দূরত্ব : সঙ্গ-নৈঃসঙ্গ্যের সেলুলয়েড ফলো

‘চলচ্চিত্র’ একচেটিয়া পুঁজিবাদের এবং ‘টেলিভিশন’ বহুজাতিক পুঁজিবাদের দৃশ্যশ্রাব্য উপস্থাপনার সাংস্কৃতিক রূপ। একচেটিয়া পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে ১৮৯০-এর দশকে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির প্রচলনের ফলে এবং বহুজাতিক সংস্থার পুঁজিবাদের যাত্রা শুরু হয় ১৯৪০ সালে পরমাণুশক্তির উদ্ভবের মধ্য দিয়ে। বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির প্রচলনের ফলেই ১৮৯৫-এর পরপরই চলচ্চিত্রশিল্প সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি প্রকাশের একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পেরেছে। প্রযুক্তিনির্ভর চলচ্চিত্র প্রথম দিকে একচেটিয়া পুঁজিবাদের প্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠে। পরের দিকে চলচ্চিত্রশিল্প বহুজাতিক পুঁজির আওতায় চলে আসে। পরমাণুশক্তির অধিকারী রাষ্ট্রসমূহের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনেই বহুজাতিক পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে। আমাদের দেশে বহুজাতিক সংস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদের কিছুটা বিকাশ ঘটেছে বটে, কিন্তু একচেটিয়া পুঁজিবাদের রমরমা অবস্থা এখন আর নেই। ফলে এক ধরনের মিশ্র অর্থনীতির, যাকে অনেকে বিকৃত পুঁজিবাদ তথা পারভারটেড ক্যাপিটালিজম্ বলতে চান, তার অবস্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। বহুজাতিক সংস্থা জুতা, ওষুধ, পোশাক, ফ্রিজ, টেলিভিশন, সেলাই কল ইত্যাদি খাতে পুঁজি লগ্নি করে চলেছে বহু আগে থেকেই। এখন প্রাকৃতিক গ্যাস, টেলিভিশন-মাধ্যমেও পুঁজি খাটাতে চাচ্ছে। ইটিভি সক্রিয় থাকলে হয়তো আরো অনেকেই এগিয়ে আসত। দেশীয় পুঁজির অনুপ্রবেশও ঘটেছে টেলিভিশন-মাধ্যমে।

সাম্প্রতিক সময়ে এফডিসি-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রশিল্পে এখন আর দেশীয় শিল্পপতিরা পুঁজি লগ্নি করতে উৎসাহী নন – কারণ এই খাতে মুনাফা আর আগের মতো নেই। লগ্নিকৃত পুঁজি প্রায় ক্ষেত্রেই ফিরে আসে না। যা-ও বা লগ্নি করা হয়, তার মধ্যে কালো টাকার পরিমাণই বেশি। এই অবস্থায় টেলিভিশনে টেলিফিল্ম(?) দেখিয়ে পুঁজি ফেরত পাবার এবং মুনাফা করার লক্ষণ এখন স্পষ্ট বাংলাদেশে। পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে পুঁজি ফিরে আসছে। টেলিফিল্ম বা চলচ্চিত্রটি নির্মাণে যে-ব্যয় হচ্ছে, তা দিচ্ছে হয় কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের স্বত্বাধিকারী বা কোনো দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান। কখনো-বা এদের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে চলচ্চিত্রটি।

নির্বাচিত চলচ্চিত্র-নির্মাতা একটা থোক অর্থের বিনিময়ে চলচ্চিত্রটি তৈরি করে দিচ্ছে। এই ফিনিশড্ প্রডাক্টের প্রচারস্বত্ব থাকছে টেলিভিশন চ্যানেলের হাতে। তারা টেলিভিশন এবং প্রেক্ষাগৃহে প্রিমিয়ার শো করে, প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করে লগ্নিকৃত পুঁজি তুলে আনছে। এ-ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন প্রচার এবং টিকিট বিক্রি বাবদ অর্থের ওপর টিভি চ্যানেলগুলোকে নির্ভর করতে হচ্ছে। সংবাদ হচ্ছে যে, লগ্নিকৃত পুঁজি ফেরত তো আসছেই, সঙ্গে মুনাফাও হচ্ছে।

দূরত্ব চলচ্চিত্রটি বীক্ষণের শুরুতে চলচ্চিত্রের বাজার বা চলচ্চিত্রের অর্থনীতি নিয়ে সামান্য আলোচনা করতে হলো এ-জন্য যে, এটিও একটি দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং চ্যানেল আইয়ের ফিল্ম ডিভিশন তথা ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড কর্তৃক যথাক্রমে নিবেদিত এবং প্রযোজিত। চলচ্চিত্র-নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম থোক অর্থের বিনিময়ে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করে দিয়েছেন। এই প্রবণতা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির বিকাশের জন্যে একটি শুভ দিক, কেননা চলচ্চিত্রশিল্পে পুঁজি বিনিয়োগের জন্যে নতুন প্রযোজকশ্রেণি এগিয়ে আসছে। এতে করে এফডিসি-কেন্দ্রিক যে-নিম্নমানের চলচ্চিত্র তৈরি হয়, যার দর্শক প্রধানত নিম্নআয়ের মানুষ – তার বিপরীতে সুস্থ ও বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্র নির্মিত হবার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যে-চলচ্চিত্রের দর্শক মধ্য ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির। প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখার প্রবণতা হয়তো এভাবে আবার ফিরে আসবে। চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহেই দেখা উচিৎ – কেননা, মৃণাল সেন তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে একবার আমাকে বলেছিলেন যে, ‘টেলিভিশনে চলচ্চিত্র দেখলে মূল চলচ্চিত্রের তিরিশ থেকে চল্লিশ ভাগ পাওয়া যায় না। খোয়া যায়।’

নতুন প্রযোজকশ্রেণি আসছে বটে, তবে এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে চলচ্চিত্র-মাধ্যমের প্রতি নির্মাতার যে-কমিটমেন্ট এবং যা তিনি এ-মাধ্যমকে ব্যবহার করে বলতে চান বা যে-ধরনের নিরীক্ষা তিনি করতে চান – তাতে বাধা পেতে পারেন। কারণ যারা পুঁজি লগ্নি করছে, তারা চাইবে তাদের পুঁজি যাতে ফেরত আসে, এবং যে-শ্রেণি টেলিভিশন-মাধ্যমে প্রচারিত পণ্যের ভোক্তা, তারা যেন নির্মিত চলচ্চিত্রটি দেখতে উৎসাহী হয়। বিতর্কিত বিষয় এবং চলচ্চিত্রিক নিরীক্ষার ব্যাপারটি উল্লিখিত প্রযোজকরা এড়িয়ে চলবেন। তাঁরা জনপ্রিয়তাকে প্রাধান্য দেবেন, এটাই স্বাভাবিক।

দূরত্ব জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের ‘পুতুল’ নামের একটি গল্পের চলচ্চিত্ররূপ। মোরশেদুল ইসলাম গল্পটি হুবহু ট্রান্সপোর্ট করেছেন চলচ্চিত্র-মাধ্যমে। সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র-মাধ্যমে ট্রান্সপোর্ট বা পরিবহণের সময় প্রায় ক্ষেত্রেই গ্রহণ-বর্জনের ঘটনা ঘটে। দূরত্বের ক্ষেত্রেও কিছুটা ঘটেছে। বর্জনের ঘটনাটি ঘটেছে কাহিনী-উপস্থাপনের ক্ষেত্রে, বক্তব্যের বেলায় ঘটেনি। বক্তব্য একই – একজন মধ্যবিত্তভুক্ত লেখক তার চোখে গল্পের মধ্যে উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্ত মানুষের মধ্যকার পার্থক্য-রেখাটি বা দূরত্বটি পাঠককে দেখিয়েছেন; আর চলচ্চিত্রেও নির্মাতা ওই একই বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, নতুন কোনো মাত্রা যোগ করেননি।

পুতুল নামের আড়ালে লেখক এগারো বছরের নাদুস-নুদুস যে-ছেলেটিকে এঁকেছেন, তাকেই উপস্থিত করেছেন নির্মাতা দূরত্বতে। পুতুল উচ্চবিত্ত পরিবারের একমাত্র সন্তান, কিছুটা একা ও নিঃসঙ্গ, অসুস্থ। চলচ্চিত্রে তার অসুস্থতার ধরনটি পরিষ্কার করা হয়নি। চলচ্চিত্রের শুরুতেই পুতুলের মা তার কোনো এক আত্মীয়কে টেলিফোনে জানান যে, আগামী মাসে তারা পুতুলকে নিয়ে স্টেট্সে যাচ্ছেন অপারেশন করাতে। অপারেশনটা যাতে ভালোয় ভালোয় হয়ে যায় সেজন্যে দোয়াও চান।

এরই মধ্যে এক সকালে পুতুল ঘর থেকে বের হয়ে পার্কে যায়, অন্তু নামের এক দরিদ্র ছেলের সঙ্গে দেখা হয়, তার সঙ্গে রেলস্টেশনে যায়। ট্রেনে চড়ে ময়মনসিংহে যায়, আবার পরদিন সকালে বাড়ি ফিরে আসে। তার অবর্তমানে বাড়িতে টেনশন, থানা-পুলিশ, হারানো বিজ্ঞপ্তি, মাইকিং ইত্যাদি। গল্পের পরিসর এটুকুই। এর মধ্যেই সে পরিচিত হয় অন্তুর বোন মরিয়মের সঙ্গে, যে ট্রেনে পানি বিক্রি করে, অন্তুর জ্বরাক্রান্ত বাবার সঙ্গে। ট্রেনে দেখা পায় ওষুধ বিক্রেতার, যার দরিদ্রাবস্থা পুতুলকে ব্যথিত করে। দেখা পায় পাইপ-টানা বিত্তবানের সঙ্গে, যে অন্তুকে তার স্যুটকেস গাড়িতে তুলে দিতে বলে। দেখা পায় ট্রেনযাত্রীর, যারা মানুষকে অবিশ্বাস করে। একদিন একরাতের মধ্যে সে বিকৃত পুঁজিবাদী সমাজের নানারূপ দর্শন করে। তার সঙ্গে সঙ্গে দর্শক হিসেবে আমরাও সমাজে শ্রেণিতে শ্রেণিতে যে-দূরত্ব বিদ্যমান, তার সঙ্গে পরিচিত হই। দূরত্ব, বিচ্ছিন্নতা, নৈঃসঙ্গ্যতা – সবই সমাজবাস্তবতা থেকেই উৎপন্ন হয়। পুতুল এই সবকিছুর সঙ্গে নিজে পরিচিত হয়, আমাদেরকেও পরিচিত করায়।

অন্তু যখন তার স্বপ্নের কথা পুতুলকে বলে, তখন আমরাও অন্তুর সামান্য স্বপ্নের সঙ্গে পরিচিত হই। অন্তু পুতুলকে বলে যে, তারা অর্থ জমাচ্ছে এবং এই অর্থের পরিমাণ একহাজার হলে তারা আবার গ্রামে ফিরে যাবে – তাদের বাবা এই টাকায় একটা ছোট্ট দোকান দেবে। ওই দোকানের আয়ে তাদের সংসার চলবে, তারা দু-ভাইবোন স্কুলে ভর্তি হবে, জমি কিনবে, গাই কিনবে, একটা নৌকা কিনবে, সেই নৌকায় চড়ে বিলে মাছ ধরতে যাবে।

অন্তু ও মরিয়মের যে-স্বপ্ন তা আমাদের দেশের ভূমিহীন বা শুধু ভিটেবাড়ি আছে, এমন ক্ষেতমজুর-কৃষিশ্রমিকদের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন নিয়েই এরা শহরে আসে। কৃষিখাতে শ্রম দিয়ে যে-আয়, তাতে সংসার চলে না বলেই এরা দলে দলে শহরে চলে আসছে। অন্তুর বাবাও হয়তো, অন্তুরা আজ যে-স্বপ্ন দেখছে, সেই স্বপ্ন নিয়ে ময়মনসিংহ শহরে এসেছিল। তার স্বপ্ন পূরণ হয়নি, অন্তুরও হবে না। তবু মানুষ স্বপ্ন দ্যাখে : হুমায়ূন আহমেদ দেখেছেন – মোরশেদুল ইসলামও দেখেন এবং আমাদের দ্যাখান। দূরত্বের বক্তব্য এটিই যে, সবার সামনেই একটি স্বপ্ন থাকতে হয়। স্বপ্ন ফেরি করেছেন মোরশেদুল ইসলাম।

প্রশ্ন হচ্ছে, মাত্র একহাজার টাকায় কি এই স্বপ্ন দেখা যায়? মূল গল্পে, যে-গল্প হুমায়ূন আহমেদ ১৯৮৯ সালে লিখেছিলেন, তাতে     অন্তু পাঁচশত টাকা জমানোর পরই গ্রামে ফিরে যাবার স্বপ্ন দেখেছিল। ২০০৪ সালে মোরশেদুল ইসলাম তাকে একহাজার টাকা করেছেন। পাঁচশ বা একহাজার কোনোটাই বিশ্বাস্য নয়। হয়তো পাঁচ হাজার বললে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্য হতো। আবার হয়তো তাঁরা – লেখক বা নির্মাতা – অন্তুদের স্বপ্নকে স্বপ্নই বা কল্পনা হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন। তাই হয়তো তাঁদের কল্পনাকে কোনো বাস্তবভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চাননি। সমাজবাস্তবতায় যে-ধরনের বিকৃত পুঁজিবাদী আর্থনীতিক-বিন্যাস বর্তমান, সেখানে অন্তুদের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যেতে বাধ্য। তাছাড়া শিল্পকর্মকে যে বাস্তবের হুবহু অনুকৃতি হতে হবে বা সর্বদাই বিশ্বাস্য হতে হবে – এমন কোনো কথা নেই।

দূরত্বের মাহাত্ম্য এখানেই যে, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় যে-শ্রেণিবৈষম্যের উপস্থিতি বিদ্যমান, তাকে চলচ্চিত্রের মতো একটি গণমাধ্যমে তুলে ধরেছে। এর একটি সামাজিক প্রভাব অন্তত যারা চলচ্চিত্রটি দেখবেন, তাদের মধ্যে পড়বে। এ-কথা সত্য যে, দূরত্ব শ্রেণিসংগ্রামের চলচ্চিত্র নয়, তবে নিশ্চিতভাবেই বলা চলে যে, এটি শ্রেণিঅবস্থানের নানাদিক তুলে ধরেছে। সমাজের বৃহৎ পরিসরে শ্রেণিবৈষম্যের কারণে মানুষ কী অবস্থায় আছে, দূরত্ব সেই দিকটি অন্তু, মরিয়ম, ওষুধ বিক্রেতা, বস্তিবাসী, অন্তুর বাবার মধ্য দিয়ে দেখায়। আবার অর্থবান মানুষরা, যারা নানাভাবে অর্থ উপার্জন করে, বিশেষ করে লুটপাটের অর্থনীতির সুযোগে, যে-সুযোগ রাষ্ট্র করে দেয় রাজনৈতিক দলবাজির মাধ্যমে, তাদের ও তাদের সন্তানদের কাহিনীও পাওয়া যায় দূরত্বতে। অর্থাৎ দূরত্ব বুড়ো খোকা-খুকির স্বরূপও উন্মোচন করে।

দূরত্ব মোটেও ছোটদের চলচ্চিত্র নয়। ছোট্ট একটি ছেলের বাড়ির বাইরে গিয়ে সমাজের নানা অসংগতি ও রূঢ় বাস্তবের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আবার ঘরে ফিরে আসার কাহিনী দূরত্ব। এই যাওয়া ও ফিরে আসার মধ্য দিয়ে লেখক ও নির্মাতা যা বলতে চেয়েছেন, তা মোটেও ছোটদের বিষয় নয়। তাই কেউ যদি দূরত্বকে শিশুতোষ চলচ্চিত্র বলেন, তবে ভুল হবে। পথের পাঁচালীতেও সত্যজিৎ রায় ১৯২০-৩০ সালের গ্রামবাংলার সামন্ত অর্থনীতির ভেতরে যে-ভাঙন দেখা দিয়েছিল, তার আলেখ্যই অপু, দূর্গা, সর্বজয়া ও হরিহরের মাধ্যমে চিত্রায়িত করেছিলেন। অপু ও দূর্গাই প্রধানত কাহিনীকে ডমিনেট করে। তাই বলে পথের পাঁচালীকে কি ছোটদের চলচ্চিত্র বলতে হবে?

  দূরত্বতেও পুতুল, অন্তু, মরিয়ম, পুতুলের বাবা রহমান ও মা জেসমিনের মাধ্যমে বুটি ক্যাপিট্যালিজম বা বিকৃত পুঁজিবাদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়। এই ধাঁচের পুঁজিবাদী সমাজবাস্তবতায় নানাস্তরে মানুষে-মানুষে ও শ্রেণিতে-শ্রেণিতে দূরত্ব বা বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়। দূরত্বতে আমরা পুতুলকে দেখি যে, সে তার বাবা-মা তথা পরিবার থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন; বাবা-মা তারা নিজেরাও পরস্পর থেকে দূরত্বে; পুতুল ও অন্তুদের মধ্যেও শ্রেণিব্যবধান; অন্তু-অন্তুর বাবাও গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন’; বস্তিতে রাতে এক পরিবারে মা রান্না করতে করতে যে-গল্প বলে, তাতেও ছেড়ে-আসা গ্রামীণ লোকগাথার প্রতি ছিন্নমূল মানুষের টান অনুভূত হয় – এরা গ্রামকে ছেড়ে এসেও গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু একসময় তারা ফেলে-আসা সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হবেই। ভারসাম্যহীন বিকৃত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে ব্যক্তিবর্গ শুধু যে একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন বা দূরত্বে অবস্থান করছে, তা নয়, ব্যক্তি নিজের কাছ থেকে নিজেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। পুতুল নিজেই তার বড় প্রমাণ – তাই তার একাকিত্ব ও নৈঃসঙ্গ্যতার দিকটি দূরত্বতে বেশ বড় একটি জায়গা জুড়ে থাকতে দেখি।

দূরত্বতে শুধু নৈঃসঙ্গ্যতার রূপায়ণই দেখি না, সমাজবাস্তবতার প্রতিফলনও ঘটতে দেখি। সমাজকাঠামো ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের পরিচয় পাই। আসলে যে-কোনো লেখকই নিজের অজান্তেই একটি সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে লিখে থাকেন। সেই জন্য দূরত্বতে আপাত সরল একটি গল্পের আড়ালে আমাদের সমাজের নানাস্তরে বিকৃত পুঁজিবাদের বদৌলতে যে ভাঙন-অসংগতি দেখা দিয়েছে, তা দেখতে পাই। রহমান সাহেব একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তার ব্যবসার ধরন সম্পর্কে সবটা জানা না গেলেও এটি জানা যায় যে, তিনি একজন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। অর্থবান মানুষ, কাজেই ক্ষমতাবানও। তার ক্ষমতার প্রকাশ ঘটতে দেখি থানার ওসির সঙ্গে কথোপকথনে, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের দপ্তরে।

এ-রকম অর্থবান-ক্ষমতাবান ব্যক্তির পরিবারের অন্দরে স্বামী-স্ত্রী ও বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্ক-ব্যবস্থাটি কীরকম – তার একটি চিত্র পাই দূরত্বতে। প্রাচুর্যও যে মানুষে-মানুষে বিচ্ছিন্নতা ও দূরত্ব তৈরি করে, তার সেলুলয়েড ফলো হচ্ছে দূরত্ব।

দুই

সেলুলয়েড ফলো হচ্ছে চলচ্চিত্র-ভাষায় গল্প বা আখ্যানের অনুসরণ। মূলত দৃশ্য-সংগঠনের উপাদানসমূহ বিবেচনায় এনেই চলচ্চিত্র-ভাষার মাত্রাটি অনুধাবন করা দরকার। চলচ্চিত্র-ভাষার মাত্রাটি অনুধাবনের চেষ্টা করা মানেই চলচ্চিত্র-বীক্ষণ বা চলচ্চিত্র-সমালোচনা। উপরে এ-পর্যন্ত যা লেখা হয়েছে, তা যেন ঠিক পুরোপুরি চলচ্চিত্র-সমালোচনা নয়, অনেকটাই যেন সাহিত্যালোচনা।

 মোরশেদুল ইসলাম চলচ্চিত্র-ভাষার মাত্রিক প্রয়োগের মাধ্যমে রচনা করেছেন দূরত্ব – চলচ্চিত্রটি আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেবার ক্ষেত্রে এটিও অন্যতম কারণ। চলচ্চিত্র-ভাষা গল্প বা বিষয় নয়, নির্মাণশৈলীর উপর নির্ভর করে। এই নির্মাণশৈলীর মধ্যে চিত্রনাট্য, দৃশ্য-সংগঠন (কম্পোজিশন) ও দৃশ্যগ্রহণ, অভিনয়, দৃশ্যসজ্জা ও আলোর ব্যবহার, সাজসজ্জা, আবহসংগীত, টাইটেল কার্ড রচনা ও প্রবাহ এবং সম্পাদনা প্রধান। আর আছেন পরিচালক বা নির্মাতা, যিনি চলচ্চিত্র-ভাষাকে ব্যবহার করে গল্প বা বক্তব্যকে প্রকাশ করেন। গল্পটি বা বক্তব্যটি প্রকাশ করার দৃষ্টিভঙ্গি বা ধাঁচের ওপরই নির্ভর করে চলচ্চিত্রটি ঠিক কোন ধরনের চলচ্চিত্র-নির্মাণ ধারায় পড়ে।

দূরত্বতে নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম যে-ধাঁচের নির্মাণকৌশল অবলম্বন করেছেন, তাতে একটি রিয়ালিস্ট অ্যাপ্রোচ আছে। কেউ কেউ হয়তো নিও-রিয়ালিস্ট বা নব্য-বাস্তববাদী ধারায় দূরত্ব নির্মিত হয়েছে বলেও ভাবতে পারেন। পথের পাঁচালী নির্মাণের পর চিদানন্দ দাশগুপ্ত এটি নিও-রিয়ালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে নির্মিত বলে মন্তব্য করেছিলেন। পথের পাঁচালী আর দূরত্বের মধ্যে দূরত্ব অনেক – কিন্তু দুটি চলচ্চিত্রই সমাজবাস্তবতার অন্তর্লীন সত্যকে প্রকাশ করেছে – প্রথমটি সামন্তসমাজের, দ্বিতীয়টি বিকৃত পুঁজিবাদী সমাজের। যাই হোক, আমার কাছে দূরত্ব একটি বাস্তববাদী নির্মাণ বলেই অনুভূত হয়েছে। যদিও পুতুলের ভাবনাকে নির্মাতা চলচ্চিত্র-ভাষায় অনুবাদ করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে জাম্প-কাটের আশ্রয় নিয়েছেন। তাতে করে বাস্তবতার যে-ইলিউশন অনেকক্ষণ ধরে তৈরি হয়েছিল, তা হঠাৎ করে ভেঙে যায়। নির্মাতা এই অ্যাপ্রোচটি ভেবেচিন্তেই ব্যবহার করেছেন। এটি চরিত্রের ভাবনাকে মূর্ত করার একটি কৌশল। এক্সপ্রেশনিস্ট ধারার চলচ্চিত্রে এই কৌশল বহুল মাত্রায় ব্যবহৃত হয়।বস্তুত চিত্রনাট্য-রচনার সময়ই নির্মাতা চলচ্চিত্রটি কোন শৈলী ও দৃষ্টিভঙ্গির আওতায় নির্মাণ করবেন, তা ঠিক করে নেন। ‘পুতুল’ থেকে দূরত্বের চিত্রনাট্য-রচনার সময়েই মোরশেদুল ইসলাম তাঁর নির্মাণকৌশল যে বাস্তববাদী ধারায় বিন্যস্ত হবে, তা সম্ভবত টের পেয়ে গিয়েছিলেন। এই পর্যায়ে আমরা দেখতে চাইব চিত্রনাট্য-রচনার সময় তিনি মূল গল্প ‘পুতুল’ থেকে কতোটা গ্রহণ আর কতোটা বর্জন করেছেন।

আগেই বলা হয়েছে, বক্তব্য বদলাননি – তবে চলচ্চিত্র-মাধ্যমে গল্পটি পরিবহণের সময় কিছু প্রসঙ্গ-ঘটনা বর্জন করেছেন। পুতুলের মামার চরিত্রটি বাদ দিয়েছেন নির্মাতা। সম্ভবত কাহিনী-কাঠামোতে কোনো কনট্রিবিউট করে না বলেই এই বাদ-পড়া। তাছাড়া পুতুলের বাড়ি ছাড়ার আগ পর্যন্ত অনেকটা সময় গল্পটি বাড়িতেই অবস্থান করে। মামার চরিত্র আনলে আরো বেশি সময় নিয়ে নিত। বাদ পড়েছে স্টেশনে যাওয়ার পথে অন্তুর সিগারেটের প্যাকেট কুড়ানোর প্রসঙ্গটি। বাদ পড়েছে পুতুলের বারবার নানা ইস্যুতে ‘পাপ’-এর কথা বলার ব্যাপারটিও। মরিয়ম ছাড়াও আরো যে-দুজন পানি বিক্রেতার কথা গল্পে আছে, তাদেরকেও নির্মাতা চিত্রনাট্যে স্থান দেননি। তাছাড়া আরো কিছু প্রসঙ্গ, যা মূলত সংলাপ-আকারে মূল গল্পে আছে, নির্মাতা সেগুলো ছেঁটে ফেলেছেন। এতে করে চলচ্চিত্রটি টানটান একটি অবস্থায় বরাবর থেকে গেছে।

তবে একটি বিষয় বাদ দেওয়া বোধকরি সঠিক হয়নি। সেটি হচ্ছে পুতুলের অসুখের ধরনটি। মা যে শুরুতে টেলিফোনে আত্মীয়কে বলছে, পুতুলকে আমেরিকা নেওয়া হবে অপারেশনের জন্য – নির্মাতা কীসের অপারেশন বা অসুখটাই বা কী – তা কোথাও ইস্ট্যাব্লিশ্ করেননি। কিন্তু মূল গল্পে আছে যে, পুতুলের হার্টের ভাল্ব ঠিক করার জন্যেই তাকে আমেরিকায় নেওয়া হবে। তার প্রস্তুতি হিসেবেই সে স্কুলে যাচ্ছে না, বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছে, প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহণ করছে। পুরো চলচ্চিত্রে বেশ কয়েকবারই বলা হয়েছে যে, পুতুল অসুস্থ। কিন্তু বাস্তবে এই অসুস্থতার লক্ষণ একবারও দেখানো হয়নি! তাই সে যে শারীরিকভাবে অসুস্থ, তা বোঝাও যায়নি। মনে হয়েছে, নিঃসঙ্গ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কেউ। তবে কী নির্মাতা এই য়ঁরহঃবংংবহঃরধষ তথ্যটি দর্শকদের দিতে চাননি?

না-দেওয়াতে পুতুল-চরিত্রটি তার গভীরতা হারিয়ে ফেলেছে বলে মনে হয়েছে। এই ধরনের ঠধষাঁষধৎ ফরংবধংব যাদের, তাদের নানারকম সমস্যা থাকে। মূল গল্পে যেমন বলা হয়েছে যে, পুতুলের একতলা থেকে দোতলায় সিঁড়ি ভেঙে ওঠা নিষেধ এবং ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ে আর স্কুলে যায় না, ঘরে এসেই দুজন মাস্টার পড়ায় ইত্যাদি – চলচ্চিত্রে এ-প্রসঙ্গগুলো বর্জন করা হয়েছে। ফলে পুতুল যে কেন স্কুলে যায় না, তা-ও পরিষ্কার হয়নি।

পুতুলের হার্টের যে-অবস্থা তাতে তার শ্বাসকষ্ট হওয়ার কথা, একটুতে হাঁপিয়ে যাওয়া, অজ্ঞান হওয়া বা মাঝে মাঝে কাশি আসার কথা। ভাল্ব, হৃদযন্ত্র বা রক্তনালিতে রক্তের একমুখী প্রবাহকে নিশ্চিত করে, কিন্তু কোনো কারণে যদি কোনো ভাল্বে ত্রুটি ধরা পড়ে, তবে অপারেশন অনিবার্য হয়ে পড়ে। এই অপারেশনের কথা শুরুতে বলাও হয়েছে। কিন্তু ভাল্বে গোলমাল দেখা দিলে যেসব সমস্যা হয়, পুতুলের এই দীর্ঘযাত্রায় তার একটিও দেখাননি নির্মাতা। গল্পটি চিত্রনাট্যে পরিবহণের সময় এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়াতে চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা কিছুটা উবে গেছে।

বিশ্বাসযোগ্যতা যে-কোনো শিল্পের একটি অন্যতম শর্ত। এমনকি আপাত অবিশ্বাস্যকে বিশ্বাস্য করে তোলাও শিল্পের ধর্ম। তাছাড়া যখন ভাবা হচ্ছে দূরত্ব একটি বাস্তববাদী নির্মাণ, তখন তো রেফরান্স্ এবং ইন্ফারান্স্ দিয়েই নির্মাতাকে গল্পটি বলতে হবে।

চলচ্চিত্র-ভাষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে দৃশ্য-সংগঠন। এই ব্যাপারে মোরশেদুল ইসলাম দূরত্বতে দারুণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। চাকার পর কামব্যাক্ ফিল্ম হিসেবে দূরত্বকে এগিয়ে রাখতে হচ্ছে এই দৃশ্য-সংগঠনের দিকটি বিবেচনা করেই। দৃশ্য-সংগঠনের ক্ষেত্রে প্রায়ই নির্মাতা পরপর দুটি দৃশ্য সাজিয়ে একটির সঙ্গে অন্যটির ‘বৈপরীত্য’ তৈরি করেছেন। যেমন, গল্পে পুতুলের মা রাতে পুতুলকে গল্প শুনিয়ে কপালে চুমু দিয়ে ‘গুড নাইট পুতুল সোনা’ বলে। কিন্তু চলচ্চিত্রে দেখি পুতুল বিছানায় এইরকম একটি দৃশ্য ভাবে, কিন্তু বাস্তবে রাতে যখন মা বাইরে থেকে ফিরে আসে, তখন দেখে যে পুতুল ঘুমিয়ে গেছে। আবার সকালে বাবা যখন গাড়ি করে বাইরে চলে যায়, তখনো পুতুল ভাবে বাবা তাকে আদর করে যাচ্ছে। বাবা গাড়ি ঘুরিয়ে যখন সত্যি-সত্যি আদর করার জন্যে আসে, তখন জরুরি ফোন পেয়ে দ্রুত গাড়ি নিয়ে আবার বেরিয়ে যায়। নির্মাতা দুটি ক্ষেত্রেই পুতুলের     চিন্তাকে ভিজ্যুয়ালাইজ করেছেন – ফলে ভাবনা ও    বাস্তবের মধ্যে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়। আবার শুরুর দিকেই দেখা যায় যে, পুতুল ও তার মা লং ড্রাইভে : অপসৃয়মাণ বৃক্ষরাজি, পুতুল জানালার কাচ খুলতে চায়, মা বাধা দেয় – পরক্ষণেই বুঝতে পারি এটি পুতুল শুয়ে শুয়ে ভাবছে – এখানেও বৈপরীত্য।

 বৈপরীত্য দিয়ে যেমন পুতুলের সঙ্গ-নৈঃসঙ্গ্যের মাত্রাটি দেখানো হয়েছে, তেমনি এই বৈপরীত্য দিয়েই সমাজে শ্রেণিবিভাজনের ফলে সৃষ্ট অভাব ও দারিদ্র্য দেখানো হয়েছে। পুতুলের ঘরে কতো খাবার, অথচ বাড়ির বাইরে এসে পার্কে যার সঙ্গে প্রথমেই পুতুলের দেখা হয়, সেই অন্তু প্রায়ই ভুখা থাকে বলে জানায়। আবার পুতুলের বাবার কাছে অপহরণকারীরা যখন মুক্তিপণ দাবি করে, তখন মা ভাবছে মুখবাঁধা        পুতুলের কথা। বাস্তবে পুতুল তখন অন্তুদের সঙ্গে। এখানেও বৈপরীত্য দিয়েই মা-র উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন নির্মাতা।

 বৈপরীত্যের চূড়ান্ত নজির হচ্ছে নিমতলির পীর সাহেব দুবার পুতুলের কাপড় শুঁকে যা বলে, অথচ আমরা যা দেখি সেইসব দৃশ্য-সংগঠনে। প্রথমবার বলে পুতুল লঞ্চে করে বরিশাল যাচ্ছে, অথচ তখন তাকে আমরা অন্তুর সঙ্গে রিকশাভ্যানের পিছনে বসে থাকতে দেখি। দ্বিতীয়বার যখন বলে যে, পুতুলকে এবার তিনি ট্রাকের ওপর দেখছেন, বিপরীতে আমরা তাকে ট্রেনে চড়ে ময়মনসিংহে যেতে দেখি।

দৃশ্য-সংগঠনের ক্ষেত্রে কোনো কোনো দৃশ্য অবিশ্বাস্য ও ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। যেমন, পুতুলের গায়ের ছোট্ট লাল গেঞ্জি দিয়ে মাছ ধরে ফেলা অথবা ওদের সঙ্গে থাকা কুকুরটি, যেটি মাছগুলো খেয়ে ফেলতে চায়, তাকে পুতুল আর অন্তু যখন হেঁটে হেঁটে স্টেশনের দিকে যাচ্ছে, তখন আর দেখতে না পাওয়া। অথচ স্টেশনে ওরা যখন রেলগাড়ির দিকে যাচ্ছে, তখন আবার তাদের সঙ্গে আরেকটি কুকুর দেখি! কনটিনিউটি ব্রেক হয়ে গেছে বলে মনে হয়েছে। অন্তু এবং পুতুল যখন ঢাকা শহরের ফুটপাথ ধরে হেঁটে কমলাপুরের দিকে যাচ্ছিল, তখন তারা যে-দেয়ালের পাশ দিয়ে হাঁটছিল, তাতে কিছু রাজনৈতিক শ্লোগান দেখা যায়, কিন্তু অস্পষ্ট। নির্মাতা দেয়াল-লিখনকে ব্যবহার করতে পারতেন। দেশের দরিদ্রজনদের অধিকার-আদায়ের সংগ্রাম যে চলছে বা চালানো দরকার, সে-বিষয়ে কিছু শ্লোগান থাকতে পারত দেয়ালে। তখন দেয়াল-লিখনটা, নিজেই একটি বক্তব্য রেখে যেতে পারত দূরত্বতে। দূরত্ব আছে ঠিক, কিন্তু তা মোচনের সংগ্রামও যে চলছে, তাকে প্রতিষ্ঠিত করার একটি সুযোগ হারালেন নির্মাতা। আগেই বলা হয়েছে, দূরত্ব শ্রেণিসংগ্রামের চলচ্চিত্র নয়, কিন্তু শ্রেণিসংগ্রাম যে চলছে, তা চিৎ করা যেত দু-একটি দেয়াল-লিখনের মাধ্যমেই। বস্তুত দারিদ্র্য তো দরিদ্রজনদের তৈরি নয়, সমাজে শ্রেণিশোষণের ফল ও পরিণতিই হচ্ছে দারিদ্র্য। বাস্তববাদী চলচ্চিত্র-নির্মাণ-ধারায় নির্মাতা দেয়াল-লিখনের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটি রেখে যেতে পারেন বৈকি।

দূরত্বতে অনেক দৃশ্য আছে, যেসব দৃশ্যের কম্পোজিশনে নির্মাতার চলচ্চিত্র-ভাষায় গল্প-বলার দক্ষতাটি প্রকাশিত। যেমন ট্রেনে গান গেয়ে ওষুধ বিক্রি করার দৃশ্যটি। দৃশ্যটি বেশ দীর্ঘ, কিন্তু দৃশ্য-গ্রন্থণা এবং জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের সপ্রতিভ অভিনয়ের কারণে বোরিং হয়ে ওঠেনি। শুধু জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ই নয়, এই চলচ্চিত্রে সুবর্ণা, ফরিদী, ফাহাদ, অমল, মিথিলা, আহসানুল হক মিনু, আসাদ, শহীদুল আলম সাচ্চু, রহমত আলী – সবার অভিনয়ই চরিত্রানুগ হয়েছে। তবে পরপর দুটি আস্ত গান ব্যবহার করার কী কোনো দরকার ছিল? মূল গল্পে পরপর দুটি গানের প্রসঙ্গ আছে বটে, চলচ্চিত্রে তা বর্জন করা যেত অথবা প্রথম গানের শেষটা থেকে দৃশ্যটি শুরু করা যেত। প্রথম গানের শেষ দুটি চরণ গেয়ে ওষুধ-বিক্রেতা ওষুধ বিক্রি শুরু করতে পারত। এই দৃশ্যের দুটি গানের সময়েই পুতুলের রি-অ্যাকশন শট্ ব্যবহৃত হয়েছে। পুতুল গানের কথার সঙ্গে কোথায় যেন নিজের ভাবনার মিল খুঁজে পায়। প্রথম গানে কোথাও ‘যাওয়ার’ প্রসঙ্গটি এবং দ্বিতীয় গানে পাখিকে ‘ছাড়ার’ ব্যাপারটি পুতুলকে ভাবায়, নিজের সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা করে। নির্মাতা পুতুলের রি-অ্যাকশন শট্ দিয়ে তার মনোভাব ইস্ট্যাব্লিশ্ করেছেন।

এ-চলচ্চিত্রে দৃশ্যগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া (এফটিআইআই) থেকে ফটোগ্রাফিতে ডিপ্লোমা করা অপু রোজারিও এবং শব্দধারণ ও পুনরুৎপাদনে ডিপ্লোমা করা রতন পাল। তাঁদের কাজ দূরত্বকে চলচ্চিত্রিক গভীরতা দিয়েছে। দৃশ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে পুতুল যখন বাড়ির বাইরে এসে ঢাকা শহর দেখছে, তখন এমন লেন্সের ব্যবহার দাবি করে, যে-লেন্স দৃশ্যের মধ্যে প্রসারতা আনতে পারে অর্থাৎ ফিল্ড অফ ভিউয়ের প্রসার অনেক বাড়িয়ে দেয় – তেমন লেন্সের ব্যবহার পাইনি। অনেক সময় লেন্সের ব্যবহারের মধ্য দিয়েই নির্মাতা একটি অনির্বচনীয় মন্তব্য রেখে যেতে পারেন। যেমন দূরত্বতে পুতুলের চোখে বাড়ির বাইরে যে-বিস্ময় অপেক্ষা করছিল, তা নরম্যাল লেন্সে ধারণ করা সম্ভব নয়, তার জন্য ১৬-২৪ মিমি ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স জরুরি ছিল। কিন্তু ব্যবহৃত হয়েছে ২৮ মিমি – যা ফ্রেমের অন্তর্গত দৃশ্যবস্তুসমূহকে প্রসারতা দিতে পারেনি।

রতন পাল প্রতিভাবান মানুষ – তাঁর কাজ সবসময়েই আমাদের ভাবায়। দূরত্বতেও তাঁর প্রায়-নিখুঁত সম্পাদনা চলচ্চিত্রটিতে গতি এনে দেয়। চলচ্চিত্রের ভাষায় গল্প-বলার ক্ষেত্রে সম্পাদনা-কর্মটি প্রায় নিখুঁত না হলে সবকিছু ঝুলে যাবার ভয় থাকে। তবে শব্দ-ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি জায়গায় অসতর্কতা লক্ষণীয় – যেমন মাইকিংয়ের কথা বলার পরই ফরিদীর ওপরই মাইকিংয়ের শব্দ এসে গেছে; পুতুল চা-ভরা ফ্লাক্সটি যখন ট্রেনের জানালায় রাখে, তখন টং করে শব্দ হয় এবং ফ্লাক্সটি যে আদতে শূন্য তা বোঝা যায়, ফ্লাক্সটি নিয়ে ট্রেনের দিকে আসার সময়ও বোঝা যায় ওটি খালি। এ-রকম আরো দুটি বিষয়, যা বোঝা না গেলে ভালো হতো। যেমন, পুতুলদের বাড়ির গাছটি যে আদতে বানানো এবং শহীদুল আলম সাচ্চুর চুলগুলোতে যে সাদা রং দেওয়া হয়েছে। বাস্তববাদী-নির্মাণে মেকি জিনিসে কাজ চলে না। এ-চলচ্চিত্রে শব্দ ও সংগীত দিয়ে সাউন্ডট্রাক তৈরির কাজটি ইমন সাহা করেছেন। সংগীতের পরিমিত ব্যবহার দূরত্বকে চলচ্চিত্র-ভাষায় কথা বলতে সাহায্য করেছে।

খুব বেশি ছিদ্র অন্বেষণ হয়ে গেল, কিন্তু উপায় নেই। দূরত্ব আমাদের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতিতে এমন একটি সংযুক্তি, যা আমাদের ভাবিয়েছে বলেই এত কথা। কথা আরো আছে, শেষে যে পুতুল, অন্তু ও মরিয়মের বিচ্ছেদ-দৃশ্য, সেটি কী একটু ঘনবদ্ধ হতে পারত না? এতটা সময় ওরা একসঙ্গে ছিল, কারো জন্যেই কী কারো মায়া জন্মায়নি? মূল গল্পে আছে, ‘চোখের জল গোপন করার জন্যেই সে ছুটে বাড়ির গেটের ভেতর ঢুকে পড়ল।’ চলচ্চিত্রে পুতুলকে তেমন আচরণ করতে দেখা যায়নি। অন্তু ও মরিয়মেরও পুতুলের জন্যে কষ্ট হবার কথা, গল্পে সে-প্রসঙ্গও       এনেছেন লেখক হুমায়ূন আহমেদ: ‘এই মুহূর্তে শীতের জন্যে তাদের কষ্ট হচ্ছে না, কষ্ট হচ্ছে অন্য কোনো কারণে।’ এই কারণের উৎস হচ্ছে পুতুল। চলচ্চিত্রে এই পুতুল না ফেলল ‘চোখের জল’, না তাকালো ফিরে!কথা আরো আছে, পুতুল যখন ওদেরকে পেছনে ফেলে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল, তখন দারোয়ান কোনো শব্দই করল না! তাহলে কী সে জানত না যে পুতুল বাড়িছাড়া? শব্দও কিন্তু এক ধরনের শট্ – এই শট্ দিয়ে দৃশ্য না দেখিয়েও অনেক কিছু বলা যায়। সাউন্ড লেভেলে দারোয়ানের একটি সাউন্ড শট্ দরকার ছিল। পুতুলকে ফিরে পেয়ে বাড়ির ভেতরেও যে সবাই খুশি – তা-ও সাউন্ড শট্ দিয়েই বোঝানো যেত। যে-সাউন্ড বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে অন্তু ও মরিয়ম শুনছে। তারপর তারা ফিরে চলে যাচ্ছে। কিন্তু নির্মাতা দৃশ্যের প্রতি জোর দিয়ে দেখিয়েছেন মা আদর করছে পুতুলকে, কোনো শব্দ নেই দৃশ্যের সঙ্গে। এরপর অন্তু আর মরিয়ম পার্কে গিয়ে এক বুড়োর জ্বালানো পাতার আগুনের ওপর হাত মেলে ধরে। এই দৃশ্যটির কোনো প্রয়োজন ছিল কি? এ-জায়গাটি বর্জন করে ‘চোখের জল’ গোপন করে বাড়িতে ঢুকে যাবার জায়গাটি প্রতিষ্ঠিত করার দরকার ছিল। তাহলে পুতুলের এবং অন্তুদের কষ্ট দর্শকের মধ্যেও সঞ্চারিত হবার সুযোগ তৈরি হতো। কষ্ট ভাগ করে নেবার মধ্যেই কিন্তু চলচ্চিত্র-দর্শনের আনন্দ। চলচ্চিত্রিক সময় ও পরিসরের মধ্যে কষ্ট খোদাই করতে পারার মধ্যেই তো আসলে শুদ্ধ চলচ্চিত্র নির্মাণের রহস্য লুকিয়ে থাকে।