হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায় আমার মামাবাড়ি। মাঝে-মধ্যে ওখানে গেলে খোলা মাঠ, খোলা আকাশ, মুক্ত বাতাস পেয়ে প্রাণভরে নিশ্বাস নিয়ে বাঁচি। তাছাড়া মাতৃসমা বৃদ্ধা মামিমার ডাক তো আছেই। বিশেষ করে জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে বাগানের কাঁঠাল পাকলে আমার ডাক পড়বেই।

কম্পাউন্ডের মধ্যেই বিরাট কাঁঠালের বাগান। গাছে গাছে বড় বড় কাঁঠাল ঝুলছে। কে কত খাবে খাও। চোরেরাও মামিমার বাগানের কাঁঠাল খেয়ে খেয়ে এলিয়ে গেছে। তারাও আর রাত-দুপুরে কষ্ট করে কাঁঠাল চুরি করতে আসে না। বয়েস যথেষ্ট হলেও মামি এখনো লাঠিতে ভর দিয়ে কোমরে একটি হাত রেখে দাঁড়িয়ে পাড়া-প্রতিবেশীদের গোটা গোটা কাঁঠাল বিলি করেন। খুব আনন্দ পান। তবুও কাঁঠাল পেকে আপনিই গাছ থেকে পড়ে ছত্রাকার হয়ে যায়। সেগুলো যায় গরু-ছাগলের ভোজে। কাঁঠালের গন্ধে বাগান ম’ ম’ করে।

প্রকৃতির টানে আর মামিমার আহ্বানে এখানে প্রায়ই আসতে ইচ্ছে করে। হাওড়া থেকে গুপ্তিপাড়া ট্রেনে মাত্র আড়াই ঘণ্টার পথ। কাজেই যাতায়াতের এমন অসুবিধে নেই। শুধু যে পিছিয়ে যাই তার একমাত্র কারণ মূর্তিমান, আমারই সমবয়সী মামাতো ভাইটি। সংসারে এক-একটি মানুষ থাকে যারা প্রকৃত অর্থে কোনো ক্ষতি করে না, করার ইচ্ছাটুকুও থাকে না। তবু তাদের হাবভাব, আচরণ, কথাবার্তা, স্বার্থপরতা এমনই যে কিছুতেই তাদের সহ্য করা যায় না।

নটবর এই রকমই একজন। বয়েস পঁয়তাল্লিশ। এরই মধ্যে জমিজমা, তেজারতি ব্যবসা, মাছের চাষ ইত্যাদি করে মাথায় মস্ত একখানি টাক আর ব্যাংকে প্রচুর টাকা নিয়ে নিশ্চিন্তে গ্রাম্য পলিটিক্স আর একচ্ছত্র পারিবারিক কর্তৃত্ব চালিয়ে যাচ্ছে।

তা যাক। কিন্তু ওর পাল্লায় একবার পড়লে সহজে ছাড়া পাওয়া কঠিন। এইটেই সমস্যা। প্রথমত, তার অসহ্য ‘হামবড়াই’ ভাব। যেন নিজে একজন বিরাট কেউ-কেটা মানুষ। সবাই যেন তাকে খাতির করে চলে। দ্বিতীয়ত, মহাতার্কিক। তর্ক করার যেমন-তেমন উপলক্ষ পেলেই হলো। অমনি তাকিয়ায় (এই বয়েসেই) ঠেসান দিয়ে পান চিবুতে চিবুতে শুরু করবে তর্ক, যে-তর্কে পেরে উঠবে না কোনো সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। পালিয়ে বাঁচতে চাইবে।

ওখানে গেলে সর্বাগ্রে দেখা হবেই নটবর চন্দ্রের সঙ্গে। কারণ ও বেশির ভাগ সময়েই বাইরের বৈঠকখানায় বসে থাকে। আমাকে দেখামাত্র উঠে দাঁড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলবে, এসো, এসো ভ্রাতঃ। এতদিনে আমার কথা মনে পড়ল? (যেন ওর সঙ্গে দেখা করতেই আমার আসা)। এবারে এসেও একই পরিস্থিতি – এসো এসো ভ্রাতঃ! এতদিনে আমার কথা –

কথা না বাড়িয়ে একটু হেসে শুধু জিজ্ঞেস করলাম, মামিমা কোথায়?

বুঝিয়ে দিতে চাইলাম মামিমার জন্যেই আসা। আর কারও জন্যে নয়।

নটবর ফের নাটকীয়ভাবে বলল – মাতৃদেবী! তাঁর খোঁজ রাখার বিশেষ সুযোগ হয় না এ হতভাগ্যের। কারণ তিনি থাকেন মাথার উপরে স্বর্গে। আর আমি থাকি এই পাতালে! তবে আজকের এই মুহূর্তের কথা বলতে পারি। সম্ভবত তিনি এখন বাগানে দাঁড়িয়ে কাঁঠাল পাড়াচ্ছেন এবং সম্ভবত পাড়া-প্রতিবেশীদের বিতরণ করছেন।

কী করব ভাবছিলাম। ভ্রাতাটি হাত তুলে বিনয়-সহকারে বাগানে যাবার পথটি দেখিয়ে দিল। বাগান এবং বাগানের পথটি আমার চেনা। তবু যে দেখানো তার কারণ বোধহয় অনুমতিপ্রদান।

গুপ্তিপাড়ার রথ বিখ্যাত। তাই কাঁঠাল খাবার নেমন্তন্নর সঙ্গে রথ দেখার ইচ্ছেটাও এবার আমাকে এখানে টেনে আনল। ঠিক করেই এসেছিলাম যে দু-তিন দিন থাকব নটবরকে এড়িয়ে – বাইরে বাইরেই ঘুরব। কিন্তু নটবরের হাত থেকে মুক্তি নেই। ভালোবেসে নয়, খোঁচা দিয়ে পরিচিত মানুষকে জর্জরিত করে ও এক বিচিত্র আনন্দ পায়। ওর এক ধরনের বিশেষ মানসিকতা লক্ষ করেছি। সেটি হচ্ছে কমপিটিশান। সকলকে টেক্কা দিয়ে ও চলবে এটাই ওর চরম লক্ষ্য। সে নিজে গ্রামে বাস করে সেই জন্যে শহরের বিশেষ করে কলকাতার মানুষকে গ্রাহ্য করতে চায় না। সে চাকরি করেনি কখনও, তাই চাকুরে বাবুদের সহ্য করতে পারে না। যেহেতু আমি কলকাতায় সপরিবারে থাকি আর চাকরি করি সেজন্যে ও আমাকে বিদ্রƒপ করতে চায়। তার প্রচুর টাকা তাই একদিন কথায় কথায় চোখ মটকে চাপা গলায়

জিজ্ঞেস করল – সারাজীবন তো কলকাতায় থেকে গোলামি করলে, ফ্ল্যাটও কিনলে, তা কত জমালে? দশ-বারো-পনেরো?

যেন দশ-বারো লক্ষ টাকা জমানোটা কিছুই নয়।

উত্তরে গম্ভীরভাবে বলেছিলাম – কত জমিয়েছি তা তুমি ভাবতে পারবে না। শুনে লাভ নেই।

নটবরচন্দ্র এ কথা বিশ্বাস করল কিনা জানি না। তবে আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি। কেমন একরকমভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।

এসব অবশ্য আগের কথা।

এবারও রেহাই পাইনি। হঠাৎ ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল – কাঁঠাল কেমন খেলে?

যেন এমন কাঁঠাল জীবনে কোথাও খাইনি। বললাম – এ বাগানের কাঁঠাল তো আজ নতুন খাচ্ছি না ভাই! খাচ্ছি জন্ম থেকে। আর অন্তত মামি যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন খেতে পাব।

– তারপর? তারপর কি কাঁঠাল খেতে আর আসবে না? নটবর ঠোঁট টিপে হাসল।

– বলতে পারছি না।

আমার উত্তরটা গ্রাহ্যের মধ্যে না এনে ও অন্য প্রসঙ্গ পাড়ল। মুখে একটা পান ঠুসে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে চোখ ছোট করে বলল, এবার খুব ভালো সময়েই এসেছ।

– কেন?

– রথ দেখা কলাবেচা দুই-ই হবে।

বললাম, এই সময়ে এখানে আসার উদ্দেশ্য রথ দেখা বটে। কিন্তু কলা-বেচা? তুমি কি কাঁঠাল খাওয়ার কথা বলতে চাইছ?

নটবর মুখ টিপে হাসতে লাগল।

– না হে, না, কাঁঠাল তো প্রতিবছরই আছে। এবার একেবারে নতুন জিনিস। আমি জিজ্ঞাসু চোখে তাকালাম।

– এবার কলকাতা থেকে ডান্স-পার্টি এসেছে। আজ পাঁচ দিন ধরে মেলাতলা জমজমাট।

নটবর বোধহয় ভেবেছিল ডান্স-পার্টির কথায় আমি নড়েচড়ে বসব। কিন্তু যখন তেমন উৎসাহ দেখালাম না তখন কিছুটা হতাশ হয়ে বলল, তুমি ভাবতেই পারছ না সে কী জিনিস!

বলতে বলতেই হঠাৎ রাস্তার দিকের জানলার কাছে ছুটে গিয়ে হাঁকল Ñ এই যে ‘নর-বানর’! এক্ষুনি মেলায় চললে নাকি হে?

লোকটা উত্তর তো দিলই না। ফিরেও তাকাল না।

জিজ্ঞেস করলাম – ‘নরবানর’ আবার কী?

– একটা পাগল। শুধু পাগল হলেও না হয় হতো। একেবারে সেয়ানা পাগল। ধাপ্পাবাজি করে লোক ঠকিয়ে মেলাতলায় ম্যাজিক দেখাচ্ছে।

বললাম, ম্যাজিক তো লোকঠকানোই। নটবর মুখের ওপর জবাব পছন্দ করে না। বিরক্ত হয়ে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে সবাই জানে। কিন্তু এ যা করে Ñ একেবারে সজ্ঞানে লোকঠকানো।

‘সজ্ঞানে লোকঠকানো’ জিনিসটা কী তা জানা ছিল না। জিজ্ঞেস করতে সাহসও হলো না। এখুনি একগুচ্ছ জ্ঞান দিয়ে বসবে।

– বরঞ্চ ওর বাবা ধনা বৈরাগী ছিল সত্যি করে একজন গুণী ব্যক্তি। এই রথতলাতেই মেলার সময়ে দেখেছি ওর বাঁশবাজি, ভোজবাজি, হাপু খেলা। হাপু তো উঠেই গেছে এখন। তাছাড়া পুজোয়-পার্বণে, বিয়ে-বাড়িতে ডাক পড়ত তার। তাসের খেলা, রুমালের খেলায় ধনা বৈরাগীর জুড়ি ছিল না। তাকে ধাপ্পাবাজি করতে হতো না। আর তুই? ‘নররাক্ষস’ হয়েছেন।

বাধা দিয়ে বললাম, পরে শুনব। এখন রথতলা থেকে ঘুরে আসি।

– হ্যাঁ, তাই যাও। আর যদি টিকিট পাও তো ডান্সটা দেখে নিও। ওয়ান্ডারফুল।

মফস্বলের মেলা যেমন হয় Ñ লোকে লোকারণ্য। আইসক্রিম থেকে বাদামভাজা, নাগরদোলা থেকে মিনি চিড়িয়াখানা। বিরাট রথখানা অনেকখানি টেনে আনা হয়েছে। ওপর থেকে পুরোহিত ঠাকুর মাঝে মাঝে ভিড় লক্ষ করে ফুল-বাতাসা ছুড়ে দিচ্ছেন। ভিড় থেকেও প্রতিদানে সিকিটা আধুলিটা ছোড়া হচ্ছে ঠাকুরের উদ্দেশে। শেষ পর্যন্ত সে-পয়সা যাচ্ছে পুরোহিত ঠাকুরের ট্যাঁকে।

এই রকম সব মেলায় বা বারোয়ারি পুজোতলায় এলে আমি যেন এই বয়েসেও ছেলেমানুষটি হয়ে যাই। পাপড়ভাজার গন্ধ নাকে গেলেই আর লোভ সামলাতে পারি না। আজও পারলাম না। দুখানা সদ্য কড়াই থেকে ছেঁকে-তোলা পাপড় শালপাতায় ধরে ভিড়ের মধ্যে গা-ঢাকা দিলাম। হ্যাঁ, গা-ঢাকা দেওয়াই। কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে কে জানে! পাপড়ভাজা খাওয়া কোনো বয়েসেই বেমানান নয়। তা বলে মেলায় দাঁড়িয়ে ছেলেমানুষের মতো কুটুর কুটুর করে দাঁতে পাপড় ভেঙে খাওয়া – ছি ছি সে-বড়ো লজ্জার। আর খাচ্ছে কে, না গুপ্তিপাড়ার স্বনামধন্য নটবর দত্তর কলকাতানিবাসী ভাই!

ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় এসে দেখলাম একটা তাঁবুর সামনে বেশ জমজমাট ভিড়। তাঁবুর সামনে বাঁশের মঞ্চের ওপর ছোটখাট অর্কেস্ট্রা

পার্টি বেশ নাচের তালে বাজাচ্ছে। আর একটা

চোদ্দ-পনেরো বছর বয়েসের ছেলে মেয়ে সেজে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে উদ্দাম নৃত্য করছে। লোকে হেসে গড়িয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে – ‘ভেতরে চলে আসুন …কলকাতার ড্রিমগার্লদের মন-মাতানো নাচ গান …এখুনি শো আরম্ভ হবে।’

বুঝলাম নটবর এই নাচ দেখার কথাই বলছিল।

অল্প তফাতে আরেকটা তাঁবু। তবে জাঁকজমক নেই। এখানে বাঁশের মাচার ওপর শুধু কর্কশ ড্রাম-পিটুনি। কালো আলখাল্লা পরা ভয়ংকর মুখোশধারী একটা লোক দুহাত বাড়িয়ে হুমহাম করে মঞ্চের ওপর দাপাদাপি করে বেড়াচ্ছে। বড়ো বড়ো পোস্টারে লেখা – ‘আসুন দেখুন… শুধু ইন্দ্রজাল নয়, সঙ্গে ভয়ংকর নররাক্ষসও… সাবধান!’

কৌতূহল হলো। টিকিট-কাউন্টারের কাছে গিয়ে দেখি টিকিট মন্দ বিক্রি হচ্ছে না। কেন জানি না খুশি হলাম। ঠিক করলাম কাল-পরশু এদের শো-টা দেখতেই হবে।

সদ্য পাপড়ভাজা খেয়েছি। এখন একটু চা না খেলেই নয়। মেলাতে চায়ের স্টলের অভাব নেই। রুমাল দিয়ে ঠোঁটে লেগে-থাকা পাপড়ভাজার তেলটুকু মুছে নিয়ে সামনের স্টলে ঢুকে পড়লাম।

নররাক্ষস!

চায়ের পেয়ালায় প্রথম চুমুক দিতেই অকস্মাৎ মনটা যেন হারিয়ে গেল কোথায়!

সে-কবেকার কথা! তখন দেশের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছি। সিক্স-সেভেনের ছাত্র। কী একটা উপলক্ষে এখানকার হরি মোদকের কলবাড়িতে একজন ম্যাজিশিয়ান এসেছেন। খুব ভালো খেলা দেখাচ্ছেন। কিন্তু ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে সঙ্গে একটি নররাক্ষস আছে। সবার সামনে সে কোনোদিন জীবন্ত পায়রা, কোনোদিন জীবন্ত মুরগি Ñ আবার একদিন নাকি গোটা খাসির কাঁচা মাংস খেয়েছিল। যতই শুনি গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ক্লাসে পড়াশোনা মাথায় উঠল। কেবলই ‘নররাক্ষস’ নিয়ে আলোচনা।

রোজ ঘোড়ার গাড়ির ছাদে বসে ড্রাম বাজিয়ে গাড়ির পিছনে একটা বোর্ডে ভয়ংকর একটা নররাক্ষসের ছবি লাগিয়ে, গাড়ির ভেতর থেকে লাল-নীল-হলুদ কাগজে ছাপা হ্যান্ডবিল বিলি করতে করতে চলে। আমরা ছেলের দল ‘নররাক্ষস’ দেখার অনুমতি পাই না পাই কে কটা ক’ রঙের হ্যান্ডবিল নিতে পারি সেই প্রতিযোগিতায় জীবন বিপন্ন করে ঘোড়ার গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে ছুটি।

হ্যান্ডবিল পড়ে পড়ে ভাষাটি এমন মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল যে আজও কিছু কিছু মনে পড়ছে –

‘সাবধান!… সাবধান…!! সাবধান!!!

…শহরে এই প্রথম ভয়াল ভয়ংকর নররাক্ষসের আবির্ভাব! জীবন্ত পায়রা, জীবন্ত মুরগি, জীবন্ত খাসি ভক্ষণ! সঙ্গের শিশুদের মুহূর্তের জন্যও হাত ছেড়ে দেবেন না। …সঙ্গে জাদুকর ভীমচন্দ্র দে-র অত্যাশ্চর্য ইন্দ্রজাল! আসুন সবান্ধবে দেখুন… এ সুযোগ আর পাবেন না।

টিকিটের মূল্য : জমি তিন আনা, গ্যালারি আট আনা, চেয়ার এক টাকা।’

কত কষ্ট করে ‘নররাক্ষস’ দেখতে যাবার      অনুমতি আদায় করতে পেরেছিলাম সে-ইতিহাস       আজ আর মনে নেই। মনে নেই কী কী ম্যাজিক দেখেছিলাম। শুধু মনে আছে একেবারে শেষে নররাক্ষসের সেই ভয়ংকর আবির্ভাবটি। গুড়ু গুড়ু করে বেশ কিছুক্ষণ ধরেই ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজনা বাজছিল। শব্দটা ছিল মেঘডাকার মতো। তারপর হঠাৎ উইংসের পাশ থেকে বিরাটাকার একটা মানুষ ধপ করে

স্টেজের ওপরে লাফিয়ে পড়ল। শুধু তার কালো বিশাল চেহারাটাই ছেলেদের ভয় দেখাবার পক্ষে যথেষ্ট। তারপর তার মাথার ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া

ফাঁপানো চুলগুলো, লাল লাল ড্যাবলা দুটো চোখ – সেই সঙ্গে স্টেজজুড়ে দাপাদাপি লাফালাফি… দুটো জোয়ান মর্দ লোকও দড়ি দিয়ে বেঁধে দুপাশ থেকে টেনে রাখতে পারছে না… স্টেজ থেকে সে দর্শকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়… এসব দৃশ্য দেখে কোন না কিশোর ছেলেমেয়ে ভয়ে কাঁপবে! তারপর যখন তার সামনে ঠ্যাঙে দড়ি বেঁধে একটা মুরগি ছেড়ে দেওয়া হলো… তারপর এইটুকু মনে আছে, আমি ভয়ে চোখ বুজে ছিলাম। শুধু মৃত্যুভয়ে ভীত মুরগির পাখার ঝটফটানি আর অন্তিম ডাকটা জোর করে কানে ঢুকছিল…।

সেই নররাক্ষস! এতকাল পর – এবার গুপ্তিপাড়ায়।

সন্ধের পর নটবর যখন শুনল আমি গোটা বিকেলটা মেলায় ‘ডান্স’ না দেখে শুধু শুধু ঘুরেছি তখন ও এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে রইল যেন আমি এ জগতের মানুষই নই।

অনেকক্ষণ পর তার মুখ দিয়ে একটি কথাই বেরিয়ে এলো – সে কী হে! মেলায় গেলে অথচ অমন ডান্স দেখলে না? কালই শত কাজ ফেলে (কোনো কাজই এখানে আমার নেই) দেখে নাও।

হাসতে হাসতে নটবরের কাঁধে হাত রেখে বললাম, কাল নিশ্চয়ই দেখব। তবে নাচ নয়, নররাক্ষস।

নটবর হাঁ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ মুখ থেকে কথা বেরোল না। তারপর বলল, তুমি একটা আস্ত পাগল। এতকাল কলকাতায় থেকেও মানুষ হলে না। আরে, একি আমাদের ছোটবেলার সেই নররাক্ষস নাকি? এ তো চন্না বৈরাগীর ছেলেখেলা! মাইকে ফলাও করে বলা হচ্ছে ‘নররাক্ষস’ কিন্তু জ্যান্ত খাসি, পাঠা, ভেড়া, মুরগি দূরে থাক একটা পায়রা খাবার মুরদও নেই।

কথা বলার ভঙ্গিতে আন্দাজ করলাম চন্না নামে ম্যাজিশিয়ান ছোকরাটির ওপর যেন নটবরের বেজায় রাগ। কিন্তু রাগের কারণ খুঁজে পেলাম না। জিজ্ঞেস করাও যায় না।

একটু থেমে নটবর বলল, ওর বাপ তবু বাঁশবাজি, ভোজবাজি, হাপুখেলা এ-গাঁয়ে ও-গাঁয়ে দেখিয়ে নাম করেছিল। আর এ? না করতে পারলি চাষ-আবাদ, না পারলি কলকারখানার কাজ। তা খাবি কী? তাও বললাম Ñ এক বিঘে জমি আমার বেচে দে। হাতে দুটো নগদ পয়সা পাবি। সেই টাকা খাটাতে পারবি। তা কি শুনল? উনি ম্যাজিশিয়ান হবেন! তার বাবা ভিখিরির মতো পথে-ঘাটে বাঁশবাজি দেখিয়ে পয়সা রোজগার করত Ñ সে নাকি বড়ো অপমানের কাজ। তার বদলে নিজের দল খুলবে! দল খোলা অমনি মুখের কথা!

নটবর দম নেবার জন্যে একটু থামল। তারপর ফতুয়ার পকেট থেকে পানের কৌটোটা বের করে আঙুলের চাপ দিয়ে পুটুস করে ঢাকনা খুলে ভিজে ন্যাকড়া জড়ানো একগাদা ছোট ছোট খিলি থেকে একটা খিলি তুলে মুখে পুরে দিল। তারপর আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে চাপা গলায় বলল, ওর আর দোষ কী? শনি Ñ শনি –

আমি জিজ্ঞাসু চোখে তাকালাম।

নটবর ফিসফিস করে বলল, ওর পেছনে যে একটা মেয়ে লেগে আছে! বলেই ফ্যাক করে হাসল।

মেয়ে! নায়কের ওই তো চেহারা দেখলাম।

কিন্তু নটবরকে ঘাটালাম না। এখুনি মুখ ছোটাবে।

তবে মনে পড়ল কাল টিকিট-কাউন্টারের পাশে দাঁড়িয়ে যখন ভিড় লক্ষ করছিলাম তখন কাউন্টারের ভেতরে যেন সস্তা ইমিটেশানের চুড়িপরা শীর্ণ

একখানি হাত দেখেছিলাম। ক্ষিপ্রতার সঙ্গে টিকিট বিক্রি করছিল।

বোধহয় এই মেয়েটির কথাই নটবর রসিয়ে বলতে চাইছে।

যাই হোক ও নিয়ে আমার মাথা ঘামাবার কিছু নেই।

নটবর আবার বলতে লাগল, তুমি একটি আস্ত হোপলেস। কলকাতায় থাকো। অথচ এমন ডান্স দেখনি? পরলোকে গিয়ে জবাব কী দেবে হে!

একটু এদিক-ওদিক চেয়ে কানের কাছে মুখ

এনে বলল, অল্পবয়সী তাজা মেয়ে সব। হাফ নেকেড! কাঁচুলি ছাড়া গায়ে এতটুকু সুতো নেই। ওদিকে নিচে …

কথা শেষ করতে না দিয়ে বললাম, ওসব নতুন কিছু নয়। টিভিতে অমন কতই দেখতে পাই। টাকার বিনিময়ে ওরা …

নটবর ভয়ানক বিরক্ত হয়ে বলল, অকালে যারা বুড়িয়ে যায় তাদের দশা তোমার মতোই হয়। টিভিতে দেখা আর চোখের সামনে দেখা Ñ এক হলো?

বললাম, নটবর ভাই, সার্কাসেও যুবতী মেয়েরা প্রায় হাফ নেকেড হয়েই খেলা দেখায় Ñ কই তাদের দেহ দেখার জন্যে তো এমন লালসা হয় না। বরঞ্চ কেমন সমীহ করতে ইচ্ছে করে। কেন এই তফাত বলতে পার?

আবার মেলাতলা।

অবাক হলাম। দুদিন আগেও নররাক্ষসের যে-শিবিরে ভিড় দেখেছিলাম আজ সেখানে মাত্র কয়েকজন। আর বাঁদিকে অন্য শিবিরে লোক উপচে পড়ছে। সেখানে অর্কেস্ট্রা বাজছে…। মাইকে তারস্বরে ঘোষণা চলছে Ñ ‘আসুন দেখুন। কলকাতার ড্রিমগার্লদের এমন খোলামেলা নাচ দেখার সুযোগ আর পাবেন না।’

আর এদিকের শিবিরের মুখে ড্রাম বাজছে বটে কিন্তু সেদিকের তুলনায় বড়োই ম্রিয়মাণ। মনটা কেন জানি না খারাপ হয়ে গেল।

টিকিট-কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে শ্যামবর্ণা একটি মেয়ে ক্ষীণ গলায় জিজ্ঞেস করল Ñ কোন ক্লাস?

জিজ্ঞেস করলাম, ফার্স্ট ক্লাস কত?

Ñ ফার্স্ট ক্লাস! মেয়েটি যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। পারবে কী করে? এমনিই টিকিট বিক্রি হচ্ছে না তো ফার্স্ট ক্লাস!

বলল, দশ টাকা।

আমি একটা দশ টাকার নোট বের করে দিলাম। মেয়েটি ড্রয়ার হাতড়ে খুঁজে পেতে ফার্স্ট ক্লাসের একটি টিকিট বের করে দিল।

এখানে আমাকে কেউ চিনবে না। কাজেই প্রেস্টিজের প্রশ্ন নেই। একমাত্র ‘নররাক্ষস’ কথাটি ছাড়া আর কোনো আকর্ষণও নেই। তবু কেন যে একেবারে দশ টাকার টিকিট কেটে বসলাম তা আমি নিজেও জানি না। কী শো দেখব Ñ কেমন লাগবে Ñ টাকা উশুল হবে কিনা এসব প্রশ্ন একবারও মনে জাগেনি। প্রায় শূন্য কাউন্টারে তবু যে একখানা ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট বিক্রি হয়েছে সেই পরম বিস্ময় ও আনন্দের যে নিঃশব্দ প্রকাশ হতশ্রী মেয়েটির চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল সেইটুকুই আমার লাভ।

খেলা আমার ভালো লাগেনি। একে তো যে-ছোকরাটি ম্যাজিক দেখাল পরে সেই ছোকরাটিই ‘নররাক্ষসে’র ভূমিকায় দেখা দিল। জৌলুসবিহীন ম্যাজিকের সব খেলাই পুরানো। ওরই মধ্যে খালি গায়ে পিঠের ওপর ছোট একটি লাঠির বাড়ি মেরে মেরে যখন সুর করে হাপুর ছড়া (সম্ভবত তার বাপের কাছে শেখা) কাটছিল সেই খেলাটাই আমার ভালো লেগেছিল। কেননা হাপু খেলা এখন আর দেখা যায় না। ছড়ার জগৎ থেকে সে নির্বাসিত। তারপর ‘নররাক্ষসে’র চেহারা যে এমন দুর্বল কংকালসার হয় তা কল্পনা করতে পারিনি। সত্যি কথা বলতে কী নররাক্ষসকে দেখে ভয় পাওয়া তো দূরের কথা কেমন যেন করুণা হচ্ছিল।

নটবর যে কেন ওকে সেদিন ‘নর-বানর’ বলেছিল তার কারণ বুঝলাম। রাক্ষসের খেলা দেখাতে গিয়ে ও বেচারি বেগুন, আলু, কুমড়ো কামড়ে কামড়ে খাচ্ছিল। ও যতই প্রাণপণে কামড় বসাচ্ছিল দর্শক ততই হো হো করে হেসে উঠছিল।

দোষ তাদেরও নয়। কোনো কালে কোনো রাক্ষস যে এমন নিরামিষভোজী হয় তা জানা ছিল না।

শো যখন এইভাবে ঝুলে পড়ছিল তখন হঠাৎই উইংসের পাশ থেকে একটা মুরগির পায়ে দড়ি বেঁধে উদ্ভ্রান্ত মেয়েটি উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এসে ছেলেটির হাতে দিয়ে চাপা গলায় কঠোর আদেশ করল Ñ খা-ও!

ম্যাজিশিয়ানের দুচোখ ভয়ে কীরকম হয়ে গেল। মেয়েটি ফের তর্জন করে উঠল Ñ খাও!

দর্শকরা হঠাৎ চুপ করে গেল। এইবার তাহলে সত্যিই নররাক্ষসের কেরামতি শুরু হবে। কিন্তু নররাক্ষস অনড়।

উইংসের আড়াল থেকে মেয়েটি ক্রমাগত ইশারা করতে লাগল Ñ দেরি করছ কেন? খাও! খাও! খাও! বাধ্য হয়ে অনভ্যস্ত দুর্বল ম্যাজিশিয়ান মৃত্যুমুখী মুরগির পাখার ঝটপটানি উপেক্ষা করে গলায় কামড় বসাতেই হঠাৎ বোধহয় মাথা ঘুরে পড়ে গেল।

দর্শকরা হইহই করে উঠল। কিছুক্ষণ চ্যাঁচামেচি করল Ñ টিকিটের পয়সা ফেরত চাইল। তারপর গালাগালি করতে করতে বেরিয়ে গেল।

কালো আলখাল্লা পরা নররাক্ষসরূপী চন্না বৈরাগী মেয়েটির কোলে মাথা রেখে চোখ বুজে পড়েছিল। জিজ্ঞেস করলাম, ওর শরীর কি অসুস্থ?

Ñ হ্যাঁ বাবু, না খেয়ে খেয়ে কত আর যুঝবে? দরে পোষাল না। এক বিঘে জমি দত্তবাবু কেড়ে

নিল। বলল, মামলা করগে। চটকলে কাজ করছিল। কল বন্ধ হয়ে গেল। খাবে কী? শেষ পর্যন্ত ম্যাজিক ধরল Ñ তার বাপের ব্যবসা। বারণ করেছিলাম। ও তুমি পারবে না। এখন মানুষজন অন্যরকম চায়। তা শুনল না।

এই সময়ে ছোকরাটি একবার তাকাল।

মেয়েটি ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করল Ñ পানি খাবে?

Ñ হুঁ।

একটা বোতল থেকে খানিকটা জল পরম যত্নে তার মুখে ঢেলে দিল মেয়েটি।

জিজ্ঞেস করলাম, এ তোমার কে হয়?

এমন প্রশ্ন এর আগে এখানে হয়তো অনেকেই করেছে। উত্তরও দিয়েছে স্পষ্ট। কিন্তু ফার্স্ট ক্লাস টিকিট-কাটা বাবু জিজ্ঞেস করায় ও যেন বিব্রত

হলো। ইতস্তত করে বলল Ñ সম্পর্কে কেউ না। এমনিই …

থমকে গেলাম। বাঁধাধরা নির্দিষ্ট সম্পর্কের বাইরেও যে কোনো মহৎ সম্পর্ক থাকতে পারে তা আজ স্বচক্ষে দেখলাম।

একটু চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করলাম, ওর নিজের বলতে কে আছে?

Ñ অনেকেই আছে। থাকলে কী হবে, কেউ দেখে না। রোগ হলেও চিকিচ্ছে হয় না। আমিও যে ওদের বাড়ি যাবো তার উপায় নেই। তাড়িয়ে দেয়।

Ñ তোমার বাড়ি নিয়ে যাও না কেন?

মেয়েটি করুণ হাসল। বলল, তারও কি উপায় আছে? পাঁচজনে পাঁচকথা রটাবে। মিথ্যে দুর্নামে বড়ো ভয় বাবু! গরিব মান্ষের শতেক জ্বালা।

সন্ধে উৎরে গেছে। উঠে পড়লাম। মনে পড়ছিল ছোটবেলায় দেখা ভীমবিক্রম সেই নররাক্ষসের কথা। যুগ বদলে গেছে …

একটা একশ টাকার নোট চন্না বৈরাগীর হাতে দিয়ে বললাম, তোমার হাপু গান আমার খুব ভালো লেগেছে। বহুকাল পর শুনলাম। তারই পুরস্কার! চন্নার চোখদুটো একবার চক্চক্ করে উঠল। নোটটা নিঃসংকোচে মেয়েটির হাতে দিয়ে যেন নিশ্চিন্ত হলো।