কখন যে ওদের দুজনার মাঝে হৃদ্যতা ও
আন্তরিকতা গড়ে উঠল ওরা নিজেরাও জানে না। ষাটের দশকে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের প্রখ্যাত ঢাকা মেডিকেল কলেজের শেষ বছরের সেরা ছাত্রী কাজল কেবিনের করিডোর দিয়ে রাত নটার দিকে হাসপাতালের বাইরে আসার জন্যে লিফটের দিকে যাচ্ছিল। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তরুণ ডাক্তার জাকির। জাকিরকে প্রায় সবাই চেনে। প্রথমবর্ষ থেকে একটানা ফার্স্ট হয়ে ডাক্তারি পাশ করে সরকারি চাকরিতে ঢুকেছে। দ্বিতীয় বছরেই কার্ডিওলজি বিভাগের রেজিস্ট্রার হয়েছে। প্রফেসর আনিসুদ্দিন ওকে অত্যন্ত স্নেহ করেন ও সব দায়িত্ব দিতে চান। জাকির যে খুব শীঘ্রই বিলেতের স্কলারশিপ পাবে, এ-ধারণা সবারই। আজ সন্ধ্যায় জাকির কাজলদের ফিফথ ইয়ারের একটা ব্যাচের বেড সাইড ক্লাস নিয়েছে।
‘কার্ডিওলজি কেমন লাগছে’, জাকির কাজলকে সামনে পেয়ে জিজ্ঞাসা করল।
‘ভালোই, তবে কিছু প্রশ্ন আছে আপনার কাছে’, কাজল বলল।
‘বলুন।’
‘ব্লাড প্রেসারের অনেক ওষুধ বের হচ্ছে ও হয়েছে। আপনি একটা ভালো ক্লাসিফিকেশন করে নোট দিলেন। কোনটা কী কাজ করে তাও বললেন। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না Ñ কোন ওষুধ আগে দেবো এবং সেটাতে কাজ ভালো না হলে তারপরে কোনটা দেবো বা কয়েক বছর পর সেই ওষুধেও কাজ না হলে আর কী দেবো?’‘আপনার প্রশ্নটা অনেক লম্বা। সব বুঝিয়ে বলব। কিন্তু আজ নয় Ñ আরেকদিন Ñ সবার মাঝে ক্লাস নেবার সময়। কেমন?’
কাজলের মুখের দিকে তাকিয়ে জাকির একটু থমথমে ভাব দেখতে পেয়ে নিজেকে শোধরাল, ‘আজকেই বোঝাতে পারলে ভালো হতো সেটা বুঝি, কিন্তু আমার একটা ছোট বোন আছে। আজ তার জন্মদিন, পনেরো পার হচ্ছে। কথা দিয়েছিলাম নটার মধ্যেই পৌঁছে যাবো, কিন্তু এখন দেখছি সাড়ে নটার আগেও পৌঁছতে পারব না। বিশেষ করে রিকশা না পেলে। ধানমন্ডি যেতেও তো দেরি হবে!’
কাজল একটু উৎফুল্ল হলো, ‘না না আমি কিছু মনে করিনি। তবে চলুন আগে লিফট দিয়ে নিচে নামি। আপত্তি না থাকলে, আমার গাড়িতে চলুন – চট করে পৌঁছে যাবেন।’
‘না না, আমি আপনার অসুবিধা করতে চাই না।’
‘এটা কি কোনো কথা হলো?’ গভীর কালো বড় বড় দুচোখ দিয়ে তাকাল কাজল। জাকির একটু চুপ করে বলল, ‘চলুন।’
ওরা বেরিয়ে এলো হাসপাতাল থেকে।
গাড়িতে উঠে কাজল বলল, ‘আমরাও তো
ধানমন্ডিতেই থাকি। আপনারটা কত নম্বর রোডে?’
জাকির সসঙ্কোচে বলল, ‘ধানমন্ডি শুনে ভুল করেছেন? আপনারা নিশ্চয়ই নতুন ধানমন্ডিতে। সেখানে বড়লোকদের বিশাল বাগান আর বিশাল বাড়ি। আমরা থাকি পুরানো ধানমন্ডিতে। আমাকে আপনি হাতিরপুলে নামালেই হবে। আমাদের বাসা ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে। হাতিরপুল থেকে তিন মিনিট লাগবে হেঁটে যেতে।
‘আপনি পাগল হয়েছেন? যখন গাড়িতে উঠেছেন, গাড়িতেই পৌঁছে যাবেন। এখন শান্তভাবে একটু বিশ্রাম নিন।’ কাজল এরপর ড্রাইভারের দিকে তাকাল, ‘সেলিম, আমরা আগে স্যারকে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেবো, তারপর বাড়ি। তুমি কি ফ্রি স্কুল স্ট্রিট চেনো?’
সেলিম উৎসাহ নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ আপা চিনি, আমি এ-রাস্তায়ই এক বন্ধুর বাড়ি প্রায়ই যাই। ওই রাস্তারই শেষে একটি খুব বড় পুকুর আছে। সেখানে কয়েকটি বাড়ি আছে। কিন্তু তারপর রাস্তাটি বন্ধ করে দিয়েছে জমির মালিক। অথচ জমিটার একপাশ দিয়ে বহুদিন ধরে রাস্তা ছিল।’
‘তুমি সব ঠিক বলেছ সেলিম’, জাকির বলল, ‘ওই ভদ্রলোক একজন রিটায়ার্ড অফিসার। খুব দাপট। কারো কোনো কথাই শোনেন না তিনি।’
‘কিন্তু এটা তো খুবই অন্যায় – সাধারণের ব্যবহারের পথ তিনি বন্ধ করে দেবেন!’ কাজল খুবই অবাক হলো।
‘সরকার যদি কিছু করে তবে হয়তো পথটা খুলতে পারে। তবে আমাদের বাড়িটি পুকুরপাড়ের ঠিক পশ্চিমের বাড়িটি।’
সেলিম বলল, খুব ধীরে ও নম্রভাবে, ‘আপনাদের বাড়িতেই সবচেয়ে সুন্দর বাগান আছে। সবাই ওটাকে ‘ফুলের বাড়ি’ বলে। আপনাকে আর কিছু বলতে হবে না। গাড়ি একেবারে আপনাদের বাড়ির সামনে নিয়ে যাবো।’
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা পৌঁছে গেল। জায়গাটা সত্যি খুবই সুন্দর। বড় পুকুরটায় অনেক পানি, বাতাসের বেগে ছলাৎ ছলাৎ করে ছোট ছোট ঢেউ এসে বাঁধানো ঘাটে চুমু খাচ্ছে। চারিদিকে বেশ কয়েকটা নারিকেল গাছ। অনেক ডাব ঝুলছে। রাস্তাটা সরু। বাড়ির ভেতর গাড়ি যাবে না, কারণ গেটটা ছোট। পুরানো আমলের, কিন্তু ঝকঝকে চুনকাম করা বাড়ি। বড় বড় গোল থামওয়ালা একটা প্রশস্ত বারান্দা। একপাশে কতগুলো বেতের চেয়ার। আরামদায়ক কুশন দেওয়া। রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা Ñ আর একটু দূরে একটা মাঝারি সাইজের বকুল গাছ Ñ বেদি বাঁধানো। এদিকে বারান্দার পাশ দিয়ে একটা মাধবীলতা লতিয়ে লতিয়ে প্রায় ছাদ পর্যন্ত পৌঁছেছে। তারই পাশে আরেকটি লতানো বেলি। এদের মাঝে একটা লতানো গাছ উঠে গেছে ছাদে, সেটা থেকে ছোট ছোট পাতার মধ্যে সাদা ছোট ছোট ফুল গর্বিত ভঙ্গিতে তাকাচ্ছে। এদের পাশেই রজনীগন্ধা, দোলনচাঁপা আর ছোট-বড় লিলির প্রায় জঙ্গল। এরপর ওদিকটায় গাঁদা আর ক্যানা। তারপর দুটো পেয়ারা গাছ। সেগুলোর পর পুব-দক্ষিণে শুধু সিজন ফ্লাওয়ার Ñ ডালিয়া, কসমস, গ্লাডিওলা, অস্টারে ভর্তি। ফুলের সম্ভারে গাছগুলো একটু নুয়ে আছে।
‘বাহ্, এত সুন্দর বাগান! সেলিম আমি এখানে একটু নামব, তুমি গাড়িটি ব্যাক করে ঘুরিয়ে নিয়ে এলেই উঠে পড়ব।’
জাকির বাড়ির গেট খুলে বলল, ‘তাই কি কখনো হয় নাকি? আজ আমার বোন দীপার জন্মদিন না। আপনি বাড়ির দরজা থেকে চলে গেলে মা আমাকে বকবেন, আর দীপাও খুব রাগ করবে। কয়েক মিনিটের জন্য আসুন। তাছাড়া বাগানের এদিকটা দেখেছেন Ñ ওদিকটাতেও অনেক কিছু আছে।’
কাজল গেট দিয়ে জাকিরের সঙ্গে বাড়ির আঙিনায় ঢুকল। দরজার সামনেই সম্ভ্রান্ত চেহারার এক ভদ্রমহিলা ও বছর পনেরো-মতো একটা মিষ্টি মেয়ে দাঁড়িয়ে। কাজলকে ঢুকতে দেখে দুজনেই অভ্যর্থনা করতে এগিয়ে এলো।
‘পরিচয় করিয়ে দিই। আম্মা!’ জাকির বলল, ‘ইনি কাজল চৌধুরী, ফিফথ ইয়ারের ছাত্রী। আমাকে লিফট দিলেন তাড়াতাড়ি আসার জন্য। আর আপনি তো বুঝতেই পারছেন ইনি আমার মা, আর দীপা আমার বোন।’
কাজল মাকে আর দীপা কাজলকে সালাম করল।
‘এসো মা, ভেতরে এসো! জাকির তুই হাতমুখ ধুয়ে আয়। আমি তোদের সামান্য হলেও কিছু খাবার দিই। দীপা তুমি কাজলকে নিয়ে গল্প করো।’
আম্মা রান্নাঘরের দিকে চলে যেতেই কাজল দীপাকে বলল, ‘তোমার নামটি কিন্তু ভারি মিষ্টি। চলো আমি তোমাদের বাগানটা একটু দেখে আসি।’
‘চলুন।’
‘না! চলুন নয় – চলো, আমি তোমার কাজল আপা কেমন?’
দীপা খুব খুশি, ‘আমার একটা বদভ্যাস যে, আমি বেশিক্ষণ আপনি আপনি করতে পারি না। চলো কাজল আপা!’
দীপার জন্মদিনের বন্ধুরা সবাই নটার আগেই বিদায় নিয়েছে। দীপা কাজলকে নিয়ে বারান্দা পার হয়ে এবার দক্ষিণদিকের বাগানে এলো। পুব আর দক্ষিণে ফুলের বাহার বেশি। পশ্চিমে আর উত্তরে সবজি। লাউ, কুমড়ো আর শিমের মাচা। অনেক সবজি ঝুলছে। একদিকে টমেটো আরেকদিকে আলু। পেছনের দিকে সারভেন্টস কোয়ার্টারস। তারই গা-ঘেঁষে একপাশে কতকগুলো আলমন্তা আর গোলাঞ্চি দাঁড়িয়ে আছে। আরেক পাশে দুটো সজনে গাছ, শেষে কয়েকটা আতাফলের গাছ। সবশেষে পূর্ব-দক্ষিণে গোলাপের ঝাড়। গোলাপ ফুটে বাগান আলোময় করে রেখেছে। সব মিলিয়ে কাজল মুগ্ধ।
‘এ-বাগান কি শুধু মালীর যত্নে, না তোমরাও কেউ আছো? এত চমৎকার প্ল্যান করা সুন্দর বাগান আমি দেখিনি কখনো। আমাদের বাড়িতে বাগান আছে, কিন্তু এর তুলনায় সেটা তো নস্যি!’
‘আমার বাবা ছিলেন এগ্রিকালচারাল কলেজের প্রিন্সিপাল। মা এখনো ইডেনের বোটানির প্রফেসর। বাবা-মায়ের চেষ্টায়ই বাগানটা এত সুন্দর হয়েছে। মালী একটা আছে অবশ্য। সপ্তাহে তিন দিন আসে।’
‘বাবা ছিলেন মানে কী?’ কাজল প্রশ্ন করল।
‘উনি মারা গেছেন, বিনা নোটিশে একদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।’
দীপার চোখ ছলছল করছে দেখে কাজল দ্রুত বলে উঠল, ‘থাক তোমার বাবার কথা বলতে গিয়ে তুমি খুব ব্যথা পাচ্ছ। আর বলতে হবে না।’
‘না, আপা তুমি শোনো, তোমাকে বলতে পেরে আমার মনটাও একটু হালকা হবে, মাকে বা ভাইয়াকে তো কিছু বলতে পারি না। শোনো, আজ থেকে তিন বছর আগে বাবার ডেডবডি দেখলাম হাসপাতালের মর্গে। একটা ট্রাক পেছন থেকে তার শরীরটা থেঁতলে দিয়েছিল। মা শুনেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। ভাগ্যিস ভাইয়া সঙ্গে ছিল। সে-ই সবকিছু সামলালো। আব্বার কবরে আমরা প্রতি শুক্রবার যাই। ভাইয়া বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। কিন্তু মা আর আমি অন্তত ঘণ্টাখানেক থাকি। আমাদের খুব ভালো লাগে; মনে হয় বাবার কাছে গিয়েছিলাম। খুব শান্তি পাই।’
‘কোথায় তোমার বাবার কবর?’
‘আজিমপুরে। বাবা সবসময় বলতেন তিনি সাধারণের সঙ্গে থাকবেন। তার জন্য কখনো কোনো বড়লোকের পাড়ায় কবরের জমি যেন কেনা না হয়।’
‘আমার মা মারা গেছেন প্রায় দশ বছর হলো। আমিও মায়ের কবরে মাঝে মাঝেই যাই!’
‘তোমার মা নেই? তুমি কার কাছে মানুষ হয়েছো?’
‘আমার বাবা আর দাদির কাছে’, কাজল বলল, ‘তারাই আমার সব। চলো এখন ভেতরে না গেলে খালাআম্মা আর তোমার ভাইয়া রাগ করবেন।’
দুজনে ফিরে গেল।
জাকির আগেই খাবার-টেবিলে বসে আছে, সে বলল, ‘আপনি তাড়াতাড়ি এসে ভালো করেছেন। আমার পেটে রাক্ষসের ক্ষুধা। সেই কোন সকালে খেয়ে গেছি।’
‘কেন? দুপুরে কিছু খাননি?’
‘ভাইয়া ডাক্তারদের ক্যান্টিনে খেতে পারে না’, দীপা জবাব দিল, ‘ওর কেমন একটা তেলের গন্ধ লাগে। আবার বাসা থেকে খাবার নিয়েও যেতে চায় না।’
‘না, না, আমি বিস্কুট রেখে দিই আমার টেবিলের ড্রয়ারে। দুপুরে তা-ই খাই, আর সাথে চা। আমি তো দেখেছি আপনিও দুপুরে বাসায় যান না। আপনিও কি বিস্কুট খেয়ে কাটান?’
‘না, না, আমি বাবার ঘরে গিয়ে খেয়ে নিই। বাসা থেকে ড্রাইভার আসে খাবার নিয়ে। বাবার অফিসরুমে কয়েকটা ইজি চেয়ার দেওয়া পর্দা-ঢাকা একটা ভালো বিশ্রামের জায়গা আছে। বাবাও আমার সঙ্গে খেয়ে নেন।’
‘মনে হচ্ছে আপনার বাবাও আমাদের প্রফেসর।’
‘হ্যাঁ, প্রফেসর আনিসুদ্দিনই আমার বাবা।’
জাকির বলল, ‘আশ্চর্য ব্যাপার। আপনাকে তো কোনোদিন ওনার সঙ্গে দেখিনি। আমি তো প্রায়ই তার ঘরে যাই। স্যার আমাকে খুব স্নেহ করেন।’
‘আপনার জন্য তার স্নেহের কথা কে না জানে! আপনার ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্কলারশিপটা তো হয়ে গেছে। তিনিই সব ব্যবস্থা করেছেন।’
‘এই যে আরেকটা অবাক হওয়া খবর। আজ আমার কী হলো? প্রথম শুনলাম আপনার বাবা কে? তারপর আমার স্কলারশিপ। মা তুমি কি শুনছ?’
‘হ্যাঁ, বাবা, আমি তোদের খাবার দিচ্ছি বটে, কিন্তু কান তো তোদের দিকেই। শুধু আমার না, দীপারও।’
মা এগিয়ে গেলেন কাজলের দিকে। তার চোখে আনন্দাশ্রু। দীপা এসে জাকিরকে জড়িয়ে ধরল। মা কাজলের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন, ‘তুমি আমার মেয়ের মতো। তুমি যখন ইচ্ছা এ-বাড়িতে এলে এই বাড়ির সব শোক-দুঃখ আমরা ভুলে যাবো। তুমি এ-বাড়িতে আনন্দধারা নিয়ে এলে!’
কাজল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে মাকে আবার সালাম করল। মা তাকে বুকে টেনে নিলেন। কাজল প্রায় অস্ফুটস্বরে বলল, ‘দীপা জানে আমার মা নেই, আজ থেকে আমি আমার মাকে ফিরে পেলাম।’
সবাই কিছুক্ষণ আনন্দে হতবাক হয়ে রইল। মা ধীরে ধীরে কাজলকে চেয়ারে বসিয়ে তার চিবুকে আদর করে বললেন, ‘আজ থেকে আমিও আর একটি মেয়ে পেলাম। তোমরা আরেকটু বসো আমি তোমার ড্রাইভারের খাবার ব্যবস্থা করি। আর তোমরা যেটা ইচ্ছে নিজেরাই প্লেটে তুলে নাও।’
খেতে খেতে জাকির কাজলের দিকে তাকাল, ‘আচ্ছা, আমি যা কিছু শিখেছি, সব আপনার বাবার কাছে। আপনি তখন আমাকে এতগুলো প্রশ্ন করলেন রক্তচাপের ব্যাপারে। আপনি আপনার বাবাকে জিজ্ঞাসা করলে তো তিনি আপনাকে আরো ভালোভাবে বুঝিয়ে দেবেন।’
‘আপনি আমার বাবাকে ঠিক চেনেন না। তিনি সবসময়ে বলেন, যার শেখবার চেষ্টা আছে সে কষ্ট করে চেষ্টা করে শিখে নেবে। ডাক্তারি শিখতে হলে কষ্ট করতে হবে; চেষ্টা, অধ্যবসায় আর আন্তরিকতা হলো আসল। কিছু লেখা আছে বইগুলোতে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি শিখতে হবে রোগীর বিছানার পাশে। রোগীকে না ভালোবাসলে ভালো ডাক্তার হওয়া অসম্ভব। রোগীর প্রতিটা কথার দাম দিতে শেখো, তাহলেই তোমার অনুসন্ধিৎসা তোমাকে ঠিক পথে নিয়ে যাবে। আমার কাছে তোমার শেখার এটাই প্রথম ও শেষ পাঠ।’
জাকির কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। পরে ধীরে ধীরে বলল, ‘স্যারের এই বিচক্ষণ ডাক্তারি-দর্শনের কথা আমি কিছুটা জানি, কিন্তু আজ আপনার সঙ্গে কথা বলে সম্পূর্ণ বুঝতে পারলাম।’
‘কিন্তু বাবার আরো কিছু ব্যাপার আমি ঠিক বুঝতে পারি না। উনি বলেন, ডাক্তারি-বিদ্যাটা বা মেডিকেল নলেজ এখনো অসম্পূর্ণ বিজ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রতিনিয়ত আমরা রিস্ক আর চান্সের ওপর নির্ভর করছি। এটাকে সঠিক পথে নিয়ে যেতে হলে random trial, বিজ্ঞান ও স্ট্যাটিসটিকসের ওপর নির্ভর করে বহু বছর ধরে কাজ করলে ডাক্তারি শাস্ত্র কিছুটা পরিপূর্ণতার দিকে যেতে পারে। ততদিন আমাদের একমাত্র উপায় কনটিনিউয়াস আপডেটিং করা। এর জন্য মেডিকেল জার্নালের সাহায্য অপরিসীম। তোমার এখনই জার্নাল পড়ার সময় আসেনি। কিন্তু পাশ করলেই আমার সব সাপ্তাহিক জার্নালগুলো পড়া শুরু করো।’
‘আপনার কথা থেকে আরো দুটো ব্যাপার বেশ পরিষ্কার হয়ে গেল আমার কাছে।’ জাকির এবার মুখ তুলে তাকাল মা আর বোনের দিকে, ‘বুঝেছ মা, আমি যে বেশির ভাগ সময় জার্নালগুলো পড়ি, তাতেই আমার সুবিধা হয়েছে। না হলে স্যার আমাকে এই স্কলারশিপটা পাইয়ে দিতেন না।’
কাজল এবার তার কবজি-ঘড়ির দিকে তাকাল। ঠিক সেই সময়ই দেয়াল-ঘড়িতে সাড়ে দশটার সময়সংকেত হলো। কাজল বলল, ‘আজকে আমায় উঠতে হবে আম্মা। তবে আমাদের কথাই বেশি হলো। দীপা আর আম্মার সঙ্গে গল্প তো হলো না। আরেকদিন স্যার ছাড়া আমি আসব।’
জাকির বলল, ‘আমি জানি আমি অপাঙ্ক্তেয়।’
মা বললেন, ‘সে কী কথা, মেয়ে মায়ের কাছে, বোনের কাছে আসবে সেটাই তো ঠিক কথা, তুই আবার এর মাঝে মন্তব্য করছিস কেন?’
‘না মা, আমি জানি তুমি মিস কাজলের জন্য অনেক কিছু মজার মজার রান্না করবে। আমি যেন তার ভাগ পাই তাই বলে রাখার চেষ্টা করছি মাত্র।’
সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল।
কাজল ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে মায়ের কাছে গেল। মা তাকে আবার বুকে জড়িয়ে ধরলেন। দীপা এসে এই আলিঙ্গনের মাঝে ঢুকে গেল।
ফ্রি স্কুল স্ট্রিট থেকে গাড়ি এলিফ্যান্ট রোড হয়ে ধানমন্ডির দিকে চলছে। কাজলের মনে হলো আজকের সন্ধ্যাটা সত্যিই সুন্দর কাটল। সবচেয়ে ভালো হলো যে, সে যেন কিছুটা মায়ের স্নেহের স্বাদ পেল বহু বছর পরে। মায়ের চেহারাটা আবছা আবছা ভেসে উঠল কাজলের মনে।
দুই
প্রায় বারো বছর পর এই গল্পের যবনিকা উঠল লন্ডন হ্যামারস্মিথ হাসপাতালের পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিকেল স্কুলের উলফ্সন্স ইনস্টিটিউটের কনসালট্যান্টদের লাঞ্চরুমে। এককোনায় বসে লাঞ্চ করছিল কাজল আর জাকির চৌধুরী। দুজনেই কনসালট্যান্ট। সেই সময় খুব কম বাঙালিই এত উঁচুতে উঠেছে। দুজনেই খুব গভীর আলোচনায় মগ্ন। কাজল হসপিটাল ফর সিক চিলড্রেন্সে একটা ইন্টারভিউ পেয়েছে। জাকির বলল, ‘শিশু-ডাক্তারিতে ওই হাসপাতালটা পৃথিবীবিখ্যাত। কিন্তু তোমাকে বলা উচিত, আমারও একটা খবর আছে। ওয়াশিংটনের জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের প্রফেসর ও চেয়ারম্যান ম্যাকমিলান সাহেব নিজে আমাকে ফোন করেছিলেন বেলা দ্ইুটার দিকে। তিনি তার বাসা থেকে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন, হাসপাতাল থেকে নয়। সেখানে তখন সকাল।’
কাজল বড় বড় চোখে জিজ্ঞাসা করল, ‘কিন্তু বাসা থেকে কেন?’
‘কারণ, তিনি চাননি যে তার হাসপাতালে কেউ কিছু এ-ব্যাপারে জানুক। সেখানে অনেকগুলো ক্লিনিকাল ট্রায়ালের রেজাল্ট ভালো না Ñ তার ভাইস চেয়ারম্যানের হাতে ছিল এই কাজগুলো…’
কাজল তাকে থামিয়ে প্রশ্ন করল, ‘ভালো না
মানে কী?’
‘আমার মনে হয়, এত অর্থ খরচ করে আর ডাক্তারি পরিশ্রমের পরে দেখা গেছে যে এই রিসার্চ মানুষের কোনো উপকারে লাগবে না। হাসপাতাল-বোর্ডের চেয়ারম্যান খুব অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে বলেছেন, দুনিয়ার যেখান থেকে হোক একজন ব্রিলিয়ান্ট কার্ডিওলজিস্টকে ধরে আনতে। তোমার মনে আছে ম্যাকমিলান সাহেব গতবছর এখানে কনফারেন্সে এসেছিলেন। তার সেশনে আমার একটা বক্তৃতা ছিল Ñ ব্লাড প্রেসার, কোলেস্টেরল আর করোনারি ধমনিগুলোর অসুখের সম্বন্ধে কতটা এবং কোন ধরনের কোলেস্টেরল আমাদের শরীরে করোনারির অসুখের পূর্বাভাস খুব স্পষ্ট করে দিতে পারে। তুমি জানো, আমার এই কাজের উপর আমি ডক্টরেট পেয়েছি। উনি আমার এই সম্পর্কে যত বই বা প্রবন্ধ ইংল্যান্ডে বা আমেরিকায় ছাপা হয়েছে তার একটা করে কপি চেয়েছেন। কাল সেগুলো কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠাব।’
কাজল বলল, ‘শুনে খুব গর্ববোধ করছি জাকির। আমার তো মনে হয় তোমার ওয়াশিংটনের পথ পরিষ্কার হয়ে গেছে। তুমি সবসময় বলো, ইংল্যান্ড ডিকাডেন্ট জাত। উন্নতি যা কিছু হচ্ছে বা হবে সেটা আমেরিকা বা ইউরোপে সম্ভব। কিন্তু এখন অন্তত এখানে নয়। ইউরোপ থেকেও বিশেষ করে জার্মানি হল্যান্ড আর ফ্রান্স থেকে বহুবার তোমায় ডেকেছে। কিন্তু ভাষার একটা বিধিনিষেধ আছে। ছেলের পড়াশোনার গোলমাল হবে বলে আমরা সেখানে যেতে চাইনি। মনে হচ্ছে, আমাদের লন্ডনের পাঠ এবার চুকলো। তুমি আমাকে কী করতে বলো? গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিটের শিশু-হাসপাতালে যাবো কি?’
‘নিশ্চয়ই যাবে।’ জাকির জোর দিয়ে বলল, ‘আমার চাকরি তো এখনো হয়নি। তাছাড়া হলেও এখনো অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে।’
‘তার মানে কী?’ কাজলের প্রশ্ন।
‘শোনো। আমেরিকার বা ইউরোপেরও বড় বড় চাকরিতে ওদের অনেক শর্ত থাকে। এদিকে আমিও কিছু শর্ত দেবো। এই দুই শর্তগুলোর মিল না হলে তো আমি যাবো না।’
‘তোমার তরফের শর্তগুলো কী, সেটা ঠিক করেছ?’
‘এখনো পুরোপুরি ঠিক করিনি, এ-ব্যাপারে আমি তোমার মতামতেরও প্রাধান্য দিতে চাই।’
‘আগে তোমারটা বলো।’
‘পয়লা নম্বর হলো আমার নিজের সংসার অর্থাৎ টাকা। এখানে যা পাই তার দ্বিগুণের বেশি না পেলে আমার পোষাবে না। তাছাড়া রিসার্চের জন্য টাকা চাইব, যাতে আমার কোনো প্রজেক্টের কোনো বাধা-নিষেধ না থাকে। আমার কাজের ধারা তো তোমার অজানা নয়। আমি দশটা শর্ট প্রজেক্ট দেবো। এই প্রজেক্টগুলো দুবছরের। ফল পেতে আরো দুবছর লাগবে। আর চারটে লং টার্ম প্রজেক্টের জন্যে লাগবে প্রায় দশ বা পনেরো বছর। আমি গ্যারান্টি দেবো যে, এই প্রজেক্টগুলোর অন্তত সত্তর ভাগ সফল হবে এবং তাতে মানুষের হৃদরোগের অনেক বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। তা থেকেই প্রতিকার আর নিরাময়-ক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু প্রজেক্টের টাকা আমার অ্যাপয়েন্টমেন্টের আগেই সরিয়ে ফেলতে হবে।’
‘তুমি যেভাবে কথা বলছো আব্বা বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতেন। আর আম্মার তো গর্বে বুক ফুলে উঠত। আমি আজ নামাজের পর তোমার জন্য বিশেষ করে দোয়া চাইব।’
দুজনে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। একটু পরে কাজলের দিকে তাকিয়ে জাকির ধীরে ধীরে বলল, ‘তোমার চোখে একটু আগে উদ্দীপনার আভাস পেয়েছিলাম, এখন যেন সেটার বদলে একটু উদাসীনতা দেখছি। তুমি জানো ডাক্তারি শাস্ত্রের গূঢ় সত্য প্রতিষ্ঠার আর অনুসন্ধিৎসার বীজ বুনেছিলেন তোমার আব্বা। তুমি কি তার কথা ভাবছ? কিম্বা আমার আম্মা আর দীপার কথা?’
‘আব্বাকে ওরা হাসপাতালেই গুলি করে মেরেছিল। সেই পাকিস্তানি কর্নেলের নামে তুমি অনেক লিখেছিলে। কিছু কাজ হয়নি। আম্মাকে ওরা বেয়োনেটের খোঁচায় শেষ করে বাড়ির সামনের পুকুরে ফেলে দীপাকে নিয়ে চলে গিয়েছিল। দীপার খোঁজ আর কেউই পায়নি। মুক্তিযোদ্ধারা আম্মার ডেডবডি মিরপুর গোরস্তানে নিয়ে যায়। সেখানকার গণকবরের নাম এখন শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্তান। বেঁচে থাকি যদি, তাহলে একবার হলেও আমি সেখানে গিয়ে জিয়ারত করতে চাই। আব্বার একটি মূর্তি নাকি তৈরি করেছে ইউনিভার্সিটি-ক্যাম্পাসে। সেটাও দেখতে চাই তোমাকে আর খোকনকে নিয়ে। তবে একটি কথা, আমার মনে হয়েছে আমাদের কোনো পিছুটান নেই। সেটা ভাবলেই ব্যথা পাই। আব্বা তোমাকে যেটা হয়তো বলেননি, সেটা আমাকে নিয়মিতই শোনাতেন। দেশকে ভালোবাসতে, দেশের মানুষকে ভালোবাসতে। দেশের গরিব রোগীদের জন্য একটা কিছু করা আমাদের কর্তব্য। তিনি এই কথাটা সুযোগ পেলেই বলতেন। দেশে আব্বার যা কিছু আছে Ñ বাড়িঘর, টাকা-পয়সা সেগুলোর একটা ব্যবস্থা করা দরকার।’
‘তুমি কী চাও কাজল? খুলে বলো।’ জাকিরের চোখে প্রশ্ন।
‘আমি এখন ঠিক জানি না আমার কী করা কর্তব্য। তবে এটা ঠিক আমি আর কয়েক বছরের মধ্যেই অন্তত একবার হলেও দেশে যাবো তোমাদের নিয়ে। বাবার নামে একটা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন করে দেশের যত মেধাবী ছাত্র, ডাক্তার বা বৈজ্ঞানিক টাকার অভাবে দেশের ভেতরে বা বাইরে এসে কিছু শিখতে বা করতে চায় অথচ পারে না, তাদের জন্য এই ফাউন্ডেশন সাহায্য করবে। এটা না করা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছি না। এরপর আবার নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করব। যা কিছু করি খোকার ভবিষ্যৎ ভেবে আর তোমার মতামত নিয়েই করব।’
‘এ-তো খুব ভালো কথা। কবে যেতে চাও ঠিক করে ফেলো। আমি তো সবসময়ে তোমার পেছনে আছি। তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমিও আম্মার আর দীপার নামে একটা কিছু করব। তোমার আব্বার নামে তো বড় একটা কিছু করা সম্ভবপর। তবে মা আর দীপার নামে ছোটখাটো তো কিছু করা যেতে পারে।’
‘নিশ্চয়ই। দীপার নামে ওর স্কুলে একটা মেমোরিয়াল বৃত্তির ব্যবস্থা করা গেলে আর আম্মার নামে মেয়েদের একটা কারিগরি শিক্ষার স্কুল করে দিলে কেমন হয়? টাকা-পয়সা কত লাগবে আমি জানি না। খোঁজ নিলে ভালো হয়। কিছু কম পড়লে আমরা আমাদের জমানো টাকা থেকে পুষিয়ে দিতে পারব।’
‘এসব কথা বাড়িতে আলোচনা করা যাবে। এখন চলো আবার কাজে। তুমি আজ কটা নাগাদ ফ্রি হবে?’
‘আজ প্রায় সাড়ে চারটায় আমার কোনো কাজ থাকবে না। আমি কি তোমাকে তোমার রিসার্চ ল্যাব থেকে তুলে নেব?’ কাজল জাকিরের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
‘না আজ আমি লাইব্রেরিতে থাকব। আমাকে সেখান থেকেই তুলে নিও।’ জাকির উঠে দাঁড়াল। দুজনেই উলফ্সন্স ইনস্টিটিউটের বাইরে এসে দুপথ ধরল।
কয়েক মাস পরের কথা। কাজল গ্রেট ওরমন্ড স্ট্রিটের শিশু হাসপাতালে জয়েন করেছে। জাকির আমেরিকা গেছে ওর চাকরির সবকিছু ঠিক করতে আর সব হয়ে গেলে ওয়াশিংটনের আশেপাশে ভালো স্কুলের পাড়ায় বাড়ির ব্যবস্থা করতে। সেদিন রোববার। ধীরেসুস্থে ঘুম থেকে উঠে ছেলেকে ডেকে কাজল বলল, ‘তুমি বোধহয় ভুলে গেছ যে আজ শুধু আমরা দুজন নাস্তা খাবো। আব্বা তো ওয়াশিংটনে! তোমার তো একমুহূর্ত আব্বা ছাড়া চলে না।’
‘না মা! শুধু আব্বা নয়, আমার আম্মা ছাড়াও চলে না’, বলেই মাকে সে জড়িয়ে ধরল। তার ঘন চুলে আঙুল চালিয়ে আরো উসকো-খুসকো করে দিতে দিতে কাজল বলল, ‘কিন্তু তুই তো সেই এতটুকু থাকতেই শুধু আব্বা আব্বা করতিস। আজ যদি তোর আব্বা ওয়াশিংটনে খুব ভালো চাকরি পায় আর আমি যদি লন্ডনেই থাকতে চাই, তাহলে তুই কী করবি?’
‘না মা! আব্বাও তোমাকে ছাড়া Ñ তুমিও আব্বাকে ছাড়া থাকতে পারবে না কেউই। আমাকে কোনো কঠিন অবস্থায় তোমরা ফেলবে না সেটা আমি জানি।’
‘হ্যাঁ, তুই খুব বড় ডিপ্লোম্যাট হবি। আমার প্রশ্নটাই এড়িয়ে গেলি। চল এবার নাশতা খাবি। কী খেতে ইচ্ছে করছে বল।’
‘আমি হাতমুখ ধুয়ে আসছি। তবে আজ কাঁচা কাঁচা ডিমের ওমলেট পেঁয়াজ আর সামান্য কাঁচামরিচ দেওয়া সেই সঙ্গে সরু করে আলু ভাজা খেতে পেলে খুব মজা হবে মা। আমি তোমাকে মেশিনে আলু কেটে দেবো। তুমি আলুটা আমাকে ধুয়ে দিও।’
‘কিন্তু এর সঙ্গে পরোটা খেতে চাইলে খাবার খেতে নটা বেজে যাবে।’
‘না মা, আমরা ওগুলো টোস্ট দিয়ে খাবো। তুমি তো কাল সেইন্সবেরির রুটি এনেছ। ওটা হলেই জমবে। পরোটা লাগবে না।’
খেতে খেতে মা-ছেলেতে সবসময়েই নানা আলোচনা হয়। কাজল বলল, ‘আচ্ছা, কৌশিক, তোমাকে আমার কিছু কথা বলা প্রয়োজন।’
‘বলো মা, কী কথা?’ ছেলে বুঝল খোকা না বলে মা যখন কৌশিক বলে ডেকেছে তার মানে মায়ের মনে কোনো গভীর ভাবনা-চিন্তা আছে।
‘তুমি জানো, তোমার আব্বা কেন আমেরিকায় গেছে।’
‘আব্বা তো একটা দারুণ ভালো চাকরি পাবে বলে গেছে?’
‘হ্যাঁ বাবা, তুমি ঠিকই বুঝেছ। তবে একটা সমস্যা আসতে পারে, তা নাও হতে পারে।’
‘আমাকে বুঝিয়ে বলো মা।’
‘শোনো, সবই সম্ভাবনার কথা, এটা সম্ভব যে তোমার আব্বা যা যা চাইবে, ওয়াশিংটনের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বোধহয় সবই মেনে নেবে। তাহলে তোমার আব্বা আমাকে ফোন করে জানিয়ে সেখানে একটা সুন্দর জায়গায় ভালো স্কুল-কলেজের কাছাকাছি একটা বাড়ি দেখবে। খুব সুবিধা পেলে কিনেও ফেলবে।’
‘তাহলে তো কোনো সমস্যাই নেই,’ কৌশিক কিছু ভেবে বলল।
‘তবু একটা ছোট সমস্যা আছে,’ কাজল জবাব দিল, ‘সেটা আমাকে নিয়ে। আমার এখানকার চাকরিটা নতুন। কিন্তু এই শিশু হাসপাতালটাতে বেশির ভাগ ডাক্তারই খুব ডেডিকেটেড ও মোটিভেটেড। আমার কর্তৃত্ব আমার সব জুনিয়রই খুব ভালোভাবে মেনে নিয়েছে, আর যারা সিনিয়র তারা আমার কাজে অত্যন্ত সন্তুষ্ট। এই অবস্থায় আমি চট করে চাকরিটা ছাড়তে চাই না। তাছাড়া আরো একটা ব্যাপার আছে। আমি সারাজীবন বিদেশে থাকতে চাই না।’
‘তুমি কি বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাও মা? কিন্তু সেখানে তো আমাদের কেউই নেই। আব্বা তো বলে, বাংলাদেশ তার দেশ হতে পারে না Ñ সেখানে তার মা আর ছোটবোনকে পাকিস্তানিরা অত্যাচার করে মেরেছে।’
‘তোমার আব্বার কথা সত্যি, কিন্তু অন্য একটা দিকও দেখতে হয় Ñ সেখানে কোটি কোটি মানুষ আমাদেরই ভাইবোন। তাদের দুঃখ-দুর্দশা একটু হলেও দূর করার চেষ্টা করা আমাদের সবার কর্তব্য। তোমারও। তোমার আব্বা যা বলে সেটা দুঃখে আর অভিমানে। আসলে দেশে কিছু করতে পারলে সে-ও খুব শান্তি পাবে মনে।’
‘মা, তুমি কি আমাকে রেখে ঢাকা চলে যেতে চাইছ?’
‘হ্যাঁ, তা-ই চাইছি, কিন্তু শুধু তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে পারছি না।’
কৌশিক চেয়ার ছেড়ে উঠে মাকে জড়িয়ে ধরল, ‘মা, তুমি আমাকে ফেলে যেও না। আমি তোমাকে ছাড়া বা আব্বাকে ছাড়া একদম থাকতে পারব না।’
‘সময় হলেই তুমি পারবে। সে-সময় এখনো আসেনি। কাজল কৌশিককে আদর করতে লাগল। এর মধ্যে টেলিফোন বেজে উঠল। ওপাশে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপার থেকে জাকিরের গলার স্বর ভেসে এলো, ‘কেমন আছ তোমরা? কী করছ এখন? আমার খুব ইচ্ছে করছে তিন ঘণ্টার মধ্যে তোমাদের কাছে চলে আসি। কনকর্ডের টিকিটের দাম এত বেশি না হলে…’
‘তোমার মেজাজ শরিফ তো খুব চমৎকার! ব্যাপারটা কী খুলে বলো। আমরা ভালো আছি, তুমি কেমন,’ কাজল বলল, ‘আমাদের কথা শেষ হলে কৌশিকের সঙ্গে কথা বলো। এখন আসল কথা বলো।’
‘আসল কথা হলো, গভর্নিং বডির ডাইরেক্টরদের সঙ্গে আলাদা করে মোট এগারোটা ইন্টারভিউর পর ওরা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, আমাকে ছেড়ে দেওয়া ওদের উচিত হবে না। সুতরাং আমার সব শর্ত ওরা মেনে নিয়েছেন এবং যে-বেতন আমি চেয়েছি তার চেয়েও অনেক বেশি বেতন দেবেন আমার ছমাসের কাজ দেখে। এখনকার বেতন বিলেতের চাইতে দ্বিগুণেরও সামান্য বেশি।
‘খুবই খুশি হলাম জাকির। আজ সকালেই এসব কথা ছেলের সঙ্গে আলোচনা করেছি। বাড়ির কি কিছু করতে পারলে?’
‘হ্যাঁ, একটা স্বপ্নের বাড়িও পেয়ে গেছি। সুইমিং পুল, বাগান, চারটে বেডরুম ও গেস্টরুমসহ। বাগানটাও খুব সুন্দর, তুমি যা চাও। বাড়িটা মাত্র তিন বছরের পুরানো। মালিক ডিপ্লোম্যাট, বদলি হয়ে গেছে ভারতে, তাই বিক্রি করছে। বলতে পারো খুব সুবিধায় পেয়েছি। ছেলের স্কুল দুতিন মিনিটের পথ। আর কৌশিক বড় হলে একবারও বাস না বদলে আধঘণ্টায় জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছতে পারবে। অবশ্য সুবিধে হলে তোমার-আমার সঙ্গেও যেতে পারে।’
‘তোমার সঙ্গে বলো’, কাজল জাকিরের কথা শোধরালো। ‘আমি তো আপাতত এই শিশু হাসপাতাল ছাড়ব না।’
‘ওহো! আসল কথাটাই তোমাকে বলা হয়নি। তোমারও চাকরি আমার হাসপাতালেই হয়ে গেছে। তুমি জানো, আমেরিকার সবচেয়ে বিখ্যাত শিশু-হাসপাতাল সেন্ট জুডস। এরা তোমাকে চাচ্ছে ওয়াশিংটন হাসপাতাল আর সেন্ট জুডসের মধ্যে সায়েন্টিফিক ও ক্লিনিকাল লিয়াজোঁ তৈরি করার জন্য। কাজটা খুবই চ্যালেঞ্জিং। তুমি এসে একবার দেখলে না করতে পারবে না।’
তিন
প্রায় দশ বছর পরের কথা। জাকির ও কাজল খুবই নাম করেছে। দুজনেরই ডাক আসে আমেরিকার বিভিন্ন জায়গা থেকে। অনেক জায়গাতেই ওরা যেতে পারেনি প্রথমদিকে। এখন ছেলে বড় হয়েছে। প্রায় দুনিয়ার সবদেশেই ওরা বক্তৃতা দিয়ে বেড়ায়। জাকিরের সব রিসার্চ গড়গড়িয়ে চলছে, প্রায় সত্তর ভাগ সাফল্যের দিকে। কাজলেরও রিসার্চে কতগুলো খুব ভালো ফল দিয়েছে। কিন্তু তার নাম হয়েছে বিশেষ করে অরগানাইজেশনের কাজকর্মে। সবাই ওদের চায়। ছেলে কৌশিকও খুবই ভালো করেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে সে। ছাত্র হিসেবে লেখাপড়ায় ও খেলাধুলায় সমান পারদর্শী। কিন্তু এই অস্থির দৌড়-ঝাঁপের জীবনে কাজল হাঁপিয়ে উঠেছে।
এক রোববারে সে জাকির আর কৌশিককে ব্রেকফাস্ট টেবিলে একলা পেল। মনে হচ্ছে সেদিন ওদের দুজনেরই টুর্নামেন্ট বা রিসার্চের কাজে খুব তাড়াও নেই।
‘তোমাদের দুজনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। তোমরা স্থির হয়ে বসো। জাকির তুমি তোমার রিসার্চের টেবিল থেকে আর কৌশিক তোমার সব কাজ থেকে আমাকে একটু সময় দেবে?’ কাজল বলল।
‘কী কথা মা? আমি তো তোমার কাছে সবসময়েই আছি Ñ যখন প্রয়োজন বললেই হলো।’ কৌশিক বলল।
‘আই অ্যাম অলসো অলয়েজ অ্যালার্ট টু সার্ভ ইউ কাজল।’ জাকির জবাব দিল, ‘তুমি যখনই চাও, আমরা তো সবসময়েই আছি।’
‘হ্যাঁ, এক হিসেবে তোমরা দুজনেই ঠিক বলছো।’ কাজল খুব ধীরে ধীরে বলল, ‘তোমাদের সাংঘাতিক ও দুর্দান্ত ছোটার সঙ্গে আমার ব্যস্ততা ও কাজও মিশেছে। আমি তোমাদের হারিয়ে ফেলেছি। আমি নিজেও নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। আজ প্রায় ছয়-সাত বছর হলো আমরা আমেরিকায়। তোমরা জানো, আমি এসব কাজ খুব পছন্দ করলেও ঢাকায় আমার অনেক কাজ বাকি আছে। এখন না করলে হয়তো বাকি জীবন ধরে অনুতাপ করব। আমি ঠিক করেছি যে, আমি ঢাকা চলে যাবো। তোমরা দুজন যেভাবে চলছ, দুজনেই পৃথিবীতে অনেক কিছু করতে পারবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। কিন্তু পৃথিবীর এককোণে যে-দেশের মাটিতে আমি জন্মেছি, সেখানকার জন্য আমায় কিছু করতেই হবে। আমি এই নভে¤¦রেই সেখানে যেতে চাই। তোমরা কী বলো?’
প্রথমে কৌশিক বলল, ‘কিন্তু মা সেখানকার অবস্থা তো খুব একটা ভালো বলে মনে হলো না। যারা বাংলাদেশ থেকে এখানে আসে তাদের মুখ থেকেই শোনা। তাছাড়া সাংঘাতিক গরম। বাতাসের আর্দ্রতা আর মশা-মাছি ডেঙ্গু-টাইফয়েড কলেরা-ম্যালেরিয়ারও অনেক গল্প শুনি। এনভায়রনমেন্টটাও খুবই পলিউটেড। ইন্টারনেটে ডেইলি স্টার আর অবজারভারে নিজেই দেখেছি। সেখানে তুমি কী করে টিকবে?’
‘কোটি কোটি মানুষ সেখানে টিকে আছে। আমার তো মশা মাছি প্রুফ বাড়ি আছে ধানমন্ডিতে। সেখানকার লেকের ধারে পলিউশনের লেভেলও খুব কম। সুতরাং ওসব নিয়ে আমি খুব একটা চিন্তা করছি না।’ কাজল জবাব দিল।
জাকির খুব গম্ভীর হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কি সত্যি কৌশিককে আর আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে? আমি তো ভাবতেই পারছি না। ওই ধানমন্ডির বিরাট বাড়িটাতে তুমি একলা আর আমরা এখানে একলা। এটা কি সত্যিই সম্ভব?’
‘এটা খুবই ভালো প্রশ্ন’, কাজল জবাব দিল, ‘কিন্তু তুমি কি একবারও আমার দিকে এই ছয়-সাত বছরে তাকিয়ে দেখে ভেবেছ আমি কী হয়ে গেছি। আমি এখন সম্পূর্ণ নিঃস্ব জাকির। পৃথিবীর এই সবচেয়ে ধনী দেশে ডলারের পাহাড় তৈরি করেছি আমরা, কিন্তু মনের দিকে থেকে আমি একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছি। আমাকে তোমরা আর এখানে থাকতে বলো না। গত দশ বছরে কমপক্ষে বিশবার প্ল্যান করেছিলাম ঢাকা যাবো, কিন্তু তোমার আর খোকার ব্যস্ততায় যাওয়া হয়নি। আমি তোমাদের কাছে এখন শুধু অনুরোধ করব যে, আমাকে আর পিছু ডেকো না। তোমরা জানো, তোমরা দুজনেই আমার হৃদয়ের মণিকোঠার ভালোবাসার সবচেয়ে বড় অলংকার। আমার চোখের পানিতে আমার এই চলে যাওয়ার পথ ভিজে যাবে, কিন্তু তবু আমাকে যেতে হবে। আমার বেঁচে থাকার এই শেষ চেষ্টা তোমরা নষ্ট করে দিও না।’ কাজলের চোখে অশ্রুধারার চিহ্ন!
তিন জনেই অনেকক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। তারপর জাকির ধীরে ধীরে বলল, ‘বেশ তো তুমি যাও না ঢাকায়, কিছুদিন বেড়িয়ে এসো। আর যেসব কাজ তুমি তোমার আব্বা, আমার আম্মা আর দীপার জন্য করতে চেয়েছ সেগুলোও সব ঠিক করে ফেলো। এসো আমরা দুজনে মিলে আজকেই একটা খসড়া হিসাব করি। দরকার হলে ব্যাংক থেকেও কিছু তুলে নেব। লাখবিশেক ডলার দিয়ে তুমি অনেক কিছু করতে পারবে। তারপর তুমি ফিরে এসো।’
‘তোমার ধারণা ভুল জাকির!’ কাজল খুব স্পষ্ট গলায় বলল, ‘আমি আর ফিরব না।’
‘হঠাৎ এটা কেন স্থির করলে কাজল? আমার উপর রাগ আর অভিমান করার অধিকার তোমার সবসময়েই আছে। কিন্তু তুমি এটাও জানো যে আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি। আজ এতদূর যে উঠেছি এর পেছনে তোমার সমর্থন, সাহায্য আর অনুপ্রেরণাও কম নয়। তবু কেন এত অভিমান?’
কাজল কিছুক্ষণ পর চোখ মুছে বলল, ‘দেখো, তুমি আমার ফিরে আসার কথা ভাবলে। অথচ মুখফুটে একবারও বলতে পারলে না, চলো আমরা সবাই যাই, একসঙ্গে সবাই মিলে এই কাজগুলো সেরে আসি।’ কাজলের চোখে আবার পানি, ‘আমার অভিমানটা হয়তো অমূলক, কিন্তু তোমার এই কথাগুলো কী প্রমাণ করে? সত্যি করে বলো।’
জাকির বলল, ‘তোমার সাথে তর্কে কোনোদিনও পারিনি, পারবও না। সেজন্যেই তোমার নাম দিয়েছি তর্কালঙ্কার। কিন্তু একদিন না একদিন তুমি বুঝতেই পারবে যে এই কাজ-পাগল মানুষটা তোমায় কী চোখে দেখে ও কতটা ভালোবাসে।’ জাকিরের গলার স্বর ভারি হয়ে উঠল।
কাজল চুপ করে রইল, কিন্তু তার চোখের পানি বন্ধ হলো না। কৌশিক এসে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। কাজল অসীম øেহ ও মমতায় কৌশিককে বুকে টেনে নিল। মা ও সন্তানের এই নৈকট্য জাকির অনেকক্ষণ ধরে নিশ্চুপ হয়ে বসে উপভোগ করতে করতে তার মনে ধীরে ধীরে একটা আতঙ্ক কালো মেঘের মতো সবকিছু অন্ধকারে ঢেকে দিল। সে ভাবল, এখন কিছু না বলে রাতে বিছানার একান্ত নির্জনতায় যেমন করেই হোক কাজলের অভিমান ভাঙাবে। কিন্তু কাজল এরপর জাকিরকে সে-সুযোগ আর দিল না। প্রতি রাতেই সে কৌশিকের ঘরে রাত কাটাতে লাগল।
এর মাত্র কয়েকদিন পর কৌশিক আর জাকির সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরে কাজলকে আর পেল না। হাসপাতালে কোনো কাজে আটকে আছে এই ভেবে সেখানে ফোন করে জাকির জানতে পারলো যে, কাজল আজই চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে বেলা বারোটার দিকে বাড়ি ফিরেছে। এর মধ্যে কৌশিক তার ঘর থেকে পেপারওয়েট চাপা দেওয়া মায়ের একটা চিঠি আবিষ্কার করল। বাংলায় লেখা, কৌশিককে উদ্দেশ্য করে লেখা। সে অবাক হলো, মা জানে সে বাংলা খুব ভালো বলতে পারলেও লিখতে বা পড়তে ভালো পারে না। সে বুঝতে পারল এই চিঠি তাদের দুজনকেই লেখা। বাবার কাছে গিয়ে বলল, ‘আব্বু! এই চিঠিটা পড়ে শোনাও।’
জাকির পড়তে লাগল।
‘আমার নিজের চাইতেও প্রিয় কৌশিক সোনামণি!
তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি। আমি কতটা কষ্ট ও ব্যথাভরা বুকে এই চিঠি লিখছি, তা আমি লিখে বোঝাতে পারব না! তোমরাও হয়তো অতটা বুঝতে পারবে না। তোমরা যখন এই চিঠি পাবে তখন আমার প্লেন আটলান্টিকের উপর দিয়ে ছুটছে। প্লেনে চোখের পানি কী করে সামলাবো তা জানি না। তবে এই কদিন অনেক পানি ঝরতে ঝরতে চোখ একটু লাল হয়েছে, এ-ই যা রক্ষা। হয়তো কেউ ভাববে কনজাঙ্কটিভাইটিস। তবে যে যাই ভাবুক আমাকে বাঁচতে হবে বলেই এখন এই অসীম ব্যথায় আমাকে ডুবে যেতে হবে। আমার আর কোনো উপায় নেই!
আমার সোনা খোকা! আমার হৃদয়ের সবগুলো তন্ত্রীতে তুই জড়িয়ে আছিস! আমার সবচেয়ে গর্বের ও ভালোবাসার প্রতীক তুই। এই কথাটা কখনো ভুলবি না। আজ তোকে ছেড়ে যেতে সবচেয়ে বড় ভয় আমার যে, তুই যেন আমার অভাবে নষ্ট হয়ে না যাস। আমেরিকায় নষ্ট হবার সুযোগ অনেক Ñ বন্ধু-বান্ধবী, সিগারেট, গাঁজা-আফিম, এক্সট্যাসির নানারকম ধুয়ো, ইনজেকশান আরো কতকিছু আছে। সব দুঃখ ভুলে আকাশের মেঘের উপর ভেসে বেড়াবার অনেক সুযোগ। একটু চোখ খুলে তাকালেই দেখবি তোর অনেক বন্ধু-বান্ধবীই ধীরে ধীরে সেই পাতালের রাজ্যে ডুবে যাচ্ছে। খোকা সোনা! তোর কাছে আমি শুধু এটুকুই চাই যে, কখনো বিপথে-কুপথে যাবি না। একমাত্র লেখাপড়ার জন্য, বড় হবার জন্য, মনুষ্যত্ব নিয়ে মানুষ হবার জন্য, মানুষের উপকার করার জন্য প্রয়োজন হলে তুই আমাদের বাড়ি সেঁজুতি ছেড়ে যেতে পারিস! তা না হলে এখানেই থাকিস। তোর বাবা সত্যিকারের কাজ-পাগল। কিছুটা ওয়ার্কহোলিক। তবে এই ডেফিনেশন তোর আব্বার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ প্রযোজ্য নয়। ওরা অর্থাৎ ওয়ার্কহোলিকরা কোনো কাজই শেষ করতে পারে না আর তোর আব্বু যে-কাজই ধরে সেটাই সাফল্যের চূড়ায় ওঠে। আমি জানি, সে তোকে মানুষ করে তুলবে ও তোকে তার নিজের চেয়েও আরো উপরে উঠতে সাহায্য করবে। আমার অবর্তমানে সে ছাড়া তোর আর কেউ নেই। এটা কক্ষনো ভুলিস না যে, আমার আত্মার বাঁধনে আমি ফিরে ফিরেই তোদের পাশে ঘুরঘুর করব। বেঁচে থাকলেও বা মরে গেলেও। তুই এখন অনেক বড় হয়েছিস Ñ তোর চেহারা, তোর গলার স্বরের পরিবর্তন আমি প্রতিদিন লক্ষ করেছি। যদি কখনো ভবিষ্যতে দেখা হয়, হয়তো তোকে চিনতে একটু দেরি হতে পারে। কিন্তু আমি তো বদলাবো না। তুই আমাকে জড়িয়ে ধরলেই আমি বুঝব তুই আমারই রক্তে-মাংসে গড়া সোনাখোকা। এই কথা কখনো ভুলিস না।
আমার নিজের উপর আমার যথেষ্ট দুঃখ, রাগ আর অভিমান। তোর জলি আন্টি আর রহমান চাচিকে তোর নিশ্চয়ই মনে আছে। লন্ডনে ওদের দুই ছেলেমেয়েকে তুই ভাইয়া আর আপু বলে ডাকতিস। ছেলেটা এখন ডাক্তারিতে ভর্তি হয়েছে। মেয়ে কম্পিউটারে Ñ লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে। তোরা জানিস না যে, জলি আর রহমানের ডিভোর্স হয়েছে। জলি ঢাকায়। রহমান লন্ডনে। মতের অমিলই এর কারণ। তবে জলি একটা কাজ খুবই ভালোভাবে সমাধা করে তারপর আলাদা হয়েছে। ছেলেমেয়ে দুটোর ভবিষ্যৎ প্রায় নিশ্চিত করে লন্ডন ছেড়েছে। আমি কিন্তু জলির মতো অতো ভালো মা হতে পারলাম না। খুব চেষ্টা করেছিলাম তোকে হার্ভার্ডে ভর্তি করে ছুটি নেব। আমার মনে হয় এই ব্যাপারে আমি ভালো মা বা ভালো স্ত্রী নই। তোদের ছেড়ে যাচ্ছি কেন, তোরা জানিস। আমার বুকভরা দীর্ঘশ্বাস মাখা ভালোবাসা নিস।
তোর আম্মু!’
চিঠিটা পড়ে ও শুনে দুজনই পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
চার
প্রায় দশ বছর পর এই উপন্যাসের যবনিকা যখন আবার উঠল তখন কাজলের প্রায় সব কাজ শেষ। বাবার, দীপার আর দীপার মায়ের নামে যা কিছু সে করতে চেয়েছিল, তা শেষ হয়ে গেছে প্রায় সাত বছর আগে। ঢাকায় ফিরে সে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রধান অধ্যাপিকার পদে প্রায় বছরতিনেক কাজ করেছে। তারপর পোস্ট গ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউটে কয়েক বছর একটানা কাজ করার পর অবসর নিয়েছে। এর মধ্যে একটা শিশু-হাসপাতাল সে প্রতিষ্ঠা করেছে। সে এসেছিল এখানে তার নিজের সঞ্চিত ডলার নিয়ে, কিন্তু তার আব্বার সঞ্চয়ও কম ছিল না। সতরাং আর্থিক কোনো অসুবিধাই তার হয়নি। তবে নতুন কোনো কাজে ইচ্ছা থাকলেও শেষ অবধি দেশের ক্রম নিুগতি অবস্থার কারণে সে কিছু আর শুরু করেনি।
অবসরের পর তার সময় কাটানোরও কোনো সমস্যা হয়নি। পোস্ট গ্রাজুয়েটের ছেলেমেয়েরা প্রায় নিয়মিত বাসায় এসে তার নোট নেয়, প্রশ্ন করে, ভালো উত্তর পায় এবং আরো বেশি সংখ্যায় আসে। তার কলিগরা এখনো তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে, মাঝে মাঝেই শুক্রবারে বা অন্যান্য ছুটির দিনে পরিবারসহ বেড়াতে আসে। তাছাড়া গোটা চার-পাঁচেক ইংরেজি-বাংলা দৈনিক, কয়েকটা স্থানীয় মাসিক, সব ঈদসংখ্যা, ওপার বাংলার পূজা-সংখ্যা, আমেরিকার ইংল্যান্ডের আর ইউরোপীয় শিশুস্বাস্থ্য-বিষয়ক সাপ্তাহিক জার্নালগুলো তাকে যথেষ্ট ব্যস্ত করে রাখে। এর উপর তার বাসার পুরানো লোকেরা এখনো আছে। সেলিম এখনো ড্রাইভার, বোরহান এখনো এ-বাড়ির ম্যানেজার আর আমেনা তার নিজের খাস পরিচারিকা। এরা সবাই এখনো কর্মক্ষম। বিভা আর শেফালি রান্না ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকে। তাদের আবার ঠিকে কাজ করা সহকারী আছে। সুতরাং কাজলের একেবারেই মনে হয় না যে, সে অবসর জীবনযাপন করছে। এদের নাতি-নাতনিদের ও আরো অনেকের অসুখ-বিসুখ হলে বিনে পয়সায় ওষুধ ও পরামর্শ সব কাজলের।
জাকির বা কৌশিকের কোনো খবর সে জানে না। কৌশিকের জন্য সে মাঝে মাঝেই খুব ছটফট করে, কিন্তু যেহেতু কখনো কোনো টেলিফোন আমেরিকা থেকে আসেনি, সে বারবার নিজে থেকে টেলিফোন করতে গিয়েও ফিরে এসেছে। অত্যন্ত কষ্ট হয়েছে, কিন্তু সে নিজেকে সংযত করতে সক্ষম হয়েছে। মনে প্রচণ্ড অভিমানের বোঝা নিয়ে সে আরো বেশি বোবা হয়ে গেছে! কখনো কোনো সময়ের ফাঁকে ফাঁকে সে বাজনা বা গান শোনে। সাধারণত বেলায়েত খান, রবিশঙ্কর, হেমন্ত বা সাগর সেন, ফিরোজা বা পুরানো দিনের গান Ñ এগুলোই সে বারবার শোনে। আগে মাঝে মাঝে লেকের ধারে হাঁটতে যেত। এখন ভিড়ের ভয়ে সে শুধু তার নিজের বাগানে বা বাড়ির ছাদে আধঘণ্টা বা একঘণ্টা হাঁটে। কয়েকদিন ধরেই সে একটু দুর্বলতা বোধ করছিল; শুয়ে বা বসে থাকার পর উঠতে গেলে কেমন যেন একটু মাথা ঘোরে। কাজল ভাবছিল, বোধহয় প্রফেসর জামানকে দিয়ে একটু রক্তপরীক্ষা করিয়ে নিলে ভালো হয়।
সেদিন শুক্রবার। সকালে জামান-দম্পতি এসে হাজির। তাদের মেয়ের বিয়ে প্রায় ঠিক হয়ে গেছে। এক আমেরিকা প্রবাসী ডাক্তার ছেলের সঙ্গে। সামনের শীতেই বিয়ে। কাজল শুনে খুব উৎফুল্ল। সে তাড়াতাড়ি করে উঠে আমেনাকে ডাকতে গেল। জামানদের মিষ্টি খাওয়াতে হবে। এত বড় সুখবর। আমেরিকা প্রবাসী ডাক্তার ছেলে কথাটি শুনেই হয়তো সহসাই কৌশিকের মুখটা তার সামনে ভেসে এলো।
সোফা থেকে উঠতেই তার মাথা হঠাৎ ঘুরে গেল। চারদিকে আঁধার। সে হঠাৎ আবার সোফায় এলিয়ে পড়ল। জামান-দম্পতি তাকে বড় সোফাটায় শুইয়ে দিলেন। জামান পরীক্ষা করে খুবই উদ্বিগ্ন হলেন। টেলিফোন তুলে সাথে সাথেই তার অ্যাসিসট্যান্টকে রক্তপরীক্ষার সরঞ্জাম নিয়ে এক্ষুনি চলে আসতে বললেন, তার নিজস্ব হাই পাওয়ার মাইক্রোসকোপসহ। ঘণ্টাখানেক পর সবরকম রক্তপরীক্ষা শেষ হলো। ততক্ষণে কাজলের জ্ঞান ফিরেছে ও সে বেশ সুস্থ বোধ করছে।
জামান বলল, ‘ভাবি আপনার রক্তশূন্যতা চরম। হিমোগ্লোবিন মাত্র সাড়ে তিন। আপনি কি খাওয়া-দাওয়া একেবারেই ছেড়ে দিয়েছেন? আমি ব্লাড ট্রা›সফিউশনের ব্যবস্থা করেছি। ডক্টর ফেরদৌস ব্লাড আনতে গেছে। এই রক্তশূন্যতার কারণ কিছুটা বুঝেছি, কিন্তু আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সঠিক বলতে পারব। খুব কম হলেও চার বোতল রক্ত আপনার ছাত্রছাত্রীরা দেবে।’
‘কিন্তু আপনি এখন যা পেয়েছেন বা বুঝেছেন তাতে আমার রোগটা কী হতে পারে?’ কাজল প্রশ্ন করল।
‘এত চট করে বলতে পারছি না। সাধারণ অ্যানিমিয়াও হতে পারে। আমি সঠিক না জেনে কিছু বলতে চাইছি না। তবে একটা কথা। আপনার অনুমতি পেলে প্রফেসর জাকির আর ডক্টর কৌশিককে একটা খবর দিই।’
‘না না, তার প্রয়োজন নেই, ওরা অত্যন্ত ব্যস্ত থাকে নিজেদের কাজে। দরকার হলেই আমি আপনাকে বলব। এখন আপনারা মিষ্টিমুখ করুন আর আপনাদের সঙ্গে আমিও চা খাবো। হঠাৎ যে কী হলো, সব একেবারে অন্ধকার হয়ে গেল। এখন বেশ ক্ষুধা পেয়েছে।
ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যে রক্ত এসে গেল। ডাক্তার জামান আর ফেরদৌস ট্রা›সফিউশন চালু করে দিলেন। এর মধ্যেই পোস্ট গ্রাজুয়েটের ছেলেমেয়েরা রুটিন করে কাজলকে দেখাশোনা করার ব্যবস্থা নিল।
দিন দুই পর কাজল বেশ সুস্থ বোধ করতে লাগল। তার রক্তশূন্যতা প্রায় ভালো হয়ে গেছে। সেদিন বিকেলে প্রফেসর জামান ও তার স্ত্রী এসে কাজলের বিছানার পাশে দুই চেয়ারে বসলেন। তাদের মেয়ে দিশাও সাথে এসেছে। জামান বললেন, ‘দিশা কিছুতেই ছাড়ল না, সে আপনাকে দেখতে এসেছে।’
কাজল তাকে ইশারা করে কাছে টেনে নিল, ‘তুমি আমার কাছে আসবে এটা কী কোনো কথা হলো? জামান ভাইয়ের কথায় একটা সঙ্কোচের ভাব আছে। তুমি আমার মেয়ের মতো, যখন ইচ্ছা তুমি আমার কাছে এসো। কিন্তু তোমাকে তো অনেকদিন দেখিনি, তুমি খুব বড় হয়েছ আর খুউবই সুন্দর। এখন কী করছ?’
‘আমি এবার ঢাকা থেকেই এম আর সি পির ফার্স্ট পার্ট পরীক্ষায় পাশ করেছি।’
‘খুউব খুশি হলাম, দিশা! খোদা তোমাকে অনেক বড় করবেন। কোন দিকে যাবে ঠিক করেছ?’ কাজল প্রশ্ন করল।
‘আমি তো এখন পোস্ট গ্রাজুয়েটের কার্ডিওলজিতে আছি। ইচ্ছা আছে কার্ডিওলজিতে এম আর সি পি করে এডিনবরায় এফ আর সি পি করার।’ দিশার গলার স্বর যেমন মিষ্টি তেমনি পরিষ্কার।
‘আমি তো দুটো দেশই দেখেছি, দিশা। একটা মাস্টারি উপদেশ দিই, কিছু মনে করো না।’
‘আপনি কী বলছেন কাজল ভাবি?’ জামান সাহেব বলে উঠলেন, ‘আপনার উপদেশ তো দিশা মাথা পেতে গর্বের সাথে মেনে নেবে।’
‘দিশা, এই কথাটা মনে রেখো। ডিগ্রির চাকচমক আর ভ্যারাইটিজ একমাত্র ইংল্যান্ডেই আছে, কিন্তু টেকনলজির আসল মারপ্যাঁচ আছে ইউরোপ আর আমেরিকায়। ডিগ্রিগুলো ইংল্যান্ডের খুব ভালো। ডাক্তারি বিজ্ঞানের গোড়াটা খুব শক্ত করে গড়ে তুলতে সেটার প্রয়োজনও খুব বেশি। কিন্তু হাতেকলমে টেকনলজির কাজ ইউরোপে আর আমেরিকায় শেখার সুযোগ অনেক বেশি। আমার কথার সারাংশ হলো তুমি ডিগ্রিগুলো ইংল্যান্ড থেকে নিও, কিন্তু অন্তত কয়েকটা বছর ইউরোপে বা আমেরিকায় কাজ শিখো।’
‘ওর হবু স্বামী কিন্তু আমেরিকার স্পেশালিস্ট, বোধহয় সেও কার্ডিওলজিস্ট। শেষে তো দিশা আমেরিকায়ই থাকবে কাজল আপা।’ এবার জামান-গিন্নি জবাব দিলেন।
‘হ্যাঁ, সেটা আমি ভুলেই বসে আছি। ও কি বিয়ের পরপরই আমেরিকায় চলে যাবে?
‘সে-রকম তো এখন মনে হচ্ছে না।’ মিসেস জামান বলল, ‘দিশার ইচ্ছে বিয়ের আগে বা পরে হোক অন্তত এম আর সি পিটা পাশ করা পর্যন্ত ওর ঘাঁটি থাকবে ঢাকা আর লন্ডনে। বিয়ে হয়ে গেলে এফ আর সি পি পরীক্ষার ব্যাপারগুলো না বুঝে সে আমেরিকায় যাবে না।’
‘খুবই সঠিক পথ। তোমাকে পথনির্দেশনা কে দিয়েছেন জানি না, তবে তুমি চাইলে তোমার জাকির চাচার মতামত ও সাহায্য চাইতে পারো।’
‘আচ্ছা ভাবি, আপনাকে আমার একান্ত অনুরোধ, আমাকে একটু অনুমতি দিন। আমি প্রফেসর জাকির আর ডক্টর কৌশিককে একটু যোগাযোগ করি।’
‘না, না, এখন থাক। আপনারা তো সব ঘটনাই জানেন সে ব্যস্ত মানুষ, তার কাজ নিয়েই সে খুশি থাক। আমার জন্যে তার ব্যস্ত না হলেও চলবে।
কাজলের স্বরে যেন একটু অভিমানের ছোঁয়া। ‘কিন্তু একটা কথা জামান ভাই, আপনার মুখে দুবার শুনলাম ‘ডক্টর’ কৌশিক। আপনার মনে হয় আমার ছেলে কৌশিকের সব খবরই জানেন!’
‘সব খবর তো এত দূরে বসে জানা সম্ভব নয়। তবে আপনার অসুস্থতার সময় এখানকার কাগজে খুবই উৎসাহজনক খবর ছাপান হয়েছে কৌশিককে নিয়ে। সারা এশিয়া বা ইউরোপ-আমেরিকার ডাক্তাররা যা পারেনি এতদিন পর্যন্ত, সেই রকম একটা রিসার্চে ডক্টর কৌশিক চৌধুরী অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। সমগ্র এশিয়ার এই প্রথম ডাক্তার। তাকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ সবচেয়ে বড় রিকগনিশন দিয়েছে আর সেই সন্ধ্যায়ই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কৌশিককে স্পেশাল ডিনারে দাওয়াত করেছিল। ভাবি আমাকে মাফ করবেন, এত বড় খবরটা আমি আপনাকে দিইনি তার কারণ সে-সময় আপনি এত দুর্বল ছিলেন যে আমি কোনোরকম এক্সাইটমেন্টে আপনাকে জড়াতে চাইনি। আমি সবাইকে মানা করে দিয়েছিলাম।’
কাজল চুপ করে শুনল কিন্তু অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না। তারপর প্রায় তার অজান্তেই তার দুচোখে অশ্রুজলের বন্যা নেমে এলো। সবাই নিঃশব্দে বসে রইল। তবে একটু পরে দিশা কাজলের পাশে দাঁড়িয়ে তার চোখের পানি রুমাল দিয়ে মুছতে লাগল।
প্রায় আধঘণ্টা পর কাজল ধীরে ধীরে প্রশ্ন করল, ‘জামান ভাই, আপনি দয়া করে কৌশিকের হাসপাতালের ফোন নাম্বারটা আমাকে একটু যোগাড় করে দেবেন? আমি একটু ওকে মায়ের অভিনন্দন জানাতে চাই।’
‘আমি নিজেও চেষ্টা করেছি ওকে অভিনন্দন জানাতে। পারিনি। কারণ সে তখন বোস্টনে নেই, সে ইংল্যান্ড, আমেরিকা আর ইউরোপের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে ইনভাইটেড স্পিকার হিসেবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারপর সে যাবে মস্কো আর জাপানে। তারপর সে প্রফেসর হিসেবে বোস্টনে জয়েন করবে।’
‘আপনি কী করে এত খবর পেলেন?’ কাজল জিজ্ঞাসা করল।
‘আমি তো ওর সেক্রেটারির সঙ্গে কয়েকবার বৃথা চেষ্টা করেছি ও কথা বলেছি। কৌশিক এখন আমেরিকার বিভিন্ন হাসপাতালে ও কনফারেন্সে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছে। তারপর তার শুরু হবে ইউরোপিয়ান ট্যুর। মাসতিনেক তার ঠিকানা কী হবে, তা কেউ জানে না। সে নাকি গত পাঁচ বছর অমানুষিক পরিশ্রম করেছে। হার্ভার্ডের ম্যাসাচুসেট্স হাসপাতাল পৃথিবীবিখ্যাত। তারাই তাকে অধ্যাপকের পদে স্থায়ী আসনে তাকে ডেকে এনে জয়েন করিয়ে তারপর চার মাসের ‘সাবাটিকাল’ ছুটি দিয়েছে যাতে সে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তার রিসার্চের ব্যাখ্যা দেয়। তাতে সারা পৃথিবীর উপকার হবে।’ জামান সাহেব একটু থেমে বললেন, ‘ওর সেক্রেটারিকে আমার সব টেলিফোন নাম্বার আমি দিয়ে রেখেছি ওর আব্বার কলিগ হিসেবে। যখনই সুযোগ পাবে সে যেন আমাকে ফোন করে। তবে আপনি রাজি হলে আমি ওর সেক্রেটারিকে আপনার হয়ে হুকুম করব।’
‘না, না, না, অমন কাজটা ভুলেও করবেন না।’ কাজলের গলার স্বর বেদনা ও অভিমানে ভারি হয়ে উঠল, ‘আমার জন্য কৌশিককে তার জীবনের এই উঠতি সোপানে বাধা দেবেন না।’
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে কাজল বসে রইল, কিন্তু তার চোখের পানি টপটপ করে তার শাড়ির আঁচলে পড়তে লাগল। দিশা উঠে এসে অবাক হয়ে কাজলের দিকে তাকিয়ে রইল বড় বড় কালো দুই চোখে।
কাজল একটু পর আবার মুখ খুলল, ‘আমার জীবনের অনেক জিনিস বৃথা হয়ে গেলেও এই একটা সান্ত্বনা ও গর্ব আমার বুকের সংগোপনে রক্ষণাবেক্ষণ করেছি, সেটি হলো কৌশিক। তার উপর আমার দৃঢ় বিশ্বাস কক্ষনো টলেনি। আমার এই গর্বের সম্পদের চলার পথে কখনো আমি বাধা হতে চাই না। জামান ভাই আশাকরি আপনি আমায় বুঝতে পারবেন। এসব কথা থাক। আপনি কিন্তু বলেছিলেন যে, আজ আপনি আমার অসুখটা সম্পর্কে সবকিছু জানাবেন।’
‘হ্যাঁ ভাবি, আজকেই সব কথা বলতে পারব না। কারণ, আমি কিছু স্লাইড আর বোন ম্যারো স্যাম্পল আমেরিকায় পাঠিয়েছি। সেগুলোর রিপোর্ট পেয়ে যাবো সপ্তাহখানেকের মধ্যেই। তখনই না হয় সব কথা আলোচনা করা যাবে।’ জামান সাহেব বললেন।
‘জামান ভাই!’ কাজল এবার বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে আপনি কিছু একটা আমাকে বলতে চাইছেন না। আমার বিশেষ অনুরোধ আমার কাছে কিছু লুকাবেন না। আমি একজন ডাক্তার, সারাজীবন মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছি বাচ্চাদের জন্যে। যদি এখন নিজের জন্য লড়তে হয়, আমি প্রস্তুত।’
‘না, না, আপনার অবস্থা এমন নয় যে মৃত্যুর কথা ভাবতে হবে। তবে রোগটা ভালো না বলেই মনে হচ্ছে।’ একটুক্ষণ চুপ করে থেকে জামান সাহেব আবার বললেন, ‘এই জন্যই আমেরিকার রিপোর্টগুলো পেতে চাইছিলাম।’
‘জামান ভাই, সে-রিপোর্টগুলো তো আসবেই। তখন আমরা আবার আলোচনা করব। কিন্তু কত কঠিন কঠিন রোগে আমি আপনার প্রাথমিক রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসা দিয়েছি ও বহু রোগী ভালো হয়েছে। আমি আপনার আপাত ডায়াগনসিসটা কী তা এখনই জানতে চাই।’ কাজলের স্বর অধৈর্য।
‘আমার ধারণা ভুল হতে পারে। তবে মনে হচ্ছে আপনার রক্তশূন্যতার প্রধান কারণ ক্রনিক লিম্ফ্যাটিক লিউকিমিয়া। হঠাৎ ঘরে নিঃশব্দতা নেমে এলো। একটি আলপিন মেঝেতে পড়ে গেলেও যেন তার শব্দ পাওয়া যায়। কিছু সময় নিশ্চুপতায় কেটে যাওয়ার পর জামান সাহেব বললেন, ‘ভাবি, লিউকিমিয়া বা রক্তের ক্যানসার শুনলে যদিও খুব ভয় পাওয়ার কথা, তবু আমি একটু বলি হল ক্রনিক লিম্ফ্যাটিক লিউকিমিয়া সবচেয়ে ভালো রক্তের ক্যানসার। এতে রোগী ভোগেও না বা সহজে মারাও যায় না। আপনি তো জানেন এই রোগে আক্রান্ত রোগীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে রোগের স্টেজের ওপর। আপনাররোগ সন্দেহ করার সঙ্গে সঙ্গেই আমি দিশাকে দিয়েও আপনার শরীর পরীক্ষা করিয়েছি। কোথাও কোনো গ্ল্যান্ড ফুলে ওঠেনি। আপনার স্পিন বা লিভার একদম নরমাল। তবে অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতাটাই একমাত্র খারাপ দিক। আবার এটাও ঠিক যে, আপনি গত ছয়মাস যাবৎ খাবার-টাবার খুবই কমিয়ে দিয়েছিলেন। তার জন্যও রক্তশূন্যতা হতে পারে। দিশা আমেনার কাছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আপনার খাবারের একটা তালিকা তৈরি করেছে। আপনি প্রায় ছমাস যাবৎ যা কিছু খেয়েছেন তাতে দেখা যাচ্ছে, আপনার রক্তশূন্যতা খাবারের জন্যও হতে পারে।’
কাজল সব কথা নিশ্চুপ হলে শুনল। তারপর প্রশ্ন করল, ‘আমার যতদূর মনে আছে এই ধরনের রক্তের ক্যানসারে মানুষ প্রায় পাঁচ-সাত বছর পর্যন্ত বাঁচে।
‘আপনার ঠিকই মনে আছে। তবে আমি আপনার এই অসুখ আঁচ করবার পর ইন্টারনেটে সারা পৃথিবীর মেডিক্যাল লিটেরেচার ঘেঁটেছি। আজকাল ভালো চিকিৎসার পর এই রোগের ভবিষ্যৎ বা প্রোগনোসিস ঠিক করা যায় রোগের স্টেজের ওপর। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে আপনার রোগের স্টেজ একেবারেই প্রাথমিক। তাহলে নতুন কথা হলো এই যে, এই স্টেজের রোগীরা সাধারণত চৌদ্দ-পনেরো এমনকি বিশ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে Ñ অনেকে ওষুধ ছাড়াই। আর তাছাড়া ভালো ভালো ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে ও হচ্ছে। আমার ধারণা, আপনার এই রোগে মৃত্যুর কোনো চিন্তাই আপনাকে করতে হবে না। এখনই যেসব ওষুধ আছে তাতে আপনি বিশ বছর ভালোভাবে বেঁচে থাকবেন।’
‘কিন্তু জামান ভাই, রোগের কষ্টটা! আমি ভুগে ভুগে মরতে চাই না। জীবনের শেষের দিকটা অন্যের মুখাপেক্ষী হয়েও থাকতে চাই না। যে-মর্যাদার সঙ্গে এতদিন বেঁচে আছি, আমি সেই মর্যাদা নিয়েই চোখ বুজতে চাই।’ কাজলের স্বরে কাতরতা ও অসহায়তা ফুটে ওঠে।
‘ভাবি, আপনি লক্ষ করেননি, আমি বলেছি ভালোভাবে বেঁচে থাকার কথা। মর্যাদার ও শান্তির মৃত্যু পৃথিবীর সব মানুষেরই কাম্য। আমরা নিজেদের জন্যও তাই চাই।’ জামান সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘এই রোগের অনেকটাই তো আমি বুঝি না। কিন্তু আমাদের একজন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর নতুন কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। ছেলেটা অত্যন্ত কোয়ালিফায়েড Ñ এম আর সি পি ও এফ আর সি পি লন্ডনে করে তিন বছর আমেরিকায় ভালো কাজ করে ফিরে এসেছে। বাপ-মা কিছুতেই আমেরিকায় যাবে বা থাকবে না বলে। সে হিমাটোলজিস্ট। সে আপনার স্লাইডগুলো দেখেছে। আমার সঙ্গে সে-ও একমত। তবু তারই জোরাজুরিতে সব স্লাইড আর ব্লক আমেরিকায় পাঠিয়েছি।’
‘সেই ভদ্রলোক কি এখানেই থাকবেন শেষ পর্যন্ত?’ কাজল জানতে চাইল।
‘মনে হচ্ছে পিতামাতার একমাত্র সন্তান হিসেবে সে তার কর্তব্যপালনে বদ্ধপরিকর। তার আমেরিকান স্ত্রী ও দুটি ছেলেমেয়ে এখানে কয়েকবার এসে গেছে। আমাদের বাঙালি মেয়েদের মতো শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা বিদেশী মেয়েদের কাছে আশা করা যায় না, সেটা ছেলের বাবা আর মা খুব ভালোভাবেই জানেন। ওরা দুজনেই উচ্চশিক্ষিত, বিদেশেও বহুদিন ছিলেন। ওদের ধারণায় তাদের বউমাও ভালো আর নাতিনাতনিরা খুবই ভালো। তারা এখানেই থেকে যেতে যায়। কিন্তু ছেলেমেয়েদের স্কুলের ও লেখাপড়ার জন্য ফিরে গেছে। আবার আসবে।’
‘মনে হচ্ছে, বাবা-মায়ের ইচ্ছার জন্য বাংলাদেশ একজন ভালো বিশেষজ্ঞ পেল,’ কাজল ধীরে
ধীরে বলল।
‘ভাবি, আপনি অনুমতি দিলে ওকে আপনাকে একবার দেখাতে চাই।’ জামান সাহেব উদ্বিগ্ন হয়ে কাজলের দিকে তাকালেন।
‘না, না, আমি তো খুব ভালো আছি।’
‘হ্যাঁ, সেটা ঠিক। তবে কোন সময় কোন ওষুধ দিতে হবে, সেটা একজন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের মত ছাড়া ভুল হয়ে যেতে পাবে।’
‘আপনি কি মনে করেন আপনাদের ওই হিমাটোলজিস্ট এ-ব্যাপারে অভিজ্ঞ?’ কাজল প্রশ্ন করল।
‘আমার চাইতে ওর জ্ঞান বেশি। তবে আজকাল এইসব রোগের জন্য হিমাটো-অনকোলজিস্ট বলে একদল বিশেষজ্ঞ ইউরোপে আর আমেরিকায় খুব
নাম করেছে।’
‘জামান ভাই, যদি কোনো হিমাটো-অনকোলজিস্ট থাকে, তাহলে আমি রাজি আছি তাকে দেখাতে। তা না হলে আপনি যা করছেন আমি তাতেই সন্তুষ্ট।’
এবার দিশা এগিয়ে এলো, ‘আমার এক বান্ধবীর কাছে শুনলাম একজন বিশ্ববিখ্যাত হিমাটো-অনকোলজিস্ট আমেরিকা থেকে দিল্লিতে আসবেন দু-একদিনের মধ্যেই। চেষ্টা-তদ্বির চলছে তাকে এখানেও নিয়ে আসবার, অন্তত দু-চার দিনের জন্য। কয়েকটা সেমিনারে তিনি পোস্ট গ্রাজুয়েটদের বক্তৃতা দেবেন। ওরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই প্রথমে দিল্লিতে যাবেন তারপর বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে বক্তৃতা দেবেন। ওর স্ত্রীকে আমি একটু চিনি। আমি একটু চেষ্টা করে দেখি। বোধহয় দিল্লির এক কনফারেন্সে ওদের দেখেছিলাম।’ কথাগুলো বলে দিশা কেমন একটু অদ্ভুতভাবে হাসতে লাগল। সেটা জামান-দম্পতি লক্ষ করলেও কাজল তার বর্তমান মানসিক অবস্থায় লক্ষ করতে পারল না।
‘তা দেখো, না, চেষ্টা করতে দোষ নেই,’ দিশার আম্মা বললেন।
কাজলের মৌনসম্মতি ওরা বুঝে নিল।
আরো কিছুক্ষণ গল্প-গুজব করার পর জামান-দম্পতি দিশাকে নিয়ে বাড়ি গেলেন। একাকিত্ব আর দুর্ভাবনায় কাজল বাইরে খুব ধীরস্থির, কিন্তু অন্তরে উৎকণ্ঠা আর অসীম মনোকষ্ট। সে একবার ভাবল, তার জীবনের এই অন্তিম সময়ে জাকির আর কৌশিককে কাছে পেলে হয়তো মনটা একটু শান্ত হতো। সঙ্গে সঙ্গেই অভিমানে উদ্বেল হলো সে। মৃত্যু তো বেশি দূরে নয়। তাই যদি হয়, তাহলে এত হাঙ্গামা তার জীবনে কোনো প্রয়োজন নেই, বরং মর্যাদার সঙ্গে নিশ্চুপে সে চোখ বুজবে। সেটাতেই তার এবং সবারই কল্যাণ।
একটু পরেই সে তার চিন্তাধারা পালটালো। যদি এই অসুখের খবর পেয়ে ওরা আসে Ñ তাহলে কাজল এবার আবার আগের মতোই ওদের আঁকড়ে ধরে থাকবে। আর কখনো যেতে দেবে না। কিছুক্ষণ পর খাবার খেয়ে সে ঘুমিয়ে গেল। কিন্তু তার মনে এই কথাটাই ফিরে ফিরে গুঞ্জন করতে লাগল।
পাঁচ
আরো মাসদুয়েক কেটে গেছে। আমেরিকার বিখ্যাত হিমাটো-অনকোলজিস্ট ডাক্তার শিখ ঢাকায় এসেছেন ও কাজলের চিকিসার ভার নিয়েছেন। ভদ্রলোকের বয়স খুব বেশি নয়। বোধহয় চল্লিশের কাছাকাছি, কিন্তু চুল ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধেক পাকা। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ির মাঝেও বেশকিছু পাকা চুল দেখা যায়। অত্যন্ত ধীরস্থির। কথা খুব কম বলেন, কিন্তু কাজলকে নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আবারো রক্ত ও বোন ম্যারো নিয়ে গিয়ে নিজে জামান সাহেবের হাসপাতালে বসে সবকিছু পরীক্ষা করেছেন। তারপর আমেরিকান ইংরেজিতে অনেক কথা কাজলকে জিজ্ঞাসা করে কিছু ওষুধ দিয়েছেন। আর তার সঙ্গে অনেক ভিটামিন-মিনারাল আর মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জাতীয় ট্যাবলেট আর ক্যাপসুল আমেরিকা থেকে আনিয়ে দিয়েছেন। বারবার বলেছে যে, এই রোগে সবচেয়ে বড় ভয় হলো ইনফেকশন। সাধারণত সর্দিকাশি ব্রংকাইটিস ফ্যারানজাইটির বা গলাব্যথার বিরুদ্ধে সুস্থ মানুষের অনেক প্রতিরোধক্ষমতা থাকে। তা থেকে ওষুধ ছাড়াই রোগী ভালো হয়ে যায়। কিন্তু কাজলের রোগটা একটু অসাধারণ এবং তার শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা বা ইম্যুনিটি অত্যন্ত কম। তাতে সাধারণ সর্দিকাশি গলাব্যথাও মারাত্মক হয়ে দেখা যেতে পারে। দিশার কাছে কাজলের দৈনন্দিন খাবারের তালিকা আগের ও এখনকার দেখে এখানে ওখানে কিছু পরিবর্তন করেছেন। কাজল খুব ভালো বোধ করছে। ডাক্তার শিখ দু-একদিনের মধ্যেই দিল্লিতে ফিরে যাবেন বলে জানিয়েছেন। যাবার আগে আবার একবার কাজলকে দেখে যাবেন।
কিন্তু সেদিন সকালে কাজলের ঘুম ভাঙলো গলায় ব্যথা নিয়ে। কাজল সেটাকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে তার দৈনন্দিন নিয়মে সবকিছু করতে লাগল। বেলা এগারোটায় প্রায় দশজন পোস্ট গ্রাজুয়েটের ছাত্রছাত্রী এলো। ক্লাস নিতে নিতে হঠাৎ কাজলের গলা বসে গেল। ছাত্রছাত্রীরাই জোর করে ক্লাস বন্ধ করল। তারা জামান সাহেবকে ফোনে খবর দিল। কাজল কোনোমতে বলল যে তারা বাড়াবাড়ি করছে। সে বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।
বিকেলের দিকে আরো দুটো উপসর্গ দেখা দিল Ñ জ্বর ও কাশি। বিকেলে জ্বর আরো বেশি হলো। জামান-দম্পতি ও দিশা এসে বেশ কড়া অ্যান্টিবায়োটিক ফার্মেসি থেকে আনালেন। ইতোমধ্যে ডক্টর শিখ এসে হাজির। সবরকম পরীক্ষার পর দিশার অ্যান্টিবায়োটিক বদলে আরো কড়া ওষুধ দিল।
পরদিন অবস্থার উন্নতি না হলেও জ্বর ও কাশি একটু কমল। তবে কাজলের মাথায় ব্যথা খুব। দিশা কাজে না গিয়ে কাজলের বিছানার পাশে সর্বক্ষণ বসে। যা কিছু প্রয়োজন সে-ই করে। ওষুধ ও পথ্য খাওয়াল, স্পঞ্জ করালো। টয়লেটের ব্যবস্থা, সবই তার দায়িত্ব। ডক্টর শিখ কড়া নির্দেশ দিয়েছে। কোনো আনাড়ির হাতে এ-কাজ দেওয়া যাবে না। তাছাড়া মাথাব্যথা ও জ্বরের সঙ্গে কাজলের অরিয়েন্টেশন কমে গেছে। একটু-আধটু ভুল বকছে। অনেক সময় সব সাধারণ জিনিস বা কথাবার্তা বুঝতে পারছে না। দিশা, ডক্টর শিখ ও জামান সাহেব পরামর্শ করে একটা বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা করল। লাম্বার পাংচার বা মেরুদণ্ডের রস টেনে নিয়ে মাইক্রোসকোপ ও কালচারের পরীক্ষা। পরীক্ষাশেষে ডক্টর শিখ নিজেই ছুটল জামান সাহেবের ল্যাবে। ঘণ্টাদুয়েক পর এসে পরীক্ষার ফল সম্পর্কে আলোচনা করল এদের সবার সঙ্গে। মেরুদণ্ডের ভেতরের রসে কোনো লিউকিমিয়ার লক্ষণ পাওয়া গেল না। তবে কালচারের রিপোর্ট পেতে দুদিন সময় লাগবে। আলোচনার পর স্থির হলো, জ্বর ও কাশি যখন একটু কমেছে তখন ওষুধ বদলাবার প্রয়োজন আপাতত নেই। বরং একটু ঘুমের ওষুধ ট্রাঙ্কুলাইজার দিলে উপকার হতে পারে। ভয় একটু আছে Ñ দুর্বল শরীরে ঘুমের ওষুধের ফলে ঘুম একটু বেশি বিলম্বিত হতে পারে। তবে সবদিক পর্যালোচনা করে ডক্টর শিখ ওষুধ লিখে দিল। দিশা ড্রাইভারের সঙ্গে নিজে গেল ফার্মেসিতে, যাতে ওষুধের গুণাগুণ দেখে কিনতে পারে। বাজারে অনেক নকল ওষুধও আছে।
কাজল দুপুরের দিকে পথ্য খাবার পর ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। সে-ঘুম রাতেও ভাঙল না। দিশা আর ডক্টর শিখ পালা করে রাত জাগল রোগীর ঘরে। পাশের ঘরে ওদের জন্য শোবার ব্যবস্থা করা হলো। সে-ঘরে আরেক ভদ্রলোকেরও বিছানার ব্যবস্থা হলো। সে আমেরিকান বাঙালি, সৌম্য চেহারার, বয়স ষাটেরও বেশি। চুল সব সাদা। মনে হলো সে-ও ডাক্তার। মাঝে মাঝেই গিয়ে কাজলকে পরীক্ষা করছে। কাজল তখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
পরদিন দুপুরের দিকে কাজলের ঘুম কিছুটা ভাঙল। হাতে ইনফিউশনের নল লাগানো। সে দিশাকে প্রশ্ন করল খুবই অস্ফুট স্বরে, ‘আমার কী হয়েছে?’
ডক্টর শিখ ইশারায় দিশাকে জবাব দিতে বলল।
‘এমন কিছু নয়। বেশি জ্বরে তুমি একটু জ্ঞান হারিয়েছিলে। ওষুধ দেওয়া হয়েছে Ñ এখন অনেক ভালো। জ্বর ও কাশি কমে গেছে। তবে প্রায় দেড়দিন তোমাকে খাওয়ানো ঠিকমতো সম্ভব হয়নি বলে নল দিয়ে খাবার, ইলেকট্রোলাইট্স্ আর ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।
‘ডক্টর শিখ তার বউকে দেখতে দিল্লি যায়নি’, কাজল প্রশ্ন করল।
এবার ডক্টর শিখ এগিয়ে এলো, ‘আমাকে যেতে হয়নি। বউই এখানে। সুতরাং আপনার চিকিৎসার দায়িত্বটা খুব ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারছি।’
কাজল দিশার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি খুবই দুঃখিত ও বিব্রত। আমার জন্য ওর সব কাজকর্ম নষ্ট হচ্ছে। আমি ভালো আছি। ডক্টর শিখ তুমি তোমার স্ত্রীর কাছে যাও। দিশা তুমি থাকো আমার কাছে। তবে আমার আবার ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমবো।’
দিশা কাছে এসে বলল, ‘তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমার কাছেই থাকব। তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ো।’
কাজল আবার পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল। এবার ইশারায় ডক্টর শিখ দিশাকে ডেকে নিয়ে পাশের ঘরে গেল। ফিসফিস করে কী সব আলোচনা করল দুজনে। তারপর ডক্টর শিখ চলে গেল। দিশা রইল কাজলের কাছে। সেই বয়স্ক ডাক্তার এসে আবার কাজলকে ভালো করে পরীক্ষা করে দিশাকে বলল, ‘হার্ট লাংগস সবই এখন স্বাভাবিক। তুমি যাও বিশ্রাম করতে Ñ সে তো একটু পরেই আসবে।’
দিশা আরেকটু অপেক্ষা করল। ঘণ্টাদেড়েক পর ডক্টর শিখ এসে গেলেন Ñ সে স্নানটান করে কাপড় পালটিয়ে ফিরে এসেছে। এসেই দিশাকে তাড়া লাগাল, ‘তোমার আর এখন আসবার প্রয়োজন নেই। সবকিছু সেরে তুমি পাঁচটায় এসো। আমি তখন যাবো কালচার ডিশগুলো পরীক্ষা করতে।’
দিশা চলে গেল। কাজলের পায়ের দিকে একটি ডিভান বেডে শিখ একটুক্ষণ বিশ্রাম নিল। তিনটের দিকে উঠে সে আবারো কাজলকে পরীক্ষা করল। সব ভালো। তবে হাত-পাগুলো একটু ঠান্ডা। বাথরুমে গিয়ে গিজার গরম করে সে দুটো হটওয়াটার ব্যাগে গরম পানি ভরলো। একটা ব্যাগ হাতের কাছে ও আরেকটা ব্যাগ পায়ের কাছে দিয়ে নরম কম্বল দিয়ে কাজলকে খুব ভালো করে ঢেকে দিল। আধঘণ্টা পর আবার পরীক্ষা করে দেখল। হাতের দিকের তাপটার উন্নতি হয়েছে। তবে পায়ের দিকটা এখনো আশাতীত ভালো হয়নি। সে পাশের ঘরে গিয়ে সেই বয়স্ক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করে ফিরে এসে কাজলের পা দুটো নিজের হাতে ধীরে ধীরে ঘষতে লাগল। পাদুটো তাপ ফিরে পেতে লাগল। কিছুক্ষণ পর কাজল চোখ মেললো। প্রথমে বুঝতে পারল তার পায়ে কেউ একজন হাত বুলোচ্ছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখে সে ক্ষুব্ধ স্বরে ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করল, ‘ডক্টর শিখ তোমাকে আমার পায়ে হাত বুলিয়ে দিতে কে বলেছে? এছাড়া আমার পায়ে হাত দেবার অধিকার তো আমি কাউকে দিইনি। এ তুমি কী করছ? তোমার বউকে হোটেলে রেখে আমার জন্য এখানে এতো সময় দিয়ে তুমি খুবই গর্হিত কাজ করছ। আমি খুবই বিব্রত ও লজ্জিত বোধ করছি।’
‘এর জবাব আমি এক্ষুনি দিচ্ছি – টয়লেট থেকে ফিরে এসে।’
প্রায় মিনিট পাঁচেক পর টয়লেটের দরজা খুলল। কাজল দেখতে পেল না যে ডক্টর শিখের পরিবর্তে এক সুপুরুষ যুবক তার পাশে দাঁড়িয়ে Ñ দাড়ি-গোঁফ নেই, ক্লিন শেভ করা, কালো চুল, চোখে মমতা ঝরে পড়ছে। সে-ই কাজলের সামনে গেল বিছানার পাশ দিয়ে। তার হাতে কাঁচা-পাকা চুলের একটা পরচুলা। কাজল এখনো চোখ বুজে। সেই যুবক কাজলের বুকের কাছে আলতো করে বিছানায় বসে কাজলের মাথায় হাত দিয়ে একটু নাড়া দিল।
‘মাগো তুমি আমায় চিনতে পারলে না। আমিই তোমার কৌশিক। তুমি যা যা বলেছিলে আমি প্রায় পনেরো বছর ধরে অক্ষরে অক্ষরে তা-ই পালন করেছি। শুধু তোমার কাছে আসিনি কারণ তোমার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালনে অসুবিধা হতো। আর তাছাড়া তুমি তো বলেছিলে আব্বাকে দেখতে।’
কাজল হতবাক হয়ে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে রইল। কৌশিক আবার বলল, ‘তোমার পায়ে হাত দেবার অধিকার আমার জন্মগত।’
কাজলের চোখে আনন্দাশ্রুর বন্যা নামল। ছেলেকে কিছুক্ষণ বুকে চেপে রেখে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, ‘তুই এতো সং সেজে আমার কাছে আসবি তা কী করে বুঝব?’ একটু পর কাজল প্রশ্ন করল, ‘তোর আব্বার কথা কী যেন বললি, সে কি এখানে? আর দিশাই বা গেল কোথায়?’
কৌশিক জবাব দিল, ‘দিশাই তো তোমাকে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা সেবাযত্ন করল! আমি আর আব্বা মিলে তোমার চিকিৎসা করলাম। আমি দিশাকে পাঠিয়েছি একটু ফ্রেশ হয়ে আসতে। এক্ষুনি এসে পড়বে। আর আব্বা পাশের ঘরে একটু বিশ্রাম নিতে গিয়ে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। দিশার উপর সত্যিই খুব ধকল গেছে বেশ কয়েকটা দিন ও রাত।’
দিশা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে শেষ কথাগুলো শুনে জবাব দিল, ‘জাকির চাচা সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে।’ কৌশিককে জড়িয়ে ধরে কাজল এবার বলল, ‘দিশা তুমি এসে খুব ভালো করেছ। কৌশিক, এবার আর তোর কোনো কথা শুনব না, তুই তোর বউকে এক্ষুনি নিয়ে আয়।’
‘আমার বউ কোথায়,’ কৌশিক জবাব দিল ‘সে তো এই পরচুলা দাড়িগোঁফের বউ। দুটোই ইলিউশন। মাগো আমার হবু বউ তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।’
এবার হাত বাড়িয়ে কাজল দিশাকেও বুকে নিল। সবার চোখেই আনন্দের বন্যা।
কিছুক্ষণ পর কাজল একটু প্রকৃতিস্থ হলো। দিশা আর কৌশিককে সে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিয়ে বলল, এতক্ষণ তো তোরা অনেক খেলা দেখালি। এবার আমি তোর আব্বার ঘুম ভাঙাতে নিজে যাবো। সে বিছানায় উঠে বসার চেষ্টা করল। কিন্তু ইতোমধ্যে দরজা খুলে জাকির জিজ্ঞাসা করল, ‘কাজল, তোমার ঘুম ভেঙেছে?’
‘ঘুম ভেঙেছে ও আম্মা খুবই ভালো আছে’, কৌশিক বলল, ‘এবার তুমি এসে আম্মার কাছে বসো, আমি দিশাকে নিয়ে দেখি একটু হাই টির ব্যবস্থা করা যায় কিনা। আমার পেটে রাক্ষসের ক্ষুধা। দিশা যে খেয়ে আসেনি সেটা বোঝাই যাচ্ছে। চলো দিশা আমরা নিচতলায় গিয়ে দেখি ওরা কি বানাতে-টানাতে পারবে।’
দিশা আর কৌশিক নিচে নেমে গেল। জাকির ধীরে ধীরে কাজলের খাটে এসে বসল, ‘বাঃ বাঃ! যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে?’
‘বিশ বছরের উপর কোনো খবর নাওনি’, কাজলের চোখ টলমলে, ‘যদি এর মাঝে মরে যেতাম তাহলে কি ভয় পেতে, না আনন্দ পেতে?’
‘ছিঃ কাজল! আজ এত বছর পর আমরা তোমার কাছে এসেছি এখন আর কোনো খারাপ কথা নয়! তাছাড়া এই এতগুলো বছরের প্রতিটি সপ্তাহে একবার বা দুবার করে তোমার খোঁজ নিয়েছি টেলিফোনে। জামান একেবারেই আমার ছোট ভাইয়ের কাজ করেছে। সেই তো সবসময় তোমার খবর দিয়েছে। যাই হোক আমার সব দোষ ক্ষমা করে আমাকে তোমার কাছে আসতে দাও। সবচেয়ে বড় কাজ যেটা করতে পেরেছি সেটা তো তুমি জানোই! অবশ্য তোমার সেই শেষ চিঠিই ছিল ওর প্রেরণা। চিঠিটা প্রায় সর্বক্ষণই সে কাছে রাখত। সেটা ছিল ওর রক্ষাকবজ।
‘কিন্তু এখন?’ কাজলের গলার স্বরে সম্পূর্ণ অসহায়তা ফুটে উঠল, ‘আমার লিউকিমিয়া! কতদিন আর বাঁচব? আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো দিনগুলো মরুভূমি হয়ে গেছে! সেই মরুভূমির অনন্ত তৃষ্ণা নিয়ে এই শেষ বয়সটাতেও কিছু পাবো না, এর চেয়ে বড় অবিচার আর কিছু আছে?
‘তুমি খুবই নিরাশাবাদে ভুগছ। কাজল, তোমার যে-রোগ সেই রোগের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বিশেষজ্ঞ হলো তোমার ছেলে। ও যে কত বড় বিখ্যাত হিমাটো-অনকোলজিস্ট তাতে অনেকেই ও আমি নিজেও অবাক হই। তুমি জানো, আমিও খুব বিখ্যাত। কিন্তু এখন আমার পরিচয়ের চেয়েও বড় পরিচয় যে, আমি কৌশিকের বাবা।’
‘সে তো বুঝলাম,’ কাজল বলল, ‘কিন্তু এই রোগ তো ভালো হয় না।’
‘ভুল কথা! সম্পূর্ণ ভুল। তোমার রোগের যেটা টাইপ তাতে আগের ওষুধপত্তরে রোগী দশবারো বছর ভালোভাবে বেঁচে থাকে। কিন্তু কৌশিক যে-ওষুধ আবিষ্কার করেছে, তাতে এই রোগের সবচেয়ে খারাপ টাইপও ভালো হয়ে যায়। তোমার টাইপটা একটা দুটো কোর্সেই সম্পূর্ণ নিরাময় হয়ে যাবে।
দুজনেই কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল।
জাকির এবার আবার বলল, ‘কাজল! তুমি জানো তোমার-আমার দুজনেরই অনেক কষ্ট, যাতনা ও ঘুমবিহীন রাত আজ অতীত হয়ে গেছে। মরণের ভয় সবারই আছে। তবে তোমাকে অকালমৃত্যু বরণ করতে হবে না। তোমার ছেলে আর আমি কাজের মাঝে ডুবে থাকি। কখনো যমদূত কাছে এলেও তাকে তাড়াই। বলি এখন এসো না! হাতে অনেক কাজ। মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করছি। আজ যদি যমদূত তোমাকে নিতে আসে আমি প্রাণ দিয়ে হলেও তোমাকে ছিনিয়ে আনব। তোমাকে যেতে দেবো না। তবে এখন আর কথা নয়। আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। কাজল সোনা লক্ষ্মীটি! আমায় ক্ষমা করো। তোমার কাছে শুধু এই ভিক্ষা আমার! তুমি এখন একটু বিশ্রাম নাও। তুমি বিদায় না নিয়ে বিদায় হয়েছিলে। আমরা সেই বিদায় শেষ করে তোমার কাছে এসেছি। এখন একটু বিশ্রাম নাও।’ কাজলের মাথায় ধীরে ধীরে হাত বোলাতে লাগল জাকির। কাজল চোখ বুজে ভাবল, সত্যিই বোধহয় সেই বিদায়ের পালা এতদিন পর শেষ হলো। সে চোখ বুজে জাকিরের আদর নিতে নিতে ভাবল, অন্তত জাকিরকে সে আর যেতে দেবে না।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.