পঞ্চাশ হাজার টাকা

ঈদের দিন ভোরবেলা, শিশুরা যখন স্বভাবতই ভাবনাহীন কোলাহল ও আনন্দে মুখর, রান্নাঘরের চৌহদ্দি ঘিরে গৃহিণীদের দুনিয়ার ব্যস্ততা আর গৃহকর্তারা ব্যস্ত ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতিতে, তখনই মুনশি পাড়ার দিক থেকে, ইনিয়ে-বিনিয়ে মেয়েলি কণ্ঠে চিকন সুরে কান্নার শব্দ সবাইকে সচকিত করে, তাদের মনে পড়ে বছর দুয়েক আগে এমনই এক ঈদের দিন ভোরবেলা তেলী পাড়ায় গুজা বুড়ির নাতনি রাহেলা খালি পেটে কাঁচা মুলা আর হিদলের ভর্তা দিয়ে পান্তা ভাত মেখে খেয়ে কী রকম পেটব্যথায় ছটফট করতে করতে আর অনবরত বমি করতে করতে সবার চোখের সামনে তার চিকন চিকন হাত-পা সোজা করে মরে গিয়েছিল, আর গুজা বুড়ি তখন এইভাবেই ইনিয়ে-বিনিয়ে মেয়েলি কণ্ঠে চিকন সুরে কেঁদে সারা গ্রামের লোকজনের আনন্দময় ঈদ-উদ্যাপনকে বিষণ্ন আর অপরাধী করে তুলেছিল।

‘এই বেইন্না বেলা কেডা আবার মরলো?’

গৃহিণীরা বাজারের মুদি দোকান থেকে কিনে আনা লাল-হলুদ-কমলা রঙের লাচ্ছা সেমাই রেঁধে, তার নোনতা মিষ্টি স্বাদ চাখতে চাখতে বিরক্তিতে ভ্রƒ কুঁচকায়। পুরুষেরা তাড়াতাড়ি গোসল সেরে তুলার মধ্যে একটুখানি আতর ঢেলে কানে গুঁজে দিতে দিতে, ‘দেখি কার কী সর্বনাশ হইলো’ ভেবে নিয়ে তাড়াতাড়ি মুনশি পাড়ার দিকে পা বাড়ায়।

মুনশি পাড়ার শেষ মাথায় বড় পুকুরটা হাতের বাঁয়ে রেখে এগুলে যে-টিনের ঘরটা দেখা যায় তার সামনের খড়কুটো আর শুকনো পাতা পড়ে ময়লা হয়ে থাকা উঠোনে মোহর শেখের বউ তখন চিৎকার করে কাঁদছিল কখনো বুক চাপড়ে, কখনো উপুড় হয়ে মাটি চাপড়ে, ‘আল্লাগো, কী সর্বনাশ হইলো গো, আমার পুতের কী হইবো গো’ Ñ এ-রকম একটি বাক্যই বিভিন্ন সুরে বারবার বলতে বলতে, মোহর শেখ দাওয়ায় বসে ছিল ঝিম ধরে, মাথা নিচু করে, একেকবার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে, ‘ওই মাগী, চুপ করবি!’ বলে ধমকে উঠে আবার আধমরা লাউ গাছের মতো যেন নেতিয়ে পড়ছিল সে, আর বারান্দার বিপরীতে টিনের ঘরের ভেতরে যে-চৌকিতে নিথর হয়ে পড়ে ছিল মনজিলা, সেই চৌকির পায়ের কাছে যেখানে দুটো ইট দিয়ে চৌকির নড়বড়ে পায়াটা ঠেকা দিয়ে রাখা হয়েছিল, সেখানে বসে ছিল মোহর শেখের বড়ছেলে লোকমান শেখ। মাঝে মাঝে গোঙানির মতো ভয়ার্ত একটা শব্দ করে যেন নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল সে। ততক্ষণে একজন-দুজন করে গ্রামের অসংখ্য কৌতূহলী নারী-পুরুষ-শিশু মিলে মোহর শেখের ছোট বাড়িখানা মোটামুটি ভরে ফেলেছে, তাদের অনুসন্ধানে এসব কান্নার প্রাথমিক যে-কারণটি উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে, তা হলো আজ রাতের কোনো এক সময়ে কিংবা ভোরবেলায় এই বাড়িতে মনজিলা নামের একজন মারা গেছে।

মনজিলা কে?

মনজিলা লোকমানের বউ, মোহর শেখের পুত্রবধূ আর মাইজপাড়ার নূরুদ্দীনের ছয় মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় মেয়ে। কীভাবে মারা গেছে সে?

 লোকমানের মা, মানে মনজিলার শাশুড়ির ভাষ্য-অনুযায়ী, এমনিতে তো মনজিলা সুস্থই ছিল, রাতে ভাত খেয়েছে, তারপর শোয়া থেকে উঠে দুইবার মাত্র বমি করেছে, বারকয়েক বলেছে যে তার শরীর খুব খারাপ লাগছে, তো মনজিলার শাশুড়ি সেই সময় ভেবেছে বউয়ের হয়তো বাচ্চা হবে, আর সেজন্যই এই বমি, এই খারাপ লাগা…, সে তাই এসবে অতো পাত্তা দেয়নি, পাত্তা দেওয়ারই বা কী আছে, এমন তো হয়েই থাকে সব বউদের, তা নিয়ে কেউ কি অত মাথা ঘামায় নাকি? আহা, তখন কি আর সে জানত অমন তরতাজা বউটা রাতশেষে সকালেই একটা শক্ত লাশ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকবে?

‘কী কও, খালি বমি করছে? আর কিছুই হয় নাই? এমনে এমনেই বুঝি মানুষ মারা যায়? এইটা একটা বিশ্বাসের কথা?’ গাঁয়ের লোকজনের সন্দেহ কাটে না।

‘ঠিক কইরা কও, আর কিছু হইছিল নাকি?… ভাতের সাথে মিশায়া বিষ-টিষ খাওয়াও নাই তো?… নাকি মাইর-ধোর করছিলা?’

‘তওবা, তওবা, হাজার হোক নিজের পুত্রবধূ, তাকে খামাকা বিষ খাওয়াতে যাবে কে?’

‘ছি, ছি, ছি Ñ কী যে সব কও না তোমরা! ওর সাথে কি কারো কোনো বিবাদ আছে, নাকি ছিল? আর থাকলোই বা, একসাথে থাকতে গেলে পাতিলে পাতিলে পর্যন্ত ঠোকাঠুকি লাগে, আর এ-তো রক্ত-মাংসের মানুষ, কাইজ্যা ঝগড়া থাকলেই কি কাউকে বিষ খাইয়ে মারতে হবে? পরকাল বলে কি কিছু নেই? আর, মানুষে না দেখুক আল্লাতালা তো দেখে, সেই অদৃশ্য মালিকের চোখকে ফাঁকি দেবো কীভাবে, বলো?’

‘তবে হ্যাঁ, মারধোরের কথা যদি বলো তো বলি, কালকে সন্ধ্যার দিকে একবার মনে হয় শুনেছিলাম, লোকমানের সঙ্গে কি নিয়ে যেন খুব কথা কাটাকাটি হচ্ছিল বউয়ের, তো, এমন কথা কাটাকাটি তো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হরহামেশা হয়েই থাকে, আর মেয়েমানুষের বকবকানি সহ্যের বাইরে চলে গেলে পুরুষ-মানুষ এক-আধটা চড়-থাপ্পড় দেবে, এ-আর নতুন কী বলো, হবে হয়তো বউয়ের কথার ঝাঁজ সহ্য করতে না পেরে লোকমান একটা চড় মেরে থাকলেও থাকতে পারে, হ্যাঁ, সামান্য একটা চড় শুধু, একটাই চড়, আমি শুধু একবারই শব্দ শুনেছিলাম, তারপর তো বউ কথা থামালো, উঠে ভাত খেলো, তারপর বারকয়েক বমিও করলো,…’

‘ও, তোমার ছেলে তাইলে পিটায়াই বউরে মারছে।’

‘না, না, বিশ্বাস করো তোমরা, পিটায় নাই, একটা খালি থাপ্পড়, তাও দিছিলো সন্ধ্যাবেলা, এরপর বউ ভাত খাইছে, দুয়েকবার বমি করছে।’

‘ওই হইছে, মনে হয় কান পাট্টার মধ্যে থাপ্পড়টা পড়ছে, নাইলে মারছে কোনো বেকায়দা জায়গায়, মাথার রগ-টগ ছিঁড়া গেছে, আর তাতেই মনজিলা মরছে।’

গ্রামের মানুষের অনুমান করে নিতে দেরি হয় না।

ততক্ষণে পাশের গ্রামের মনজিলার বাপের বাড়িতে গ্রামের অতি উৎসাহী স্বেচ্ছাসেবক দল নিজ দায়িত্বে এই মৃত্যু অথবা অপমৃত্যুর খবর পৌঁছে দিয়েছে। মনজিলার নির্মাণশ্রমিক বাপ নূরুদ্দীন, যে কি-না এই ঈদের দিনেও ঢাকা শহরে বহুতল ভবন-নির্মাণের কাজে চুক্তিবদ্ধ থাকায় বাড়ি আসতে পারেনি, তাকে বাদ দিয়েই মনজিলার মা আর তার চার আবিয়াতো বোন গ্রাম তোলপাড় করে কাঁদতে কাঁদতে চলে এসেছে মোহর শেখের বাড়ি। তারা এখন মোহর শেখের ঝাড়ুবিহীন উঠানেই গড়াগড়ি করে বিলাপ করছে। গ্রামবাসীর চোখে এও এক দেখার মতো দৃশ্য তৈরি হয়েছে।

এদিকে ঈদের জামাত শুরু করার জন্য গ্রামবাসীদের ঈদগাহ মাঠে আসতে দেরি হওয়ায় মৌলবি সাহেব ঘনঘন মাইকে আহ্বান জানাচ্ছেন, ‘ভাইসব দয়া করে মাঠে আসেন, আপনেদের জন্য আর মাত্র পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করা হবে…’

মোহর শেখ সমবেত গ্রামবাসীকে উদ্দেশ্য করে ঈদের মাঠেই মেয়েটার যাতে জানাজা হয়ে যায় সেই ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানালে, কেউই যখন সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে গুঞ্জন তোলে, তখন হঠাৎ করেই জনতার জটলার পেছন দিক থেকে সোয়াব আলী মেম্বারের গলা শোনা যায়, তার কণ্ঠে স্পষ্ট তিরস্কার, ‘একটা বুঝের মানুষ হইয়া এই অনুরোধ তুমি কেমনে করো, মোহর শেখ? এই মৃত্যু যদি স্বাভাবিক মৃত্যু হইতো, তাইলে না এক কথা, এইটা হইলো অপমৃত্যুর কেইস, থানা-পুলিশ না জানাইয়া তুমি লাশ দাফনের কথা কইলা কেমনে?… তাছাড়া মেয়ের বাপ এখনো বাড়িতে আসে নাই, মরা মেয়েটার মুখ দেখে নাই… না, না, এখন জানাজা হইতেই পারে না… এই তোমরা      ওর বাপরে খবর পাঠাও, আমিও সময়মতো থানায় জানাবো, এখন চলেন সবাই, চলেন, ঈদগায় চলেন।’ উচ্চকণ্ঠে এই কথা বলে সে লোকজনকে প্রায় তাড়িয়ে নামাজের মাঠের দিকে নিয়ে চললে মোহর শেখ কিছুক্ষণ অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থেকে আবারো ধপ করে দাওয়ার উপর বসে পড়ে।

ঘরের ভেতর থেকে লোকমান আহত পশুর মতো আবার গুঙিয়ে উঠলে মোহর শেখ হঠাৎ রেগে যায়, ‘হারামজাদা, কান্দোস? বউ খুন কইরা এহন কান্দোস, শুওরের বাচ্চা? তোর লাইগ্যা আইজ আমি এতো বড় একটা বেইজ্জতি,… এতবড় একটা সর্বনাশের মধ্যে পড়লাম, আরে বলদ, এইবার তো সোয়াব আলী মেম্বার আমরার চৌদ্দ গুষ্টিরে জেলের ভাত খাওয়াইবো… জেলের ভাত মানে বুঝছোসনি?… হায় হায়রে, আমার সংসারটা ছাড়খার হইয়া যাইবো, এক্কেরে শেষ হইয়া যাইবো…।’

মোহর শেখ কপাল চাপড়ে প্রায় কেঁদে ফেলে। লোকমানও কাঁদে, কাঁদতে কাঁদতে তার মনে হয়, শুধু তারা বাপ-বেটাই না, আরো কেউ কাঁদছে, নিচুস্বরে, মেয়েলি গলায়, উ-উ করে, নাহ্, মা তো এরকম করে কাঁদে না, অন্য কেউ, অন্য কেউ কাঁদছে, লোকমান চারপাশে তাকায়, ঘরটা এখন খালি, এতক্ষণ যে-মেয়েটা মনজিলার মাথার কাছে বসে গুনগুন করে কোরান শরিফ পড়ছিল, সেও কখন যেন উঠে চলে গেছে, তবে কাঁদে কে? মনজিলার বোন? লোকমান আবার এদিক-ওদিক তাকায়, সাদা একটা চাদরে সারা শরীর নাক-মুখ ঢেকে লম্বা আর সোজা হয়ে শুয়ে আছে মনজিলা। তবে কি মনজিলা কাঁদে?

‘ও মনজিলা, তুমি কি কান্দো নাকি?’

‘আমি কেমনে কানবো? আমি তো মরা, কান্দে আমার আত্মা।’

‘ও মনজিলার আত্মা, আপনে কান্দেন কেন?’

‘কান্দি দুঃখে, …অসময়ে দুনিয়া ছাড়ার দুঃখে কান্দি গো শেখের ব্যাটা, কতো শখ-আহ্লাদ ছিল তার একটাও মিটাইতে পারলাম না বইলা কান্দি।’

মনজিলার আত্মার কথা শুনে লোকমান আবার হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলে প্রতিবেশীদের মধ্যে বন্ধুস্থানীয় কেউ একজন এসে তাকে ধরে বাড়ির বাইরে পুকুরের পারে নিয়ে যায়। লোকমান একটু থেমে নাক ঝাড়ে। দুই হাতে চোখের পানি মোছার চেষ্টা করতে থাকে। বন্ধুস্থানীয়র কণ্ঠে এবার বিরক্তি আর শ্লেষ ঝরে পড়ে। ‘নিজের হাতে মুড়ায়া বউরে মারছোস, আবার সেই বউয়ের লাইগা কান্দোস! আজব জমানা।’ ‘জমানা তো আজবই, নাইলে এক চৌকিতে, এক বিছানায়, এক সাথে লাগালাগি কইরা ঘুমায়াও মনজিলা কখন, কোন সময় মরলো, তা একটুও টের পাইলাম না আমি?’

 লোকমান মনে মনে ভাবে, কদিন ধরে মনজিলা বড় ঘ্যানঘ্যান করছিল একটা সোনার কানপাশার জন্য, আরেকটা সার্বক্ষণিক ঘ্যানঘ্যানানি ছিল ওর আলাদা হওয়ার, আলাদা একটা ঘর, আলাদা একটা সংসারের স্বপ্ন মনজিলার বহু দিনের, সেই সংসারে সে কী কী কিনবে, কেমন করে সাজাবে বাড়িঘর, সব ঠিক করে ফেলেছিল সে… কী যে স্বপ্নপাগল ছিল না বউটা, লোকমানের বুক ঠেলে আবার কান্না বেরিয়ে আসে, ‘কান্দোস কি মরা বউয়ের লাইগা? নাকি পুলিশ যে এখন কোমরে দড়ি দিয়া শ্বশুরবাড়ি নিয়া যাইবো, সেইটা মনে কইরা? আরে, সোয়াব আলী মেম্বার তরারে সহজে ছাড়বোনি? অতদিন পরে একটা বেকায়দা অবস্থায় তরারে পাইছে!’

বন্ধুস্থানীয় একা একাই কথা বলতে থাকে, ‘আইচ্ছা লোকমান, সত্য সত্যই তুই বউরে পিটায়া মারছোসনি ক’তো? বউয়ের লগে তো শুনছি তর মিলমিশ ভালোই ছিল, কী রে, বেশি পিটাইছিলি?’

 বেশি আর কম কী? লোকমান বোঝে না, বউ ঠিক রাখতে হইলে একটু-আধটু মাইর-পিট তো করোনই লাগে। আরে, স্বামী পিটাইলে বউরা আবার মরে নাকি? তাইলে তো আমার মায়ের এতদিনে শ-খানেক বার মরার কথা, কতবার, ক-ত-বা-র আব্বার হাতে মাইর খাইছে আমার মা, আব্বা যখন যেইটা হাতের কাছে পাইছে, লাকড়ি, গরু পিটানির লাঠি, গাছের ডাল, কঞ্চি Ñ কোনটা দিয়া তারে পিটাইতে বাদ রাখছে? আর আমি তো কইতে গেলে মনজিলারে মারিই নাই, খুব বেশি রাগ উঠলে একটা-দুইটা ধমক, আর মাথা গরম হইয়া গেলে মাঝে মইধ্যে দুয়েকটা চড়, থাপ্পড় Ñ এইটা আর এমন কী বেশি?

লোকমান আবার নাকের সর্দি ঝাড়ে। পুকুরপারে ততক্ষণে তাকে ঘিরে ছেলে-বুড়োর একটা জটলা তৈরি হয়ে গেছে। তারা বেশ আগ্রহ নিয়ে লোকমানের কান্না, তার নাক ঝাড়া, তার দুঃখী চেহারা পর্যবেক্ষণ করছে।

ঘরের ভেতর মনজিলার মৃতদেহ ঘিরে জটলা তৈরি করেছে গ্রামের কিশোরী ও মহিলারা। একজন এসে ওর মুখের চাদরটা সরিয়ে দিয়ে গেছে। মনজিলার প্রাণহীন, দুর্বল, ফ্যাকাশে মুখটা দেখা যাচ্ছে এখন। চারদিক থেকে শোনা যাচ্ছে টুকরা টুকরা মন্তব্য, টুকরা টুকরা স্মৃতিচারণ।

‘গত পরশুই তো পুকুরপারে বু’জানের সঙ্গে দেখা হইল, দুলালের মার পিন্দনের কাপড় সইরা গেছে দেইখ্যা কি তার হাসি!’

‘শাশুড়ি ননদি কূটনামি করত গো, বহু জ্বালা দিত, কতদিন মনজিলা চুপে-চাপে চোক্ষের পানি ফালাইছে।’

‘সবাই মিল্যা মারছে… নাইলে এক থাপ্পড়ে মানুষ মরেনি?’

‘আরে, বেকায়দায় মারলে মরে, মনডায় কয়, বেশেবা মারছে, থাপ্পড়ের চুটে মাথার ভিতরে রগ-রুগ ছিঁড়া গেছে।’

মনজিলার আত্মা এসব শুনতে শুনতে বাইরে যায়, মোহর শেখ বসে আছে দিশেহারার মতো, নাহ্ শ্বশুরকে বড় মান্যিগণ্যি করে মনজিলা, শ্বশুরও কখনো কিছু নিয়ে ঝামেলা করেনি তার সঙ্গে। মনজিলার আত্মা মোহর শেখের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়, বেঁচে থাকতে কখনো শ্বশুরের এতো কাছে যায়নি সে। মোহর শেখ তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর কী মনে করে ঘাড়ের গামছাটা একবার ঝাড়া দিয়ে আবার কাঁধের ওপর ফেলে হনহন করে হাঁটা দেয় মোবারক চেয়ারম্যানের বাড়ির দিকে। চেয়ারম্যানের উঠোনে তখন চাটি পেতে কোরবানির গরু কাটা হচ্ছে। গরুর মাংসের ¯তূপগুলোকে মনে হচ্ছে লাল মাংসের ছোট ছোট পাহাড়, চেয়ারম্যান সেই পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আনমনা ভঙ্গিতে কথা বলে, ‘শুনছি আমি…পুরা ঘটনাই শুনছি… তো আমি কী করতে পারি, কও… বউরে পিটায়া মারছো, এইবার বাপ-বেটা গিয়া জেল খাটো, দেশের আইন এখন বড় কড়া, বাঁচনের উপায় নাই।’

‘আপনে একটা কিছু করেন, সোয়াব আলী এমনেই আমরারে দেখতে পারে না, অখন তো হে তাল দিতাছে বেশি, আপনে একটা বিহিত কইরা দেন, থানা-পুলিশ না কইরা কেমনে ঘটনাটা সামাল দেওয়া যায় একটু দেখেন’, মোহর শেখ অনুনয় করে।

 চেয়ারম্যান তার অনুনয়ে পাত্তা না দিয়ে, ‘কিরে, কয় মণ মাংস হইছে?’ ‘এই, শিনার হাড্ডি অতো ছোট করিস না’, ‘ওই করিম, বেয়াই বাড়িতে বড় রানটা পাঠায়া দে’ Ñ ইত্যাদি বিবিধ সংলাপে ব্যস্ত থাকলেও ফাঁকে ফাঁকে মোহর শেখের অনুনয়-বিনুনয় চলতেই থাকে। মাংসের বিলিব্যবস্থাশেষে চেয়ারম্যানের যেন একটু ফুরসৎ হয় মোহর শেখের দিকে মনোযোগ দেওয়ার। ‘আইচ্ছা যাও, বউয়ের বাপ তোমার বেয়াই বাড়িত আসলে রাইতের বেলা আমার এইখানে একটা সালিশ বসাবোনে, যদি সে তোমারে ক্ষমা দেয়, যদি সে থানা-পুলিশ করতে না চায়, আপোসে মীমাংসা করে, তাইলে আর কার বাপের কী বলার আছে?’

মনজিলার বাপ নূরুদ্দীন বাড়ি ফিরল ঈদের দিনশেষে সন্ধ্যাবেলা। মৃত মেয়ের জন্য সারাটা পথ সে কাঁদতে কাঁদতে এসেছে। মনজিলা যে একবার বাজারে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল, আর অনেকক্ষণ পর তাকে খুঁজে পেয়ে রাগে-উত্তেজনায় বেশকিছু শক্ত কিল-চড় বসিয়ে দিয়েছিল তার বাবা, সে-কথাটাই বারবার ঘুরে-ফিরে মনে পড়ছিল নূরুদ্দীনের, মনজিলার যুবতী বয়সের না, শিশুকালের সেই কান্নাভেজা অভিমানী মুখটাই চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল তার, আহারে, মেয়েটা আমার, মাইর খাইয়াই মরলো…

নূরুদ্দীন নিজের বাড়ি যাওয়ার আগেই সরাসরি এসে উঠেছিল মোহর শেখের বাড়ি, হারিকেনের মৃদু আলোয় মেয়ের মরা মুখটা দেখে সে যেন হঠাৎ করে চিনতে পারছিল না, এই মৃতা যুবতীই তার হাতে মার খাওয়া সেই ছোট্ট মেয়েটা কিনা? নূরুদ্দীন অনেকটা যেন দিশেহারা হয়েই উঠানে নেমে এলে, কেউ একজন একটা মোড়া এগিয়ে দিলে সে বসে।

‘মাইয়াডার দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করা লাগে’, মুরুব্বিস্থানীয় কেউ একজন মৃদু কণ্ঠে বলে।

‘হ, বেশিক্ষণ মাটির উপরে রাখলে মুরদার কষ্ট হয়’, অন্য কেউ সমর্থন করে। মোহর শেখ এতক্ষণ উঠোনের এককোনায় সন্ধ্যার অন্ধকারে আমগাছের আরো অন্ধকার ছায়ার নিচে মাথা চেপে ধরে চুপচাপ বসেছিল। এবার সে ধীরপায়ে নূরুদ্দীনের সামনে, যেখানে চাঁদের আলোতে যে কারো চেহারা অস্পষ্ট বোঝা যায়, সেখানে উঠে আসে, অপরাধীর মতো নিচু কণ্ঠে বলে, ‘যা হওনের তা তো হইছেই, বেয়াই এখন আপনে এজাজত দিলে দাফনের ব্যবস্থাটা করতে পারি’, নূরুদ্দীন প্রচুর কান্নাকাটি করলেও এতক্ষণ শান্তই ছিল, মোহর শেখের কথায় হঠাৎ তার মধ্যে কেমন যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটে যায়, তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে সে একদম হিংস্র বাঘের মতো আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে মোহর শেখের ওপর, তারপর সমস্ত শক্তি দিয়ে দুই হাতে মোহর শেখের চোখে মুখে নাকে সমানে পাগলের মতো কিল ঘুষি চড় মারতে শুরু করে সে, সেইসঙ্গে শোনা যায় তার কান্নামিশ্রিত চিৎকার, ‘বেয়াই মারাইতে আইছস, শুওরের বাচ্চা,… আমার ঝিরে বাপে-পুতে মিল্যা খুন কইরা অহন দাফনের কথা কছ… যেমনে আমার মনজিলা মরছে, তেমনে তোরারে মারুম আমি, একটারেও ছাড়তাম না, একটারেও না… মাইরা ফালামু, মাইরা শেষ কইরা ফালামু।’

আশেপাশের দুতিনজন মিলে নূরুদ্দীনকে সে-সময় চেপে না ধরলে আর কোনোরকমে মোহর শেখকে সরিয়ে না নিলে শেষ পর্যন্ত যে কী হতো কে জানে! নির্মাণশ্রমিক নূরুদ্দীন সেই সময় প্রচণ্ড হাঁপাচ্ছিল আর আহত মোহর শেখ তার ব্যথিত রক্তাক্ত শরীর ও মন নিয়ে যেন লজ্জায়-অপমানে, যেন কষ্টে-ঘৃণায় উঠোনের কোনায় অন্ধকারের সঙ্গে মিশে অন্ধকারে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছিল।

এই ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টা পর রাত এগারোটার দিকে মোবারক চেয়ারম্যানের বাংলাঘরে পল্লীবিদ্যুতের চল্লিশ পাওয়ার বাল্বের আলোর নিচে মনজিলার মৃত্যু ও বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে সালিশ বসলে, চেয়ারম্যান একটা পুরনো কাঠের চেয়ারের হাতলে শরীরের ভর রেখে সামান্য কাত হয়ে সালিশের ভূমিকা দিতে শুরু করে, ‘ঘটনা যেটা ঘটছে সেটা যে গুরুতর অন্যায় সে-বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ নাই, মোহর শেখের পুত্র লোকমান শেখ যে কাজ করছে তা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এর একটা উপযুক্ত বিচার হওয়া উচিত। গ্রামের দশজন ময়মুরুব্বি এইখানে উপস্থিত আছেন, কী কন আপনেরা?

তবে হ্যাঁ, সেই বিচার যে থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাচারিতেই হইতে হবে এমন কোনো কথা নাই। পুলিশ একটা মহিলা মানুষের লাশ নিয়া বেপরদা কইরা কাটবো, ছিঁড়বো, ঘুস চাইবো, ঘুস খাইবো, তারপরে ইচ্ছা-খুশিমতো একটা চার্জশিট দিব, কোর্টে যাইবেন, বছরের পর বছর কেইস জায়গা ছাইড়া লড়তো না, উকিলরে টাকা খাওয়াইতে খাওয়াইতে দুই পার্টিই ফতুর, তারপরেও ন্যায়বিচার পাওয়া যাইব কিনা সন্দেহ। গ্রামের দশজন সর্দার মাতবর এইখানে উপস্থিত আছেন, কী কন আপনেরা?

এখন যে মানুষ গেছে যত কিছুই করেন তাকে কি আর ফিরা পাওন যাইবো? যাইবো না। হ, কী জানি নাম মেয়েটার? হ্যাঁ? মনজিলা, মনজিলা আর জীবিত হবে না, আর এই দুনিয়াদারীতে ফিরা আসবে না, যার জিনিস তিনি তাকে নিয়া গেছেন, লোকমান তো উছিলা, আয়ু শেষ হয়ে গেলে কেউ কি আর পৃথিবীতে থাকতে পারে, বলেন আপনেরা?’

সোয়াব আলী মেম্বার এতক্ষণ বসে বসে দাঁত থেকে খুঁচিয়ে কোরবানির গরুর মাংসের অংশবিশেষ বের করছিল। এবার সে দাঁড়িয়ে বলে, ‘এই কোনো কথা না, গ্রামে একটা খুন হইছে, সেই খুনের বিচার দেশের যা আইন সেই আইন-মোতাবেকই করতে হইবো।

মোবারক চেয়ারম্যান হাত উঁচু করে তাকে থামায়, ‘তুমি ঠিকই বলছ মেম্বার, যদি এই সালিশে কোনো মীমাংসা আমরা না করতে পারি, তাইলে তো দেশের যা আইন, সেই আইনমতোই চলতে হবে, তার আগে আমরা দশজন মিল্যা বসছি যখন, তখন দেখি কোনো সমাধানে যাইতে পারি কিনা? কী বলেন আপনেরা? আমাদের দাদা-পরদাদাদের আমলে কোনোদিন থানা-পুলিশ লাগছে? লাগে নাই, আমরা নিজেরা ঠিক থাকলে এখনো লাগবো না, কী বলেন ভাইসাবেরা?’

গ্রামের সালিশ বৈঠকগুলো সাধারণত দীর্ঘ হয়, সর্দার মাতবররা নানা কথা বলে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, এই বৈঠকেও তাই হয়।

‘ও নূরুদ্দীন, তোমার মেয়ে তো শুনছি অসুইখ্যা ছিল, আইজ পেটব্যথা, কাইল মাথাব্যথা, ব্যারামের শেষ নাই, এখন হে কি লোকমানের থাপ্পড়ে মরলো, না কোনো রোগে মরলো কে জানে?’

‘আরে লোকমানের যদি এখন ফাঁসিও হয়, তাইলেও কি তোমার ঝিরে আর ফিরা পাইবা?’

 ইত্যাদি নানা প্রশ্নে-উত্তরে এই বৈঠকটাও চললো প্রায় ভোররাত পর্যন্ত, যুক্তি-তর্ক দুই পক্ষের বক্তব্য ইত্যাদি শোনার পর শেষ রায়টা দিলেন চেয়ারম্যান সাহেব।

‘জানের বদলা জান তো আর মোহর শেখ দিতে পারবো না, জানের কোনো ক্ষতিপূরণও নাই, কিন্তু তবু আমরা দশজনে মিল্যা বিবেচনা করি যে মোহর শেখের টাকার অঙ্কে একটা ক্ষতিপূরণ দেওয়া দরকার, এইবার তুমি কও নূরুদ্দীন, কত টাকা ক্ষতিপূরণ পাইলে তুমি দাবি ছাড়বা, গ্রামের পাঁচজনের সামনে স্পষ্ট কইরা কও’, চেয়ারম্যানের কথা শুনে নূরুদ্দীন হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলে, গ্রামবাসী নিজেরাই আলাপ-আলোচনা করে ক্ষতিপূরণের একটা অংশ ঠিক করে।

‘ঠিক আছে, মোহর শেখ, গ্রামের দশজনের সামনে শপথ কইরা তুমি মুচলেকা দেও যে মনজিলার জানের ক্ষতিপূরণ বাবদ তার পিতা নূরুদ্দীনকে আগামী তিন মাসের মধ্যে তুমি পঞ্চাশ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত আছো, এক্ষেত্রে চেয়ারম্যান সাহেব আর সোয়াব আলী মেম্বার সাক্ষী হিসেবে থাকবেন।’

মোহর শেখ নিঃশব্দে মাথা নিচু করে আর নূরুদ্দীন লুঙ্গির কোনা দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে এই রায় মেনে নিলে সালিশ বৈঠক শেষ হয়ে যায়।

সালিশের লোকজনদের পিছু পিছু আসতে থাকে মনজিলার আত্মা।

‘পঞ্চাশ হাজার টাকা একসঙ্গে করলে কেমন দেখায়?… কয়টা কানপাশা কেনা যাবে পঞ্চাশ হাজার টাকায়? পঞ্চাশ হাজার টাকা থাকলে কি আলাদা একটা সংসার করা যায়? পঞ্চাশ হাজার টাকায় কি আমার চারটা বোনের বিয়া হবে? পঞ্চাশ হাজার টাকা    দিয়া শেখের বেটা লোকমান কি আরেকটা মনজিলা ফেরত পাবে? পঞ্চাশ হাজার টাকা মানে আসলে কত টাকা?’

এইসব নানা কিছু ভাবতে ভাবতে মনজিলার আত্মা সবুজ হয়ে যায়। সে মোহর শেখের উঠোনের কোণে তার নিজের হাতে লাগানো লাউ গাছের কচি পাতার সঙ্গে মিশে অদৃশ্য হয়ে থাকে। ঘরের ভেতর তখন মোহর শেখ তার দাদার আমলের পুরনো কাঠের সিন্দুক খুলে জমির দলিলপত্র নিয়ে বসেছে, আর আপনমনেই গজগজ করে যাচ্ছে, ‘এইটারেই কয় কপাল, সারা জীবন জমি বেচি নাই, এখন বুড়া বয়সে পুতের লাইগ্যা আমার জমি বেচনের ধান্দা করা লাগে।’

 লোকমানের মা তখন একটু দূরে দরজার কপাটের আঁড়ালে দাঁড়িয়ে স্বামীর দিকে না তাকিয়ে নিচুস্বরে বলে, ‘জমি জিরাত কিয়ের লাইগ্যা? যুদি বিপদে-আপদে কামে নাই লাগলো।’

জমি-বিক্রির চিন্তায় মোহর শেখের মেজাজ এমনিতেই চড়ে ছিল, স্ত্রীর কথা শুনে তা সপ্তমে চড়লো, ‘আরে হারামজাদি, এইডারেনি কয় বিপদ-আপদ?… এইডা তো তোর পুতের বেয়াকুবি কামের জরিমানা, আইজকা ধরতো পুলিশে, বাইন্ধা নিতো, তাইলে বুঝতো।’

‘হেরে বাইন্ধা নিলে কি আফনেরে ছাড়তো? আপনেরে শুদ্ধা বাইন্ধা নিতো।’

‘মাগী চুপ করবি, না দিতাম দুইটা মুড়া’, মোহর শেখ এবার খেঁকিয়ে উঠে, লোকমানের মা মাথায় আঁচল টেনে ঘরের বাইরে যেতে যেতে যেন আপন মনেই বলে, ‘দেইন না মুড়া, …মুড়ায়া মারলে আর কি? আবার পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়া বাইচ্যা যাইবেন, আপনের তো জমি জিরাত আছেই!’

মনজিলার আত্মা তারপর সবুজ পাতা থেকে ধীরে ধীরে একটা হলুদ পাখি হয়ে যায়, হলুদ পাখিটা উড়ে এসে বসে পাশের গ্রামের নির্মাণশ্রমিক নূরুদ্দীনের খড়ের ঘরের চালায়, যে-ঘরের ভেতর বসে স্বামীকে ভাত বেড়ে দিতে দিতে মনজিলার মা মনজিলার বাপকে মৃদু তিরস্কার করে বলে, ‘অত কম টেকায় মাইয়ার দাবি ছাড়লেন?… আরো অন্তত বিশ হাজার টেকা বেশি জরিমানা ধরা উচিত আছিলো।’

ভাতের থালাটা নিজের দিকে টেনে নিতে নিতে নূরুদ্দীন খেঁকিয়ে ওঠে, ‘কি কছ তুই? অ্যাঁ,… কি কছ? মরা মাইয়া নিয়া ব্যবসা করতে কছ আমারে?… ব্যবসা? অ্যাঁ?’

মনজিলার মা তখন চোখে আঁচল চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে, ‘যে মাইয়া গেছে, হে রে তো আর ফিরা পাইতাম না, লাখ টেকা দিলেও কি আর আমরার মাইয়া ফিরা আইবো? ওরে আমার মায়ূরে, ওরে আমার মনজিলারে…’

স্ত্রীর এই শোকের মাতম দেখে নূরুদ্দীনের চোখেও পানি আসে, কিন্তু ভাত সামনে রেখে কাঁদার নিয়ম নেই বলে সে নিজের শোক নিয়ন্ত্রণ করে বলে, ‘আরে টেকার হিসাব কি আমি ঠিক করছি? গেরামের দশজন মিইল্যা যা ঠিক করছে এর উপরে কি আমার কোনো কথা খাটে?’

মনজিলার মা এবার কান্না সামলে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘আমরার সব দিক দিয়েই        ক্ষতি, …টেকা যদি আর কিছু বেশি পাইতাম      তাইলে তো বাকি মাইয়াগুলির বিয়ার খরচ নিয়া অতো ভাবন লাগতো না, …এই বুইঝ্যাই কইছিলাম গো কথাডা। খড়ের চালের ওপর বসে হলুদ পাখিটা তখন নীল হয়ে আকাশের সঙ্গে মিশে যেতে যেতে ভাবতে থাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা মানে আসলে কতো টাকা? পঞ্চাশ হাজার টাকা একসাথে করলে কেমন দেখায়?