নিউইয়র্ক থেকে – ডিলানের জন্যে নোবেল ও নিউইয়র্কে বাংলা পত্রিকা

বব ডিলানের ক্রনিকল্স

আমি কিন্তু সত্যি আশা করেছিলাম বব ডিলান ২০০৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাবেন। কতসব হেজিপেজি এই পুরস্কার পেয়েছে। তাদের অনেকের তুলনায় ডিলান শুধু ভালো কবি নন, কাব্যজগতে তাঁর প্রভাবও অনেক বেশি। সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকায় তাঁর নাম উঠেছিল, কিন্তু শেষমেষ পুরস্কার তিনি পেলেন না।

তাই বলে এ-বছরের নোবেল বিজয়ী অস্ট্রিয়ার এলফ্রিয়েদা ইয়েলিনেককে আমি হেজিপেজি বলছি না। পুরস্কার পাবার আগে তাঁর কোনো লেখা আমি কখনো পড়িনি। এখন ইন্টারনেটের সাহায্যে যতটুকু পড়া হলো, তাতে কবি ও লেখক হিসেবে তাঁর ক্ষমতা নিয়ে দ্বিমত নেই। তার চেয়েও বড় কথা, লেখকের নাগরিক-দায়িত্ব নিয়ে তাঁর বলা অনেক কথাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। ব্রেখটের ভক্ত তিনি, কিন্তু ব্রেখট যে তাঁর তাবৎ সামাজিক অঙ্গীকার সত্ত্বেও নিজের মেয়ে-সহকর্মীদের যৌন-নির্যাতনে বাধ্য করেছেন, সে-কথাও তাঁর বদৌলতে জানা গেল। এভাবে আমাদের সব আইকনগুলো ধসে পড়ছে, ফলে আমাদের সকল বিশ্বাস ও বিবেচনাকে ঢেলে সাজাতে হচ্ছে। পুরুষ, তা সে দেবতা কি শয়তান, সবাই ইয়েলিনেকের ঘনিষ্ঠ নিরীক্ষণের বিষয়। মেয়েদের অধিকার নিয়ে আজকাল অনেকেই লিখছেন, কিন্তু পুরুষের যৌন-আগ্রাসন-বিষয়ে তাঁর চেয়ে কঠোর ও আবেগবিহীন ভাষায় আর কেউ বলেননি। আধুনিক সভ্যতা সম্পূর্ণ পুরুষশাসিত, এবং সে-শাসনের কেন্দ্রে রয়েছে মেয়েদের বিরুদ্ধে পুরুষের যৌন-আগ্রাসন। ইয়েলিনেক তাঁর কবিতা, উপন্যাস বা নাটকে সে-কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বলে সুইডিশ রয়াল অ্যাকাডেমি জানিয়েছে। কেউ কেউ এমন কথা বলেছেন বটে যে, ইয়েলিনেকের এইসব লেখা আমাদের উদ্বিগ্ন করার বদলে সন্ত্রস্ত করে। কিন্তু এ-কথাও তো মানতে হবে, পুরুষদের চেতনায় আঘাত হানতে হলে সুই দিয়ে খোঁচালে হবে না, তার জন্যে দা-কুড়াল চাই। ইয়েলিনেকের লেখা হলো সেই দা-কুড়াল। এমন লেখক নোবেল পুরস্কার পেলে আমরা দুহাত তুলে অভিনন্দন তো জানাবই।

কিন্তু ইয়েলিনেকের কথা নয়, আমি ডিলানের কথা বলতে চাই। তার একটি কারণ ডিলানের আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড ক্রনিকল্স – সদ্য প্রকাশিত হয়েছে (সাইমন অ্যান্ড সুস্টার, নিউইয়র্ক, ২০০৪)। ডিলানকে নোবেল-সম্মানে ভূষিত করার এই তো ছিল সেরা সময়।

নোবেলের জন্যে গত পাঁচ-সাত বছর থেকেই ডিলানের নাম শোনা যাচ্ছে। বিটনিক কবি গিন্সবার্গ নিজে তাঁকে বার কয়েক সে-পুরস্কারের জন্যে মনোনয়ন দিয়েছিলেন বলে আমরা জানি। মার্কিন লেখক গর্ডন বেল, যিনি নিজেও একজন নোবেল পুরস্কার ‘নোমিনেটর’, গিন্সবার্গের সঙ্গে একমত হয়ে গত নবছর থেকে ডিলানকে এই পুরস্কারের জন্যে মনোনয়ন দিয়ে যাচ্ছেন বলে নিজেই সে-কথা জানিয়েছেন। কোনো কোনো পণ্ডিত অবশ্য যুক্তি দেখিয়েছেন, ডিলান বড় গীতিকার, এমনকী বড় গায়ক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু তাই বলে তাঁর গানকে কি সাহিত্য বলা যাবে? কেন বলা যাবে না, সে-ব্যাপারটি আমার কাছে মোটেই পরিষ্কার নয়। শুধু তাঁর গীতিকবিতা – যা আসলে তাঁর লেখা গান – তার জন্যে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ডিলান অপরাধটি কোথায় করলেন?

ডিলানকে আমরা অনেকে চিনি ষাট-দশকে লেখা তাঁর প্রোটেস্ট সংগ্সের জন্যে। আমরা, অন্ততপক্ষে আমি, ডিলানকে এবং তাঁর সঙ্গে সঙ্গে জোয়ান বায়েজকে একজন সাহসী, বিদ্রোহী, প্রতিবাদী নাগরিক-অধিকার কর্মী-শিল্পী হিসেবে চিনে এসেছি, ভালোবেসেছি। ষাটের দশকের শেষ মাথায় নাগরিক-অধিকার-আন্দোলনে এবং সত্তরের গোড়ায়, ভিয়েতনামবিরোধী মিছিলে ও সমাবেশে ডিলানের গান – নাকি তার কবিতা? – ছিল অপরিহার্য। সেসব গানের অর্থ আমরা সবাই একভাবে বুঝিনি। সব গানের কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থও হয়তো হয় না। আক্ষরিক অর্থ যদি কেউ খুঁজতে যায়, তাহলে অনেক সময়েই হতাশ হবে। কিন্তু সহর্ষে, সানন্দে সেসব গান গাওয়া হয়েছে। দি টাইমস দে আর অ্যা চেঞ্জিং, ব্রিঙ্গিং ইট অল ব্যাক হোম বা ব্লোয়িং ইন দি উইন্ড ছিল সে-সময়ের তারুণ্যের অ্যান্থেম। কোনো-এক দেশের নয়, সব দেশের।

ব্লোয়িং ইন দি উইন্ড গান/কবিতাটির কথা ভাবুন। ৪০ বছর আগে লেখা কবিতা, কিন্তু তার প্রতিটি কথা – আমার দুর্বল অনুবাদেও এখনো কী তরুণ, কী তাজা!

বাতাসে কান পাতো, জবাব পাবে

কত পথ হাটা শেষ হলে

একজন মানুষকে তুমি মানুষ বলবে?

কতো সাগর উড়াল দিয়ে অবশেষে শ্বেত পায়রা

বালুতে ক্ষান্তি পাবে?

কতোবার কামানের গোলা দাগা হলে

তাকে নিষিদ্ধ করা হবে?

এ-প্রশ্নের জবাব, বন্ধু আমার, এখন ভাসছে বাতাসে

বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সে-জবাব।

কতবার আকাশপানে তাকালে মানুষ

অবশেষে দেখতে পাবে আকাশ?

কত কান থাকলে তবেই

সে শুনতে পাবে মানুষের ক্রন্দন?

কত মৃত্যুর পর মানুষ বুঝবে

ঢের হয়েছে মানুষের হত্যা?

এ-প্রশ্নের জবাব, বন্ধু আমার, এখন বাতাসে ভাসছে

বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সে জবাব।

কত বছর দাঁড়িয়ে থাকলে পাহাড়

অবশেষে মিলাবে সাগরে?

আর, হ্যাঁ, কত বছর টিকে থাকলে তবেই

কোনো জাতি পাবে মুক্তির অনুমতি?

কতবার মানুষ তার মাথা ঘুরিয়ে রাখবে

দেখেও না দেখার ভান করে?

এ-প্রশ্নের জবাব, বন্ধু আমার, এখন বাতাসে ভাসছে

বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সে-জবাব।

ষাটের দশকে প্রকাশিত তাঁর তিনটি অ্যালবাম – ব্রিঙ্গিং ইট অল ব্যাক হোম, হাইওয়ে ৬১ রি-ভিজিটেড ও ব্লড অন ব্লন্ড – গায়ক-কবি হিসেবে তাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়। এক অর্থে তাঁর সে-সময়ের লেখা-গাওয়া গানে যৌবনে সদ্য পা-দেওয়া এক নতুন প্রজন্মের জিজ্ঞাসার উচ্চারণ শোনা গিয়েছিল। তাঁর সে-কবিতায়/গানে প্রতিবাদ ছিল, প্রত্যাখ্যান ছিল, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ছিল অনিশ্চয়তা।

আমরা জানি, ষাটের দশক শেষ হবার আগেই ডিলানের রাজনৈতিক কমিটমেন্টে চিড় ধরেছে, তাঁর পালাবদল ঘটেছে। শুধু ভাব ও ভাষায় নয়, জাগতিক অর্থেও তাঁর পরিবর্তন এসেছে। আকুস্টিক গিটার ছেড়ে ইলেকট্রিক গিটারে তাঁর আনুগত্য-হস্তান্তর সম্ভবত তার প্রথম ইঙ্গিত ছিল। প্রোটেস্ট সংগ্সের বদলে লাভ সংগ্সে তাঁর আগ্রহ সে-পরিবর্তনের আরেক প্রকাশ। এ-সময় থেকে ডিলান ক্রমশ ধর্ম ও মিস্টিসিজমেও ঝুঁকে পড়েন। ইহুদি হিসেবে জন্মগ্রহণকারী ডিলান, যিনি নাম বদলিয়ে খ্রিষ্টান হলেন, পরে আবার ফিরে গেলেন ইহুদি ধর্মে, পরবর্তী প্রায় পুরোটি সময়ই আমাদের অনেকের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে কেমন এক আলো-আঁধারির জগতে চলে গেলেন।

তাঁর এই অনবরত পরিবর্তন সত্ত্বেও ডিলান কেন একজন সেরা কবি?

আমার তো মনে হয় এই অনবরত পরিবর্তনই তার একটি কারণ। যত পালাবদলই তাঁর হোক না কেন, ডিলান তাঁর কাব্যকণ্ঠের অকৃত্রিমতা, তাঁর অথেন্টিসিটি, কখনো পরিত্যাগ করেননি। তাঁর সব কবিতা হেয়ালিতে ভরা, আপাত অর্থহীন অথবা ক্রমাগত বৈপরীত্যে আকীর্ণ। কিন্তু এই বৈপরীত্যের কারণেই তাঁর কবিতায় একই সঙ্গে এত অসংখ্য কণ্ঠের ধ্বনি শোনা যায়, তার কোনোটি উচ্চ, কোনোটি অনুচ্চ। আমরা যে যার মতো করে সেসব ধ্বনি থেকে নিজেদের জন্যে কাব্যকণ্ঠ উদ্ধার করে নিয়েছি। ডিলান নিজেই তাঁর কবিতাকে ‘চেইন্স অব ফ্লাসিং ইমেজেস’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর আবেগের ভিত্তি পরিকল্পিত নয়, স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁর যাত্রাপথ সরল ও একরৈখিক নয়। তিনি যেন ঝড়ের বেগে ছুটে যাওয়া ট্রেন, অনবরত পথ বদলিয়ে যে তার গন্তব্যে পৌঁছায়। অথবা বলা যায়, অনেক রং-তুলিতে আঁকা চিত্রের মতো তাঁর কবিতা, পাঠক-শ্রোতা তাকে নিজের মতো আবিষ্কার করে নিচ্ছেন। এ-যেন পিকাসোর কিউবিস্ট পিরিয়ডের কোনো ছবি। সোজাসুজি তাকালে সে-ছবির এক অর্থ, বাঁ-দিকে বা ডানে ঘুরুন, তার অর্থ বদলে যাবে। (তাঁর আত্মজৈবনিক ক্রনিকল্সে ডিলান স্মরণ করেছেন, ১৯৬১-তে নিউইয়র্কে প্রথমবারের মতো পিকাসোর ছবি দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, এই শিল্পী একজন বিপ্লবী, আমি এর মতো হতে চাই।)

ডিলানের ‘অল এলং দি ওয়াচটাওয়ার’ গানটির কথা ভাবুন। পথচলতি এক ভাঁড় ও তস্করের মধ্যে কথোপকথন সে-কবিতার বিষয়। তাঁর যাপিত সময়ের রানিং কমেন্টারির মতো রচিত সে-কবিতা। ডিলান নিজেই নিজেকে ভাঁড় বলে উপহাস করেছেন, যদিও তার লক্ষ্য তাঁর যাপিত জীবনের অর্থহীনতার দিকেই আঙুল তুলে দেখানো। এই প্রবল রকম ব্যক্তিগত কবিতাটি হয়ে উঠল আমেরিকার ভিয়েতনামবিরোধীদের প্রধান সংগীত। কারণ, সে-কবিতার এই প্রথম দুটি লাইন : ‘There has to be some kind of way out of here’ । অথবা ‘মি. টাম্বুরিন ম্যান’ গান/কবিতাটির কথা ভাবুন। এক অর্থে মাদকসেবন নিয়েই কবিতাটি লেখা : yIÕm ready to go aûwhere, IÕm ready for to fade, into my own parade, cast your dancing spell my way, I promise to go under it…,” এই কথার অর্থ মাদকের ধোঁয়ায় বুঁদ হওয়া ছাড়া আর কী হতে পারে বলে আমি জানি না। কিন্তু একই কবিতায় ডিলান যখন বলেন, ‘To dance beneath the diamond sï with one hand waving free/ Silhouetted by the sea…” তখন মনে হয় মানবমনের মুক্তির কথা বলছেন তিনি, যে-মুক্তির সম্ভাবনা মানুষের নিজের ভেতর থেকে উৎসারিত। ফেয়ারওয়েল অ্যাঞ্জেলিনা, তাঁর সেই বিখ্যাত গান, জোয়ান বায়েজ যাকে স্মরণীয় করেছেন, সেখানেও অর্থের দ্বিচারিতা আমাদের প্রবলভাবে বিদ্ধ করে। ন্যারেটিভ অনুসরণ করে সে-কবিতা উদ্ধার করতে গেলে আমরা কিছুই পাবো না, অথচ তার প্রস্থানের ঘোষণা – Farewell Angelina/ The sï is on fire/ And I must go  আমাদের একই সঙ্গে বিচ্ছেদের উদ্বেগ ও আসন্ন পরিবর্তনের সম্ভাবনায় আগ্রহী করে। তাতে ক্রবাদুরের মর্মযাতনা আমাদের সঙ্গ দেয়, আমরাও তার সঙ্গে প্রস্থানের উদ্যোগ নিই। অথচ তাকে কেন যেতে হবে, সে-প্রশ্ন করেও তার উত্তর-উদ্ধার আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। আসলে সে-প্রশ্নই অবান্তর, কারণ, প্রস্থানের কারণ সবার এক নয়, ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু যেতে যে হবে, সে-ব্যাপারে আমরা সবাই অভিন্ন মত।

চারণ কবি হিসেবে তাঁকে আমরা মাল্যভূষিত করলেও আদতে তিনি বরাবরই একাকী ও বিষণ্ন। নিজেকে আবিষ্কারের চেষ্টাও তিনি কখনো পরিত্যাগ করেননি। প্রতিবাদ ছেড়ে মিস্টিসিজমে তাঁর আগ্রহে আমরা যত স্ববিরোধিতা খোঁজার চেষ্টাই করি না কেন, আসলে ডিলান বরাবরই একজন ‘রেবেল’ থেকে গেছেন। নিজেকে নিজেই বর্ণনা করেছেন ‘আউটল’ বা অপরাধী হিসেবে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একথাও বলেছেন, আইনের বাইরে বাস করতে হলে তোমাকে পুরোপুরি সৎ থাকতে হবে। ডিলানের কাব্যের রাজনৈতিক চারিত্র্যের কারণে তাঁকে একসময় বিদ্রোহের তাত্ত্বিক ভেবে আমরা কেউ কেউ বরণ করেছি, কিন্তু সেটি তাঁর নিজের নির্বাচিত ভূমিকা নয়। আমরাই সে-ভূমিকা তাঁর ওপর চাপিয়ে দিয়েছি। পৃথিবী বদলানোর কাজ ডিলানের ছিল না, কিন্তু যে-পৃথিবীতে তাঁর বাস, তার চেয়ে ভালোভাবে অন্য কেউ তাকে বোঝেনি। তিনি নিজে সে-পৃথিবীকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তাঁকে প্রত্যাখ্যানের ভাষাও আমাদের দিয়েছেন। একজন কবি, তাঁর সময়ের বিবেক হিসেবে এরচেয়ে আর বেশি কী করবেন?

এই যে বহুস্তর বিশিষ্ট, আমাদের চেনা ও অচেনার কবি ও গায়ক বব ডিলান, তাঁর একটি অপাপবিদ্ধ, প্রায় সরল চিত্র ধরা পড়ে তাঁর আত্মজৈবনিক ক্রনিকল্সে। ডিলানের কবিতার জটিলতা উদ্ধার করা যারা রীতিমতো পেশা বানিয়ে ফেলেছেন, তারা এ-বই পড়ে বোধহয় খানিকটা হতাশই হবেন। বড় নিরাভরণ, বড় একরৈখিক। ডিলানকে যারা বিপ্লবী ভাবতে ভালোবাসেন, তারাও হতাশ হবেন, কারণ কোনো রাখঢাক ছাড়াই ডিলান এখানে জানিয়ে দিয়েছেন, মস্ত বিপ্লবী হবার কোনো ইচ্ছা তাঁর কখনোই ছিল না। এমনকী যেসব গান আমরা তাঁর সেরা গান বলে ভাবি, সেসবকেও তিনি আমলে আনতে রাজি নন। এই গ্রন্থ পড়ে মনে হয় নিজের খ্যাতি, বিত্ত, বৈভব বা সাংগীতিক প্রভাব, কোনোকিছুতেই তাঁর কোনো আগ্রহ বা প্রকৃত আনুগত্য নেই। বরং এসব কিছু থেকে পালিয়ে থাকতে পারলেই তিনি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচেন। Everything was wrong. The world was absurd.” – এ-কথা ডিলানের। নিউইয়র্ক ছেড়ে উডস্টকে আশ্রয় নিয়েছিলেন সে-কারণেই, কিন্তু তা যখন পারলেন না, তখন সেই নিউইয়র্কেই আবার ফিরে এলেন। আর যারা ডিলানকে মাদকসেবন ও যৌনাচারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে চান, তারা এই গ্রন্থ পড়ে আরো হতাশ হবেন। পুরো বইয়ে ডিলান নারীসঙ্গীদের প্রসঙ্গ কার্যত এড়িয়ে গেছেন। ‘শিল্পের

চেয়ে জীবন অনেক বড়’- এমন একটি সাদামাটা কথাও তিনি এখানে বলে ফেলেন।

প্রথাগত অর্থে যাকে আমরা আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা বলি, ক্রনিকল্সকে সম্ভবত তা বলা কঠিন। সাল-তারিখ ধরে, শক্ত কোনো সাংগঠনিক নির্মাণ-অনুসারে এই গ্রন্থ লিখিত নয়। ১৯৬১-তে প্রথম যখন ডিলান নিউইয়র্কে আসেন, সে-কথা থেকে কথন শুরু। এর পরবর্তী পাঁচ বছর তাঁর বিপুল উত্থানের কাহিনী। এতে প্রধানত সে-কাহিনীই ধরা পড়েছে। শেষ হয়েছে ১৯৬৪ সালের উডস্টক ফেস্টিভ্যালশেষে তাঁর মানসিক অবসাদ ও একাকীত্ব থেকে পলায়নের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ফের নিউইয়র্কে ফিরে আসার ঘটনা দিয়ে। মাঝখানে লাফ দিয়ে চলে গেছেন আশির দশকের মাঝামাঝি, যখন তাঁর এক ধরনের বন্ধ্যাত্ব চলছে। আশির দশকে এসে ডিলান কার্যত গান লেখা ও রেকর্ড করা থেকে নিজেকে অনেকটা দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। অনেকেই সে-সময়ে ভেবেছিল লোকটি শেষ হয়ে গেছে। ডিলান নিজেও সে-কথা ভেবেছিলেন। ক্রনিকল্সের এক জায়গায় তাঁর মানসিক অবসাদের কথা বলতে গিয়ে ডিলান নিজেকে ষাটের দশকের ভগ্নাবশেষ, তাঁর ‘ফোকলোর রেলিক’ বলে বর্ণনা করে লিখেছেন, yIm in the bottomless pit of cultural oblivion.” তবে এইসব ঘটনাক্রমকে অনুসরণের বদলে খণ্ড খণ্ড স্মৃতিচিত্র আঁকাতেই তিনি আগ্রহ দেখিয়েছেন ক্রনিকল্সে। তাঁর একমাত্র যে-ছবিটি এখানে পূর্ণাঙ্গ বলে মনে হয় তা হলো, ফোক সংগীতে যাদের কাছে তিনি ঋণী তাদের বর্ণনায় ও স্মৃতি-তর্পণে।

ডিলানের প্রত্যাবর্তনের বিবরণ এই গ্রন্থে নেই, তবে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। নতুন সীমান্ত-বিজয়ে তিনি আগ্রহী নন, কিন্তু সংগীতের ক্ষেত্রে আমাদের বিস্ময় ও ভালোবাসার এক অদ্ভুত আলো-আঁধারিতে তিনি আমাদের গোড়া থেকেই রেখে দিয়েছেন। এই ডিলান যে আবার ফিরে আসবেন – তাঁর গানে ও কবিতায় – তাতে সন্দেহ কী! তাঁর সর্বশেষ দুটি অ্যালবাম, লাভ অ্যান্ড থেফ্ট এবং টাইম আউট অব মাইন্ডে প্রমাণিত হয়েছে ডিলানের কবিতা ও গান কোনোটিই শেষ হয়নি। ডিলান নতুন গান রেকর্ড করছেন, সে-কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু সে-গান হাতে পাবার আগেই পেয়ে গেলাম এই গায়ক-কবির স্মৃতিচারণ। হতে পারে গ্রন্থটি কিঞ্চিৎ নিরাভরণ, কিন্তু তার অকৃত্রিমতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, একবার পড়েই এ-বইয়ের অর্থ বোঝা যায়, যে-কথা ডিলানের কোনো গান-সম্বন্ধে বলা যাবে না। এখানে ডিলান কবি নন, একদম সাদামাটা একজন মানুষ।

এ-বছরের নোবেল পুরস্কার ডিলানের হাত ফসকে গেল। আসন্ন বছরগুলোতে তিনি যদি সে-পুরস্কারের জন্য মনোনীত না হন, তাহলে আসল ক্ষতিটা হবে নোবেল কমিটির, ডিলানের নয়। এই পুরস্কারের মূল্য নিয়েই সন্দেহ জাগবে। তবে তাঁর কৃতজ্ঞ পাঠক ও শ্রোতার জন্য আসল অপেক্ষা হবে নোবেল ঘোষণার জন্যে নয়, তাঁর স্মৃতিকথার পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য।

দুই

আমেরিকায় বাংলা পত্রিকা

সপ্তাহ তিনেক আগে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় নিউইয়র্ক শহরে বাংলাদেশীদের পত্র-পত্রিকা নিয়ে এক দীর্ঘ প্রতিবেদন বেরিয়েছে। পত্রিকার কম্যুনিটি-বিষয়ক প্রতিবেদক তৃপ্তি লাহিড়ি এই শহরে যে-কটি বাংলা সাপ্তাহিক বের হয়, তার প্রায় প্রতিটির দপ্তরে গেছেন, সেখানে যেসব বাঙালি সাংবাদিক কাজ করেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন। খানিকটা বিস্মিত হয়েই যেন তিনি লিখেছেন, ‘বাব্বাহ, একই শহরে এক দেশের মানুষের জন্যে এতগুলো পত্রিকা।’

বিস্মিত হবারই কথা। টাইমসের প্রতিবেদন-অনুসারে, নিউইয়র্কে মোট বাংলাদেশীর সংখ্যা ৪৭ হাজারের কিছু বেশি। পাকিস্তানির সংখ্যা তার চেয়ে হাজার পাঁচেক কম। অথচ বাঙালিদের জন্যে সপ্তাহে পত্রিকা বের হয় কম করে হলেও এক ডজন। পাকিস্তানিদের তার অর্ধেকও নয়। কেন, তার ব্যাখ্যায় এক সম্পাদকের বরাত দিয়ে তৃপ্তি লিখেছেন, ‘বাঙালিরা পড়তে ভালোবাসে। তারা দেশের খবর জানতে খুবই আগ্রহী। একই পাঠক এক সঙ্গে একাধিক পত্রিকা কিনছে, এটা এখানে মোটেই নতুন কিছু নয়।’

নিউইয়র্কে বাঙালির সংখ্যা ৪৭ হাজার নয়, কম করে হলেও এক লাখ হবে। এদের সবার নাম যে সরকারি খাতায় আছে তা হয়তো নয়। এই শহরে আসছে, আবার এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে, এমন বাঙালির সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তারপরেও ডজনখানেক বাংলা সাপ্তাহিক, তা দেখে খানিকটা বিষম লাগে বৈকি! প্রায় প্রতিদিনই একটি করে পত্রিকা বেরুচ্ছে। গায়ে-পায়ে তারা প্রত্যেকে আধসেরি। এগুলোর অধিকাংশকে অবশ্য পত্রিকা না বলে ‘স্টিচ কাঁথা’ বলা আমার মনে হয় অধিক সংগত। এখান থেকে এক টুকরো ন্যাকড়া, ওখান থেকে আরেক টুকরো ন্যাকড়া, এইভাবে জোড়াতালি দিয়ে বানানো পত্রিকা। ন্যাকড়ার সোর্স সব ওই ঢাকা। বিভিন্ন ঢাকাই দৈনিকে যে-খবর, ফিচার, কলাম ছাপা হয়, তাই একই শিরোনামে বা কিঞ্চিৎ অদল-বদল করে এখানে ছাপা হচ্ছে। বলাই বাহুল্য, সেসব খবরের আদি উৎস কী, সে-কথা জানানোর কোনো ইচ্ছা বা চেষ্টা কারুরই নেই।

যদি কতগুলো পত্রিকা তার মোট সংখ্যা ধরি, তাহলে কবুল করতেই হবে এখানকার বাংলাদেশী তথ্যমাধ্যম রীতিমতো জমজমাট। গড়ে ৬০ পাতা ধরলে তাদের মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা সম্ভবত ৭০০ বা তার চেয়েও বেশি হবে। যে-ক্যালকুলেটর দিয়েই হিসাব করুন না কেন, এই সংখ্যাকে সম্মানজনক না বলে উপায় নেই।

কী থাকে আধাসেরি ওজনের এসব এক-একটি পত্রিকায়? হাসিনা-খালেদার কাদা ছোড়াছুড়ি তো আছেই। সেসব বাদ দিলে বাঙালি আবার বাঙালি হবে কী করে! কিন্তু তাতে না হয় বড়জোর পাঁচ-সাত পাতা ভরানো গেল। বাকি যে ৫৫ পাতা রয়ে গেল, তা ভরানোর জন্যে এক ছাগলের তিন মাথাওয়ালা বাচ্চা প্রসব থেকে আশি বছরের বৃদ্ধের আট বছরের বালিকার পাণিগ্রহণসহ হেন খবর নেই, যা সেখানে

স্থান পায় না। ঢাকার পত্রিকার মান কোথায়

গিয়ে ঠেকেছে, এ-থেকে সে-কথা যেমন ঠাহর করা যায়, তেমনি নিউইয়র্কের সম্পাদকমণ্ডলীর বুদ্ধি-বিবেচনাও বেশ বোঝা যায়। যেটা বোঝা যায় না তা হলো, এসব খবরে এই সুদূর প্রবাসে বাংলাদেশীদের আদৌ কোনো আগ্রহ আছে কিনা?

বাংলাদেশীরা অন্যান্য প্রধান অভিবাসী সম্প্রদায়ের তুলনায় অপেক্ষাকৃত নবীন। অন্য অনেকেই ইতোমধ্যে থিতু হয়ে বসেছেন, তাদের ‘স্থানীয়করণ’ প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। জন্ম তাদের যেখানেই হোক না কেন, আমেরিকাকেই তারা নিজেদের দেশ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ফলে এদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে খেলাধুলা সব ব্যাপারেই তাদের সমান আগ্রহ।

এসব ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণও অনেক ব্যাপক। চীনা-জাপানিদের কথা ছেড়ে দিই, প্রবাসী ভারতীয়রা পর্যন্ত সাংস্কৃতিকভাবে অনেক বেশি সমন্বিত হয়ে এসেছে। ‘এখানে কী ঘটছে’, সে-ব্যাপারে তাই তাদের পত্র-পত্রিকায় লেখালেখিও হয় বেশি। এদের তুলনায় বাঙালিরা এখনো দরজায় খিল দিয়ে বসে।

‘এখানে কী ঘটছে’ তার খবর বাঙালিদের পত্র-পত্রিকায় থাকে না তা নয়। তবে ‘এখানে কী ঘটছে’ বলতে বোঝায় এখানে বাঙালিদের মধ্যে কী ঘটছে। যে-কোনো পত্রিকার পাতা খুলুন। দেখবেন গোলাপগঞ্জ সমিতি থেকে দক্ষিণ কেরানিগঞ্জ সমিতির নানা কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ। তাদের নির্বাচন-প্রচারণা থেকে বনভোজন, সমিতিপ্রধানের নাতির আকিকা থেকে রাজনৈতিক বিবৃতি, সবই তাতে পেয়ে যাবেন। অধিকাংশ বাঙালিই সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে আমেরিকার মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন। এটা যে কতটা সত্য, তা যে-কোনো বাংলা পত্র-পত্রিকা খুললেই বোঝা যায়। নৃতাত্ত্বিক বা বর্ণগতভাবে স্বতন্ত্র যে-কোনো ইমিগ্রান্ট সম্প্রদায়ই এখানে ছোট ছোট দ্বীপের মতো বাস করে। চারদিকের প্রতিকূলতা থেকে নিজেদের বাঁচাতে তারা সবসময়ে হাত বাড়ায় নিজেদের সম্প্রদায়ের ভেতরেই। চীনা-ভিয়েতনামি বা পুয়েরতো-রিকো, যাদের কথাই বলুন না কেন, সবার ডিফেন্স মেকানিজমই অভিন্ন। এদের নিজস্ব তথ্যমাধ্যমেও সে-ছবিটি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তাদের সঙ্গে আমাদের বড় তফাৎ হলো চীনা-জাপানি-কলম্বিয়ানরা এইখানে স্থায়ীভাবে নোঙ্গর বাঁধতে যতটা আগ্রহী ও সে-ব্যাপারে স্পষ্টবাক, আমরা বাঙালিরা ততটা নয়। এদের পত্র-পত্রিকায় স্থানীয় সমস্যা – তা সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক – স্থান পায়, আমাদের পত্র-পত্রিকায় তা নেই।

নেই, কিন্তু থাকা দরকার। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ও সমন্বিত করতে না পারলে কোনো ইমিগ্র্যান্ট সম্প্রদায়ের পক্ষে ভালোভাবে টিকে থাকা সম্ভব নয়। বিদেশে থাকা মানে চাকরি-বাকরি থেকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, আইন-আদালত ইত্যাদি নানা সমস্যা মাথায় নিয়ে দিন কাটানো। এসব সমস্যার সমাধান-প্রক্রিয়ার ভেতর ঢুকতে না পারলে বাঙালিরা বরাবরই প্রান্তবর্তী হয়ে থাকবে। এ-অবস্থা কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে প্রবাসের পত্র-পত্রিকা একটি ভালো ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু তা রাখার কোনো চেষ্টা এখন পর্যন্ত চোখে পড়ে না।

সাংস্কৃতিকভাবে সমন্বিত না হবার ফলে বাঙালিদের দুধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রথমত, প্রজন্মগত তারতম্য বাড়ছে। সাথে সাথে তাদের আত্মপরিচয়ের সংকটও দানা বাঁধছে। দ্বিতীয়ত, অব্যাহতভাবে বাংলাদেশী পরিমণ্ডলে বাস করার ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের কৃত্রিম নিরাপত্তাবোধ সৃষ্ট হচ্ছে, ফলে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবার জন্যে তারা তৈরি হতে পারছে না।

সন্দেহ নেই, অধিকাংশ কালো বা তামাটে ইমিগ্রান্ট সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতাই অভিন্ন। সবাই-ই ঠকে এবং ঠেকে শিখেছেন। এদেশে আমরাই প্রথম বাংলাদেশী ইমিগ্রান্ট সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। ঠেকে এবং ঠকে আমরাও শিখছি। কিন্তু এই শেখাটা অনেক সহজ হয় যদি নিজেদের তথ্যমাধ্যম এ-ব্যাপারে একটি দায়িত্বসম্পন্ন ভূমিকা রাখতে পারে। কোথায় কেচকি মাছ পাওয়া যায় বা গলাচিপায় কোন যুবতীর দুই স্বামী রয়েছে, তা একদম গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমি তা বলছি না। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বোধহয় যে-দেশটিকে বাঙালিরা তাদের নিজেদের নতুন দেশ বলে নির্বাচন করেছে, তাকে আরো

ভালোভাবে জানা, তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া।

এ-ব্যাপারে প্রবাসের পত্র-পত্রিকার যে একটি ভূমিকা থাকা দরকার, তা নিয়ে বোধহয় বিতর্ক থাকার কথা নয়। কিন্তু সেটি যে হচ্ছে না তার একটি প্রধান কারণ, যারা এখানে বাংলা পত্র-পত্রিকার সঙ্গে জড়িত তারা নিজেরাই নবাগত ইমিগ্রান্ট। নিজেরাই এ-ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন বা অবগত নন। তাছাড়া, তাদের ‘টারগেট’ পাঠকগোষ্ঠীও একইভাবে নবাগত হওয়ায় গলাচিপা ও ক্ষেপুপাড়ার খবর না ছাপিয়ে উপায় নেই।

আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, এখানে নির্বিচারে ঢাকার পত্র-পত্রিকা থেকে কলাম বা উপ-সম্পাদকীয় তুলে দেবার একটি অদ্ভুত রেওয়াজ চালু হয়েছে। পাতা ভরানো এর একটি কারণ। অন্য কারণ কম্পোজ করার ঝুটঝামেলা থেকে মুক্তি। কিন্তু সংবাদপত্রের একটি প্রধান কাজই হলো নিজস্ব লেখকসৃষ্টি। নিজেদের দৈনন্দিন সমস্যা, যা নিয়ে এখানে তারা হাবুডুবু খাচ্ছেন, সেসবের কথা লিখতে পারেন, এমন লেখকদের জন্যে পাতা ছেড়ে দিতে হবে। সেসব লেখার জন্যে হাত বাড়াতে হবে ভেতরে, বাইরে নয়। স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে পরিচিত এমন লেখক-সাংবাদিকদের সে-কাজে উৎসাহিত করতে হবে। সে-কাজের জন্যে তাদের যোগ্য সম্মানী দিলে ভালো লেখক এগিয়ে আসবে না, আমি তা বিশ্বাস করি না।

পৃষ্ঠা-সংখ্যা নিয়েও আমার আপত্তি আছে। এক-একটা পত্রিকা এমন প্রমাণ সাইজের কেন? – জিজ্ঞেস করায় এক সম্পাদক বন্ধু সবিনয়ে জানিয়েছিলেন, ‘কী করব বলুন? আমরা পত্রিকার পাতা কমালে পাঠকরা বলবে, ওই পত্রিকা বড় পাতলা। এতে খবর নেই, ওই পত্রিকায় আছে, কারণ ওর ওজন বেশি।’

যুক্তিটা আপাতভাবে অকাট্য মনে হলেও তা যে পুরোপুরি ঠিক, আমার তা মনে হয় না। এখানে যারা পত্রিকার পাঠক তারা অধিকাংশই খেটে খাওয়া মানুষ। পাতার পর পাতা পড়ার সময় কোথায় তাদের? পত্রিকায় যত প্রবন্ধ-নিবন্ধ ছাপা হয়, তার অধিকাংশই হয় অপঠিত থেকে যায়, বা তারা অপঠিত থাকলে কারো কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হবে বলে মনে হয় না।

কিন্তু এসব কথা আমি আপনাদের শোনাচ্ছি কেন? নিজেদের পত্রিকার জ্বালায় আপনারাও তো কম জ্বলছেন না। তারচেয়ে বরং আপনাদের নিউইয়র্কের বাংলা পত্রিকা নিয়ে একটি গল্প শোনাই।

লন্ডনের হাইড পার্কে মস্ত এক পাথরের রয়েল বেঙ্গল টাইগার। পাথরের হলে কী হবে, মহা বাচাল সে। মুখে মুখে সে কথা বলে। আপনি প্রশ্ন করুন, সে-বাঘ অমনি চটপট জবাব দিয়ে দেবে। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন মূর্তি দেখতে আসে। বিনে পয়সায় না, টিকিট কেটে।

একদিন হলো কী, সে-বাঘ হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করে দিল। ব্রিটিশরাজের তো মাথায় বাড়ি। কোটি কোটি পাউন্ড তারা কামিয়ে নিচ্ছিল বাংলার সে-ব্যাঘ্রকে দেখিয়ে। এখন উপায়? পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে সরকার ঘোষণা করল, বাঘ বাবাজির বন্ধ মুখ যে ফের খুলতে পারবে, তাকে এক মিলিয়ন পাউন্ড পুরস্কার দেওয়া হবে।

কত লোক এলো, কত লোক গেল, কিন্তু বাঘ আর কথা বলে না। অবশেষে নিউইয়র্ক থেকে এক বাঙালি ভাই এসে হাজির। তিনি বললেন, পাথরের বাঘকে কী করে কথা বলাতে হয়, তা তার জানা আছে। সে-কথা শুনে সবাই হেসেই খুন। বাঘা বাঘা সব ওঝা এসে পারল না, আর তুমি কোথাকার হরিদাস পোদ্দার! যাও, চেষ্টা করে দেখো।

তো, সে-বাঙালি ভাই বাঘ বাবাজির কানে কী যেন বলল। আর অমনি সেই পাথরের বাঘ চিৎকার করে বলে উঠল, না, না, না।

সবাই তো অবাক। সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরে প্রশ্ন করল, তা ভাই, আপনি বাঘকে কী কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন?পুরস্কারের টাকা পকেটস্থ করে বাঙালি ভদ্রলোক বললেন, আমি কেবল জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘কি, নিউইয়র্কের বাংলা পত্রিকা পড়বি?’