উনিশ শো পঞ্চাশে আমার পিতৃবিয়োগ হয়। তিনি বিচিত্রগামী প্রতিভার মানুষ ছিলেন। পণ্ডিত মানুষ, দ্বিজাতিতত্ত্বে তাঁর বিশ্বাস থাকবার মোটেই কোনো কথা ছিল না। তবু ছেচল্লিশের হিন্দু-পাকিস্তান-নির্ধারণী নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে ঢাকার নবাবকে হারিয়ে বঙ্গীয় আইন পরিষদে নির্বাচিত। ওই নির্বাচনকে কলাগাছ-নির্বাচনও বলা হতো। জিন্নাহ সাহেব মুসলমানদের বলেছিলেন তাঁর প্রার্থী কলাগাছ হলেও তাকে ভোট দিতে। বাবা মোটেও কলাগাছ ছিলেন না – আরবি-ফারসিতে অনর্গল বক্তৃতা করতে পারতেন, হিন্দু-উর্দু প্রায় মাতৃভাষার মতো ছিল তাঁর কাছে। প্রেম দিয়ে পড়েছিলেন বৈষ্ণব কবিতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনার মেডেল পেয়েছিলেন অসাধারণ ছাত্র হিসেবে। ইংরেজি ভাষা-সাহিত্যে মাস্টার্স করেছিলেন, চলতেন বিশুদ্ধ সাহেবি কেতায়। গ্রামে গেলে লুঙ্গি পরে ক্ষেতের কাজে লাগতেন। তাঁর পিছু-পিছু রসুন বুনতে গিয়ে হাতের আঙুলে উলটো চামড়া উঠে আমি কষ্ট পেয়েছি কয়েকদিন। কিন্তু আমার এই ‘সোহরাওয়ার্দীর ডান হাত’ বাপটি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে বিয়াল্লিশ বছর বয়সে মারা যান। সবে সংসারে মন দিয়েছিলেন। তাঁর ইঁচড়ে পাকা পুত্রকে যোগজিজ্ঞাসা করতেন, কী গাড়ি কেনা যায়। হামিদুল হক চৌধুরীর সঙ্গে জায়গা নেবেন – নেবেন বেইলি রোডে কিংবা ফার্মগেটের পিছনটায় – এমন সময় আজরাইল সমন নিয়ে এসে হাজির। বাবা মারা যেতে মা সাতচল্লিশ বছরের একা-জীবনে প্রবেশ করেন। বাঁচবার কোনোই ব্যবস্থা নেই, বাপ উলটে ঋণই রেখে গিয়েছিলেন – হাসপাতালের পাওনা দুশো টাকা। এই অকূল সমুদ্রে তিনটি ছেলে দুটি মেয়ে নিয়ে তিনি ভাসলেন, সেই সুদূর পঞ্চাশে। গয়না বেচা হলো, আসবাব তারপর। ঘরের বৈদ্যুতিক পাখা পর্যন্ত। চাকুরি একটা দিলেন বন্ধুরা, খবরের কাগজে। ষাট টাকা মাস-মাইনে। এই হাবুডুবু সময়ে কোনোমতে আই. এ. পেরিয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার সম্বল সংগ্রহ না-করতে পারবার সময়ে ঘরে লক্ষ্মী এলেন। বরং বলা ভালো সরস্বতী এলেন। বাবা এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক তাঁর উচ্চ সংগীত-অনুরাগের জন্যে। বলতেন বাগেশ্রী রাগটা এই রকম, বেহাগটা ওই রকম। প্রচ্ছন্ন সায় ছিল তাঁর আমার সংগীত-কারণে পাঠ্যে অমনোযোগে। মার কেবল সুরজ্ঞান ছিল তাই নয়, আমাদের শৈশব তো তিনিই ভরে রেখেছিলেন গানে-গল্পে। বাবা প্রাসঙ্গিক তাঁর অকালমৃত্যুর কারণে। তিনি অন্তরাল হতেই আমি বাঁশি ধরেছিলাম, মা ধরেছিলেন সেতার।
পঞ্চাশ থেকে চুয়ান্ন – চার বছরের বেকার-কালে আমার অলস দ্বিপ্রহরগুলো কাটত নাজিমুদ্দীন রোডের ব্রিটিশ কাউন্সিলে, হাটখোলা রোডের আমেরিকান সেন্টারে। নতুন বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব আমাকে খুব টানে। পড়ে ফেলি ক্রিবার, লিন্টন। তখনো মার্গারেট মীডের রাজত্ব আরম্ভ হয়নি, রাশেল কারসনের সায়লেন্ট ¯িপ্রং ধাক্কা দিয়েছে মাত্র – আর রুথ বেনেডিক্ট্ হৃদয়ের রানী হয়ে গেছেন। বিয়ের আগে-আগে কিনেই ফেললাম একটা দামি বই। র্যান্ডম হাউসের মডার্ন লাইব্রেরি সিরিজের দি মেইকিং অব ম্যান। সম্পাদক বি. এফ. ক্যালার্টন। তাঁর ভূমিকাটিতে তাঁর নিজের বই দি ব্যাংকরাপ্ট্সি অব ম্যারেজ অ্যাজ অ্যান ইনস্টিট্যুশনের চুম্বক কথাগুলো ছিল। ওই আমার পরিচয় ফ্রাঞ্জ বোয়াস, ম্যালিনাউস্কির সঙ্গে, রবার্ট ক্রিফোর সঙ্গে। যা হোক সঙ্কলনগ্রন্থটি নৃতত্ত্ব-বিষয়ে শ্রেষ্ঠ একটি বই হয়েছিল এবং আমার জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছে এবং রীতিমতো নতুন পথ কেটে দিয়েছে।
বিয়ে যেন দুটি নরনারীর ভদ্রজনোচিত নৈকট্যেই পর্যবসিত না হয়ে পড়ে সে-বিষয়ে আমার সুচিন্তিত যত্ন ছিল। স্কুলজীবনশেষে অল ইন্ডিয়া ছাত্র ফেডারেশনের কমিউনিস্ট-প্রভাবে একটি পরহিত ও দেশোদ্ধারব্রতী কর্মসূচিভিত্তিক মন ছিল। যত ক্ষুদ্র হোক, জগতের দেশের কোনো কাজ হতে হবে আমাদের দুজনের চেষ্টায় – সেই হবে আমাদের বিয়ের সার্থকতা। সারাজীবন এই চেষ্টার পেছনে ছিলাম, আছিও। এবং হয়তো জীবনটা কেবল বৃথায় যায়নি। কিন্তু আমাদের যুক্ত প্রয়াসগুলো যে সংস্কৃতি ক্ষেত্রকেই বেছে নিল, তার পেছনে সন্জীদার প্রভাব প্রায় ষোলো আনা। তবু সন্জীদা বিয়ের আগেই প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের। তিনি শিল্পী হিসেবেই আরো বিকাশ-প্রতিষ্ঠা পেতে পারতেন। তিনি ধরলেন সংগঠন-আন্দোলনের পথ, বাঙালি সংস্কৃতির, পূর্ববাংলায়, পুনরুজ্জীবনের পথ। আমরা ছাপান্নর ক্রান্তিকালে যুক্ত না হলে, এই বড় ব্যাপারটি হয় আমাদের পথপাশে ফেলে এগিয়ে যেত – কিংবা আদৌ ঘটতই না – ষাট থেকে সত্তরের দশকে, অবধারিত করে তুলত না বাঙালির রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় মুক্তিকে। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের উন্মাদনা কাটতেই দেখি সংস্কৃতিক্ষেত্রে মোটামুটি একটা শূন্যতা। চট্টগ্রামে হরিখোলার মাঠে মাহবুবুল আলম চৌধুরীরা সংস্কৃতিসম্মেলন করে ফেলেছেন বটে, এবং সেখানকার প্রতাপশালী কাস্টমসের লোকেরা হেমন্ত-আদি পশ্চিমবঙ্গের বাঘা শিল্পীদের এনে অনুষ্ঠানও করছেন বটে – তবু শূন্যতা। বিশেষ করে ঢাকায়। ভাষা-আন্দোলনের উন্মেষলগ্নে তমুদ্দুন মজলিশ তথা সৈনিক পত্রিকা গ্রুপের ভালো ইতিবাচক অবদান ছিল। যে-কারণে কাশেম সাহেব, তমুদ্দুনের প্রাণশক্তি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মুজফফর আহমেদের মতো এবং সম্ভবত বদরুদ্দীন উমরকেও টানতে পেরেছিলেন। কিন্তু শিল্পাঙ্গনে তাদের কোনোই পদচারণা ছিল না, মনের ভেতরেও সঙ্গীত-চিত্র-নাটকাদির কোনো অপেক্ষা। উমরের বিখ্যাত পিতা আবুল হাশিম সাহেবের লাইনেই চিন্তা চলত ভার্বোসিটির ছায়ায় – বাক্সর্বস্ব। ইসলামের গৌরব-উদ্ঘাটনে সদানিযুক্ত। শিল্পী জিনিসটা বাঙালি ইসলামের খুব প্রাণের জিনিস নয়। বাহান্ন থেকে ছাপান্ন দেখলাম, তবুও, সংস্কৃতিক্ষেত্রে তমুদ্দুন ছাড়াও ইসলামপন্থি লোকজনরাই কিছু করছেন। ভাষা-আন্দোলনের চরিত্র ও তাৎপর্য-বিষয়ে তমুদ্দুনের ধারণা আমাদের থেকে ভিন্ন ছিল। ইসলামের প্রভাববিস্তার, পাকিস্তানি প্যাট্রিয়টিজম ও বাংলা ভাষার স্বার্থ-উদ্ধার – এই তিন এক করতেন তাঁরা। অসাম্প্রদায়িক, মানুষমুখী দৃষ্টিভঙ্গির লোকদের প্রভাব সংস্কৃতিক্ষেত্রে উপেক্ষিত ছিল। অথচ সংস্কৃতির মূল ব্যাপারটি তো ওইখানে, সম্প্রদায়কে পেছনে ফেলে জাতীয়তায়-মানবতায় ঐক্য-সন্ধান – এবং ইউরোপীয় রেনেসাঁসের মূল অবদান মানুষমুখিতা।
এতসব কারণে আমরা ছাপ্পান্নতেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্কুল খুলি, গীতালি। এক-শিক্ষক স্কুল। ঘরও একটিই। সেগুনবাগানে শ্বশুরবাড়িতে। আমি ছাত্র সে-স্কুলের। সহপাঠী সঙ্গীত-ভাবুক আবদুশ শাকুর। গীতালি থেকে আমরা এদেশের প্রথম শারদোৎসব করি। সেই জায়গাটা এখন আর নেই। সড়ক ভবন দখল করেছে, হাইকোর্টপ্রাঙ্গণেও গেছে আমাদের সেই অপূর্ব মিলনকুঞ্জটি। একটি প্রাচীন শানবাঁধানো ঘাটের পুকুর, তার চারধারে সরকারি নার্সারি। সরকারের সব অনুষ্ঠানের ফুলের জোগান হয় এখান থেকে। শারদোৎসবের দিনে বৃষ্টি হয়েছিল। ভিজতে ভিজতে ছেলেমেয়েরা গেয়েছিল ‘আজ প্রথম ফুলের পাব প্রসাদখানি’। কচি-কাঁচা শিশু এমনিতেই যেন শুভ্রতার-পবিত্রতার ছবি, তাতে সাদা পোশাকে, আর দোদুল প্রভাতী রবীন্দ্রসুরে, যেন প্রফুল্ল হাট বসেছে কাশের। এই অনুষ্ঠানে লাগবে বলে আমরা খোল খুঁজলাম ঢাকাময়। পেলাম না। বিবেকানন্দ ধ্রুপদ গাইতেন, পাখোয়াজ বাজাতেন। তাঁর রামকৃষ্ণ মিশনে পাখোয়াজ পাওয়া গেল। খোল তো বৈষ্ণব ব্যাপার, বড়জোর খ্যাপা বাউলের সঙ্গী। শেষে ঢাকা রেডিও স্টেশন থেকে ধরাধরি করে একটা খোল নিয়ে আসি। ঢাকায় ওই প্রথম প্রকাশ্য সেক্যুলার অনুষ্ঠানে খোল-সঙ্গত। এখন তো খোলের যথেচ্ছ ব্যবহার, সর্বত্র। পোর্টেবল্ তালবাদ্য বলে। ঢোলও তাই কিন্তু সে তো বাজাতে শিক্ষা লাগে। খোলেও শিক্ষা লাগে। সে-শিক্ষা কীর্তনের আখড়া ছাড়া বাংলাদেশে আর কোথাও লভ্য নয়।
গীতালি একসময় উঠে গেল। যেন আমি একলা গান শিখব বলেই। গলা আমার কখনোই স্বভাব-সুরেলা ছিল না। গায়ক হবার কোনো দুরাশাও ছিল না মনে। সঙ্গীতভিত্তিতে যদি সংগঠন করতেই হয় তবে যেন বুলবুল একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা কর্ণধার বিখ্যাত মাহমুদ নুরুল হুদার মতো সঙ্গীতে গভীর জ্ঞান অর্জন না করেও তা করতে যাই। শরতের গান দিয়ে আরম্ভটা খুবই ভালো হয়েছিল। সরল সুরের সৌন্দর্য মনকে অধিকার করে। ধ্রুপদেও তো তাই। গোটা গোটা স্বর, কিছু-বা বড়জোর অর্ধমাত্রা। অলঙ্করণ নেই আদৌ অবয়বের দীনতা ঢাকবার জন্যে। সঙ্গীত-জীবনের প্রারম্ভেই বুঝে নিই ধ্রুপদ আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের আত্মার বন্ধনটি, কোনো বই পড়ে নয়। সন্জীদা খুব গাইতেন ‘ছুটির বাঁশি বাজল বাজল’। তাঁর মুড়কি – অবিড়ম্বিত কণ্ঠের উপযোগী এবং ঠিক যেন তাঁর মনের কথাটি। কে বলেছে রবীন্দ্রনাথ ওই গান বেঁধেছেন পঞ্চাশের দশকের আরম্ভেই! সুচিত্রা মিত্রের ও সুবিনয় রায়ের গানে আমরা মত্ত হয়ে যাই। সুচিত্রাদির প্রথম ৭৮ ঘূর্ণন ডিস্ক, সারাজীবন তাকে রেকর্ড বলে এসেছি – গ্রামোফোন রেকর্ড – এখন তা বললে কেউ বোঝে না – তার দুপিঠে ছিল মরণরে তুঁহু মম শ্যাম-সমান আর হৃদয়ের একূল-ওকূল। সুবিনয়দা বয়সে বড় হলেও তার কিছু পরে আত্মপ্রকাশ করেন এই করেছ ভালো নিঠুর হে আর ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু দিয়ে। তার আগে রবীন্দ্রনাথের গান শুনেছি পঙ্কজ মল্লিক, দেবব্রত বিশ্বাস ও কনক দাসের – কিন্তু বাইরের লোক হিসেবে। কানন দেবীর কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত আমাকে স্পর্শ করেছিল – তিমির দুয়ার খোলো, এতকাল যে বসেছিলেম পথ চেয়ে আর কাল গুণে যেমন। প্রমথেশ বড়ুয়ার মুক্তি ছবিতে যে প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত সবাক চিত্রে ঢুকল, তার গানগুলো আমার জন্মের পর থেকেই লোকের মুখে উড়তে শুনেছি। পঙ্কজ মল্লিক সায়গল আর কানন দেবীর গলায়। নাকি সায়গলকে প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে শুনি জীবনমরণ ছবিতে? ‘আমার বীণায় গান ছিল’। তাঁর অমর গান ‘আজ খেলা ভাঙার খেলা’, আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান’ও কি সিনেমার গান ছিল? আমার জীবনের প্রথম জেনে-শুনে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা হচ্ছে ‘সকল কলুষ তামষ হয় তামষ হয়, জয় হোক তব জয়’। উনিশ শো একচল্লিশের শীতকালে আমাদের আরমেনিটোলা স্কুলের পুরস্কার-বিতরণী অনুষ্ঠানের মহড়ায়।
গ্রাম থেকে আমরা ঢাকায় চলে আসি ১৯৩৮ সালে। নানা জায়গায় ঘুরে থিতু হই উর্দু রোডে। বড় বাড়ি প্রায় ষোলোটা কামরা দুই তলা মিলে। অত বড় বাড়ি কে নেবে? বাড়িতে ঢুকে দেখি মাঝখানে ইটপাতা উঠানের ওপর দিয়ে টিনের পাঁচিল। দুই তিন মানুষ উঁচু। ওপরে বর্ধমান থেকে আসা এক একান্নবর্তী পরিবার, আঢ্য উপাধি। আঢ্য উপাধিতে অবশ্য ওদের বাড়ির সর্বতোশীলনের আবহাওয়া ধরা পড়ে না। ওদের বাড়ির বড় ছেলে দেবেন্দ্র চট করেই আমাদের সঙ্গে থাকা বড়মামার বন্ধু হয়ে গেলেন। একটু সবিস্তারেই বলছি তাদের কথা। আমার জীবনের ওপর তাঁদের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। তাদের অর্ধেক উঠানে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির পাশে তুলসী মঞ্চ। সন্ধ্যাবাতির সময় রোজই গান হয়, নাচ হয়। পিসি, মাসি, কাকিরা বসেনসিঁড়িতে। আমরা টিনের পাঁচিলের ফুটো দিয়ে দেখি আর শুনি। ওই আমার প্রথম দেখা নাচ। গান শুধু শুনতাম না গিলে খেতাম যেন। ‘দেবতার মন্দিরঅঙ্গনতলে’ সনৃত্য গানটা হতো সবচেয়ে বেশি। অন্নপূর্ণা পিসি খুবই কৃষ্ণ, খুব উঁচু এবং ভারি, সেতার শিখতেন, বেলু গীতা বিজয়াদের গানে কখনো যোগ দিতেন নাকি স্বরে। চিরকুমারী। বেলু গীতারা আমার বন্ধু, তাদের দিদি ডলিদি আমার শৈশব-কৈশোরের সকল ভালোবাসার অপরূপ পাত্রটি ছিলেন। অমন সুন্দর মানুষ আর জীবনে দেখলাম না। আমার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড় হবেন। আরম্ভ থেকে তাঁকে শাড়িতে দেখেছি, একটু গম্ভীর এবং বিষণ্ন প্রকৃতির। তাঁর মুখের ভাষাটি তার কিন্নরকণ্ঠে মনের মধ্যে বাজত। কথা শেষ করবার পরেও। আমি প্রথম পশ্চিমবঙ্গে যাই পূর্ব পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে, আমার বিয়ের পরে, ছাপ্পান্নয়। কিন্তু যতদূর মনে পড়ে চল্লিশ সাল থেকেই আমি বিশুদ্ধ মান্ ভাষাতেই কথা বলি – সে ওঁদের প্রসাদাৎ। এখনো ডলিদির কথা স্মরণে এলে মনে একটা ঘোর লাগে। সে তিনি নারী বলে নন। মনে যাকে দেখি তিনি তো নারী নন, দেবী। স্মিতবিকশিত বয়ান। কিন্তু কোনো দুষ্টামি ফাজলামি করা যাবে না তাঁর সামনে। একটু ভয়ই পাই তাঁকে, ষাট বছরের সুদূর পেরিয়েও। তাঁর কথা এত করে বলেও কি তাঁর ঋণ আমি কিছুমাত্র শুধতে পারব কোনোদিন? আমার বড় ঋণ, তিনি সারাদিন গান করতেন। সাবলীল স্পষ্ট উচ্চারণে, সুরছন্দ ভাবতাৎপর্যের সরল উন্মোচন, এমন যেন আর হয় না। এই বিশেষণগুলো আমার মনে পরে এসেছে। তখন শোনার আনন্দে শুনতাম। বুঝতাম না তো কিছুই। গান যে এমন অনর্গল ধারায় ঝরে পড়তে পারে, কোনো মানব-ঝরনা থেকে, এ আমি পরের ছয় দশকে কোথাও দেখিনি। মনে হয় যেন তার সব গান, একটি দুটি ছাড়া – সবই রবীন্দ্রসঙ্গীত ছিল।
দেবীদা প্রায় সন্ধ্যায় আমাদের বৈঠকখানায় এসে আমার মামার সঙ্গে গল্প করতেন। তিনি বি.এসসি. পড়তেন, মামা আই. এ.। মামা খুব সোজা মানুষ ছিলেন, ফরসা তো ফরসা। একেবারে লালমুখো। দেবীদা দীর্ঘদেহী, চোখে কালো চশমা। সজল কালো মেঘের রং গায়ে, আলাভোলা। মামা একদিন বললেন, রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন বলেই কি তাঁর গানগুলোকে ভালো হতে হবে? তুমিই বলো দেবী? সদ্যই রবীন্দ্রসঙ্গীত কথাটা চালু হয়েছে। মামা বললেন, রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাহাত্ম্যটা কী? দেবীদা ভাবলেন, একটু পরে বললেন, শোনো। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন বলেই রবীন্দ্রসঙ্গীত এমন নয়। এমনকি তিনিই সুর দিয়েছেন তাতে, তা বলেও নয়। তাঁর হাজার দুই গানের অধিকাংশ এমন সুরেছন্দে গাঁথা যে, হাজার চেষ্টায়ও কেউ তার একটি স্বর বদলাতে পারবে না। রবীন্দ্রনাথ নিষেধ করেছেন বলে নয়। ওই পরিবর্তন গানটা নেবে না বলেই। এমনটা আর কোনো গানের বেলায় বলা যায় না। মামা কিছুই বুঝলেন না, কিন্তু নিরস্ত হলেন। আমি তৃতীয় শ্রেণির নয় বছরেরটি, বইয়ের আড়ালে পড়ার ভান করে, মনের খাতায় কথাটা অনপনেয় কালিতে লিখে রাখলাম।
চল্লিশেই খুব বড় দাঙ্গা হয় ঢাকায়। আমি গ্রামে ছিলাম। দোতলার কোনায় আমার ছোট্ট নিজের ঘর ছিল। বাড়ি ফিরে সে-ঘরে ঢুকতে গিয়ে অবাক। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত কয়েক সারি উঠে গেছে গ্রামোফোন রেকর্ডের সারি। একটা ফিলিপ্স্ হল্যান্ডের বারো ভালভের রেডিও। হারমোনিয়াম একটা দুটি। গ্রামোফোন বড় সাইজের। কোনো জায়গা নেই ঘরে যে শুই কি বসি। গৃহকর্তা রমেন্দ্রকুমার আঢ্য রেলওয়েতে নিতান্তই কেরানির চাকুরি করেন। অতগুলা পোষ্য, ছয়-সাতটা ছেলেমেয়ে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া, এক বিধবা দিদি, এক বিধবা ভ্রাতৃবধূ, এক চিরকুমারী নিজের বোন। বেতন শুনেছি, মাসে পঁয়ত্রিশ টাকা। নিশ্চয় ভুল শুনেছি। তবে একশত পঁয়ত্রিশ নয় নিশ্চয়ই। তার মধ্যে ওই বিপুল সাংস্কৃতিক বৈভব। শনিবারে আমাদের সবার পড়ার ছুটি। দোতলার বারান্দায় প্রথম রাত্রের আলো-আঁধারিতে আমরা গল্প করি, ডলিদি বড়দেরকে হারমোনিয়ম-যোগে গান শোনান ঘরে। আবারো বলি, এঁদের কথা যেন অপ্রাসঙ্গিকভাবেই বাড়িয়ে বলছি। তা নয়। মেটিরিয়াল কন্ডিশনকে ছাপিয়ে মানুষের উৎকর্ষের অভিযান চলবে, এই তো পরিশীলন-অর্থে যে-সংস্কৃতি – তার প্রাণের কথা। এ তাঁদের কাছ থেকে পেয়েছি। তখনকার ঢাকার কাছে পেয়েছি। সারাজীবন মাথায় ধরে রেখেছি এ-শিক্ষাকে। শুধুই ভাষায় আর গানে নয়, প্রণোদনা নয়, একটি পরিশীলিত-চিত্ত জীবনের তৃষ্ণাতাপ আমার মধ্যে সঞ্চার করেছিলেন। আমি ধন্য।
ছাপ্পান্ন থেকে পিছিয়ে গেলাম অনেকটা। বিয়ের পর প্রথম বড় কাজ শান্তিনিকেতন সন্দর্শন। আরমেনিটোলা স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তাম তখন, বাংলা পাঠ্যবই ছিল বাহার ও নাহারের কিশোর-সাথী। তাতে ছিল শান্তিনিকেতনের কথা। আর আশ্রমে সকলের দ্বারা পরিবেষ্টিত রবীন্দ্রনাথের ছবি। আগের বছর বাংলা বই পড়িয়েছিল মালিকা ড. করুণাকণা দাশগুপ্তা গোল্ড মেডালিস্টের। শৈশবেই রবীন্দ্রনাথের ও শান্তিনিকেতনের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেছি তাই। দিনে দিনে তা স্বপ্ন হয়ে আমাকে ছেয়েছে।
গিয়ে উঠলাম রুচিরা নামের বাড়িতে, পূর্ব পল্লী বা গুরুপল্লীতে। প্রবোধ সেন মশাইয়ের বাড়ি। প্রবোধচন্দ্র সেন। রবীন্দ্র-অধ্যাপক। সন্জীদার এম. এ. থিসিসের গাইড এবং কাকাবাবু। রুচিরা তাঁর স্ত্রীর নাম। তাদের জ্যেষ্ঠ কন্যার নাম অপালা। আমি দুই গুরুর একলব্য শিষ্য। ইতিহাস-জিজ্ঞাসায় রবীন্দ্রসন্ধানে গুরু প্রবোধচন্দ্র সেন। সঙ্গীত রবীন্দ্রসঙ্গীত অনুধাবনে গুরু শৈলজারঞ্জন মজুমদার। আমাদের ওপর প্রবোধ সেন মশাইয়ের প্রভাব বোঝা যাবে আমাদের দুই মেয়ের নামে। জ্যেষ্ঠা অপালা, কনিষ্ঠা রুচিরা। কাকাবাবুর সঙ্গে চায়ের টেবিল সাঙ্গ হতো দুপুরের খাবারের ডাকে। বিকেলের চায়ের আড্ডা চলত গভীর রাত পর্যন্ত। তিনদিন, চারদিন। কাকিমা অতিষ্ঠ হয়ে উঠতেন। কাকাবাবু আমাকে প্রথম জানান ঔরঙ্গজেবের সেই আম-নামকরণ, সুধারস ও রসনাবিলাস, বিষয়ে। পরে ঔরঙ্গজেবের পত্রাবলির বিলিমোরিয়াকৃত অনুবাদে সম্রাটের সেই নামকরণ-চিঠি পাই। শিখ মিস্টিসিজমের ঘনিষ্ঠ ছাত্র ছিলেন ঔরঙ্গজেব, সে-কথা অনেক তাঁর কিংবা সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের বইয়ে পাই। কাকাবাবু আমাকে অশোক-বিষয়ে আমার মনে সিংহদরজা কাটেন – এবং ভারত-সন্ধানেও আগ্রহী করে তোলেন। রবীন্দ্রনাথ যে জীবনের শেষ দশ বছরে শুধুই অজ্ঞেয়বাদী ছিলেন, স্পষ্টত সংশয়বাদী ও শেষাবধি নাস্তিক ছিলেন, সে-বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, বলেন রবীন্দ্রনাথের শেষ সাহিত্য থেকে উদ্ধৃতি উদাহরণ দিয়ে। কাকাবাবু একটা লার্নিংয়ের রেশমগুটি বানিয়ে তার ভিতরে বাস করতেন। তা বলে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কম ছিল না। আমাকে বলতেন, দেখ, দুই বাংলা এখনকার মতো তো দুই থাকবে না। অনেক কাছে আসবে এবং তা হবে তোমাদেরই নেতৃত্বে। দেখো, যেন তোমরা একেবারে মিলে যেও না। ফেডারেটেড স্টেট করো – বাঙালি হিন্দু খুব নির্ভরযোগ্য বন্ধু নয়। সঙ্গীতবিষয়ে তাঁর কিছু বলবার ছিল না। শৈলজারঞ্জনের ওপরে অগাধ নির্ভর ছিল তাঁর সে-বিষয়ে।
কাকাবাবুর ছোট মেয়ে টুসু – সুগতা সেন। তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। প্রথম দিনেই কাকাবাবু তাকে গাইড করে আমাকে শান্তিনিকেতন সবটা দেখে নিতে পাঠালেন। যদিও সন্জীদা তো হাফ-আশ্রমকন্যা – আমার সঙ্গেই ছিলেন। টুসু অপূর্ব সুন্দরী ছিল। পরীটা। হালকা গোলাপি ফ্রকে সে সেদিনের বিকেলটাকে রাঙিয়ে দিয়েছিল। ও বিশ্বাস করেনি যে এক মুসলিম দম্পতিকে পাশে করে আশ্রম পরিক্রমা করছে। সন্জীদাদিকে তো চিনি (অর্থাৎ তিনি আর মুসলিম নন), আর আপনি যে নিজেকে মুসলমান বলছেন, সে আমি বিশ্বাস করি না। অবশ্যই মজা করছেন। আমরা আসলেই ‘আপন মনের বিকারটারে’ হিন্দু-মুসলিম নামের আড়ালে পুষতে থাকি। সন্ধের পরে গান শোনাল সে। সেই আমি শান্তিনিকেতনকে প্রথম পেলাম। উচ্চগ্রামে ধরল ‘ওগো পথের সাথী, নমি বারংবার’। ওই কচি ক্ষুরধার কণ্ঠে দেবব্রতকে লজ্জা দেবার মতো মডুলেশন করল সে-মেয়ে। এ-গান পরে কত শুনেছি, শিখিয়েছি – কোনোটাই টুসুর ধারে-কাছে যায়নি। তারপরে গাইল ‘দিনান্ত বেলায় শেষের ফসল’। আগে শুনিনি, বুঁদ হয়ে শুনলাম। এ-গানটির প্রসঙ্গ আবার করব, ভাবছি। রবীন্দ্রনাথের গান, সম্ভবত যে-কোনো গানই যে তার স্বরলিপিরই অবিকল রূপায়ণ, একথা কেউ বলে না। স্বরলিপি – অতিরিক্ত অনেক কিছু থাকে গানে। কিন্তু কেউ বলতে পারে না কী সে অতিরিক্ত। টুসুর গানে পেলাম সেই আদর্শ অতিরিক্তকে। ও খোলা গলায় উচ্চ কণ্ঠে গাইল গানদুটি বেশ প্রবল করে। সেই প্রবলতা আমাদেরকে ধরল পরম আদরে। গ্রামের গান যেমন করে পা বিকট আওয়াজকে ছাপিয়ে নিয়ে যায় কোনো স্নিগ্ধ মনগহীনে।
দ্বিতীয় দিনে সন্ধের পর নিয়মমতো ‘গান’ হলো। দিক্পালদের একজন নিলীমা সেন এলেন। বাচ্চুদি। ঢাকার বিদগাঁও কিংবা ব্যাজগাঁও এলাকার মেয়ে। কাকাবাবুর ভাই অমিয় সেনের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গুপ্তা থেকে সেন হয়েছেন। বিয়ের আগে থেকে শান্তিনিকেতনবাসী। অমিয়কুমার সেন বিশ্বভারতীর (শান্তিনিকেতনের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম) কর্মাধ্যক্ষ হয়েছিলেন, পরে মাদ্রাজ অঞ্চলেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন-অধিকর্তা ছিলেন। বাচ্চুদির পাথরে কোঁদা চেহারা। কষ্টি পাথরেই যেন। এবং উঁচুতে-পাশে বাঙালি মেয়েদের চাইতে ভিন্ন মাপের। বড়ো। মানুষটা ঠান্ডা, উত্তেজনাহীন। তাঁর অনুভূতি যেন মুখে খেলে না, বুকে জমে থাকে না। যেন ওই প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলাম। ‘অসীম ধন তো আছে তোমার, তাহে সাধ না মেটে’। সাধ না মেটের পরে কতগুলো মোটা কাজ যেন শক্তি হয়ে ঝরল। পরের চরণে ‘নিতে চাও তা আমার হাতে কণায় কণায় বেঁটে’ আমার হাতে বলতে কী করলেন মনে হলো ওই যেন প্রথম মীড় শুনলাম। মীড় ধ্রুপদের নিজস্ব অলঙ্কার। খেয়াল গানেতে খুব একটা নেই। কোনো কোনো খেয়াল গায়ক একটাও মীড় প্রয়োগ না করে দিব্যি আধঘণ্টার একটা খেয়াল গেয়ে ওঠেন। আগের বাংলা গানে মীড় প্রায় ছিল না। যেমন ছিল না ঢাকার গৌরব ভগবান দাসের সেতারে। মীড় ব্যবহার করতেন না বলে দীর্ঘ রেশের প্রয়োজন হতো না। তরপ ছাড়া যন্ত্রেও তাঁর কোনো অসুবিধা হতো না। কেবলই বোলবাণী আর ছন্দের ঝনঝনা। রাগের প্রকাশ কম, গতের গতি-চাতুরি দিয়ে তাঁর মনোহর বাজনা সাজানো ছিল।
রবীন্দ্রনাথের গান গড়নেও ধ্রুপদধর্মী, ‘রূপবর্ণছন্দে’ও ধ্রুপদধর্মী। এর প্রধান কারণ তাঁর উদার মীড়-প্রয়োগ। তিনি শেষের দিকে কাতর মিনতি করে বলতেন, আমার গান একটু দরদ দিয়ে, একটু মীড় দিয়ে গেও – যেন চিনতে পারি আমার গান বলে। বিষময় ফল হয়েছিল তাতে, কবিগুরু-প্রয়াণের দুই দশকের মধ্যে। তার গানকে এমন মীড়িয়ে এবং গলা বাজিয়ে গাওয়া আরম্ভ হলো যে আমি নিশ্চিত বাগগেয়কার সেই মানুষ তা শুনতে পেলে, আমার বিশ্বাস, বলতেন, থাক বাপু, আমার মিনতি ফিরিয়ে নিচ্ছি, অনেক মীড় করেছ, মীড়ে-মীড়ে অন্ধকার। আর মীড়ে কাজ নেই। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে রবীন্দ্রনাথের গান ছিল চলচ্চিত্রের এক মূলনির্ভর। ষাট সাল পড়তে তাঁর গান, গায়ক-গায়িকার কণ্ঠে সুর ছেড়ে মীড় ধরল। উদ্দীপনার গান, ‘প্রাণ-পোড়ানো’ গান তাঁর হয়ে দাঁড়াল ঘুমপাড়ানি গান। অবাক হয়ে শুনলাম বাচ্চুদির মীড়। পেটের ভিতরটা কেমন করে উঠল, মনটা উঠল মুচড়ে। সাবলীল নিষ্কম্প কণ্ঠটি যেন সুরপক্ষটিকে একটা লুপের আকারে চিরে গেল। চিনলাম নীলিমা সেনকে। আমার এক আত্মার আত্মীয় পেলাম। তাঁর জীবন-শেষ অবধি তাঁরও স্নেহ-বন্ধুতা পেয়েছি। শান্তিনিকেতনের পথে রিকশায় যাচ্ছি। আমি প্রসঙ্গ করছিলাম প্রত্যন্ত, বিশেষ করে উত্তর-প্রত্যন্ত স্বরগুলো কেমন করে লাগাতে হবে তা নিয়ে। তিনি বললেন, ঠিক তাই। আমরা মেয়েরা যেমন ঘর ঝাঁট দেবার সময়ে ঘরের কোনাগুলো থেকে ঝাড়ুটা ছুঁচলো করে বিশেষ যত্ন করে ময়লা টেনে আনি, অনেকটা সেই রকম করতে হয়।
কণ্ঠশীলনের দেড়-ডজন ছেলেমেয়ে পুরী-কোণারকের তীর্থ সেরে দেশে ফিরবার পথে শান্তিনিকেতনে ঢুঁ মারল একবার। বিকেলে সকলে সাজুগুজো করে অভিযান করলাম বাচ্চুদির বাড়ির লক্ষ্যে। বাচ্চুদির বাড়িতে সচরাচর কেউ যেতে চায় না। ওটা একেবারেই আড্ডার জায়গা নয়। বাচ্চুদি এবং আড্ডা – ভাবাই যায় না। আমার আড্ডা ছিল শান্তিনিকেতনের কিছু দাপুটে অনেকটা বাউন্ডুলে নিয়মকানুন না-মানা অধ্যাপকের সঙ্গে। আমাদের মধ্যমণি ছিল শচীন গাঙ্গুলি। গভীর রাতে গুরুপল্লীর রাস্তায় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মনগড়া যেমন-আসে সুরে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে বেড়াতে তাদের আনন্দ ছিল। মানামানি আবার কী, শচীনের ভাবখানা ছিল তাই। সেই শচীন বাচ্চুদির বাড়ি যাবো শুনলে অন্য পথ ধরত। ওটা সিরিয়াস মানুষের বাড়ি, আমাদের মতো ফচকেদের জন্যে নয়, বলত সেই বিশ্বখ্যাত মার্কিসস্ট দার্শনিকপ্রবর।
আমরা আবার হাজির বাচ্চুদির বসবার ঘরে। বাচ্চুদি নির্বিকার। সবাই ধরল, বাচ্চুদি গান শুনব। সব্বোনাশ, – এ-অনুরোধ তো এ-তল্লাটে কেউ গত বিশ-ত্রিশ বছরে করেনি। ছেলেমেয়েরা তো জানে না, তাই পারল ওইসব কথা বলতে। বাচ্চুদি হারমোনিয়ম বাজিয়ে গান করেন না, পছন্দ করেন না কেউ তা করলে। তানপুরা চাই। বাসার তানপুরাটায় দেখা গেল বছর দশেক কেউ হাত ছোঁয়ায়নি। কাকে যেন পাঠালেন সঙ্গীতভবন থেকে তানপুরা আনতে। আমাদের সকলের অপেক্ষার উসুখুসু। হঠাৎ আলতাফ বলে ওঠে, বাচ্চুদি, ভালো বাংলা উচ্চারণের মূল কথা কী? অ্যাইরে, সেরেছে। বাচ্চুদি পূর্বাপরের মতোই নির্বিকার। ধীরে ধীরে অনুচ্চ কিন্তু দৃঢ়কণ্ঠে বললেন – স্পষ্টোচ্চারণ। কণ্ঠশীলন উচ্চার্য বাংলা চর্চার প্রতিষ্ঠান। আশীর্বাদের মতো, তিমিরে হঠাৎ আলোর মতো এলো বাচ্চুদির সেই উত্তর। কণ্ঠশীলনের পাঠক্রমশেষের পরীক্ষায় প্রতিবারেই প্রশ্ন করি, বাংলা সুবাচনের সুবর্ণ সূত্র কী? উত্তর দেয় ছেলেমেয়েরা, স্পষ্টোচ্চারণ।
আচার্য শৈলজারঞ্জনের দুই প্রধান শিষ্য – কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেন। প্রকৃতপক্ষে কলকাতা-ভিত্তিক পঙ্কজ মল্লিক মশাইরা ছাড়া আর প্রায় সকল প্রধান শিল্পী, ত্রিশ থেকে চার দশকের, শৈলজারঞ্জনের পায়ের কাছে বসেছেন। তার মধ্যে নানা কারণে ওই দুজনকে প্রধান মানা হয়। স্বয়ং আবু সয়ীদ আইয়ুব সম্ভবত নীলিমার প্রতি পক্ষপাতী ছিলেন। আমারও কখনো কখনো তেমন লাগে। কিন্তু কণিকা – আমাদের মোহরদি – তাঁর কোনো তুলনা নেই কোথাও। তাঁরা দুজন একই গুরুর শিক্ষায়, বলতে গেলে একই ঘরানার গাইয়ে (শৈলজারঞ্জন বলতেন রবীন্দ্র-ঘরানার), কিন্তু কতই সুস্পষ্টভাবে পৃথক তাদের গায়ন। সর্বদিকের বিচারে, সর্বলোকের বিচারে মোহরদিই সবার সেরা। কেন? শত কারণ তার, শত শ্রেষ্ঠতা।
সেই মোহরদিকে পেয়ে যাই ক্লাসের ফাঁকে গাছতলায়। ওঁর জন্মকর্ম সব শান্তিনিকেতনে। বিয়ে, তাও। শান্তিনিকেতন বলতে যদি একটা কোনো লোককে বোঝাত, সে মোহরদি। প্রচলিত অপ্রচলিত সর্ব অর্থে সুন্দরী। এবং সদানন্দ সদাপ্রফুল্ল সহজ মেলামেশার মানুষ। ঘরেই আছেন এমন করেই আমাদেরকে গ্রহণ করলেন। সন্জীদা তো ওদের ঘরের মেয়ে। আমি জামাই মানুষ, তাকালেন খুব স্নেহ করে (আমার চাইতে নয় বছরের বড়)। বললেন, গজল গাও? আমার বাড়ি এসো সন্ধ্যায়। গান শুনব। ভয় পেলাম, কিন্তু তা আমার তাঁর বাড়িতে যাওয়া থেকে ঠেকাতে পারলো না। তাঁর অ্যান্ডরুজ পল্লীর দোতলা বাড়ি তখনও অনেক দূরে। পিতা ‘সত্যদা’ – সত্য মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতেই গেলাম বুঝি। নাকি স্বামী বীরেনদা, বীরেন বন্দ্যোপাধ্যায়ই বাসা করেছিলেন দুজনে, আমার খেয়াল নেই। কুঞ্জ কুঞ্জভাবের একটা বাড়ি। বললাম, মুসলমান-মাত্রেই গান গায় এ-কোনো কথা নয়। তার ওপর গজল নামের বিজাতীয় গান? আপনার গান শুনব বলে কত দূর থেকে, কত কাল ধরে চলতে চলতে এসেছি। আপনি গান করুন। কী গান করব ভাই? বিপদ। হঠাৎ মনে এলো কোন কালে একটা অতুলপ্রসাদ তিনি রেকর্ড করেছিলেন, ‘রইল কথা তোমারি নাথ, তুমি জয়ী হলে/ ঘুরে ফিরে এলাম আবার তোমার চরণতলে’। শুনতে চাইলাম, কিছুটা অবাক হলেন কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ধরলেন।আমি গানটা ততটা নয়, মানুষটাকে শতচক্ষু হয়ে গিলতে থাকলাম। সে আমার নিজের শোনবার পদ্ধতি। শৈলজাদার শিক্ষায় যে-শিল্পী মানুষ হয়েছে, তাদের সবটা গান সব ভালো করে শুনতে হলে সুর যেখানটায় উত্থিত হচ্ছে তাকেও নিরিখ করে দেখতে থাকা চাই। এ পরে বুঝেছি। ওই প্রথম আমার মোহরদির গান শোনা, তাঁর গানের শক্তি আমাকে বাধ্য করেছিল দেখতে যে এই শক্তিটা তৈরি হয় কী করে। ‘তুমি জয়ী হলে’, ‘তোমার চরণতলে’ জায়গাগুলোতে ‘জয়ী হলে’ ‘চরণতলে’ জায়গাগুলোতে অপূর্ব মীড় লাগালেন তিনি। এ তিনি কোথায় পেলেন? ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাব না’ গানে ‘চাঁদের মতো অলখ টানে জোয়ারে ঢেউ তোলাব’ চরণে ‘ঢেউ’ শব্দে যে-মীড় তা সরাসরি কলজেয় গিয়ে লাগে, তিনি গাইলে। ‘মধুযামিনীরে’ গানে ‘যমুনাতীরে’ কথাটার শেষ এক মাত্রায় এক মাত্রার এক মীড়, মোহরদি গাইলে মনে হয় অনন্তকাল ধরে চলছে সে-মীড়। তাঁর এই পাগল-করা মীড়ের সঙ্গে ওই তাঁরবাসার প্রথম সন্দর্শনে পরিচয়, সে-কিছুতে ভোলার নয়। ওই অলোকসম্ভব মীড় সম্ভব হয় কী করে তা বহু পরে শৈলজাদার কাছে বসে দেখেছি। প্রথম দুই চরণ গেয়ে মোহরদি বললেন, আর যে মনে পড়ছে না ভাই। আর কোনো গান গেয়েছিলেন কিনা সে-সন্ধ্যায়, আমার মনে পড়ে না। মোহরদির কথা গানের চাইতে কম মিষ্টি ছিল না। কথা বলতে থাকলে মনে হতো গান শুনছি – এবং অতি উচ্চাঙ্গের। ওই কথন তিনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন, আহা! রবীন্দ্রনাথের কথন নিয়ে আহা মরি ছিল, দেশবিদেশের সর্বত্র। তার প্রভাব পড়েছে মোহরকণ্ঠে। নিশ্চিত করে জানি না। তবু জানি গানের সুরে ততটা, গানে যে কথন-সুর থাকে, কথন থাকে তার সত্যই গানকে সত্য করে তোলে। এই সত্য সহস্রচক্ষু হয়ে পান করলাম সেদিন। অনেক পরে একদিন কথায় কথায় তিনি বলেছিলেন, আমি এককালে আবৃত্তি করতাম, জানো? হ্যাঁ, জানতাম বইকি। উত্তর-কৈশোর সুন্দরীশ্রেষ্ঠা কলকাতার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন আবৃত্তি করতে। পেছনে এক দীর্ঘ শোভাযাত্রা মানুষের। সেই আবৃত্তির ঝলক পেয়ে যাই নৃত্যনাট্য-গীতিনাট্যে। মোহরদির বাচনটাই তাঁর গানের অনেকখানি। যেমনটা হয় বড়মাপের কীর্তনিয়াদের বেলায়।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.