॥ ১১ ॥

রশিদ সাধারণত সকাল নটা-সাড়ে নটার আগে ঘুম থেকে ওঠে না।

এখানে তার অফিস যাবারও বালাই নেই। তার বাড়িটাই অফিস। বেশ কিছু লোক খুব সকাল থেকে বসে থাকে বাড়ির সামনে। যারা তার স্বভাব জানে, তারা বেলা করে আসে। সাহেবের ঘুম ভাঙলেও তারপর বিছানায় শুয়েই চা পান করবেন আধঘণ্টা ধরে।

পুলিশের চাকরিতে অবশ্য নিজের শরীরটাকেও নানান অবস্থার জন্য উপযোগী করে নিতে হয়। এমন নিদ্রাবিলাসী রশিদকেও আমি কখনো দেখেছি ভোর চারটেয় উঠে চটপট তৈরি হয়ে নিতে। গোপীবল্লভপুরে নক্শাল দমন-অভিযানে সে পরপর দু রাত্রি ঘুমোয়নি।

প্রয়োজনে এরা সবই পারে।

শক্তি আর আমি পৌঁছেছি আগের রাত্রে। পূর্ণিমার রাত, চুঁচড়োর এই বাড়ির একেবারে পাশেই গঙ্গা। এখানে নদী বেশ চওড়া। চাঁদের আলোয় এই নদীকে মনে হয়েছিল স্বর্গের রাজপথ।

অনেক রাত পর্যন্ত চলছিল আড্ডা ও গান-বাজনা। নিজের কণ্ঠস্বর একেবারে বেসুরো, তবু গান সম্পর্কে এক তীব্র নেশা আছে রশিদের। চন্দননগর থেকে রশিদ ডেকে এনেছিল এক দম্পতিকে, সুজয় আর মধুছন্দা, এদের মধ্যে মধুছন্দা ক্লাসিকাল গানের তালিম নিচ্ছে এ টি কাননের কাছে। মেয়েটির কণ্ঠস্বর বেশ সুখশ্রাব্য!

গায়িকার স্বামীদের একটা দুর্বলতা আমি আগেও লক্ষ করেছি। স্ত্রীর গান শুনে যখন অন্যরা বাহবা দেয়, তখন, একসময় স্বামীটি ভাবে যে, তাকে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। কিন্তু সে-ই বা কম কীসে? সেও তখন গান জুড়ে দেয়।

ক্লাসিকাল নয়, সুজয় জানে লালন ফকিরের কয়েকটা গান। গলা তেমন তৈরি নয়। রশিদ বাংলা গান পছন্দ করে না। সুজয় গান গেয়ে উঠতেই রশিদ হাত তুলে বলেছিল, এখন নয়, এখন নয়, তুমি পরে গাইবে। মধুছন্দা পুরিয়া ধানেশ্রী গাইছে, সেই সুরটা নষ্ট করে দিও না।

কয়েক পাত্র হুইস্কি পেটে পড়ায় সুজয় অদম্য হয়ে ওঠে। সে আবার লালনের গান ধরবেই, রশিদ হঠাৎ রেগে উঠে বলেছিল, মারবো এক ঝাঁপড়! তোর গান কে শুনতে চেয়েছে রে? তোর বউকে ডেকেছি বলেই তুই পিছুপিছু এসেছিস কেন? বউকে একা ছাড়তে ভয় পাস? এরকম পুতুপুতু করে আগলে রাখলে তোর বউ কোনোদিন নাম করতে পারবে না!

শক্তি তখন প্রতিবাদ করে উঠেছিল।

শক্তি আবার উচ্চাঙ্গসংগীতের তেমন সমঝদার নয়। রাগ-রাগিণী চেনে না।

কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরে শোনে বটে, তারপরই নিজে কিছু গেয়ে ওঠার জন্য ওর ঠোঁট শুলশুলিয়ে ওঠে।

সে বললো, অ্যাই রশিদ! মধুছন্দা তো অনেকক্ষণই গেয়েছে, এখন সুজয় একটু গাইতে চাইছে, তুই থামাচ্ছিস কেন? একটু গাইতে দে না!

রশিদ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললো, ওগুলো আবার গান নাকি? খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কম্নে আসে যায়! এ তো আবৃত্তি, এতে সুর কোথায়?

শক্তি বললো, আর তোদের ওই ক্লাসিকাল গানে পোয়েট্রির কোনো স্থানই নেই। অতি অর্ডিনারি এক লাইন দু’ লাইন, তারপর একই সুর, রিপিট কথা, বেশিক্ষণ শোনা যায় না।

সুজয় বললো, লালনের গানে সুর নেই কে বললো?

ওদের তিনজনের মধ্যে তর্ক লেগে গেল। গান বন্ধ।

আমি নিরপেক্ষ।

ছোট বয়েস থেকে শুনছি বলে উচ্চাঙ্গসংগীত যেমন ভালো লাগে, তেমনই খুব পছন্দ পল্লীগীতি। আমি নিজে কখনো কখনো দু চারখানা গান লিখবো ভেবেছি, তা কিন্তু রবীন্দ্রসংগীত কিংবা আধুনিক গানের ধাঁচে নয়, সরল পল্লীগীতির মতন (লেখা হয়নি অবশ্য)।

হারমোনিয়ামের ওপর হাত রেখে চুপ করে বসে আছে মধুছন্দা, ভুরু দুটো কুঁচকে গেছে। মাঝপথে গান থেমে যাওয়া যেন প্রেমের কথার মাঝখানে হঠাৎ রাজনীতির দলাদলির প্রসঙ্গ তোলার মতন রসভঙ্গের ব্যাপার।

মেয়েটি বেশ সুশ্রী। মুখখানা বতিচেল্লির আঁকা মেয়েদের মতন ডিম্বাকারের। মাঝখানে সিঁথি-কাটা চুল আর ঘটি-হাতা ব্লাউজ পরা। গানের গলা বেশ ভালোই। ওর উচ্চাকাক্সক্ষা আছে, আজ প্রথমেই রশিদকে অনুযোগের সুরে বলেছিল, ওকে ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্সে গত বছর সুযোগ দেওয়া হবে বলেও বাদ দেওয়া হয়েছে শেষ মুহূর্তে।

ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্সের কর্মকর্তাদের সঙ্গে রশিদের পরিচয় আছে। তাছাড়া পুলিশের বড়কর্তাদের অনুরোধ ওরা অগ্রাহ্য করতে পারে না। সুতরাং রশিদ ইচ্ছে করলেই মেয়েটিকে সুযোগ করে দিতে পারে। এটাই মধুছন্দার আশা, তাই রশিদের সঙ্গে কথা বলার সময় ওর গলায় ফুটে ওঠে আধো-আধো ন্যাকামির সুর।

ডোভার লেন কনফারেন্সে প্রতিবছর রবিশঙ্কর-আলি আকবর খান এসে বাজান, রসুলন বাঈ, কিশোরী আমোনকর গান করেন, সেখানে কি এই মেয়েটি গান গাইবার যোগ্য? দু’ চারজন লোকাল আর্টিস্টকে সন্ধের দিকে আসর জমে ওঠার আগে সুযোগ দেওয়া হয়। তাতে চান্স পেতে পারে, কিন্তু সে-সুযোগ পেলেও বেশিদূর যাবার সম্ভাবনা ওর নেই। ওকে লোকাল আর্টিস্ট হয়েই থাকতে হবে সারাজীবন।

ইদানীং দেখেছি, গায়িকাদের শুধু ভালো গান জানলেই চলে না, চেহারাটাও সুন্দর হওয়া চাই।

গানের জগতে একমাত্র লতা মুঙ্গেশকরই এক দারুণ ব্যতিক্রম। ভদ্রমহিলার রূপ নেই, মুখে-চোখেও লাবণ্য নেই, গত পঞ্চাশ বছর ধরে গানের জগতের রানি। বিশ্বরেকর্ড, এ পর্যন্ত কেউ এত বেশি সংখ্যক গান রেকর্ড করেনি। দশ হাজারেরও বেশি, ওঁর ধারে-কাছে আর কেউ নেই।

লতা মুঙ্গেশকর সত্যিই অদ্বিতীয়া, একমাত্র উনিই বলতে পারেন, রূপে তোমায় ভুলাবো না, ভালোবাসায় ভুলাবো। আমি হাত দিয়ে দ্বার খুলবো না গো, গান দিয়ে দ্বার খোলাবো!

অন্যসব গায়িকাদেরই তেমন রূপ থাক বা না-থাক, সাজগোজ করে সুন্দরী সাজতে হয়। বিদেশিনী গায়িকাদের আবার নাচ না জানলে চলে না। কোমর যদি সরু না হয়, তাহলে সে-গায়িকাকে বিদায় নিতে হয় গানের জগৎ থেকে।

মধুছন্দা অবশ্য রূপের পরীক্ষায় ভালোভাবেই পাশ করে যাবে। কিন্তু ও সুজয়ের মতন একটা আস্ত গাড়লকে বিয়ে করতে গেল কেন? শুধু তাই-ই নয়, এরই মধ্যে দুটি ছেলেমেয়ে। অর্থাৎ হোপলেস কেস। স্বামী-ছেলেমেয়ে নিয়ে ভালোভাবে সংসার করবে, আর গান-বাজনার সাধনাও চালাবে, এ সম্ভব নয়। শিল্পের জগতে টিকে থাকা অত সহজ নয়।

সুজয় এখন রীতিমতন গাঁক-গাঁক করে চ্যাঁচাচ্ছে।

দু’ পেগ হুইস্কিই মাথায় চড়ে গেছে ওর। রশিদ নিজে সহসা মাতাল হয় না, মাতালদের একেবারে পছন্দ করে না, একমাত্র শক্তিকেই প্রশ্রয় দেয়। শক্তির মাতলামি অনেকটা ছেলেমানুষি খেলার মতন।

শক্তি প্রথমে সুজয়ের পক্ষ নিয়ে তর্ক করছিল রশিদের সঙ্গে, এখন সুজয়ের বেসুরো চিৎকারে সে বেশ বিরক্ত। দু’জনের মধ্যে সন্ধি করাবার জন্য সে নিজে একটা গান গেয়ে উঠল। ‘আহা, তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা…।’ শক্তি কোন গানটা গাইছে শুনলেই বোঝা যায়, সে কটা পেগ খেয়েছে। এই গান মানে চার পেগ। ‘বঁধু তোমায় করবো রাজা’ পাঁচ পেগ।

শক্তির গানের মাঝখানেও কথা বলতে লাগলো সুজয়।

এবার শক্তির মেজাজ টং। সে সুজয়ের পিঠে একটা ঠেলা দিয়ে বললো, এই শালা, চুপ করবি কি-না!

সুজয় শক্তির দিকে রক্তাক্ত চোখে তাকিয়ে বললো, তুমি আমার গায়ে হাত দিলে কেন?

মধুছন্দা তার স্বামীকে সামলাবার জন্য বললো, এই চুপ করো না, প্লিজ! উনি গান গাইছেন।

সুজয় বললো, ও আমার গায়ে হাত দিল কেন?

রশিদ বললো, এই এসব দিল্লাগি থামাও তো। আর গান কারুর গাইবার দরকার নেই। আমি আমির খাঁ সাহেবের রেকর্ড লাগাবো। সবাই চুপ করে থাকবে।

সুজয় বললো, কে দিল্লাগি করছে; শালা, কালচার মারাচ্ছো? আমির খানের বোরিং গান এখন শুনতে হবে? গানের কী বোঝো তুমি?

রশিদ খুব ভদ্র। এ-সময় সে যদি বলতো ছেলেটিকে যে, তুমি এবার বাড়ি যাও, তাহলে দোষের কিছু হতো না।

সুজয়ের হাতে এখন হুইস্কির বোতলটা, সে কাঁচা চুমুক দিচ্ছে।

রশিদ শুধু শান্তভাবে বললো, বোতলটা নামিয়ে রাখো।

মধুছন্দা বললো, দেখেছেন তো! সব জায়গায় গিয়ে ও এরকম মাতলামি করে। এরপর আর আমাকে কেউ ডাকবে? ও-ই আমার কেরিয়ার নষ্ট করে দেবে।

সুজয় একটা হুংকার দিয়ে বললো, কী আমি তোমার কেরিয়ার নষ্ট করে দিচ্ছি? আমি তোমায় সব জায়গায় নিয়ে যাই, যত শালা লম্পট, ধান্দাবাজ, ছুতো করে তোমার গায়ে হাত দেয়, আমি সামলাই বলে…।এরপর ব্যাপারটা খুব বিচ্ছিরি দিকে গড়ালো। শুরু হলো স্বামী-স্ত্রীর প্রবল ঝগড়া। সুজয়ের মুখের ভাষাই শুধু ক্রমশ খারাপ হতে লাগলো না, সে ফট করে এক চড় কষিয়ে দিল স্ত্রীর গালে।

শক্তি তাকে জোর করে সরিয়ে দিতে গেলে সে শক্তিকেও মারলো এক লাথি। তারপর এক ধুন্ধুমার কাণ্ড।

আমি সেখান থেকে উঠে গিয়ে ওদিককার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম গঙ্গার জলে জ্যোৎস্নার খেলা।

একসময় সুজয় দুপদুপিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে চেঁচিয়ে তার স্ত্রীকে বললো, তুই থাক এখানে। এই লম্পটগুলোর সঙ্গে ফুর্তি কর, যা খুশি কর। আমি আর কোনোদিন তোর মুখ দেখতে চাই না।

সত্যিই সে চলে গেল তার গাড়ি নিয়ে।

রশিদ মধুছন্দাকে বললো, একটু চুপ করে বসে থাকো, তারপর আমার গাড়ি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে!

মধুছন্দা আড়ষ্টভাবে বললো, না, আমি বাড়ি যাবো না। আজ ফিরে গেলেই ও আমাকে মারবে। বেল্ট দিয়ে পেটাবে!

শক্তি বললো, তোমাকে মারে? আগে মেরেছে?

মধুছন্দা বললো, অনেকবার। দেখুন না, পিঠে দাগ আছে।

আঁচল ফেলে দিয়ে সে পিঠের দিকের ব্লাউজটা তোলার চেষ্টা করতেই রশিদ বললো, থাক, থাক।

শক্তি বললো, রশিদ, ও ব্যাটাকে এক্ষুনি অ্যারেস্ট করাও। তারপর জমাদারদের দিয়ে ওকে আচ্ছা করে পেটাও।

রশিদ বললো, স্বামীটাকে থানায় এনে মার খাওয়ালেই কি তার বউয়ের সঙ্গে ভাব হয়ে যাবে? আমাদের অভিজ্ঞতা অন্যরকম। এই যে আজকে ওদের দু’জনের ঝগড়া হলো, এটা কি শুধু হঠাৎ আজকের ব্যাপার? এর গভীরে অনেক কিছু আছে।

আমি কাছে এসে মধুছন্দাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার স্বামী তোমাকে মারে, তুমি একজন শিক্ষিত মেয়ে, একজন শিল্পী, তুমি প্রতিবাদ করতে পারো না?

মধুছন্দা মুখ নিচু করে বললো, কী করে প্রতিবাদ করবো? আমি কি গায়ের জোরে পারবো ওর সঙ্গে? আর মদ খেলে ওর গায়ে যেন অসুরের শক্তি হয়।

– অন্য কোথাও চলে যেতে পারো না?

– কোথায় যাবো?

– আপাতত বাপের বাড়ি। তারপর অন্য একটা ব্যবস্থা করে নিতে পারো।

– বাপের বাড়ি? হুঁঃ! মা-কে তো প্রায় মনেই পড়ে না। বাবাও চলে গেছেন তিন বছর আগে। এক দাদা, সে-ই ও-বাড়িতে থাকে।

– সেই দাদা তোমাকে…

– দাদাকে দেখলেই আমার ভয় করে। কেন জানেন? নিজের মুখে বলতে আমার লজ্জা নেই। আমার যখন চোদ্দ বছর বয়েস, আমার দাদা, আমার আপন দাদা, মায়ের পেটের ভাই, এক রাত্তিরে আমাকে রেপ করার চেষ্টা করেছিল। আমি ওর হাত কামড়ে দিয়ে কোনোরকমে পালিয়ে যাই। ওর হাতে এখনো সেই দাগ আছে। আপনারা বিশ্বাস করছেন না, তাই না?

রশিদ বললো, ইনসেস্ট এমন কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। অনেক ফ্যামিলিতেই… মেয়েরা মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না!

মধুছন্দা বললো, সেই থেকে আমি একা কখনো দাদার সামনে যাই না। বাবা চলে যাবার পর ও-বাড়িতে আমি আর একবারও যাইনি!

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার দাদা কী করেন?

– একটা বিজ্ঞাপন কম্পানিতে কাজ করে। কমার্শিয়াল আর্টিস্ট।

– কমার্শিয়াল আর্টিস্ট। হয়তো অন্যদিক দিয়ে স্বাভাবিক লোক। একবার তোমার ওপর জোর করেছিল, এখন তার জন্য অনুতাপও করতে পারে।

– ওর চোখ দেখলে আপনি বুঝতেন। আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে চায়। ওর ধারণা, আমি বাবাকে বলে দিয়েছি। বলিনি কিন্তু, সত্যি বলিনি। এই আপনাদের কাছেই প্রথম। দাদা আমাকে একা পেলে খুনও করে ফেলতে পারে।

আমি রশিদের দিকে তাকালাম।

রশিদ আস্তে আস্তে বললো, কোয়ায়েট লাইক্লি। এনিথিং ক্যান হ্যাপেন। এক একটা মানুষ সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। কিন্তু সেক্শুয়াল পারভারশানের জন্য হঠাৎ সাংঘাতিক কিছু করে ফেলতে পারে। এইসব কেসে কী হয় জানো? ওর দাদাটা যদি মধুছন্দাকে একবার রেপ করে ফেলতো, তারপর ওর অনুতাপ হতে পারতো, হয়তো আত্মহত্যাও করতো। কিন্তু কিছু করতে পারেনি তো, তাই ফিক্সেশান হয়ে গেছে, এই বোনকে ও আবার রেপ করার চেষ্টা করবে, অথবা খুন করে ফেলাও আশ্চর্য কিছু নয়।

– অর্থাৎ, স্বামীর অত্যাচার থেকে বাঁচবার জন্য এই গায়িকাটির কোথাও যাবার জায়গা নেই। বিয়ে করতে গেলে কেন?

– কপাল! আমি আজ রাত্তিরটা এখানেই থাকবো। তারপর কাল সকালে চলে যাবো দক্ষিণেশ্বরে। ওখানে আমার এক মাসতুতো বোন থাকে।

শক্তি অস্থিরভাবে বললো, না, না, এখানে থাকবে কী! আজ রাত্তিরেই তোমাকে অন্য কোথাও যেতে হবে। এখানে আমরা আছি। কাল সকালে তোমার বরটা এসে যদি আমাদের নামে যা-তা কিছু বলে।

রশিদ বললো, দ্যাট ইজ নো প্রবলেম। এখানে আমার বউ আছে, দুটো মেয়ে আছে। ও তাদের সঙ্গে থাকবে। আমার বউ হচ্ছে, জুলিয়াস সিজারের বউয়ের মতন সব অভিযোগের ঊর্ধ্বে!

এ-বাড়িটা এতই বড় যে এক প্রান্তে কিছু ঘটলে, অন্য প্রান্তে তা টেরও পাওয়া যায় না। নাসিম কখনো আমাদের মদের আসরে যোগ দেয় না। সে তার মেয়েদের নিয়ে অন্য মহলে টিভিতে সিনেমা দেখছে।

রশিদ মধুছন্দাকে পৌঁছে দিয়ে এলো নাসিমের কাছে। এরপর পান-আহার নিয়ে আমরা আরও দেড়ঘণ্টা জেগে ছিলাম। কিন্তু আড্ডা আর তেমন জমলো না।

শক্তির গলা জড়িয়ে আসতেই আসর ভেঙে গেল।

আমি আরও কিছুক্ষণ একা বসে রইলাম বারান্দায়। মনটা প্রকৃতির দিকে ফেরাবার চেষ্টা করতেও বারবার মনে পড়তে লাগলো মধুছন্দার কথা।

আজ খানিক আগে যা ঘটলো, তার ফলেই কি বিয়ে ভেঙে যাবে সুজয় আর মধুছন্দার? এর জন্যে কি আমরাও কিছুটা দায়ী?

সুন্দরী স্ত্রীকে নিয়ে সুজয়ের মনে নিশ্চয়ই হীনমন্যতা বোধ জমেছে বেশ কিছুদিন ধরে? এই স্ত্রীকে নিয়ে যেখানেই সে যায়, তার গায়িকা স্ত্রীর প্রতিই সবাই মনোযোগ দেয়। সুজয় একটা দেয়াশলাই কাঠির কম্পানি করে মোটামুটি ভালোই রোজগার করে, তবু ওকে কে গ্রাহ্য করবে?

স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হলে স্ত্রীর জীবনই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কোথায় যাবে এখন মধুছন্দা! আজকাল এই ধরনের কোনো ঘটনা শুনলেই আনোয়ারার কথা মনে পড়ে। সে-ও কি শামীমের সঙ্গে এই ধরনের ঝগড়া করেছিল?

শামীম কক্ষনো আনোয়ারাকে শারীরিকভাবে অত্যাচার করতে পারে না। মধুছন্দার আরও একটি বিপদ, তার দুটি ছেলেমেয়ে আছে। তাদের নিয়ে কী হবে?

ইজি চেয়ারে বসে বসে ঝিমুনি আসতেই আমি দেখতে পেলাম, কাঁদতে কাঁদতে একটা দূরপাল্লার ট্রেনে উঠে পড়ছে মধুছন্দা। স্বামীকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। বাচ্চা দুটোকেও ফেলে এলো। ঠিক এইভাবে চলে এসেছিল আনোয়ারা।

ট্রেন থেকে মধুছন্দা যেখানে নামলো, সে-জায়গাটা তো চেনা। মুম্বাইয়ের চার্চ গেট স্টেশান। সেখান থেকে বেরিয়ে একটা অটো ধরলো। ঠিক যেন সিনেমার মতন দেখতে পাচ্ছি।

এটা কোন বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উঠছে মধুছন্দা? তিনতলায় একটা ফ্ল্যাটের দরজা। নাম লেখা আছে, কিন্তু সেটা পড়ার আগেই দরজা খুলে গেল।

একজন শক্ত চেহারার মাঝবয়েসি মানুষ, মুখখানা চৌকো ধরনের, বেশ পুরুষ্টু গোঁফ। মধুছন্দা কেঁদে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার বুকে।

ব্যাস, এখানেই শেষ।

আমার চোখ খুলে গেল, হাত বাড়ালাম সিগারেটের প্যাকেটের দিকে।

এটা কি স্বপ্ন, না ভবিষ্যতের ছবি?

ভবিষ্যতের ছবি আমি দেখবো কী করে, আমার সে-ক্ষমতা নেই। স্বপ্নই, কিন্তু ওই যে লোকটাকে দেখলাম, সে কে? আমি জীবনে ওকে কখনো দেখিনি। ওর চেহারাটা আমি কল্পনায় তৈরি করলাম? গোঁফ-টোঁফ সুদ্ধ?

লোকটা ভালোও হতে পারে, খারাপও হতে পারে। হয়তো লোকটি মধুছন্দাকে ফিল্মে গাইবার সুযোগ করে দিতে পারে। তারপর মধুছন্দার বেশ নাম হয়ে গেল, গানের জগতে মধুছন্দা স্বাধীনভাবে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারবে।

আর যদি লোকটা খারাপ হয়! মুম্বাইয়ের ফিল্মের জগতে অনেকরকম পঙ্কিলতা আছে। একটু সুন্দরী মেয়েদের নানারকম প্রতিশ্রুতি আর প্রলোভন দেখিয়ে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো হয়। শত শত মেয়ের মধ্যে গান গাইবার সুযোগ মাত্র দু’-একজনই পায়। বাকিরা বড়জোর কোরাস গানে একটু গলা দেয়, শেষ পর্যন্ত বেশ্যাবৃত্তি করতে বাধ্য হয়।

ওই লোকটা অতি বদ হবার সম্ভাবনাই বেশি। কেন আমার এরকম ধারণা হচ্ছে? মোটা গোঁফওয়ালা পুরুষদের সম্পর্কে আমার মনে একটা বিরাগ ভাব আছে। আজকালকার দিনে কোনো রুচিসম্পন্ন লোক ওরকম গোঁফ রাখবে কেন? হাওড়া স্টেশনের কুলিদের ওরকম গোঁফ মানায়। গোঁফ-কামানো কুলি আমি এ পর্যন্ত একজনও দেখিনি। ওদের ধারণা, দৃশ্যমান গোঁফ হচ্ছে পৌরুষের লক্ষণ! এ হচ্ছে সেই ধরনের পৌরুষ, যা মেয়েদের সবসময়ে পায়ের তলায় রাখতে চায়।

একজন পুরুষ, যদি নেহাৎ গায়ের জোর বেশি বলেই তার স্ত্রীকে মারধোর করে, তবে তার চেয়ে বর্বরতা আর কী হতে পারে? কিন্তু সেটা আটকাবার কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই। জেনেশুনেও আমাদের চুপ করে থাকতে হবে। কারণ, বন্ধ ঘরের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী কী করছে, সেখানে নাক গলাবার অধিকার নেই কারুর। তবে, আজকাল মেয়েদের অনেকরকম আইনের অধিকার দেওয়া হয়েছে। স্ত্রী যদি থানায় গিয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযোগ করে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বামীকে গ্রেফতার করা হবে। পুলিশ মেয়েটিকে আশ্রয় দেবে। আশ্রয় মানে পাঠানো হবে উদ্ধার-আশ্রমে। সেগুলো একেবারে ভয়াবহ জায়গা।

কোনো স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে তখনই অভিযোগ আনবে, যখন সে বিবাহ-বিচ্ছেদের ঝুঁকি নেবে। তার নিজস্ব কোনো নির্ভরযোগ্য আশ্রয়ের জায়গা থাকবে। মধুছন্দার মতন মেয়ে, যার বাপের বাড়িতেও যাবার উপায় নেই, সে কি চট করে বিবাহ-বিচ্ছেদের ঝুঁকি নিতে পারে? এই জন্যই হাজার হাজার মেয়ে স্বামীর কাছে মার খেয়েও মুখ বুঁজে থাকে।

এমন স্বামীর সঙ্গে ঘর করার চেয়ে বেশ্যাবৃত্তিও অনেক ভালো, এমন সিদ্ধান্ত কি নিতে পারে কোনো মেয়ে? হাজার জনের মধ্যে বড়জোর দু- চারজন।

সেই ইজি চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়লাম আমি। সুতরাং ঘুম ভেঙে গেল খুব ভোরে।

বাগানে ও নদীর ধারে হেঁটে বেড়ালাম খানিকক্ষণ।

তাতে শরীর বেশ স্নিগ্ধ হলেও মনের মধ্যে খচখচানি রয়েই গেল। কী করছে মধুছন্দা? ওর দুটি ছেলেমেয়ে আছে। তাদের ছেড়ে কতক্ষণ থাকবে?

রশিদ কখন জাগবে, আমার যেন সময়ই কাটতে চায় না।

এর মধ্যে রোদ আরও চড়া হতে লাগলো। আমি আর-একবার বেরিয়ে ডজন খানেক গরম সিঙ্গাড়া কিনে আনলাম মোড়ের দোকান থেকে।

ফিরে এসে দেখি শক্তি চা খাচ্ছে।

সে হাঁকডাক করে রশিদকে বিছানা ছাড়িয়ে নিয়ে এলো বারান্দায়।

এখন রশিদ অন্তত তিন কাপ কফি খাবে, তারপর বাথরুমে গিয়ে খবরের কাগজ পড়বে প্রায় একঘণ্টা ধরে।

দ্বিতীয় কাপ কফি শেষ করার পর আমি রশিদকে বললাম, আমরা কখন বেরুবো? বেশি দেরি করতে চাই না।

রশিদ রীতিমতন অবাক হয়ে বললো, বেরুবো? কোথায়? আজ বিশেষ কাজ নেই, বাড়িতেই আড্ডা দেওয়া যাক। আমি পেঁয়াজকলি দিয়ে গোস্ত রান্না করবো।

আমি বললাম, বাঃ, মেমারি যাবার কথা আছে না?

শক্তি বললো, মেমারি, সেখানে কী আছে? কিছু নেই!

আমি রশিদের দিকে তাকিয়ে বললুম, তুমি ভুলে গেছ?

– আমি ভুলিনি! তুমি মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট পড়েছো। সেটা সব নিউজপেপারে ছাপা হয়েছে। ওরাও কি সেটা পড়েনি? এর পরেও কি ওরা মেমারিতে বসে থাকবে? এতক্ষণে পাখি উড়ে গেছে। ওখানে গেলে কিছুই দেখতে পাবে না। তাছাড়া তোমার তো বাংলাদেশের সেই মেয়েটি, কী যেন নাম?

– আনোয়ারা।

– হ্যাঁ, সেই মেয়েটিকে নিয়ে চিন্তা। সে অদৃশ্য হয়ে গেছে অনেকদিন আগে। মেমারিতে গিয়ে তার কোনো ট্রেস পাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। সে কোনো আরব কান্ট্রিতে চালান হয়ে গেছে!

– তবু আমি জায়গাটা দেখতে চাই নিজের চোখে।

– তোমার এই কথার কোনো যুক্তি আছে?

আমি একটুক্ষণ চুপ করে রইলাম। আমার এই অনুরোধের সত্যিই কোনো যুক্তি নেই। আনোয়ারার পক্ষে সেখানে থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, আর বিক্রি বা পাচার হয়ে-যাওয়া হাজার হাজার মেয়েদের নিয়ে আমি মাথা ঘামিয়েই বা কী করবো! তবু আমার একটা ঝোঁক চেপেছে। আনোয়ারাকে উদ্ধার করার ব্যাপারে আমি কোনো সাহায্যই করতে পারবো না জানি। তবু এইসব কারবার যারা করে তাদের একজনকে অন্তত আমি জলজ্যান্ত অবস্থায় দেখতে চাই। বুঝতে চাই, তারা কী ধরনের মানুষ!

– চলো না রশিদ, কতক্ষণই বা লাগছে? বিকেলের মধ্যে ফিরে আসবো।

শক্তি বললো, ধ্যাৎ, ছাড়ো তো! এমনি এমনি মেমারিতে কেউ যায়? তারচেয়ে বরং চলো, বেরিয়ে পড়ি, অট্টহাস ঘুরে আসি। চমৎকার জায়গা, ওখানে ভালো বাংলা পাওয়া যায়। একেবারে খাঁটি।

রশিদ আমার স্বভাব জানে।

একবার যখন মেমারি যাবার ইচ্ছে আমার মাথায় চেপেছে, আমি যাবোই। ওরা যেতে না চাইলে, ট্রেনে একা।

রশিদ বললো, ঠিক আছে, সুনীলের যখন ইচ্ছে, ঘুরেই আসা যাক। ওখানে পনেরো মিনিটের বেশি থাকবো না। রান্নার মাসি লুচি-ফুচি ভাজছে, আর কিমার তরকারি, না খেয়ে গেলে চিল্লামিল্লি করবে।

শক্তি বললো, সে-মেয়েটা এখনো জাগেনি?

রশিদ বললো, কোন মেয়েটা? ও, মধুছন্দা? সে তো ভোরবেলাতেই কেটে পড়েছে!

আমি চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম, কারুকে কিছু না বলে?

রশিদ বললো, তাই তো! আমার বড়মেয়ে বাবলি বললো, ওর বাড়িতে পরার চটিটা খুঁজে পাচ্ছে না। মধুছন্দা নিজের চটি ফেলে ভুল করে বাবলির চটি পরে চলে গেছে।

কোথায় গেল মধুছন্দা? তার স্বামীর কাছে? আবার মার খাওয়ার জন্যে? কিংবা, আমি স্বপ্নে যে-রকম দেখেছি, দৌড়ে গিয়ে উঠে পড়েছে কোনো দূরপাল্লার ট্রেনে?

এটা না-জানা পর্যন্ত স্বস্তি নেই।

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমরা তিনজন তৈরি হয়ে উঠে পড়লাম গাড়িতে।

এ-যাত্রায় শক্তি না থাকলেই ভালো হতো। ও গজগজ করতে লাগলো অনবরত। শুধু শুধু মেমারি যাবার কোনো মানে হয়? কী আছে সেখানে?

রশিদও চাপা বিদ্রƒপের সুরে কয়েকবার বললো, সেখানে যে কিছু নেই, সেটা সুনীল নিজের চোখে না দেখলে শান্তি পাচ্ছে না!কিন্তু ওদের কথা মিথ্যে হয়ে গেল। মেমারি-যাত্রা মোটেই অসার্থক হয়নি। বরং এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হলো। (ক্রমশ)