দশ

রপর শুরু হয়েছিল আসল জীবনযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলো, দেশ স্বাধীন হলো, কিন্তু আমাদের পরিবারটির জন্য শুরু হলো আসল যুদ্ধ। জীবনযুদ্ধ। সেই যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে নিয়তি আমাকে টেনে নিল অন্য এক জীবনের দিকে। সেই জীবন আমার লেখক জীবন।

“১৯৭৩ সালের কথা। জগন্নাথ কলেজে আইএসসি পড়ি। বিকেল কাটাই গেণ্ডারিয়া ধুপখোলা মাঠে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, নয়তো সীমান্ত গ্রন্থাগারে বই পড়ে। ‘গেণ্ডারিয়া সীমান্ত গ্রন্থাগার’ নামক এই পাঠাগারে কি যে সুন্দর সব বই ছিল তখন! পাঠাগারের লম্বা বেঞ্চে মাথা গুঁজে বই পড়ছি, বাইরে অবলীলায় ফুরিয়ে যাচ্ছে একেকটি মনোরম বিকেল, দৃশ্যটি এখনও চোখের অনেক ভেতর থেকে দেখতে পাই। যেন চোখের ভেতর মাইক্রোফিল্ম হয়ে আছে। বলতে দ্বিধা নেই, বাংলা ভাষার অনেকগুলো মহৎ গল্প উপন্যাস ওই বয়সেই সীমান্ত গ্রন্থাগারের কল্যাণে পড়ে শেষ করেছি। কোনও কোনও বিকেলে বই নিতে আসত সেই সময়কার জনৈক কিশোর লেখক। দৈনিক পত্রিকার ছোটদের পাতায় প্রায়ই তার গল্প ছাপা হয়। এই নিয়ে তার যে কী অহংকার ছিল! সঙ্গে দু’তিনটি চামচা নিয়ে সেই বয়সেই ঘুরে বেড়াত সে। হাঁটত মাটির কমপক্ষে পৌনে দু’ ইঞ্চি ওপর দিয়ে। কথা বলত আকাশের দিকে তাকিয়ে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে বলত না, বলত তার চামচারা। লেখকটি অবশ্য কথায় কথায় পকেট থেকে নিজের লেখার কাটিং বের করে দেখাত। সীমান্ত গ্রন্থাগারে আসত দস্যু বাহরাম বা ওই ধরনের বই নিতে। যে ছেলেটি পাঠাগার চালাত তাকে দেখতাম অযথা সেই কিশোর লেখককে তোয়াজ করছে। আমি হয়তো তখন এককোণে মাথা গুঁজে পড়ছি কবি। ঠাকুরঝির অনুচ্চারিত প্রেম বিরহব্যথা তুমুল ভাঙচুর করে যাচ্ছে আমার হৃদয়ে।

তবুও চোখ তুলে কখনও কখনও সেই লেখককে দেখেছি। আর সামান্য ঈর্ষাবোধ করেছি বুকের অনেক ভেতরে।

আসলে আমাকে লেখালেখির দিকে ঠেলে দিয়েছিল সেই কিশোর লেখক। আমিও চেয়েছিলাম গ্রন্থাগার-পরিচালক যুবকটি আমাকে একটু তোয়াজ করুক। আমারও পকেটে থাক নিজের লেখার কাটিং। আমারও সঙ্গে থাক গুণমুগ্ধ দু’চারটি চামচা।

… ১৯৭৩-এ আমার প্রথম লেখা বেরিয়েছিল সেই সময়কার দৈনিক পত্রিকা পূর্বদেশের ছোটদের পাতা চাঁদের হাটে। গল্পের নাম ‘বন্ধু’। লেখকের নাম ইমদাদুল হক মিলন। তবে আর্টিস্টের কল্যাণে লেখকের নামের বানান ভুল হয়ে এমন অদ্ভুতুড়ে একটি নাম তৈরি হয়েছিল, সেই নাম বলা যাবে না।

এইভাবে শুরু। ব্যাপারটা দৈব ঘটনামাত্র। দিন যায়, কালক্রমে টের পাই অস্থিমজ্জায় নিজের অজান্তে কখন ঢুকে গেছে এক শব্দকারবারি। সে কোনও শাসন মানে না।

আমার প্রথম বড়দের লেখা ‘শঙ্খিনী’ নামের গল্প, ওই বছরেই লেখা। লেখাটি নিয়ে আমি দু’একটি পত্রিকায় ছুটোছুটি করেছিলাম। কেউ ছাপেনি। দু’একজন সাহিত্য-সম্পাদক খুবই হেলাফেলায় লেখাটি ফেরত দিয়ে বলেছেন, কিচ্ছু হয়নি।

একটি সিনেমা মাসিকের ভারপ্রাপ্ত কিংবা নির্বাহী সম্পাদক, যিনি এখন আর বেঁচে নেই, লেখাটি না পড়েই বলেছিলেন, গল্প হয়নি।

তারপর আমাকে একটি প্রেসক্রিপশান দিয়েছিলেন, লেখক যদি হতে চাও তো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প পড়ো। তখন বুঝিনি, কিন্তু আজ আমি সিওর, ওই ভদ্রলোক জীবনে এক লাইনও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়েননি। তাঁর দু’একটি টুকটাক রচনা আমি পড়েছি। অতিশয় বাজে লেখা। এবং ভদ্রলোক তস্য মূর্খ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়লে অতো বাজে রচনা লেখার সাহস কারু হওয়ার কথা নয়।

যা হোক লেখালেখি নিয়ে সেই প্রথমে অপমান হওয়া। সম্পাদক কাহাকে বলে, সেই প্রথম টের পাওয়া। ‘বন্ধু’ গল্পটি তো ডাকে পাঠিয়েছিলাম, ছাপা হয়ে গেছে। কিন্তু ‘শঙ্খিনী’!

এই রচনাটিও ডাকে পাঠাতে হয়েছিল। তবে বাংলাদেশের কোনও পত্রিকায় নয়। কলকাতায়।

তখন যুগান্তর গ্রুপের সাপ্তাহিক কাগজ ছিল অমৃত। পত্রিকাটি দেশ পত্রিকার সঙ্গে কমপিট করত। সাহিত্য-সম্পাদক ছিলেন মণীন্দ্র রায়। কবি। অমৃতে পাঠিয়ে দিলাম ‘শঙ্খিনী’। কারণ একটিই, রচনাটি ছাপা না হলেও গিয়ে খোঁজখবর করতে পারব না। সরাসরি অপমান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অপমান যেটুকু সে কেবল নিজের কাছে। ভেতরে ভেতরে নিঃশব্দে হজম করে নেবো, চুপ করে যাবো।

কিন্তু শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে তিন সপ্তাহের মাথায় অমৃত পত্রিকায় ছাপ হয়ে গেল ‘শঙ্খিনী’। লেখকের নাম দেখে মণীন্দ্র রায় বোধহয় ভেবেছিলেন আমি বেশ বয়স্ক লোক, হেভি লেখক। সম্পাদকীয় পাতার পরপরই ছেপে দিয়েছিলেন লেখাটি। দেখে আমার তো মাথা বিগড়ে গেল। পত্রিকা যে কতোগুলো কিনেছিলাম মনে নেই। মনে আছে একটি পত্রিকা নিয়ে সেই সিনেমা মাসিকের অফিসে গিয়েছিলাম। সেই ভদ্রলোকের সামনে খুবই বিনীত ভঙ্গিতে পত্রিকাটি খুলে বলেছিলাম, লেখাটি ছাপা হয়েছে। ভদ্রলোক খানিক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর লজ্জিত ভঙ্গিতে অকারণেই চোখ থেকে চশমা খুললেন। কথা বললেন না। লোকটির জন্যে আমার খুব মায়া হয়েছিল। যদিও সেই পত্রিকায় পরে আমি অনেক লিখেছি এবং তারই অনুরোধে, তবু মনে রয়ে গেছে। প্রথম অপমান তো! মনে থাকেই।

আমার প্রথম উপন্যাসের নাম যাবজ্জীবন।

উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল বাংলা একাডেমীর মাসিক সাহিত্যপত্রিকা উত্তরাধিকারে। উত্তরাধিকারের দায়িত্বে তখন কবি রফিক আজাদ। ছিয়াত্তর সালের প্রথম দিককার কথা। বাংলা একাডেমীর নতুন বিল্ডিংটির দোতলার কোনার দিককার একটি রুমে বসতেন সেলিনা হোসেন, রশীদ হায়দার এবং রফিক আজাদ। রফিক আজাদের সঙ্গে তখনও আমার পরিচয় হয়নি। রশীদ হায়দারের সঙ্গে মুখচেনা পরিচয় ছিল। তাঁর ছোটভাই জাহিদ হায়দার আমার বন্ধু, বোধহয় কথাটি তিনি জানতেন।

আমি তখন দু’ হাতে যা মনে হয় লিখছি। হাতের কাছে যে-কোনও পত্রিকা পেলেই একটি গল্প লিখে পৌঁছে দিচ্ছি। ছাপাও হচ্ছে রেগুলার। দেশের কবি-সাহিত্যিক, পত্রিকা-সম্পাদক এবং পাঠকরা আমার নাম জানতে শুরু করেছেন।

তখন সাপ্তাহিক বিচিত্রা ভীষণ জনপ্রিয় এবং নামকরা পত্রিকা। বিচিত্রায় আমার গল্প বেরুল। গল্পের নাম সম্ভবত ‘স্বপ্নের শঙ্খচূড়’; নাকি ‘না সজনী’ ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে গল্পটি অনেকেই ভালো বললেন। বিচিত্রায় তখন গল্প দেখতেন শেখ আবদুর রহমান।

এসময় আমি একদিন অকারণেই বাংলা একাডেমীতে গেছি। দোতলার ওই রুমে রশীদ হায়দারের টেবিলে গিয়ে বসেছি। রশীদ ভাই কাজে ব্যস্ত, আমাকে তেমন পাত্তাই দিচ্ছেন না। পাত্তা দেবার অবশ্য কোনও কারণও ছিল না।

রশীদ ভাইয়ের টেবিলের পশ্চিমের কোণের টেবিলে বসে আছেন রফিক আজাদ। পুবদিককার কোণে সেলিনা হোসেনের টেবিল। রফিক আজাদ চা খাচ্ছিলেন। কী মনে করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই মিয়া, এই সংখ্যা বিচিত্রায় একটা ছেলে গল্প লিখছে, ইমদাদুল হক মিলন নাম, চিনো তারে?

আমি কথা বলবার আগেই রশীদ ভাই চোখ তুলে তাঁর দিকে তাকালেন। ওর নামই ইমদাদুল হক মিলন।

রফিক আজাদ একটু থতমত খেলেন। তারপরই বললেন, তুমি ওই টেবিলে কী করো? এইদিকে আসো মিয়া।

আমি আড়ষ্ট ভঙ্গিতে রফিক আজাদের টেবিলের সামনে গিয়ে বসলাম। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাঁকে দেখতে লাগলাম। রফিক আজাদ সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছি। যেমন তিনি এক দুর্দান্ত মুক্তিযোদ্ধা। কাদের সিদ্দিকীর টোয়াইসি ছিলেন। দুর্দান্ত কবিতা লেখেন। প্রচণ্ড স্পিডে মোটর সাইকেল চালান। তাঁকে নিয়ে বিচিত্রা কাভারস্টোরি করেছিল। কিন্তু সেই মানুষকে কখনও সামনা সামনি দেখিনি। আজই প্রথম।

আমি মুগ্ধ বিস্ময়ে রফিক আজাদকে দেখতে থাকি। বোঁচা ধরনের মঙ্গোলিয়ান টাইপ চেহারা। মাথায় লম্বা চুল, কুতকুতে চোখ এবং ঠোঁটের দু’ পাশ দিয়ে নামিয়ে দেয়া গোঁফ। বেশ মোটাতাজা দেখতে। স্কিনটাইট টিশার্ট আর জিন্স পরে আছেন। টেবিলে রাখা চায়ের কাপের পাশে স্টার সিগ্রেটের প্যাকেট। হাতেও সিগ্রেট জ্বলছে। সিগ্রেটে টান দেয়ার সময় দেখলাম কবজিতে সিলভার রঙের মোটা চেন। হাতে ওই ধরনের চেন পরার ফ্যাশান মাত্র এসেছে বাংলাদেশে। রফিক আজাদের গলায়ও একটি চেন ছিল, তবে সেটি অপেক্ষাকৃত সরু। যাব্বাবা! এই হচ্ছেন কবি রফিক আজাদ! আমি একটু ভড়কে গেলাম। এতদিন শুনেছি কবিরা পাজামা-পানজাবি পরেন। কাঁধে একটি ঝোলা থাকে। ঝোলার ভেতর কী থাকে কেউ জানে না, এমনকি যাঁর ঝোলা তিনি নিজেও না। একটু উদাস হন কবিরা, আত্মমগ্ন কিংবা অন্যমনস্ক। লেখেন মানুষ নিয়ে, কিন্তু তাকিয়ে থাকেন আকাশের দিকে। অনেকদিন নাকি গোসল করেন না, দাঁত মাজেন না। কারও কারও মাথায় নাকি উকুনও থাকে। কবিদের প্রধান খাদ্য চা, সিগ্রেট এবং মদ। কিন্তু এ তো দেখি অন্যজাতের। দেখে কেউ কবি মনেই করবে না, ভাববে গুন্ডা। তবে রফিক আজাদের দেহের সঙ্গে গলার স্বর একটু বেমানান। গলা সামান্য সরু এবং ভাষা তেমন ভদ্রগোছের নয়। যা বলতে চান স্বচ্ছন্দে বলে ফেলেন। অকারণে কেতা দেখাবার প্রবণতা একদম নেই।

ততোক্ষণে তিনি আমার সঙ্গে দু’চারটি কথা বলেছেন। আমার সম্পর্কে সামান্য খোঁজখবর নেয়া আর কি। তাঁর কথা বলার ধরনে আমি টের পেয়ে গেছি, অসম্ভব প্রাণবন্ত মানুষ রফিক আজাদ, হৃদয়খোলা, মুহূর্তে মানুষকে আপন করে নিতে তাঁর তুলনা তিনি নিজে।

আমি রফিক আজাদের প্রেমে পড়ে গেলাম। প্রথম দর্শনেই প্রেম। একজন পুরুষের প্রেমে আরেকজন পুরুষ যে সত্যি সত্যি পতিত হতে পারে ওই প্রথম আমি তা টের পেলাম।

আমি তখন জগন্নাথে ইকনমিক্সে অনার্স পড়ি। একাত্তর সালে বাবা মারা যাওয়ার পর বড়ভাই চাকরি পেয়েছেন মিউনিসিপ্যালিটিতে। আমার বাবা চাকরি করতেন ওখানে। বাবার জায়গায় বড়ভাই ঢুকে গেছেন। আমাকে একটি কন্ট্রাকটরির লাইসেন্স করে দিয়েছেন। ফার্মের নাম ‘মিলন ট্রেডিং কোম্পানী’। জগন্নাথে পড়ার ফাঁকে কন্ট্রাকটরির কাজ করি আমি। অর্থাৎ সংসারের আয়-উন্নতি বাড়াবার চেষ্টা। পকেটে কন্ট্রাকটরি কাজের টাকা-পয়সা কিছু থাকে। বেদম সিগ্রেট খেতে শিখেছি। আমার প্রিয় ব্র্যান্ড ডানহিল। চ্যাপ্টা ধরনের কিংসাইজ ডানহিলের লাল প্যাকেট তখন প্রায়ই আমার পকেট উজ্জ্বল করে থাকত।

সেদিনও ছিল।

রফিক আজাদের দিকে প্যাকেট বাড়িয়ে দিলাম। তিনি একটি সিগ্রেট নিয়ে ধরালেন ঠিকই কিন্তু টান দিয়েই বিরক্ত হয়ে গেলেন। ধুৎ মিয়া! কী খাও এইসব? এইটা কোনও সিগ্রেট হইল! এটা তো মাইয়াগ সিগ্রেট। পুরুষমানুষের সিগ্রেট খাইবা। ফাইভ ফিফটি ফাইভ।

কিন্তু ফাইভ ফিফটি ফাইভ তখনও পর্যন্ত খেতে পারতাম না আমি। স্ট্রং লাগত।

তারপর রফিক আজাদ আমার কাছে লেখা চাইলেন। তোমার গল্প আমি পড়েছি। উত্তরাধিকারের জন্য গল্প দাও।

সেই প্রথম রফিক আজাদ টাইপের কোনও সম্পাদক আমার কাছে লেখা চাইলেন। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় ফেটে পড়লাম আমি। খানিকটা দিশেহারাও হলাম। বুকের ভেতর বেশ একটি কাঁপন লাগল।

বেরিয়ে আসার সময় রফিক ভাই আমার পেছন পেছন এলেন। সিঁড়ির সামনে এসে বললেন, একশটা টাকা দিয়া যাও।

শুনে আমি হতভম্ব। ওই মাপের একজন মানুষ মাত্র পরিচিত কারও কাছে এভাবে টাকা চাইতে পারেন, আমি কল্পনাও করিনি। আর চাওয়ার ভঙ্গিতে মনেও হচ্ছে না যে ধার চাইছেন, পরে কখনও ফেরত দেবেন। পরিচয়ের আধঘণ্টা সময়ের মধ্যে রফিক আজাদ আমার কাছে এক রহস্যময় এবং বড়রকমের ধাঁধা হয়ে দাঁড়ালেন। কন্ট্রাকটরির টাকা সেদিনও আমার পকেটে ছিল। একশ টাকার একটি নোট দিলাম রফিক আজাদ ভাইকে। দিতে বেশ কষ্টই হলো। তখন একশ টাকা অনেক টাকা। মনটা খচখচ করতে লাগল। এই একশ টাকার হিসাব কেমন করে মিলাবো? প্রতিরাতেই তো খরচের খাতা নিয়ে বসেন বড়ভাই! পাই টু পাই হিসাব দিতে হয় তাঁকে।

একশ টাকার নোট হাতে রফিক ভাই তখন বেশ চঞ্চল হয়ে উঠেছেন। যাক, দুপুরটা আজ ভাল কাটব। এই মিয়া, যাইবা নাকি?

কোথায় রফিক ভাই?

বোঝ নাই?

না।

আরে মিয়া মাল খাইতে।

শুনে বুকটা ধক করে উঠল আমার। এই দুপুরবেলা মদ খেতে যাবেন রফিক ভাই! টাকা চাওয়ার কারণটা বুঝে গেলাম।

কিন্তু রফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার যাওয়া হলো না। কন্ট্রাকটরির কাজে চলে যেতে হয়েছিল।

তখন তিন-চারটি বন্ধুবান্ধবের সার্কেল আমার। আফজাল হোসেন, আবদুর রহমান, ফরিদুর রেজা সাগর, দিদারুল আলম, আলীমুজ্জামান, সাইফুল আলম, অর্থাৎ চাঁদের হাটের বন্ধুরা। এদের সঙ্গে আড্ডা হতো সাগরের ‘খাবার দাবার’ রেস্টুরেন্টে। জগন্নাথ কলেজের একটি সার্কেল ছিল। সেখানে আমার স্কুলজীবনের বন্ধুরা অনেকে পড়ে, তাদের সঙ্গেও আড্ডা হয় কোনও কোনওদিন। মিউনিসিপ্যালিটিতে আমার বয়সী কয়েকজন কন্ট্রাকটর বন্ধুও জুটেছে। সব চাইতে বেশি সময় কাটে যাদের সঙ্গে তারা হলো কাজী হাসান হাবিব, সিরাজুুল ইসলাম, মুহম্মদ জুবায়ের আর ফিরোজ সারোয়ার। আমাকে নিয়ে এই পাঁচজনের বেশ একটি দল তখন। হাবিব হচ্ছে শিল্পী। তথ্য অধিদপ্তরে কাজ করে। পার্টটাইম করে দৈনিক সংবাদে। সিরাজুল ইসলাম ওই সময়কার বিখ্যাত তরুণ গল্পকার। কিছুদিন হলো বুয়েট থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইন্জিনিয়ার হয়ে বেরিয়েছে। জুবায়ের এবং সারোয়ার ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। জুবায়ের ইংরেজির ছাত্র, সারোয়ার বাংলার। ক’দিন আগে সিরাজের একটি চাকরি হয়েছে ওয়াপদায়। পোস্টিং চিটাগাংয়ের শিকলবাহা নামের একটি জায়গায়। চিটাগাং শহরের চাকতাই এলাকা দিয়ে সাম্পানে করে কর্ণফুলি পেরিয়ে ওপারে শিকলবাহা। হানড্রেড টেন মেগাওয়াটের কী একটা বিশাল কারবার হচ্ছে। সারোয়ার আর জুবায়ের সঙ্গে গিয়ে সিরাজকে প্রথমবার রেখে এসেছে ওখানে। কিন্তু সিরাজের মন টিকছে না। প্রায়ই চিঠি লিখছে। আমাকে যেতে বলছে। এক সকালে বাসে চড়ে একা একা চিটাগাং রওনা দিলাম আমি। মাথায় রফিক আজাদ এবং উত্তরাধিকারের গল্প। চিটাগাং পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। তখন তো দাউদকান্দির ফেরি পেরুতেই সময় চলে যেত অনেকখানি। যাহোক সিরাজ আমার জন্য বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিল। সিরাজ সাঁতার জানে না। তবু তাকে যখন-তখন কর্ণফুলি পেরুতে হয়। রাতের অন্ধকারে কর্ণফুলি পেরিয়ে গেলাম আমরা। শিকলবাহায় লম্বা মতন একটি একতলা বিল্ডিংয়ে সিরাজরা অনেকজন থাকে। হোস্টেলের মতো একেকজনের একেকটি রুম। সেইরাতে আমরা দু’ বন্ধু অনেকক্ষণ জেগে থাকলাম। কেরু কোম্পানির একটি গরিব ধরনের মদ কিনে রেখেছিল সিরাজ। ওই খেয়ে চূড়ান্ত নেশা হলো দু’জনার। কখন ঘুমিয়ে পড়লাম আমি, টেরই পেলাম না। সকালবেলা উঠে দেখি, সিরাজ নেই। আমার মাথার কাছে একটি চিরকুট : ‘আমি অফিসে চলে গেলাম। কলিংবেল বাজালেই বেয়ারা এসে নাশতা দিয়ে যাবে। দুপুরে একসঙ্গে খাব।’

ভালো ঘুম হওয়ার ফলে আমি একদম ফ্রেশ। গোসলটোসল করে নাশতা খেয়ে চা-সিগ্রেট নিয়ে লিখতে বসে গেলাম। সিরাজের এখানে যে-দু’তিনদিন থাকব উত্তরাধিকারের গল্পটা লিখে ফেলব!

কিন্তু কী লিখব?

তখন আমি এক ধরনের হালকা প্রেম-ভালোবাসার গল্প লিখি। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের শরীর-মনে সুড়সুড়ি লাগে এমন সব বিষয়-টিষয় থাকে। এইসব কারণেই বোধহয় ওই বয়সীদের কাছে রাতারাতি আমি খানিকটা জনপ্রিয়ও হয়েছি।

কিন্তু উত্তরাধিকারে তো ওই জিনিস লেখা যাবে না। রফিক আজাদ দেখতে গুন্ডাপান্ডার মতো হলে কী হবে, কবি হিসেবে তিনি তো খুবই সিরিয়াস টাইপের। ফালতু লেখা হলে ছুড়ে ফেলে দেবেন। আমার কাছ থেকে যে একশ টাকা নিয়েছেন গ্রাহ্যই করবেন না।

বেশ কিছুদিন ধরে আমার মাথায় তখন একটি দৃশ্য ঘুরছিল। বারো বছর বয়স অব্দি আমি ছিলাম মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল গ্রামে, আমার নানির কাছে। মেদিনীমণ্ডলের পুব পাশের গ্রাম কাজির পাগলায় শতবর্ষের পুরানো স্কুল ‘কাজির পাগলা এ টি ইন্্স্টিটিউশনে’ ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছি। স্কুলটির পশ্চিম পাশে বাজার। বাজারের পশ্চিম-উত্তর কোণে গান্ধি ময়রার মিষ্টির দোকান ছাড়িয়ে অনেকখানি সাদা মাটির চটানো জমি ছিল। এই জমি ছাড়িয়ে উত্তরে খাল। কী জানি কেন প্রায়ই আমি কল্পনায় এই জায়গাটি দেখতে পেতাম। ফকফকে জ্যোৎস্নায় গভীর রাতের নির্জনতায় এই সাদা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদছে একটি যুবতী মেয়ে। কেন কাঁদছে, কোন দুঃখে তা আমি জানি না। শুধু দৃশ্যটি দেখতে পাই।

এই নিয়ে কি গল্প লিখব! মেয়েটির দুঃখ, বেদনা এবং অসহায়ত্ব আবিষ্কারের চেষ্টা করব!

আমি লিখতে শুরু করলাম। ‘মাথার ওপর দিয়ে ছাতারে উড়ে যায়। বান্দরলাঠি গাছে তিড়িংবিড়িং করে লাফায় একটা দইকুলি। বনকুল গাছ বেয়ে উঠেছে সোনালতা। তার আড়ালে স্থির হয়ে থাকে এক রক্তচোষা। আরজিনাটা শুকনো লতাপাতার ওপর দিয়ে সরসর করে দৌড়ে যায়।

এইসব ঝোপঝাড়ের ঝুঝকো অন্ধকার থেকে মাথা তোলে মন্থর এক সাপ। তুলে দেখে গাছপালা কী সবুজ, আকাশ কী নীল! আর তার চারপাশে অবিরাম ডাকছে কীটপতঙ্গ, মধুপোকা। তারপর লম্বা শরীরটা আর একটু বের করে আনে সে। মাথা উঁচিয়ে দেখে অদূরের ভাঙ্গা দরদালানে একটি মনিষ্যি, বাইরে একটি কুকুর।

দেখে ধীরেসুস্থে সাপটা তারপর ঘাসের ওপর দিয়ে পাতলা ওস ভেঙে নাবালে নেমে যায়।’

কিন্তু লেখাটি এইভাবে শুরু হলো কেন? শীতনিদ্রা শেষ করে ঝোপের গর্ত থেকে বেরুল এক সাপ। সেই সাপের চোখ দিয়ে দেখানো হচ্ছে ভাঙা দরদালানে একজন মানুষ, বাইরে একটি কুকুর। সময়টা ফাগুন মাস, আকাশটা স্বচ্ছ। তারও পর বর্ণনার ধরন অন্যরকম, শব্দটব্দগুলো অন্যরকম। যেমন বান্দরলাঠি গাছ, দইকুলি পাখি, আরজিনা, ওস এসব তো বিক্রমপুরের শব্দ! দইকুলি মানে দোয়েল, আরজিনা হচ্ছে এক ধরনের গিরিগিটি, ওস মানে শিশির, অন্যদিকে ‘ঝুঝকো’ কিংবা ‘নাবাল’ হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের শব্দ। এইসব শব্দের মিশেলে ভাষা তৈরির কারণ কী?

আসলে আমি নতুন ধরনের কিছু একটা লিখতে চাইছিলাম। কিছু হচ্ছে কি হচ্ছে না, না ভেবেই লিখে যেতে লাগলাম। পটভূমি কাজির পাগলা বাজার আর ছেলেবেলায় দেখা কিছু মানুষ কিছু ঘটনা। শুদ্ধ ভাষার সঙ্গে অবলীলাক্রমে মিশেল দিতে লাগলাম বিক্রমপুরের আঞ্চলিক শব্দ। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শিকলবাহায় বসে লিখছি, অফিস থেকে ফিরে সিরাজ সেটি পড়ে, কিন্তু কোনও মন্তব্য করে না। ফলে আমি বুঝতেই পারছি না জিনিসটি কিছু হচ্ছে কিনা! রুলটানা ফুলস্কেপ কাগজের আঠারো পৃষ্ঠা লিখলাম কিন্তু লেখাটি শেষ হলো না। কী কী যেন লিখতে চাই ঠিক বুঝতে পারি না। এই আঠারো পৃষ্ঠা প্রকৃতপক্ষে একটি চ্যাপ্টার মাত্র।

ঢাকায় ফিরে রফিক আজাদের কাছে নিয়ে গেলাম। ভয়ে ভয়ে বললাম, গল্পই লিখতে চেয়েছি কিন্তু লেখাটা কেমন বড় হয়ে যাচ্ছে। শেষ করতে পারিনি। রফিক ভাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, রেখে যাও। পড়ে দেখি।

লেখা রেখে চলে এলাম। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ছটফটানি। কবে রফিক ভাইয়ের কাছে যাবো, কবে জানতে পারব ব্যাপারটি কী দাঁড়াল। না জানা পর্যন্ত বাকি লেখা লিখতেই পারছি না।

তিন-চারদিন পর গেলাম রফিক ভাইয়ের ওখানে। বুকটা ধুগধুগ করছিল। কী জানি কী শুনতে হয়। মুখের ওপর লেখাটি কি তিনি ছুড়েই মারেন কিনা, যাও ভাগো মিয়া! কী লেখছ এইসব!

কিন্তু হলো তার উল্টো। রফিক ভাই গম্ভীর মুখে বললেন, লেখা আমি প্রেসে পাঠিয়ে দিয়েছি। তুমি তোমার ইচ্ছেমতো লিখে যাও। যতবড় হয় হবে, লেখা আমি ছাপব।

আঠারো মাস ধরে এই লেখা ছেপেছিলেন রফিক ভাই। ততোদিনে তাঁর সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্ব। আমাকে তিনি ‘বেটা’ বলে ডাকেন।

কিন্তু লিখতে লিখতে টের পাই যাবজ্জীবনে এসে ভিড় করছে আমার ছেলেবেলায় দেখা বিক্রমপুর অঞ্চলের বহু মানুষ, বহু ঘটনা। এবং নিজের অজান্তেই সময়টা হয়ে যাচ্ছে চৌষট্টি সাল। কী কারণে, বুঝতে পারছি না। লিখতে লিখতে কলম কখনও কখনও আমাকে ফেলে এগিয়ে যায়। সে কোনও কথাই শোনে না।

 মেদিনীমণ্ডল থেকে কাজির পাগলা হাইস্কুলে যাওয়ার পথে সীতারামপুরে বিশাল তালুকদার বাড়ি। রাস্তা শর্টকাট করার জন্য সেই বাড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে যাই। অশত্থের চারা গড়িয়ে যাওয়া ভাঙাচোরা পুরানো একটি দালানঘরের সামনে প্রায়ই এক মহিলাকে এলোমেলো ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখি। তার পায়ের কাছে ঘুরঘুর করে একটা নেড়িকুকুর। এই মহিলা হয়ে গেল উপন্যাসের রুহিতন চরিত্র। রুহিতন হচ্ছে তাসের নাম। কেবলই খেলোয়াড়দের হাত বদলায়। এক হাত থেকে আরেক হাতে যায়।

কাজির পাগলায় যাওয়ার পথে জলধর ডাক্তারের বাড়ি। উমাচরণ নামে জলধর ডাক্তারের ভাই কিংবা আত্মীয় একজন ছিলেন অতিশয় মোটা। এই চরিত্রটি এক কম্পাউন্ডার হিসেবে। তাকে ধরে এলো দেশভাগের কথা, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কথা। হিন্দুদের নিরাপত্তাহীনতার কথা।

মাওয়ার বাজারে নাপিতের কাজ করত নিতাই। ছেলেবেলায় নিতাইয়ের মতো সুন্দর পুরুষ আমি আর দেখিনি। দুধের মতো গায়ের রং, মাথায় সুন্দর চুল, ছবির মানুষের মতো। এই নিতাই এলো আরেক চরিত্র হয়ে, যে চায় তার পরিবেশ বদলাতে, জীবন বদলাতে।

মাওয়ার বাজারে ন্যাংটা হয়ে ঘুরে বেড়াত রোদেপোড়া কালো কুচকুচে মমিনা পাগলা। উপন্যাসের শুরুতে বেরিয়ে আসা সাপটি তাকে দংশালো এক ফকফকে জ্যোৎস্না রাতে।

এখন যেখানে মাওয়ার বাজার, আমার ছেলেবেলায় এই বাজার ছিল আধমাইল খানেক দূরে, পদ্মার তীর ঘেঁষে পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে। বাজার এবং নদীতীরের মাঝখানকার কয়েকখানি খোলা জায়গায় একবার সার্কাস এলো। বিশাল তাঁবু গেড়ে হৈ হৈ রৈ রৈ একটি কাণ্ড। বাড়ির যুবক-কিশোরদের সঙ্গে আমি একদিন গিয়েছিলাম সেই সার্কাস দেখতে। সার্কাসে আমার সব চাইতে পছন্দ হয়েছিল জোকার মানুষটিকে। মহারাজা চরিত্রটি এলো সেই জোকারের স্মৃতি থেকে।

এই হচ্ছে যাবজ্জীবন।

ভাষায় বিক্রমপুরের আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহারটা ছিলই। উপন্যাস ছাপা হচ্ছে আর আমি খুব প্রশংসা পাচ্ছি। আবু হেনা মুস্তাফা কামাল, ডক্টর রফিকুল ইসলাম, কবি শহীদ কাদরী, আহমদ ছফা নানা রকমভাবে তাঁদের মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন।

সাতাত্তরের শেষদিকে যাবজ্জীবনের পাণ্ডুলিপি দিলাম মুক্তধারাকে। তখন ‘মুক্তধারা’ নতুন পুরানো সব লেখকেরই বই ছাপছে। তাদের একটি এডিটরিয়াল বোর্ড আছে। পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার কয়েক মাস পর গিয়ে খবর নিতে হয়। পাণ্ডুলিপি মনোনীত হলে বই বেরুবে। যাবজ্জীবন মনোনীত হলো। মুক্তধারার স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা আমাকে অভিনন্দন জানালেন এবং বারোশো টাকায় বইটির স্বত্ব নিয়ে নিলেন। আমার কাছে তখন টাকা কিংবা স্বত্ব কোনও ব্যাপারই নয়, বই বেরুলেই হলো। তবে আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে আমার একটি পছন্দের কথা চিত্তবাবুকে জানালাম, আমার বইটির প্রচ্ছদ যেন কাইয়ুম চৌধুরী করেন। তখন কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদ আমার কাছে এক বিশাল স্বপ্ন।

চিত্তবাবু আমার কথা মেনে নিলেন। কাইয়ুম ভাইয়ের কাছে প্রচ্ছদের জন্য পাঠালেন। আমি বিশাল উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। একদিন দুদিন করে দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। কাইয়ুম ভাই সময়ই পান না। তখন তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় নেই।

দেখতে দেখতে উনআশি সাল এলো। আমি চলে গেলাম জার্মানিতে। ফিরে এলাম একাশির অক্টোবরে। তখনও পর্যন্ত আমার প্রচ্ছদটি আঁকার সময় পাননি কাইয়ুম ভাই। তারপরও আমার সৌভাগ্য এই মহান শিল্পী শেষ পর্যন্ত যাবজ্জীবনের জন্য অসাধারণ একটি প্রচ্ছদ এঁকে দিলেন। বই বেরুল উনিশ শো তিরাশি সালে।

আমার প্রথম বাইয়ের নাম ভালবাসার গল্প।

বারোটি প্রেম-ভালোবাসার অতিশয় হালকা ধরনের গল্পের সংকলন। অল্পবয়সের উচ্ছ্বাস-আবেগে ভর্তি লেখা। বইটি বেরিয়েছিল ১৯৭৭ সালে। আমি একটি ভূমিকা লিখেছিলাম। ভূমিকার শেষে একটি তারিখ ছিল, বেশ মজার। সর্বত্রই সাত। ৭.৭.৭৭। এই একই তারিখে আমার বন্ধু শিল্পী কাজী হাসান হাবিব একটি ছবি এঁকেছিলেন। বসে থাকা একটি বালকের ছবি। সেই ছবির তলায় হাবিবের স্বাক্ষর এবং ৭.৭.৭৭ তারিখ। ছবিটি হাবিব আমাকে প্রেজেন্ট করেছিলেন। এখনও যত্নে রেখে দিয়েছি। ছবিটির দিকে তাকালে আমাদের সেই সময়টিকে পরিষ্কার দেখতে পাই। তখন আমরা পাঁচবন্ধু দিনের কোনও না কোনও সময় একত্র হতামই। কাজী হাসান হাবিব, গল্পকার সিরাজুল ইসলাম, মুহম্মদ জুবায়ের, ফিরোজ সারোয়ার এবং আমি। বন্ধুদের মধ্যে প্রতিভা জিনিসটি আমার বলতে গেলে ছিলই না। আমি অনেকটা জোর করে লেখক হয়েছি। বন্ধুরা লেখালেখি ব্যাপারটি বেশ ভালো বুঝত, প্রচুর পড়ত ওরা, লিখতও ভালো। আমার পড়াশুনা নেই, সাহিত্যটা বুঝিও না, তবু লিখে যাচ্ছিলাম।

তখন দু’ ধরনের লেখা লিখতাম আমি। চিত্রালী, পূর্বাণী, সিনেমা, উল্টোরথ টাইপের ঝিনুক, জোনাকী কিংবা রহস্য পত্রিকা, গোয়েন্দা পত্রিকা ইত্যাদিতে শহরকেন্দ্রিক উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের প্রেম-ভালোবাসা আবেগ-উচ্ছ্বাস এবং যৌনগন্ধি এক ধরনের তরল লেখা। আর সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী কিংবা ইত্তেফাকের সাহিত্যপাতা, সাপ্তাহিক বিচিত্রা এইসব কাগজে গ্রামজীবন নিয়ে একটু অন্য ধরনের গল্প। এই ধরনের লেখাকে কেউ কেউ সিরিয়াস টাইপ লেখা মনে করেন। আমাদের দেশে একটি ব্যাপার তখন থেকেই আমি লক্ষ করেছি, গ্রামজীবন নিয়ে লিখলেই, সেই লেখা ভালো কি খারাপ না বুঝেই অনেকে বলেন, খুবই সিরিয়াস লেখা। পত্রিকা-সম্পাদকরাও তাই মনে করতেন কিংবা হয়তো এখনও করেন। যাই হোক পত্রিকার চরিত্র বুঝে আমি লিখতাম। বিনোদনধর্মী পত্রিকায় শহরকেন্দ্রিক হালকা মেজাজের লেখা আর অন্যত্র গ্রামজীবননির্ভর তথাকথিত সিরিয়াস লেখা।

লেখালেখি শুরুর পর প্রথম যে-নামকরা লেখকের সঙ্গে আমার পরিচয়, তাঁর নাম বুলবুল চৌধুরী। বোধহয় তিয়াত্তরের শেষ কিংবা চুয়াত্তরের শুরুর দিককার কথা। বুলবুল তখন ওয়াপদায় চাকরি করে। যতদূর মনে পড়ে কেরানি ধরনের চাকরিই হবে। তাঁর সঙ্গে দু’চারবার সেই অফিসে আমি গেছি।

বুলবুলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল বাংলাবাজারে, জোনাকী নামের একটি মাসিক পত্রিকার অফিসে। বুলবুলও লেখা দিতে গিয়েছিল, আমিও। জোনাকীর সম্পাদক এবং মালিক ছিলেন আবদুল মতিন নামের নরম নিরীহ এবং খুবই ভদ্রলোক ধরনের একজন মানুষ। কিন্তু পত্রিকাটির সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন আহসান হাবিব, যাঁর ছদ্মনাম ছিল আহমেদ সানবিব, যিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটির পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কিংবা ওই ধরনের কোনো একটি বিভাগের লেকচারার। দেখতে অত্যন্ত ফুটফুটে সুন্দর এবং স্মার্ট ভদ্রলোক। লিখতেনও বেশ ভালো। ছোটদের লেখা, সায়েন্স ফিকশন, থ্রিলার এসব ছিল তাঁর বিষয়। আবার অনুবাদও করতেন। বেশ স্পিডে মোটর সাইকেল চালাতেন। এই মোটর সাইকেল অ্যাকসিডেন্ট করেই ঢাকা ইউনিভার্সিটির সামনে মারা যান তিনি। সেটি অবশ্য অনেক পরের কথা।

বুলবুল তখন প্রচুর লেখে। চিত্রালী, দৈনিক বাংলা, পূর্বদেশ, বিচিত্রা সর্বত্র তার লেখা বেরোয়। চালচলনে বেশ একটা লেখক লেখক ভাব। চোখে পুরু কাচের চশমা, মাথায় লম্বা চুল, অবিরাম সিগ্রেট খায়, চা খায়, সাহিত্য নিয়ে কথা বলে সুন্দর করে এবং গলার স্বর বেশ ভারি। দেখতে দেখতে বুলবুলের ভক্ত হয়ে গেলাম আমি। যা লিখি তাই বুলবুলকে পড়াতে নিয়ে যাই। বুলবুল গভীর উৎসাহ নিয়ে আমার লেখা পড়ে, আমি দুরুদুরু বক্ষে তার মুখপানে তাকিয়ে থাকি। আল্লাই জানেন লেখা পড়ে কী বলবে?

কিন্তু বুলবুল খুবই ভদ্র। আমার কাঁচা পচা লেখা পড়েও প্রশংসা করার চেষ্টা করে, লেখার ভালোমন্দ এটা ওটা বোঝাবার চেষ্টা করে। আমি তখন গেণ্ডারিয়ার রজনী চৌধুরী রোডে থাকি, বুলবুল থাকে ডালপট্টির ওদিককার, পূর্ণচন্দ্র ব্যানার্জি লেন কিংবা এই ধরনের নামের একটি গলিতে, পৈতৃক বাড়িতে। সম্ভবত এখনও সেই বাড়িতেই থাকে বুলবুল। বুলবুলের মাধ্যমেই তখনকার নামকরা অনেক তরুণ গল্প লেখকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। যেমন সিরাজুল ইসলাম, সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়, ফিউরি খোন্দকার। সেবা প্রকাশনীর জন্য লিখতেন শেখ আবদুল হাকিম, তিনি তখন বানিয়ানগরে থাকেন। শেখ আবদুল হাকিমের সঙ্গেও বুলবুলই আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। শেখ আবদুল হাকিমের বড়ভাই শেখ আবদুর রহমান, তাঁর সঙ্গেও ক্রমে পরিচয় হলো। ব্যাপক পড়াশুনা করা মানুষ ছিলেন রহমান ভাই।

বুলবুলকে নিয়ে অনেক স্মৃতি আছে আমার। একবার কোরবানি ঈদের সময় বাড়ির কাউকে কিছু না বলে বুলবুলের সঙ্গে তাদের গ্রামের বাড়ি কালিগঞ্জে চলে গিয়েছিলাম। তিনচারদিন সেখানে থেকে, খ্রিষ্টান পাড়ার চোলাই ফোলাই খেয়ে খুবই আনন্দ করে এসেছিলাম। মনে আছে সেই সময় বুলবুল একদিন তাদের পুকুরে মাছ ধরতে নেমেছিল। শীতকাল। খালি হাতে ডুব দিয়ে মাছ ধরছিল বুলবুল। কিন্তু তার চোখে চশমা ছিল। আমি পাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। বুলবুল উঠে আসার পর জিজ্ঞেস করলাম, চশমা পড়ে ডুব দিচ্ছিলেন কেন? বুলবুল সরল গলায় বলল, চশমা ছাড়া আমি দেখতে পাই না। চোখে চশমা না থাকলে পানির তলার মাছ তো দেখতে পাব না! আপনি জানেন না, আমি তো ঘুমাইও চশমা পড়ে। চশমা পরে না ঘুমালে আমি স্বপ্নও দেখতে পাই না।

শুনে আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারি না।

বুলবুল আমাকে তাস খেলা শিখিয়েছিল। ফ্লাশ আর কিট্টি এই দুটো খেলা। শিখিয়েছিল শেখ আবদুল হাকিমের বানিয়ানগরের বাসায় বসে। সেই কবেকার কথা। তারপর এতকাল কেটে গেছে তাসে আমার কোনও উন্নতি হয়নি। ওই দুটি ছাড়া আর কোনও খেলা আমি শিখতেই পারিনি।

যাহোক, ওয়াপদার চাকরিটা যে বুলবুলের ভালো লাগত না তা আমি পরিচয়ের শুরুতেই বুঝে গিয়েছিলাম। বুলবুলের ভালো লাগত পত্রিকার কাজ, লেখালেখি সংক্রান্ত আড্ডা, তাস খেলা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিছুদিন ঝিনুক পত্রিকাতে পার্টটাইম কাজ করল সে। চিত্রকল্প নামের একটি মাসিক পত্রিকা লিজ নিল। সিরাজুল ইসলাম এবং আমিও ভিড়লাম তাঁর সঙ্গে। সাকুল্যে দুটি সংখ্যা বোধহয় আমরা বের করতে পেরেছিলাম। তারপরই ফতুর। ওই চিত্রকল্পের সময়েই বোধহয় ওয়াপদার চাকরিটা বুলবুল ছাড়ে।

ততোদিনে রহস্য পত্রিকা ঘিরে আমাদের একটি আড্ডা তৈরি হয়েছে। পত্রিকাটির মালিক সম্পাদক ছিলেন অলক বারী। বাহাদুর শাহ পার্কের দক্ষিণদিককার একটি বিল্ডিংয়ের পেছন দিককার দোতলা কিংবা তিনতলায় অফিস। আমি আর বুলবুল নিয়মিত লিখি সেই কাগজে, আফজাল হোসেন ইলাসট্রেশন করে। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায়ই সেখানে আড্ডা হয়। শেখ আবদুর রহমান, শেখ আবদুল হাকিম, বুলবুল চৌধুরী। শেখ আবদুর রহমান তখন পূর্বাণীতে কাজ করেন। পূর্বাণী-সম্পাদক তখন আজকের বিখ্যাত দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার। সারওয়ার ভাইয়ের সঙ্গে এই আড্ডায়ই আমার পরিচয় হয়েছিল। পঁচাত্তর ছিয়াত্তর সাল হবে।

কিন্তু যে-সময়ের কথা বলছি, সাতাত্তর সাল, বুলবুল তখন জোনাকী পত্রিকায় কাজ করে। প্রায় প্রতি বিকেলেই বুলবুলের সঙ্গে আমি আড্ডা দিতে যাই। জোনাকী অফিসটা বাংলাবাজার বইপাড়ার ভেতর। আসলে ওটিও একটি বইয়েরই দোকান। মতিন সাহেবের পাবলিকেশনের বিজনেসও ছিল। যতদূর মনে পড়ে ৩৮ নম্বর বাংলাবাজারে তাঁর তিনটি দোকান এবং একটি প্রেস ছিল। তিনটি দোকানের একটি তিনি পত্রিকার অফিসের জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন।

জোনাকী অফিসের একটি কিংবা দুটি দোকান আগে ছিল ‘বুক সোসাইটি’ নামের একটি প্রকাশন সংস্থা। দোকানের একেবারে মুখে টেবিলে বসে নিবিষ্ট মনে প্রুফ দেখতেন ছোটখাটো একজন মানুষ। তাঁর হাতের কাছে পানের ঠোঙা এবং মুখেও পান। পেছনে র‌্যাক ভর্তি বই। একপাশে ম্যানেজার কর্মচারীরা বই বেচাকেনা করছে, কিন্তু ভদ্রলোক কারও দিকে তাকাচ্ছেন না। তাঁর চোখ প্রুফের দিকে।

পরে জেনেছি ভদ্রলোকের নাম মুস্তাফা কামাল। তিনি বুক সোসাইটির মালিক। নিজে অসাধারণ ছড়া লেখেন, ময়মনসিংহ গীতিকার ‘মহুয়া’ ‘মলুয়া’ গদ্যভাষায় লিখেছেন। তাঁর হাতের লেখা মুক্তোদানার মতো।

এক বিকেলে বুলবুলের সঙ্গে আড্ডা দিতে যাচ্ছি, দেখি মুস্তাফা কামাল সাহেব প্রুফ রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন। মুখে যথারীতি পান। আমাকে দেখে হাত ইশারায় ডাকলেন। এই শোনো।

আমি থতমত খেয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। জ্বী!

শুনেছি তুমি লেখ। কী লেখ আমাকে একটু দেখিও তো!

এতবড় প্রকাশক আমার লেখা দেখতে চেয়েছেন, আমার বুকের ভেতর ক্ষীণ একটি আশা জাগল। বই বের করবেন নাকি!

তখনকার দিনে তরুণলেখদের বই প্রকাশ মানে বিশাল ব্যাপার। আমার চেয়েও বেশ অনেকদিন আগ থেকে লিখছেন যেমন বুলবুল চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম, নামও করেছেন বেশ, ওদেরই তো বই বেরোয়নি! আমার বই বেরোয় কী করে! ক্ষীণ আশাটি তৎক্ষণাৎ বাতিল হয়ে গেল। ধুৎ ও অসম্ভব! তবুও কয়েকদিন পর বারোটি হালকা মেজাজের গল্পের কাটিং একটি ফাইলে ভরে, ফাইলের ওপরে ‘ভালবাসার গল্প’ লিখে কামাল ভাইকে পৌঁছে দিয়ে এলাম। এত নির্বিকারভাবে ফাইলটি তিনি রাখলেন, আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম, এই বই জিন্দেগীতেও বেরুবে না।

কয়েকদিন পর আবার দেখা হলো কামাল ভাইয়ের সঙ্গে। বললেন, একটা ভূমিকা লিখে দিও।

শুনে আমি তো লাফ দিয়ে উঠেছি। তার মানে বই বেরুচ্ছে আমার!

কামাল ভাই কথা বললেন না। মুচকি হাসলেন। বললাম, তাহলে বইটার একটা কাভার করাই আমি।

কাকে দিয়ে?

কাজী হাসান হাবিব। আমার বন্ধু। খুব ভালো আর্টিস্ট।

হাবিবকে তিনি চিনলেন না। বললেন, করাতে পারো।

ভূমিকা লিখে, হাবিবকে দিয়ে একটি কাভার করিয়ে নিয়ে গেলাম। খুবই আধুনিক এবং সুন্দর কাভার করেছে হাবিব। কিন্তু কাভারটি কামাল ভাইয়ের পছন্দ হলো না। ভূমিকা রেখে কাভারটি তিনি আমাকে ফেরত দিলেন। তাঁর আচরণে সেদিনও আমি বুঝতে পারলাম না ব্যাপারটি আসলে কী হচ্ছে। বই বেরুবে কি বেরুবে না একবারও তো বলছেন না। কেমন যেন রহস্যময় আচরণ। বুলবুল, সিরাজ, হাবিব, জুবায়ের, সারোয়ার ওদের সঙ্গে আলাপ করার পর কেউ কেউ হাসাহাসিও করল। আমি ভেতরে ভেতরে একেবারেই দমে গেলাম। কেউ একজন বলল, হাবিবের এত সুন্দর কাভার পছন্দ হয়নি, তার মানে বই করবে না। ভেবেছিল করবে, তারপর কোনও কারণে ভাবনাটা নিশ্চয় বাদ দিয়েছে। তোকে সরাসরি বলতে ভদ্রতায় বাধছে বলে এই আচরণ করছেন।

বই বেরুবার স্বপ্নটা মাঠে মারা গেল। লজ্জায় আমি আর বাংলাবাজার মুখো হই না। বুলবুলের সঙ্গে অন্যত্র দেখা হয়।

এসবের মাস দু’তিনেক পর বাংলাবাজার গেছি। বুক সোসাইটির সামনে দিয়ে মাথা নিচু করে জোনাকী অফিসে যাচ্ছি, কামাল ভাই ডাকলেন, মিলন, শোনো। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বললেন, তুমি তো অদ্ভুত ছেলে। বাসার ঠিকানা ফোন নাম্বার কিচ্ছু দাওনি। তোমার সঙ্গে তো যোগাযোগই করতে পারছি না। মাসখানেক হলো তোমার বই বেরিয়ে গেছে।

শুনে কথাটি আমার বিশ্বাসই হলো না। ফ্যাল ফ্যাল করে কামাল ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। একজন কর্মচারীকে ইশারা করলেন তিনি, সে একগাদা ভালবাসার গল্প এনে আমার সামনে রাখল। প্রাণেশ কুমার মণ্ডলের কালো হলুদ রঙের প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদটি তেমন সুবিধার নয়। তবু এই আমার প্রথম বই। বইয়ের দিকে তাকিয়ে কান্না পেয়ে গিয়েছিল।

আমার প্রথম নাটকের নাম মায়াকানন প্রচারিত হয়েছিল আটাত্তর সালের শেষ কিংবা উনআশির প্রথম দিকে। কিন্তু নাটকটি সরাসরি আমার লেখা নয়। সেই সময় ইত্তেফাক ভবন থেকে সাপ্তাহিক রোববার পত্রিকাটি বেরোয়। আমি জগন্নাথ কলেজে অনার্স শেষবর্ষের ছাত্র। সাবজেক্ট ইকনমিক্স। কিন্তু পড়াশুনোয় আমার মন নেই। বছর পাঁচেক আগে লেখালেখির পোকা ঢুকেছে মাথায়। অবিরাম গল্প-উপন্যাস আর ছোটদের লেখা লিখছি। সেগুলো কিছু হচ্ছে কি হচ্ছে না, ভাবছি না। অবিরাম লিখেই যাচ্ছি। লেখক-কবি অনেকের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয়েছে। রোববার তখন বেরুব বেরুব করছে। নেপথ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন রাহাত খান। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন রফিক আজাদ, আমার প্রিয়তম বন্ধু শিল্পী কাজী হাসান হাবিব, অসীম সাহা, আতাহার খান, সেলিম নজরুল হক আর আজকের বিজ্ঞাপন জগতের এক মহীরুহ আমার আরেকজন প্রিয়বন্ধু সানাউল আরেফিন। রাহাত খান, রফিক আজাদ আমাকে টেনে নিলেন রোববারে। লেখাপড়া একপাশে রেখে সারাদিন রোববার অফিসে পড়ে থাকি। নিউজপ্রিন্টের ছোট প্যাডগুলোর একটির পর একটা হাবিজাবি লেখা লিখে শেষ করি। রোববার পত্রিকা নিয়ে দীর্ঘ একটি লেখা একসময় আমি লিখেছি, এজন্য এই লেখায় বিস্তারিত আর কিছু লিখছি না। নাটক প্রসঙ্গেই ফিরি। রোববারের কোনও একটি বিশেষ সংখ্যায় ছোট্ট একটি প্রেমের উপন্যাস লিখলাম! পিছনে ফেলে আসি। নামটি নেওয়া হলো রফিক আজাদের কবিতা থেকে। তখন রফিক আজাদের কবিতায় দারুণভাবে আচ্ছন্ন আমি। রফিক আজাদকে নিয়ে উপন্যাসও লিখেছি দুঃখ কষ্ট। তাঁর কবিতার নামেই নাম। ওই যে সেই কবিতা ‘পাখি উড়ে গেলে পাখির পালক পড়ে থাকে কঠিন মাটিতে, এই ভেবে কষ্ট পেয়েছিলে’। এই ছিল থিম। যাহোক পিছনে ফেলে আসি লেখাটির মূল প্রেরণা ছিল এরিখ সেগালের বিখ্যাত উপন্যাস লাভ স্টোরি। পরে বই করার সময় পিছনে ফেলে আসি নামটি বদলে দিয়েছিলাম। বোধহয় বাণিজ্যিক কারণেই নাম দিই হে প্রেম। আফজাল হোসেনের দুর্দান্ত কাভার নিয়ে দশ-বারোটি এডিশন হয়েছে বইটির।

কিন্তু রোববারে পিছনে ফেলে আসি পড়ে মুগ্ধ হলেন একজন টিভি নাট্যকার। তাঁর নাম ফজলুল করিম। লেখাটির টেলিভিশন নাট্যরূপ দিলেন তিনি। আমি তখনও টেলিভিশন বুঝি না, টেলিভিশনের নিয়মকানুন বুঝি না। টেলিভিশনে নাটক করতে হলে যে একজন প্রযোজক ধরতে হয়, তিনমাস আগে নাটকের প্রপোজাল, থিম এসব জমা দিতে হয়, জানা নেই আমার। কিন্তু টেলিভিশনে যাতায়াতটা আছে। তখনকার জনপ্রিয়তম জুটি আফজাল-সুবর্ণা দুজনেই আমার বন্ধু। ওদের নাটকের স্যুটিং দেখতে যাই। এই জুটি একটি দুর্দান্ত জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান করত, ‘আপনপ্রিয়’, ওটার স্যুটিংয়েও যেতাম। কিন্তু টেলিভিশনের ভেতরকার নিয়মকানুন সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই। তখন আবদুল্লাহ আল মামুন, মুস্তাফিজুর রহমান, আতিকুল হক চৌধুরী অসাধারণ সব নাটক করছেন। মুস্তাফিজুর রহমানের মাধ্যমে ফজলুল করিম একটি নাটকের প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। নাম মায়াকানন। যথাসময়ে নাটকের রিহার্সেল শুরু হলো। অভিনয় করছেন আফজাল হোসেন, সুবর্ণা মুস্তাফা, বাবার চরিত্রে আবুল হায়াত, আফজালের ছোটবোনের চরিত্রে রিনা সুলতানা। কিন্তু স্ক্রিপ্ট পড়ে তাঁরা কেউ তেমন সুখী হতে পারলেন না। এমনকি মুস্তাফিজ ভাই নিজেও। ফজলুল করিমকে নাটকটির কিছু কিছু জায়গা বদলাতে বললেন। ফজলুল করিম তা না করে পরদিন সম্পূর্ণ নতুন একটি স্ক্রিপ্ট নিয়ে এলেন। এটি হচ্ছে পিছনে ফেলে আসির নাট্যরূপ। এই স্ক্রিপ্ট সবাই পছন্দ করলেন। কিন্তু মায়াকানন নামটি তো আর বদলানো যাচ্ছে না। কারণ টিভি গাইডে ছাপা হয়ে গেছে। সুতরাং মায়াকানন নামেই শুরু হলো পিছনে ফেলে আসি। ঘটনাটি আমি শুনলাম আফজালের মুখে।

তখন জগন্নাথ কলেজ, রোববার পত্রিকা, ইউনিভার্সিটি এলাকায় শরিফ মিয়ার ক্যান্টিনের আড্ডা ছাড়াও আমার একটি প্রিয় আড্ডার জায়গা ছিল স্টেডিয়ামের উলটোদিককার ‘খাবার দাবার’ রেস্টুরেন্ট। খাবার দাবারের মালিক ফরিদুর রেজা সাগর আমার লেখকজীবনের শুরুর দিককার বন্ধু। আমরা একসঙ্গে ‘চাঁদের হাট’ করতাম। সাগরের সঙ্গে খাবার দাবারে ছিল সিরাজুল ইসলাম নামে আমাদে আরেক বন্ধু, যিনি আজকের বিখ্যাত শাইখ সিরাজ। খাবার দাবারে যখন তখন আড্ডা দিতে চলে যেতাম আমরা। আফজাল, ফরিদী, রহমান (প্রিয়জন পত্রিকার সম্পাদক আবদুর রহমান), আজকের বিখ্যাত সাংবাদিক আলীমুজ্জামান, আরেকজন বিখ্যাত সাংবাদিক সাইফুল আলম, পাভেল রহমান, ফটোসাংবাদিক হিসেবে যিনি পৃথিবীবিখ্যাত। ব্রাজিলের একটি উৎসবে পাভেলের ছবি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার পেয়েছিল। তাঁর ছবি দিয়ে নিউজ উইক কাভার করেছে। খাবার দাবারের আড্ডা নিয়ে অন্য একটি লেখা লেখার ইচ্ছে আছে আমার।

যাহোক খাবার দাবারের যখন তখন আড্ডা দিতে যাওয়ার জন্য একটি কারণও ছিল আমাদের। আমরা অনেকেই তখন বেশ গরিব। টাকা-পয়সা বলতে গেলে থাকেই না। সাগর ছাড়া প্রায় সবাই তুমুল সিগ্রেট খাই, পনেরো-বিশ মিনিট পরপর চা। কোনও কোনওদিন দুপুরে পেটভর্তি খিদে নিয়ে ঘুরে বেড়াই। আমাদের মধ্যে রহমানরা বেশ বড়লোক। রাজউকের পাশে নিজস্ব জায়গায় ওদের ‘ঢাকা সিডস্টোর’ (এখন বিশাল বিল্ডিং)। রহমান তার বাবার বড় ছেলে। অসাধারণ ছড়া লেখে। যখন-তখন বাবার কাছ থেকে গিয়ে টাকা নিয়ে আসে। আমাদের জন্য দু’হাতে খরচা করে। তারপরেও অভাবে পড়ে যাই আমরা। তখন আমাদের একমাত্র কাণ্ডারি সাগর। খাবার দাবারে গেলেই সব ফ্রি। ঘণ্টায় ঘণ্টায় চা, সকালে পরোটা গোসত, দুপুরে ভুনা খিচুরি, বিকেলে রসে টইটম্বুর জিলিপি।

এই আড্ডায় এসেই মায়াকাননের ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরিটা বলল আফজাল। শুনে আনন্দে ফেটে পড়লাম আমি। আমার গল্পের নাট্যরূপ হচ্ছে টেলিভিশনে? বন্ধুরাও আমার মতোই খুশি হলো। প্লেট প্লেট জিলিপি সাপ্লাই দিল সাগর। আমরা সেলিব্রেট করলাম।

মায়াকানন দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। ভাবতে মজা লাগে, আমার একই লেখা তিন জায়গায় তিন নামে দাঁড়াল। পত্রিকায় পিছনে ফেলে আসি, টেলিভিশনে মায়াকানন, বই হলো হে প্রেম নামে।এইভাবে লেখক হয়ে ওঠা সেই হতাশ, দরিদ্র আর অসহায় যুবক অনেক অনেক বছর অতিক্রম করে একটি সময়ে লক্ষ করল, একসময় অবজ্ঞা-অবহেলা করা বহুমানুষ অতি সম্মান দেখিয়ে তার কাছে ফিরতে শুরু করেছে। কাজির পাগলা হাইস্কুলের শতবর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে সে হয়ে উঠেছে এক অবধারিত ব্যক্তিত্ব। [চলবে]