২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কালি ও কলমে আবুল হোসেন হাসনাত আবদুল হাইয়ের হাইকু গ্রন্থের সমালোচনা করতে গিয়ে হক্কু ও রবীন্দ্রনাথের হাইকু লেখা-প্রসঙ্গে কিছু কথা লিখেছেন। আমার মনে হয়, আমার হাইকু গ্রন্থের (ঢাকা : পুনশ্চ, ২০০৩) ভূমিকা থেকে খানিকটা অংশ তুলে দিলে পুরো ব্যাপারটি আরো একটু স্পষ্ট হতো : আমার ভূমিকার অংশবিশেষ –
“জাপান রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছিল। এই মুগ্ধতার অনেকগুলো কারণের একটি হাইকু। হাইকু সম্বন্ধে তাঁর ‘জাপানযাত্রী’ গ্রন্থের অভিমত এই প্রকার, ‘তিন লাইনের কাব্য জগতের আর কোথাও নেই। এই তিন লাইনই ওদের কবি, পাঠক, উভয়ের পক্ষেই যথেষ্ট। সেইজন্যেই এখানে এসে অবধি, রাস্তায় কেউ গান গাচ্ছে, এ আমি শুনি নি। এদের হৃদয় ঝরনার জলের মতো শব্দ করে না, সরোবরের জলের মতো স্তব্ধ। এপর্যন্ত ওদের যত কবিতা শুনেছি সবগুলিই হচ্ছে ছবি দেখার কবিতা, গান গাওয়ার কবিতা নয়। হৃদয়ের দাহ এবং ক্ষোভ প্রাণকে খরচ করে, এদের সেই খরচ কম। এদের অন্তরের সমস্ত প্রকাশ সৌন্দর্যবোধে। সৌন্দর্যবোধ জিনিসটাই স্বার্থনিরপেক্ষ। ফুল, পাখি, চাঁদ, এদের নিয়ে আমাদের কাঁদাকাটা নেই। এদের সঙ্গে আমাদের নিছক সৌন্দর্যভোগের সম্বন্ধ – এরা আমাদের কোথাও মারে না, কিছু কাড়ে না, এদের দ্বারা আমাদের জীবনে কোথাও
ক্ষয় ঘটে না। সেইজন্যেই তিন লাইনেই এদের কুলোয়, এবং কল্পনাটাতেও এরা শান্তির ব্যাঘাত
করে না।
এদের দুটো বিখ্যাত পুরোনো কবিতার নমুনা দেখলে আমার কথাটা স্পষ্ট হবে :
পুরোনো পুকুর,
ব্যাঙের লাফ,
জলের শব্দ।
বাস! আর দরকার নেই। জাপানি পাঠকের মনটা চোখে ভরা। পুরোনো পুকুর মানুষের পরিত্যক্ত, নিস্তব্ধ, অন্ধকার। তার মধ্যে একটা ব্যাঙ লাফিয়ে পড়তেই শব্দটা শোনা গেল। শোনা গেল – এতে বোঝা যাবে পুকুরটা কী রকম স্তব্ধ। এই পুরোনো পুকুরের ছবিটা কীভাবে মনের মধ্যে এঁকে নিতে হবে সেইটুকু কেবল কবি ইশারা করে দিলে; তার বেশি একেবারে অনাবশ্যক।
আর-একটা কবিতা :
পচা ডাল,
একটা কাক,
শরৎকাল।
আর বেশি না! শরৎকালে গাছের ডালে পাতা নেই, দুই-একটা ডাল পচে গেছে, তার উপরে কাক ব’সে। শীতের দেশে শরৎকালটা হচ্ছে গাছের পাতা ঝরে যাবার, ফুল পড়ে যাবার, কুয়াশায় আকাশ ম্লান হবার কাল – এই কালটা মৃত্যুর ভাব মনে আনে। পচা ডালে কালো কাক বসে আছে, এইটুকুতেই পাঠক শরৎকালের সমস্ত রিক্ততা ও ম্লানতার ছবি মনের সামনে দেখতে পায়। কবি কেবল সূত্রপাত করে দিয়েই সরে দাঁড়ায়। তাকে যে অত অল্পের মধ্যেই সরে যেতে হয় তার কারণ এই যে, জাপানি পাঠকের চেহারা দেখার মানসিক শক্তিটা প্রবল। …
এই কবিতাগুলির মধ্যে কেবল যে বাক্সংযম তা নয়, এর মধ্যে ভাবের সংযম। এই ভাবের সংযমকে হৃদয়ের চাঞ্চল্য কোথাও ক্ষুব্ধ করছে না। আমাদের মনে হয়, এইটেতে জাপানের একটা গভীর পরিচয় আছে। এক কথায় বলতে গেলে, একে বলা যেতে পারে, হৃদয়ের মিতব্যয়িতা।’
জাপানযাত্রী গ্রন্থের বেশ খানিকটা তুলে দেওয়া হলো কেবল এইটুকু বলতে যে, বাংলা ভাষায় আর কেউ হাইকু-বিষয়ে এমন উৎকৃষ্ট রচনা লেখেননি। যে-দুটি কবিতা রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করেছেন তা বাশোর কবিতা। সারাজীবনে এই দুইখানা হাইকু ছাড়া তিনি আর একটিও হাইকু লেখেননি। স্ফুলিঙ্গ বা অন্যান্য অনুকবিতা হাইকু নয়। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আমাদের কবিতার মেজাজে হাইকুর স্থান কম।
এবারে দ্বিতীয় প্রসঙ্গ। কবে থেকে হক্কু বা হাইকু লেখা শুরু হলো।
আমার হাইকু গ্রন্থের ভূমিকার অংশবিশেষ এই প্রকার : “জাপানের হাইকুর কবে থেকে শুরু। প্রথম থেকেই কি একে হাইকু বলা হতো?’
জাপানি সাহিত্যের ইতিহাসে ‘টকুওগা’ কাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ-সময়ে জাপানি সাহিত্যের স্বর্ণযুগ। ‘টকুওগা’র সময়কাল ১৬৮৮ থেকে ১৭০৪। এ-সময়কালের আগে থেকেই হাইকাই নামে একধরনের সাহিত্যচর্চা জাপানি সাহিত্যে চলছিল। হাইকাই শব্দের অর্থ হাস্যরস বা হিউমার। এই হাইকাই সাহিত্যধারায় আংটা লাগানো একধরনের কাব্যচর্চা তখন টোকিও, ওসাকা ও কিয়োটোতে প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করে। চতুর্দশ বা পঞ্চদশ শতক থেকে এক ধরনের হুক বা আংটা লাগানো কবিতা জাপানি সাহিত্যের কাব্য-ইতিহাসে পাকা আসন গেঁথে বসেছিল। এই কাব্যচর্চার নাম ছিল রেংগা। রেংগা অনেকটা রঙ্গর মতো কোনো ব্যাপার। রেংগার প্রথম তিন পঙ্ক্তি লেখেন একজন কবি ৫ ৭ ৫ নিয়মে। তারপর দুই লাইন যোগ করেন আরেক কবি ৭ ৭ নিয়মে। এরপর আরেকজন কবি তিন পঙ্ক্তি বা পুরো পাঁচ পঙ্ক্তি একসঙ্গে লেখেন। এভাবে বিভিন্ন কবি লিখতে থাকেন তিন পঙ্ক্তি, দুই পঙ্ক্তি বা পাঁচ পঙ্ক্তি করে। তারপর দেখা যায় একটি বিশাল দুশো লাইনের রেংগা লিখে শেষ করেছেন সমবেত কবি। প্রথম তিন পঙ্ক্তি যিনি লেখেন তাঁর কাজ সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তিন পঙ্ক্তির সঙ্গে মিল রেখে পরের কাব্য-আঙ্গিক বা বিষয়বস্তু তৈরি হয়। পরবর্তীকালে এই তিন পঙ্ক্তি কবিতা হয়ে যায় হাইকু আর পাঁচ পঙ্ক্তি কবিতা হয়ে যায় ট্যাংকা বা তানাকা। প্রথম দিকে এই তিন পঙ্ক্তির হাইকুকে বলা হতো হক্কু বা হুক। তার একমাত্র কারণ আলাদা তিন পঙ্ক্তির কোনো অস্তিত্ব ছিল না। আংটা লাগিয়ে দুশে/দীর্ঘ একটি রেলগাড়ি এই ছিল রেংগা পদকর্তার কারবার। এই হক্কু হাইকু নামে প্রথম পরিচিত হয়েছিল ১৮৮৬-১৯০২ সালের হাইকু-পদকর্তা মাশাওকা শিকির সময়ে। তার আগে যাঁরা লিখতেন তাঁরা হক্কু বলতেন। যদিও তখন তিন লাইন অস্তিত্বে হাইকু স্বতন্ত্র চেহারা পেয়েছে বাশোর সময়ে। ট্যাংকা বা রেংগার লেজ খসে তিন লাইন হাইকু যেমন এক নতুন কাব্য-আঙ্গিক ও সুবাসে নতুন ব্যাপার হয়ে যায় তেমনি ট্যাংকাও জেগে ওঠে পাঁচ পঙ্ক্তির স্বতন্ত্র কবিতারূপে। কিন্তু বাশো একে হাইকু বলে ডাকতে শুরু করেননি। তবে জেন ধর্মাবলম্বী মাতশুয়ো বাশোর হাতে পড়ে হাইকু একেবারে অন্য জিনিস হয়ে ওঠে। যেখানে হাইকাই বা হাস্যরসের চেহারা বদলে ধ্যানী বাশোর কলাগাছের ঝোপের মধ্যে হাইকু প্রাণ পেল প্রকৃতিনির্যাসে ও নতুন চিত্রকল্পে। বাশো শব্দের অর্থ কলাগাছ বা কলাপাতা। বোঝা যায় জেন ধর্মে বিশ্বাসী বাশো বাস করতেন কলাগাছঘেরা আপন কুটিরে। তিনি হাইকুকে করলেন শোভনতর। সিরিয়াস। আবার প্রকৃতির ঘাস ও গুল্মের মতো সহজ ও সজল কবিতা। হাইকাইয়ের রঙ্গ আর রইল না এখানে। রইল না রেংগার একদল মানুষের লেখা সমবেত কবিতা। ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটল। ফুটে উঠতে লাগল ব্যক্তির অলৌকিক আনন্দের ভার। দুশো তিনশো লাইনের বারোয়ারি ট্যাংকা বাশোর সময়ে তার পরমায়ু নিভিয়ে ছোট নিটোল হাইকু ও ট্যাংকা হয়ে গেল। রেংগা পদকর্তারা অতীতের কঠিন, কঠোর নিয়ম ভেঙে কাব্যচর্চায় এনেছিলেন সমবেত কবির কৌতুক। বাশোর ধ্যানী মন সেই রঙ্গকে করল শান্ত ও সুমিত। রেংগা কবি রেংগার আসরে আসতে পকেটে করে আনতেন তিন লাইনের একটি হক্কু। ভাবতেন যদি তাকে শুরু করতে বলা হয়, তাই। পরে এই তিন লাইনের উদ্বোধনী কবিতা সংগ্রহ করে একটি গ্রন্থ রচনা করা হয়, যে-গ্রন্থটির নাম দেওয়া হয় হাইকাই নো রেংগা। পরবর্তীকালে স্বতন্ত্রভাবে হাইকু লেখা শুরু হলে তার সঙ্গে এসে যোগ দেয় সেনরিয়ু নামের আরেক তিন পঙ্ক্তির কাব্য-আঙ্গিক। সেনরিয়ু হাইকুর যমজ ভাই, যে একটু বেশি হাসতে ভালোবাসে এবং যার চলার গতি লঘু।
সেনরিয়ুতে হাইকুর শেষ লাইনের চমক থাকে না। যে-চমকের লাইনকে জাপানি ভাষায় কিরেজি বা কাটিং ওয়ার্ড বলা হয়। আর হাইকুর প্রকৃতি-সম্পর্কিত শব্দ-থাকার ব্যাপার সেনরিয়ুতে নেই। তবে পশ্চিমে সেনরিয়ু ও হাইকুর ভেদাভেদ ঘুচে গেছে বলাই ভালো। এখন ৫ ৭ ৫-এর নিয়মে যে-কোনো ছোট কবিতাকেই হাইকু বলা হয়। সেনরিয়ুর শেষ পঙ্ক্তি প্রথম দুই পঙ্ক্তির রেশ। আর হাইকুতে থাকতে হবে একটু নতুন ধরনের চমক। ‘কাপেতে মাছি/ পড়ে আছে টেবিলে/ দূরে বাস চলছে।’ চা খেয়ে মেয়েটি এখন বাসে চেপে কোথায় চলেছে। সেনরিয়ু হলে হয়তো শেষ লাইন হতো ‘বিস্কুটগুঁড়ো’।”আশা করি হয়তো আমি হক্কু, হাইকাই, রেংগা, ট্যাংকা, সেনরিয়ু ও হাইকুর ভেদাভেদের কথা ঠিক করে বলতে পেরেছি।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.