স্যাটেলাইট টেলিভিশন : সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

বাংলা স্যাটেলাইট টেলিভিশনের দর্শকমাত্রই জানেন, আমরা কী ধরনের টিভি-আবহাওয়ায় বসবাস করছি। আর সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত অবধি আমরা অনেকেই নিজেদের সঁপে দিয়েছি টিভির কাছে। গৃহবধূদের অনেকেরই দিবানিদ্রা এখন আর নেই। ক্লান্ত-দুপুরে বিছানায় শুয়ে উপন্যাস পড়া গৃহবধূদের সেই বিলাসিতাও এখন প্রায় নেই বললেই চলে।

অর্থাৎ নারীপুরুষ-নির্বিশেষে এখন আমরা অনেকেই টিভির মোহের কাছে পরাজিত। শিশুরাও বাদ নেই। একদিকে রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো খেলার মাঠ ক্রয় করে বহুতল বাড়ি তৈরি করছে, অন্যদিকে নানা স্যাটেলাইট চ্যানেলে রয়েছে শিশুদের জন্য রকমারি ভোজ। বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে এমনকি গৃহভৃত্য পর্যন্ত এখন টিভি বা ক্যাবল টিভিতে মজে রয়েছেন।

দু-ধরনের টেলিভিশন চ্যানেল এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। ১. টেরিস্ট্রিয়েল, যা শুধু দেশের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ। ২. ক্যাবল, যা ভূ-উপগ্রহের মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে, বিশেষ ব্যবস্থায় পৃথিবীর একটি বড় সীমানায় তার অনুষ্ঠান দেখা যাচ্ছে।

স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টিভি-অনুষ্ঠান-প্রচার – একালের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি বড় বিপ্লব, সন্দেহ নেই। বিশেষ করে, তথ্য-সম্প্রচারে তা যে একটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটিয়েছে, এ-ব্যাপারে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই। সারা পৃথিবীর সচিত্র ‘খবর’ গরম তেলেভাজার মতো মচমচে অবস্থায় আপনার আমার বৈঠকখানায় ঢুকে পড়ছে প্রায় সারাদিনই। দূরকে নিকট করা – তা এত আক্ষরিকভাবে আমাদের জীবনের আর কোনো ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি।

টেরিস্ট্রিয়েল টিভি একটি দেশীয় সীমানার টিভি। অর্থাৎ দেশের লোকদের জন্যে এই টিভি প্রচারিত হচ্ছে। আমাদের আজকের আলোচনায় তা প্রাসঙ্গিক নয় বলে এই নিবন্ধে তার আলোচনা বাদ দিয়ে রেখেছি। তবে দেশের চাহিদার প্রেক্ষাপটে টেরিস্ট্রিয়েল টিভির একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। সেই ভূমিকাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। দেশের সাধারণ দর্শকের কাছে টেরিস্ট্রিয়েল টিভিই পৌঁছেছে, ক্যাবল টিভির সুযোগ পেয়েছেন কিছু ভাগ্যবান মানুষ।

এই অঞ্চলে ক্যাবলের সাহায্যে প্রচারিত বেশির ভাগ টিভি চ্যানেলেরই উৎপত্তিস্থল ভারত। অনেকগুলো স্যাটেলাইট টিভি

চ্যানেল চলে ভারতে। বাংলাদেশও তিনটি ক্যাবল চ্যানেল নিয়ে তার পাশে জায়গা

করে নিয়েছে।

ভারত থেকে পরিকল্পিত ও পরিচালিত বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেল শুধু ভারতবর্ষের দর্শকরা দেখছেন না, এশিয়া ও ইউরোপের বহু দেশের দর্শকরা দেখছেন। আমরা বাংলাদেশেও দেখছি। তবে এক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা দুরকম। ১. ভারত এসব স্যাটেলাইট চ্যানেল-পরিকল্পনা, পরিচালনা ও ব্যবসা করছে। ২. এসব চ্যানেলের প্রায় একশ ভাগ অনুষ্ঠানই ভারত তৈরি করছে। ভারত একইসঙ্গে প্রডিউসার ও কনজিওমার। তাদের প্রডাক্ট তারা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি করছে। আর এশিয়া ও ইউরোপের দর্শক এই অনুষ্ঠানের কনজিওমার।

আমরা বাংলাদেশেও ভারতীয় বিভিন্ন স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের কনজিওমার। তবে আর্থিক অবস্থার কারণে এখনো ‘ক্যাবল টিভি’র দর্শক ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ গুটিকয়েক বড় শহরেই সীমাবদ্ধ।

ঢাকা পৌর এলাকায় বসতবাড়ির সংখ্যা ১০ লাখ ২৮ হাজার। এর মধ্যে ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িতে টিভিসেট রয়েছে। এর ৩৬ দশমিক শতাংশের রয়েছে ক্যাবল কানেকশন (সূত্র : ঝওজওটঝ – মার্কেটিং অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ, এপ্রিল ২০০১)। ভারতে নির্মিত স্যাটেলাইট টিভির অনুষ্ঠান মানে একগাদা সিরিয়াল। আরো কয়েকরকম অনুষ্ঠান প্রচারিত হলেও এসব টিভি চ্যানেলের প্রধান অনুষ্ঠান হচ্ছে সিরিয়াল। হয়তো বিজ্ঞাপনদাতা ও স্পন্সররা এ-ধরনের অনুষ্ঠানই পছন্দ করেন। প্রাইভেট চ্যানেলগুলো তো বিজ্ঞাপন বা স্পন্সর ছাড়া কোনো অনুষ্ঠানই প্রচার করতে পারে না বা চায় না।

বিজ্ঞাপনদাতা বা স্পন্সররা কোন অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন দেবেন, তা যাচাই করার জন্যে তারা তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতে দর্শক-মতামত-জরিপ পরিচালনা করেন। কিন্তু দর্শকদের চাহিদা জরিপ করার জন্যে কোনো দর্শক-মতামত-জরিপ করা হয় না।

দর্শকরা সাধারণত পর্দায় যা দেখতে পান তাতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। এর বাইরেও যে টিভি-অনুষ্ঠান হতে পারে তা অনেক দর্শকের মাথায় আসতে চায় না। এখানে একটি বড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে বলে আমার মনে হয়। টিভি-কর্মকর্তারা দর্শকদের একটি মোটা ছাঁচে ফেলে বিচার করেন। সেই বিবেচনা থেকে অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করেন। তারই ফল হলো প্রতিদিনের সিরিয়াল।

টিভি-কর্তারা আরো একটি দিক বিবেচনা করতে ভুল করছেন বলে মনে হয়। তা হলো, এই প্রযুক্তির বৈশিষ্ট্যই এমন যে, তার দর্শক দেশীয় সীমানার মধ্যে নয়, এমনকি মহাদেশীয় সীমানার মধ্যেও আবদ্ধ নয়। তবু বলা যায়, স্যাটেলাইট চ্যানেলের দর্শক বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালেই বেশি। এসব দেশের যে-নাগরিকরা কর্মোপলক্ষে দেশের বাইরে থাকেন তারাও এসব চ্যানেলের দর্শক। দেশের বাইরে অবস্থান করলেও দেশের প্রতিই থেকে যায় তাদের টান। প্রতিদিন দেশের খবর জানতেই তারা উন্মুখ। অবশ্য প্রায় সব চ্যানেলেই ‘খবর’ একটি বিশেষ আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু আরো অনেক ক্ষেত্র ছিল, যার প্রতি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো অবহেলা করছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে হবে এই চার দেশে কী কী কমন বিষয় রয়েছে বা কী কী বিষয় আলোচনা করলে বা প্রামাণ্য কিছু দেখালে তা একাধিক দেশ বা চারটি দেশের মধ্যে

আগ্রহ সঞ্চার করতে পারে। এ-রকম অনেক বিষয় হতে পারে। যেমন : অর্থনীতি, ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, শিক্ষা, ভ্রমণ, নস্টালজিয়া এবং একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত

সমস্যা ইত্যাদি।

এখন এসব বিষয়ে কোনো অনুষ্ঠান প্রচার হয় না, তা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। এখনো হয়। তবে তা মূলত যার যার দেশের দৃষ্টিকোণ থেকে ও নিজ নিজ দেশের দর্শকদের জন্যে। আমার প্রস্তাব হচ্ছে, কিছু অনুষ্ঠান নির্দিষ্ট করা যায় যা অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্কিত সমস্যা হবে।

ভাবতে অবাক লাগে, এসব স্যাটেলাইট টিভির ‘খবরে’ও যার যার দেশের খবরই পুরো ‘খবর’ জুড়ে থাকে। প্রযুক্তির এত উন্নতি সত্ত্বেও স্যাটেলাইট টিভির ‘খবরে’ আশেপাশের দেশের খবর কমই থাকে। খুব বড় ঘটনা হলেই শুধু স্থান পায়। যেসব বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান করার প্রস্তাব দিয়েছি সেগুলো নিয়ে টক শো, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, নাটক, প্রামাণ্য চলচ্চিত্র, সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠান তৈরি হতে পারে।

আমাদের উপমহাদেশ – ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এক অদ্ভুত রাজনৈতিক বিবাদ ও পরস্পরের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। একমাত্র হিন্দি ফিল্ম ও ক্রিকেট ম্যাচ ছাড়া আর কোনো কিছুকে তিনটি দেশ খোলামনে গ্রহণ করতে পারেনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, টিভি-মাধ্যম সচেষ্ট হলে এই সন্দেহ ও অবিশ্বাস অনেকটা দূর করতে পারত। তবে তার জন্যে দক্ষ অনুষ্ঠান-নির্মাতা ও উপস্থাপক দরকার। বাজার থেকে মাছ-মাংস সবাই কিনতে পারে, তবে ভালো রাঁধুনি সবাই হতে পারে না।

অনেকে আশংকা করতে পারেন, এসব বিষয় যদি টিভি-অনুষ্ঠানে ঢুকে যায় তাহলে টিভির বাক্সটি রাজনীতির ময়দান হয়ে যাবে। সবসময়ে শুধু বক্তৃতা আর বক্তৃতা!

এই আশংকাও অমূলক। কারণ টেলিভিশন যে প্রধানত বিনোদনের বাক্স, তা আমি অস্বীকার করছি না। কাজেই এসব চ্যানেলে প্রধানত বিনোদন-অনুষ্ঠানই হবে। যদি অনুপাত হিসেবেও চাই তাহলে আমি বলব, পঁচাত্তর ভাগ বিনোদন, পঁচিশ ভাগ তথ্যমূলক। তবে সেই অনুষ্ঠান এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে তার মাধ্যমেও মানুষ বিনোদন লাভ করে। আর তার চেয়েও বড়

শর্ত হলো, সেই অনুষ্ঠান অ্যাড্রেস করতে

হবে উপমহাদেশের দর্শককে। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরাও হবে বিভিন্ন দেশের, শুধু এক দেশের নয়।

বাংলাদেশের একজন দর্শক প্রশ্ন করতে পারেন – আমাদের দেশের টিভিতে অন্যান্য দেশের বিষয় আমরা শুনব কেন?

প্রশ্নটি উঠতেই পারে। এর জবাব দুটি।

এক. শুধু বাংলাদেশের বিষয় আলোচনা করার জন্য টেরিস্ট্রিয়েল টিভি ‘বিটিভি’ তো রয়েছেই। তাছাড়া স্যাটেলাইট টিভিতে দেশীয় বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান করা যাবে না, তা তো আমি বলিনি।

দুই. পৃথিবী বদলে যাচ্ছে দ্রুত। বিশ্বায়নের প্রভাব আমরা প্রতিদিন অনুভব করছি। ১৯৪৭ সালের জাতীয়তাবাদী অনুভূতি দিয়ে ২০০৪ সালের সবকিছু বিচার করা যাবে না। ইউরোপে যখন এক ও অভিন্ন মুদ্রা চালু হয়ে গেছে তখন আমাদের এই ধারণা সভ্য দেশে হাসির খোরাক যোগাবে।

কবি নজরুল যুগস্রষ্টা কবি। তাই বহু আগেই তিনি আমাদের অবস্থা দেখে লিখতে পেরেছিলেন : ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখন বসে/ বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজছি ফিকাহ হাদিস চষে।’

কথাটা এখনো কত নির্মম সত্য!

আমি যে-ধরনের অনুষ্ঠানের স্বপ্ন দেখি, তা শুধু তত্ত্বকথার মধ্যে সীমিত না রেখে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

অনেক দর্শক নিশ্চয় বিবিসি ওয়ার্ল্ডে ‘ইন্ডিয়া কোশ্চেন আওয়ার’ দেখে থাকবেন। খুব সুন্দর অনুষ্ঠান, সন্দেহ নেই। ধরা যাক, অনুষ্ঠানটির নতুন নামকরণ হলো : ‘কোশ্চেন আওয়ার’। এতে পালাক্রমে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপালের ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। কখনো একাধিক দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। আলোচক, মডারেটর, অংশগ্রহণকারী দর্শক পালাক্রমে সব দেশ থেকে হবে।

এ-রকম একটি সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান নিয়মিত প্রচারিত হলে উপমহাদেশের নানা পরিস্থিতি সম্পর্কে দর্শকরা অবহিত হবেন। অনেক ভুল ধারণা ভাঙবে। এসব দেশের সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বও আর সাতপাঁচ মিথ্যা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না। এ-ধরনের আলোচনা কোনো একটি অনুষ্ঠানে শেষ করা যায় না। ঠিকমতো সাজাতে জানলে উপমহাদেশের নানা ইস্যু নিয়ে আলোচনার ‘সিরিয়াল’ তৈরি করা যায়।

আমার আজকের লেখার মূল ফোকাস ‘বাংলা টিভি’। কাজেই এখন আমি বাংলা স্যাটেলাইট টিভি-অনুষ্ঠানের ওপর আলোকপাত করব।

বাংলাদেশ ও ভারত দুটি দেশ হলেও বাংলা ভাষা দুটি দেশের মধ্যে একটি যোগসূত্র রেখে দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার মধ্যে। শুধু কি ভাষা? রবীন্দ্রনাথ, নজরুল-সমেত সমগ্র বাংলা সাহিত্যের পাঠকও অভিন্ন। যদিও নানা কারণে বাংলাদেশের সাহিত্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরার পাঠকদের তেমন ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটেনি।

বাংলা স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো সামগ্রিক বাংলা সাহিত্য নিয়ে একটি নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে পারত। বাংলা সাহিত্যের (দুই দেশের) ধ্রুপদী কাজগুলো নিয়ে ধারাবাহিক নাটক তৈরি করতে পারত। সফল ছোটগল্পগুলোর নাট্যরূপ দিতে পারত।

সাহিত্য নিয়ে আলোচনা-অনুষ্ঠান, বই নিয়ে আলোচনা, কবিতা পাঠ, সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার, সাহিত্য-বিষয়ক বিতর্ক ইত্যাদি হতে পারত।

বাংলাদেশের টিভির একটি মৌলিক অবদান ‘ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান’। একটু হালকা মেজাজে পাঁচমিশালি বিষয়ের সমাহার। গান, নাচ, প্রতিভা-প্রদর্শন, জাদু, মিনি সাক্ষাৎকার, মিনি প্রতিবেদন, কৌতুক ইত্যাদি বিনোদনের সর্বপ্রকার বিষয় এই অনুষ্ঠানে এক চামচ করে গুলে দেওয়া হয়, যাতে দর্শক সবসময়ে পরেরটার জন্য মুখিয়ে থাকে। বাংলাদেশের প্রখ্যাত ও জনপ্রিয় টিভি-উপস্থাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এই মডেলের জন্মদাতা ও সফল রূপকার। টিভি-অনুষ্ঠান হিসেবে এই ফরম্যাট খুবই কার্যকর। আমার মনে হয়, বিভিন্ন বাংলা স্যাটেলাইট চ্যানেল বাংলাভাষী শিল্পী ও প্রতিভার সমন্বয়ে এ-রকম একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের কথা ভাবতে পারে।

একটু আগে ‘ইন্ডিয়া কোশ্চেন আওয়ারে’র কথা বলেছিলাম। এ-রকম একটি সাপ্তাহিক ‘টক শো’ বাংলা চ্যানেলেও হতে পারে। তার প্রধান বিষয়বস্তু হবে : বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ইস্যু। তিনবিঘা করিডোর, ট্রানজিট, ট্রানস্শিপমেন্ট, পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের বই-আমদানিতে শৈথিল্য, ঢাকায় কলকাতার বই-পাইরেসি, বাংলা বানান-পরিস্থিতি, তথ্যপ্রযুক্তি-সেক্টরে যৌথ শিল্পের সম্ভাবনা, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে আমদানি রপ্তানি-সমস্যা, ভিসার ঝামেলা, বাংলাদেশের অর্পিত সম্পত্তি আইন, বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার-দর্শন ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে, যেসব বিষয় এই অঞ্চলের বাংলাভাষী দর্শক-শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে সহজেই।

ভ্রমণ আরেকটি উপভোগ্য বিষয়। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ভ্রমণ-পিয়াসী। বাংলাদেশের মানুষ এখনো ততটা নয়। ভারতে বাংলাদেশের মানুষের ‘ভ্রমণ’ – এদিকে কলকাতা ওদিকে আজমির। ভ্রমণ কালচারটি এখনো আমাদের দেশে তেমন বিকশিত হয়নি, তবে কর্মোপলক্ষে বাংলাদেশের মানুষকে অ্যান্টার্কটিকায়ও পাওয়া যেতে পারে।

‘ভ্রমণ’ নিয়ে একটি চমৎকার নিয়মিত টিভি-অনুষ্ঠান হতে পারত। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, ভুটান – সার্ক দেশের এই সাতটি দেশ কভার করে চমৎকার অনুষ্ঠান হতে পারে বলে আমি মনে করি। বিভিন্ন এয়ারলাইন্স, পর্যটন-কর্তৃপক্ষ, হোটেল-কর্তৃপক্ষ এই অনুষ্ঠানে নানা কুইজ-প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করে অনুষ্ঠানটি জমিয়ে তুলতে পারে।

গান, নাচ, ব্যান্ড, যন্ত্রসংগীত ইত্যাদির সমন্বয়েও একটি অনুষ্ঠান করা যায়। এর ফলে বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক গানের সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় গড়ে উঠত। বাংলা গান নিয়ে শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়াও জানা যেত।

যে-অনুষ্ঠানটির ব্যাপারে আমি সবচেয়ে বেশি আশাবাদী, তা হলো প্রামাণ্যচিত্র। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা সর্বত্রই সাক্ষরতার হার কম, ফলে পত্রপত্রিকা পড়ে নানা তথ্য জানা এই অঞ্চলের বেশির ভাগ লোকের পক্ষে সম্ভব হয় না। টেলিভিশন এজন্যে একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারত। কিন্তু এত বছরেও তা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নানা সফল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও কর্মসূচির কথা মোটামুটি স্বীকৃত ও প্রশংসিত, কিংবা কিছুটা বিতর্কিতও। বিতর্ক নেই এমন কোনো কাজ এ-যাবৎ পৃথিবীতে হয়েছে কিনা সন্দেহ।

আমরা সকলে প্রত্যক্ষভাবে এসব প্রতিষ্ঠান দেখার হয়তো সুযোগ পাব না। তাই প্রামাণ্যচিত্র এর একটি পরোক্ষ সুযোগ এনে দিতে পারে। শুধুমাত্র যোগাযোগের অভাবে বাংলাদেশের ও পশ্চিমবঙ্গের নানা সফল কর্মকাণ্ড সম্পর্কে দুই অঞ্চলের মানুষ জানতে পারেন না। অথচ স্যাটেলাইট টিভির কল্যাণে পৃথিবীর কত দূর দেশের কত অজানা জিনিস আমরা প্রতিনিয়ত জানতে পারছি। জানি না শুধু পাশের বাড়ির খবর। ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুইপা ফেলিয়া…।’

প্রামাণ্যচিত্রের সম্ভাব্য বিষয় হতে পারে : পশ্চিমবঙ্গের ব্যবস্থা, সাক্ষরতা, আন্দোলন, সমবায়, কুটির শিল্প ও আরো কিছু। বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংক, পল্লী ফোন,

ব্র্যাক, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, আর্সেনিক-মোকাবিলা, গার্মেন্টস শিল্প, বাংলা একাডেমী, নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলা নববর্ষ পালন ইত্যাদি।

এটি চলমান প্রক্রিয়া। যে-কোনো ক্ষীণ সাফল্যও বড় করে দেখানো দরকার। কারণ আমাদের চারদিকে শুধু নেতিবাচক কথার ছড়াছড়ি। এমন সব বিষয়কে সবার সামনে তুলে ধরতে হবে যাতে বাংলা-ভাষী হিসেবে আমার গর্ব হয়, আমার মনোবল বাড়ে, আমি নৈতিক শক্তি অর্জন করতে পারি, আমি নতুনভাবে কাজে উদ্বুদ্ধ হতে পারি।

প্রামাণ্যচিত্র এবং সাক্ষাৎকার তা করতে পারে।

‘ওয়ান টু ওয়ান’ সাক্ষাৎকারও সে-রকম একটি অনুষ্ঠান হতে পারে। বিবিসির ‘হার্ড টক’-এর মতো।

বাংলাভাষী সফল ব্যক্তি, প্রতিভাবান ব্যক্তি, মৌলিক চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ ব্যক্তি, সৃজনশীল ব্যক্তিদের অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকার একটি আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান হতে পারে।

এই অঞ্চলের বহু মানুষ বিদেশে বসবাস করেন। শুধু বসবাস করেন না, স্থায়ীভাবে বিদেশেই থাকেন। তাঁদের অনেকে বিদেশের তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে বড় বড় সাফল্য দেখাতে সমর্থ হয়েছেন। তাঁদের প্রতিভা, বিশেষজ্ঞতা, সাংগঠনিক ক্ষমতা, কর্মোদ্যোগ, সাফল্য সবই বাংলাভাষী টিভি-দর্শকের জন্যে এক বিরাট অনুপ্রেরণা হতে পারে।

তাঁদের কথা আমরা জানি না বললেই চলে। জানলেও বিস্তারিত জানি না। তাঁদের সাক্ষাৎকার, তাঁদের কাজের পরিচয়, দেশীয় নানা বিষয়ে তাঁদের মতামত টিভি দর্শকদের জন্যে বড় আকর্ষণ হতে পারে। তাঁদের নিয়ে ‘প্রবাসী’ নামে একটি চমৎকার অনুষ্ঠান করার সুযোগ রয়েছে।

প্রবাসীদের অনেকেই আমাদের আপনজন। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী আপনজনদের সঙ্গেও একটি যোগসূত্র গড়ে উঠতে পারে। এ-ধরনের অনুষ্ঠানে স্পন্সর পাওয়া খুব কঠিন কাজ হবে বলে মনে হয় না।

এই নিবন্ধে যেসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তা রূপরেখা মাত্র। যাঁরা অনুষ্ঠান-নির্মাতা, তাঁরা এটুকু আইডিয়া থেকেই অনুষ্ঠানটি ভিজ্যুয়ালাইজ করতে পারবেন বলে আশা করি। যদি আমার স্বপ্ন টিভি চ্যানেল-পরিচালক ও অনুষ্ঠান-নির্মাতাদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারি তাহলে দুই দেশের আগ্রহী নির্মাতাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। বিজ্ঞাপন-এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে আলোচনা করা যেতে পারে। আমার এই ক্ষুদ্র নিবন্ধকে আলাপ-আলোচনার ‘টকিং পয়েন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। আমি আশা করি, আলোচ্য বিষয়ে আরো গঠনমূলক, সৃজনশীল ও রিয়েলিস্টিক প্রস্তাব অন্যদের কাছ থেকে আমরা পাবো। সকলের বক্তব্য ও প্রস্তাব থেকে আমরা একটি কর্মপরিকল্পনা নিশ্চয় তৈরি করতে পারব। এই রচনা বাংলা স্যাটেলাইট টিভির সীমাহীন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবার ব্যাপারে আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করলে খুশি হবো। আশা করি, বিশ্বায়নের এই সময়ে এই সামান্য দায়িত্বপালনে আমরা পিছপা

হবো না। পুরো বাংলাভাষী দর্শকসমাজ

তরল বিনোদনের স্রোতে ভেসে যাবার আগে তাদের জন্যে কিছু করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।