অমিয়কুমার দাশগুপ্ত
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সৌজন্যে কালি ও কলমের সেপ্টেম্বর ২০০৪ (আশ্বিন ১৪১১) সংখ্যাটি আমার হাতে পৌঁছেছে। পত্রিকার রচনা-ঐশ্বর্য ও অঙ্গসৌষ্ঠবে আপ্লুত বোধ করছি। কালি ও কলম চিরজীবী হোক।
সংখ্যাটিতে অন্তর্ভুক্ত সনৎকুমার সাহাকৃত অমিয়কুমার দাশগুপ্ত : শতবার্ষিকী শ্রদ্ধার্ঘ্য গ্রন্থটির সহৃদয় সুদীর্ঘ আলোচনাটির জন্য আমি বিশেষ কৃতজ্ঞ। আলোচক কর্তৃক উত্থাপিত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জোগানো উক্ত গ্রন্থের প্রকাশক হিসেবে আমার কর্তব্য। অধ্যাপক দাশগুপ্তের শতবার্ষিকী উদ্যাপন-উপলক্ষে ২০০৩ সালের ১৬ জুলাই কলকাতায় একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, সেই সূত্রেই ওই প্রবন্ধগুচ্ছের প্রকাশ। আমরা ভেবেছিলাম অধ্যাপক দাশগুপ্তের অনুরাগীবৃন্দের বৃত্তের বাইরে বইটি নিয়ে তেমন কেউ আগ্রহ দেখাবেন না। তাই বিনিময়মূল্য কিংবা বিক্রয়কেন্দ্রের কোনো উল্লেখ নেই। সনৎকুমার সাহার মতো আরো কয়েকজনের অনুযোগে-অনুরোধে দে’জ পাবলিশিং, ১৩ বঙ্কিম চাটুয্যে স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০৭৩ থেকে গ্রন্থটি এখন সংগ্রহ করা সম্ভব। বিক্রয়মূল্য ভারতীয় মুদ্রায় পঞ্চাশ টাকা।
কালি ও কলম বেঁচে-বর্তে থাক।
কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপনান্তে
অশোক মিত্র
কলকাতা ৭০০০২৭
প্রচ্ছদের তৃপ্তিকর বৈচিত্র্য
আমাদের বর্তমান সাহিত্যাঙ্গনে শিল্প-সংস্কৃতি চেতনাবোধসম্পন্ন ম্যাগাজিন বা পত্র-পত্রিকার অপ্রতুলতা খুব-একটা নেই। এটা খুবই আশার কথা। আরো ভালো লাগে যখন দেখি এক-একটা সাহিত্য-পত্রিকা বা পত্রিকা সাহিত্যপ্রেমীদের সামনে নিজেকে উন্মোচন করে অনেকটাই তার নিজস্ব ছাঁচে বা কিছুটা বৈচিত্র্য নিয়ে। সাহিত্যপ্রেমীদের প্রেম-পিপাসা মেটানোর জন্যে নেপথ্যে থেকে যিনি বা যাঁরা নিরলস ভাবনা-চিন্তা-কসরতের মাধ্যমে একটি সাহিত্য-পত্রিকা দাঁড় করান তাঁদেরকে শুধু অভিনন্দন জানালে ব্যাপারটি অতি নগণ্য হয়ে যায়। তবু অভিনন্দন!
বেশ কমাস হলো আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে উদিত হয়েছে তেমনি এক জ্যোতিষ্ক, সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা কালি ও কলম। ইতোমধ্যেই তাকে পাঠক-পিপাসুদের মনের ভেতর গেঁথে দিতে পেরেছেন পত্রিকাটির নেপথ্যকার। পত্রিকাটির একটি বৈশিষ্ট্য (আর সব বাদে) শুরু থেকেই চোখে লাগার মতো, সেটি হচ্ছে ‘প্রচ্ছদ-পরিচিতি। এই অংশটি প্রতি সংখ্যাতেই থাকে। আর এখানেই বর্ণনা দেওয়া থাকে প্রতি সংখ্যার প্রচ্ছদ সম্পর্কে আদ্যোপান্ত! প্রচ্ছদ-চিত্রকর্মটির শিল্পী সম্পর্কে এখান থেকেই আমরা খুব অল্পকথায় হলেও স্থির ও স্বচ্ছ একটি ধারণা নিতে পারি। কখন, কেন, কীভাবে, কী উদ্দেশ্যে শিল্পী চিত্রকর্মটি সৃষ্টি করেছেন, তা আমরা এ-অংশের বক্তব্যের মাধ্যমে অনুধাবন করতে পারি। তার ফলে প্রচ্ছদটা যথেষ্ট সহজ হয়ে ওঠে নিতান্ত শিশু-কলাপ্রেমীদের কাছেও (‘শিশু’ বলতে এখানে তাকেই বুঝিয়েছি যিনি এইমাত্র নিজের ভেতর অনুভব করছেন শিল্পের প্রতি দুর্বলতা)। এতে করে আমরা সকলেই প্রতিটি প্রচ্ছদের খুব কাছাকাছি যেতে পারি, যা শুধু দেখাই নয় Ñ আরো বেশি কিছু তৃপ্তির প্রাপ্তি!
সচরাচর সাহিত্য-পত্রিকাগুলোতে ‘প্রচ্ছদ-পরিচিতি’র এই অংশটুকু দেখা যায় না (‘প্রচ্ছদ-পরিচিতি’ এর আগে আর কোনো ম্যাগাজিনে ব্যবহার করা হয়েছে কিনা, তা আমার অজানা)। কালি ও কলমের নেপথ্যকারদের ধন্যবাদ এরকম বৈচিত্র্যময়, সৃষ্টিশীল একটি ভাবনাকে পাঠক-সম্মুখে তুলে ধরার জন্য। কালি ও কলমের ভবিষ্যৎ পথচলা হোক আরো ক্ষুরধার, কালি ও কলম স্থায়ী হোক সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির শুদ্ধ আদর্শ নিয়ে।
মালিহা জেরিন
ধানমন্ডি, ঢাকা
সমরেশ মজুমদারকে ধন্যবাদ
হাঁটি হাঁটি পা পা করতে করতে হয়ে গেল অনেক। তবু জৌলুস রয়ে গেছে সেই আগের মতোই। উপরন্তু নতুন সাহিত্যভাবনায় ও নতুনত্বের আলোকচ্ছটায় নতুন নতুন বিষয় নিয়ে হাজির হচ্ছে কালি ও কলম। অসাধারণ সব প্রবন্ধ, গল্প, চিত্রকলা-আলোচনা, বইপত্র, বিজ্ঞান এবং অন্যান্য বিষয়ের মাঝেও আমার দৃষ্টি প্রথমেই পড়ে পশ্চিমবাংলার স্বনামধন্য লেখক সমরেশ মজুমদারের ‘নিবেদন’ কলামটিতে। ধন্যবাদ সমরেশকে, সাথে সাথে কালি ও কলমকে।
একজন সাহিত্যিক বা কবি বা শিল্পী তাঁদের কালি ও রঙের আঁচড়ে অতি সূক্ষ্ম সত্যকে সুন্দর ও সুনির্মলভাবে মেলে ধরতে পারেন। তাঁরা সত্যসন্ধানী দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিস্পৃহ একটি বিষয়কে করতে পারেন আলোকোজ্জ্বল। এরই একটি ছোট দৃষ্টান্ত এ-পত্রিকার সেপ্টেম্বর সংখ্যার সমরেশ মজুমদারের ‘নিবেদন’ কলামটি। সত্যাশ্রয়ী এ-লেখক বিনয়াবনত চিত্তে বাঙালির প্রাণের ভাষা বাংলা ভাষাকে নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা লিখেছেন। বাক্য হিসেবে নিতান্ত ক্ষুদ্র হলেও লেখাটিতে রয়েছে বাংলাদেশের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা, বিনয়, শ্রদ্ধা এবং বাংলা ভাষার প্রতি কিছু শ্রদ্ধার কথা।
বাংলা ভাষার ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবের। এ-ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্যে হয়েছে রক্তক্ষয়ী এক করুণ আন্দোলন, যা পৃথিবীতে বিরল। একুশের সেই চিরস্মরণীয় ঘটনাকে চিরঅম্লান করতেই যেন ‘বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস’ হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি। এত গৌরবের মাঝেও একটি দুঃখজনক বিষয় হলো, এ-ভাষা নিয়ে দুই বাংলার রয়েছে সামান্য হলেও কিছু পার্থক্য, বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য। এ-ব্যতিক্রমটি বেশি দৃষ্টিগোচর হয় বানানের ক্ষেত্রে। বানানরীতিতে দুই বাংলারই রয়েছে আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য। এসব বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তাই বলে কোনোরকম জড়তা বা বাহাসে না গিয়ে দুপক্ষেরই উচিত একটি যৌথ অভিধান প্রণয়ন করা, যার ফলে লাভবান হবে বাংলা, সঙ্গে সঙ্গে ভাষাচর্চাকারী লেখক, সাহিত্যিকসহ আমাদের মতো সাধারণ সাহিত্যপ্রেমী। বানানের এ-মতদ্বৈধ আমাদের দ্বিধায় ফেলে দেয়, মাঝে মাঝে মনে হয় এটি ভুল, মাঝে মাঝে মনে হয় ওটি। এ-ধরনের পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ কি আবশ্যক নয়?
বাংলা ভাষা বাংলাদেশের – এ-দাবি অবান্তর। আবার পশ্চিমবঙ্গের নয় কেন? Ñ বাংলা ভাষা না শুধু এ-পারের না শুধু ও-পারের। বাংলা ভাষা সবার প্রাণের ভাষা Ñ বাংলা ভাষা বাঙালির। বাংলাদেশীরা এ-ভাষার জন্যে রক্ত দিয়েছেন, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাই বলে কি এ-ভাষা একান্ত এদেশের ভাষা? বাংলা ভাষার মূল দাবিদার বাঙালি Ñ হোক তা এ-পারের, হোক ও-পারের। অত্যন্ত বিনয়াবনত হয়ে সমরেশ মজুমদার বাংলাদেশের পনেরো কোটি মানুষের ভাষা বাংলাকে বাংলাদেশের ভাষা বলে যে-সম্মান দেখিয়েছেন, প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশকে দেখিয়েছেন, সেজন্যে ধন্যবাদ জানালেও তাঁকে ছোটো করা হয়। তবু তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর এ-লেখাটি পড়ে একজন বাংলাভাষী ও বাংলাদেশী হিসেবে নিজেকে গর্বিত মনে করছি।
আশা করছি দুই বাংলার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও ভাষাবিজ্ঞানীরা সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে এ-ভাষাকে কেন্দ্র করে চলমান এ-ক্ষুদ্র জড়তা কাটিয়ে নেবেন। এতে উপকৃত হবে বাঙালি, সঠিক পথে চলবে বাংলা। রবীন্দ্রনাথ- নজরুলের মুখের ভাষা প্রতিষ্ঠিত হোক সুচারুরূপে। বাঙালির মুখে মুখে ধ্বনিত হোক – ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলাভাষা।’
সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন বিপ্লব
বৃত্তপট নাট্য সংগঠন, ঢাকা
মধুসূদনকে জানতে চাই
নতুন চেতনার আলোকবর্তিকা নিয়ে এ-দেশের সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশ করেই দিনে দিনে কালি ও কলম দেশের একমাত্র নির্ভেজাল সাহিত্যপত্রিকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সাহিত্যরস-আস্বাদনে ও সাহিত্য-গবেষণায় এখন অবারিত শরণাপন্ন হতে হয় কালি ও কলমের। এ-নিয়ে স্তুতি প্রকাশ না করাই শ্রেয়।
কালি ও কলমের সপ্তম সংখ্যায় মনজুরে মওলার কাব্যনাট্য ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ’ পড়ে রীতিমতো বিস্মিত ও পুলকিত হয়েছি। পুলকিত হওয়াই স্বাভাবিক। দেশের সাহিত্যপত্রিকাগুলোতে এই ধরনের ভাবগম্ভীর অসাধারণ লেখা প্রকাশিত হয় না বললেই চলে। ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে এ-রকম একটি কাব্যনাট্য প্রকাশ করায় লেখক মনজুরে মওলার সাথে ধন্যবাদ কালি ও কলমের সম্পাদকমণ্ডলীকে। ভবিষ্যতে আমরা এ-কাব্যনাট্যটির মতো প্রেরণাদায়ী লেখা আরো বেশি আশা করছি।
কালি ও কলমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় বিষয় হলো প্রবন্ধ। একটি পত্রিকার মান বোঝা যায় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ ও অন্যান্য বিষয় পড়ে। দুই বাংলার সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক ও প্রবন্ধকারদের সুনিপুণ কলমের আঁচড়ে প্রবন্ধগুলো হয়ে ওঠে সুপাঠ্য ও জ্ঞানান্বেষণের অন্যতম মাধ্যম। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীন, ওয়ালীউল্লাহ্, মীর মশাররফ হোসেনসহ দেশ-বিদেশের নানা মনীষী ও জ্ঞান-তপস্বীদের নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলো পাঠ করে তাঁদের সম্পর্কে নতুনভাবে জানা যায়। তাঁদের অনেক অজানা কথা ও সাহিত্যকৃতি উঠে আসে প্রবন্ধগুলোতে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যতটুকু দেখেছি ও পড়েছি, বাংলা ভাষার অন্যতম সেরা কবি ও নাট্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্তকে নিয়ে কোনো প্রবন্ধ লেখা হয়নি। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচিত-সমালোচিত হলেও তাঁর সাহিত্য-ভাবনা, সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা না করে পারা যায় না। চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেটের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন ধারা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি। নির্জন-নির্জনতায় অবগাহন, নৈঃশব্দ্যের সংস্পর্শে লেখা মেঘনাদবধ কাব্য তাঁর অমর সৃষ্টি। বাংলাদেশের তথা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এ-কবি সচরাচর অনালোচিতই থেকে যান। যতটুকু আলোচনা হয় তা সীমাবদ্ধ থাকে নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতরেই। বেশ কটি সংখ্যা কালি ও কলম পড়ে আশা করা যায় তাঁকে জানা যাবে বিস্তারিতভাবে। শেক্সপিয়র, এলিয়ট, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলদের নিয়ে যেসব প্রবন্ধকার, লেখক, বুদ্ধিজীবী প্রবন্ধ লিখে তাঁদের আরো ভালোভাবে জানার সুযোগ করে দিচ্ছেন, ওঁদের কাছে অনুরোধ, মাইকেল মধুসূদন দত্তকে কলমের সুতীক্ষè ছোঁয়ায় উজ্জীবিত করে তাঁর কর্মময় জীবন ও সৃষ্টি সম্পর্কে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিন পাঠক-মহলে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে থাকা মাইকেল মধুসূদনকে নতুনভাবে তুলে ধরার প্রত্যাশা কালি ও কলমের কাছে করাই যায়।
দুই বাংলার জনপ্রিয় লেখকদের লেখায় উদ্ভাসিত হোক কালি ও কলম। গল্প, উপন্যাস, চিত্রকলা, ব্যক্তিত্ব, বইপত্র-আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে আরো বেশি করে ছাপা হোক প্রবন্ধ। কারণ প্রবন্ধই একটি সাহিত্যপত্রিকার মাননির্ণয়ে প্রধান ভূমিকা পালন করে। প্রবন্ধ-পাঠেই জানা যায় সাহিত্য এবং সাহিত্যিকদের কৃতি ও ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে। পথচলা মসৃণ, চিরঅম্লান ও দীর্ঘায়ু হোক কালি ও কলমের – এটিই প্রত্যাশা।
পারুল ইসলাম চৌমুহনী, নোয়াখালি

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.