প্যারিস থেকে : শতাব্দীর চোখ অঁরি কার্তিয়ে ব্রেসঁ

চূড়ান্ত মুহূর্তে ঠিক জিনিসটির ওপর ক্যামেরা ধরতে পারাটাই আসল কাজ, আর ওই বিশেষ ক্ষণ থেকেই ভূমিষ্ঠ হতে পারে কালজয়ী ছবি – এই বিশ্বাস লালন করতেন তিনি। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রীদের একজন অঁরি কার্তিয়ে ব্রেসঁ। সংস্কৃতি ও ঐশ্বর্যের বনেদি পরিবেশে জন্মেছিলেন ১৯০৮ সালে ফ্রান্সে সন্তেল-পরিবারে। দাদা, বাবা, চাচা সবাই কম-বেশি চিত্রচর্চা করতেন। তবে বাবার ছোটভাই লুই কার্তিয়ে ছিলেন বিখ্যাত, ‘প্রি দ্য রোম’ (১৯১০) জয়ী শিল্পী।
১৯১৩ সালে বড়দিনের রাতে শিশু ব্রেসঁ জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারটি পেয়েছিলেন। চিত্রশিল্পী চাচা ভাইপোকে অনুমতি দিলেন তাঁর স্টুডিওতে প্রবেশের। পাঁচ বছরের শিশুর সামনে উন্মোচিত হলো রঙিন কিংখাবে মোড়া সৃজনের ভুবন। চোখে গুপ্তধন-আবিষ্কারের বিস্ময়। ঘটনার আশি বছর পরও রং, তুলির গন্ধে তাঁর দ্বিতীয় জন্মলাভের স্মৃতিতে আলোড়িত হয়েছেন কীর্তিমান চিত্রী ব্রেসঁ। চাচার স্টুডিও দেখার প্রথম পরিচিতিটি নিয়তির মতো হয়েছিল তাঁর জীবনে; মলের গোপন সুড়ঙ্গে জমা শিল্পসৃজনের রাগ-রাগিণী। ফলে শৈল্পিক জীবন শুরু করেছিলেন চিত্রশিল্পী হিসেবেই। সাদা-কালো আলোকচিত্রের ভুবনে মোহাবিষ্ট হয়েছেন পরে।
শৈশবে মুকুলিত শিল্পে অনুরাগ, মুগ্ধতা ছিল জীবনভর। কৈশোরের অনপনেয় স্মৃতিচারণ, “চিত্রকলা ছিল আমার আবেশ, বাবার ভাই যিনি বড়দিনের রাতে স্টুডিও দেখিয়েছিলেন আমার সেই ‘মিথিকাল ফাদার’… আমি চিত্রকলার ছায়ায় বাস করেছি; আমি নিশ্বাসে টেনেছি ক্যানভাসের গন্ধ।”
পরে ১২ বছরের নওল কিশোরের চিত্রচর্চায় অভিষেক হয়েছিল চাচার দেখা তেলরং দিয়েই। তিনি মারা যান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। মনের শিষ্য এবং প্রুস্তের বন্ধু জ্যাক এমিল ব্লশ ১৬ বছর বয়সের ব্রেসঁকে আমন্ত্রণ জানান তাঁর স্টুডিওতে গিয়ে ছবি আঁকার। লিসেতে পড়ার সময়েই ক্লাসের বইয়ের চাইতে আনন্দ পেতেন দস্তয়ভস্কি, শোপেনহার, প্রুস্ত, মালার্মে, জয়েস, মার্কস পড়ায়। আর বয়ঃসন্ধিতে লক্ষ্যস্থির তখন চিত্রকর হবার। ফলে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় ব্রেসঁর ধ্যানের দেবতা র্যাঁবো। মূলত দাদা, সুররিয়ালিজম, জয়েস প্রায় অঁভ-গার্দদের সবাই – অ্যাপোলিন্যার থেকে জঁলুক গদার – শুরুটা র্যাঁবোকে দিয়েই। দান্তের ডিভাইন কমেডিতে রদ্যাঁ-সৃষ্টির ব্যাকুলতম প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিলেন আর ব্রেসঁ প্রেরণা খুঁটে নিয়েছিলেন র্যাঁবো থেকে। সেই ষোলো বছরেই পরিচয় হয়েছিল ম্যাক্স জ্যাকব এবং রেনে ক্রেভাল, আর উনিশে অঁদ্রে ব্রেতঁ, ম্যাক্স অ্যারনস্ত, এলি ফোরের সঙ্গে। লিসের গণ্ডিবাঁধা জীবন ছেড়ে উনিশ বছর বয়সে তিনি ছবি আঁকা শিখতে যান শিল্পী অঁদ্রে লোৎয়ের কাছে। লোৎ ছিলেন কিউবিস্ট ঘরানার। ছাত্রকে শিল্পগুরুদের চিত্রকর্ম দেখানো এবং অধ্যয়নের জন্য ল্যুভ্রসহ অন্যান্য গ্যালারিতে নিয়ে যেতেন সমসাময়িক শিল্পকলা সম্পর্কে ধারণা দিতে।
আধুনিক শিল্পকলা সম্পর্কে ব্রেসঁর আকর্ষণের পেছনে ছিল রেঁনেসার চিত্রকর্মসমূহ – পাওলো উচ্চেলো, পিয়েরো দেল্লা, ফ্র্যান্সেসকা, মাসাচ্চিও এবং জানভান এইকের প্রতি সশ্রদ্ধ মুগ্ধতা। শিক্ষক লোৎ সম্পর্কে বহু পরে বলেছেন, ‘তিনি আমাকে পড়তে এবং লিখতে শিখিয়েছিলেন। তার ভূ-চিত্র এবং পিগারের উপর বইগুলো ছিল গবেষণাধর্মী… তাঁর মৃত্যুর কদিন আগে আমার দেখা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে ১৯৬২তে। আমার আলোকচিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন – চিত্রশিল্পী হিসেবে তোমার চর্চা থেকেই সবকিছু এসেছে।
অঁদ্রে লোৎয়ের কাছে কাজ শিখবার এক পর্যায়ে মনে হতে থাকে তাঁর ছবি প্রায় শিক্ষকের কাজের অনুকরণ হয়ে পড়ছে। কিন্তু লোৎয়ের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা চিত্রকলায় না হলেও পরবর্তীকালে ফটোগ্রাফির কম্পোজিশন ও ফর্মের সমস্যা-সমাধানে সাহায্য করেছে। ইতোমধ্যেই ইউরোপের সর্বত্র ফটোগ্রাফিক রিয়েলিজম বা আলোকচিত্রের বাস্তবতার স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উদ্দেশ্য, কীভাবে আলোকচিত্রের উন্নতি করা যায় – এ-সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা, মতবাদ। তুমুল আলোচনা, হল্লা চলছে – Crush tradition! Photograph things as they are! বলাই বাহুল্য এই বিদ্রোহের কেন্দ্রে ছিল সুররিয়ালিস্ট আন্দোলনের ঝাপটা, সময়টা ১৯২৪।
১৯২৫, তখনো ব্রেসঁ কাজ করছেন লোৎয়ের স্টুডিওতে। এর মাঝেই যাওয়া-আসা বিখ্যাত কাফে লা প্লাস ব্লশের আড্ডায়; সঙ্গী প্রিয়বন্ধু তরুণ কবি রনে ক্রেভাল, পরে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। পরাবাস্তবতাবাদীদের সান্নিধ্যে, প্রতর্কে তরুণ ব্রেসঁর চেতনার চাঁদ নড়ে উঠেছে। তর্কে যেতেন না, শুনতেন এবং তাঁদের ধারণা আঁজলা ভরে মননে ছড়িয়ে দিয়েছেন, যা তাঁর প্রথম জীবনের শিল্পসৃষ্টিতে উর্বরতা দিয়েছে। ‘পরাবাস্তব চিত্রকর্ম নয়, তাঁর ভাবনায় তরঙ্গ তুলেছিল অঁদ্রে ব্রেতঁর ধারণা – স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি ও স্বজ্ঞার ভূমিকা এবং সর্বোপরি দ্রোহের মনোভাব… শিল্পে এবং জীবনেও।’
এই বিশেষ সময়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উত্তাল পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন ব্রেসঁ। স্বর্গ খোঁজার অনুভবে রং ও রেখায় দিওয়ানা হয়েছিলেন। কিন্তু চিত্রকলার মানচিত্রে প্রার্থিত স্বপ্ন-কল্পনা-প্রকাশের সাঁকোটি ধরতে পারছিলেন না। পরীক্ষা-নিরীক্ষাশেষে অতৃপ্তির বৃত্ত তাঁকে ঘিরে ফেলেছে। হতাশায়, বিমর্ষতার খোলসে ডুবে প্রাথমিক পর্বের অনেক কাজই তিনি নষ্ট করে ফেলেন। কিছু কাজ রক্ষা পেলেও তা শিল্পী ব্রেসঁর শৈল্পিক ভাষাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে না।
১৯৩০ সালে জীবনে বড় বাঁক এলো ভিন্নধারায়। লোৎয়ের স্টুডিওর প্রচল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছিল তাঁর ব্যাকুলসত্তা। ‘আমি আমার মতো হতে চাই’- বোধে আকুল হয় সৃজনস্পৃহা। পাড়ি জমান আফ্রিকায়, জীবনের গভীর মন্থনে ঢুকে ক্রমশ তৈরি করেছেন নিজস্ব-ভাবনার অখণ্ড পরিমণ্ডল। তাই পরে লিখেছিলেন, ‘ছবি আঁকা এবং পৃথিবীটাকে বদলে দেওয়া আমার জীবনের সবকিছুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
আফ্রিকাতে জীবনধারণ করেছেন জীবজন্তু শিকার করে এবং তা স্থানীয় গ্রামবাসীর কাছে বিক্রি করে। ব্রেসঁর সময় কেটেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভার আদান-প্রদানের তরজমায় এবং নিরূপণের ভাবনায়। স্বচক্ষে দেখা ফরাসি ঔপনিবেশিক দেশের বঞ্চনার, শোষণের ইতিহাস তাঁর স্নায়ুকে দলিত করে শৈল্পিক চেতনার মর্মমূলে গিয়ে বিঁধেছে। মানুষের তৈরি পৃথিবীর এই বিপর্যয় ও বিকলতার চিত্র তুলির চাইতে আরো দ্রুত আঁচড়ে মূর্ত করার বাসনায় তাঁর আয়ুধ হয় ক্যামেরা। সাময়িকভাবে নিরীক্ষামূলক কিছু ছবি তুলেছিলেন, কিন্তু সে-সময়ের মাত্র সাতটি আলোকচিত্র রক্ষা পেয়েছে। ছবি আঁকা ও ছবি তোলা – সৃষ্টি ও আবিষ্কারে নিরন্তর অন্বেষু তরুণকে ফ্রান্সে ফিরে আসতে হয় ‘ব্ল্যাক ওয়াটার’ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে।
ফিরে এসে এবার যোগাযোগটা আরো নিবিড় হলো সুররিয়ালিস্টদের সঙ্গে। তাঁদের তত্ত্ব কপচানো, ধুন্ধুমার আড্ডার মাঝেই ব্রেসঁর তৃষ্ণার্ত মন ছটফট করে বিষয়ের খোঁজে, সৃষ্টির ক্ষুধায়। অবশেষে খুঁজে পেলেন সৃষ্টির দুর্লভ আকর, নাবিকের মতো কাঙ্ক্ষিত দ্রাঘিমা হাঙ্গেরির আলোকচিত্রী মার্টিন মুস্কাসির ‘লেক অংগানিকায় তিনটি বালক’ (Three boys at Lake Tanganyika) ছবিটি দেখে। ব্রেসঁর আত্মকথন — একমাত্র বিষয় যা আমাকে সম্পূর্ণরূপে বিস্ময়ে বিহ্বল করেছিল এবং আমাকে আলোকচিত্রের জগতে এনেছিল তা হলো মুঙ্কাসির কাজ। যখন আমি মুঙ্কাসির শিল্পকর্ম দেখেছিলাম – ‘তিনটি কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর দৌড়াচ্ছে এমন তরঙ্গ তুলে, আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না এমন বিষয় ক্যামেরায় ধরা সম্ভব। আমি বলেছিলাম, ড্যাম ইট; আমি ক্যামেরা নিয়ে রাস্তায় চলে গিয়েছিলাম।’
বুকের মধ্যে হৃদয় ভেঙেছে, অঙ্কুরিত হচ্ছে বীজ; প্রার্থিত স্বপ্নসৃষ্টির মোহনায় দাঁড়িয়ে আবার অনুভব করেছেন শিল্পেই তাঁর প্রবল প্রেম ও সমঝোতা।
—
ব্রেসঁ ব্যবহার করতেন ছোট্ট, হালকা ৩৫ মিমি লাইকা ক্যামেরা, ১৯৩২ সাল থেকে তাঁর সবসময়ের সঙ্গী ছিল এই ক্যামেরা, ব্রেসঁর কাছে লাইকা ছিল। তাঁর ‘চোখের প্রসারণ’ (Extention of eye) আর এই ক্যামেরা নিয়ে তিনি মানুষ, নগর, সভ্যতা, মহাদেশীয় মাটির গন্ধে সিক্ত পৃথিবীর অবয়বকে মূর্ত করছেন। মাধ্যম বদলালেও দর্শন বদলাননি পদাতিক। পৃথিবীর উঠানে, জীবনযাপনের বিশাল অরণ্যে ছুটে বেড়িয়েছেন প্রার্থিত জিনিসটি বা মোক্ষম মুহূর্তকে বন্দি করতে। বলতেন, ‘আমার কাছে ক্যামেরা হলো একটি স্কেচ-বই, স্বতঃলব্ধ জ্ঞান এবং স্বতঃস্ফূর্ততার যন্ত্র… প্রশ্ন এবং সিদ্ধান্ত যুগপৎ । জীবনে মনে রাখার মতো ঘটনা কিংবা অভিব্যক্তির যথার্থ ভাষা দিতে প্রয়োজন মগ্নতা, নিষ্ঠা, সংবেদনশীলতা এবং জ্যামিতির জ্ঞান।’
ব্রেসঁর এই ভাবনাকে কোনো ঋষিবাণী ভাববার কারণ নেই। নিজের ভেতর বিপ্লব বা পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে বলেই কর্মে সেই দর্শন ছায়া
ফেলেছে। জীবনের স্বপ্ন মূর্ত হয় প্রগাঢ় বিশ্বাসের জমিতে, স্বপ্ন বীজাকারেই মূর্ত হয় কাজে। একাগ্র ধ্যানে একটা ইমেজকে ধরে জীবনে সত্যের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সেইসব জীবন্ত সত্যপ্রকাশে অনুপম। ‘খুবই ক্ষুদ্র একটি জিনিস হতে পারে মহৎ বিষয়’— এই দর্শন থেকেই তিনি বলতেন, ‘শুধুই আলোকচিত্র আমাকে আকর্ষণ করে না। আমি ধারণ করতে চাই শুধুমাত্র যথাযথ বাস্তবকে ।’
তাঁর বুকের উপত্যকায় ছিল দু-দুটি প্রস্রবণ আলোকচিত্র ও চিত্রকলা। আর চিত্রকরের দৃষ্টি থেকেই তিনি অন্তর্দৃষ্টি খুঁজে পেয়েছিলেন ছবিতে। নগরে বাউল কখনো বা আরণ্যক ঋষির মতো মগ্নতায় বিপর্যস্ত সময়, তৃষ্ণাহরণকারী মুহূর্ত, মানুষের মুখের নানা আঁচের ভাব অগণিত ছবি ঝলসে উঠেছে ব্রেসঁর ক্যামেরায়। তাঁর তোলা প্রতিটি ছবিই একেকটি যুগ বা সময়ের আলেখ্য। কিন্তু ব্রেসঁর প্রতিটি ছবির শরীরে যে-গল্প জড়িয়ে থাকে – তা হয়ে উঠতে পেরেছে কালের প্রতিমা, ইতিহাসের সত্য। আর সত্য বলেই সে-গল্প চিরন্তন। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৫ পর্যন্ত তিনি পূর্ব ইউরোপ, স্পেন এবং মেক্সিকোতে ভ্রমণ করেন। থাকতেন সমাজের সবচাইতে বঞ্চিতদের মাঝে । লেখক অঁদ্রে পিয়ের দ্য মন্দি আর্গ ছিলেন সঙ্গে। তাঁর স্মৃতিতে তরুণ ব্রেস . Through a spontaneous activity, which, rather like a game at first, forced itself on the young painter as poetry may force itself on other young people…’। একটি রহস্য-উন্মোচনের ব্যঞ্জনার মধ্যে নিহিত থাকে ছবির চিত্রাতীত সৌন্দর্য, থাকে কল্পনার অভিঘাত; যেখানে ট্র্যাজেডি মিলে যাবে কমেডিতে…। হফমান, অ্যালান পো, বালজাক, কাফকা এবং মরিস ব্লশ কিংবা চ্যাপলিন এবং কিটনের চলচ্চিত্র, যা নিশ্চিতভাবে ব্রেসঁর ভাবনার কাঙ্ক্ষিত পথে উদিত সূর্যের মতো আলো ফেলেছে।

ব্রেসঁর এ-পর্বের কাজে ভাষা স্বচ্ছ, পরিস্ফুট দৃশ্য তখনো কিন্তু বিখ্যাত পরাবাস্তব লেখকদের কাব্যিক ইমেজের ব্যাসার্ধের কাছাকাছি। পরাবাস্তববাদীরা রাস্তায় বা জীবনে যা কিছু আবিষ্কার করেছে তাকেই নিঃসৃত শ্বাসের মতো গ্রহণ করেছে এবং তাতে অন্য বিষয় যোগ করে বা পরিবেশের পরিবর্তন করে তাকে রূপান্তরিত করেছে। সাধারণ ছোটখাট তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনার স্থিরচিত্রও ব্রেসঁর হাতের ছোঁয়ায় হয়ে উঠেছে কাব্যিক, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রবাদপ্রতিম, কিংবদন্তি । ছোট্ট লাইকা ক্যামেরা হাতে তাঁর দৃষ্টি ছিল দূরগামী — বস্তুর বাইরের এবং ভেতরের অতলে ডুবে থাকা ভাবও স্ফূর্তি পেত তাতে। চলিষ্ণু জীবনবোধের কল্যাণে ইতিহাসের অবিস্মরণীয় সব ঘটনার ছবি তুলে, আলোকচিত্রকে একাই এক ভিন্ন মাত্রা দিতে পেরেছিলেন। নিজের জীবনে অসংখ্যবার খুঁজে পেয়েছিলেন তার ‘আমোম দেসেসিফ’ (Un moment decisif) বা মোক্ষম মুহূর্তটি। আর এই মোক্ষম মুহূর্তে, নির্দিষ্ট ক্ষণের হিসেব কষায় পারদর্শী ছিলেন বলেই হতে পেরেছিলেন বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রীদের একজন। শীলন ও ধ্যানের মৌলিকঋদ্ধ শিল্পের জন্ম দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন আলোকচিত্রের গুরুস্থানীয়দের একজন। সাহিত্যে যেমন হেমিংওয়ে, চিত্রকলায় পিকাসো, আলোকচিত্রে তেমনি ব্রেসঁ।
১৯৩৫ সালে প্রথম প্রদর্শনী করেন মেক্সিকোতে, পরে নিউইয়র্কের জুলিয়ান লেভির গ্যালারিতে। সাতাশ বছর বয়সেই পরিবর্তিত সময়কাল, প্রেক্ষাপট আর অভিজ্ঞতার সমীকরণে ব্রেসঁর বিশ্বাসের ভূখণ্ডে ছায়া ফেলে স্তালিনের কমিউনিস্ট পার্টি। নিউইয়র্কে তিনি থাকতেন কমপোজার নিকোলাস নবোকভের সঙ্গে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি সম্পর্কে সচেতন ব্রেসঁর উদ্বেগের কথা জানা যায় নিকোলাসের স্মৃতির সৌজন্যে – ‘আমরা দীর্ঘসময় ধরে কথা বলতাম, অধিকাংশই নৈতিকতা এবং রাজনীতি নিয়ে। আমার মনে হয় দুজনেই রেডিক্যাল ছিলাম। কিন্তু কার্তিয়ে ব্রেসঁর কাছে কমিউনিস্ট-আন্দোলন ছিল ইতিহাসের ধারক, মানবজাতির ভবিষ্যৎ বিশেষ করে সেই সময়গুলোতে, যখন হিটলার জার্মানির নিয়ন্ত্রক এবং যখন গৃহযুদ্ধ স্পেনে… সৌভাগ্যক্রমে অঁরি কার্তিয়ে ব্রেসঁ কখনোই যুক্তিহীন, অন্ধবিশ্বাসী বা নীতিবাগীশ ছিলেন না তাঁর বিশ্বাস অথবা শেখা সম্পর্কে।
নিউইয়র্কে তিনি কিছুদিন কাজও করেন পল স্ট্রান্ডের অধীনে ।
পৃথিবীর বাতাসে তখন ফ্যাসিজম-শকুনের ডানার ঝাপটা। প্রবল বিক্ষুদ্ধ, আলোড়িত সময়ে ব্রেসঁ প্যারিসে ফিরে এলেন ‘৩৬ সালে । জঁ রনোয়ার সহকারী হিসেবে কাজ করেন প্রচারধর্মী চলচ্চিত্র লা ভি এ আনু (La vie ebta’ nous) বা ফ্রান্সের জনগণে। ছবিটি তৈরি হয়েছিল লেফট পপুলার ফ্রন্ট সরকারের জন্য। ব্রেসঁ অবশ্য এই চলচ্চিত্রের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘এতে যুক্তিবলে মতবাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে’, আবার একই সঙ্গে বলেছেন যে, ‘এতে ফ্রন্ট পপুলারের জন্য বিশেষ সংবেদনশীলতাও প্রকাশ পেয়েছে।’ স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় হারবার্ট ক্লাইনের সঙ্গেও সহপরিচালকরূপে একটি অ্যান্টিফ্যাসিস্ট তথ্যচিত্র করেন রিপাবলিকান মেডিক্যাল সার্ভিসের পক্ষে। ব্রেসঁ নিজে তুলেছিলেন রাস্তায় খেলাধুলারত একদল শিশুকে। তাদের অসীম আনন্দময়, নিষ্পাপ ক্ষণটিকে বন্দি করেছিলেন চিত্রে। নিয়মের আগল ভাঙা এই অবাধ উচ্ছ্বাসই ছিল ব্রেসঁর কাছে মুক্তির প্রতীক । একই বছরে রনোয়ার ছবি আ পার্টি দ্য কম্পাইন বা দেশের একদিন চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয়ও করেন। দ্বিতীয় সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন ‘৩৯ সালে, রনোয়ার ছবি লা রেগল দ্য জো (La Rigle du Jeu) বা লেখার নিয়মাবলিতে। চলচ্চিত্রে অভিনয় এবং পরিচালনা-সূত্রে ব্রেসঁর অভিজ্ঞতা, ‘একজন চলচ্চিত্র-পরিচালক আমার কাছে একজন উপন্যাস লেখক, গল্প বলছেন, যা একটি চমকপ্রদ বিষয় ও পরিচালনা এবং একজন অভিনেতাকে আমি নির্দেশ দিতে পারছি… এটি আমার জগৎ নয়।’
করে
রাজনীতি-সচেতন ব্রেসঁ জীবনের এক পর্বে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে কাজ করেছেন । ১৯৩৭-৩৯ পর্যন্ত পার্টির সান্ধ্য দৈনিক ছো ছোয়ার (Ce Soir) আলোকচিত্রীর কাজ করেছেন। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন লুই আঁরাগ, প্রাক্তন পরাবাস্তব কবি ও লেখক । এই দিনগুলোতে অনেক শিল্পীই নিজেদের সৃষ্টিশীল কাজ ত্যাগ স্ট্যালিনের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে কাজ করেছিলেন। আঁরাগ ছিলেন অন্যতম। পত্রিকায় ব্রেসঁ ছাড়াও ছিলেন আলোকচিত্রী রবার্ট কাপা ও দাভিদ সিমুর। কর্মরত অন্যান্য আলোকচিত্রীর চেয়ে তাদের কাজের স্বাধীনতা ছিল তুলনায় বেশি। মূলত এ-স্তরে এসে ব্রেসঁর সৃষ্টির মানচিত্রের ভাষা বদলে গেল। তাঁর চিত্রের ফসল হলো গণমানুষ, সামাজিক চরিত্রসমূহ পূর্বের পরাবাস্তবতার প্রভাবমুক্ত, একেবারে ভিন্ন। যদিও প্রশ্ন থেকেই যায় যে, ওইসময়ে ব্রেসঁ প্রকৃত অর্থেই শিল্পীর স্বাধীনতা পেয়েছিলেন কিনা ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে তিনি ফরাসি সেনাবাহিনীর ফিল্‌ম ও ফটোগ্রাফিক ইউনিটে যোগ দেন। প্রো-ফ্যাসিস্ট ভিশি সরকারের সময় তিনি বন্দি হন অন্যদের সঙ্গে (প্রায় ১.৫ মিলিয়ন লোককে ধরা হয়েছিল)। তিনবছর যুদ্ধবন্দি থাকাকালে নাজিদের অধীনে তিনি শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য ছিলেন। ১৯৪৩ সালে তৃতীয়বারের চেষ্টায় বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। প্যারিসে ফিরে প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগদানের আগে তিনি কিছুদিন একটি নিরাপদ ফার্মে কাজ করেন; আন্ডারগ্রাউন্ড ফটোগ্রাফিক ইউনিটের সঙ্গে। তাঁদের দায়িত্ব ছিল দখলদার নাজিদের কর্মকাণ্ড এবং মুক্তিকামীদের আন্দোলন চিত্রায়িত করে রাখা, ইতিহাসের সত্যের সন্ধানে। এমন প্রবল অনিশ্চিত, অস্থির সময়েই তিনি বেশকিছু স্মরণীয় প্রতিকৃতি ধরে রাখেন ক্যামেরায় মাতিস, ব্রাস এবং অন্যদের। পরে বিশেষ উপলক্ষে তাঁকে ফার্মে যেতে হয়েছিল। আর গভীরভাবে মর্মাহত হন ঘটনার আকস্মিকতায়; যারা কালি লামা – ১০৬-
সবাই তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, মাত্র দুদিন আগে তাদেরকে বুসেনওয়াল্ড মৃত্যুশিবিরে ধরে নিয়ে
(Le
যাওয়া হয়েছে। ‘লো-রতুর’ Retour) বা ‘ফেরা’ নামে একটি তথ্যচিত্রে কাজ করেন ১৯৪৪-৪৫ সালে। ছবিটির প্রযোজনায় ছিল ‘ইউ এস অফিস অব ওয়ার ইনফরমেশন’। বিষয়বস্তু ছিল ফরাসি যুদ্ধবন্দি, দেশান্তরী, নির্বাসিতদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন । আদিদিগন্ত বিস্মৃত সারল্যে দৃশ্যগ্রহণ করেন ব্রেসঁ, যেমনভাবে করতেন তাঁর লাইকা ক্যামেরায়। একটি দৃশ্যে পরিবারগুলো একত্রে ভিড় করেছে, স্বামী, পুত্র, ভাই, প্রেমিক, স্বজনদের জন্য
রেলস্টেশনে। অপেক্ষারত স্পর্শাতুর সেসব মুখ, উদ্বেগ, আকুতি, তাদের অপ্রকাশিত, অবদমিত প্যাশন, ব্যাকুলতার অসাধারণ মানসিক রসায়ন ঝলসে উঠেছে ব্রেসঁর স্বশৈলীতে।
তাঁর কর্ম ও সৃষ্টির
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
শুরুতে তিনি ফরাসি সেনাবাহিনীর ফিল্ম ও ফটোগ্রাফিক ইউনিটে যোগ দেন। প্রো-ফ্যাসিস্ট ভিশি সরকারের সময় তিনি বন্দি হন অন্যদের সঙ্গে (প্রায় ১.৫ মিলিয়ন লোককে ধরা
হয়েছিল)। তিনবছর যুদ্ধবন্দি থাকাকালে
নাজিদের অধীনে তিনি শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য ছিলেন ।
উদ্দীপনার উৎস ছিল মানুষ, সমাজ, প্রকৃতি। যুদ্ধের পর কর্মক্ষেত্রে একটি সাধারণ ঘটনায় ব্রেসঁর মনে হয়েছিল তাঁর কাজে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। ছো ছোঁয়া পত্রিকার জন্যে একটি দৃশ্যগ্রহণকালে পুরো রিল ব্যবহার করায় তাঁকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। যুদ্ধোত্তর স্বাধীন দেশে ব্রেসঁ ভাবতেন শিল্পকে দিয়েই মহৎ পৃথিবী গড়ার, আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন, দ্বিধা-দ্বন্দ্বের খাদ পেরিয়ে স্থিত প্রজ্ঞ ব্রেসঁ! চেতনাস্রোতে আবার বুদ্বুদ তোলে ব্রেতর দর্শন, ‘সবকিছুর উপর জীবন’ ।
১৯৪৭ সালেই ছো ছোঁয়ার দাভিদ সিমুর, রবার্ট কাপার সঙ্গে যোগ দেন ম্যাগনাম কো-অপারেটিভে। ম্যাগনামের তাৎপর্য সম্পর্কে ব্রেসঁর বক্তব্য – “স্বশাসিত হতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার মানে আপনি কারো হয়ে ভূমিকা পালন করছেন না। আপনি স্থির করতে পারেন আপনি কী করতে চান…।’
স্বপরিবেশ ও অভিজ্ঞতা থেকে ‘ম্যাগনামে’র ভাষা ও বিষয়- উত্থাপনের অভিনবত্বে হয়ে উঠল মৌলিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে ‘পিপল লিভ এভরি হোয়্যার’, ‘ইয়থ অব দি ওয়ার্ল্ড’, ‘উইম্যান অব দি ওয়ার্ল্ড’ এবং ‘দি চাইল্ড জেনেরেশন’ উল্লেখযোগ্য। আলোকচিত্রকে মানবতার সেবায় কাজে লাগানো ছিল তাদের উদ্দেশ্য। যা ব্রেসঁর ‘লাইফ ফটোগ্রাফির’ ভাবানুষঙ্গে সিক্ত।
যুদ্ধোত্তর বিপর্যস্ত পৃথিবীতে বিচ্ছিন্ন, ভাবুক শেকড়হীন নানা চরিত্রের শিল্পীর ভিড়ে লতিয়ে উঠছে বিভিন্ন মূর্ত-বিমূর্ত ভাবনা। চিত্রকলা, চলচ্চিত্র এবং আলোকচিত্রে বিমূর্ত (abstract) এবং মূর্ত (Concrete) ঘরানার দ্বন্দ্বে তখন ঝাঁঝালো পরিবেশ। কিন্তু ব্রেসঁ প্রত্যয়ী, তিনি জানতেন সৃষ্টির কোন ঘাটে পা রাখবেন। স্বপরিবেশ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক বীক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নিয়েছে ব্রেসঁর শিল্প। অনুবাদ নয়, নয় হুবহু আলেখ্য, তিনি চাইতেন অনুপঙ্খময় অন্তর্মানচিত্র, রূপের মহিমা। চিত্রসাংবাদিকতা বা ফটোজার্নালিজম, কার্তিয়ের ব্রেসঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল না। কিন্তু যখন লাইকাকে সমাজ-পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে ভাবতেন শুরু করেন তিনি হয়ে উঠেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী । ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্র,ভারত এবং চীনদেশ ভ্রমণে যান। কুমিনটং একনায়কতন্ত্রের শেষ ছয়মাস এবং মাও-ইস্ট শাসনের প্রথম ছয়মাস চীনে ছিলেন । দেশ-দেশান্তরে পরিক্রমায় অভিজ্ঞতার উত্তরণে তাঁর ভাবনালোকে ছায়া ফেলে বৌদ্ধদর্শন। শিল্প মুক্তি বা নির্বাণের পথ এই বিশ্বাসে প্রীত ব্রেসঁকে আলোড়িত করেছিল ‘Buddhist idea of disrupting nature as little as possible.’
আলোকচিত্রকে তিনি ভাবতেন জীবনে বেঁচে থাকার একটি দিক। বিশ শতকের অবিস্মরণীয়, কিছু ঘটনা ক্যামেরাবন্দি করে ইতিহাস তৈরি করেছেন। চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, রাশিয়া, মেক্সিকো, কানাডা, ইউরোপ, আমেরিকাসহ তামাম দুনিয়া চষে তিনি তুলে এনেছেন শিল্পের সম্ভার, ইতিহাসের দলিল। স্পেনের গৃহযুদ্ধ, নাজি-অধিকৃত ফ্রান্স, ভারতের দেশবিভাগ, চীনের বিপ্লব, প্যারিসের মুক্তি, ‘৬৮-র ছাত্র-আন্দোলন দেশ, সমাজ, রাজনীতির এ-সমস্ত অমূল্য ইতিহাস, স্মৃতির সাক্ষী ব্রেসঁর ক্যামেরা। তিনিই প্রথম আলোকচিত্র-সাংবাদিক হিসেবে ১৯৫৪ সালে রাশিয়াতে যাবার অনুমতি পান বিপ্লবী রাশিয়ার স্তালিনের মৃত্যু-পরবর্তী পরিস্থিতিতে। মহাত্মা গান্ধীর অন্তিম মুহূর্তের চিত্রগুলোও ব্রেসঁর তোলা । হত্যার ৪৫ মিনিট পূর্বে তিনি ছিলেন গান্ধীজীর সঙ্গে। নানা ঘটনা ও ব্যক্তির সান্নিধ্যে তিনি নিজেই ইতিহাস পরিক্রমণ করে গেছেন ক্রমাগত ।
—
ব্রেসঁ ফ্রান্সের মুক্তির ছবি তুলেছিলেন। কিন্তু পরে হারিয়ে-যাওয়া দুর্লভ চিত্রগুলো খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের বাড়িতেই । বাড়ি বদলের সময় একটি বিস্কুটের বাক্সে সযত্নে রক্ষিত অমূল্য ছবিগুলো পেয়েছিলেন পঁচিশ বছর পর। ফটো পত্রিকায় পরে সেগুলো ছাপা হয়েছিল। ১৯৪৪, ৫ই জুন তিনি ছিলেন ব্রাকের বাড়িতে। প্রতিকৃতি তোলার মুহূর্তে শোনেন বিবিসির সংকেতধ্বনি বেথোভেনের সিম্ফনি। পরপরই ঘোষণা নরমন্দিরে ইংরেজ মিত্রশক্তির পদার্পণের খবর ।
ফরাসি চিত্রশিল্পী পিয়ের বোনারের সঙ্গে আলাপের এ-পর্যায়ে ছবি তুললে, কৌতূহলী শিল্পীর প্রশ্ন, কেন তিনি ঠিক এই মুহূর্তের ছবিটি নিলেন? ব্রেসঁর উত্তর, ‘কেন আপনি বিশেষ করেই হলুদ দিয়েছেন আপনার চিত্রকর্মে? বলাই বাহুল্য দুজনেই হেসেছেন। বোনার বলেছিলেন, ‘বুদ্ধিমত্তা ও সহজাত প্রবৃত্তি প্রয়োজনীয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সহজাত প্রবৃত্তিই প্রাধান্য পায় বুদ্ধিমত্তার উপর এবং আমার মনে হয় এটিই হলো মূল… ।
ব্রেসঁর তোলা প্রতিকৃতিগুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা-বিতর্ক করেছেন শিল্পী ও শিল্পসমালোচকরা। কারো মতে এগুলো অনেকটাই ক্যারিকেচারধর্মী, প্রকৃত বিষয়কে প্রকাশ করে না। অন্যদের বিশ্বাস, মানবচরিত্রের গভীরতা উপলব্ধি করা যায় প্রতিকৃতিগুলোতে।
আলোকচিত্রকে বলা হয় হাজার শব্দের সমতুল্য । আর চিত্রকর্ম কোটি কোটি স্নায়ুকোষের অনুভব, বোধ আর মগজের কুঠুরির অসংখ্য নিউরনের দাপাদাপি সমীকরণ। রঙের ব্যঞ্জনায় এক বিশেষ স্পর্শযোগ্য ভাষা তৈরি করতে চিত্রকরই পারেন – আত্ম-এষণা থেকে পরিণত বয়সে এই আত্মপোলব্ধি ব্রেসঁর। মগজের মধ্যে মননের বিশাল মহাদেশে ক্রমশ স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে সৃষ্টির ভিন্ন নিশানা। তাই ‘৭০ সালের মাঝামাঝি তিনি আবার হাতে তুলে নেন রং, তুলি, পেনসিল । জীবনের প্রায় অর্ধশতক সাদা-কালো আলোকচিত্রের ভুবনে ভ্রমণশেষে তাঁর চেতনাপ্রবাহ কাজ করে অন্যস্তরে – ‘আলোকচিত্র কখনোই চিত্রকলার মতো ততটা হতে পারে না, এটি তাৎক্ষণিক ড্রইং করার মতো।’
দীর্ঘাঙ্গ, কৃশ-তনু, সমুদ্র নীল চোখের মানুষটির আয়ু ছিল কর্মের আভিজাত্যে ভরা, অসাধারণ কর্মের সম্ভার রেখে প্রচার বিমুখ ও লাজুক অঁরি কার্তিয়ে ব্রেসঁ জীবনের দীপিত অধ্যায় শেষ করলেন গত ৩ আগস্ট, দক্ষিণ- পূর্ব ফ্রান্সে নিজ বাসভবনে। ছিয়ানব্বইতে পদার্পণের কয়েকদিন আগে ।
বছর পাঁচেক আগে নব্বই বছর বয়সে এক সাক্ষাৎকারে তাঁর শিল্প-ভাবনায় ইংরেজ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনের উদ্ধৃতিতে, ‘Respect of reality’ এবং হেগেলের ‘ফিলসফি অব আর্টে’র দর্শনের প্রভাবের কথা
বলেছিলেন।
সৃজন-সৈকতে সৃষ্টিই ছিল তাঁর কাছে জরুরিতম শ্রম, অন্তিমশুদ্ধ পাঠ। তাই আমৃত্যু বলতে পেরেছেন, ‘আমার কাছে ছবি এবং ড্রইং একই ব্যাপার। সেখানে বিশেষ প্রাধান্য বা গুরুত্ব পাবার কিছু নেই…।’
সমস্ত উপচার নিয়ে এত সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল যে, সীমাবদ্ধ পরিসরে তা বলা অসম্ভব। স্ব-সময়ের স্মারক কণ্ঠস্বর ব্রেসঁর কাজ নিয়ে, তাঁর সম্পর্কে অসংখ্য বই বেরিয়েছে। প্রথম বই দি ফটোগ্রাফ অব হেনরি কার্তিয়ে ব্রেসঁ প্রকাশিত হয়েছে নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটান মডার্ন আর্ট মিউজিয়াম থেকে ১৯৪৭ সালে। আর ফ্রান্সে প্রকাশিত প্রথম বই ইমাজ আ লা ছোবেত। ১৯৫২ সালে প্রথম প্রকাশ, প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন বিখ্যাত শিল্পী অঁরি মাতিস। বইয়ের মুখবন্ধে ব্রেসঁ নিজের কাজ সম্পর্কে বলেছেন। ব্যক্ত করেছেন আলোকচিত্র সম্পর্কে নিজস্ব মতামত, ধারণা। মোক্ষম ক্ষণ ইংরেজি সংস্করণের নাম দ্য ডিসিসিভ মোমেন্ট (The Decisive Moment) থেকে । বেরিয়েছে নিউইয়র্ক বহু আলোচিত, বিখ্যাত বইটিকে বলা হয় পেশাজীবীদের জন্যে প্রামাণ্য গ্ৰন্থ ।
১৯৯৫ সালে ব্রেসঁর কাজ নিয়ে উল্লেখযোগ্য বইটি লিখেছেন রেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জঁ পিয়ের মঁতিয়ে। ‘নাদার’ পুরস্কারপ্রাপ্ত লা আর সজ আর দ্য HCB (Lart sano art de HCB) বইটি পড়ে ব্রেসঁ নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন ১৪ই এপ্রিল ১৯৯৮তে – ‘… আমি আবার উল্লেখ করতে চাই যে, ছবি তৈরির পদ্ধতি আমাকে আকর্ষণ করে না। কখনোই না। আমি তা ভাবিনি। না, ছবিতে আমার কোনো অবসেশন নেই। আমার অবসেশন হলো যা আমি দেখি তাতে, জীবন, বাস্তবতা। ছবি আমার কাছে দেখার আনন্দ, তাৎক্ষণিকভাবে যাকে একটি খণ্ড দিয়ে বন্দি করা হয়। কিন্তু এ-তো শুধু হাতিয়ার। এবং সেলিব্রেটি আমাকে বিচূর্ণ করেছে। এটি হলো পরিচিত হতে ক্ষমতার একটি ফর্ম এবং যেহেতু আমি গভীরভাবে ব্রেসঁ এবং তাঁর কর্মময় জীবন জীবনের স্বাধীন, আমি তা গ্রহণ করতে পারি না!’
প্রথম স্ত্রী নৃত্যশিল্পী রত্নামোহিনী ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে। বিয়ে করেছিলেন ১৯৩৭ সালে। স্ত্রীর প্রভাবেও খানিকটা তিনি বৌদ্ধধর্ম ও হিন্দুধর্ম সম্পর্কে আগ্রহী হয়েছিলেন। পরে রত্নার সঙ্গে বিবাহ- বিচ্ছেদ হলে ১৯৭০-এ আবার বিয়ে করেন আলোকচিত্রী মার্টিনি ফ্র্যাঙ্ককে। একমাত্র দত্তক কন্যা মেলানিকে নিয়ে ছিল সুখের দাম্পত্য।
পুনশ্চ: গত বছর প্যারিসে জাতীয় গ্রন্থাগার ফ্রঁসোয়া মিতেরতে ব্রেসর শেষ রেট্রোসপেক্টিভের শিরোনাম ছিল ‘HCB দো কি সাজিতিল?’ (HCB de qui s’agit-il)। এ-বছরেই উদ্বোধন করা হয় অঁরি কার্তিয়ে ব্রেসঁ ফাউন্ডেশন, যেখানে ব্রেসঁর কাজের সংগ্রহের পাশে অন্যান্য শিল্পীরও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে।
তথ্যসূত্র :
১। ফটো ম্যাগাজিন বিশেষ সংখ্যা, আগস্ট ২০০৪
২। তেলেরামা ‘কার্তিয়ে ব্রেসঁ’,
বিশেষ সংখ্যা ২০০৩
৩। ‘কার্তিয়ে ব্রেসঁ লই দ্য সিয়ের’ পিয়ের আছোলিন,
২০০১
৪। HCB দ্য কি সাজিতিল? প্রকাশক : গালিমার ও ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগার, ২০০৩।