বুদ্ধদেব বসুর রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে বহুমাত্রিক লেখক বুদ্ধদেব বসু। মোটা দাগে বাংলা সাহিত্যে এমন তিনজন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে যাঁরা নিজেদের সময়ে সাহিত্যের অভিভাবকত্ব করেছেন – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বুদ্ধদেব বসু। রবীন্দ্রনাথ আর বুদ্ধদেব বসু দুটি ভিন্ন সময়ের প্রতিনিধি, সেই ভিন্নতা শুধু সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি বিস্তৃত হয়েছিল সাহিত্যিক আদর্শ পর্যন্ত। বুদ্ধদেব বসুর নেতৃত্বে যে আধুনিক সাহিত্য আন্দোলন দানা বেঁধেছিল সেই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল রবীন্দ্রবিরোধিতা। জীবনের নানা পর্বে বুদ্ধদেব ‘রবীন্দ্রবিরোধী’ অভিধায় অভিহিত হয়েছেন। অথচ রবীন্দ্রবিরোধী কখনো ছিলেন না বুদ্ধদেব। বিভিন্ন বইয়ে,

বক্তৃতায়, টুকরো প্রবন্ধে, পত্রালাপে তিনি রবীন্দ্রনাথের অনন্যসাধারণ সাহিত্যসম্ভার সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করেছেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর কয়েকটি রবীন্দ্রবিষয়ক গ্রন্থে। যেমন Tagore : Protrait of a poet কবি রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গ : নিঃসঙ্গতা : রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ : কথাসাহিত্য, সব পেয়েছির দেশে এবং An Acre of Green grass-এর অংশবিশেষ  উল্লেখযোগ্য। রবীন্দ্রনাথের অন্ধ স্তাবক ছিলেন না তিনি। অসামান্য প্রতিভার কারণে বুদ্ধদেব নিজেও রবীন্দ্রনাথের অকৃপণ স্নেহ পেয়েছিলেন।

আঠারো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দেখেছিলেন বুদ্ধদেব ১৯২৬ সালে। রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে একটি কবিতাও লিখেছিলেন তিনি তখন। সেই ‘ছন্দবদ্ধ প্রশস্তিটি’ একটি সভায় পড়ে শুনিয়েছিলেন তাঁর এক ‘নবলব্ধ বন্ধু’। রবীন্দ্রনাথকে দেখার স্পর্শপ্রবণ বর্ণনাটি আছে আমার ছেলেবেলা বইয়ে – ‘রবীন্দ্রনাথকে আমি প্রথম চোখে দেখেছিলাম বুড়িগঙ্গার উপর নোঙর-ফেলা একটি স্টিম-লঞ্চে, যেখানে, নিমন্ত্রণকর্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রেষারেষি ক’রে, ঢাকার নাগরিকেরা তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। উপরের ডেক্-এ ইজিচেয়ারে ব’সে আছেন তিনি, ঠিক তাঁর ফটোগ্রাফগুলোর মতোই জোব্বা-পাজামা পরনে – আরো কেউ-কেউ উপস্থিত ও সঞ্চরমান, রেলিংয়ে হেলান দিয়ে আমি দূরে দাঁড়িয়ে আছি। আমার মুখ-চেনা একটি ব্রাহ্ম যুবক আমার কাছে এসে বললেন, ‘আপনাকে ইনট্রোডিউস করিয়ে দেবো?’ আমি ত্রস্তে ব’লে উঠলাম, ‘না, না – সে কী কথা!”

সেখানে বুদ্ধদেবের ‘অটোগ্রাফ খাতায়’ রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন –

বাজে নিশীথের নীরব ছন্দে

বিশ্বকবির দান

আঁধার-বাঁশির রন্ধ্রে রন্ধ্রে

তারার বহ্নি গান।

বুদ্ধদেব বসু ও তাঁর সহযাত্রী লেখকগণ রবীন্দ্র-প্রভাবমুক্ত সাহিত্যসৃষ্টির তাগিদ অনুভব করেছিলেন আধুনিক সাহিত্যের প্রাণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। বুদ্ধদেব যেহেতু তরুণ বয়স থেকেই যথার্থ সাহিত্যবোদ্ধা, তাই রবীন্দ্রনাথের অলোকসামান্য দীপ্তি তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। কলেজের ছাত্রাবস্থায় তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের মহত্তম প্রতিভা। রবীন্দ্রনাথ :

কথাসাহিত্য বইয়ে বুদ্ধদেব বসু স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন –

‘শেষের কবিতা’র আবির্ভাবের সময় আমি ছিলাম কলেজের ছাত্র এবং বাংলা সাহিত্যে নবাগত। বাংলা সাহিত্যের একটি সন্ধিক্ষণ তখন, ‘কল্লোল’কে কেন্দ্র ক’রে হাওয়া-বদল ঘটেছে, আর তা-ই নিয়ে মুখর হ’য়ে উঠছে সমালোচনা। আমরা কোমর বেঁধে লেগেছি, বিরুদ্ধ দলেরও প্রচণ্ড উৎসাহ। তারুণ্যের সেই সংঘাতের দিনে রবীন্দ্রনাথের আদর্শ আর মেনে নিতে পারছি না আমরা; আমাদের আকাক্সক্ষা ছুটেছে তীক্ষ্মতার দিকে, তীব্রতার দিকে, তার প্রভাবে তখন রবীন্দ্রনাথের রচনাকে বড্ড বেশি মৃদু ব’লে ঘোষণা করতে আমরা কুণ্ঠিত হইনি। ঠিক এইরকম সময়ে রবীন্দ্রনাথের দুটি নতুন উপন্যাস বিভিন্ন মাসিকপত্রে পর-পর দেখা দিলো। কোনো গম্ভীর রাগিণীর আলাপের মতো ‘যোগাযোগে’র আরম্ভ, তাতে সাড়া দিতে একটু দেরি হ’লো আমাদের; কিন্তু ‘শেষের কবিতা’র প্রথম কিস্তি বেরোনোমাত্র বিকিয়ে যেতে হ’লো। মাসে-মাসে এই আশ্চর্য নতুন রচনাটি পড়তে-পড়তে আমাদের মনে হ’লো যেন একটা বন্ধ দুয়ার, যা আমাদের আনাড়ি হাতের আঘাতে কোনো উত্তর দেয়নি, তা এক জাদুকরের স্পর্শে হঠাৎ খুলে গেলো – দেখা গেলো আমাদেরই অনেক স্বপ্নের চোখ-ধাঁধানো মূর্তি। আমরা যা-কিছু চেষ্টা করছিলাম অথচ ঠিক পারছিলাম না, সেই সবই রবীন্দ্রনাথ করেছেন – কী সহজে, কী সম্পূর্ণ ক’রে, কী সুন্দর ভঙ্গিতে। মনে হ’লো বইটা যেন আমাদেরই, অর্থাৎ নবীন লেখকদেরই উদ্দেশে লেখা, আমাদেরই শিক্ষা দেবার জন্যে এটি গুরুদেবের একটি তির্যক ভর্ৎসনা। অবাক হয়ে দেখলুম রবীন্দ্রনাথের ‘আধুনিক’ মূর্তি – আমরা আধুনিক বলতে যা ভাবছিলাম ঠিক তা নয়, কিন্তু তারই কোনো সার্থক রূপান্তর যেন; আমাদের কল্পিত রবীন্দ্র-যুগের সীমানা এক ধাক্কায় অনেক দূরে স’রে গেলো; যেটাকে আমরা ‘রবীন্দ্র-যুগ’ আখ্যা দিয়েছিলাম, সেটা যে নিজেই গতিশীল এবং পরিবর্তমান, তা বুঝতে পেরে অনেক ধারণা বদলে গেলো আমাদের। বারবার যিনি নবজাত, প্রায় সত্তর বছরে আবার তাঁর এক নূতন জন্ম। আবার হার মানতে হ’লো তাঁর কাছে, সেই আনন্দে তাঁকে প্রণাম জানালুম, আর ‘শেষের কবিতা’র উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বেড়াতে লাগলুম চারদিকে।

রবীন্দ্রনাথ : কথাসাহিত্য বইয়ে উপন্যাস ও ছোটগল্প সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন বুদ্ধদেব বসু। চোখের বালির সমাপ্তি নিয়ে তাঁর অতৃপ্তির যৌক্তিকতা মেনে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শেষের কবিতার আবির্ভাব কীভাবে তরুণ বুদ্ধদেব ও তাঁর সহযাত্রীদের অভিভূত করেছিল তার চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। স্বীকার করেছেন – এমন গতিশীল, দ্যুতিময় ভাষা বাংলা সাহিত্যে এর আগে দেখা যায়নি। বাংলা গদ্যের তৎকালীন অগ্রগতির নিয়ামক হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন শেষের কবিতা উপন্যাসকে। গদ্য-রচনার কারুশিল্পই যদি লক্ষ্য হয়, তবে শেষের কবিতার অবস্থান বাংলা সাহিত্যের চূড়ায়। বুদ্ধদেবের অনন্য মূল্যায়ন –

বাংলা গদ্য যে এত সাবলীল হতে পারে, তাকে যে ইচ্ছে মতো বাঁকানো, হেলানো, দোমড়ানো, মোচড়ানো সম্ভব, আলোছায়ার এত সূক্ষ্ম স্তর তাতে ধরা পড়ে, খেলা করে ছন্দের এত বৈচিত্র্য, তা আমরা এর আগে ভাবতে পারিনি।

… ‘ঘরে-বাইরে’তে যে-পরীক্ষা আরম্ভ হয়েছিলো তার উদযাপন হ’লো ‘শেষের কবিতা’য়; এরপর থেকেই চলতি ভাষার ব্যবহার ব্যাপক হ’য়ে উঠলো সাহিত্যে, আর সাধুভাষা পিছনে হটতে-হটতে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিলো রক্ষণশীলতার শেষ দুর্গ, বিশ্ববিদ্যালয়ে।

রবীন্দ্রনাথের অনুপম সৃষ্টি গল্পগুচ্ছ সম্পর্কেও হৃদয়গ্রাহী আলোচনা করেছেন বুদ্ধদেব। রূপময়তা, গীতধর্মিতা, ভাষার কারুময়তা নানা দিকে আলো ফেলে বিশ্লিষ্ট করেছেন অনিন্দ্য ছোটগল্পগুলোকে। প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি ব্যবহার করে দেখিয়েছেন শুধু মানব চরিত্র নয়, প্রকৃতিও অবিচ্ছেদ্য সত্তা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের –

… ‘গল্পগুচ্ছ’ বিশেষভাবে বলা যায় যে, ‘পয়লা নম্বরে’র আগে পর্যন্ত, প্রকৃতিই ব্যাপ্তভাবে তার অধিনায়ক। বিশ^প্রকৃতির পটভূমিকায় মানবজীবনের আলেখ্য তিনি তুলে ধরেছেন। মনুষ্যমূর্তিগুলি ছোটো, ঘটনাগুলি তীক্ষ্ম, মর্মস্পর্শী, মর্মভেদী, কিন্তু শেষ মুহূর্তে এই ধরনের সূক্ষ্ম একটি ইঙ্গিত তিনি রেখে যান যে এখনকার মতো এ-বেদনা যতই দুঃসহ হোক, চিরকালের পরিপ্রেক্ষিতে এ কতটুকুই বা। এ রকম ঘটনা অতীতেও ঘটেছে, ভবিষ্যতেও ঘটবে, কালস্রোত নিরবধি ব’য়ে চলেছে, আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের কোনো দুঃখ, কোনো আনন্দই তাকে বেঁধে রাখবে না। … গল্পের চরিত্রবিন্যাস ও ঘটনাসমাবেশ একদিকে চলেছে বাস্তবনিষ্ঠার পথ ধরে, কাহিনীটুকু বলা হচ্ছে খুবই স্পষ্ট ক’রে, গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে, উপস্থিত মুহূর্তের সুখদুঃখগুলি গভীরভাবে  আঘাত করছে পাঠকের মনে, আবার সেই সঙ্গে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে চিরকালের দৃষ্টিতে বর্তমানকে দেখবার একটি ইঙ্গিতও লেখক দিয়ে যাচ্ছেন।

রবীন্দ্রনাথের মহত্তম উপন্যাস গোরা সম্পর্কে অসাধারণ আলোচনা করেছেন বুদ্ধদেব বসু। নিজের জন্মরহস্য ভেদ করার পর গোরা উপলব্ধি করেছিল যে, সে ভারতবর্ষীয়। ভারতবর্ষের সকল জাতই তার জাত, সকলের অন্নই তার অন্ন। পরেশের উদ্দেশে বলে, ‘আপনি আমাকে আজ সেই দেবতারই মন্ত্র দিন, যিনি হিন্দু মুসলমান খ্রীস্টান ব্রাহ্ম সকলেরই যাঁর মন্দিরের দ্বার কোনো জাতির কাছে কোনো ব্যক্তির কাছে অবরুদ্ধ হয় না, যিনি কেবলই হিন্দুদের দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা।’ এ-প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর মন্তব্য যথার্থ – ‘‘গোরা’র শেষ পরিচ্ছেদটিতে রবীন্দ্রনাথকেই প্রত্যক্ষ করলাম আমরা মানবধর্মের মহৎ পূজারি রবীন্দ্রনাথ – আর দেখতে পেলাম ইতিহাসের বিচিত্র চিত্রপটে আঁকা তাঁরই ভারতবর্ষের মানসমূর্তি।’

Tagore : Portrait of a Poet বা কবি রবীন্দ্রনাথ বইয়ে বুদ্ধদেব আলোচনা করেছেন মানসী থেকে গীতাঞ্জলি পর্যন্ত। আদিপর্বের রবীন্দ্রনাথকে ঘিরেই মূর্ত হয়ে উঠেছে তাঁর উচ্ছ্বাস। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীলতার বিচিত্র রূপকে নানাভাবে তুলে ধরেছেন বুদ্ধদেব বসু। কথাসাহিত্য, কবিতা, সমালোচনা, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য, নাটক রবীন্দ্রনাথের অশেষ সৃষ্টিভাণ্ডারকে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন নির্মোহ সমালোচক ও অভিভূত পাঠকের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে। যাঁরা ‘রবীন্দ্রবিরোধী’ বলে বুদ্ধদেবকে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং এখনো করেন, তাঁদের অপপ্রচারের অন্তঃসারশূন্যতা ধরা পড়ে বুদ্ধদেব-লিখিত ‘রবীন্দ্রনাথ : বিশ্বকবি ও বাঙালি’ প্রবন্ধের সূচনা বক্তব্যে –

যেন এক দৈব আবির্ভাব অপর্যাপ্ত, চেষ্টাহীন, ভাস্বর, পৃথিবীর মহত্তম কবিদের অন্যতম : আমার কাছে, এবং আমার মতো আরো অনেকের কাছে, এ-ই হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর তুল্য ক্ষমতা ও উদ্যম ভাষার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে, এমন ঘটনা ইতিহাসে বিরল : এবং ভাষা ব্যবহারের দক্ষতায়, কবিতা ও গদ্যরচনার যুগপৎ অনুশীলনে, বহু ভিন্ন-ভিন্ন বিষয় ও রূপকল্পের সার্থক প্রযোজনায় সব মিলিয়ে, অন্য দেশে বা কালে, তাঁর সমকক্ষ ক-জন আছে, বা কেউ আছেন কিনা, তা আমি অন্তত গবেষণার বিষয় ব’লে মনে করি।

শুধু রবীন্দ্রসাহিত্যের বিচার-বিশ্লেষণের মধ্যে বুদ্ধদেবের রবীন্দ্রানুরাগ সীমাবদ্ধ ছিল না। সমালোচনার আদর্শও তিনি গ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। ‘কবিতা : আষাঢ় ১৩৫০’ সংখ্যায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাঁর সমালোচনা দর্শন –

সাহিত্যের রস পাঠকের মনে সংক্রামিত করা, সাহিত্যের মূলসূত্র উদ্ঘাটন করা এবং প্রসঙ্গত ভালো লেখার একটি আদর্শ সকল লেখকের ও পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা। এ কাজ যাঁরাই করেছেন, তাঁরাই শ্রেষ্ঠ সমালোচক বলে স্বীকৃত, এবং তাঁদের সকলের লেখাই এতখানি সরস যে পরবর্তী যুগে তাঁদের মতামত সম্পূর্ণ গৃহীত না হলেও শুধু লেখার গুণেই পাঠকের চিত্তে তাঁদের রাজত্ব নষ্ট হয়নি। অর্থাৎ সমালোচনাকেই তাঁরা সাহিত্য করে তুলেছিলেন। এইটেই শ্রেষ্ঠ সমালোচনা। রবীন্দ্রনাথ এই শ্রেণীরই সমালোচক।

কবি রবীন্দ্রনাথ বইটি রবীন্দ্রনাথের কাব্যপ্রতিভা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এক অসামান্য দিকনির্দেশকের ভূমিকা পালন করেছে। রবীন্দ্রনাথের কবিকৃতির বৈচিত্র্য সন্ধান করতে গিয়ে বুদ্ধদেব লিখেছেন –

আমরা বারে বারে বিস্মিত হই, যখন দেখি তাঁর অধিকৃত ভূমি কী বিস্তীর্ণ, কত ভিন্ন ভিন্ন সুরে ও স্বরে তিনি কথা বলতে পারেন, কী রকম দ্রুত পরিবর্তনশীল তাঁর ভাব ও ভঙ্গি। সহজেই আবিষ্কার করি অনেক ভিন্ন ভিন্ন ধরন, কবিতার বিষয়ে অনেক ভিন্ন ভিন্ন ধারণা। কাব্যকলার কোনো অনন্য আদর্শে রবীন্দ্রনাথ আত্মসমর্পণ করেননি – যেমন করেছিলেন বোদলেয়ার ও ভের্লেন, ইয়েটস ও ইলিয়ট, পরবর্তীকালে সুধীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ।

এরপর রবীন্দ্রনাথের বহুমাত্রিক প্রতিভা সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুর এই উক্তি অবিস্মরণীয় –

গ্যেটের মতো রবীন্দ্রনাথও একজন নন, এক শ জন মানুষ, আর কাব্যে যিনি ধরা দেন তিনিও একজন নন, অনেক ভিন্ন ভিন্ন কবির সমাহার। কবিতার কাছে যা আমাদের ন্যূনতম প্রত্যাশা শুধু সেটুকু মেটাতে তিনি আপত্তি করেন না; আবার তাঁর কবিতা আমাদের জন্য যা করতে পারে তার বেশি কোনো কবিতারই সাধ্য নেই। এবং দুই চরণের মধ্যবর্তী অনেক স্তরও তাঁর রচনায় প্রাজ্ঞীয়।

সেজন্যই সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ভিন্নভাবে বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ আমাদের সাহিত্যের সিদ্ধিদাতা গণেশ।’ আর সে-কথার সূত্র ধরে বুদ্ধদেবের মন্তব্য – ‘এ কথার সত্যতা যত দিন যাবে ততই গভীরভাবে আমরা উপলব্ধি করব।’

কাব্যসৃষ্টিতে অতিপ্রজ হওয়ার যে বিপদ, রবীন্দ্রনাথের বিশাল কাব্যভাণ্ডারের দিকে তাকিয়ে সে-কথাও উল্লেখ করেছেন বুদ্ধদেব, বিশেষ করে সুদীর্ঘ কবিতায় অনেক কথা বা সব কথা বলার আগ্রহে বা কাহিনি কাব্যগুলোর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশে। যেমন একদিকে ‘পুরাতন ভৃত্য’ অন্যদিকে ‘বসুন্ধরা’ শীর্ষক কবিতার উল্লেখ করেছেন। ‘অমিত কথনে’ বুদ্ধদেব তুলনা টানতে উল্লেখ করেছেন ওয়াল্ট হুইটম্যানকে।

বিপরীত বিবেচনায় বলেছেন, ‘না বলা বাণীর মূল্য জানতেন রবীন্দ্রনাথ’, ‘তাঁর আয়ত্তে ছিল মিতভাষণ ও পরিচ্ছন্ন পরিলেখ।’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন চিরকালের চেনা ‘সোনার তরী’ কবিতাটি। তাঁর মতে, এ-কবিতায় রয়েছে ‘সরলতা ও সংযম, অনুদ্বেল শব্দ ব্যবহার এবং এক চিত্তহারী নির্ভরতা। একটি বাহুল্য শব্দ নেই এতে, কোনো পাশের ব্যক্তি বা আতিশয্য নেই।’ তুলনায় ‘বসুন্ধরা’কে বলেছেন ভৌগোলিক নিবন্ধ।

প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘মহত্তম প্রতিভার অধিকারী’ হয়েও কেন রবীন্দ্রনাথ অমিতকথনের অপচয়ে সময় ও শ্রম ব্যয় করলেন। এ-প্রশ্নের জবাবও বুদ্ধদেবই দিয়েছেন এভাবে। তাঁর সময়ে ‘যেহেতু ভাষা ছিল অপেক্ষাকৃত অপরিণত বাংলা, তাই সমগ্র বাংলা সাহিত্যের দায়িত্ব তাঁকে নিতে হয়েছিল। শুধু কবিতা লেখা নয় – তাঁকে সৃষ্টি করতে হলো ভাষা, ছন্দ ও রূপকল্প।’

কিছুটা আবেগসিক্ত ভাষায়ই বুদ্ধদেব প্রশ্ন করেন, কেন রবীন্দ্রনাথ এত বহুমুখী, বিচিত্রগামী হলেন, অর্জুনের মতো লক্ষ্যভেদে একমুখী না হয়ে। আর হননি বলে বুদ্ধদেবের ভাষায় –

তাঁর কবিতা – যা এমন প্রচুর, বিচিত্র ও অবসানহীন, তাঁর কাছে আমরা পেয়েছি – শুধু কবিতা পড়ার আনন্দ নয়, পেয়েছি সেই সোনার বাংলাকে, যার আকাশ-বাতাস আমাদের মনে বাঁশি বাজায়। সেইসঙ্গে অন্য এক ব্যাকুল বাঁশরিও তিনি শুনিয়েছেন, এক সুদূর বিপুল সুদূরের আহ্বান, দেশকালোত্তর বিশ্বের সমাচার। … তারই হাত থেকে জগৎটাকে পেয়েছিলাম, তাই এখন তা নিয়ে যা খুশি তা-ই করতে পারছি।

অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কথা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বলেছেন বুদ্ধদেব বসু – ‘যদি তিনি শুধু স্বল্পসংখ্যক উৎকৃষ্ট কবিতা লিখতেন, তাহলে হয়তো পরবর্তী কবিদের পক্ষে আরো ভালো হতো, কিন্তু তাঁর সমগ্র স্বজাতির মানসিক দারিদ্র্য ঘুচত না। এখানেই তাঁর আতিশয্য ও উচ্চবচতার সার্থকতা।’ তবু একালের সংহত-বাক কবি মিতকথনের দায়ে হয়তো অভিযোগ তুলবেন : ‘কবি ও কবিতার সপক্ষে …. ছত্রের সুবিশাল কাহিনী কাব্য লিখে তাঁর মূল্যবান সময়ের অপচয় না ঘটালেই চলত না?’ হয়তো চলত, কিন্তু তাঁর নান্দনিক দায়বদ্ধতা তাঁর কাব্যস্বভাবকে অনেকাংশে অমিতব্যয়ী করে তুলেছিল। বুদ্ধদেবের মতে, ‘রবীন্দ্রনাথ সেই অমরবৃন্দের অন্যতম, যাঁর বিষয়ে নির্ভয়ে বলা যায় যে সাহিত্যের আদর্শে যতই পরিবর্তন ঘটুক, বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন কারণে তিনি সমাদৃত হবেন এবং কোনো না কোনো কারণে প্রতি যুগ তাঁকে অভ্যর্থনা জানাবে।’ রবীন্দ্রনাথ-প্রদর্শিত পথ ছাড়াও যে অন্য পথে বাংলা কবিতার বিকাশ সম্ভব সে-লক্ষ্যে বুদ্ধদেব ও কল্লোলগোষ্ঠী সচেষ্ট ছিলেন। এর মানে এই নয়, রবীন্দ্রনাথের প্রভাব, প্রতিভা কিংবা যুগান্তর আনয়নকারী ভূমিকাকে অস্বীকার করা হয়েছে। ভবিষ্যতের কবিকেও যে রবীন্দ্রভিত্তির ওপরই সৌধ নির্মাণ করতে হবে, তা বিস্মৃত হননি বুদ্ধদেব। ‘রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক’ প্রবন্ধে তাঁর উপলব্ধি –

বাংলা সাহিত্যে আদিগন্ত ব্যাপ্ত হ’য়ে আছেন তিনি, বাংলা ভাষার রক্তে-মাংসে মিশে আছেন; তাঁর কাছে ঋণী হবার জন্য এমনকি তাঁকে অধ্যয়নেরও আর প্রয়োজন নেই তেমন, সেই ঋণ স্বতঃসিদ্ধ বলেই ধরা যেতে পারে শুধু আজকের দিনের নয়, যুগে-যুগে বাংলা ভাষার যে-কোনো লেখকেরই পক্ষে। আর যেখানে প্রত্যক্ষভাবে ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘ’টে যাবে, সেখানেও সুখের বিষয়, সম্মোহনের আশঙ্কা আর নেই; রবীন্দ্রনাথের উপযোগিতা, ব্যবহার্যতা ক্রমশই বিস্তৃত হ’য়ে, বিচিত্র হ’য়ে প্রকাশ পাবে বাংলা সাহিত্যে। তাঁরই ভিত্তির উপর বেড়ে উঠতে হবে আগামী কালের বাঙালি কবিকে; এইখানে বাংলা কবিতার বিবর্তনের পরবর্তী ধাপেরও ইঙ্গিত আছে।

রবীন্দ্রনাথের কবিজীবনের নানা পর্ব বিশ্লেষণ করেছেন বুদ্ধদেব। কখনো মুগ্ধতা, কখনো আক্ষেপ ছড়িয়ে আছে তাঁর আলোচনায়। ক্ষণিকা, বলাকা, লিপিকা, পুনশ্চ সম্পর্কিত রচনায় বুদ্ধদেব দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি কাব্য রীতিতে ও বিষয়বস্তুতে স্বতন্ত্র। কাব্য-সমালোচনার ক্ষেত্রে রূপ, রীতি, ভঙ্গি, সুর আর অফুরন্ত কলাকৌশলের আলোচনা করেছেন তিনি। সৌন্দর্যবাদী বুদ্ধদেব নির্দ্বিধায় বলেছেন পত্রপুট কাব্যে রবীন্দ্রনাথ ব্যবহৃত সমাসে, সন্ধিতে, অনুপ্রাসে, অমৌখিক সংস্কৃত শব্দের অন্তর্ভুক্তি তাঁর পছন্দ হয়নি। এখানে ‘গীতিকবিতার ইঙ্গিতের ঐশ্বর্য’ তিনি আশা করেননি। সেখানে পেয়েছেন ‘বিশাল চিন্তার প্রসারিত ডালমালার মর্মর’।

রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেমের কবিতাকে তিনি ইয়েটসের কবিতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর কবিতায় উগ্র জাতীয়তাবাদ বা ভাবালুতার কোনো চিহ্ন নেই। বুদ্ধদেবের মতে, অন্য কোনো দেশপ্রেমিক বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথের পাশে দাঁড়াতে পারেন না, কারণ তিনি স্বদেশের সঙ্গে বিশ্বকে এক করে দেখেছিলেন। কবি রবীন্দ্রনাথ বইয়ের শেষে রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদের গুরুত্ব সম্পর্কে কথা বলেছেন বুদ্ধদেব বসু। তিনি আশা ব্যক্ত করে বলেছিলেন, কোনো একজন মার্কিন কবি মূল রবীন্দ্রনাথ পড়ার জন্য বাংলা শিখবেন এবং পড়ার পর রবীন্দ্রনাথের কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করবেন। বুদ্ধদেবের ভাষায়, ‘যখন রবীন্দ্রনাথের জন্য একজন রয় ক্যাম্বেল বা মাইকেল হ্যাম্বার্গার তৈরি হবেন, শুধু তখনই ঘটবে বহির্বিশ্বে তার পুনরাগমন; আর তা যতদিন না হবে ততদিন আমাদের বোধহয় নীরব থাকাই ভালো, কেননা রবীন্দ্রনাথ জগতে অজ্ঞাত থাকার জন্য যে-ক্ষতিটা হচ্ছে, সেটা জগতেরই, আমাদের নয়।’

সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুর অমর কীর্তি কবিতা পত্রিকা। পত্রিকার প্রথম সংখ্যা ভয়ে ভয়ে রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিলেন তিনি। এ-সম্পর্কে নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন –

… ভয় এজন্যে নয় যে আমাদের ক্ষুদ্র উপচার তাঁর পছন্দ হবে না – সেটা প্রায় প্রত্যাশিত বলা যায়, পাছে, তাঁর অসামান্য সৌজন্য ও কর্তব্যবোধের তাগিদে, তিনি লিখে পাঠান কোনো দায়সারা গোছের সার্টিফিকেট, অথবা তাঁর ঝুলি হাৎড়ে বের ক’রে দেন দু-চার লাইনের পদ্য-বিন্যাস …। কিন্তু আমাদের সব দ্বিধা উড়িয়ে দিয়ে দ্রুত এল তাঁর উত্তর – মস্ত একখানা তুলোট কাগজের এপিঠ-ওপিঠ ভর্তি সেই অনিন্দ্যসুন্দর হস্তাক্ষর, যার তুলনা আমি দেখেছিলাম বহুকাল পরে অক্সফোর্ডে এক প্রদর্শনীতে টেনিসন ও রবার্ট ব্রিজেসের পাণ্ডুলিপিতে, উপরন্তু এলো তাঁর আনকোরা নতুন লম্বামাপের গদ্য-কবিতা ‘ছুটি’ …। কবিতার দ্বিতীয় সংখ্যা শুরু হয়েছিল এই ‘ছুটি’ কবিতা দিয়েই …।

কবিতা পত্রিকায় ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় প্রকাশিত বাংলা কাব্য পরিচয় নিয়ে বুদ্ধদেব বসু বেশ সমালোচনামূলক কথাবার্তা বলেন। প্রেমের কবিতাবর্জিত, গদ্য কবিতারহিত পাঠ্যবইগন্ধী সেই সংকলনটি বুদ্ধদেবের পছন্দ হয়নি। শুধু তিনি নন, পাঠকরাও সেই সংকলনকে সাদরে গ্রহণ করেননি। সংকলনটিতে কবিতা নির্বাচনে রবীন্দ্রনাথ সবার প্রতি সুবিচার প্রদর্শন করেননি – সে-প্রসঙ্গে নিজের যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম, যতীন্দ্র সেনগুপ্ত, সুধীন্দ্রনাথ দত্তসহ অনেকের প্রতিনিধিত্বমূলক কবিতাকে সংকলনে অগ্রাহ্য করা হয়েছে বলে বুদ্ধদেব বসু অভিমত ব্যক্ত করেন। বিষ্ণু দে-র মতো কবির কবিতাকে বাদ দিয়ে বনফুল, সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়, সুকোমল বসু, হাসিরাশি দেবী, মৈত্রেয়ী দেবী প্রভৃতির কবিতাকে স্থান দেওয়া তাঁর কাছে ন্যায্য মনে হয়নি। জীবনানন্দের যে-কবিতাটি সংকলনের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল (মৃত্যুর আগে) সেটিকে কেটে-ছেঁটে প্রকাশ করা এবং এর অঙ্গহানিতে কবিতাটির কতটা ক্ষতি হয়েছে, এসব নিয়েও সমালোচনা করেন বুদ্ধদেব বসু। রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় বাংলা কাব্য পরিচয় পর্যবেক্ষণ করে আধুনিক কবিতার একটি সংকলন প্রকাশ করার ইচ্ছা তাঁর মনে জেগে ওঠে। এরই পরম্পরায় ১৯৪০ সালে প্রকাশিত আধুনিক বাংলা কবিতা। আবু সয়ীদ আইয়ুব ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল সংকলনটি। দুজন সম্পাদকের একজনও কবি ছিলেন না। সমবায় পদ্ধতি অনুসরণ করে বুদ্ধদেবের চাওয়া-পাওয়াকে কোণঠাসা করে যা ছাপা হলো তাতে বুদ্ধদেবের পুরো সায় ছিল না। জীবনানন্দের আরো উন্নত কবিতাগুলো স্থান দিতে না পারার বেদনা তাঁকে আহত করল। বইতে দুই সম্পাদক পরস্পরবিরোধী দুটি আলাদা সম্পাদকীয় লিখলেন। এই বই থেকে তিনি শিক্ষা নিলেন, যা করার একা করতে হবে। এর ফলে তাঁর সম্পাদনায় আধুনিক বাংলা কবিতা প্রকাশিত হয়।

ততদিনে বুদ্ধদেব বসুর নামের পাশে রবীন্দ্রবিরোধী বিশেষণ যুক্ত হয়ে গিয়েছে। ১৯৩৮ সালে নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের মুখপত্র প্রগতি পত্রিকায় আলোচনাসূত্রে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘The age that produced Rabindranath is over.’ অমৃতবাজার পত্রিকা তাঁর কথাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে লিখল, ‘The age of Rabindranath is over.’ ‘রবীন্দ্রবিরোধী’ বুদ্ধদেবকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘সময়হারা’ নামে একটি কবিতা – ‘খবর এল সময় আমার গেছে/ আমার গড়া পুতুল যারা বেচে।’

শনিবারের চিঠি তীব্র বিদ্রূপ বর্ষণ করলো। সঞ্জয় ভট্টাচার্য্যরে পূর্বাশা বুদ্ধদেবের লেখাটিকে ‘সংস্কারাচ্ছন্ন একজন পেটি বুর্জোয়া লেখকের বুর্জোয়া জীবনের স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়’ বলে মন্তব্য করলো। তাঁর নামের সঙ্গে রবীন্দ্রবিরোধী বিশেষণ যুক্ত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও এর কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখালেন না বুদ্ধদেব বসু। অপেক্ষা করছিলেন বড় কোনো উপলক্ষের।

সিলেটের করিমগঞ্জে তৈরি হলো সেটি। করিমগঞ্জে একটি সাহিত্য-সভায় অংশ নিয়েছিলেন বুদ্ধদেব। একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ পড়েন সেখানে। কলকাতায় ফিরে প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘আধুনিক বাংলা ভাষা রবীন্দ্রনাথই সৃষ্টি করেছেন।’ অনেক পরে এ-প্রসঙ্গে সেই সময়ের অনুভূতি নিয়ে আত্মজীবনীতে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, ‘তিনি কী জানতেন না, ঘোষণাকারীর (বুদ্ধদেবের) এক দণ্ড রবীন্দ্রনাথ বিনা চলে না?’ কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত ১৯৪০-৪১ সালে রবীন্দ্র-রচনাবলীর প্রথম খণ্ড নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর অসামান্য দীর্ঘ সমালোচনার কথাও স্মরণীয়। বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন – ‘তিনি আমাদের আদি ও আধুনিকতম কবি, তিনিই প্রথম, তিনিই শ্রেষ্ঠ সম্পদ।’

কবিতা পত্রিকায় নিয়মিত রবীন্দ্রসাহিত্য সম্পর্কে আলোচনা করেছেন বুদ্ধদেব। রবীন্দ্র রচনাবলীর একটি-একটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে, কবিতা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তাঁর দীর্ঘ প্রবন্ধ।

তৃতীয় খণ্ডে ‘চোখের বালি’র সমালোচনা করলেন তীব্রভাবে। তাঁর মতে, যে-সাহস নিয়ে রবীন্দ্রনাথ উপন্যাসটি শুরু করেছিলেন, শেষ মুহূর্তে তা ত্যাগ করেছিলেন, তাই হিন্দু বিধবার বিবাহ করানোর সাহস তাঁর হয়নি। রবীন্দ্রনাথ এ-সমালোচনা গ্রহণ করেছিলেন। চিঠি লিখে জানিয়েছেন, মাসিকপত্রের সস্তা দামের মনোরঞ্জনী প্রলেপ ব্যবহারের ঝোঁক থেকে অনেক সময় একটা ঝোঁক চলে আসে। তাই এমন বিপত্তি ঘটে, যেটি ‘চোখের বালি’তে বিনোদিনীর ক্ষেত্রে ঘটেছিল। ১৩৩৮-এর আষাঢ় সংখ্যা কবিতায় বুদ্ধদেব লিখেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘজীবন আমাদের সৌভাগ্য, পৃথিবীর সৌভাগ্য। কথাটা ফাঁকা স্তুতি নয়। এর তাৎপর্য এই যে, তিনি জীবনের প্রতিদিন বেড়েছেন, এখনো বাড়ছেন। পঞ্চাশ বছরে তাঁর জীবন শেষ হলে তিনি এত বড় হতেন না, ষাট সত্তরে হলেও না। গত দশ বছরেই কি তিনি কম নতুন উপঢৌকন দিয়েছেন তাঁর দেশকে, এই জগৎকে। যেমন বিচিত্র তেমনি মহামূল্য

সে-সব উপহার। এখন তাঁর জীর্ণ, কিন্তু মন অক্লান্ত, বুদ্ধি বিশ্রামবিমুখ। গান্ধিজির কথা যদি সফল হয়, যদি তিনি শতজীবী হন তাহলে আরো অনেক জিনিস তাঁর কাছ থেকে পাবো তাতে সন্দেহ নেই। তা-ই যেন হয়।’

রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় তাঁকে উপলক্ষ করে বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা ‘রবীন্দ্রসংখ্যা’ প্রকাশ করেছে। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে কবিতা পত্রিকার ‘রবীন্দ্রসংখ্যা’। রবীন্দ্রনাথের আশি বছর পূর্তি উপলক্ষে ২৫শে বৈশাখ ১৩৪৮, ৮ই মে ১৯৪১ তারিখে এটি প্রকাশিত হয়। বুদ্ধদেব বসুর সম্পাদনায় এ-সংখ্যাটির লেখক তালিকা ছিল চোখ ধাঁধানো – অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, অতুলচন্দ্র গুপ্ত, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন রায়, যামিনী রায়, প্রমথনাথ বিশী, অমিয় চক্রবর্তী, অন্নদাশঙ্কর রায়, হুমায়ুন কবির, বিমলাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, জ্যোতির্ম্ময় রায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, অজিত দত্ত, প্রভু গুহঠাকুরতা, হিমাংশুকুমার দত্ত, সুধীরচন্দ্র কর, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এবং বুদ্ধদেব বসু। 

কবিতার রবীন্দ্র অর্ঘ্যে সবচেয়ে মূল্যবান পুষ্প অর্পণ করেছেন স্বয়ং সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু। তিনি লিখেছেন –

আসলে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বিরাট কবিপ্রতিভা ও গীতপ্রতিভার যে অদ্ভুত মিলন হয়েছে, এ মিলনই বোধ হয় এর আগে কোনো মানুষে কখনো হয়নি। এত বড়ো কবি গান গেয়েছেন কবে, আর কোন দিগি¦জয়ী কবিপ্রতিভা গান বাঁধবার নেশায় ক্ষেপেছে! এ দুয়ের সম্মিলন হয়েছে, এমন আর যে ক’জনের কথা মনে করা যায়, সকলেই ছোটো কবি। গানে তাই রবীন্দ্রনাথ রাজা, এ তার এমন সৃষ্টি যেখানে কোনো প্রতিযোগী নেই। কবিতায়, গল্পে উপন্যাসে, নাটকে প্রবন্ধে সমালোচনায় তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকদের একজন। নানা দিক দিয়ে তার তুল্য অনেকেই; গানে তার মতো কেউ নেই। গান তার সবচেয়ে বড়ো, সবচেয়ে ব্যক্তিগত ও বিশিষ্ট সৃষ্টি; সমগ্র রবীন্দ্র-রচনাবলীর মধ্যে গানগুলি সবচেয়ে রাবীন্দ্রিক।

‘রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ ও গদ্যশিল্প’ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব লিখেছিলেন –

রবীন্দ্রনাথ গদ্য লিখেছেন কবির মতো; তাঁর গদ্যের গুণ কবিতারই গুণ; যা কবিতা আমাদের দিতে পারে, তা-ই তাঁর গদ্যের উপঢৌকন। যদি কোনো খণ্ড প্রলয়ে তাঁর সব কবিতার বই লুপ্ত হয়ে যায়, থাকে শুধু নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ, তাহলে সেই প্রবন্ধ নাটক উপন্যাস থেকেই ভাবীকালের পাঠক বুঝে নিতে পারবে যে রবীন্দ্রনাথ এক মহাকবির নাম।

কবিতা ও কথাসাহিত্যের বাইরে রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ নিয়ে অসাধারণ বিশ্লেষণ করেছেন বুদ্ধদেব বসু।

য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র ও পঞ্চভূত-এর আলোচনায় গদ্যশৈলীর প্রশংসা করেছেন। আত্মশক্তি বইয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করেন একজন অসাধারণ সমাজচিন্তক হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ যে রাষ্ট্রের চেয়ে সমাজকে বেশি গুরুত্ব দিতেন – এ-ভাবনাকে আধুনিক বলে মনে হয়েছে বুদ্ধদেবের। কবি রবীন্দ্রনাথ, ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথ, প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ – এভাবে বিভাজন করলেও বুদ্ধদেব বসু দেখিয়েছেন, প্রতিটি বিভাগ পরস্পরের মধ্যে প্রবিষ্ট। পরস্পরের উদ্দীপক পরিপূরক এবং এক অখণ্ড সত্তার প্রতিরূপ।

জাপান ভ্রমণে গিয়ে এক সংবেদনশীল মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করেছেন বুদ্ধদেব বসু। তাঁর চেতনায় দেশের চেয়ে বড় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ‘জাপান ও হনলুলু’ রচনায় তিনি লিখেছেন :

দেশপ্রেম বা রবীন্দ্রভক্তি কোনোটাই আমার পেশা নয়, কিন্তু হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে জাপানি ছেলেমেয়েদের মুখে ‘জনগণমন’ গান শুনে আমি ঈষৎ বিচলিত না-হয়ে পারলুম না – তার কারণ বোধহয় ভারতবর্ষ যতটা, তার চেয়ে বেশি রবীন্দ্রনাথ।

বুদ্ধদেব বসুর যেদিন ফুটল কমল বইটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে একটি চিঠি পাঠান ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মাধ্যমে। বইটি সম্পর্কে নিজের ভালো লাগার কথা জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। চিঠির উত্তরে বুদ্ধদেব লিখেছিলেন –

আমার কাছে – প্রত্যেক আধুনিক বাঙালি লেখকের কাছে – কিন্তু বিশেষ ক’রে আমার কাছে আপনি দেবতার মতো। আপনার কাছ থেকে আমি ভাষা পেয়েছি। সে-ভাষা আপনার পছন্দ হয় না। আমারই দুর্বলতা, অক্ষমতা। উৎসস্নাত স্বচ্ছ, বিশুদ্ধ – আমি কি তাকে ঘোলাটে করে তুলি বেসামাল ইংরেজি শিক্ষা দিয়ে? কিন্তু তর্ক করবো না, শুধু এই সুযোগ গ্রহণ করছি আপনাকে আমার অন্তরের গভীরতম ধন্যবাদ জানাবার – আপনি আমাকে ভাষা দিয়েছেন বলে।

বুদ্ধদেব বসুর তিথিডোর বাংলা সাহিত্যের একমাত্র উপন্যাস যেখানে বাইশে শ্রাবণের অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ছবি আঁকা হয়েছে। বাইশে শ্রাবণ অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণের অতুলনীয় বর্ণনার জন্য বুদ্ধদেব বসুর তিথিডোর উপন্যাসটি স্মরণীয় –

… স্বাতী দেখলো ভিড়ের এক আশ্চর্য আলোড়ন, এসপ্লানেডের পক্ষেও আশ্চর্য। স্যুটপরা আপিশ চাকুরে, কালোকোর্তা উকিল, ছাতাহাতে আধবুড়ো বাবুরা, ছিপছিপে ছোকরাকেরানি, ইংরেজ, চিন … সব দিক থেকে সব দিকে আসা-যাওয়া করছে সকলে, কিন্তু কোথায় যাচ্ছে ঠিক যেন জানে না, একটু-যেন দিশেহারা … লক্ষ্যের নিশ্চয়তা আজ হারিয়ে ফেলেছে সবাই আর সেইজন্যই আশ্চর্য, অদ্ভুত এই ভিড়।

… কেউ কাগজ পড়ছে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে, আর তার ঘাড়ের উপর দিয়ে গলা বাড়িয়েছে আরো দু-তিনজন। এইমাত্র পৌঁছলো কাগজের স্পেশল, হাতে-হাতে উজোড় হ’য়ে যাচ্ছে।

সত্যেন, স্বাতীর পিছন ব’সে, হাত বাড়িয়ে কাগজ কিনলো। … তার পাশে ব’সে ছিলো যে-বছর পনেরোর মেয়েটি, অনুমতি না-নিয়েই সেটা হাতে নিলো, তার চোখ নড়তে লাগলো উপর থেকে নিচে, আর সেই চোখ থেকে টপটপ ক’রে জল পড়তে লাগলো কালো-কথা-ছাপানো কাগজটার উপর, ছাপাখানার কাঁচা কালি মুছে-মুছে দিয়ে।

সব পেয়েছির-দেশে বুদ্ধদেবের শান্তিনিকেতন ভ্রমণ সংক্রান্ত বই। ভ্রমণকে ছাপিয়ে এখানে বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর কালোত্তীর্ণ সৃষ্টি শান্তিনিকেতন। চেনা রবীন্দ্রনাথের গণ্ডির বাইরে গিয়ে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশিষ্টতা আবিষ্কার এ-বইয়ের উজ্জ্বলতম বৈশিষ্ট্য। শুধু তা-ই নয়, কেন শান্তিনিকেতন ‘ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী’ – এর চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। সম্ভবত স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও শান্তিনিকেতনের গুরুত্ব সম্পর্কে এত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না যতটা ছিলেন বুদ্ধদেব। ভারতীয় সংস্কৃতির মূল্যবান সব উপকরণের সঙ্গে নবীন ইউরোপের প্রাণপ্রাচুর্যের মেলবন্ধন শান্তিনিকেতনকে অনন্যতা দান করেছে :

কলকাতার জীবনে বাঁধা সময়ে বাঁধা কাজের অবিরাম উৎকণ্ঠার পরে, সাহিত্যিক বাক্বিতণ্ডার, সামাজিক

আচার-ব্যবহারের অফুরন্ত স্নায়ুবিক টানা-হেঁচড়ার পরে, জীবিকা-অর্জনের ঘৃণ্যতা আর জীবন-রচনায় পদে-পদে ব্যর্থতার পরে শান্তিনিকেতনে এসে কী যে ভালো লাগলো। মনে হলো মুক্তি পেলাম, জীবনকে ফিরে পেলাম। তর্ক নেই, উত্তেজনা নেই, মনস্তাপহীন কর্মক্ষেত্রের রক্তশোষক নিপীড়ন নেই অথচ কর্মজগতের জাগ্রত সচেতন মনোভাব আছে। … শান্তিনিকেতনে দেখা যায় জীবনশিল্পের বাস্তবিক প্রয়োগ, এবং সে-শিল্প আমরা অচেতন মনেও নিজের বলে চিনতে পারি। কী-ভাবে বাঁচবো কী-নিয়ে বাঁচবো – এ-সব প্রশ্নের একদিককার উত্তর আছে এখানে, যাঁদের মন অনুরূপ সুরে বাঁধা তাঁরা সহজেই গ্রহণ করতে পারবেন।

মাত্র কয়েকটি বাক্যে শান্তিনিকেতনের এমন নিখুঁত চিত্র আর কে আঁকতে পেরেছেন? শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি, ভবনবিন্যাস, রবীন্দ্রনাথের আতিথেয়তা, বিচিত্র উদ্ভিদ ও প্রাণীর বর্ণিল লীলা, রবীন্দ্রনাথের নিকটাত্মীয়দের বিচরণ নানা উপকরণে সমৃদ্ধ এ-বৃত্তান্ত। অতিথিপরায়ণতার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের আশ্চর্য পরিমিতিবোধ আমাদের মুগ্ধ না করে পারে না। অতিথিকে প্রকৃত সমাদর করতে গেলে যে তাকে যথেষ্ট নির্জনতা ও অবকাশ দিতে হয়, তাকে স্বাধীনতা দিতে হয় – এটি আমরা সচরাচর মনে রাখি না, রবীন্দ্রনাথ তা মনে রেখেছেন। ব্যক্তি ও শিল্পী রবীন্দ্রনাথের অনুপম ব্যক্তিত্ব সহজেই প্রস্ফুটিত হয়েছে বুদ্ধদেবের তেরোদিনের শান্তিনিকেতন বাসে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বের দুর্লভ রবীন্দ্রসান্নিধ্য এক অমূল্য সঞ্চয় হিসেবে দেখা দিয়েছে এ-কাহিনিতে –

আমরা সবাই জানি যে রবীন্দ্রনাথ অসামান্য সুপুরুষ, কিন্তু তাঁর রূপ রূপের চেয়ে কিছু বেশি কিংবা তা জাগতিক অর্থে রূপই নয়, তা নন্দনতত্ত্বের রূপ। … তিনি কুৎসিত হলেও এ-সৌন্দর্যের কোনো ক্ষতি হতো না, কারণ বেশে বচনে ব্যবহারে, জীবনযাত্রার প্রতি ক্ষুদ্র ভঙ্গিতে, প্রতি সূক্ষ্ম ইঙ্গিতে তিনি শিল্পী ও স্রষ্টা, এমন পরিপূর্ণরূপে শিল্পী জগতের আর কোনো বড়ো শিল্পীই বোধহয় ছিলেন না। … সমস্ত জীবনটিই তাঁর শিল্পকর্ম; শিল্প ও জীবনকে তিনি বিচ্ছিন্ন করে রাখেননি, এক অপূর্ব রসায়নে দুইকে মিশিয়েছেন, শিল্প দিয়ে জীবনকে ফুটিয়েছেন, জীবন দিয়ে শিল্পকে ফলিয়েছেন।

জীবনশিল্পী রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এমন অপূর্ব বিশ্লেষণ আর কীভাবে হতে পারে? শুধু শিল্পী রবীন্দ্রনাথ নয়, ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের প্রতিও বুদ্ধদেবের অতুলনীয় শ্রদ্ধা প্রকাশিত হয়েছে এ-বইয়ে – ‘কবি বলে তাঁকে ভালোবেসেছি চিরকাল, গুরু ব’লে তাঁকে মেনেছি, তাঁর মধ্যে পেয়েছি জীবনের ভিত্তি, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর যে-স্নেহস্পর্শ এবার পেলাম তার স্মৃতি মন থেকে মিলোবে না যতদিন বেঁচে আছি।’

বুদ্ধদেব বসু তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এ-অঙ্গীকার রক্ষা করেছিলেন।