বুদ্ধির মুক্তির ইতিহাস পুনরাবিষ্কার : শিখা প্রতিলিপি- সংকলন

শিখা : বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের মুখপত্র

সংকলন-সম্পাদনা-ভূমিকা : আবুল আহসান চৌধুরী

পাঠক সমাবেশ – ঢাকা, ২০২৫ – ১৯৯৫ টাকা

বাংলা মুসলিম সমাজের নবজাগরণ,

আধুনিকতা-চেতনা এবং মুক্তবুদ্ধির বিকাশের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে শিখা একটি অনিবার্য নাম। বিশ শতকের বিশের দশকে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত এই সাময়িকী শুধু একটি সাহিত্যপত্রিকা ছিল না; এটি ছিল চিন্তার স্বাধীনতা, যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ ও আধুনিকতার এক বলিষ্ঠ উচ্চারণ। দীর্ঘকাল ধরে বিচ্ছিন্ন ও দুর্লভ অবস্থায় থাকা শিখার মোট প্রকাশিত পাঁচ খণ্ড সংগ্রহ করে এগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রতিলিপি-সংকলন সম্পাদনা ও প্রকাশ করে গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী বাংলা বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসচর্চায় অসামান্য অবদান রেখেছেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ সাময়িকপত্র সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেছে কিংবা গবেষকদের নাগালের বাইরে চলে গেছে কিংবা অংশত বেঁচে আছে। আবুল আহসান চৌধুরী গভীর নিষ্ঠায় দীর্ঘ অনুসন্ধানে পত্রিকার সকল সংখ্যা সংগ্রহ করেছেন। আর কারো আছে এরকম অক্ষত সকল সংখ্যা নেই বলেই জানি। ফলে এর প্রতিলিপি-সংকলন শুধু একটি গ্রন্থপ্রকাশ নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক সাহিত্যিক দলিলের পুনরাবিষ্কার হিসেবে সম্মান পাওয়ার যোগ্য। এই সংকলনের মাধ্যমে পাঠক একদিকে যেমন শিখার পূর্ণাঙ্গ পাঠের সুযোগ পাচ্ছেন, অন্যদিকে তৎকালীন মুসলিম সমাজের চিন্তা-জগৎ, মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব, সাহিত্যিক অভিরুচি এবং সামাজিক সংস্কারচেতনারও প্রত্যক্ষ পরিচয় লাভ করছেন।

মুক্তচিন্তার অবস্থান ছিল শিখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। সে-সময়ের মুসলিম সমাজে ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক কুসংস্কার এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে যে-কটি শক্তিশালী কণ্ঠ উচ্চারিত হয়েছিল, শিখা তাদের অন্যতম। কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল হুসেন, আবদুল কাদির, কাজী আনোয়ারুল কাদির প্রমুখ লেখক এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে এক নতুন চিন্তার জগৎ নির্মাণ করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট – মুক্ত বুদ্ধি ছাড়া কোনো জাতির উন্নতি সম্ভবপর নয়। এই অবস্থানই শিখাকে সেই সময়ের অন্যান্য সাহিত্যপত্রিকা থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।

সংকলনের একটি বড় শক্তি হলো এর দলিলমূল্য। এখানে কেবল সাহিত্যরচনা নয়, প্রবন্ধ, সম্পাদকীয়, মতবিনিময়, সমালোচনা এবং সামাজিক প্রশ্নাবলি সম্পর্কিত লেখাও স্থান পেয়েছে। শিখা গোষ্ঠী আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলন ও

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিবরণ এতে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে পাঠক বুঝতে পারেন, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্ন সাহিত্যিক উদ্যোগ ছিল না; এটি ছিল সামগ্রিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের একটি কর্মসূচি। ধর্ম, শিক্ষা, ভাষা, নারী-অধিকার, সমাজসংস্কার, জাতীয়তা ও আধুনিকতার প্রশ্নে আন্দোলনের কর্মীরা যে যুক্তিনির্ভর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, এর প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য সংকলনের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে। সেটি বর্তমান পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন আবুল আহসান চৌধুরী। এটি কেবল একজন গবেষকের কাজ নয়, একজন দেশহিতৈষী সমাজকর্মীরও দায়পূরণের স্মারক হিসেবে গণ্য হবে।

তিনি শুধু প্রতিলিপি প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত, ব্যাখ্যা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সংযোজনের মাধ্যমে পাঠকের জন্য একটি সুসংহত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর নির্মাণ করেছেন। ফলে উল্লিখিত সংকলনটি শুধু পাঠের উপকরণ নয়, গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়েছে। তাঁর এই দায়িত্বশীল ও গভীর সম্পাদনা-চর্চা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। এই সংকলনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, সম্পাদক রচিত প্রায় ৪৮ পৃষ্ঠাব্যাপী দীর্ঘ ভূমিকা। এটি সাধারণ সম্পাদকীয় বক্তব্যের সীমা অতিক্রম করে শিখা পত্রিকা, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব, মতাদর্শ এবং তৎকালীন সমাজ-সংস্কৃতির একটি সুসংগঠিত গবেষণাধর্মী দলিল হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। এই ভূমিকা মূল গ্রন্থে প্রবেশের জন্য পাঠককে প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপটগত প্রস্তুতি দেয় এবং সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা অনুধাবনে সহায়তা করে। বিশেষত নবীন গবেষকদের জন্য এটি একটি নির্ভরযোগ্য নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে। ফলে সংকলনটির মূল্য শুধু প্রতিলিপি সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এই সম্পাদকীয় ভূমিকার মাধ্যমে এটি বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস ও চিন্তাচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য আকরগ্রন্থে পরিণত হয়।

সংকলনটি পাঠ করতে গিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপলব্ধি করা যায়। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনকে অনেক সময় একরৈখিকভাবে প্রগতিশীল আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু শিখার নিবিড় পাঠে দেখা যায়, আন্দোলনের ভেতরেও নানা ধরনের দ্বিধা, মতপার্থক্য এবং সীমাবদ্ধতা ছিল। আধুনিকতার প্রশ্নে তাঁরা যেমন সাহসী ছিলেন, তেমনি কিছু বিষয়ে তাঁদের অবস্থান ছিল সময়ের বাস্তবতা দ্বারা সীমাবদ্ধ। এই জটিলতাগুলোও সংকলনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে সংকলনগ্রন্থটি কেবল আন্দোলনের গৌরবগাথা নয়; বরং তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ও সীমাবদ্ধতাও বুঝতে সহায়তা করে।

রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র কিংবা কল্লোল-আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলেও মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের আধুনিকতা-অভিযাত্রার দলিল হিসেবে শিখা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়েছে। মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, খোন্দকার সিরাজুল ইসলাম, আবদুল মান্নান সৈয়দ, হাবিব রহমান মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও শিখা নিয়ে কিছু কাজ করলেও তা পূর্ণাঙ্গ ছিল না। এই সংকলন সেই শূন্যতা পূরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। বিশেষত যাঁরা বাংলা মুসলিম সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস, নবজাগরণ, আধুনিকতা কিংবা সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ নিয়ে জানতে চান, কিংবা গবেষণা করতে চান, তাঁদের জন্য এটি অপরিহার্য গ্রন্থ। এর আগে শিখার পাঁচটি সংখ্যা একত্রে দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। আবুল আহসান চৌধুরী সেই সুযোগ তৈরি করে দিলেন। এটি জাতির জন্য একটি বড় দায়িত্বশীল কাজ।

সংকলনের আরেকটি তাৎপর্য হলো এর সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা। আজকের বিশ্বেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, যুক্তিবাদ, সহনশীলতা এবং মুক্তচিন্তার প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শতবর্ষ আগে শিখার লেখকেরা যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তার অনেকগুলি আজো প্রাসঙ্গিক। অন্ধ অনুকরণ, সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা এবং চিন্তার অবরুদ্ধতার বিরুদ্ধে তাঁদের অবস্থান আজকের পাঠককেও নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবে।

সম্পাদনার ক্ষেত্রে আরো কিছু পরিশিষ্ট, টীকা কিংবা লেখক-পরিচিতি সংযোজিত হলে গ্রন্থটির গবেষণামূল্য আরো বৃদ্ধি পেত। বিশেষ করে তরুণ পাঠকদের জন্য আন্দোলনের প্রধান ব্যক্তিত্বদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় এবং ঘটনাপঞ্জি সংযোজন উপকারী হতে পারত। তা সত্ত্বেও সংকলনগ্রন্থটির সামগ্রিক গুরুত্ব ও মূল্য কোনোভাবেই কমে না। আবুল আহসান যে ভিত্তি নির্মাণ করে দিলেন, তার ওপরে বহুতলীয় সৌধ নির্মাণ সহজ হতে পারে।

আবুল আহসান চৌধুরী তাঁর দীর্ঘ গবেষণাজীবনের অভিজ্ঞতা ও নিষ্ঠা দিয়ে যে কাজটি সম্পন্ন করেছেন, তা ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য এক দৃঢ় ভিত্তি নির্মাণ করেছে। মুক্তবুদ্ধির ইতিহাস, বাংলা মুসলিম সমাজের আধুনিকতার অভিযাত্রা এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির বিবর্তন বুঝতে এই সংকলনের গুরুত্ব অপরিসীম।

শিখা প্রতিলিপি-সংকলনটি আরজ আলী মাতুব্বর, আবদুল হক, আহমদ শরীফ, আহমদ রফিক, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রতি উৎসর্গ করা হয়েছে। এটি নিছক আনুষ্ঠানিক উৎসর্গ নয়; বরং একটি সুস্পষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান ও ঐতিহ্যের স্বীকৃতি। উৎসর্গপত্রে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ সময়ে এই আদর্শের ধারক ও বাহক হিসেবে পরিচিত। আবুল আহসান চৌধুরী বলতে চেয়েছেন – শিখার যে আলোকধারা ১৯২০-এর দশকে শুরু হয়েছিল, তার উত্তরসূরি এই ব্যক্তিত্বরা। উৎসর্গে উল্লিখিত ব্যক্তিদের জীবন ও কর্ম লক্ষ করলে দেখা যায়, তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের মানুষ হলেও একটি অভিন্ন সূত্রে যুক্ত।

আরজ আলী মাতুব্বর গ্রামীণ সমাজ থেকে উঠে এসে যুক্তিবাদী প্রশ্নচর্চার নজির স্থাপন করেছেন।

আবদুল হক ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে মুক্তচিন্তার পরিচয় দিয়েছেন।

আহমদ শরীফ ছিলেন মধ্যযুগ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজ বিষয়ে নির্ভীক বিশ্লেষক।

আহমদ রফিক ইতিহাস, ভাষা-আন্দোলন ও জাতীয় সংস্কৃতি নিয়ে নিরলস কাজ করেছেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সমাজ, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি বিষয়ে মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করেছেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক সাহিত্য ও সংস্কৃতির সামাজিক পাঠ নির্মাণ করেছেন।

ফলে এই উৎসর্গ একটি ধারাবাহিক বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকারের মানচিত্রও নির্মাণ করে। শিখা পত্রিকার প্রকাশকাল থেকেই এর লেখকেরা ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে ছিলেন। উৎসর্গপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রায় সকলেই জীবনের বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও বুদ্ধিবিরোধী প্রবণতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাই এই উৎসর্গের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বার্তাও নিহিত রয়েছে। উল্লিখিত ব্যক্তিদের কেউই কেবল সাহিত্যিক নন; তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন প্রশ্নকারী মানুষ। তাঁরা প্রতিষ্ঠিত মতকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন, নতুন ভাবনার পথ খুলেছেন। শিখার মূল চেতনাও ছিল প্রশ্ন করার অধিকার। এদিক থেকে উৎসর্গটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটিকে সম্পাদক আবুল আহসান চৌধুরীর ব্যক্তিগত ঋণস্বীকারও বলা যায়। তাঁর গবেষণা, প্রবন্ধচর্চা ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এই চিন্তাবিদদের ভাবধারার গভীর সাযুজ্য রয়েছে। তাই তাঁদের প্রতি উৎসর্গ মানে কেবল শ্রদ্ধা জ্ঞাপন নয়, নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানও স্পষ্ট করে দেওয়া।

উল্লিখিত উৎসর্গপত্রটি আসলে শিখা পত্রিকার ঐতিহাসিক চেতনাকে বিশ শতকের শেষভাগ ও একবিংশ শতকের বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধির ধারার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি একটি প্রতীকী ঘোষণা – বুদ্ধির মুক্তির যে শিখা একদা কাজী আবদুল ওদুদদের হাতে প্রজ্বলিত হয়েছিল, তার আলো পরবর্তী প্রজন্মে বহন করেছেন আরজ আলী মাতুব্বর, আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ চিন্তাবিদ; আর সেই ধারাবাহিকতাকেই এই উৎসর্গ স্মরণীয় করে রেখেছে।

শিখার সকল সংখ্যার প্রতিলিপি-সংকলনের অন্যতম বড় অর্জন হলো, এর মাধ্যমে পাঠক প্রায় মূল পত্রিকাটি হাতে নিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেন। প্রতিলিপি-সংকলনে মূল সংখ্যাগুলোর বিন্যাস, ভাষা, বানানরীতি, রচনাক্রম, বিজ্ঞাপন, সম্পাদকীয় বিন্যাস এবং সামগ্রিক প্রকাশরূপ আগাগোড়াই অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। ফলে পাঠক শুধু লেখাগুলোর বিষয়বস্তুই নয়, বরং বিশের দশকের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ, ভাষার ব্যবহার, চিন্তার প্রবণতা এবং সাময়িকপত্র সংস্কৃতির স্বরূপও প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। গবেষকদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মূল কপিগুলো বর্তমানে দুর্লভ এবং সাধারণ পাঠকের নাগালের বাইরে। এই সংকলন সেই দুর্লভ উপকরণকে সহজলভ্য করেছে। ফলে শিখার মূল সংখ্যাগুলো পাঠের যে ঐতিহাসিক ও নান্দনিক স্বাদ, এর অনেকখানিই এই প্রতিলিপি-সংকলনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হয়।

শিখা প্রতিলিপি-সংকলনের পরিশিষ্ট অংশটি মূল গ্রন্থের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও ঐতিহাসিক সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এখানে শুধু পত্রিকার বিভিন্ন বর্ষের বিজ্ঞাপন বা সংখ্যা-তালিকা সংরক্ষিত হয়নি; বরং এর মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর কার্যক্রম, সংগঠন-পরিকাঠামো এবং মতাদর্শিক তৎপরতার একটি সমগ্রচিত্র উন্মোচিত হয়েছে। সভার কার্যবিবরণী, বার্ষিক সভার কার্যসূচি এবং বিভিন্ন ঘোষণাপত্রের প্রতিলিপি পাঠককে আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ গঠন ও গতিশীলতা বোঝার সুযোগ করে দেয়।

বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো আবুল হুসেনকে ঘিরে থাকা দলিলসমূহ – ক্ষমাপত্র, ঘোষণাপত্র এবং বিদায়-শ্রদ্ধাঞ্জলি – যা তৎকালীন মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব, সংস্কারবাদী চিন্তা এবং সামাজিক প্রতিরোধের বাস্তব ইতিহাস তুলে ধরে। এগুলো শুধু তথ্য নয়, বরং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের দলিল। আবুল হুসেনের ক্ষমাপত্র বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দলিল। এতে তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থান, সামাজিক চাপ এবং তৎকালীন ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বিতর্কের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়। ক্ষমাপত্রটি কেবল ব্যক্তিগত অনুশোচনার প্রকাশ নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আত্মরক্ষামূলক বক্তব্য হিসেবেও পাঠযোগ্য। শিখা সংকলনের পরিশিষ্টে এর অন্তর্ভুক্তি পাঠককে সেই সময়ের মতাদর্শিক উত্তেজনা ও সংকটকে সরাসরি অনুধাবনের সুযোগ দেয়। ফলে দলিলটি ইতিহাসের একটি জীবন্ত সাক্ষ্য হয়ে ওঠে, যা আবুল হুসেনের চিন্তাজগৎ এবং আন্দোলনের ভেতরের টানাপড়েন উভয়কেই উন্মোচিত করে। এছাড়া সৈয়দ ইমামুল হোসেনের চিঠি এবং সম্পাদকদের আলোকচিত্র সংযোজন পরিশিষ্টকে মানবিক ও ব্যক্তিগত মাত্রা প্রদান করেছে। এতে আন্দোলনের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণকারীদের মুখাবয়ব ও সম্পর্কের আবহ স্পষ্ট হয়। ফলে এই পরিশিষ্ট অংশটি কেবল সহায়ক তথ্যসংগ্রহ নয়, বরং শিখা ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসকে জীবন্ত ও প্রামাণ্য রূপে পুনর্গঠনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

পরিশিষ্টে সংকলিত দুষ্প্রাপ্য দলিলসমূহ সংগ্রহ ও সংরক্ষণে আবুল আহসান চৌধুরীর কৃতিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয়। তিনি কেবল একটি পত্রিকার পুনর্মুদ্রণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসকে পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রাসঙ্গিক উপাদান অনুসন্ধান করে একত্রিত করেছেন। শিখার মূল সংখ্যাগুলোর পাশাপাশি নওরোজ ও জাগরণ পত্রিকায় প্র্রকাশিত বিজ্ঞাপন, মুসলিম সাহিত্য সমাজের বিভিন্ন সভার কার্যবিবরণী, বার্ষিক সভার কার্যসূচি, আবুল হুসেনকে প্রদত্ত ক্ষমাপত্র, বিদায়-শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং অন্যান্য দলিল একত্র করে তিনি একটি সমন্বিত ইতিহাস-আধার তৈরি করেছেন। এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, হারিয়ে যেতে বসা ও প্রায় অপ্রাপ্য ঐতিহাসিক উপকরণকে গবেষণার উপযোগী করে তোলা। এসব দলিল শুধু তথ্য নয়; বরং একটি যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বন্দ্ব, সংস্কার আন্দোলন, সাহিত্যচিন্তা এবং সামাজিক পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে। আবুল আহসান চৌধুরী অত্যন্ত যত্নসহকারে এসব উপকরণ যাচাই-বাছাই ও বিন্যাস করেছেন, এতে পাঠক ও গবেষক সহজে সেই সময়ের চিন্তাজগতে প্রবেশ করতে পারেন।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো তাঁর দলিল নির্বাচন-দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে তিনি শুধু প্রতিষ্ঠিত বা প্রচলিত উৎস নয়, বরং প্রান্তিক ও প্রায় বিস্মৃত দলিলগুলোকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে এই সংকলন ইতিহাস পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একটি নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য উৎসে পরিণত হয়েছে। তাঁর এই শ্রমসাধ্য গবেষণা ও সম্পাদনা-প্রচেষ্টা বাংলা সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসচর্চায় এক অনন্য

সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে শিখা কেবল একটি পত্রিকা নয়, বরং একটি আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ দলিলরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

বাংলাদেশে সংকলন ও সম্পাদনা-চর্চার ক্ষেত্রে আবুল আহসান চৌধুরী একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি শুধু সাহিত্য পাঠের পুনর্গঠক নন, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের দলিল উদ্ধার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক নিরলস গবেষক। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থসমূহে আমরা দেখি হারিয়ে যাওয়া বা বিস্মৃতপ্রায় সাহিত্য-ইতিহাসকে প্রামাণ্য ভিত্তিতে পুনর্গঠনের এক গভীর প্রয়াস। শিখা পত্রিকার পাঁচ খণ্ডের প্রতিলিপি-সংকলন তাঁর এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন।

বাংলাদেশে সংকলন-সম্পাদনার প্রচলিত প্রবণতা সাধারণত নির্বাচিত লেখা বা সাহিত্যিক জীবনীকেন্দ্রিক থাকে। কিন্তু আবুল আহসান চৌধুরী এই সীমাকে অতিক্রম করে দলিলনির্ভর ইতিহাস নির্মাণে মনোনিবেশ করেছেন। তিনি শুধু পাঠযোগ্যতা নয়, বরং প্রামাণিকতা, প্রেক্ষাপট এবং ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে তাঁর কাজ গবেষকদের জন্য সহায়ক গ্রন্থমাত্র নয়, বরং প্রাথমিক উৎসের মর্যাদা লাভ করে।

বর্তমান শিখা সংকলনগ্রন্থটির স্বাতন্ত্র্য এখানেই, এটি শুধু একটি সাহিত্য-পত্রিকার পুনর্মুদ্রণ নয়; বরং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ দলিল-সংগ্রহ। বহুমাত্রিক সংযোজন-সংকলন গ্রন্থটিকে একাধারে সাহিত্য, ইতিহাস ও সমাজচিন্তার সংকর দলিলে পরিণত করেছে।

পরিশিষ্ট অংশে সংযোজিত বিরল দলিলসমূহ গ্রন্থটির গবেষণামূলক গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়েছে। এতে শিখা কেবল পাঠ্য নয়, বরং পাঠ-অন্বেষণের এক বিস্তৃত ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তাই বলা যায়, আবুল আহসান চৌধুরীর এই সংকলন-সম্পাদনা বাংলাদেশের সাহিত্য-ইতিহাসচর্চায় এক অনন্য সংযোজন এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।

বিশাল-বপুর এই প্রতিলিপি-সংকলন প্রকাশের দায়িত্ব পালন করেছেন অভিজাত প্রকাশনা সংস্থা পাঠক সমাবেশের স্বত্বাধিকারী সাহিদুল ইসলাম বিজু। বইটির প্রচ্ছদ ও শিল্পনির্দেশনা দিয়েছেন আনিসুজ্জামান সোহেল। চোখে পড়ার মতো কাজ। বইয়ের গুরুত্বকে অনুধাবন করে এই প্রচ্ছদের নকশা করার জন্য শিল্পী অবশ্যই ধন্যবাদ পাবেন। এই বই কেবল পাঠের নয়, সংগ্রহেরও আনন্দ আনে। মুসলিম সাহিত্য সমাজের ও শিখা পত্রিকার শতবর্ষপূর্তিতে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট ও সমৃদ্ধ আয়োজন এখনো পাওয়া যায়নি। তাই অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী ও প্রকাশক সাহিদুল ইসলাম বিজুকে আমাদের অভিনন্দন না জানিয়ে উপায় নেই। আশা করি, পাঠক এই বই গ্রহণ করবেন হৃষ্টচিত্তে।