আধুনিক মার্কিন সাহিত্যের অঙ্গনে রিচার্ড রাইট একটি বিখ্যাত নাম। শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ-নির্বিশেষে ঔপন্যাসিক, গল্পকার এবং কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের মনস্তাত্বিক বিশ্লেষকরূপে রিচার্ড রাইটের স্থান অতি উচ্চে।
তাঁর জন্ম ১৯০৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, মিসিসিপির একটি তুলার খামারে। ক্ষুধার যন্ত্রণা ও চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় একেবারে শৈশবকাল থেকেই। দেহের ক্ষুধার হাত থেকে মুক্তি পাবার পরও ১৯৬০ সালে পারীর এক ক্লিনিকে মৃত্যুবরণের পূর্ব পর্যন্ত তিনি মন ও আত্মার ক্ষুধার হাত থেকে মুক্তি পাননি। শোষিত, নির্যাতিত এবং নিদারুণ পক্ষপাতিত্বের শিকার হতভাগ্য মানুষদের যন্ত্রণার স্বরূপ তিনি তাঁর স্পর্শকাতর হৃদয়, মন ও যুক্তি দ্বারা নির্ভুলভাবে উপলব্ধি করেন এবং একজন পরিশীলিত উচ্চমানের শিল্পীর নৈপুণ্য নিয়ে তা নিজের সাহিত্যকর্মে পরিবেশন করেন। ১৯৪০ সালের ১ মার্চ প্রখ্যাত পুস্তক প্রকাশক হার্পার অ্যান্ড সানস কর্তৃক রাইটের উপন্যাস নেটিভ সান তথা দেশের ছেলে প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে তা গোটা আমেরিকায় বিশাল আলোড়ন তোলে। প্রকাশের তিন সপ্তাহের মধ্যে গ্রন্থটির দুই লাখ পনেরো হাজার কপি বিক্রি হয়। আফ্রো-আমেরিকান সাহিত্যভুবনে এ-রকম কিছু আর ইতিপূর্বে রচিত হয়নি। এ-উপন্যাসের বাস্তবতা, জীবনঘনিষ্ঠতা, তীক্ষè পর্যবেক্ষণ-দক্ষতা, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও প্রগাঢ় মানবতাবোধ একজন বড়মাপের সাহিত্যিকের পরিচয় তুলে ধরে। এর মধ্যে ক্রোধ আছে, তীব্র প্রতিবাদী সুর আছে, কিন্তু তার পাশাপাশি নিগ্রোদের অবস্থা, তাদের জীবন, তাদের আশা ও আকাক্সক্ষাকে উপলব্ধি করার অত্যাবশ্যকতার দিকটিও উজ্জ্বলভাবে উঠে এসেছে।
কিন্তু সনাতনী রক্ষণশীল মহল থেকে নেটিভ সানের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। বার্মিংহাম অ্যালাবামার গ্রন্থাগারগুলো বইটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু বিভিন্ন মহলে গ্রন্থটির খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৪০ সালেই বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা অরসন ওয়েলস নেটিভ সানের মঞ্চ-সংস্করণে মুখ্য চরিত্রে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, নেটিভ সান ব্রডওয়ে এবং অন্যান্য স্থানে সাফল্যের সঙ্গে বহুবার মঞ্চস্থ হয়েছে।নেটিভ সানের নায়ক বিগার টমাসকে বিন্দুমাত্র আদর্শায়িত করে চিত্রিত করা হয়নি। নিজের পরিবারের কারো সঙ্গে তার কোনো আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। এমনকী তার মায়ের সঙ্গেও না। বাবার কথা প্রায় উচ্চারিতই হয় না। রিচার্ড রাইট গ্রন্থের প্রথম দৃশ্যেই কিশোর বিগারকে উপস্থিত করেন একটি শারীরিক লড়াইয়ে। গোটা পরিবারকে আতঙ্কিত করে রাখা একটি বিশালাকার রাক্ষুসে ইঁদুরের বিরুদ্ধে ওই লড়াইয়ে বিগার জয়ী হলেও তার আত্মমর্যাদার যে-হানি ঘটে, গ্রন্থ শেষ হওয়া পর্যন্ত সে তা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয় না। বিগার নামটিও লক্ষণীয়। এর ছন্দমিল আছে নিগারের সঙ্গে।
১৯৩৮ সালে রাইটের প্রথম গ্রন্থ টম চাচার সন্তানরা প্রকাশিত হবার পরপরই লেখকের প্রতি অনেকের সপ্রশংস ও কৌতূহলী দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। ওই গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘বিগ বয় লিভস্ হোমে’ একটি নিগ্রো ছেলে কী পরিস্থিতিতে লিঞ্চিংয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য একটা খুন করে, তারপর উত্তরাঞ্চলে পালিয়ে যায়, তার কাহিনী বিধৃত হয়েছে। ওই বিগ বয়-ই নেটিভ সানের বিগার টমাস। তবে নেটিভ সান অনেকগুণ উচ্চতর শৈল্পিক কাজ। এর প্রধান চরিত্র বিগার টমাস এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিগার টমাস পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপিত। তার যাবতীয় ইচ্ছা, কামনা-বাসনা, ভয়, ঘৃণা, প্রতিশোধগ্রহণের অদম্য আকাক্সক্ষা কোথাও কৃত্রিম বা আরোপিত মনে হয় না। এক অর্থে রিচার্ড রাইট তাঁর সারাজীবন ধরে বিগার টমাসকে লক্ষ করে এসেছেন, তার ভেতর ও বাহির দুই-ই তীক্ষè চোখে দেখেছেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোরতর অন্যায়, মানবতাবিরোধী অনৈতিক ও ক্রিমিনাল বর্ণবাদী পরিস্থিতিতে তাকে নির্মোহভাবে উপস্থিত করেছেন।
এক স্তরে নেটিভ সান অতি-নাটকীয়। এর কাহিনীতে আছে ধর্ষণ, হত্যা, নিহতের দেহ-ব্যবচ্ছেদ এবং ফার্নেসে খণ্ডিত মৃতদেহ ঢুকিয়ে অপরাধের সব নিদর্শন মুছে ফেলার প্রয়াস, মুক্তিপণের চিঠি, বিগারের পলায়ন ও ধরা পড়ার নাটকীয় ঘটনা এবং শেষ অংশে বিচারালয়ের আবেগঘন দৃশ্যাবলি এবং বিগারের আইনজীবী ম্যাক্সের উদাত্ত ভাষণ। অবশ্যই মর্মস্পর্শী নাটকীয়তায় পূর্ণ এ-উপন্যাস। কিন্তু অন্য স্তরে এ-উপন্যাস নাটকীয়তাকে ছাড়িয়ে একটি মহৎ সাহিত্যকর্ম হয়ে উঠেছে, যেখানে একটি মানুষের অন্তর্জগৎ এবং চরিত্রের গতানুগতিক সংজ্ঞাকে অতিক্রম করে যায়।
জনৈক সমালোচক এ-উপন্যাসকে পলিফোনিক আখ্যা দিয়েছেন, বলেছেন যে এ একটি বহুস্বরিক রচনা। একটি স্বরই মুখ্য, বিগারের স্বর, কিন্তু তা অন্য স্বরগুলোকে মুছে দেয় না। আমরা শ্বেতাঙ্গ মার্কিন কোটিপতির স্বর শুনি, তাঁর অন্ধ স্ত্রীর স্বর শুনি, তরুণ শ্বেতাঙ্গ কমিউনিস্ট কর্মীর স্বর শুনি, বিগারের মানবতাবাদী শ্বেতাঙ্গ আইনজীবী ম্যাক্সের স্বর শুনি। নেটিভ সানের পলিফোনিক আমাদের দস্তয়েভস্কির কথা মনে করিয়ে দেয়। উপন্যাসটির রুশ অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৪১ সালে।
নেটিভ সানের পর ১৯৪৩ সালে রাইট তাঁর আত্মজীবনী লেখায় মনোনিবেশ করেন। নাম দেন অ্যামেরিকান হাঙ্গার, মার্কিনি ক্ষুধা। ওই বছরের ডিসেম্বরেই তিনি মার্কিনি ক্ষুধা শেষ করেন। বুক অব দি মান্থ ক্লাব রাইটের প্রকাশক হার্পারকে জানায় যে, তারা মার্কিনি ক্ষুধার শুধু প্রথমাংশ মুদ্রণ করতে চায়, যেখানে লেখক দক্ষিণাঞ্চলে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতাসমূহের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। রাইট সম্মতি দান করেন এবং রচনার নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম দেন ব্ল্যাক বয়। তাঁর আত্মজীবনীর দ্বিতীয় অংশ, যেখানে তিনি শিকাগোতে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, হার্পার অ্যান্ড রো কর্তৃক তা প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে মার্কিনি ক্ষুধা নামেই।
হার্পার অ্যান্ড ব্রাদার্স ১৯৪৫ সালের মার্চ মাসে রাইটের ব্ল্যাক বয় : এ রেকর্ড অব চাইল্ডহুড অ্যান্ড ইয়ুথ প্রকাশ করলে তা নানা মহল থেকে বিপুল অভিনন্দন লাভ করে। ২৯ এপ্রিল থেকে ৬ জুন পর্যন্ত গ্রন্থটি বেস্ট সেলার তালিকায় এক নম্বর স্থান অধিকার করে থাকে, কিন্তু কয়েকটি মহল থেকে রাইটের আত্মজীবনীর বিরুদ্ধে নিন্দা ও বিরূপ সমালোচনার ঝড়ও ওঠে। কৃষ্ণাঞ্চল মিসিসিপির এক শ্বেতাঙ্গ মার্কিন সিনেটর সিনেটে গ্রন্থটির বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ তোলেন, কিন্তু তাতে ব্ল্যাক বয়ের ব্যাপক সমাদরে ভাটা পড়েনি। ১৯৪৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে হার্পারের বাণিজ্যিক সংস্করণে গ্রন্থটির এক লাখ পঁচানব্বই হাজার কপি বিক্রি হয়, আর বুক অব দি মান্থ ক্লাবের মাধ্যমে বিক্রি হয় তিন লাখ একান্ন হাজার কপি। কিন্তু শুধু বিক্রির সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, বইটিতে রাইট বিশ্লেষণ-দক্ষতা, অকপট সত্য-কথন এবং আবেগের সঙ্গে যুক্তির যে-সমন্বয় সাধন করেছেন তার গুণে ব্ল্যাক বয় একটি ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে।
অন্ধকার ভুবনে দারিদ্র্য ও বঞ্চনার মধ্যে বাস করা রাইটের জীবনকাহিনী, একটি কৃষ্ণাঙ্গ বালকের নিয়তি, শৈল্পিক সাধারণীকরণের মাধ্যমে বহু প্রজন্মের কৃষ্ণাঙ্গ বালকের কাহিনী হয়ে ওঠে, যারা তাদের দক্ষিণাঞ্চলের পিতৃতান্ত্রিক গোষ্ঠীশাসিত সমাজ থেকে মুক্তির আশায় উত্তরাঞ্চলে পালিয়ে এসে পতিত হয় কদর্য নোংরা এলাকায়, সেখানে কর্মহীন লক্ষ্যহীন অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়, আর বড় বড় শহরের অ্যাসফল্টের জঙ্গলে ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু শুধু এটুকু নয়, রিচার্ড রাইটের ব্ল্যাক বয় এর চাইতে আরো বেশি কিছু হয়ে ওঠে। এর মধ্যে তীব্রভাবে সর্বাঙ্গ অসাড় করা একটা ভয়াবহ ছবি প্রাণবন্তু হয়ে ওঠে। এখানে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ-নির্বিশেষে সেইসব মানুষের ছবি আমরা দেখি, যারা কখনো প্রকৃত শৈশব বা যৌবনের স্বাদ পায়নি, যাদের জীবন কেটেছে অব্যাহত কাঠিন্য, নিষ্ঠুরতা ও
প্রবঞ্চনার মধ্যে, যারা পরিণত হয়েছে সমকালীন নাগরিক-সভ্যতার হতভাগ্য শিকারে।
১৯৪৬ সালে নিউইয়র্কে রাইটের দেখা হয় জাঁ পল সার্ত্রের সঙ্গে।
সে-বছরই রাইট ফ্রান্স থেকে একটি আমন্ত্রণ পান, কিন্তু ভিসা পাওয়া নিয়ে অসুবিধা দেখা গেলে তিনি ওয়াশিংটনে গিয়ে গারট্রুড স্টাইন, ডরোথি নরম্যান ও ক্লদ লেভি-স্ট্রাউসের সাহায্য কামনা করেন। লেভি-স্ট্রাউসের উদ্যোগের ফলে রাইট ফরাসি সরকার থেকে একটি সরকারি আমন্ত্রণ লাভ করেন, পারীতে একমাস কাটাবার জন্য। রাইট পারীতে পৌঁছলে গারট্রুড স্টাইন এবং ফ্রান্সের প্রায় সব সাহিত্যিক-সংস্থা ও প্রধান সাহিত্যিক
তাঁকে স্বাগত জানান। গারট্রুড স্টাইন, সিমঁ দ্য ব্যুভোয়া, কাম্যু, ককতো, আঁদ্রে জিদ, লিওপোল্ড সেঙ্ঘর, ইগনাশিও সিলোনি প্রমুখের সঙ্গে শিল্পসাহিত্য-বিষয়ক বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নেন রাইট। ডিসেম্বরের
শেষ দিকে তিনি লন্ডন যান, তারপর আবার নিউইয়র্কে ফিরে আসেন ১৯৪৭-এর জানুয়ারিতে।
এ-সময় একটি কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা ঘটে। হলিউড থেকে জনৈক চলচ্চিত্র-পরিচালক রাইটকে একটি প্রস্তাব দেন। তিনি নেটিভ সান চলচ্চিত্রায়িত করতে চান, তবে মুখ্য চরিত্র বিগার টমাসকে কৃষ্ণাঙ্গ থেকে শ্বেতাঙ্গে পরিণত করতে হবে। বলা বাহুল্য যে, রাইট সে-প্রস্তাব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে নাকচ করে দেন।
এ-সময় রিচার্ড রাইটের গ্রন্থগুলো ফরাসি, ইতালি, জার্মান, ডাচ এবং চেক ভাষায় অনূদিত হতে শুরু করে। ১৯৪৭ সালেই রাইট, দেশের
ছেলে, যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে ইউরোপে বাস করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। স্ত্রী ও কন্যাসহ তিনি আগস্ট মাসে পারীতে পৌঁছে
একটা অ্যাপার্টমেন্ট নেন। ১৯৪৭ সালের শরৎকালেই নেটিভ সানের ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হয়।
স্বদেশের লেখকদের মধ্যে রাইটকে প্রভাবিত করে থিওডোর ড্রাইসার এবং সিনক্লেয়ার লিউইস, আর বিদেশের লেখকদের মধ্যে সার্ত্র, সিমঁ দ্য ব্যুভোয়া, কাম্যু এবং দস্তয়েভস্কি।
পারীতে অবস্থানকালে রাইট অস্তিত্ববাদী দর্শন সম্পর্কে ব্যাপক পড়াশোনা শুরু করেন। তাঁকে বিশেষভাবে আলোড়িত করে কাম্যুর দি স্ট্রেঞ্জার। ১৯৪৮ সালেই রাইট তাঁর অস্তিত্ববাদী উপন্যাস দি আউটসাইডার লিখতে শুরু করেন। একজন কৃষ্ণাঙ্গ ডাক-কর্মীর জীবন নিয়ে লেখা এ-উপন্যাসেও আমরা রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক বিষয়ে রাইটের নিজস্ব ধ্যান-ধারণার নির্ভুল প্রতিফলন দেখি। রচনাশৈলীর ক্ষেত্রেও আমরা তাঁর বৈশিষ্ট্যসমূহ লক্ষ করি। স্মর্তব্য যে, রাইট এ-উপন্যাস রচনা করেন স্বদেশ থেকে বহু দূরে বসে, যেখানে মার্কিনি সমাজের শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গের বর্ণবাদ সমস্যা নেই। প্রায় আট বছর সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম থেকে দূরে থাকার পর রাইট এ-গ্রন্থ রচনা করেন। তবু আমরা এখানে রাইটের আগের গ্রন্থগুলোর নায়কের ভাষাই শুনি, তাদের যন্ত্রণা, ক্রোধ ও প্রতিশোধগ্রহণের স্পৃহা লক্ষ করি। তাদের লজ্জা, অবমাননা ও মৃত্যু, তাদের লুকানো চিন্তা ও অবদমিত অনুভূতি এবং তাদের অন্ধ স্বজ্ঞার আকস্মিক প্রলয়ঙ্করী বিস্ফোরণ আমাদের বলে দেয় যে দি আউটসাইডারের নায়ক ক্রস ডেমন দেশের ছেলে বিগার টমাস ও ব্ল্যাক বয়ের নায়কের সমগোত্রীয়।
রাইটের সর্বশেষ উপন্যাস দি লং ড্রিম প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে, লেখকের মৃত্যুর দুবছর আগে। এ-উপন্যাসেও আমরা রাইটের নিপুণ রচনাশৈলীর পরিচয় পাই। চরিত্র, ব্যক্তি-মানুষের ভাগ্য, বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির ব্যক্তিবর্গের মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সামাজিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের রূপায়ণে লেখকের স্মৃতি এবং কল্পনা মিশে গিয়ে যা সৃষ্টি করে তা নেটিভ সান ও ব্ল্যাক বয়ের সমকক্ষ না হলেও অবশ্যই উল্লেখযোগ্য।
ছোট গল্পকার হিসেবেও রাইটের নৈপুণ্যের কথা বলা দরকার। ১৯৪৫ সালে তিনি একটি আত্মজৈবনিক ছোটগল্প লিখেছিলেন, নাম দিয়েছিলেন ‘শিকাগোতে প্রথম দিনগুলো’। পনেরো বছর পর তিনি গল্পটির নতুন নামকরণ করেন ‘যে মানুষটি শিকাগো গিয়েছিল’। রাইট তাঁর আটজন মানুষ গল্প-সংকলনে এ-গল্পটিকে গ্রন্থের শেষ গল্প হিসেবে স্থান দেন। মুদ্রণের জন্য নিজের হাতে প্রস্তুত করা রাইটের সর্বশেষ গ্রন্থ হলো আটজন মানুষ। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে রাইটের মৃত্যুর পর। গল্পটির একটি অংশ উদ্ধৃত করা যাক :
আমি মনে মনে ভাবি, মানুষের ব্যক্তিত্বের উপর বর্ণবাদী বৈষম্যের ধারণার চাইতে বেশি ক্ষয়কারী ও বিধ্বংসী কোনো আক্রমণ কি সমগ্র মানব ইতিহাসে কখনো সংঘঠিত হয়েছে… যে সংস্কৃতি তাকে ঘৃণা করে তারই একটি অর্গানিক, জৈব-রাসায়নিক, অংশ হওয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ অন্যরা তার মধ্যে যা ঘৃণা করে সে নিজেই তার মধ্যে তাকে ঘৃণা করতে শুরু করে। কিন্তু তার অহংকার তাকে শেখায় তার আত্মঘৃণাকে ঘৃণা করতে…
আমি নিজেকে অন্য কারো জন্য হুমকি বলে মনে করি না। তবু
চিন্তা করবার মতো বয়স হওয়া মাত্রই আমি জেনে যাই যে
আমার গোটা ব্যক্তিত্ব, আমার আশা-আকাক্সক্ষা, বহু আগেই ছেঁটে ফেলা হয়েছে। এক দিক দিয়ে আমার উচ্চারিত কথা পর্যন্ত কেউ পুরোপুরি বুঝতে পারে না … আমি অনুভব করি যে নিগ্রো জীবন এক অচেতন যন্ত্রণার বিস্তৃত এলোমেলো জগৎ, প্রায় কোনো নিগ্রোই তার জীবনের গল্প বলতে পারে না, জানে না তার জীবনের অর্থ কী।
আটজন মানুষ গল্পগ্রন্থের আটটি গল্পের নামের তালিকার দিকে তাকালে একটি সমকালীন কবিতা বলে মনে হতে পারে :
প্রায় একটা মানুষ ছিল যে মানুষটা
যে মানুষ যাপন করতো গোপন জীবন
বড় কালো ভালো মানুষ
‘বন্যা’ দেখেছিল যে মানুষ
সব কাজের কাজী মানুষ
শোনো, ঈশ্বর ওরকম নয়
ছায়াকে হত্যা করেছিল যে মানুষ
যে মানুষটি শিকাগো গিয়েছিল॥
রূপক-প্রতীক প্রায় সব সাহিত্যকর্মের একটি তাৎপর্যময় অংশ। রিচার্ড রাইটের রচনায় রূপক-প্রতীকের বহুমাত্রিক ব্যবহার লক্ষণীয়। সেখানে বাস্তবতার সঙ্গে এসে মিশে যায় অভিব্যক্তিবাদী এবং পরাবাস্তববাদী মাত্রা। নেটিভ সান, ব্ল্যাক বয়, দি আউটসাইডার, দি লং ড্রিম এবং এইট মেন Ñ সর্বত্রই আমরা তা লক্ষ করি।
১৯৬০ সালের ২৮ নভেম্বর প্যারিসের একটি ক্লিনিকে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে রিচার্ড রাইট মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছা-অনুযায়ী তাঁর মরদেহ দাহ করা হয়, সঙ্গে রাখা হয় ব্ল্যাক বয়ের একটি কপি।
দুঃসহ দারিদ্র্য, সারাক্ষণ ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর, নিষ্ঠুর বর্ণবাদের শিকার, শ্বেতাঙ্গদের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত, নোংরা পরিবেশ ইত্যাদির ভেতর থেকে নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তি, পড়াশোনা, কতিপয় গুণী মানুষের সাহচর্য এবং আপন প্রতিভার বলে রিচার্ড রাইট নিজেকে এক মহৎ উচ্চস্থানে উন্নীত করেছিলেন।
তিনি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন, অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানিত বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে বক্তৃতা দেন। ১৯৫১ সালে তিনি ইতালির তিউরিন, জেনোয়া এবং রোমে বক্তৃতা করেন। ওই বছরেই তিনি জেনেভাতে দেখা করেন প্রখ্যাত সমাজতত্ত্ববিদ গুনার মিরডালের সঙ্গে এবং তখন সূত্রপাত হয় দুজনের মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের।
রাইট স্পেন ও আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। আফ্রিকা ভ্রমণশেষে তিনি একটি বই লেখেন, ব্ল্যাক পাওয়ার : এ রেকর্ড অব রিঅ্যাকশান্স ইন এ ল্যান্ড অব পেথস। ১৯৫৪ সালে তিনি আফ্রিকার উপর বক্তৃতা করেন আমস্টারডামে। পরের বছর এপ্রিলে তিনি ইন্দোনেশিয়ার বানডুঙ্গে ঐতিহাসিক জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে উপস্থিত থাকেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিজের মূল্যায়নসহ তিনি একটি বই লেখেন, দি কালার কার্টেন : এ রিপোর্ট অব দি বানডুঙ্গ কনফারেন্স। বইটির ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন গুনার মিরডাল।
গল্প-উপন্যাসের বাইরে রাইট বেশকিছু কবিতাও লেখেন। তাঁর কবিতা বামপন্থি পত্রিকা ইন্টারন্যাশনাল লিটারেচার এবং নিউ মাসেসে প্রকাশিত হয়ে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে রিচার্ড রাইটকে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এবং প্রতিষ্ঠা এনে দিয়েছে নেটিভ সান ও ব্ল্যাক বয়। বিশ্বের সেরা আত্মজীবনীগুলোর মধ্যে ব্ল্যাক বয় অবিসংবাদিত স্থান করে নিয়েছে।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.