কোনো একটি উপন্যাসে আমি লিখেছিলাম, এদেশের পুরুষরা বিয়ে করে, মেয়েদের বিয়ে হয়। অর্থাৎ পুরুষরাই সক্রিয় আর মেয়েদের ইচ্ছে-অনিচ্ছে নেই, বাবা-মা যার সঙ্গে জীবনযাপন করতে বলেন তাকেই মেনে নিতে হয়। ব্যাপারটা কয়েক শ বছর ধরে চলে আসছে। যদিও তার আগের ইতিহাস এরকম নয়। তখন নারী তার স্বামী-নির্বাচনের অধিকার অর্জন করেছিল। একটা সময় ছিল যখন পুরুষরা নারীর সামনে উপস্থিত হয়ে যে যার যোগ্যতার প্রমাণ রাখত। তাদের মধ্যে যাকে নারী যোগ্য মনে করত তাকেই গ্রহণ করত। মহাভারতে দেখছি, স্বয়ংবর-সভায় কর্ণ নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে চাইলেও দ্রৌপদী তা উপেক্ষা করে অর্জুনকেই স্বামী হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন। অর্থাৎ তাঁর সেই অধিকার ছিল। তাহলে এদেশীয় নারীরা কবে ওই অধিকার হারালো?

উপন্যাসটি পড়ে অনেক পাঠিকা চিঠি লিখেছিলেন আমাকে। তাঁদের অনেকেই নিজেকে রক্তমাংসের পুতুল বলে বর্ণনা করেছিলেন। বিয়ের আগে অন্য কোনো পুরুষকে দেখে মোহিত হয়েছেন জানতে পেরে ক্ষিপ্ত হয়েছেন পিতামাতা। তড়িঘড়ি একটি পছন্দসই পাত্র জোগাড় করে মেয়েকে ঘাড় থেকে নামিয়েছেন।

আমাদের এদেশে আশির দশক পর্যন্ত এরকম একটা ছবি আমরা প্রায়ই দেখতে পেতাম। মেয়ে সাত-আট বছরে পৌঁছানোমাত্র বাড়ির বয়স্কারা বলতে শুরু করলেন, ‘বেশি লেখাপড়া শিখিয়ে কাজ নেই, সেই তো শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে হাঁড়ি ঠেলবে।’ অথবা, ‘একটু একটু করে রান্নাবান্না শেখো, ঘরে কাজ করো, নইলে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে মুখ ঝামটা খাবে।’ এসব শুনতে শুনতে মেয়েটির মনে হতো, ওই বাড়ি তার নয়, তাকে যেতে হবে শ্বশুরবাড়ি। অর্থাৎ সেটাও তার হবে না। অথচ তার দাদাভাইদের ক্ষেত্রে যে-ব্যবহার করা হতো তাতে তাদের বাড়ি নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়তে হতো না।

সেই পঞ্চাশ থেকে পঁচাশি সাল পর্যন্ত বছরগুলোতে যে এর ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেনি, তা নয়। পড়াশুনা শেষধাপ অতিক্রম করা বেশির ভাগ মেয়ের বিয়ে হয়েছে বাবা-মায়ের পছন্দসই পাত্রের সঙ্গে। বউমা চাকরি করুক তা শ্বশুর-শাশুড়ি চাইবেন না জেনে সেই মেয়ে চাকরির রাস্তায় হাঁটেনি। বড় জোর মেয়েস্কুলে কিছুদিন পড়িয়েছে। সেটাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিরুদ্ধে যেত। বউমা মাস্টারনি শুনলে শাশুড়ি মুখ বেঁকিয়ে বলতেন, ‘সর্বনাশ, ও তো ছেলের ওপর মাস্টারনিগিরি করবে!’বাবা-মায়ের আর্থিক অবস্থা ভালো নয় অথবা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছে যাদের প্রবল ছিল পুরুষদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সেইসব মেয়ে চাকরিতে ঢুকেছিল। গত পঞ্চাশ বছরে ক্রমাগত লড়াই করে মেয়েরা এখন পুরুষদের পাশের আসন দখল করেছেন বললে একটু কম বলা হবে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাড়িয়েও গিয়েছেন। ভাবুন তো চল্লিশ বছর আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কেউ কোনো মহিলাকে কল্পনা করতে সাহস পেতেন? ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একজন নারীকে দেখার কথা পঞ্চান্ন সালে আমরা ভাবতে পারতাম? দু-তিনজন মহিলা, তাঁরা বাঙালি নন, পারিবারিক পরিচিতি এবং পাণ্ডিত্য অথবা সমাজসেবিকা হিসেবে শ্রদ্ধা আদায় করার পর রাজ্যপাল হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। বাংলাদেশে এখন শেখ হাসিনা এবং বেগম জিয়াকে শ্রদ্ধেয়া নেতা হিসেবে মেনে নিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর পর সোনিয়াকে (বিদেশিনী সত্ত্বেও) নেত্রী হিসেবে মেনে নিচ্ছেন অধিকাংশ মানুষ। অর্থাৎ বিধাতার কৃপায় নয়, নারী তার নিজের ভাগ্য জয় করে নিতে পারছেন।

বিখ্যাত বা উঁচু পদে যাঁরা আছেন তাঁদের কথা থাক। মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েরা শিক্ষার সুযোগ নিয়ে আজ বাইরে এসেছেন। আমি এমন পরিবার জানি যাঁরা চাইছেন মেয়ে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াক তারপর বিয়ে নিয়ে ভাবা যাবে। পশ্চিমবঙ্গে একটা অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দুই ভাইবোন মেধাবী। ছেলে পরপর ভালো রেজাল্ট করে বড় চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছে প্রবাসে অথবা বিদেশে। মেয়েও ভালো চাকরি খুঁজে নিচ্ছে কলকাতায়, বাবা-মায়ের পাশে থাকছে সে। এমনকি বিয়ের পরেও, স্বামীর সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছে, বাবা-মাকে দেখবে সে। এদেশে এখনও কিছু পুরুষ আছেন যাঁরা মনে করেন ছেলে যদি নুন-ভাত খাওয়ায় তবু ভালো, কিন্তু মেয়ের দেওয়া পোলাও-কালিয়া খাবেন না। অথচ বিপদে পড়লে মেয়ে এসে পাশে দাঁড়াচ্ছে, ছেলে নয়।

ইংরেজ আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছিল দেশটাকে দু-ভাগ করে। ওই একটি স্বাধীনতার বিনিময়ে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানের অংশ হয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের শিকার হয়েছেন কম-বেশি সবাই। মায়ের ভাষা বলার অধিকার আদায় করতে প্রাণ দিয়েছেন শহীদরা। প্রকৃত স্বাধীন হয়েছেন তাঁরা একাত্তর সালে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিপর্যস্ত হয়েছেন দেশভাগের জন্যে। কাতারে কাতারে শরণার্থীরা চলে এসেছেন পাকিস্তানি সৈন্যদের ভয়ে। আচমকা লাখ লাখ মানুষ বেড়ে যাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক কাঠামো হয়ে গিয়েছিল নড়বড়ে, যা অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রে হয়নি।

পূর্ববঙ্গের যে-মানুষরা পশ্চিমবঙ্গে এলেন তাঁরা কে কত সম্পত্তি ফেলে রেখে এসেছেন তা আমাদের জানার কথা নয়। গল্প চালু আছে, সবাই নাকি কয়েক শ বিঘা ধানের জমি, পুকুর, ফলের গাছগাছালি ফেলে এসেছেন। প্রত্যেকের পরিসংখ্যান একত্রিত করলে দেখা যাবে গোটা পাঁচেক পূর্ব পাকিস্তানও কম পড়ছে। মানুষ কিছু হারালে ক্রমশ সেটা তার নিজের কাছেই অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু এপারে আসার পর যে-সত্যটা ওঁদের মানতে হলো সেটা খুবই নির্মম।

বিভিন্ন শরণার্থী-ক্যাম্পের বাসিন্দারা প্রতিদিন নরকযন্ত্রণা ভোগ করেছেন। সহায়-সম্বলহীন মানুষরা শেষ পর্যন্ত জমি দখল করে তার ওপর মাথাগোঁজার আস্তানা তৈরি করেছেন। আমরা প্রথম কলোনি শব্দটার আর-একটা মানে জানলাম। কলকাতার উপকণ্ঠগুলোতে নতুন নতুন কলোনি তৈরি হয়ে গেল, যেখানে ছিন্নমূল মানুষেরা জবরদখল জমিতে কোনোরকমে ঘর তৈরি করে নিলেন। তারপর বাঁচার লড়াই শুরু হলো। চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা ছিল মুষ্টিমেয়র। কিন্তু শ্রমের বিনিময়ে অর্থ রোজগার করতে তাঁরা বসে গেলেন কলকাতার রাজপথে। সামান্য অর্থে জিনিস কিনে এনে হকারি করতে শুরু করলেন তাঁরা। বিভিন্ন কলকারখানা, দোকানে কর্মচারী হয়ে ঢুকে গেলেন অল্প মাইনেতে। দুবেলা ভাত আর পরনের কাপড়ের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেয়ে গেলেন সবাই। যাঁরা বুদ্ধিমান তারা একটু একটু করে গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। এই অবস্থায় মেয়েরা পিছিয়ে থাকেননি। যাঁরা স্কুলের নিচু ক্লাসে পড়ে এসেছেন তাঁরা পশ্চিমবঙ্গের স্কুলে ভর্তি হতে চাইলেন। কিন্তু অবস্থা এমন প্রতিকূল ছিল যে, বাবা-মায়ের পক্ষে সন্তানের পড়ানোর খরচ বহন করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব ছিল না। এই মেয়েরাই জীবন-সংগ্রামে নেমে গিয়েছিলেন সেই সময়। বাচ্চাদের পড়িয়ে নিজের পড়ার খরচ জোগাড় করতেন। আমি এমন মহিলাকে জানি যিনি অন্যের বাড়িতে বাসন মেজে যে-টাকা পেয়েছেন তাই দিয়ে পড়াশুনার খরচ মিটিয়েছেন। ওই মহিলা পরবর্তীকালে সরকারি চাকরি করেছেন সুনামের সঙ্গে। এই যে বিশাল মহিলাকুল সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে গিয়েছিলেন তার প্রভাব পড়ল পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের ওপর বিপুলভাবে।

আমি কলকাতায় পড়তে আসি ১৯৬০ সালে। ভর্তি হয়েছিলাম স্কটিশচার্চ কলেজে। ওই কলেজে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়তেন। ক্লাসে ছেলেরা আগে বসে থাকতেন, মেয়েরা অধ্যাপকের পেছন পেছন ক্লাসে এসে আলাদা বসতেন, আবার পড়ানো শেষ হলে তাঁর পেছন পেছন চলে যেতেন। সে-সময় শহরের অর্থবানদের ছেলেমেয়েরাই স্কটিশের ছাত্রছাত্রী ছিলেন। ক্লাস না থাকলে মেয়েরা থাকতেন লেডিস কমনরুমে। তবু ওরই ফাঁকে এর সঙ্গে ওর প্রেম হয়ে যেত। আশেপাশের রেস্তোরাঁগুলো ছিল ছাত্রদের আড্ডার জায়গা। বেশির ভাগ মেয়েরা কলেজে আসতেন এবং ফিরতেন অভিভাবকের সঙ্গে। যাঁরা প্রেমে পড়তেন তাঁদের খুব সাহসী বলে ধরে নেওয়া হতো। সে-সময়ের প্রেম ছিল, দূর থেকে দৃষ্টিবিনিময়, পাশাপাশি দু-পা হাঁটা, প্রেমপত্র লেখা। ব্যাস। হাতধরা যেখানে স্বপ্নের ব্যাপার ছিল সেখানে আঙুলের ছোঁয়া পেয়েই তৃপ্ত হতো প্রেমিক। প্রথম বছর রেস্তোরাঁর আড্ডায় আমি কোনো ছাত্রীকে দেখিনি।

সে-সময় সন্ধের পর বাস বা ট্রামে কোনো মেয়েকে একা দেখা যেত না। বিশেষ প্রয়োজন হলে অভিভাবকের সঙ্গে তাঁরা বাস বা ট্রামে উঠতেন। কোনো মেয়ে, হঠাৎই, একা যাচ্ছেন দেখলে লোকে তাঁকে

নষ্ট মেয়ে মনে করত। এর পঁচিশ বছর আগে, নীরদ চৌধুরীর লেখায় পড়েছি, তাঁর স্ত্রী একা ট্রামের আসনে বসেছিলেন এবং তিনি কিছুটা

দূরে দাঁড়িয়ে শুনেছেন যে, যাত্রীরা আলোচনা করছেন মহিলা যে বারবনিতা তাতে সন্দেহ নেই। ষাট সালেও ব্যাপারটা প্রবল না থাকলেও কিছুটা ছিল।পরের বছর, একষট্টি সালে, আচমকা একটি মেয়ে আমাদের

রেস্তোরাঁর আড্ডায় চলে এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘শুধু ছেলেরাই ইউনিয়নের মেম্বার হবে কেন? মেয়েদের প্রতিনিধি থাকা উচিত, তাই না?’ তার উচ্চারণে একটা টান ছিল, যা থেকে বোঝা যায় সে পূর্ববঙ্গের মেয়ে। কিন্তু কোনো মেয়ে যে এরকম সহজ গলায় কথা বলতে পারে তা জেনে আমরা খুব খুশি। ওই স্কটিশচার্চ কলেজে ঢুকে আমরা কেয়া চক্রবর্তীর নাম শুনেছিলাম। তিনি আমাদের সিনিয়র ছিলেন। ছেলেদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতেন এবং সে-সময় থেকেই গ্রুপ থিয়েটারের নেত্রী ছিলেন। মঞ্চে তাঁর মতো অভিনেত্রী খুব কম ছিল। কিন্তু ওঁকে আমরা দেখিনি, একে দেখলাম।

আমরা জানলাম একটি মেয়ে এক মাইল হেঁটে সোনারপুর স্টেশনে পৌঁছে ট্রেন ধরে শিয়ালদা স্টেশনে নামে। সেখান থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ হেঁটে কলেজে ঢোকে ক্লাস করতে। তখন বাসের ভাড়া ছিল আট পয়সা। সেটা খরচ করার সামর্থ্য তার ছিল না। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘এত দূরের কলেজে পড়তে এলে কেন?’ সে জবাব দিয়েছিল, ‘স্কটিশে সুভাষচন্দ্র, বিবেকানন্দ পড়তেন, তাই।’

এই মেয়ে একাই ক্লাসে ঢোকে, আমাদের সঙ্গে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেয়, ইউনিয়নের নির্বাচিত সদস্যা হয়। কিন্তু দেখতে খারাপ না হওয়া সত্ত্বেও কোনো ছেলে ওকে প্রেমনিবেদন করেনি অথবা সে কারও প্রেমে পড়েনি। এ-ব্যাপারে প্রশ্ন করলে সে হেসে বলেছে, ‘পাগলা। আমরা বাবা ট্রেনে হকারি করেন। আমি না দাঁড়ালে আমার ভাই-বোন-মা ভেসে যাবে। ওসব বিলাসিতা করার সময় আমার নেই।’

আমরা ততদিনে জেনে গিয়েছি সে সকালে উঠে ঘুঁটে দেয়, বাচ্চাদের পড়ায়। প্রায় আধপেটা খেয়ে কলেজের জন্যে ছোটে। সন্ধেয় বাড়ি ফিরে মুড়ি খেয়ে ছাত্র পড়ায়। আমরা সাধ্যমতন ওকে খাওয়াতাম। রেস্তোরাঁয় ও খেতে চাইত না, কারণ আমাদের পয়সা খরচ হবে এবং প্রতিদানে সে খাওয়াতে পারবে না। কিন্তু আমাদের বাড়ি থেকে আনা টিফিন ওকে দিয়ে যখন কেউ বলত, মা পাঠিয়েছে তোর জন্যে, তখন ও হাসিমুখে খেত। খেতে খেতে বলত, ‘তোর মা খুব ভালো রাঁধে, শুধু তরকারিতে যদি একটু কম মিষ্টি দিত তাহলে ভালো হতো।’

সেই সময় পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোয় যে-অনুশাসন চলত তার শিকার ছিল মেয়েরা। মেয়েদের বেশি পড়াশুনা করানোর দরকার নেই, পনেরো বছর বয়স হলেই পাত্র খুঁজে বিদায় করে দাও। কোথাও যেতে হলে সঙ্গে অভিভাবক বা অভিভাবিকা থাকবেন। সেটা কোনো কারণে সম্ভব না হলে বাড়ির কাজের মহিলাকে সঙ্গে নিতে হবে। অনাত্মীয় ছেলেদের সঙ্গে কথা বলা নিষেধ। পনেরোতে পা দিলেই ফ্রক ছেড়ে শাড়ি ধরতে হবে। বাড়িতে ফোন বাজলে আগ বাড়িয়ে সেটা ধরা চলবে না। এমনকি কোনো বান্ধবী ফোন করলে অভিভাবকরা ভালো করে যাচাই করে মেয়েকে কথা বলতে দিতেন। প্রৌঢ় গৃহশিক্ষক পড়াতে এলে পাশের ঘরে বসে কান খাড়া করে শুনতেন পড়ানোর বাইরে কোনো কথা হচ্ছে কিনা।

দেশবিভাগের পর যে-মেয়েরা পূর্ববঙ্গ থেকে এদেশে এলেন তাঁদের সংগ্রামের গল্প পৌঁছাল পশ্চিমবঙ্গের মেয়েদের কাছে। সম্ভবত বাষট্টি সাল থেকে স্কটিশের মেয়েরা আর অধ্যাপককে অবলম্বন না করে নিজেরাই ক্লাসে ঢুকলেন। অভিভাবকরা পৌঁছে দিত, নিয়ে আসত, কিন্তু কলেজের সময়টায় তাঁরা আগল ভেঙে ছেলেদের সঙ্গে মিশতে শুরু করলেন। প্রাথমিক উচ্ছ্বাসে কিছু বাড়াবাড়ি হলেও সেটা থিতিয়ে গেলে সম্পর্ক সহজ হলো। শেষ পর্যন্ত মেয়েরা বাড়িতে আপত্তি জানালেন। অভিভাবক সঙ্গে থাকায় তাঁরা কলেজের অন্য ছাত্রছাত্রীর কাছে হাস্যাস্পদ হচ্ছেন। আমি দেখেছি ট্রাম থেকে নেমে অভিভাবক মেয়েকে ছেড়ে দিচ্ছেন, তিনি আর কলেজের গেট পর্যন্ত যাচ্ছেন না। মেয়ে একা সদর্পে হেঁটে যাচ্ছে।

একটি ঘটনা, আগেও লিখেছি, এক্ষেত্রে না লিখে পারছি না। আমরা যখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, কোনো মেয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলে না, তখন প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীকে দেখতাম অভিভাবকের গাড়িতে আসতে-যেতে। অপূর্ব সুন্দরী ছিল সে। একদিন কলেজে হঠাৎ ছুটি হয়ে গেল মাঝদুপুরে। কেউ মারা গিয়েছিলেন জেনে ছুটি। অথচ মেয়েদের অভিভাবকরা আসবেন চারটে নাগাদ। তখন মোবাইল কেউ জানে না, এমনকি টেলিফোনের ব্যবস্থাও তেমন ছিল না। হঠাৎ দেখি মেয়েটি একাই কলেজ থেকে বেরিয়ে ট্রামরাস্তার দিকে যাচ্ছে। দৃশ্যটা অভিনব। বন্ধুদের মধ্যে তর্ক হলো, বাজি ধরা হলো, যে ওর সঙ্গে কথা বলতে পারবে তাকে সবাই মোগলাই পরোটা খাওয়াবে। আমাকে প্রথমে ঠেলে দিল ওরা। মেয়েটি যখন ট্রামের জন্যে দাঁড়িয়ে তখন দূরে একটা টু-বি নম্বর লেখা বাস আসতে দেখলাম। আমি পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘টু-বি অর নট টু-বি?’ সে আমাকে দেখেই মুখ নামিয়ে বলল, ‘ট্রামে যাবো।’

‘আমার নাম সমরেশ, আমি স্কটিশের হাতিবাগানের হোস্টেলে থাকি। তোমার নাম কী?’ নায়ক-নায়ক গলায় জিজ্ঞাসা করলাম।

‘অপর্ণা।’

আমি আর না দাঁড়িয়ে বিজয়ীর মতো ফিরে এসে মোগলাই পরোটা খেয়েছিলাম। সেই রাত্রে একজন মোটাসোটা মহিলা হোস্টেলে এসে প্রচণ্ড ধমক দিয়ে তাঁর গাড়িতে তুলে নিয়ে গেলেন বেলগাছিয়ার বাড়িতে। সেখানে বসে আমাকে বেশ কথা শোনালেন, কারণ আমি তাঁর ভাইজির সঙ্গে প্রেম করতে গিয়েছিলাম। তিনি তাঁর দাদার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে মেয়েদের কলেজে ভর্তি না করে ভাইঝিকে বিবেকানন্দের পড়া স্কটিশ কলেজে ভর্তি করেছিলেন। ওঁদের এক আত্মীয় আমাকে ট্রামস্টপে অপর্ণার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছে। আমি কে তা অপর্ণাকে চাপ দিতেই জানা গিয়েছে, যদি দ্বিতীয়বার এই কাজ করি তাহলে সরাসরি প্রিন্সিপালকে জানাবেন আমাকে কলেজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্যে।

ওই রকম অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি থেকে আমাকে উদ্ধার করেছিলেন ভদ্রমহিলার স্বামী।

এই ঘটনাটি তখনকার পশ্চিমবঙ্গীয় পরিবারগুলোর মন-মানসিকতার নিদর্শন। বাড়ির মেয়ে প্রেম করে বিয়ে করছে Ñ একথা ভাবতেই পারতেন না অধিকাংশ মানুষ।

ওই ষাট দশক থেকে অর্থনৈতিক চাপ বেড়ে যেতে লাগল। পশ্চিমবঙ্গের মেয়েদের পেছনে ফেলে পূর্ববঙ্গের মেয়েরা পড়াশুনা করে ভালো ভালো চাকরিতে ঢুকে গেলেন। আর এই ব্যাপারটা পারিবারিক সংস্কারকে উপেক্ষা করতে, উজ্জীবিত করতে সাহায্য করল, পশ্চিমবঙ্গের মেয়েরা পড়াশুনা করে চাকরি করতে চাইলেন, অভিভাবকরা তখন অর্থনৈতিক কারণে আর আগের দাপট দেখাতে পারছেন না। একমাত্র মেয়েদের স্কুলে পড়ানোর চাকরি ছাড়া আর কোনো চাকরি মেয়েদের পক্ষে যাঁরা সম্মানজনক বলে মনে করতেন না তাঁরাও শেষতক হাল ছেড়ে দিলেন।

আশির দশকে দেখা গেল একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে গেছে। মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেখা যাচ্ছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গোলমাল শুরু হয়েছে। মেয়ে ফিরে আসছে বাপের বাড়িতে। কুপাত্র নির্বাচনের জন্যে সে বাবাকে দায়ী করছে।

নব্বই দশকের অধিকাংশ পিতামাতা চাইছিলেন মেয়ে নিজে তার পাত্র নির্বাচন করুক। তাতে ভবিষ্যতে গোলমাল হলে তাঁদের কোনো দায়িত্ব থাকছে না। শিক্ষিত কর্মরত মেয়ে কেন প্রেম করছে না, এ নিয়ে তাঁরা চিন্তায় পড়লেন। এই যে অভাবনীয় ভাবনাবদল, এটা সম্ভব হলো পূর্ববঙ্গের মেয়েদের উত্থানের জন্যে। এখন আর মেয়েদের বিয়ে হয় না, মেয়েরাও বিয়ে করেন। যে-কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা বেশি। মেয়েরা শিল্পী হচ্ছেন, চলচ্চিত্র পরিচালনা করছেন, প্লেন চালাচ্ছেন। এদেশীয় মেয়েরা নিজেদের ভাগ্য গড়ে নিচ্ছেন, যার ভিত তৈরি করেছেন পূর্ববঙ্গের লড়াকু মেয়েরা।