হচ্ছে-হবে

পুরনো দিনের মজার কবিতা

… হিতসাধিনী সভার চাঁদাচুরি কাণ্ড

ছড়িয়ে পড়েছে আজ সারা ব্রহ্মাণ্ড।

ছেলেরা দুভাগ হল মাগুরার কলেজে

এরা যদি বলে বেল, ওরা লাউ বলে যে।

চালতার ফল থাকে উভয়ের মাঝেতে,

তারা লাগে দুদলের সভাভাঙা কাজেতে। …

একটি বিখ্যাত, বহুপঠিত, সুদীর্ঘ ছড়ার সামান্য অংশটি দিয়ে এই নিবন্ধটি শুরু করলাম।

কোনো হেঁয়ালি না করে সরাসরি বলা ভালো, এই ছয় পঙ্ক্তি রবীন্দ্রনাথের একটি ছড়া থেকে উদ্ধৃত। এই রচনাটির নামই ছিল ‘ছড়া’, আরম্ভ হয়েছিল এইভাবে,

জিনেদার জমিদার কালাচাঁদ রায়-রা

সে বছর পুষেছিল এক পাল পায়রা।

এই রকম সরল আরম্ভ থেকে কলেজের ছেলেদের দুভাগ হয়ে লড়াই, আরেক দল সভাভাঙার কাজে নিযুক্ত।

এই ছড়া প্রায় একশো বছর আগে লেখা। কিন্তু পড়ে কেউ বলতে পারবে না এই কবিতা গতকাল রচিত হয়নি।

আরো পিছনে যাই। অনেক পিছনে। ১৮৫৭ সনের সেপাই বিদ্রোহের ঢের আগে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখলেন,

… কামরূপেতে কাগ মরেছে,

কাশীধামে হাহাকার। …

ঈশ্বর গুপ্তই লিখেছিলেন,

ঢলঢল ঢলঢল বাঁকাভাব ধরে।

বিবিজান চলে যান লবেজান করে ॥

নির্গুণ ঈশ্বরকে কবি ঈশ্বর গুপ্ত বলেছিলেন,

তুমি হে ঈশ্বর গুপ্ত, ব্যাপ্ত ত্রিসংসার।

আমি হে ঈশ্বর গুপ্ত, কুমার তোমার ॥

সামান্য দশ-বারো লাইনে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতার মজা নিয়ে লেখা সম্ভব নয়। অদ্যাবধি অন্তত দশ-বিশটা গবেষণাগ্রন্থ রচিত হয়েছে ঈশ্বরগুপ্তের কাজমহিমা নিয়ে। এখনো আলোচনা হয়।

নীলদর্পণের দীনবন্ধু মিত্রের একটি অবিস্মরণীয় পদ্য (গান) পীরের গান এখনো অনেকের মনে আছে। কোনো কোনো পঙ্ক্তি তো প্রায় প্রবাদ হয়ে গেছে :

মুসলমানের মোল্লারে ভাই

হাঁদুর মধ্যি সাধু।

কদু-কুমড়ো ছেড়ে দিয়ে

আকির মধ্যে মধু॥

(হাঁদু = হিন্দু, কদু = লাউ, আকি = আখ, ইক্ষু।)

এই কবিতার শেষে বলা হয়েছে,

    মানিকপীরÑ

ষাঁড়ের মাথায় শিং দিয়েছে,

মানষির মাথায় কেশ।

আল্লা-আল্লা বলরে ভাই,

পালা কল্লাম শেষ॥

    মানিকপীর Ñ

নীতিকুসুমাঞ্জলি নামক নৈতিক শিক্ষার পদ্যমালার রচনাকার রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন ব্রান্ডি নিয়ে, সোডা নিয়ে :

… জলে না নিবায় তেজ

কাটে তার ঠান্ডি Ñ

হে সখি, অনল সে কি?

Ñ না সখি, সে ব্রান্ডি॥

… ওই শুন বজ্রশব্দে

বর্ষে অনর্গল

হে সখি! নীরদ সে কি?

Ñ না, লো, সোডাজল। …

এক রবীন্দ্রনাথ ছাড়া উল্লিখিত কবিদের জন্মসাল পৌনে দুশো থেকে দুশো বছর আগে। রবীন্দ্রনাথের দেড়শ জন্মবার্ষিকী দূরে নয়।

যে-কোনো হালকা কবিতায় একটা মেজাজ ছিল আকাশে-বাতাসে। সমস্ত দুঃখ-বেদনা এবং দারিদ্র্যের মধ্যেও রস-রসিকতার অভাব ছিল না। ‘বন্দেমাতরমে’র উদ্গাতা, আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরাণীর লেখক ঋষি বঙ্কিমকে একবার দেখুন। বঙ্কিম লিখেছেন, ‘বিরহিণীর

দশ দশা’।

অষ্টম দশা দিনে   বিরহ বিষাদিনী

    মনদুঃখে কিনিল ইলিশ।

তিতিয়া নয়ন জলে   ভাজায় ঝোলে অম্বলে

    খায় ধনী খান বিশ ত্রিশ। ভাবা যায়, এরকম রসিকতা করবেন বঙ্কিমচন্দ্র?