অস্তিত্বের মুখমণ্ডল

কালিদাস কর্মকারের ‘এলুভাল ফেসেস-টু’ প্রদর্শনী সম্প্রতি উত্তরার ‘কায়া’ গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কালিদাস কর্মকার আমাদের দেশের চিত্রকলার একজন অতি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী। তাঁরচিত্রকলার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি ইমেজ ও দৃশ্যবস্তুর স্বতঃস্ফূর্ত বিক্রিয়ায় বিশ্বাস করেন এবং সেভাবেই তাঁর নিজের মানস- জগৎকে বিনির্মাণ ও পুনর্র্নিমাণ করে থাকেন। তাঁর কাজে বিমূর্ত ভাষার যেমন সব্যাখ্যা রাখার প্রয়াস থাকে তেমনি ফিগারেটিভ চিত্রকলার ফ্যান্টাসিনির্ভর কিছুটা সুরিয়াল ব্যাখ্যাও অতীতে পাওয়া গিয়েছিল। একসময়ে বিমূর্ত চিত্রকলা যখন নির্দিষ্ট কিছু টেকনিক, ফর্ম ও রঙের ঘরানায় আটকে গিয়েছিল তখন কালিদাস রং-ফর্মে নানারকম মুক্তি ঘটিয়েছিলেন। অবশ্য তাঁর এই অবদান সেভাবে চিহ্নিত হয়নি, যেমন হয়নি শিল্পী আবদুল বাসেতের বিমূর্ত চিত্রসম্ভারের । আমাদের চিত্রকলায় এমন অনেক শিল্পীর বৈশিষ্ট্যমূলক কাজকেই অবহেলা করা হয়েছে, আবার কিছু কাজকে বা শিল্পীকেও তাঁদের যোগ্যতার অধিক, বা ভুলভাবে খারাপ-ভালো যেটাই হোক, ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে । আমাদের শিল্প-সাহিত্যাঙ্গনে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে শিল্পবিচারের স্থানটি হয়তো ব্যক্তিগত কারণেই এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুধীমহল সমাজরক্ষার্থেই হয়তো উচিত কথাটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে বলেন না । অথচ সমাজরক্ষা না করতে চাইলেই নতুন সমাজ সৃষ্টি হয় – এ-সত্যটি সবার জানা উচিত । সৃষ্টি হয় সমাজরক্ষার নানা প্রেক্ষাপট থেকে আমাদের নানা পশ্চাৎপদতার সৃষ্টি।

কালিদাসের স্বতন্ত্র রেখা, রং, টেকনিক, চিত্রভাষা সর্বতোই কিছুটা জটিল, কিন্তু আবেগনির্ভর। এই আবেগ তাঁর অস্তিত্বের। কোনো নির্দিষ্ট দুঃখবোধ বা সুখবোধ তাঁর আবেগের অভিপ্রায় নয়; বরং মানুষের অস্তিত্ব নিজেই যে একটি ব্যাপক অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের একত্রীভূত আবেগ, সে-বিষয়টিই তিনি চিহ্নিত করতে চান। আবেগের বিদ্রোহ আর রহস্যময়তা প্রায়শই তাঁর চিত্রকলায় ঘুরে-ফিরে আসে, যেন তিনি আবেগের এমন এক অবকাঠামো খুঁজে ফিরছেন, যার উৎপত্তি সৃষ্টির রহস্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সে-কারণেই হয়তো আঁকাবাঁকা সর্পিল লাইনের ডিজাইনিক সংগঠন কোনো দূর-অতীতের সম্পর্ককেই দর্শকের সামনে নিয়ে আসতে চায়, যে-কারণে তান্ত্রিক চিত্রকলার নির্যাস থেকে শুরু করে ইউরোপীয় চিত্রকলার নানা আন্দোলনের সূত্রসহ এশীয় চিত্রভাবের নানা উপাচার তাঁর চিত্রকলায় প্রায়ই দেখা যায় । আন্তর্জাতিক হয়ে-ওঠার অভিপ্রায়ই তাঁকে এই মিশ্রিত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পরিবহণ করেছে বলে মনে হয়। চিত্রকলায় আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠা নিঃসন্দেহে জটিল প্রক্রিয়া ।

বর্তমানের জনপ্রিয় শব্দ ‘ফিউশন’ এই আন্তর্জাতিক বিষয়টিকে চিহ্নিত করে না। আন্তর্জাতিকতা এক অর্থে সভ্যতার পক্ষে বলা সবচেয়ে বলিষ্ঠ একটি শব্দ। সভ্যতার একটি নির্দিষ্ট মডেলের সামগ্রিক বিকাশই এটি চিহ্নিত করে। কোনো শিল্পী যদি আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে চান তবে তাকে এই নির্দিষ্ট মডেলটির ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। মূলত মডেলটির সমালোচনা করেই বিষয়টিকে ধারণ ও ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। কারণ ছাড়িয়ে- ধারণ করার যাওয়া কথাটিই অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দেয়। শিল্পী কালিদাসের এই প্রদর্শনীতে অজস্র মুখমণ্ডলের ডিজিটাল-লিথো স্থান পেয়েছে। ডিজিটাল-লিথোর মতো নিরীক্ষামূলক পদক্ষেপ তাঁর নানা মাধ্যমে আগেও আমরা দেখেছি। মিডিয়াগত নতুনত্ব চিত্রভাষার সঙ্গে যে-নতুন সম্পর্কগুলো নির্ণয় করে, কালিদাস সে-ব্যাপারে বরাবরই অতি সচেতন। মূলত মিডিয়ার চরিত্রই চিত্রবস্তুর উপরিতল এবং অন্তঃস্তল- বুননে ব্যাপক প্রভাব রাখে। সাধারণত মিডিয়া বা মাধ্যম একজন চিত্রকরের কাছে অনেকটা পাত্রের মতো বিষয়। অর্থাৎ একই বস্তুকে বিবিধ আলো- আঁধারী এবং আকৃতিতে পর্যবেক্ষণ করলে যেমন রকমফের হয়, বিষয়টি তেমন। চিত্র-প্রদর্শনীর এই মুখগুলো নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের নয়। দেখে মনে হতে পারে একজন পর্যটকের দৃষ্টিতে মানুষের নানা অভিজ্ঞতার ছাপ নিয়ে মুখগুলো ধরা পড়েছে। নারী-পুরুষের এই মুখগুলো ধূসর পটভূমিতে অতি সাবলীল কালো রেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কালিদাসের রেখা বহমান। অর্থাৎ গতিসম্পন্ন, কিন্তু সেই গতি অতীতের। যে-কারণে নস্টালজিয়া মাত্রাগুলোয় ছবির ইমেজ পাওয়া যায় । শক্ত বলিষ্ঠ রেখার পশ্চাতে হালকা ছায়ার আদলে নানা শেড এবং সাদা রেখা তৈরি করা হয়েছে। যেগুলো মুখমণ্ডলগুলোতে ইলিউশন তৈরি করে। এই ইলিউশন আরো কিছু ছবিতে অন্যভাবে নিয়ে আসা হয়েছে। যেমন অনেক ছবিতে একটি মুখমণ্ডলের উপর আরেকটি মুখমণ্ডলের প্রতিস্থাপনের ফলে একপ্রকার দৃষ্টিমায়ার মাধ্যমে বিষয়গুলো প্রকাশিত হচ্ছে। এই মায়া মানুষের ব্যক্তিচরিত্রের। যে-চরিত্র তার নিয়ন্ত্রণে নেই, বরং সমাজ-নির্ধারিত এবং সমাজ-নিয়ন্ত্রিত। যেখানে ব্যক্তি-বিশ্বাস এবং সম্পর্কের জন্যেও সমাজকে প্রতিবদ্ধ করা যায় । এর ফলে দেখা যায় শিল্পী কালিদাসের এই মুখমণ্ডলগুলো সমাজের কথা যেমন বলে তেমন মানুষের এলিয়েনেশন নিঃসঙ্গতার কথাও বলে। সে- কারণে এই নিঃসঙ্গতার, বিচ্ছিন্নতার দায়ভার তিনি প্রকৃতির উপর ন্যস্ত করেছেন। তাই গ্যালারির একটি কক্ষে ঝরাপাতার কার্পেট তৈরি করে মধ্যবর্তীস্থানে ফেলে রেখেছেন একটুকরো কাচের টুকরো, জলের চিহ্নস্বরূপ। দর্শক শুকনো পাতার উপর হাঁটতে বাধ্য হবেন। সহজেই একটি প্রাকৃতিক রূপকের সুন্দর স্বাদ এতে পাওয়া যাবে। তবে আরেক জায়গায় লৌহ-ধনুক ও প্রতিমা মুখমণ্ডলের কম্পোজিশনটি অপ্রাসঙ্গিক ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল মনে হয়েছে।

কিছু বড় বড় মিশ্র মাধ্যমের কাজে ছোট ছোট আইকন-সদৃশ আলাদা-আলাদা ড্রয়িং-সম্ভার যেন মুখমণ্ডলেরই আরেক অভিব্যক্তি। ফলে চিন্তার যোগসূত্র প্রদর্শনীটিতে বিদ্যমান ছিল। রং-ব্যবহারে শিল্পী কালিদাসের স্বতঃস্ফূর্ত মনোভাব এবং গ্রাফিক্স-ব্যবহারের সহ-অবস্থান নির্দিষ্ট কম্পোজিশন তৈরি করে। এই কম্পোজিশন শহুরে জীবনের সংকটকে নির্দিষ্ট করতে চায়। এই সংকট শেষ পর্যন্ত অস্তিত্বের। যে- কারণে কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে অস্তিত্ববাদী বলা যায়।