বিয়েটা জেসমিন মেনে নিল। তার বাবা বলল – ছেলের আগে একটা বিবাহ হইছে তো কী হইছে! এইটা কুনো ব্যাপার না। আমার মেয়ের দিকটাও দেখন দরকার। জেসমিন ভেবে দেখল – হ্যাঁ, তার দিকটাও দেখা দরকার বইকি। তার চেহারা বিশেষ ভালো নয়। তার গায়ের রং যদিও ফর্সা, নাক বোঁচা আর ঠোঁট একটু ছড়ানো, চোখদুটোয় কিছু মায়া আছে, তবে সেটা বোঝার জন্য বেশ কিছুক্ষণ দুচোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। তা, কে এমন পুরুষ আছে, জেসমিন অন্তত দেখেনি, তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবে! লেখাপড়ায় সে অবশ্য মোটামুটি। বিএ পাশ করে সে এমএ পড়ার কথা ভাবছিল। তার বাবা বলল – থোও, বটি দিয়া আলু-পটল কাটার জন্য এমএ পড়া লাগে না। বিএ পাশ করছ, এই যথেষ্ট।
জেসমিন জিজ্ঞেস করল – তাহলে বাবা, আমি এখন কী করব?
তার বাবা রাগ-রাগ চোখ তুলে তাকাল – তোমারে না বলছি আমার সঙ্গে ন্যাকা ভাষায় কথা বলবা না। কেন বলতেছ?
বাবার রাগ-রাগ চোখের সঙ্গে জেসমিনের অনেকদিনের পরিচয়, সে ঘাবড়াল না, সে বলল – ঠিক আছে, আর বলব না। কিন্তু আমি এখন কী করব? আমার খুব এমএ পড়ার ইচ্ছা।
বলছি না – থোও। এইবার তোমার বিবাহ।
তবে দেখা গেল, বিয়েটা খুব সহজ ব্যাপার না তার জন্য। তার বাবা চেষ্টা করতে লাগল, তাদের আত্মীয়-স্বজন এমনকী পাড়া-প্রতিবেশীরাও। ছেলেপক্ষ দলবেঁধে তাকে দেখে গেল একের-পর-এক, কিন্তু পছন্দ করল না।
তার বাবা বলল – জেসমিনের মা, মাইয়া তো আমারে রাস্তায় নামাইব। থালা হাতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেছি, এই দৃশ্য চোখের সামনে দেখতেছি।
জেসমিনের মা বলল – কী যে কও না তুমি! মেয়ে তোমারে রাস্তায় নামাইব ক্যান! তুমি তো তার ল্যাখাপড়াও বন্ধ কইরা দিছ।
আরে বুঝতেছ না, এই যে ছেলেপক্ষ আসে, যা দেই ঠাইসা খায়। কয়দিন পারুম। পয়সা লাগে না?
তাইলে ছেলেপক্ষ আর য্যান না আসে, সেই ব্যবস্থা করো।
মাইয়ারে ঘরে বসাইয়া রাখবা? তোমার মাথায়? ওজন নিতে পারবা তো?
জেসমিনের দিন ঘরে বসেই পার হতে লাগল। তার বাবা বলল – এই মাইয়ারে নিয়া কী করি কও! এই মাইয়া মা-বাপের মুখের দিকে চাইয়া একটা প্রেমও করতে পারে নাই।
জেসমিন একদিন সাহস করে বলল – বাবা, তুমি আমাকে এমএ পড়তে দাও। এমএ পাশ করে আমি স্কুলে মাস্টারি করব।
বাবা তার দিকে কতক্ষণ গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে থাকল – তোমার বিবাহ হইতেছে না ক্যান জানো?
সেটা জেসমিনের অনেকটাই জানা ছিল, প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত, কিন্তু সে জিজ্ঞেস করল – কেন?
তুমি বইয়ের ভাষায় কথা বলো, এই জন্য। তোমার কথা শুইনা ছেলেপক্ষ ভাবে – এইটা কী! যদি ওইভাবে কথা না বলতা, দেখতা ফট কইরা তোমার বিবাহ হইয়া গেছে।
এইবার জেসমিন মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল।
বাবা বলল – মাঝে মইধ্যে বইসা খাতায় কী সব লিখ না – গান, কবিতা – এইসব যদি না লিখতা তাইলেও বিবাহ হইত।
জেসমিনের কান্না পেল। তার সহজে কান্না পায় না। বাবা যদি উঠে তাকে এখন মারতে আরম্ভ করে, এ-বয়সেও বাবার মার খেয়ে তার কান্না পাবে না, কিন্তু তার একটা দুর্বল জায়গা আছে, গান আর কবিতা লেখে সে, এই গান আর কবিতা লেখা নিয়ে কেউ তাকে খোঁটা দিলে তার কান্না পায়।
তার কান্না পেল, যদিও সে কাঁদল না, সে জিজ্ঞেস করল – এইসব কি খারাপ কিছু?
খারাপ না ভালো, সেইটা তো দেখতেছই, তোমার বিবাহ হইতেছে না।
সেটার সঙ্গে গান আর কবিতার কী সম্পর্ক? বাবা, তুমি আমাকে এমএ পড়তে দাও।
তুমি এক কাজ কর। এই যে এমএ পড়তে চাও, এইটারে তুমি মন থেইকা মুইছা ফেলো। বিবাহের দিকে মন দাও। একবারও ভাবছ, ছেলেপক্ষ আসে কিন্তু তোমারে পছন্দ করে না, এইটার কী কারণ?
মাখনের খবর নিয়ে এলো জেসমিনের দূর সম্পর্কের ফুপু। জেসমিনের জন্য পাত্র খুঁজতে যাদের বলে রাখা হয়েছিল তাদের মধ্যে এই ফুপু অন্যতম। সে বয়স্ক এবং মেজাজি মহিলা। আপাতত তার একটাই কাজ – ঘটকালি করে কিছু সোয়াব হাসিল করা।
সেই ফুপু মাখনের খবর নিয়ে এসে জেসমিনের বাবাকে বলল – এর চেয়ে ভালো পাত্র আর পাইবা বইলা তো মনে হয় না।
বাবা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল – আমারও সেই রকমই ধারণা। সমস্যা নাই।
সমস্যা যদি ধরো, তাইলে একটাই – পাত্র দোজবর।
এইটারে আমি সমস্যা মনে করি না। আমার মেয়ের দিকও দেখা দরকার।
মাখনের কিন্তু ট্যাকা অনেক। বড় ব্যবসা।
মাশাল্লাহ।
আর, তার বউ যে মরছে, এইটায় তো তার কুনো হাত নাই। অসুখ হইছে, মরছে। মাখন চিকিৎসার কুনো ত্রুটি করে নাই।
ছেলে যে ভালো এইটা তো বোঝাই যাইতেছে।
সংসারও ছোট – মাখন আর তার মা। মাখনের সন্তান নাই।
বুবু, তুমি এখন দেখো মাখনে রাজি হয় কিনা।
মাখন তার দুবন্ধুকে নিয়ে জেসমিনকে দেখে গেল, জানাল, জেসমিনকে তার পছন্দ হয়েছে। এখন দিন-তারিখ ঠিক করা দরকার। জেসমিন বলল – এই বিয়ে সে করবে না। তার বাবা জানতে চাইল – কেন? জেসমিন বলল, ছেলের আগে বিয়ে হয়েছে এজন্য সে ওই ছেলেকে বিয়ে করবে না।
ওই ছেলের কয়বার বিবাহ হয়েছে? তার বাবা জানতে চাইল।
একবার।
ওই ছেলের দশবার বিবাহ হইলেও সে তোমার তুলনায় উপযুক্ত। তুমি কপাল কইরা আসছিলা যে, সে তোমারে বিবাহ করতে রাজি হইছে। এইরকম ছেলে লাখে একটা পাওয়া মুশকিল। আগে কী তোমারে কেউ বিবাহ করতে রাজি হইছে?
আমি এই বিয়ে করব না।
কেন করবা না? ছেলের আগে বিবাহ হইছে, তাই? ছেলের গায়ের রং কালো? ছেলে মোটা? শুনো জেসমিন, ওইগুলা ব্যাপার না, সে তোমারে বিবাহ করতে রাজি হইছে, এইটাই ব্যাপার। তোমার নিজের দিকটাও দেখা দরকার।
জেসমিন কাঁদল, হইচই করল, দুদিন ভাত খেল না, তারপর বিয়েটা সে মেনে নিল। কারণ তার মনে হলো, তার নিজের দিকটাও দেখা দরকার।
দুই
মাখনের নামের সঙ্গে তার চেহারার কোনো মিল নেই। তার গায়ের রং ধূসর কালো, সে অতি স্থূলকায়। এরকম একটা মানুষের নাম মাখন কী করে হয়, সেটা ভাববার বিষয়। তবে মানুষটা সে ভালো। তার মেজাজ যদিও কিছুটা গরম, তবে তার শরীরের মতো অতটা নয়। এমনিতে সে আন্তরিক ও সংসারী, স্ত্রীর সুখ-সুবিধার দিকেও তার নজর।
জেসমিনের যেটা সমস্যা হলো, শারীরিকভাবে সে মাখনকে নিতে পারল না। প্রথম মিলনের সময় মাখন যে অতি আগ্রাসী ও বোধহীন হয়ে উঠল, তা নয়, তবু জেসমিনের মনে হলো ভালুকের মতো কোনো একটা প্রাণী তাকে দখল করে নিয়েছে। জেসমিন তার এই ভাবনা কাটিয়ে উঠতে পারল না। এটা, একটু ঘুরিয়ে হলেও টের পেল মাখন এবং সে জানতে চাইল – তোমার সমস্যাটা কী, আমারে বলবা?
জেসমিন বলল – আমার সমস্যা মানে! আমার কীসের সমস্যা!
ওই সময়ে তুমি তক্তার মতো পইড়া থাকো ক্যান?
কোন সময়ে?
আসল সময়ে। আসল সময়ে তুমি ঠান্ডা মাইরা যাও।
ওটা তাহলে আসল সময়? জেসমিন ঠিক করল, এখন থেকে আসল সময়ে সে নিজেকে গরম রাখার চেষ্টা করবে। এ থেকে সংসারে নানা অশান্তি হয়, সে বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছে, এদিক-ওদিক দেখেছেও। সে, বিয়ে যখন হয়েছে, সংসারে অশান্তি চায় না। সে তাই মাখনকে বলল – এইটা তোমার ঠিক কথা না।
এইটাই ঠিক কথা।
এইটা তোমার মনের ভুল।
মুখে-মুখে কথা বলবা না। মুখে-মুখে কথা বলা আমার পছন্দ না।
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে জেসমিন বলল – এইটা যদি মুখে-মুখে কথা বলা হয়, তবে আর কোনোদিন মুখে-মুখে কথা বলব না।
খামাখা রাগও করবা না। খামাখা রাগ করা, বেজাড় হওয়া, এইসবও আমার পছন্দ না।
আমার মনে থাকবে।
তোমার শরীরে যদি সমস্যা থাকে, আমারে বলবা, আমি তোমারে ডাক্তারের কাছে নিয়া যাবো। এর মধ্যে লজ্জার কিছু নাই।
জেসমিন তার শরীরের সমস্যা কাটানোর চেষ্টা করল। সমস্যাটা তার শরীরে নয়, মনে। সে ঠিক করল মাখনকে সে আর ওই সময়ে ভালুক বলে ভাববে না। সে নিজেকে বলল – হ্যাঁ, কেন ভাবব আমি, ও তো আর ভালুকের মতো আচরণ করে না, ওর চেহারাটা ওসময় অনেকটা ওরকম হয়ে যায়, এই তো? তা, ওর চেহারা খেয়াল না করলেই হলো।
মাখনকে অন্যভাবে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল জেসমিন। এভাবে কদিন যাওয়ার পর মাখন জিজ্ঞেস করল – তুমি তো আমার বিয়া করা বউ, তুমি আমারে একটা সত্য কথা বলবা?
কিছু না বলে, মাখন কী জিজ্ঞেস করে, তা শোনার জন্য জেসমিন মাখনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। মাখন বলল – কিছু মনে করবা না, আমার মনে হইছে তাই জিজ্ঞেস করতেছি … তুমি কি কাউরে ভালোবাসতা?
মাখনের কথা জেসমিন প্রথমে সত্যিই বুঝতে পারল না। সে তাই জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল, তারপর জিজ্ঞেস করল – কী?
কাউরে ভালোবাসতা? প্রেম করতা?
এই প্রশ্নের উত্তর কী দেবে, চট করে সেটা বুঝতে না পেরে জেসমিন চুপ করে থাকল।
উত্তর দিবা না? মাখন জানতে চাইল।
তার আগে তুমি বলো, জেসমিন বলল, তোমার এই কথা কেন মনে হলো?
উত্তর দিতে একটু সময় নিল মাখন, সে বলল – ওই সময় মনে হয়। রাতে, তখন মনে হয় তুমি অন্য কারো কথা ভাবতেছ।
বড় শ্বাসটা লুকাল জেসমিন, সে বলল- এইটা একদমই ঠিক কথা না।
সেইটা তুমি জানো। আমার মনে হয়, তাই বললাম।
আমার কারো সঙ্গে প্রেম ছিল না। আমি কারো সঙ্গে মিশিই নাই।
না মিশলে ভালো, আর, মিশলেও ভালো। শুধু এখন তারে মনে না করলেই হইল। এখন তোমার-আমার সংসার।
মাখনের মনোভাব সত্যিই এরকম ছিল। মাস পয়লা সে বড় অঙ্কের টাকা ধরিয়ে দিত জেসমিনের হাতে – খরচ করবা।
জেসমিন খরচ করার জায়গা পেত না। মাখন বলত – সংসার গোছাও। কিন্তু সংসার কী গোছাবে জেসমিন, এই সংসার অন্য একজনের হাতে গোছানো। যত নিখুঁতভাবে গোছানো, সেখানে নতুন করে হাত লাগাবার কিছু নেই। আর, নতুন করে কিছু করার নেই বলেই হয়তো, যতই সে চেষ্টা করুক না কেন, এ-সংসারকে সে নিজের ভাবার সুযোগ পেল না। এক করা যায়, সবকিছু বদলে ফেলা যায়। পুরনো যা-যা আছে, তার সবকিছু বাতিল করে দিয়ে নতুন-নতুন সবকিছু দিয়ে ঘরবাড়ি সাজিয়ে তোলা যায়। কিন্তু মাখনের ভেতরে আছে রোখসানা, তার আগের বউ, মাঝে মাঝেই সেটা স্পষ্ট করে টের পাওয়া যায়, তাকে সে সরাবে কী করে?
মাখনের ভেতর থেকে রোখসানা হঠাৎ-হঠাৎই বেরিয়ে আসে। অনায়াসে এবং অনেক সময়, জেসমিনের সঙ্গে তুলনায়। রোখসানা পটলের দোলমা খুব ভালো রাঁধত, তাকে সকালের নাস্তা দিতে কোনোদিন একমিনিটও দেরি করত না, রোখসানা আবদার ধরত, রাতে মাখনের ঘুম না আসা পর্যন্ত সে নিজেও ঘুমাত না, মাখনের সামান্য অসুখে সে অস্থির হয়ে যেত আর শাশুড়ির কী সেবাটাই না করত।
এসব শুনতে শুনতে বিয়ের কয়েক মাস পর একদিন জেসমিনের খুব ইচ্ছা হলো মাখনকে সে বলবে – রোখসানা তোমার ভেতর এতটাই যখন জায়গা দখল করে আছে, তখন তোমার আবার বিয়ে করা উচিত হয়নি। একরম বলার ইচ্ছা হলো তার এবং সে বললও।
মাখন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল – এইটা আবার কী ধরনের কথা বললা!
কথা এইটাই।
রোখসানার কথা আমি বলতে পারব না?
পারবে।
তাইলে!
সবসময় বলো। সবসময় বলো যখন, বোঝা যায় তাকে তুমি খুবই ভালোবাসতে।
ভালো তো তারে বাসতামই।
সেজন্যই বলছি – তোমার আবার বিয়ে করা উচিত হয়নি।
এইটা কী কথা! কীসের মধ্যে কী!
তুমি রোখসানাকে ভুলতে পার নাই।
কেমনে ভুলব! এতদিন সংসার করছি। সে সত্যই ভালো মেয়ে ছিল।
আর আমি, আমি ভালো না।
তুমিও ভালো।
কে বেশি ভালো?
এইটার কি তুলনা হয়?
হয়। তুমিই সবসময়ে তুলনা করো। বলো, কে বেশি ভালো।
এইটা আমি বুঝতেছি না। … শুনো, রোখসানা খুবই সংসারী ছিল।
ও, আমি সংসারী না?
এইটা আমি বলব না। কিন্তু তুমি অন্যরকম। তোমারে বুঝা কঠিন। রোখসানা তোমার চেয়ে বেশি সংসারী ছিল, এইটা আমি বলব।
তিন
এটুকু মেনেই নিত জেসমিন। মাখনকে সে মেনে নিয়েছে, তার বিয়ে হচ্ছিল না, একের-পর-এক পাত্রপক্ষ তাকে নাকচ করে দিয়েছে, তখন মাখন তাকে বিয়ে করেছে। তার মাখনকে বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না, এটা অন্য কথা, তার আসলে একসময় বিয়ে করার ইচ্ছাই ছিল না, তার ইচ্ছা ছিল এমএ পাশ করে সে খুব দূরের কোনো স্কুলে চাকরি নেবে, স্কুলের পাশেই তার থাকার জায়গা হবে, ওখানে সে একা-একা জীবনটা পার করে দেবে; কিন্তু মাখনকে সে বিয়ে করেছে এবং মেনেও নিয়েছে, মাখনের ভেতর রোখসানার যে-উপস্থিতি, সেটুকুও সে মেনে নিল।
তার মেনে নিতে কষ্ট হতো। কেন সে, বিয়ে যখন সে করেছেই, মাখন অন্য একজনকে সবসময়ে মনে করছে, আর তুলনাও – এটা মেনে নেবে! হ্যাঁ, রোখসানার কথা পুরো ভুলে যাবে মাখন, কখনো বেখেয়ালেও তার কথা উল্লেখ করবে না, এটা যে হয় না এটা জেসমিন জানে। তবে তাদের সংসারে অন্য একজন, হোক সে মৃত, সবসময়ে তুলনীয় হিসেবে থেকে যাবে, এটা মেনে নিতে অনেক কষ্ট, তবু সে মেনে নিত। মেনে নিত তার গান আর কবিতা লেখা নিয়ে মাখনের হাসি-ঠাট্টাও। তার গান আর কবিতা লেখার কথা মাখনের অবশ্য জানার কথা নয়। জানিয়েছিল সে-ই, উৎসাহ নিয়ে, হাসি-হাসি মুখে। খাতার একটা পৃষ্ঠা মাখনের সামনে ধরে সে বলেছিল – পড়ো তো।
কী পড়ব? খাতার পৃষ্ঠার দিকে না তাকিয়ে মাখন তাকিয়েছিল তার মুখের দিকে।
এই যে, এটা। পড়ো।
মাখন আবার তার দিকে তাকিয়েছিল, লেখাটা পড়ার পর – এইটা কী?
বুঝতে পারছ না?
দুপাশে মাথা নেড়েছিল মাখন – না। … চিঠি?
গান। হাসিমুখে বলেছিল জেসমিন আর মাখন কী বলে তা শোনার জন্য উজ্জ্বল চোখে তাকিয়েছিল।
গান! মাখন বলেছিল। একটুক্ষণ থেমে ছিল তারপর, জিজ্ঞেস করেছিল – কাকে নিয়ে লিখেছ?
কাকে নিয়ে আবার লিখব! কাউকে নিয়ে না।
কিন্তু এই যে এখানে, … এই যে – ‘কতদিন দেখি না তোমায় …’।
মাখনকে সে অবশ্য শেষ পর্যন্ত বোঝাতে পেরেছিল – গান এরকমই হয়। গান সবার কথা বলে। মাখন বুঝেছিল, তবে উৎসাহ দেখায়নি, জিজ্ঞেস করেছিল অবশ্য – আরও লিখেছ?
কত! তিনটা খাতা ভর্তি।
ও।
কবিতাও আছে অনেক। তোমাকে একদিন পড়ে শোনাব।
থাক। এইসব হইতেছে ফাতরা লোকের কাজ।
ফাতরা লোকের কাজ! রবীন্দ্রনাথ …
সেইদিন এক ছেলে আসছে, কবিতার বই বাইর করব, কবি, বিখাউজ চেহারা, চান্দা চায়।
চাঁদা!
বিজ্ঞাপন দিতে কয় তার পত্রিকায়। এমন ধমক দিছি। আর আমার বউ হইয়া তুমি আছ কবিতা নিয়া। চান্দি ঠান্ডা থাকলে এইসব কাম কেউ করে!
ভালো। … ঠিক আছে, তোমাকে আমি কবিতা শোনাব না।
দরকার নাই। ওইসব আমি বুঝিও না। নদী-নালা …।
লিখতে পারব তো?
কী?
কবিতা বা গান?
সেইটা তোমার ইচ্ছা। লিখলে লিখবা, না লিখলে লিখবা না। তবে সংসার আগে।
আশ্চর্য, আমি কি সংসারের কাজে ফাঁকি দেই? বলো?
এইসব গান-কবিতা বাদ্য-বাজনা নিয়া যারা থাকে, সংসারে তাদের মন থাকে না।
এটুকুও মেনে নিত জেসমিন, মেনে তো আসলে সে নিয়েওছিল, যার সঙ্গে তার সংসার, তার কোনো উৎসাহ নেই স্ত্রীর লেখা গান বা কবিতার প্রতি, এটা কষ্টের, কিন্তু উপায় নেই বলে মেনে নেওয়ারও। উলটোটা হতে পারত। মাখনের খুব উৎসাহ থাকতে পারত তার লেখা গান বা কবিতার প্রতি – এইটা তুমি লেখছ! সত্য?
কী বলো তুমি! জেসমিন হাসিমুখে বলত। আমি লিখিনি তো কে লিখেছে!
এত সুন্দর! আমার বিশ্বাস হয় না।
তাহলেই বোঝো, কত গুণ তোমার বউয়ের।
তাই তো দেখতেছি। কতগুলা লেখা হইছে, বলো তো?
কেন?
আমার এক বন্ধু আছে গানের লাইনে। তারে দিব। সে যদি কাউরে দিয়া গাওয়াইতে পারে।
আরে না, এগুলো অত ভালো হয়নি।
কী যে কও না তুমি! আমি বুঝি না?
এরকম যদি বলত মাখন, কতটা ভালো লাগত তার, জেসমিন আন্দাজ করতে পারে। মাখন কখনো ওরকম বলবে না, সেটা তার জানা হয়ে গেছে। তবে হয়তো বারণও করবে না। চোখ রাঙিয়ে বলবে না – শোনো, এই বাড়িতে ওইসব ঢং বন্ধ। সংসারে মন দাও।
সংসারে মন দাও – এ-কথাটা প্রায়ই বলে মাখন। বলে, সংসারে তার মন নেই। আচ্ছা, সংসারে তার মন নেই, এটা কী করে বোঝে মাখন? আর, তার চেয়েও বড় কথা, কাউকে সে অবশ্য বলে বোঝাতে পারবে না কেন সে এই কথা বলছে, তবু বড় কথা আসলে ওটাই – এটা কি সত্যিই কোনো সংসার?
চার
জেসমিনের ঘুম ভাঙে ভোরবেলা। এটা তার বহুদিনের অভ্যেস। যত রাতেই সে ঘুমোতে যাক না কেন, ঘুম তার ভোরবেলায়ই ভাঙবে। মাখনের ঘুম ভাঙে দেরি করে। জেসমিনের যদি ভাঙে ছটায়, মাখনের ভাঙবে আটটায়। এই দুঘণ্টা, এ-সংসারে আসার পর থেকে, তার কিছু করার নেই। আগে সে বিছানায়ই বসে থাকত। বড়জোর উঠে ঘরের মধ্যে একটু হাঁটাহাটি। এখন সংকোচটুকু নেই, সে উঠে এঘর-ওঘর করে। সকালের নাস্তার ব্যবস্থা করে, কিংবা করতে-করতে, কখনো বারান্দায় এসে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকে, কখনো শোবার ঘরে ফিরে, যদিও জানা আছে কখন উঠবে মাখন, অপেক্ষা করে মাখনের ঘুম ভাঙার। ঘুম ভাঙলে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে মাখনের এক কাপ চা চাই। এটা কোনো সমস্যা না। চা বানাতে তিন মিনিটের বেশি লাগে না। সেই চা মাখন দশ মিনিট ধরে খায়। এ-সময়টায় কোনোদিন সে জেসমিনের সঙ্গে কথা বলে, নিতান্তই সাধারণ কথা, কোনোদিন তাও বলে না। চা খেয়ে সে বাথরুমে যায়, বেরোয় একবারে গোছল সেরে। তারপর নাস্তা। নাস্তার টেবিলে কথা হয়। কখনো মাখনের ব্যবসা নিয়ে, কখনো মাখনের বন্ধুদের নিয়ে, কখনো টাকা উপার্জন করতে মাখনের কত কষ্ট হয় তা নিয়ে, কখনো রোখসানার রান্নার হাত কতটা ভালো ছিল, তা নিয়ে মাখন কথা বলে আর জেসমিন শোনে।
এরপর সারা বাড়িতে আর কোনো শব্দ নেই। মাখন বেরিয়ে যায়, জেসমিনের কিছু করার থাকে না। একা একা তার কান্না পায়, তার ভয়ও লাগে। তার মনে হয় রোখসানা নামের মেয়েটা বোধহয় তার পাশে পাশে হাঁটছে, তার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে।
তার এই ভয়ের কথা একদিন সে বলল মাখনকে। মাখন তার দিকে কতক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল – রোখসানা তোমার দিকে তাকাইয়া থাকে আর হাসে?
ঠিক সে-রকম না। মানে সে-রকম তো হতে পারে না। কিন্তু আমার মনে হয়।
মাখন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল – এইসব আজেবাজে চিন্তা ক্যান করো। রোখসানার এই স্বভাব ছিল না।
ও। জেসমিন বলল। বলে সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। সে তাকাল না মাখনের দিকে, সে বলল – মাঝে-মাঝেই তুমি এত রাত করে ফেরো। আমার কিছুই করার থাকে না।
তোমার সংসার আছে। মাখন অবাক গলায় বলল। তুমি আর কী করবা!
আমার সময় পার হয় না।
এইটা একটা অদ্ভুত কথা। নিজের সংসারে সময় পার হয় না!
তোমার যেদিন আসতে দেরি হবে, তুমি যদি বলে যাও, আর আমি যদি একটু মা-র ওখানে যাই, ধরো কোনো-কোনোদিন তুমি তোমার অফিসে যাওয়ার পথে আমাকে তো মা-র বাসায় একটু নামিয়ে দিতে পারো।
মাখন হাসল – ঘরে কী ব্যবস্থা নাই তোমার, তোমার সুখের জন্য কী করি নাই, তারপরও সবসময় মায়ের বাড়ি যাইতে চাও, ক্যান, এই সংসার কি তোমার নিজের মনে হয় না?
পাঁচ
দুপুরবেলাটা ঘুমিয়ে পার করতে পারলে বেশ হতো। দুপুরবেলা তার চোখে এক ফোঁটা ঘুমও আসে না। দুপুরবেলাটা, অধিকাংশ দিন, সে পার করে বারান্দায় বসে। তাদের বারান্দাটা বড়, লম্বা ও চওড়ায়। একটু ভেতর দিকে বসলে দুপুরে কোনো তাপই টের পাওয়া যায় না।
জেসমিন বারান্দায় বসে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের বাড়ির সামনে, বেশ কিছুটা দূরে অবশ্য, একটা পুকুর। পুকুরের এক মাথায় কয়েকটা সুপারি গাছ। এদিকে অবশ্য বাড়ি উঠছে। কিছুদিন পর পুকুরটা আর দেখা যাবে না। এখন দেখা যায়, জেসমিন দেখে। দুপুরবেলা সুপারি গাছ মাথায় নিয়ে শুয়ে থাকা পুকুরটার দিকে তাকিয়ে থাকতে তার বড় ভালো লাগে।
এক দুপুরে বারান্দায় বসে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ করেই একজনকে দেখল জেসমিন। পুকুরপাড়ে হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে বসে আছে। ওই পুকুরে কারা আসে, কারা বসে, কারা গল্প করে, তাদের চেনা আছে জেসমিনের। চেনা আছে মানে জেসমিন তাদের শারীরিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু এই লোকটা নতুন। অথচ আশ্চর্য ব্যাপার, জেসমিন অবাক হলো, লোকটাকে তার অচেনা মনে হলো না। তার মনে হলো এই লোকটাকে আগে সে কোথাও দেখেছে।
জেসমিন লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকল। মনে করার চেষ্টা করল কোথায় লোকটাকে সে দেখেছে। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও সে মনে করতে পারল না। জেসমিন হাল ছেড়ে দিল না, সে ভাবল ঠিকই সে মনে করতে পারবে। একদম অচেনা যদি কেউ হতো, তবে নিশ্চয় এতটা চেনা-চেনা লাগত না। কোথায় দেখেছে, কোথায় দেখেছে সে লোকটাকে – ভাবতে ভাবতে তার ভুরু কুঁচকে গেল।
লোকটা বসে আছে স্থির ভঙ্গিতে। কোনদিকে তাকিয়ে আছে সেটা এতদূর থেকে বোঝা মুশকিল। তবে জেসমিনের মনে হলো লোকটা আসলে কোনোদিকেই তাকিয়ে নেই। চারপাশের কোনোকিছুর প্রতি তার মনও নেই। লোকটা সবকিছু থেকে
নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে নিজের ভেতর নিশ্চুপ হয়ে আছে। দারুণ তো – জেসমিন মনে মনে বলল – কিন্তু লোকটা কে, এটা আমাকে বের করতে হবে। ‘এই যে’ বলে জেসমিন হঠাৎই চেঁচিয়ে উঠল, তারপরই সে লজ্জা পেয়ে গেল – এর কোনো মানে হয়! এতদূর থেকে ডাকলে শুনবে? তাছাড়া এতদূর থেকে সে ডাকতেই বা যাবে কেন! হাসল সে, হাসিমুখে
মৃদুগলায় বলল – এই যে, শোনো তো, আমি কি তোমাকে চিনি?
প্রশ্নটা করে উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকল জেসমিন। কোনো উত্তর এলো না, সে তখন বলল – এই সামান্য একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে তোমার কি খুবই অসুবিধা হচ্ছে?
কী উত্তর দেবো? জেসমিন শুনল লোকটা এই কথা বলল। সে অবাক হয়ে গেল, আরে, দারুণ তো, এতদূর থেকে লোকটা তাহলে তার কথা শুনেছে, আবার উত্তরও দিয়েছে। জেসমিন বলল – কী উত্তর দেবে মানে! আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম তোমাকে আমি চিনি কিনা, বলো, চিনি?
না।
না!
আমার মনে হয় না।
কিন্তু তোমাকে যে আমার খুবই চেনা-চেনা মনে হচ্ছে!
জেসমিনের মনে হলো লোকটা একটু হাসল – তাই!
হুঁ। …আচ্ছা দাঁড়াও, কিছুই তোমার বলতে হবে না। আমিই তোমার পরিচয় বের করব। দাঁড়াও।
জেসমিন একদৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকল। আর কী আশ্চর্য, অতদূর থেকেও লোকটা বোধহয় সেটা টের পেল। জেসমিনের যেন সুবিধা হয়, সে-জন্যই যেন একটুও সে নড়ল না। হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে কোনোদিকে না তাকিয়ে বসে থাকল তো থাকলই। এইভাবে একটু একটু করে অনেক সময় পার হয়ে গেল। দুপুর গড়িয়ে বিকালও ফুরোল, তারপর ওদিকটায় অন্ধকার নামল, লোকটাকে আর দেখা গেল না।
রাতে যখন ফিরল মাখন, জেসমিনের যদিও ইচ্ছা হলো খুব লোকটার কথা সে বলবে, কিন্তু সে বলল না, কারণ তার মনে হলো, মাখনকে এই কথা বলা যায় না, মাখন অন্যকিছু ভাববে।
পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙলে প্রথমেই বারান্দায় গেল জেসমিন। সে অবশ্য তার কাণ্ড দেখে নিজেই হেসে ফেলল – আচ্ছা, এটা একটা কথা হলো, লোকটা এই ভোরবেলা পুকুরের কাছে এসে বসে থাকবে! একটু বেলা হোক।
বেলা হলো, লোকটাকে দেখা গেল না। মাখন বেরিয়ে যাওয়ার পর জেসমিনের কোনোই কাজ নেই। তাই সে বারবার বারান্দায় আসতে লাগল। ব্যাকুল চোখে তাকাতে লাগল। লোকটার অবশ্য দেখা নেই। লোকটাকে দেখা গেল আবার ওই দুপুরে। ততক্ষণে জেসমিন অস্থির। সে রাগ আর অভিমান মিশিয়ে বলল – এর কোনো মানে হয়!
লোকটা জবাব দিল না।
আমি সেই সকাল থেকে অপেক্ষা করছি।
লোকটা একবার একটু ফিরে তাকাল।
রাগ হয়েছে আমার। তোমার ওপর।
লোকটা সামান্য হাসল।
হাসলে চলবে?
আমি এরকমই।
খুব বললে। এতক্ষণ কোথায় ছিলে?
ছিলাম।
এটা কোনো উত্তর হলো!
হবে না কেন – ছিলাম তো।
ভালো। …শোনো, কাল সারারাত ভেবেছি তোমার কথা, যদিও এখনো চিনতে পারিনি তোমাকে।
চেষ্টা চালিয়ে যাও।
মনে হচ্ছে, নিজে থেকে চিনতে পারব না তোমাকে, যদি তুমি না বলো। …বলবে?
কী?
কে তুমি?
আমি কেউ না।
এটা একটা কথা বললে। তুমি কীভাবে কেউ না হও!
আমি কেউ না।
আচ্ছা, বেশ। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা দোলাল জেসমিন। বেশ, তুমি কেউ না। এসেছ কোত্থেকে, নাকি আসোনি?
আমি যেখান থেকে এসেছি, সেখানে আবার চলে যাব।
চলে যাবে?
থাকে নাকি কেউ?
জেসমিনের ভয় ছিল, লোকটা হয়তো পরদিনই চলে যাবে। এই আশঙ্কায় সে ভেতরে ভেতরে এতটাই অস্থির হয়ে থাকল, মাখনের নজরেও সেটা পড়ল। জেসমিন অবশ্য তাকে কাটাতে পারল। তবে নিজের অস্থির-অবস্থা দূর করতে পারল না। সেটা দূর হলো পরদিন দুপুরে, যখন সে দেখল লোকটা পুকুরের কাছে এসে বসে আছে।
আচ্ছা, এই যে রোদের মধ্যে বসে আছ, তোমার অসুবিধা হয় না? জেসমিন জিজ্ঞেস করল।
লোকটা বলল – মাথার ওপর সুপুরি গাছ।
ওতে কি রোদ কাটে?
না কাটুক। রোদের কথা মনে না করলেই হলো।
ইস, তাই যদি হতো, মনে না করলেই যদি হতো, আবার, মনে করলেই যদি হতো!
হবে না কেন!
ঠিক আছে, হবে। …মানে, চেষ্টা করে দেখি – হয় কিনা। তুমি বন্ধু হবে আমার?
মনে করে নাও। এভাবেই শুরু হোক – আমাকে বন্ধু মনে করে নাও।
জেসমিন লোকটাকে বন্ধু মনে করে নিল। তখন, সে দেখল, সময় কাটাতে তার খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। দুপুর পর্যন্ত অবশ্য একটা ছটফটে অবস্থা থাকে, তবে সে তো জানেই দুপুরের আগে ওই লোকের সঙ্গে তার দেখা হচ্ছে না।
প্রতি দুপুরে তারা নানা গল্প করে। গল্প অবশ্য জেসমিনেরই, লোকটা শোনে, কখনো কিছু বলে, কখনো কিছুই বলে না। এই নিয়ে মাঝে মাঝে জেসমিনের খুব রাগ হয় – তুমি একটা কী মানুষ, বলো তো? আমি বকবক বকবক করেই যাই আর তুমি কিছুই বলো না।
কী বলব?
আশ্চর্য, কিছুই বলার নেই তোমার?
আমার আসলে শুনতে ভালো লাগে।
আর আমার বলতে।
ব্যস, তাহলে তো হয়েই গেল। তুমি বলবে, আমি শুনব। … এরকমই চলছে, তাই না?
চলছে। কতদিন চলবে, জানি না। তুমি বলেছ – চলে যাবে।
এর মধ্যে নতুন লিখলে কিছু? গান বা কবিতা?
তুমি কথা ঘোরাচ্ছ।
এর মধ্যে নতুন কী লিখলে?
কবিতা। …তোমাকে নিয়ে। মাখনকে পড়তে দিয়েছিলাম, জানো …।
মানে! আমি যতদূর জানি উনি এসব পছন্দ করেন না।
করে না। আমিই বলেছি তোমাকে। তবু… মনে হলো তোমাকে নিয়ে লেখাটা ভালো হয়েছে, তাই পড়তে দিলাম। দিলাম মানে জোর করেই পড়ালাম। পড়ে ভেংচি কাটল। … তুমি হাসছ? হেসো না। বলল – এসব কী, এসবের কী মানে – ‘সুদূর আমায় টান দিয়েছে’ – সুদূর কি মানুষ না জন্তু যে টান দেবে! … হেসো না বলছি।
না, হাসব না।
আমার জন্য তোমার বরং দুঃখ হওয়া উচিত।
আমার কারও জন্যই দুঃখ হয় না।
হুঁ। …আমি যদি তোমার মতো হতে পারতাম।
জেসমিন বলল – তুমি যদি হঠাৎ করে না আসতে কী যে হতো আমার।
কী হতো?
তুমি জানো না কী হতো? তুমি জানো না আগে সারাটা দিন আমার কী অসহ্য কাটত!
লোকটা চুপ করে থাকল।
তারপর হঠাৎ করে তুমি এলে। আমার সবকিছু এমন বদলে গেল। আমার এই পরিবর্তনটা মাখনের চোখেও পড়েছে।
তুমি বলেছ আমাকে।
হঠাৎ সেদিন জিজ্ঞেস করল – ব্যাপার কী! আমি বললাম – ব্যাপার আবার কী? এই তো। … আমার মনে হয়, ও আমাকে একটু একটু সন্দেহ করছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করল আমি সারাদিন কী কী করি।… আমার তখন কী ইচ্ছা করছিল জানো?
অনুমান করতে পারি।
ইচ্ছা করছিল বলি – ছুটির দিনে দুপুরটা না ঘুমিয়ে জেগে থাকো, কিংবা যে-কোনো দুপুরে বাইরে থেকে ফিরে আসো হঠাৎ করে। দেখবে কী করি।
কী দেখবে? লোকটা হাসল। মানে তুমি কী দেখাবে?
তোমাকে দেখাব। মাখনকে বারান্দায় এনে বলব – ওই যে, দেখো, ওই যে …।
লোকটা জিজ্ঞেস করল – কী, তোমার কর্তা আর কিছু বলেছেন?
জেসমিন হাসল – নাহ। সন্দেহ কিছু বোধহয় কমেছে।
তাহলে তো ভালো খবর। তোমার গান-কবিতা এসব নিয়ে কিছু বলছেন-টলছেন?
না। …না বলুক। তার জন্য তুমি আছ।
কথা কি ওরকমই কম কম-বলেন?
ওরকমই। …আমার অবশ্য এখন আর খারাপ লাগে না। দুপুর-বিকাল তোমার সঙ্গে কথা বলি। …আমার মাঝে মাঝে খুবই অবাক লাগে…।
কেন?
তুমি হঠাৎ করে কোত্থেকে এলে বলো তো!
এলাম।
রোজ দুপুরে বসে থাকি বারান্দায়। ওসময় পুকুরের কাছে কেউ থাকে না। হঠাৎ একদিন দেখি তুমি বসে আছ। চেনা চেনা লাগল তোমাকে, কথাও বলতে আরম্ভ করে দিলাম …।
ভালো হয়েছে না?
তবু, ওই যে বললাম – মাঝে মাঝে অবাক না হয়ে পারি না। চেনা-চেনা লাগল তোমাকে, এতদিন ধরে কথাও বলছি, তবু চিনছি না। তুমি বোধহয় কোনোদিনই বলবে না, কে তুমি…।
বলিনি – কেউ না।
হুঁ।… কেউ না। … মাঝে মাঝে খুব ভয়ও হয়।
কেন?
দুটো কারণ। কোনটা বলব?
দুটোই।
হঠাৎ যদি দেখি তুমি নেই। ধরো, এক দুপুরে বারান্দায় এসে দেখি তুমি চলে গেছ।
যেতেও পারি। …ভয়ের দ্বিতীয় কী কারণ?
তোমার ওই চলে যাওয়াটাই। ধরো বারান্দায় এসে দেখলাম তুমি চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছ।
হুঁ…।
আমার ভয় হয় – তখন তোমাকে বলে বসব না তো – আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাও।
কোথায়?
জানি না। শুধু হয়তো বললাম – তুমি আমাকে নিয়ে যাবে। … যাবে?
তোমার না সংসার আছে?
সংসার?
হ্যাঁ।
তাই তো …!
সংসার ছেড়ে যাবে?
উত্তর না দিয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকল জেসমিন।
কী হলো? সংসার ছেড়ে যাবে?
দুপাশে মাথা নাড়ল জেসমিন, বলল – না। তারপর সে হাসতে আরম্ভ করল। তাকে আনন্দিত ও উদ্ভাসিত দেখাল।
হাসছ কেন!
কারণ, আমি জেনে গেছি।
কী?
আমি খামাকা ভয় পাই। তুমি আসলে যাবে না।
যাবো না?না। তুমি থাকবে। জেসমিন বলল। তাকে স্থির ও বিশ্বাসী মনে হলো। তুমি থাকবে। আমার সংসার থাকবে, আর, তুমিও থাকবে।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.