শাকের তখন ছোট ছিল, প্রাথমিক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। বাবার চেয়ে দাদার সঙ্গেই বেশি বের হয়, দাদা বেশি ভালোবাসে। দাদি অন্যরকম প্রিয়, দাদি শোনায় গল্প।
গ্রামের নদী, বটগাছ, টিলা বা পাহাড়, ঝোপঝাড় আর মসজিদ – শাকেরের জীবনের বিশেষ বিশেষ প্রিয়। মসজিদ প্রিয়, কারণ শুক্রবারে সেখানে কোরান শিখতে যায়। নদী প্রিয় অনেক কারণে, সেখানে সাঁতার কাটে, বালুচরে বাতাবিলেবু দিয়ে ফুটবল খেলে। বাতাবি যখন থাকে না তখন খড়, ন্যাকড়া দিয়ে বল বানিয়ে খেলে। জোয়ারের সময় সে কী আনন্দ! ভাদ্র মাসে মাছ নামে বিল থেকে। বোশেখ মাসে নতুন বৃষ্টির পানিতে মাছ ছোটে উজানের দিকে। গ্রামের শেষ মাথায় আছে নদীর বাঁকের কুম বা গভীর পানি। ওখানে মাছেরা বৈশাখি পূর্ণিমার দিন বৃষ্টির পানিতে ডিম ছাড়ে। রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল আর কালবোস মাছের উজানে ছোটার দৃশ্য দেখতে ওর কী যেমজা! লোকে তখন হাত-জাল নিয়ে ছোটে মাছের পেছনে। কুমে পৌঁছার আগে নদীতে পানি থাকে হাঁটু বা কোমরসমান। মাছ তখন ধরতে হয়, কুমে পৌঁছলে আর ধরা যাবে না। পাড়ার ছেলে-বুড়ো নদীর কূলে বসে বসে দেখে। আর নদীর কূলে আছে মাঘ-ফাল্গুনের যত তরকারি আর ফল। তরমুজ, ফুটি, শশা আর মিষ্টি রাঙাআলু – কোনটা ফেলে কোনটা খায়। দাদা সঙ্গে নিয়ে যায় শাকেরকে। হাতে ধরে নাচতে নাচতে যায়। পাড়ার লোকেরা শাকেরকে দেখে গাল টিপে দেয়। মাথার চুল এলোমেলো করে দেয়। কী আশ্চর্য! দাদাকে অমন করে না, তার বেলায় শুধু অন্যরকম। মসজিদ ভালো লাগে সুর করে কোরান শেখার জন্যে। মুখে মুখে সে মুখস্থ করে নেয়, সবার আগে থাকে সে। মৌলভি যেমন যেমন উচ্চারণ করে ঠিক সে-রকম সুর করে মুখস্থ করে নেয়। একটুও এদিক-ওদিক হয় না।
আর হ্যাঁ, বটগাছটা বিশাল! ঝুরি নেমে সরমাদের আধবিঘে জমি দখল করে নিয়েছে। কেউ মানা করে না। পাড়ার মলিনা বৌদি ও অনেকে কলসিতে করে পানি এনে গাছের গোড়ায় দেয় ফাল্গুন-চৈত্র মাসে। চৈত্র মাসে মেলা বসে। কী মজা তখন! গাজন হয়। চুল-দাড়ি লাগিয়ে ত্রিশূল নিয়ে সাজে শিব, মুখে রং মেখে লম্বা চুল নিয়ে শাড়ি পরা একজন সুন্দরী মেয়ে থাকে। আসলে সে ছেলে, সেজেছে মেয়ে। সঙ্গে দু-তিনজন সাগরেদ থাকে পেট-নাভি দেখিয়ে। একটা ষাঁড় থাকে চুল-দাড়িওয়ালার পিছে পিছে। ওদের পিছে পিছে যেতে ওর খুব মজা। গাজনের গান হয় খঞ্জনি ও ঢোল বাজিয়ে।
সকালটা শাকেরের খুব প্রিয়। স্কুলে যাওয়ার জন্য ছুটে যায় নদীতে, সাঁতার কেটে, ঝাঁপিয়ে, বালুচরে দৌড়ে খুব সুখ। নদী থেকে এসে রাক্ষুসে খিদে নিয়ে মায়ের কাছে বসে গরম ভাত খেয়ে তাড়াহুড়ো করে স্কুলে যেতে কী যে আনন্দ! তারপর নদীর কূলে কূলে দৃশ্য দেখতে দেখতে, আমগাছের ছায়া ও হারানকাকাদের কাঁঠালবাগানে পাখিদের বকবকানিও ওর খুব প্রিয়। তখন সে নিজেকে খুব বীরপুরুষ ভাবে। কাঁঠালগুলো কাটার সময় হয়ে এসেছে। আষাঢ় মাসের রোদ আর বৃষ্টি পেয়ে কাঁঠাল পুষ্ট হয়ে গেছে। খুঁজলে দু-একটা পাকা কাঁঠাল পাওয়াও যেতে পারে। হারানকাকার ছোটমেয়ে মলিনা ওকে স্কুলে যেতে দেখে দাঁড়াতে বলল। ‘বইখাতা নিয়ে এক্ষুনি আসছি’ – বলে এক দৌড় দিল মলিনা, যেন হলদে সোনাবৌ পাখি উড়ে গেল ডানা ঝাপটে।
মলিনা দু-তিন মিনিট পরে চলে এলো। সে বলল, ‘আজ বাগানের প্রথম পাকা কাঁঠাল পেয়েছি। বাবা বলেছে কাল কাঁঠাল কাটা হবে। ব্যাপারীরা আসবে।’
শাকের বলল, ‘বড় হয়ে আমি দশ বিঘা জমির উপর কাঁঠালবাগান করব।’
‘আমাদের বাগানটাই তোদের হয়ে যাবে। আর কী দরকার!’ – মলিনা বিষণ্ন হয়ে বলল।
‘তোদের বাগান কী করে আমার হবে? তুই আমাকে দিয়ে দিবি?’ – শাকের হাসতে হাসতে বলল।
‘আমার বাবা বলেছে। তোর দাদু আমার বাবাকে অনেক টাকা দিয়েছে। তার বদলে বাগানটা পাবে।’
‘তোদের বাগান নিলে তোরা কী খাবি? তোদের কী করে চলবে?’
‘সে আমি জানি না। বাবা বলেছে।’
‘তোদের বাগান আমি নেব না। আমি গাছ রুয়ে নিজে বাগান করব। পাঁচ-ছ বছরে গাছে কাঁঠাল ধরে। সারি সারি করে গাছ লাগাব। যেদিক থেকে দেখবি সারি মিলে যাবে। যেসব মুচি থেকে কাঁঠাল হবে না সেগুলো লঙ্কাবাটা ও তেল-নুন দিয়ে ভর্তা করে খাব।’
কথা বলতে বলতে ওরা গ্রামের স্কুলে এসে পৌঁছল। ছেলেমেয়েরা স্কুলের মাঠে দাঁড়াচ্ছে। রোজকার মতো জাতীয় পতাকা তোলা হবে।
‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গাওয়া হবে। তারপর শপথবাক্য পাঠ করে সারি বেঁধে ক্লাসে গিয়ে ঢুকবে। প্রথমেই ওদের পঞ্চম শ্রেণির কক্ষ।
স্কুল থেকে ফেরার পথে শাকের আর মলিনার জন্য অপেক্ষা করে না। সবার আগে এক দৌড়ে আম ও কাঁঠালবাগানে চলে আসবে। সেখানে ভুঁড়িওয়ালা কাল্পনিক দৈত্য ভাবে সে নিজেকে, যে-প্রচুর আম ও কাঁঠাল খেতে পারে, এক গাছের একশটা কাঁঠাল একাই সাবাড় করে। তারপর মাথার নিচে দুহাত দিয়ে, পা গুটিয়ে এক পায়ের উপর আরেক পা দিয়ে সে ঘুমুবে, আর স্বপ্ন দেখবে কুড়ি-পঞ্চাশ বিঘা আম-কাঁঠালের বাগানের মালিক সে, পাড়ার ছেলেরা এসে তার কাছ থেকে আম-কাঁঠাল চেয়ে নিয়ে খাচ্ছে হল্লা করে। বাগানের কয়েকটা গাছ রাখবে সে পাখি ও কাঠবেড়ালির জন্য, কয়েকটা তার বয়সী ছেলেমেয়েদের জন্যে, স্কুলের শিক্ষকদের জন্যও থাকবে আলাদা গাছ। দাদা বা বাবাকে সে এসবের উপর খবরদারি করতে দেবে না। এমনকি গাছের কোটরে থাকা তক্ষক, কাঠঠোকরা, বসন্তবৌরি বা পেঁচাদেরও সুখেশান্তিতে থাকতে দেবে।
ফেরার পথে সে দেখল ওর দাদা ও হারানকাকা কথা বলছে। দূর থেকে সে দাদাকে চিনতে পারে সাদা লম্বা দাড়ি ও উচ্চতার জন্যে। পাড়া বা দু-দশ গাঁয়েও দাদার সমান লম্বা মানুষ নেই। সবাই দাদার মুখের দিকে মাথা তুলে সালাম-আদাব দেয়। সমীহ করে। নানা বিষয়ে শলাপরামর্শ করে। আজ দাদা তাকে দূর থেকে দেখেও ডাকল না। শাকের ভাবল, কী ব্যাপার!
দাদা পান-সিগারেট বা তামাক খায় না। জুমার নামাজে তাকে সঙ্গে নিয়ে যায়। গোটা তল্লাটে হিন্দু-মুসলমান এমন কাউকে সে দেখেনি, যে দাদাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে সালাম-আদাব জানায় না। এমনকী থানার দারোগা-পুলিশ গ্রামে এলেও দাদাকে ডেকে নেয়, সবচেয়ে ভালো আসনে আগে বসতে দেয়।
মলিনা মাঝে মাঝে শাকেরের কাছে আসে। এতে ওর দাদা বিশেষ খুশি হয় না বলে শাকেরের মনে হয়। কেন সে জানে না।
সেদিন মলিনা চলে গেলে শাকের বলল, ‘দাদা, তুমি বুঝি হারানকাকাকে পছন্দ করো না?’
দাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে বলল, ‘হারানটা বড় বেশি খরচ করে। খাওয়ার জন্যএকটার বদলে তিনটা কাঁঠাল পাড়বে।’
‘ওর কাঁঠাল ও পাঁচটাও যদি পাড়ে তোমার কী ক্ষতি?’
‘বাগানটা ওর হলেও আসলে ওর নয়। ওটা আমার কাছে এবছর দিয়ে দেবে। আমি ওর বাগান, পাশের ধানখেত, তারপরের উঁচু জমি, সব একদিন কিনে নেব। সব আমার হয়ে যাবে।’
‘ও এত টাকা কী করে?’
‘ওর এক ছেলে ডাক্তারি পড়ে, এক মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, আরেক ছেলে কলেজে পড়ে। সবাই শহরে থেকে পড়াশুনো করে। শুধু ছোট মেয়েটা তোর সঙ্গে পড়ে গাঁয়ে থেকে।’
‘ছেলেমেয়েদের পড়ার জন্যে খরচ তো করতেই হবে। তার জন্য বাগান বা জমি বেচবে কেন?’
‘সেসব তুই বুঝবি না। ওর সব জমি ওর নয়। অর্ধেক সরকারের। শত্রু-সম্পত্তি।’
‘শত্রু-সম্পত্তি কী?’
‘হারানের বড় ভাই পারান ইন্ডিয়া থাকত। মরে গেছে। হারানদের অর্ধেক জমির মালিক ওর ভাই পারান। পারান ব্রিটিশ সরকারের সেনাবাহিনীতে কাজ করত। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে আইয়ুব খান সাহেব শত্রু-সম্পত্তি আইন করে। যারা পাকিস্তান ছেড়ে ইন্ডিয়া চলে গেছে তাদের জমিজমা হয়ে গেছে শত্রু-সম্পত্তি।’
‘ইন্ডিয়াতে চলে গেলে কি শত্রু হয়ে যায়! মলিনা কি আমার শত্রু?’ – শাকের কিছুই বুঝতে না পেরে জানতে চাইল।
‘এসব কথা তুই বড় হলে বুঝবি। পাকিস্তান শত্রু-সম্পত্তি করেছে, বাংলাদেশ সরকারও শত্রু শব্দ বাদ দিয়ে অর্পিত সম্পত্তি করে রেখেছে, আমি কী করব? তোর এত মাথাব্যথা করে লাভ নেই।’
‘আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। ওসব বাগান, জমি, নদী, টিলা আমার খেলার জায়গা, স্বপ্নের অঙ্গন। আমি মলিনা, স্বপ্না, কামাল, জামালদের সঙ্গে সেখানে ঘুরে বেড়াই। একা একাও যাই। তুমি মলিনার বাবাকে কত টাকা দিচ্ছ না দিচ্ছ আমার জানার দরকারও নেই।’
‘আমিও সে-কথা বলছি। তুই এসব নিয়ে একদম মাথা ঘামাবি না।’ – দাদা বলল। এসব বলার সময়ও দাদা একটু হাসল না।
আর সত্য কথা দশ বছর আগেও এসব জমির মালিক ছিল হারান। সরকার থেকে শত্রু-সম্পত্তি লিজ নিত। লিজ নেওয়ার সময় একগাদা টাকা লাগে, ঘুস দিতে হয়, আসলের চেয়ে বেশি। তারপর একবছর ফসল না হলে মুশকিলের একশেষ।
শাকের বলল বটে তার মাথাব্যথা নেই, কিন্তু মলিনাদের বাগান কিনে নিলে ওদের কী হবে – সেই ভাবনায় তাকে পেয়ে বসল। এসব কথা বলার সময় তার দাদা একবারও হাসল না দেখে ওর আরো খারাপ লাগল। এমনিতেও ওর দাদা লোকের সঙ্গে কথা বলার সময় একটুও হাসে না। নাকি দাড়ির জন্য চোখে পড়ে না? তা কেন হবে? অন্যসময় ঘরে তার সঙ্গে এরকম বিষণ্ন তো থাকে না? অল্পসময়ের জন্য হলেও হাসে। এজন্য দাদার কথা শুনে মাঝে মাঝে তার ভয় হয়। সে মনে-প্রাণে চায় মলিনাদের বাগানটা যেন ওদের থাকে। ওর হাসিমুখ যেন কখনো মলিন না হয়। বর্ষায় গাঁয়ের নদীর মতো ওর চঞ্চল ছোটাছুটি যেন কখনো বন্ধ না হয়, ওর ভাইবোনদের পড়াশুনো যেন কখনো থেমে না যায়, ওদের ধানখেত যেন ওদের হয়ে হেমন্তে মাথা দোলায়, আর শাকেরের দাদা যেন মলিনার বাবার মতো বেশি বেশি হাসে! পাখি, কাঠবেড়ালি, পাড়ার কুকুর, গাছের পাতা ও ফুল কত হাসে! কাঠপোকা ঠাস ঠাস করে ডাকে, ঝিঁঝিপোকা ঝিঁ-ঝি শব্দে গান গায়, বর্ষাকালে ওদের নদী কত শব্দ করে, ভাদ্র মাসে ভরা নদীতে ছোট ছোট ঢেউ কত নাচে! ওর দাদা এত ভালোবাসে তাকে, তবুও কেন লোকজনের মতো হা হা করে হাসে না! শাকের নিজে যখন সুর করে কোরান পড়ে ওর দাদা মনোযোগ দিয়ে শোনে। নামাজ পড়ার সময় তাকে সুরা কাফেরুন সুর করে আবৃত্তি করতে বলে। শাকের মুখস্থ বলে, আস্তে আস্তে সুর করে। পাশে দাদিও থাকে তখন। তারপর সুরা ফালাক বলে। দাদাকে তখন সে খুব খুশি দেখে। তখন শব্দ করে হাসার প্রশ্নই আসে না। আর দাদির তখন চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে। এসব সে মেলাতে পারে না। দাদার সঙ্গে দাদির কোনো মিল নেই।
মলিনার দিদি যখন ছুটিতে বাড়িতে আসে সে তখন শাকেরকে ডেকে পাঠায় মলিনাকে দিয়ে। ওর নাম পলিনা। শাকেরের জন্য সে গল্পের বই, মণ্ডা ও পেড়া নিয়ে আসে। ক্ষীরের পেড়া জমাট মধুর মতো মিষ্টি। শাকেরকে কোলে বসিয়ে একটি গল্প পড়ে শোনায়। পলিনার গায়ের মিষ্টি সুগন্ধে সে শিরশির করে কাঁপে আর গল্প শোনে মণ্ডা খেতে খেতে। মলিনাও তখন কোলের একপাশ দখল করে নেয়। একটা গল্প শোনার পর দুটো চুমু গালে নিয়ে শাকের ও মলিনা চলে যায় পুকুরপাড়ে। পুকুরে আছে রাজহাঁস। কী ধবধবে ওদের পালক! একেবারে ওর দাদার দাড়ির মতো। এরকম সাদা কিন্তু শাকের আর কোথাও দেখেনি।
শাকেরের ভাইবোনদের মধ্যে শাকেরকেই বেশি ভালোবাসে তার দাদা। পড়াশুনোয়ও শাকের সবার সেরা। ক্লাসে সে প্রথম হয়, মলিনা হয় দ্বিতীয়।
মলিনা বলে, ‘আমি যখন প্রথম হবো তখন তুই কী হবি?’
শাকের বলে, ‘আমি দ্বিতীয় হবো!’
মলিনা বলে, ‘না, তুইও প্রথম হবি। আমরা দুজনই প্রথম হবো।’
‘তাহলে খাতায় কার নাম আগে হবে?’
মলিনা বলে, ‘তোর।’
শাকের বলে, ‘তোর।’
‘তোর।’
‘তোর।’
ওরা সমাধান করতে পারে না। এই নিয়ে একবার ওরা পলিনা দিদির কাছে যাবে ঠিক করে। আবার দাদার কাছে যাবে, বলে মলিনা। শাকের তাতে রাজি হয় না। কারণ সে জানে, তার দাদা তাকেই আগে বলে দেবে। তারপর ওরা ওটা স্কুলের মাস্টারের উপর ছেড়ে দিয়ে নদীর পাড়ে চলে যায় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল দেখতে। তখন আষাঢ়। পাহাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে।
সেদিন হারান মিত্র এসে বলে, ‘কাকা, কাল কাঁঠাল কাটব। ব্যাপারীরা আসবে বলেছে। আপনি থাকবেন তো?’
পাশে শাকের ছিল। তার মনে হলো হারানকাকা মনে মনে বুঝি চাইছে না দাদা থাকুক। দাদা শুনেই খুশি হয়ে উঠল। দাদাকে সে এরকম খুশি হতে দেখে দাদার সঙ্গে একা থাকলে। লোকজনের সামনে দেখা যায় না। শাকেরও চায় কাঁঠাল বেচার সময় যেন দাদা না থাকে। কেন, সেটাও সে ভালো করে কিছু জানে না। এটা তার মনে হলো তক্ষুনি, আগেভাগে এরকম কিছুই সে ভাবেনি, এজন্য কারণও সে জানে না। দাদার চোখ-মুখ দেখে তাই শাকের খুব চিন্তায় পড়ে গেল। এসব হঠাৎ আসা চিন্তার কোনো মাথামুণ্ডুু নেই বলে তক্ষুনি শাকের অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল। ঘরের ভেতর থেকে দাদি ওকে ডাক দিল পানের রেকাব নিয়ে আসতে।
হারানকাকা পান মুখে দিয়ে চলে গেল। শাকেরের মাথায় তখন পাকা কাঁঠালের ঘ্রাণ ঘুরছে। কারণ এতবড় বাগানে দু-দশটা পাকা কাঁঠাল পাওয়া যাবেই। কোনো কোনো গাছের কাঁঠাল উপরে একটু নরম হলেই পুরোটা পেকে যায়। সেগুলো শক্ত জাতের রসালো কাঁঠাল। কোনো কোনো কাঁঠাল আছে একেবারে নরম, সেগুলো রস করে নিয়ে দুধ দিয়ে খেতে খুবই মজা। মুঠো সমান বড় বড় কোয়ার কাঁঠাল মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। তিন-চারটা কোয়া খেলেই পেট ভরে যায়। খাওয়ার সময় কচকচ করে, আর কী রসালো! শাকের আগামীকালের ভাবনায় বিভোর হয়ে যায়। সব গাছের কাঁঠাল পাড়তে পাড়তে দুপুর শেষ হয়ে যাবে। বিকেল শেষ হওয়ার আগেই গরুর গাড়িতে করে সেগুলো চলে যাবে বড় রাস্তায়। এক মাইল দূরে গাড়ির রাস্তা, সেখান থেকে ট্রাকে করে চলে যাবে শহরে। শাকের ঠিক করল দাদাকে বলে কাল স্কুলে যাবে না। মলিনাকেও বলতে হবে না যেতে।
বাগানের পাখিরা নিজের মনে গাইছে। ডাকাডাকি করছে কাঠবেড়ালি। খুরুলে প্যাঁচাগুলো গর্ত থেকে মুখ বের করে ড্যাবড্যাব চোখে তাকাচ্ছে। অনেকদিন পরে বাগানে ওরা এত লোক একসঙ্গে দেখতে পেল। দু-একটা প্যাঁচা প্রতিবাদ করে ডেকে উঠল। কাঠঠোকরাগুলো রঙিন ঝুঁটি নিয়ে ঠকঠক করে গাছের ডালে আক্রমণ করছে। হারান মিত্র উদাসীনের মতো একদিকে দাঁড়িয়ে আছে, আবার সেখান থেকে আরেকটি গাছের নিচে যাচ্ছে তেমনি উদাসীন পদক্ষেপে। ধুপ ধুপ করে কাঁচা কাঁঠাল পড়ছে গাছ থেকে। বড় বড় কাঁঠালের জন্যে দড়ি নিয়ে উঠেছে ডালে, কোনো কোনো গাছে বেশ আগায় বড় কাঁঠাল আছে। বেশির ভাগ কাঁঠাল গাছের গোড়ায় ও মূল ডালে। একের পিঠে আরেকটা, একের কোলে অন্যটা। কোনো কোনোটা নিটোল গোলগাল, কোনোটা একটার চাপে আরেকটা চ্যাপ্টা একেক দিকে। স্কুলে না-পড়া ছেলেও জুটেছে। ওদের মধ্যে অনেকে পাকা কাঁঠাল খুঁজছে। একটা পেলেই অমনি ভেঙে খেতে বসছে। গন্ধে চারদিক ভরে যাচ্ছে। একে একে পাঁচটি পাকা কাঁঠাল পাওয়া গেল। হৈ-হল্লা চলল বাগানভরে।
‘হারান কাকা, আমি খাব?’ – শাকের কাছে গিয়ে বলল।
সুগন্ধ হাসিতে মুখ বাড়িয়ে সে বলল, ‘নিশ্চয়ই কাকা, তুমি বেশি করে খাবে। তুমি নিজেই একটা পাকা খুঁজে নাও। বাগানের ওই কোনার গাছটি দেখো, ওটার কাঁঠাল খুব ভালো। যাও।’
শাকের এবার খুশিমনে সেদিকে চলে গেল। গাছটি সে খুঁজে বের করল আর ছোট গোলগাল একটি পেল। টুকে দেখল ঢ্যাপঢ্যাপ শব্দ হচ্ছে। মলিনা তখন সবেমাত্র এসেছে। ওরা দুজনে ওটা নামিয়ে নিল। আর সেখানে বসে খেতে শুরু করল। মলিনা শিশিতে করে সর্ষের তেল ও দা নিয়ে এসেছে। কাঁঠাল ভাঙার আগে দুহাতে তেল মেখে নিল। মলিনার জেঠতুতো ছোট দুভাইও বসল। ওরা পাঁচ মিনিটে ওটা শেষ করে আবার ছুটল নারকেলি গাছটার দিকে। ওটার কাঁঠাল নারকেলের মতো কচকচ করে, কিন্তু খুব মিষ্টি আর রসালো। বাগানের একপাশ থেকে পাড়তে পাড়তে আরেক পাশে এসে পড়েছে লোকেরা। একেবারে ছোট ও অপুষ্টগুলো বাদে সব পেড়ে নিচ্ছে। ওর দাদা একটা চেয়ারে বসে আছে। আর খুব আশ্চর্য যে, সবার মধ্যে দাদাই বিষণ্নের মতো।
একবার হারান একটা ছেলেকে ডাক দিয়ে বলল, ‘কাঁঠাল কাটতে গিয়ে গাছে কোপ দিচ্ছিস কেন রে! গাছের চামড়া আর হাড়ে কোপ লাগলে ঘা হয়ে যায়।’
শুনে শাকের ভাবতে লাগল। গাছের চামড়া, হাড়, ঘা – মানুষের মতো কি গাছ? গাছ কি ব্যথা পায়? নয়-বা কেন? সাদা কষ বের হয় কেন? কাঁঠাল গাছের রক্তে লাল কণিকা নেই, আছে শ্বেতকণিকা। শাকের নিজের মনে বলল নিজেকে, স্কুলের মাস্টারের মতো।
এমন সময় মলিনা ওকে টেনে নিয়ে গেল বাগানের শেষ মাথায়। চার বিঘার মতো বাগান। গাছের জন্য এ-মাথা থেকে ও-মাথা ভালো করে দেখা যায় না। শাকের বলল, ‘অ্যাই, তোদের বাগানে কয়টা গাছ রে?’
‘সত্তরটা।’
‘এতগুলো? তুই গুনেছিস?’
‘তুই গুনে দেখ না।’
‘তোদের গাছ, তুই গুনবি। আমি গুনলে যদি মুখ পড়ে?’
‘পড়বে না। তুই তো আমাদের খারাপ চাস না। তাই তোর মুখ পড়বে না।’
‘সত্যি!’
‘সত্যি। যারা মানুষের খারাপ চায় তাদের নজর পড়ে। এমনকী বাইরের থেকে সব কাঁঠাল ভালো থাকে, কিন্তু পাকলে কোয়া সব পচে যায়। বিচিও খাওয়া যায় না।’
তারপর ওরা সবাই মিলে একটা গাছে কয়টা কাঁঠাল ধরেছে গুনতে লাগল। মলিনা গুনল ৫৯টি। শাকের পেল ৬০টা। মলিনার ভাই ভুবন ৫৫টা, ওর ছোট তপন ৫৯টা। কাজেই দুজনের গোনায় যখন ৫৯টা পেল তখন ওটাই ঠিক ধরল। আর একটায় পেল ৮০টি। একটাতে পেল ৫০টা। পাকা কাঁঠাল আর পেল না। শাকেরের দাদা চেয়ারের হাতল ধরে ঘুমিয়ে পড়ল। ব্যাপারী এলো দুজন। ওদের লোকেরা গুনে-বেছে গরুর গাড়িতে তুলছে। এদিকে বাকি গাছগুলো থেকে কাটা হচ্ছে। কেউ কেউ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে গাড়ির কাছে। কাঁঠালের ভুতিতে নীল মাছি বসে খাচ্ছে। ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে গরুর গাড়ি চলে যাচ্ছে।
মলিনা তখন শাকেরকে বলল, ‘বাবা আমাকে রেশমের শাড়ি কিনে দেবে বলেছে। কাঁঠাল বেচার টাকা থেকে। আমি বলেছি নীল শাড়ি কিনে দিতে। আর দিদির জন্য পরীক্ষার ফির টাকা পাঠাবে। তোকে একটা বই কিনে দিতে বলব।’
‘তুই খুব খুশি!’
‘সোনার একটা নাকফুল কিনে দিতে বলব কিনা ভাবছি। শাড়ির বদলে নাকফুল কিনলে কেমন হয় রে?’
‘তোর মুখটা আরো সুন্দর হয়ে যাবে। আমি আর তাকাতে পারব না।’
‘বাঃ! আমি বুঝি সুন্দর না!’
‘এমনিতেই সুন্দরী। সোনার নাকছাবি হলে কথাই নেই।’ বলতে বলতে সে বাগানের চারদিক তাকিয়ে দেখল। কাঁঠালহীন গাছগুলো একটুও ভালো লাগছে না। বোঁটা থেকে অবিরাম কষ ঝরছে। পাকা কাঁঠালের গন্ধ কমে আসছে। রোদ উঠেছে ধাঁ-ধাঁ করে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ গায়ে এসে পড়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে যেন। বৃষ্টি হবে বলে যে-মেঘ উঠেছিল তারা কোথায় কোন বনে যে চলে গেল কে জানে!
পাকা কাঁঠাল আর নেই বলে ছেলের দল চলে গেছে। বড়রা কাঁঠাল নিয়ে আর হইচই শব্দ করছে না। পাখিরাও ঘটনা সয়ে নিয়েছে। একটা-দুটো কাঁঠাল গাছের খোঁদলে খুদে মৌমাছি বাসা করেছে। তার আশেপাশে আনাগোনা দেখে বোঝা যায়। শাকেরও চেনে। একটা কাঠঠোকরা ট্যাঁ-ট্যাঁ-এঁ-এঁ শব্দ করে বাগান ছেড়ে চলে গেল। তার পেছন পেছন আরেকটি, আরেকটি উড়ে গেল। ওরা বোধহয় মা-বাবা ও ছেলেমেয়ে, এক পরিবারের। ছেলেমেয়েরা এখনো আলাদা হওয়ার মতো বড় হয়নি হয়তো! বাদশা সলোমান মাথায় সোনার মুকুট দিয়েছিল মোহনচূড়াকে। চারটি মোহনচূড়া মাটিতে নেমে ঘাস থেকে পোকা খুঁজছিল প্রথম থেকেই। ওরা যাবে যাবে করছে। পাঁচটা গরুর গাড়ি যাওয়া-আসা করছে। শেষবার দুটি গাড়িতে সব কাঁঠাল তুলে দিল। বড় বড় দশটা কাঁঠাল রেখে দিল। শাকেরের দাদা বেছে রেখেছে।
মোট চারশ সত্তরটা কাঁঠাল। দুই ব্যাপারী সাত হাজার টাকা গুনে দিল। টাকাটা হারান মিত্র হাতে নেওয়ার সময় শাকেরের দাদা বলল, ‘আমার কাছে তোমার পনেরো হাজার টাকা ধার আছে, সে-ব্যাপারে পরে তোমার সঙ্গে কথা বলব।’ বলতে বলতে টাকাগুলো নিয়ে নিল এবং সাদা পাঞ্জাবির জেবে রাখল।
হারান তার লোকজনদের ডেকে নিল। দা ও দড়িদড়া গোছগাছ করে নিতে বলল। আর কাঁঠালগুলো শাকেরদের বাড়িতে দিয়ে আসতে বলল। তারপর গভীর নিশ্বাস নিয়ে বাগানের গন্ধ টেনে মুখ ফিরিয়ে নিল।
শেষ দুটি গাড়ির বলদগুলো ডাক ছেড়ে গাড়িতে টান দিল, গাড়ি নড়ল না, মাথা নিচু করে বলদগুলো টানছে। হারান মিত্র তার লোকদের বলল, ‘গাড়িগুলো একটু ঠেলে দাও কাকারা। ওরা পারছে না।’
শাকের মাথা নিচু করে মলিনার দিকে আড়চোখে তাকাল। মলিনা দেখল কাঁঠাল বেচার টাকা শাকেরের দাদা পকেটে ভরে নিয়েছে। সে হাত দিয়ে নাকের ছিদ্রটা চুলকে নিল – তার চোখ থেকে টপটপ অশ্রু ঝরছে।
শাকের আর দাঁড়াল না। সে হারানকাকার শেষ কথাগুলো শুনল পাশে দাঁড়িয়ে, জবাই হওয়া গরুর মতো তার গলা দিয়ে ঘরঘরে আওয়াজ শুনল, আর তাতে শাকের বুকটা ফালা ফালা হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা অনুভব করল। শাকের তার দাদার প্রতি জীবনে এই প্রথম প্রবল ঘৃণা অনুভব করল।
সে আর দাঁড়াতে পারল না। কাঁঠালবাগানের ভেতর দিয়ে সে সোজা নদীর দিকে চলল। দাদা ওকে ডাকল, কিন্তু সেই ডাকে কোনো মায়ামমতা নেই, শাকের যেন বাগানের আরেক প্রান্ত থেকে বিষণ্ন, ভয় ও অপরাধীর মতো অচেনা একটা ডাক শুনল। একবার সে পেছন ফিরে তাকাল, ইতস্তত করল, কিন্তু দাদার গলার আওয়াজে সে আজ্ঞা বা ভালোবাসা কিছুই খুঁজে পেল না। তার বদলে তার নিজের বুকে যেন গভীর এক রহস্য খুঁজে পেল, যা সে মলিনার দিকে তাকিয়ে ফের দেখতে পেল, মলিনার অধো মুখে ও তার ছোট ছোট ভাইদের মুখে, মাটিতে লাফিয়ে লাফিয়ে চলা মোহনচূড়ার মধ্যে, কাঠবেড়ালির কর্কশ থকথক ডাকে, কাঁঠাল গাছের লাল পিঁপড়ের সারি বেঁধে চলায়, আর ঝাঁপিয়ে আসা একদল কালো মেঘে ছেয়ে যাওয়া আকাশে-বাতাসে। মলিনা তাকে ডাকল না, হারানকাকাও না, কাঁঠালের ভুতির গন্ধও না, বরং তার পেটের মধ্যে কাঁঠালের কোয়াগুলো কেমন যেন ভারি হয়ে আসতে লাগল। সে এবার জোরে পা চালিয়ে দিল। বাগানের শেষ প্রান্তে যখন সে পৌঁছল তখন পেছনে আর কাউকে দেখতে পেল না, সামনের নদীর তীরের মুক্ত হাওয়া তাকে ডাকছে বাগানের ছায়া থেকে মুক্তি নিতে… বাগানের শেষ প্রান্তে শেষ কাঁঠালগাছের পরেই আছে গ্রামের রাস্তার শিরীষ ও জারুলের সারি, তার ছায়ায় গিয়ে সে বসে পড়ল, পেটটা ভীষণ ভারি মনে হলো তার, আর তক্ষুনি সে ডান হাতের চারটি আঙুল গলায় ঢুকিয়ে আয়েশ করে খাওয়া কাঁঠাল উগরে দিল, একবার দুবার করে বারবার ঢুকিয়ে শেষ ফোঁটা পর্যন্ত বের করে দিয়ে দীর্ঘনিশ্বাস টানতে লাগল, সেই সঙ্গে বুকের গভীর গোপন রহস্যটারও যেন একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করল।
২১ আগস্ট ২০০৪

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.