অক্টোবরের সকাল, ঠান্ডা হাওয়া বইছে, শীত আসছে। পাখির সুমধুর গান এবং শিওরে বসা টুনটুনের ডাকে ঘুম ভেঙে যায়। দেখি, মায়ের সুতি শাড়ির আঁচলের মতো ভোরের কুসুম কুসুম আলো আমার ঘরের দেয়ালে সেঁটে আছে। মায়ের আঁচল যেন এক মহাকাল, সন্তান যত দূরেই থাকুক সেখানেই ছায়া ফেলে। মায়েরা বোধকরি কোথাও যান না, তাঁরা সন্তানের কাছে ফিরে ফিরে আসেন। কখনো সকালের মিষ্টি আলো হয়ে, কখনোবা দুপুরে অশ^ত্থের মায়াময় ছায়া হয়ে, কিংবা বিকেলে
খাঁচামুক্ত বিহঙ্গের গলায় ঘুমপাড়ানি গান হয়ে। এই মুহূর্তে কক্ষের জানালা দিয়ে সূর্য এমনভাবে আমার দিকে চেয়ে আছে, মনে হচ্ছে, মা আমাকে পরম মমতায় দেখছেন। ভাবি, জীবন নামের রেলগাড়িতে ওঠা অগণিত মানুষ যে যার গন্তব্যে নেমে পড়লেও মা রয়ে গেছেন আমার সঙ্গে। জানি, রয়ে যাবেন আমার শেষ নিশ্বাস অবধি। মা হলো আমার শৈশবে দেখা সেই বিশাল বটগাছ, যে খাঁ-খাঁ রোদ্দুরে, তীব্র ঝড়বৃষ্টি সয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকেন।
টুনটুনের আঁচড় খেয়ে বুঝি, মায়ের ভাবনায় ডুবে বিছানায় দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিয়েছি। আমার টুনটুন, তার আহ্লাদ, আদিখ্যেতার শেষ নেই। ক্ষুধা লাগলে প্রথমে আমার গা-ঘেঁষে মোলায়েমভাবে, এরপর বৃত্তাকারে চারপাশে মিউমিউ সুর তুলে ঘুরতে থাকে। তখনো যদি কোনো কারণে খাবার দিতে দেরি করি, ক্ষুধার চোটে সোজা আমাকে আঁচড়ে দেবে। ইনজেকশনকে আমি ভয় পেলেও ওর জন্য কয়েকবার ইনজেকশনও নিয়েছি। ওকে পেট শেল্টারে রেখে আসার ইচ্ছাটা যখনই মনের চারধারে উঁকিঝুঁকি দেয়, তখনই দেখি আমার প্রতি ওর আদর, মনোযোগ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। কীভাবে আমার ভেতরটা ও পড়ে ফেলে, ভেবে বিস্মিত হই! ক্ষুধার চোটে মিউমিউ ডাকের পরিবর্তে ও যখন মা মা ডাকে তখন ভাবি, আমি ওর মা, নাকি ও আমার মা। মা ছাড়া মুখ দেখে জগতে কে আর এভাবে ভেতরটা পড়তে পারে – বুঝি না। আমার হাতে মাখা মাছ ও ভাত পরম তৃপ্তিতে চুপচাপ খাওয়ায় ব্যস্ত টুনটুনের দিকে তাকিয়ে দেখি, কত মায়া ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে চতুর্দিকে, মায়ার কোনো শেষ নেই, শুধু কুড়িয়ে নিতে জানতে হয়।
খাবার শেষে টুনটুন বারান্দার গ্রিলে উঠে বসে। এবার ও সকালের প্রকৃতি উপভোগ করবে। কফি হাতে আমিও ওর সঙ্গে যোগ দিই। দিনের শুরুতে ক্যাফেইনের স্বাদ ছাড়া আমার মস্তিষ্ক ভালোভাবে জেগে ওঠে না। সূর্যের সোনালি আলো এসে পড়েছে আমাদের শরীরে। টুনটুনের চোখ জ্বলজ্বল করছে। বুঝি, আমার মতো সে-ও সকালের মিঠা রোদে প্রাণে আরাম পাচ্ছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশিরভাগ মানুষেরই বন্ধু তেমন থাকে না, আমারও নেই। কিন্তু আমি এতে কোনো শূন্যতা বোধ করি না। এই যে টুনটুন, বিশ্বপ্রকৃতিসহ চেনা-অচেনা মানুষের সান্নিধ্যে সময় বেশ ফুরফুরে কেটে যায়। বয়স বাড়লে মানুষ আসলে বোধ, চিন্তা, অনুভূতি, মননে আরো বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে। এর মধ্যে হঠাৎ কানে শিশুর কান্না ভেসে এলে বারান্দা থেকে জিরাফের মতো গলা বাড়িয়ে দেখি, এক মা প্রাণপণ চেষ্টা করছে শিশুটাকে স্কুলবাসে তুলে দিতে; কিন্তু সে স্কুলবাসে উঠতেই চাইছে না। ‘আমি স্কুলে যেতে চাই না’ – সে একাধারে বলছে, সঙ্গে তার কান্নার গতি বেড়েই চলছে। মা যতবার তার কাঁধে স্কুলব্যাগ তুলে দিচ্ছে, ততবারই সে স্কুল ব্যাগ রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। স্কুলব্যাগ কুড়িয়ে আনতে আনতে মা হাঁপিয়ে উঠলে একসময় বাসের সাহায্যকারীর সহযোগিতায় অনেকটা পাঁজাকোলা করে শিশুটাকে স্কুলবাসে তুলে নেওয়া হয়। স্কুলবাসের জানালা থেকে প্রজাপতির মতো অন্য শিশুরা তখন অদ্ভুত দৃষ্টিতে একযোগে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। ওদের দৃষ্টি অনুসরণ করে আমিও আকাশের দিকে মুখ তুলে দেখি, নীল আকাশে রাজহাঁসের মতো সাদা মেঘ ভাসছে, শরীরে সোনালি রং মেখে পাখিরা গুনগুন গাইছে, কিচিরমিচির গল্প করছে, ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে। পাখিদের উৎসবের দিকে চেয়ে আপনমনে আওড়াই, ওরা সকলে কি সফল? ভীষণভাবে সুখী? কেউ কি ব্যর্থ নয়? অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বুঝি, নাহ, ওদের কারো মধ্যে কোনো বিষণ্নতা নেই, দৌড় প্রতিযোগিতা নেই,
তাপ-উত্তাপের বালাই নেই, অহেতুক চাপ নেই। ওরা মনের সুখে উড়ছে, মৃদুস্বরে গাইছে। ওরা নির্ভার, ওরা মুক্ত। সফলতা এবং ব্যর্থতা, পাহাড়ের মতো ভারি এই শব্দদ্বয় শুধু মানুষের নিয়তির সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে বাঁধা। যদিও সফলতা ও ব্যর্থতার সঠিক সংজ্ঞা আজ অবধি আমার জানা হয়নি। আদতে, বিশ্বাসও করি না। কারণ, বহু ব্যর্থতার পথ ধরেই সফলতার দেখা পেয়েছি। তদ্রূপ, সফলতার শীর্ষে পৌঁছে মনে হয়েছে, সবকিছু বড় অর্থহীন!
পাখি এবং আকাশ থেকে জমিনে চোখ নামাতেই আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। দেখি, বেশ আগে স্কুলে চলে যাওয়া সেই শিশুর মা সরু একটা বার্চ গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার সর্বাঙ্গ বেদনায় জর্জরিত। তার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে আমার দুই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ঘুম ভাঙার পর থেকে টুনটুনের সঙ্গে আড্ডা, আয়েশ করে কফি পান, পাখি, আকাশ, স্কুলবাসের সঙ্গে সময় কাটানোর রেশ দ্রুত কেটে গেল, টেরই পেলাম না। এখন এই অচেনা মায়ের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট মনে হয়, সময় কত দীর্ঘ, যেন কাটছেই না। এই মা যেন সময়ের পুকুরে ছিপ ফেলে দৃষ্টি এলিয়ে দিয়েছে নিঃসীম শূন্যতায়। কত হবে এই মায়ের বয়স? বড়জোর তিরিশ! স্পষ্ট বুঝতে পারি, রাস্তায় গাড়ির হর্ন, পথচারীদের কোলাহল কোথাও সে নেই। সন্তান চলে যাওয়ার পর পথের দিকে চেয়ে সে কেমন আত্মভোলা হয়ে পাহাড়ের মতো নীরবতা পালন করছে।
মনে পড়ে যায়, ছোটবেলায় আমি স্কুলে যাওয়ার আগে আমাদের ঘরেও কান্নাকাটির ধুম পড়ে যেত। আমার পেট ব্যথা, পা ব্যথা – কোনোভাবেই স্কুলে যাব না। অপরদিকে মায়ের কড়া শাসন, সময় বেঁধে দেওয়া, এর মধ্যেই স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হবে। স্কুলে না যাওয়ার জন্য এইটুকুন বয়সে কতশত বুদ্ধি এঁটেছি, তার ইয়ত্তা নেই। তবে, ওই ক্ষুদ্র বয়সের কোনো বুদ্ধিই আমাকে স্কুলে যাওয়ার বিপদ থেকে তখন বাঁচাতে পারেনি। এই মায়ের মতো আমার মা-ও অস্থির আমাকে স্কুলে পাঠিয়ে বাড়ির সামনের বিশাল বটগাছটার শরীরে হেলান দিয়ে আমার স্কুলে যাওয়ার পথের দিকে অপলক চেয়ে থাকতেন। পেছনে তাকালেই তিনি ‘সামনে তাকা’ বলে ঝাঁজিয়ে উঠলেও অনেকদূর গিয়েও দেখেছি, তিনি আমার পথের দিকে তাকিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন। বাড়ির রাস্তা পেরিয়ে বড় রাস্তায় পা ফেলে পেছনে তাকিয়ে মাকে তখন আমার বটগাছ মনে হতো। মা এবং বটগাছকে আমি তখন আর আলাদা করতে পারতাম না। মায়ের মনের অখণ্ড ধৈর্য ও গভীর মনোযোগই তিল তিল করে গড়ে তুলেছে আজকের আমাকে।
দেয়ালঘড়ির ঢং ঢং শব্দে ভাবনার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসি। বলতে গেলে এই দেয়ালঘড়িটাই এখন আমার অভিভাবকতুল্য। ঘড়ির চেঁচামেচি শুনেই রোজকার সকল কর্ম সম্পন্ন করি। ঘণ্টায় ঘণ্টায় সে ঢং ঢং আওয়াজ তুলে আমাকে তাড়া দেয়। এই যেমন এখন, তার আওয়াজে বারান্দা ছেড়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে আসি। গতকাল ভেবে রেখেছিলাম, আজ সকাল সকাল শপিংমলে যাব। সামনে শীত আসছে, কিন্তু আমি আজ গ্রীষ্মের কিছু প্রয়োজনীয় কাপড় কিনব। একইভাবে, গ্রীষ্মের পূর্বাভাস পেলেই আমি শীতকালীন কাপড়চোপড় কিনি। এই কৌশল শিখেছি বেশ কয়েক বছর আগে। নিউইয়র্কের শপিংমলগুলোতে যখন যে-ঋতু আসে তার আগের ঋতুর জিনিসপত্রগুলোকে বোঝা কিংবা বিপদ ভেবে কেনা দামে বিক্রি করে দেয়। গ্রীষ্মে যে টপ, প্যান্ট কিনতে হয় তিরিশ ডলারে, আজ হয়তো সেসব কেনা যাবে দশ ডলারে। প্রবাসের যাপিত জীবন সর্বক্ষেত্রে আমাকে যা শিখিয়েছে, স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ে তা শিখিনি। আজকাল প্রায়ই ভাবি, এত ইতিহাস মুখস্থ করে, ব্যাঙ, কেঁচো, তেলাপোকা কেটে লাভটা কী হলো! জীবনের খেলাঘরে এসব কোনো কাজেই এলো না। সে যা-ই হোক, অতীতের হাবিজাবি ভাবনা ছেড়ে এখন আমাকে দ্রুত বের হতে হবে।
বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখি, আমার মুখটা দেখতে অনেকখানি মায়ের মতো লাগছে। আমার চাহনি, কপালের বলিরেখা, ছোট হতে হতে মায়ের মতো উচ্চতা, চওড়া সিঁথি, কাঁচাপাকা পাতলা চুল, গলা, ঘাড়ের চামড়ায় ভাঁজ – সবকিছুতে মায়ের প্রতিবিম্ব দেখছি। আমি আর মা – আমরা আয়নায় যেন লুকোচুরি খেলছি, খিলখিল হাসছি এবং এটা আমি বেশ উপভোগ করছি। চোখের পলক ফেলে দেখি মা নেই আর আমার সঙ্গে, মিলিয়ে গেছেন রঙধনুর মতো। চোখের কোণের জলকণা মুছে স্মৃতির গভীরতম প্রদেশ থেকে বেরিয়ে এসে শপিংমলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি।
আকাশচুম্বী দালানের ঠাসাঠাসি এই শহরে শরৎ, হেমন্তের দেখা না মিললেও আমার মনে ওরা খলবল করছে। ‘শীতের বনে কোন সে কঠিন আসবে বলে, শিউলিগুলো ভয়ে মলিন বনের কোলে’ গানটা নিজ মনে গুনগুন করতে করতে বাসস্টপের দিকে হাঁটছি। আগে রাস্তায় হাঁটার সময় অপরিচিত মানুষ দূরের কথা পরিচিত কারো দিকেও তাকাতাম না, কথা বলতাম না, চোখ, মুখ, মাথা লুকিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করতাম। মনে হতো, আমার মেধা নেই, প্রজ্ঞা নেই, আগুনঝরা কথা বলতে পারি না। অতএব চুপচাপ নির্জনে থাকাই শ্রেয়। এখনো কিছুই পারি না, কিছুই করি না, তবে আগের মতো আর ভয় লাগে না। এখন রাস্তায় নামলে চোখে চশমা এঁটে মানুষ দেখি, বড় ভালো লাগে। পরিচিত কেউ এড়িয়ে যেতে চাইলে নিজ থেকেই তাকে কাছে ডাকি, গল্প করার চেষ্টা করি। চেষ্টা করি বলছি এজন্য যে, এই সত্তরোর্ধ্ব বয়সে এখন আমার সময় থাকলেও তার সময় সবসময় থাকে না। আজ সোমবার, সপ্তাহ শুরুর দিন। আজ অবশ্য সকলে ব্যস্ত স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালতে। তাই হাঁটতে হাঁটতে পথে কিছু ঝরাপাতা ছাড়া তেমন কারো সঙ্গেই দেখা হলো না।
বাসে উঠে দেখি, আমিসহ মোট পাঁচজন যাত্রী। আরাম করে জানালার পাশে বসে ঝিরঝিরে হাওয়ায় আকাশ, প্রকৃতি দেখছি। ছবির মতো সুন্দর আকাশ, প্রকৃতি দেখার মুহূর্তে মনের মধ্যে প্রবল ইচ্ছা জেগেছে ছবি আঁকার। ইদানীং, মনের দেয়ালে সুন্দর কিছু ছায়া ফেললেই ভীষণ স্কেচ করার সাধ হয়। আমার এই অভ্যাস অবশ্য ছোটবেলা থেকেই ছিল। হাতে রং, তুলি, ক্যানভাস আসার আগে সে-সময় নারকেলপাতার শলা দিয়ে মাটির ওপর গাছ, ফুল, পাখির কত ছবি এঁকেছি, তাদের সঙ্গে মুখোমুখি বসে অনর্গল আপনমনে কথা বলেছি। স্মৃতির টুপটাপ বরষায় পুনরায় ভিজে জবুথবু হয়ে পড়ার আগেই বাস এসে থামে শপিংমলের সামনে।
শপিংমলে ঢুকে দেখি মানুষে চারপাশ সয়লাব। তারাও হয়তো আমার মতো শপিং করার কৌশল শিখে গেছে। ভাবি, বেঁচে থাকার জন্য জীবন মানুষকে আপনা থেকেই একের পর এক সকল সূক্ষ্ম কৌশল শিখিয়ে দেয়। কিছুটা সময় চুপচাপ মানুষের কোলাহল দেখি, ভালো লাগে। এরপর চারপাশে তাকিয়ে দেয়ালে, ডলে সাজিয়ে রাখা কাপড় দেখি আর আপনমনে বলি, বাহ, জায়গাটা দেখছি ভীষণ জীবনজাগানিয়া। বিশাল মল, মন যেদিকে চাইছে সেদিকেই ছুটছি, নানা জিনিসপত্র দেখছি। এসকেলেটর ধরে মলের দ্বিতীয় তলায় উঠে ডান পাশের একটি মনোরম দৃশ্যে আমার চোখ আটকে যায়। দেখি, নীল স্কার্ট আর ম্যাজেন্টা রঙের টপস জড়ানো একটা ডলের চতুর্দিকে ঘুরে ঘুরে কথা বলছে ফুলের মতো ছোট্ট একটা বাচ্চা মেয়ে। কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি, ও শুধু কথাই বলছে না সাজানো ডলটার সঙ্গে নানা খুনসুটিও করছে। সোনালি চুল, বাদামি চোখ, আদর আদর মুখের মায়াময় বাচ্চা মেয়েটা আমার সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নেয়। ও কখনো মলের সাজানো ডলটার সঙ্গে পিকাবু গেম খেলে, কখনোবা ডলটাকে ওর হাতের চকোলেট সাধে। ডলের হাত ধরে চারপাশে ঘুরে ঘুরে ও কিছুটা সময় খুব চঞ্চল হয়ে ওঠে তো পুনরায় শান্ত হয়ে ডলের দিকে ঝুঁকে জড়িয়ে ধরে খিলখিল হাসে। ওর হাসি আমার মধ্যেও সংক্রমিত হয়। কিছু না বুঝে আমিও হাসছি। এবার দেখি, বড়দের মতো একহাতে মুখ ঢেকে ও ডলটার সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলছে। ওর অনুচ্চ কথামালা আমার কান অবধি পৌঁছায় না। ডলটার চতুর্দিকে ও চক্রাকারে ঘুরছে আর নানা ভঙ্গিমায় হাত, পা শূন্যে ছুড়ে যেন ছবি আঁকছে, কবিতা লিখছে। আমি শপিং ভুলে গিয়ে বাচ্চাটার মধ্যে মজে থাকি। এর মধ্যে শপিংমলের সিকিউরিটি গার্ড এসে মেয়েটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, ‘ওহে সুন্দর, তুমি কার সঙ্গে এসেছ? তারা কোথায়?’ মেয়েটা উত্তর দিলো, ‘মায়ের সঙ্গে এসেছি, মা শপিং করছে, তাকে যেন ডেকো না।’ ‘কেন ডাকব না’, গার্ড জানতে চাইল। ‘মাকে ডাকলেই আমাকে নিয়ে যাবে, শাসন করবে, এটা করো না, ওটা ধরবে না বলে রাগ করবে। আমার মা ভীষণ কঠোর, আমাকে খুব জ্বালাতন করে।’ ‘কিন্তু তোমাকে তো একা রাখা যাবে না, এবং এটা আমার দায়িত্ব।’ গার্ডের কথা শুনে মেয়েটা বড়দের মতো শূন্যে তাকিয়ে কিছুটা সময় ভেবে বলে, ‘তোমার কাছে ফোন আছে? থাকলে দ্রুত দাও, প্লিজ। বাবা আমার বন্ধু, যা বলি সব শোনে, যা চাই তাই কিনে দেয়, তাকে ফোন করব।’
ওদের কথোপকথনের মধ্যেই বাচ্চাটার মা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে উপস্থিত হয়। মেয়েকে পেয়ে মায়ের মুখে স্বস্তির ভাব ফুটে ওঠে। কিন্তু মাকে দেখেই মেয়েটা ছটফট শুরু করে। মা টানছে মেয়েকে, মেয়ে টানছে সাজানো ডলটাকে। মা-মেয়ের মাঝখানে আমি এবং সিকিউরিটি গার্ড বিভ্রান্ত দর্শকের মতো তাকিয়ে থাকি। আমাদের পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে মায়ের হাতে আছাড়ি-পিছাড়ি করতে করতে বাচ্চা মেয়েটা চিৎকার করে বলে, ‘আমি এই স্ট্যাচু মাদার চাই-ই চাই! ও আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে, খেলা করে, জড়িয়ে ধরে, সময় দেয়, রাগ করে না, হোমওয়ার্ক করতে বলে না, কার্টুন দেখতে দেয়, চকলেট, আইসক্রিম খেলে বকা দেয় না। তোমরা দেখো, বাবা এসে ঠিক আমার জন্য এই স্ট্যাচু মাদারটা নিয়ে যাবে।’
মেয়েটা চোখের আড়াল হলে ওর কথাগুলো ভেবে আমার আপাদমস্তক কেঁপে ওঠে। ঠিক ওর বয়সে নয়, ওর থেকে কিছুটা বড় হয়ে মায়ের শাসনে রাগ করে আমগাছের মগডালে উঠে দুই পা ঝুলিয়ে আমিও মনে মনে প্রার্থনা করতাম, মায়ের থেকে অনেকদূরে চলে যেতে চাই, যেখানে তার কোনো শাসন-বারণ থাকবে না। আজ মনে হয়, পৃথিবীর যে-কোনো মূল্যে একবার যদি মায়ের স্পর্শ পেতাম, দেখা পেতাম! মেয়েটার চলে যাওয়ার পথের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে বলি, তুমি যত বড় হবে তত মায়ের প্রতি সকল অভিযোগ শূন্যে গিয়ে ঠেকবে। সেদিন তুমি আর এই স্ট্যাচু মাদার চাইবে না, প্রিয়। আজীবন তোমার জীবনবৃত্তে একমাত্র মায়ের ছায়াটাই থাকবে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.