শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক এবং নাগরিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ কলকাতার বইপাড়া। প্রেসিডেন্সি কলেজের রেলিং ও তার ফুটপাতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা পুরানো বইয়ের দোকান গ্রন্থপ্রেমিকদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণ। এমন একটা সময় ছিল যখন কৌলীন্যে এবং খ্যাতিতে পুরানো বইপাড়া কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউজকে প্রায় ছুঁই ছুঁই করত। সে-আমলের নামকরা অধ্যাপকরা প্রেসিডেন্সি কলেজের রেলিংয়ে পুরানো বই খুঁজে বেড়াতেন। শুনেছি, সন্ধ্যার পর এই পাড়ায় বই কিনতে বা দেখতে আসতেন কলকাতার বনেদি পরিবারের মানুষেরা।
অনেকেই বলেন, বইপাড়ার আগের জেল্লা নাকি স্তিমিত। সন্দেহ নেই, আজ থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে যে-বৈচিত্র্য ও সম্ভার এ-পাড়ার বৈশিষ্ট্য ছিল আজ তা খুঁজে পাওয়া দায়। অশীন দাশগুপ্ত ১৯৫০-এর কলকাতায় ফুটপাতের পুরানো বই দেখে বেড়ানোর নেশার কথা উল্লেখ করে হালের বইপাড়া নিয়ে খেদ করে বলেছেন, ‘সেই ফুটপাতের দোকানগুলো আর দেখি না। বইয়ের দোকান আর ফুটপাতের দোকানের পার্থক্য এইটুকু যে, পথ চলতে চলতে থমকে দাঁড়িয়ে দু-চারটে বই নাড়বার সুযোগ শুধু ফুটপাতেই পাওয়া যায়। আমাদের সে-পুরানো ফুটপাতে অনেকরকম বই দেখতাম। এখন ভাবলে মনে হয় কিছু কিছু ইংরেজ পরিবার বোধকরি চলে যাওয়ার আগে বইগুলো বিলি করেছিল। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজ দেশত্যাগী হওয়ার সময় হয়তো পারিবারিক সংগ্রহগুলো নামিয়ে দিয়েছিল। পুরানো জমিদার পরিবারের বই বোধহয় আসতো।’ অতীতের বইপাড়ার একটি নিটোল ছবি অশীন দাশগুপ্তের কলমে ফুটে উঠেছে।
পুরানো দিনের বইপাড়া দেখার সৌভাগ্য হয়তো আজকের প্রজন্মের অনেকেরই হয়নি, কিন্তু হাল-আমলের ক্ষয়িষ্ণু চেহারার বইপাড়ার আকর্ষণ কি কম? ছোট ছোট মলিন খুপড়ির দোকানের অনাড়ম্বর চেহারা দেখে বোঝার কোনো উপায় আছে কি যে, এখানে কত বিচিত্র বিষয়বস্তুর বই ধুলোচাপা হয়ে আছে? বাংলা সাহিত্যে একসময়ে যাঁরা খুব জনপ্রিয় লেখক ছিলেন কিন্তু আজ পাঠকের কাছে বিস্মৃত, তাঁদের বইও খুঁজলে এখানে দুই-একখানা পাওয়া যাবে। চামড়া-বাঁধানো বনেদি বাড়ির সুদৃশ্য বই হাত-ফেরতা হতে হতে এখানে এসে সাময়িকভাবে থিতু হয়। একশ-দেড়শ বছর আগের ছাপা ইংরেজি সাহিত্য, ইতিহাস অথবা দর্শনের বই একটু খোঁজাখুঁজি করলেই পাওয়া যায়। যেসব বাংলা বই আজ আর ছাপা হয় না এবং রীতিমতো দু®প্রাপ্য – তা-ও এখানে একেবারে অলভ্য নয়। নানা বয়সের বই, নানা ধরনের বাঁধাই, কাগজের ফিকে হয়ে আসা রং, ন্যাপথালিনের হালকা গন্ধ এই এলাকার একবারেই নিজস্ব সম্পদ, যার সঙ্গে মিশেছে চায়ের দোকানের ধোঁয়া, ব্যস্ত মানুষের ভিড়, যানবাহনের শব্দ। সব মিলিয়ে এ-পাড়ায় একটা সজীব প্রাণপ্রবাহ তার আপনগতিতে বয়ে চলে। একটু ভালো করে কান পাতলেই শোনা যাবে অতীত আর বর্তমানের এক নিরবচ্ছিন্ন কিন্তু নীরব কথোপকথন। লাল চামড়া আর সোঁদা গন্ধের বইগুলো নাড়তে কার না ভালো লাগে! প্রথম দর্শনেই বইপাড়ার সঙ্গে যদি গভীর ভাব-ভালোবাসা গড়ে ওঠে তবে সেটা মোটেই অস্বাভাবিক হবে না। কয়েকবার টহল দেওয়ার পরে এ-পাড়ায় নিয়মিত ঘোরাঘুরির অভ্যাস যদি দানা বেঁধে ফেলে তবে সেটাও হবে না কোনো আশ্চর্য ঘটনা।
ঢাকা থেকে কলকাতায় নিয়মিত অনেক অতিথির সমাগম হয়। রাজনৈতিক নেতা, সরকারি আমলা, বন্ধু-বান্ধব, শিল্পী, শিক্ষক ও আত্মীয়স্বজন নানা কারণে কলকাতায় বেড়াতে যান। এঁদের মধ্যে প্রায় সকলেই গ্রন্থ-অনুরাগী, অনেকে বই-পাগল। আর্থিকভাবে খুব সংগতিপন্ন না হলেও তাঁরা না ছিলেন বইকুণ্ঠ অথবা বই কেনার ব্যাপারে ব্যয়কুণ্ঠ। এঁদের অনেকেই বইপাড়া থেকে দুষ্প্রাপ্য বই কিনে খুশি হয়ে দেশে ফিরে আসতেন। আমাদের হাইকমিশনার ফারুক আহমেদ চৌধুরী সরকারি কাজে দিল্লি থেকে কলকাতায় এলেই সময় করে বইপাড়ায় যেতেন আর পছন্দমতো বই কিনতেন। এই বইপাড়ায় আরেকজন বিদেশী কূটনীতিবিদ প্রায়ই টহল দিতেন। তিনি ইতালির তৎকালীন কনসাল-জেনারেল জাম্পালিওনে। গ্রন্থপ্রেমিক এই বয়স্ক ভদ্রলোক এককালে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। জাম্পালিওনে শব্দের অর্থ সিংহের থাবা। আমরা তাঁকে আদর করে ডাকতুম মান্যবর সিংহবাহু। সিংহবাহু কলকাতার পুরানো বইপাড়ার একজন পরিচিত এবং বড় গুণগ্রাহী ছিলেন।
এক ছুটির দিনে বইপাড়ায় ঘুরছি। হঠাৎ নজরে পড়ল ফুটপাথের ওপর পোকায় কাটা ছেঁড়া-ফাটা একরাশ বইয়ের মাঝে নীল প্রচ্ছদের বিলেতি চেহারার একখান বই বেমানানভাবে পড়ে আছে। পুরানো হলেও একটা বনেদি ভাব তার সারা দেহে। নীল আর সোনালি রঙে আঁকা প্রচ্ছদটিতে এক ধরনের নীরব আভিজাত্য। কুমড়োর ফালির মতো সোনালি রঙের একখানা চাঁদ দোলনা হয়ে নীল আকাশে ঝুলে আছে আর সেই চাঁদের ভেতর ঘুমিয়ে মাথাভরা সোনালি চুলের একটি শিশু। বইটির নাম ইংরেজি হরফে সোনার জলে লেখা ঞযব ঈৎবংপবহঃ গড়ড়হ, রচয়িতা : জধনরহফৎধহধঃয ঞধমড়ৎব। এই বহুলপ্রচারিত ও দুষ্প্রাপ্য বইটির নাম শুনেছিলাম অনেক কিন্তু স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়নি। গভীর আগ্রহে বইটি নেড়েচেড়ে দেখি। রবীন্দ্রনাথের নিজের ইংরেজিতে লেখা কয়েকটি শিশুতোষ কবিতার সংকলন এটি। ছেপেছেন বিলেতের নামকরা পুস্তক-প্রকাশনী ম্যাকমিলান অ্যান্ড কোম্পানি, ১৯১৩ সালে। কতদিনের পোকায় কাটা পুরানো বই, তবু মলাটের সোনালি রং এখনো অম্লান। বইটির ভেতরে আরো বড় বিস¥য় অপেক্ষা করছিল। কবিতার ফাঁকে ফাঁকে আটখানা অপরূপ রঙিন ছবি, দামি আর্টপেপারে ছাপা। সেই সময়ের নামী-দামি বইয়ের মতো প্রত্যেকটি ছবির ওপর স্বচ্ছ টিস্যু পেপার, যাতে বহুলব্যবহারে ছবির রং নষ্ট না হয়। ছবিও এঁকেছেন সব ডাকসাইটে শিল্পী – অবন ঠাকুর, নন্দলাল, অসিতকুমার হালদার এবং সুরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি। বাংলার সব সেরা শিল্পমেধা যেন এই বইয়ের দুমলাটের ভেতর তাঁদের সমস্ত উৎকর্ষ নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। কবিতার বিষয়বস্তুকে ছোটদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার কী অনবদ্য নিষ্ঠাপূর্ণ প্রয়াস! রবীন্দ্রনাথ তাঁর বইয়ের ছাপা, কাগজ, ছবি, বাঁধাই এসব নিয়ে যে কতখানি সচেতন এবং সজাগ ছিলেন, তা সকলেই অবহিত আছেন। ঞযব ঈৎবংপবহঃ গড়ড়হ নিঃসন্দেহে ম্যাকমিলান অ্যান্ড কোম্পানির একটি শ্রেষ্ঠ এবং অনবদ্য প্রকাশনা হিসেবে সে-আমলে বেশ আলোড়ন তুলেছিল।
রবীন্দ্রনাথ বইটি উৎসর্গ করেছেন স্টার্জ মুরকে। রবীন্দ্রানুরাগী এবং শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে স্টার্জ মুর সর্বত্র পরিচিত। কিন্তু এছাড়াও তাঁর একটি বিশেষ পরিচয় রয়েছে। কবির অকৃত্রিম সুহৃদ স্টার্জ মুর নোবেল পুরস্কারের জন্য রবীন্দ্রনাথের নাম সুইডিশ অ্যাকাডেমির কাছে পাঠিয়েছিলেন – এ-তথ্য আজ সকলেরই জানা। কৃষ্ণ কৃপালনী ১৯৬২ সালে প্রকাশিত তাঁর জধনরহফৎধহধঃয ঞধমড়ৎব – অ ইরড়মৎধঢ়যু গ্রন্থে স্টার্জ মুরের এক বাক্যের যে-নোবেল প্রস্তাবপত্রটি উদ্ধৃত করেছেন তা নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো :
Sir, as a Fellwo of the Royal Society of Literature of the United Kingdom, I have the honour to propose the name of Rabindranath Tagore as a person well qualified, in my opinion, to be awarded the Nobel Pri“e in literature./ T. Sturge Moore.স্বভাবতই কৌতূহল জাগে, The Crescent Moon -এর অপরূপ প্রচ্ছদটি কার হাতে তৈরি? বইয়ের ভেতরে কোথাও এ-সম্পর্কে কোনো উল্লেখ নেই। The Crescent Moon নিয়ে কবিকে লেখা স্টার্জ মুরের ছয়-সাতখানি চিঠি পাওয়া গেছে বলে রবীন্দ্র-গবেষক সৌরীন্দ্র মিত্র তাঁর খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এই সমস্ত চিঠির বক্তব্য থেকে তাঁর ধারণা হয়েছে ম্যাকমিলানের আদি সংস্করণে ঞযব ঈৎবংপবহঃ গড়ড়হ-এর প্রচ্ছদের জন্য স্টার্জ মুর নিজেই ডিজাইন করেছিলেন। প্রশান্তকুমার পাল একই অভিমত প্রকাশ করেছেন তাঁর রবিজীবনীতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, The Crescent Moon -এর ফরাসি তরজমার আইনগত অধিকার কবি মিসেস স্টার্জ মুরকে দিয়েছিলেন, যদিও গীতাঞ্জলি এবং ডাকঘরের ফরাসি অনুবাদক আঁদ্রে জিদ এই সময়ে The Crescent Moon -এর একটি ফরাসি অনুবাদ করতে যথেষ্ট আগ্রহী ও উৎসাহী ছিলেন। এছাড়াও আরো অনেকে The Crescent Moon অনুবাদ করার স্বত্বের জন্য কবিকে অনুরোধ করেছিলেন, যার মধ্যে ইয়েটসের বান্ধবী আইরিশ বিপ্লবী মডগনের পালিতা কন্যার নামও উল্লেখযোগ্য। শোনা যায়, এই কন্যাটি এক প্রবাসী বাঙালি ভদ্রলোকের কাছে বাংলা ভাষা শিখতে শুরু করেছিলেন এই আশায় যে, হয়তো তিনি বইটি অনুবাদ করার অনুমতি কবির কাছ থেকে পেতেও পারেন।
The Crescent Moon বিলেতে সমালোচকদের যথেষ্ট প্রশংসা পেয়েছিল। তবে উচ্ছ্বাসের বশে কোনো কোনো সমালোচক একটু আতিশয্যও করেছিলেন বলে সৌরীন্দ্র মিত্রের ধারণা। The Globe -এর সমালোচক লিখলেন, ‘In the Crescent Moon Rabindranath Tagore offers a revelation more profound and more subtle than that in the Gitanjali. He opens to us the child mind – that mind which all of us have possessed and all save an uninspired fwe have long forgotten.’ কবি এডওয়ার্ড টমাসও The Crescent Moon -এর অকৃপণ প্রশংসা করেছেন দি ডেইলি ক্রনিকল পত্রে (১২. ১২. ১৯১৩)।
বিলেতে ইংরেজি গীতাঞ্জলিসহ রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য ইংরেজি কবিতার বইয়ের কাটতি কেমন ছিল এ-প্রশ্ন স্বভাবই উঠতে পারে। প্রকাশক ম্যাকমিলানের নথিপত্র গীতাঞ্জলির বাণিজ্যিক সাফল্যকে বলেছে – ‘বিস¥য়কর’। ‘যদিও গার্ডেনার বা The Crescent Moon -এর কোনোটিই গীতাঞ্জলির রেকর্ড ছুঁতে পারেনি তবুও বিলেতের বাজারে এদের ছিল ঈর্ষণীয় কাটতি।’ ১৯১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি Manchester Despatch পত্রিকায় ‘The Tagore Boom’ শীর্ষক রিপোর্টের একটি অংশ এখানে তুলে ধরা যেতে পারে :
‘A leading publisher informs me the Tagore books are selling in this country like the proverbial hot cakes… Boom is only just beginning.’ (সৌরীন্দ্র মিত্র/ খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে)
এছাড়া রোটেনস্টাইন ৪ আগস্ট ১৯১৪ সালে এক চিঠিতে কবিকে জানাচ্ছেন : Everything which nwo bears your name is gold to Macmillan। রবীন্দ্রনাথের বইয়ের কাটতির ব্যাপারে সবচেয়ে প্রামাণ্য দলিল হলো প্রকাশক ম্যাকমিলানের নিজস্ব বয়ান। ১৯১৪ সালের ১১ এপ্রিল ওয়েস্টমিনস্টার গেজেটে ম্যাকমিলান কোম্পানির ইঙ্গিতে একটি বিশেষ রিপোর্ট প্রকাশিত হয় (খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে/ সৌরীন্দ্র মিত্র)। রিপোর্টের অংশটুকু একটু দীর্ঘ হলেও তথ্যের প্রাসঙ্গিকতার কারণে এখানে তুলে ধরা অনুচিত হবে না।
Some remarkable figures have been reached by Messers Macmillan in the sale of the four translations they have published of works by Rabindranath Tagore. Gitanjali is in its
twenty-fourth thousand and selling steadily. The Crescent Moon in its seventh… These would be notable sale for aû books of pure literature. In all the circumstance they are probably without parallel. সৌরীন্দ্র মিত্রের মন্তব্য, ‘মনে রাখতে হবে, যে হিসাব দেখানো হয়েছে তা হলো গীতাঞ্জলির এক বৎসরের। দি গার্ডেনারের পাঁচ মাসের, The Crescent Moon -এর চার মাসের বিক্রয়ের হিসাব। পাঠ্যপুস্তক ছাড়া এই রেকর্ডের তুলনা ম্যাকমিলানের ঘরে বিরল।’
The Crescent Moon সম্পর্কে ইয়েটস-ঘটিত একটি অবাঞ্ছিত ঘটনা সৌরীন্দ্র মিত্র তাঁর খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে গ্রন্থে বিশদ আলোচনা করেছেন। ম্যাকমিলানকে এক গোপন চিঠির মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলিসহ ইংরেজি কবিতার মূল্যায়নে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন ইয়েটস। তিনি চিঠিতে আরো জানিয়েছিলেন যে, The Crescent Moon ‡Zv Sturge Moor কর্তৃক exhaustively revised.
কোন বিচিত্র অসূয়ায় তাড়িত হয়ে ইয়েটস-প্রকাশক ম্যাকমিলানকে রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি কবিতা-অনুবাদের মূল্যায়নে অস্বস্তিকর মন্তব্য করেছিলেন তা গবেষকের অনুসন্ধানের বিষয়। কিন্তু ইয়েটসের বিরূপ এবং ভিত্তিহীন মনোভাব যে ম্যাকমিলানকে আদৌ প্রভাবিত করেছিল তা মনে হয় না। সাময়িক বিভ্রান্তি হয়তো কিছুটা সৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু ইয়েটসের মূল অভিযোগ, The Crescent Moon exhaustively revised by Sturge Moor, শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি। তবে কি ইয়েটস রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি রচনার বাণিজ্যিক সাফল্যে সাময়িকভাবে হলেও কিছুটা ঈর্ষান্বিত বা হতাশ হয়েই গোপনে ম্যাকমিলানের কান ভাঙাবার চেষ্টা করেছিলেন?
এ-প্রসঙ্গে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে কি রবীন্দ্রনাথের কবিতার উজ্জ্বল দ্যুতি ভাষান্তরিত হয়েও তার প্রভা অক্ষুণ্ন রেখে রক্ষণশীল ইংরেজ পাঠকমহলকে উজ্জীবিত করেছিল, কবির মেধা, মনন এবং তাঁর সংবেদনশীলতা ম্যাকমিলানের বাণিজ্য-লক্ষ্মীকে হিরণ¥য় দ্যুতিতে উদ্ভাসিত করেছিল? রোটেনস্টাইনের এক চিঠিতে স্পষ্ট ভাষায় রবীন্দ্রনাথের সমস্ত ইংরেজি প্রকাশনার বাণিজ্যিক সাফল্যের প্রমাণ রয়ে গেছে। ১৯১৩ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে তিন বৎসরে ম্যাকমিলান রবীন্দ্রনাথের দশখানা বই প্রকাশ করেছেন অর্থাৎ বছরে তিন-চারখানা করে। সৌরীন্দ্র মিত্র উবাচ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ম্যাকমিলানরা তখন এতই ব্যস্ত ছিলেন যে অন্য কারো দিকে তাঁদের বিশেষ লক্ষই ছিল না বলা যায়। রবীন্দ্রনাথের দৌলতে ম্যাকমিলানের বাণিজ্যিক সাফল্য তখন তুঙ্গে। ম্যাকমিলানের ঘরে লক্ষ্মী যেন অচঞ্চলা।
দ্য ক্রিসেন্ট মুন হাতে পেয়ে বইপাড়ায় আমার টহলের মাত্রা বেড়ে গেল। আর এরই ফলে হঠাৎ একদিন দেখি ফুটপাতের একচিলতে দোকানের ঝাঁপির ওপর রোগাভোগা চেহারার হালকা-পাতলা কয়েকখানা বাংলা বই। নজরে পড়ার কারণ বিশেষ একটি বইয়ের প্রচ্ছদে নৃত্যরতা নারীর বিশিষ্ট ভঙ্গি, যা কিনা প্রথম দৃষ্টিতেই রবীন্দ্রনাথের ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর ছবির সহজ অথচ ভাঙাচোরা অবয়ব প্রচ্ছদের সেই নৃত্যরতা নারীমূর্তি থেকে স্পষ্ট উঁকি দিচ্ছে। বইয়ের নাম পড়তে কষ্ট হয়, কেননা প্রচ্ছদের বাদামি রঙের সাথে বইয়ের শিরোনামের বাদামি রং মিলেমিশে প্রায় একাকার হয়ে গেছে। বাঁ পাশে আরো একটু ওপরে সাদা পটভূমির ওপর ছোট করে বাদামি রঙের হাতে লেখা লেখকের নাম : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জন্মাবধি দেখে আসছি কবির সব বইয়ের একরঙা মেটে রঙের প্রচ্ছদ, তাতে ছবির কোনো নাম-নিশানা নেই। আর যে-সময়ের কথা বলছি কবি তখনো কপিরাইটের বাঁধন থেকে মুক্ত হননি যে, তাঁর বই কেউ ছবি আঁকিয়ে প্রচ্ছদ করে ছেপে দেবেন। শেষে পাতা উলটে সব বিভ্রান্তির অবসান হলো। আমার হাতে ধরা রয়েছে রবীন্দ্রনাথের চণ্ডালিকার প্রথম সংস্করণ। ছাপার তারিখ ভাদ্র, ১৩৪০। প্রথম সংস্করণে মোট ১১০০ কপি ছাপা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকাশক : শ্রীকিশোরীমোহন সাঁতরা, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ২১০ নং কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট, কলিকাতা। বীরভূমের শান্তিনিকেতন প্রেস থেকে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বইটি ছেপেছেন।
মহুয়া, চণ্ডালিকা এবং চার অধ্যায় – এই তিনটি বই ছেপেছে বিশ্বভারতী। যে-কোনো মাপকাঠিতে এই বই তিনটি বিশ্বভারতী-প্রকাশনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বইগুলোর প্রচ্ছদ, কাগজ ও মুদ্রণে রুচি, মেধা ও তীক্ষè নজরদারির ছাপ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ যে-তাঁর বই-প্রকাশনার ব্যাপারে তন্বিষ্ট, পরিশ্রমী ও সজাগ ছিলেন এই বইগুলো হাতে নিলেই তা বোঝা যায়। মহুয়া শক্ত মলাটের বই আর চণ্ডালিকা ও চার অধ্যায় নরম মলাটের।
চণ্ডালিকার একরঙা প্রচ্ছদটির নৃত্যরতা নারীমূর্তিটিতে একসঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত হিরণ¥য় দ্যুতি আর বিষাদের লাবণ্য। তার ভাঙাচোরা অবয়বের ভঙ্গিতে কোথায় যেন এক সুদূরের আহ্বান, গতি অমরাবতীর দিকে। এই প্রচ্ছদের প্রকাশভঙ্গি, নির্মাণশৈলী সবই সম্পূর্ণ নতুন এবং বলাবাহুল্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ছবিটির প্রচ্ছদটি দেখেই রবীন্দ্র-চিত্রকলা সম্পর্কে অশোক মিত্রের (ভারতের চিত্রকলা, ১৩৬৩) সেই বিখ্যাত মন্তব্য মনে পড়ে গেল, যেখানে তিনি বলছেন, ‘কবির ছবির বিষয় হলো খানিকটা আজগুবি, কাল্পনিক, খানিকটা বস্তুবিচ্ছিন্ন। রীতি হলো একেবারে দুইমাত্রিক, সমান, চ্যাপটা, ফ্ল্যাট… কাগজের সাদা জমিতে ছবিকে এমনভাবে নিক্ষেপ করলেন, এমনভাবে তার সংস্থান সাধন করলেন যে সাদা জমি মুহূর্তে গতিচঞ্চল, তৎপর, উন্মুখর হয়ে উঠল। কাগজের সাদা জমি ও ছবির মধ্যে তিনি এমনভাবে অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ-স্থাপন করলেন যে মনে হবে ছবিটি একটু নড়ালে চড়ালেই তার কেটে যাবে।’ চণ্ডালিকার প্রচ্ছদটি দেখে অশোক মিত্রের উক্তি আবার মনে পড়ল। ‘রবীন্দ্রনাথে আমরা এমন শিল্পী পেলুম যিনি সজ্ঞানে, ‘সুন্দর’ বিষয়, ‘সুন্দর’ মুখ, ‘সুন্দর’ দেহ, ‘সুন্দর’ মায়ায় ঘেরা দৃশ্য’’ ঠেলে ফেলে দিয়েছেন।’
চণ্ডালিকা তো হাতে এলো, কিন্তু তার প্রচ্ছদের ছবি নিয়ে যে ধন্দ আর কাটে না। কারণ প্রকাশক এবং গ্রন্থকার উভয়েই এ-ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব। একটি দেড় পাতার ছোট ভূমিকা থাকলেও প্রচ্ছদটি কে এঁকেছেন সে-ব্যাপারে গ্রন্থকার বা প্রকাশক একটি বাক্যখরচেও নারাজ। অশোক মিত্র রবীন্দ্র-চিত্রকলার যে-সমস্ত বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর সঙ্গে প্রচ্ছদটির প্রচুর সাদৃশ্য থাকলেও বইয়ের কোনো অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য থেকে প্রচ্ছদকারের নাম বা পরিচয় বের করতে পারিনি। যাঁরা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে গবেষণা করেন তাঁদের কাছেও কোনো নিশ্চিত প্রমাণভিত্তিক উত্তর পেলাম না।
আরেকদিন এমনি এক ছোট মলিন বইয়ের দোকানে পাওয়া গেল রবীন্দ্রনাথের চার অধ্যায়ের একখানা প্রথম সংস্করণ। ছাপার তারিখ অগ্রহায়ণ, ১৩৪১।
যদিও বইতে প্রথম সংস্করণ লেখা হয়েছে, কিন্তু কত কপি ছাপা হয়েছে তার কোনো উল্লেখ নেই। প্রকাশক : শ্রীকিশোরীমোহন সাঁতরা, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ২১০ নং কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট, কলিকাতা। এই বইটির প্রচ্ছদে ছবি নেই, কিন্তু সাদা পটভূমির ওপর সবুজ আর কালো রঙে ‘চার অধ্যায়’ এবং নিচে ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ লিখে বেশ সুন্দর করে অর্ধবৃত্তাকারে সাজানো হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ যেভাবে পাণ্ডুলিপি সংশোধন করতে গিয়ে নানা আঁকিবুকির মাধ্যমে এক ধরনের ছবির আদল তৈরি করতেন, মনে হলো একই ধরনের পদ্ধতি এখানেও অনুসরণ করা হয়েছে। প্রচ্ছদ-শিল্পীর নাম এবারও উহ্য।
বিপ্লবী রাজনীতির পটভূমিকায় লেখা উপন্যাস চার অধ্যায়ের প্রথম সংস্করণের একটি বিশেষত্ব রয়েছে। ‘আভাস’ নামে একটি ভূমিকা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ এই সংস্করণে, যা পরবর্তী সব সংস্করণে বর্জন করা হয়। পাতা উলটাতেই চোখে পড়ল উপন্যাসটির সেই বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ‘আভাস’। সেখানে রয়েছে একদা সুহৃদ, ‘ক্যাথলিক সন্ন্যাসী অপরপক্ষে বৈদান্তিক’ ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের নিজের পত্রিকা সন্ধ্যায় হিংসার রাজনীতিকে খোলাখুলি সমর্থন দেওয়ায় ব্যথিত ও শঙ্কিত রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য, ‘এই কাগজেই প্রথমে দেখা গেল বাংলাদেশে আভাসে-ইঙ্গিতে বিভীষিকা-পন্থার সূচনা। বৈদান্তিক সন্ন্যাসীর এত বড়ো প্রচণ্ড পরিবর্তন আমার কল্পনার অতীত ছিল।’ ‘আভাসে’ আরো রয়েছে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎশেষে ব্রহ্মবান্ধবের হতাশাপূর্ণ স্বীকারোক্তি – ‘রবিবাবু, আমার খুব পতন হয়েছে।’ ‘সেই অন্ধ উন্মত্ততার দিনে’ চার অধ্যায় ও তার ‘আভাস’ পত্রপত্রিকায় প্রচণ্ড সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। ফলে রবীন্দ্রনাথ বৈশাখ ১৩৪২ সংখ্যা প্রবাসীতে ‘চার অধ্যায় স¤¦ন্ধে কৈফিয়ত’ দিতে এবং, প্রশান্তকুমার পালের ভাষায়, ‘পরবর্তী সংস্করণে ‘আভাস’টি বর্জন করতে বাধ্য হন’।
সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের দুর্বলতা ও নেতিবাচক ভূমিকার প্রতি রবীন্দ্রনাথ বরাবরই ছিলেন বিরূপ – ঘরে বাইরে ও চার অধ্যায় উপন্যাসে তাঁর বীতরাগ শিল্পমণ্ডিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথের বারোটি উপন্যাস’ শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু নিজে পটভূমিকাকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে চার অধ্যায়কে এনা আর অন্তুর প্রেমের কাহিনী বলে গণ্য করেছেন। সুনীলও চার অধ্যায়কে সেই হিসেবেই দেখেন।
আমার আগ্রহ দেখে বই-বিক্রেতা একপাশে সরিয়ে রাখা আরেকখানা বই এগিয়ে দিলেন, বইটি রবীন্দ্রনাথের মহুয়া। ভেতরে লেখা রয়েছে প্রথম সংস্করণ (২১০০) আশ্বিন, ১৩৩৬। বোঝা গেল প্রথম সংস্করণে ২১০০ কপি ছাপা হয়েছিল। ছেপেছেন শ্রীনরেন্দ্রনাথ মুখার্জী, আর্ট প্রেস, ৩১ নং সেন্ট্রাল এভিনিউ, কলিকাতা। প্রকাশক : শ্রীকিশোরীমোহন সাঁতরা, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ২১০ নং কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট, কলিকাতা। আগের দুটি বইয়ে কোনো মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। এবার কিন্তু বইয়ের মূল্য ছেপে দেওয়া আছে : ২ টাকা।
বইয়ের প্রচ্ছদটি অপরূপ। ঘন লাল, কালো, আর সবুজের অনবদ্য মিশ্রণে একটি অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মহুয়া শব্দটি ঈষৎ বাঁকা করে লেখা। লালের ভেতর কালো রঙে ফুটে উঠেছে গ্রন্থকারের নাম ‘শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। কালচে রঙের ভেতরে হালকা লাল রঙের আভাস, যেন সকালবেলা সূর্য ওঠার আগে আকাশের লাল রং ধীরে ধীরে সরিয়ে দিচ্ছে আঁধার। লেখকের নাম যেভাবে লেখা হয়েছে
তাতে আমার মনে হলো কবির নিজের হাতের স্বাক্ষর। প্রচ্ছদের অর্ধেক সম্পূর্ণ ফাঁকা, হালকা একরঙা গেরুয়া রঙের পটভূমি, বাকি জায়গাটুকু জুড়ে আছে (পরবর্তীকালে যে-একরঙা গৈরিক প্রচ্ছদ রবীন্দ্র-রচনাবলির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ও পুরস্কৃত হয়েছিল, মহুয়ার প্রচ্ছদ কি তারই পূর্বসূরি) চণ্ডালিকা এবং চতুরঙ্গে রবীন্দ্রনাথ নামের আগে শ্রী ব্যবহার করেননি। কিন্তু মহুয়ার প্রচ্ছদে তিনি নামের আগে শ্রী ব্যবহার করেছেন। প্রচ্ছদ-শিল্পীর ব্যাপারে এবার প্রশান্তচন্দ্র মহালনবীশ আমাদের সব জল্পনাকল্পনা, আন্দাজ এবং অনুমান সম্পূর্ণ নিরসন করলেন। মহালনবীশ ‘পাঠ-পরিচয়’ নামে মহুয়ার একটি ভূমিকা লিখে একেবারে শেষ লাইনে প্রচ্ছদকারের পরিচিতি সুস্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করলেন, “আর একটি কথা উল্লেখযোগ্য – নামপত্রখানি কবির স্বহস্ত অঙ্কিত।”
মহুয়া ছাড়া যে-দুটি বই আগে উল্লেখ করেছি, সেগুলোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির রং, স্টাইল এবং প্রকাশভঙ্গির সাদৃশ্য সহজেই চোখে পড়ে। এ-প্রচ্ছদ দুটি কি তাঁর আঁকা? রবীন্দ্রনাথ আঁকা শুরু করেন শেষ বয়সে। মহুয়ার প্রচ্ছদ যখন আঁকেন, তখন তাঁর বয়স আটষট্টি। ততদিনে ছবির নেশা বেশ ধরেছে। কবির নিজের ভাষায় : ‘রেখার মাঝখানে আমার সমস্ত মন জড়িয়ে পড়েছে। অকালে অপরিচিতার প্রতি পক্ষপাতে কবিতা একেবারে পাড়া ছেড়ে চলে গেল।’ ১৩৩৬-এ আঁকা মহুয়ার প্রচ্ছদের পর খাপছাড়া (১৩৪৩) ও সে (১৩৪৪) – এই দুটি প্রকাশনায় দেখতে পাচ্ছি কবির আঁকা ‘বহুচিত্র ও রেখাচিত্র’। তবে কি এরই ধারা-বাহিকতায় ১৩৪০-এ প্রকাশিত চণ্ডালিকা এবং ১৩৪১-এ চার অধ্যায়ের প্রচ্ছদদুটি রবীন্দ্রনাথের নিজেরই আঁকা? অনুমান করা হয়তো অসংগত হবে না যে, বিশ্বভারতী পর্যায়ের কিছু নির্বাচিত রবীন্দ্রগ্রন্থের প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ তিনি নিজেই এঁকেছেন এবং হয়তো তাঁরই ইচ্ছানুযায়ী প্রচ্ছদ-শিল্পীর নাম উহ্য রাখা হয়। অবশ্য এই মতামত সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর এবং একমাত্র রবীন্দ্র-গবেষকরাই এ-ব্যাপারে যথার্থ রায় দেবার অধিকারী।
মহুয়া প্রথম সংস্করণের বই জেনেও বই-বিক্রেতা আমার কাছে কোনো চড়া দাম হাঁকেননি। আমার আগ্রহ দেখে তিনিই জানালেন যে, মাঝে মাঝে প্রথম সংস্করণের বই দু-একটি তাঁর হাতে পড়ে। এরকম বই পেলে অবশ্যই আমাকে খবর দেবেন এই আশ্বাসও দিলেন। কিন্তু, হায়, তারপর বইপাড়ায় অনেকদিন ঘোরাফেরা করেছি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রথম সংস্করণের বই অধরাই রয়ে গেছে। আমাদের দেশে ধহঃরয়ঁধৎরধহ বইয়ের প্রতিষ্ঠান নেই, যেখান থেকে পছন্দমাফিক পুরানো ও দু®প্রাপ্য বই সহজেই সংগ্রহ করা যায়। অনেকেই বিলেত-আমেরিকায় ধহঃরয়ঁধৎরধহ বইয়ের দোকানের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পছন্দমাফিক বই সংগ্রহ করেন, তবে তাদের সংখ্যা খুব কম এবং এই সুবিধা অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পুস্তকপ্রেমিকেরই নাগালের বাইরে। আমাদের ভরসা ঢাকার নীলক্ষেত, পুরানা পল্টন, বাংলাবাজারের পুরানো বইয়ের দোকান, যেখানে হারানো দিনের বইয়ের চাহিদা এরাই মিটিয়ে থাকে, আধুনিক বিপণন জগতের ক্রিয়াকৌশলের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে, তাদের নিজস্ব অপরিকল্পিত এবং অপেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। এই সাধারণ অল্পশিক্ষিত, স্বল্পপুঁজির পরিশ্রমী মানুষদের পুস্তকপ্রীতির কারণে হারানো দিনের বই আজও একেবারে হারিয়ে যায়নি। কামনা করি, বিশ্বায়নের দাপট, অসম প্রতিযোগিতা এবং বৈদ্যুতিন মিডিয়ার ঝাপটা কাটিয়ে এই হারানো দিনের বইওয়ালারা যেন বেঁচে-বর্তে থাকে আর এদের সঙ্গেই বেঁচে থাকুক হারানো দিনের সেই সমস্ত ঝাপসা হয়ে যাওয়া দুর্বল পাতার একরঙা বই, যা আজকের দিনের নতুন প্রজন্মকে টেনে আনবে হারানো বইয়ের জগতে, বইয়ের পাতায় আর কল্পরাজ্যের অসীম সম্ভাবনায়।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.