১৮ই অক্টোবর, ২০০৪। যখন সন্ধ্যার আঁধার নামছে চেনা পৃথিবীর চারপাশে; আকাশে জন্ম নিচ্ছে একটি দুটি করে নীলাভ তারা; ঠিক তখন মহিলা সমিতি মিলনায়তনের ভেতরে বেজে উঠল থার্ড বেল। মঞ্চস্থানের রঙ্গপূর্ব অন্ধকারে ১৯৭১ সালের আবহ ফুটিয়ে তুলতে সচেষ্ট হয়ে উঠল উদীচীর নাট্যকর্মীরা।
গণমুখী সংস্কৃতিচর্চা এবং এর মাধ্যমে সমাজ-পরিবর্তনের সংগ্রামকে বেগবান করার লক্ষ্যে ১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় উদীচী। শব্দসৈনিক কমরেড সত্যেন সেন এর প্রতিষ্ঠাতা।
উদীচীর পদচারণার শুরু মানুষের সামাজিক অস্তিত্বের সঙ্গে চৈতন্যলোকের সম্বন্ধকে স্বীকার করে। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, আগ্রাসনের মোকাবিলায় সংস্কৃতির হাতিয়ার ব্যবহারের অপরিহার্যতা উপলব্ধি করে উত্তাল রাজপথে নেমে আসে উদীচী। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, তারপর স্বাধীনতা-প্রত্যাশী বাঙালির সশস্ত্র সংগ্রামে গৌরবময় ভূমিকা-পালনকারী সংগঠন উদীচী যখন তাদের নাট্যপ্রযোজনার প্রেক্ষাপট নির্বাচন করে ১৯৭১-কে, তখন নাট্যামোদীদের প্রত্যাশায় ভিন্নমাত্রা যুক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক।
দর্শকসারির বুকভরা প্রত্যাশাপূরণের লক্ষ্যে নাট্যক্রিয়ায় মনোযোগী হয় উদীচীর মঞ্চ ও মঞ্চনেপথ্যের সৈনিকরা। শুরু হয় উদীচীর একাদশ প্রযোজনা বৌবসন্তি।
’৭১ সালের মার্চের পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নয় মাস এ-নাটকের প্রেক্ষাপট এবং এই প্রেক্ষাপটে পলিবিধৌত উর্বর ভূখণ্ডের কোনো-এক অনাদৃত গ্রামীণ জনপদের কিছু মানুষের বিচিত্র জীবনালেখ্যের চিত্রায়ণ বৌবসন্তি নাটকটি।
নাটকের কেন্দ্রে স্থাপিত দুটি চরিত্র বদর আর মনু। চুরি করা পেশা তাদের। চোর হলেও বদরের মানবিক সত্তায় একসময় দোলা দেয় একই গ্রামের ভিক্ষুক মোতালেবের মেয়ে রিজিয়া। রিজিয়ার প্রতি ভালোবাসা ভাসিয়ে নিয়ে যায় বদরকে জাগতিক পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে রংধনু-রং পৃথিবীতে। ভেসে যায় রিজিয়াও। কিন্তু জাগতিক মানুষের সৃষ্ট সামাজিক অবস্থানের গণ্ডিতে বাঁধা রিজিয়া এক পর্যায়ে প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয় বদরকে।
এরই মধ্যে বদর আর মনু একদিন চোরাইমালসমেত ধরা পড়ে গ্রামের মানুষের হাতে। অনিবার্যভাবেই কপালে জোটে তাদের প্রচণ্ড প্রহার। অধিকন্তু চেয়ারম্যানের ছেলে সেকান্দার বিচার করে গ্রামছাড়া করে বদর আর মনুকে।
সমাজের চোখে ঘৃণিত, ভালোবাসার মানুষের কাছে প্রত্যাখ্যাত বদর আর মনু অন্যন্যোপায় হয়ে চলে যায় গঞ্জে। গঞ্জে তাদের আশ্রয় দেয় চোরাইমালের ব্যবসায়ী হালিম।
একাত্তরের উত্তাল সময় তখন ঘিরে ধরেছে ভূখণ্ডের মানুষগুলোকে। যুদ্ধের আঁচ এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে জনপদের জীবনাচারে। কিন্তু প্রবহমান সময়ের স্রোতে জীবনের পদচারণা থেমে নেই। থেমে নেই মানুষের মনে বসন্তের আগমন।
বসন্ত এসে আবারও মাতিয়ে তোলে বদরকে। চোরাইমালের ব্যবসায়ী হালিমের মেয়ে জোৎস্নার আলোতে ফিকে হয়ে আসে বদরের মনে চিত্রিত রিজিয়ার মুখাবয়ব। বদর বিয়ে করে ফেলে জোৎস্নাকে। আনন্দের আতিশয্যে কেটে যায় কিছুদিন। কিন্তু পৃথিবীতে কোনো আনন্দই দীর্ঘস্থায়ী নয়। বস্তুগত প্রয়োজনে একসময় প্রতিস্থাপিত হয় ভাব। একসময় প্রকট হয়ে ওঠে মৌলিক চাহিদাপূরণসামগ্রীর অপ্রতুলতা। শুধু তাই নয়, প্রকাশ পায় জোৎস্নার অন্তরে স্বাভাবিকভাবেই লালিত লাল বেনারসি, টিকলি, গলার হারের স্বপ্ন।
জীবনের তাগিদে চৌর্যবৃত্তিতে আপাত নিষ্ক্রিয় বদর পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠার চিন্তা করতে বাধ্য হয়। এতে উৎসাহিত বোধ করে তার সহকর্মী মনু। খবর পাওয়া যায় সেকান্দার বিয়ে করেছে। বদর আর মনু একরাতে চুরি করতে যায় সেকান্দারের বাড়িতে। মৌলিক তাগিদের পাশাপাশি তাদের মধ্যে কাজ করে প্রতিশোধস্পৃহাও। চুরি করতে গিয়ে বদর দেখে সেকান্দারের স্ত্রী তারই পূর্বপ্রেমিকা রিজিয়া। বদরের ভেতর সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব। ফিকে হয়ে যাওয়া ভালোবাসা মুহূর্তের অসতর্কতায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার মনে। ভাবনায় পড়ে বদর – আসলে কে তার আপন? প্রেমিকা রিজিয়া নাকি স্ত্রী জোৎস্না? জোৎস্নার সঙ্গে বদরের সামাজিক বন্ধনের কাছে হার মানে রিজিয়ার প্রতি বদরের ভালোবাসা। জোৎস্নার জন্য অবশেষে বয়ে নিয়ে আসে রিজিয়ার জিনিসপত্র। ভোররাতে বাড়ি ফেরে বদর – সেই জোৎস্নার কাছে, যে তার একান্ত আপনজন। কিন্তু ফিরে এসে দেখে তার স্ত্রী জোৎস্না পালিয়ে গেছে পাকিস্তানি আর্মির খেদমতে নিয়োজিত ধূর্ত প্রতারক মঈনের সঙ্গে – এই হচ্ছে সারাৎসার বৌবসন্তি নাটকের। নাট্যঘটনার আরম্ভ পূর্ব
পাকিস্তানে – সমাপ্তি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে। নাট্যকার রতন সিদ্দিকীর বহু পূর্বে লেখা একটি ছোটগল্পের নাট্যরূপান্তর এটি। নাট্যরূপান্তরে রতন সিদ্দিকীর দক্ষতা সংশয়াতীত। উদাহরণ টানতে খুব বেশি পেছনে তাকাবার প্রয়োজন পড়ে না নাট্যরসিকদের। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের স্নায়ু-উদ্দীপ্তকারী উপন্যাস চিলেকোঠার সেপাইয়ের অসাধারণ নাট্যরূপান্তর ঘটেছিল এই রতন সিদ্দিকীর হাতেই। আর তাকে কেন্দ্র করে প্রযোজিত হয়েছিল উদীচীর নবম নাট্যপ্রযোজনা চিলেকোঠার সেপাই।
কিন্তু এই বৌবসন্তি নাটকটির কয়েকটি অংশ দর্শকদের সুযোগ তৈরি করে দেয় ভ্রƒ-কুঞ্চনের। নাটকে ব্যবহৃত গান, এম.আর. আখতার মুকুলের চরমপত্রের ব্যবহার, দৃশ্যচিত্রণে নির্দেশকের নিপুণ আঁচড়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপট বুঝতে বিন্দুমাত্র হোঁচট খেতে হয় না নাট্য-উপভোগকারীদের এবং নির্দেশনার স্তর-বিবেচনায় স্পষ্টতই বোঝা যায় ’৭১ এই নাটকের মূল উপজীব্য বিষয় নয় এবং ’৭১-এর অর্জিত সত্য অনেকগুলো খণ্ডিত সত্যের সুসংবাদ রূপ আর সেই খণ্ডিত সত্যের একটি অংশকে তুলে ধরা বৌবসন্তি নাটকের লক্ষ্য, তথাপিও নাটকের শুরুতে এবং শেষে যথাক্রমে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারপ্রমত্ত বাঙালি আর বাংলাদেশের বাঙালিদের মধ্যে লুকিয়ে-থাকা কতিপয় স্বাধীনতাবিরোধীদের অবস্থান সম্পর্কিত তথ্যবহনকারী নাট্যমুহূর্তদুটির অন্তর্নিহিত সুর, সমগ্র নাট্যঘটনার মূল সুরের সঙ্গে একসুরে বাঁধা পড়তে আন্তরিক ছিল কিনা অথবা একসুরে বাঁধবার প্রচেষ্টাটি আদতেই যথার্থতার দাবি রাখে কিনা এই ভাবনায় প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে নাট্য-অবলোকনকারীদের চিত্ত।
উল্লেখযোগ্য কোনো নাট্যসংঘাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি নাটকের কাহিনী। উপরন্তু বদর-চরিত্রটির মানসিক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশের মঞ্চরূপের সঙ্গে সংযোগ গড়তে প্রায়শই সমর্থ হয়নি তার চরিত্রের চিত্রিত গভীরতা। রিজিয়ার প্রতি বদরের ভালোবাসার প্রচণ্ডতা অতি দ্রুত জোৎস্নার প্রতি স্থানান্তরিত হওয়াটা চরিত্রের মানসিক অগভীরতার প্রকাশ। আর অগভীর চরিত্রের আবেগচিত্রণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আতিশয্যের দোষে দুষ্ট বলে মনে হয়েছে অবলোকনকারীদের কাছে। এর দায় যতটুকু বহন করতে হয় নাট্যকারকে; তার চাইতে এতটুকু কম বহন করতে হয় না নির্দেশককেও, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি।
যদিও একটি নাট্যপ্রচেষ্টার প্রতিটি স্তর সমন্বিত করাটা ভীষণ কঠিন, তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে খুব বেশি আপোসে সম্মত হতে আপত্তি নাট্যামোদীদের। কারণ নির্দেশক আজাদ আবুল কালামের পূর্ববর্তী নাটকসমূহের ঊর্ধ্বমুখী সাফল্যের আলোতেই তাকে খুঁজে ফিরবেন নাট্যামোদীরা, সেটিই স্বাভাবিক। আর চিলেকোঠার সেপাইয়ের দক্ষতার স্বাদ যদি নাট্যকারের আলোচ্য নাট্যরূপেও খুঁজে পেতে চায় নাট্যামোদীদের জিহ্বা; কতটুকু দোষ দেওয়া যায় তাদের?
পাণ্ডুলিপি থেকে একটি নাটকের মঞ্চে উঠে-আসার পথটুকু কণ্টকাকীর্ণ নিঃসন্দেহে। মূল রস অক্ষুণ্ন রেখে নাটকের ভেতরকার গল্পের আবেগ ও কল্পনার ডালপালা ছেঁটে প্রোসেনিয়ামের ‘ইউ’ আকৃতির ফুলদানিতে সুন্দর করে সাজানোর সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রয়োগকৌশল নির্ধারণ – এই ক্ষেত্রে যতটুকু শ্রম দাবি করা উচিত একজন নির্দেশকের কাছে, তার প্রায় পুরোটুকুই দিতে সক্ষম হয়েছেন আজাদ আবুল কালাম।
আপাত প্রত্যক্ষ রাজনীতির বাইরে – নগর নয়, গঞ্জ নয়, কোনো-এক নিভৃত গ্রামের প্রচ্ছদে এক চোর, চোরের সহচর, দুই নারী, এক সম্ভ্রান্ত পুরুষ, উঠতি সুযোগসন্ধানী এক পাক-সহযোগী আর অকিঞ্চিৎকর কিছু মানুষের সম্মিলিত ছবি; তাদের জীবনাচার মঞ্চে একের পর এক দৃশ্যমান করেছেন তিনি। প্রায় কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই অনেকগুলো কনফিউশনকে মিলিয়েছেন এক ফিউশনে। নাটকে তুলে এনেছেন একাত্তর, তবে যেভাবে আমরা একাত্তরকে চিনি ঠিক সেভাবে যেন নয়।
নাটকটির পটভূমি দাবি করে মঞ্চস্থানে অনেকগুলো মানুষের একত্র পদচারণা। মুখোশ-ব্যবহারের মাধ্যমে উদীচীর মঞ্চকর্মীর অপ্রতুলতা ঢাকার প্রচেষ্টার পাশাপাশি বহু মানুষের ইলিউশন-সৃষ্টির সফলতায় পাওয়া যায় নির্দেশকের বুদ্ধিদীপ্ততার প্রমাণ। মাহিহুদ্দৌলা আজাদ ছিলেন মুখোশ-নির্মাণের নেপথ্যকর্মী।
মঞ্চ ও আলোক-পরিকল্পনায় ছিলেন সাইফুল ইসলাম। কাঠ, দড়ি আর ¯েপ্র করা মশারির নেটে সাজিয়েছেন তিনি মঞ্চটিকে। কয়েকটি লেয়ার তৈরির মাধ্যমে তিনি সৃষ্টি করেছেন দর্শকদৃষ্টিতে দূর-ভ্রমণের অনুভূতি। তার উপর যথাযথ বর্ণ ও প্রখরতার আলোকসম্পাতে মঞ্চতলে আবহমান বাংলার প্রত্যন্ত এক গ্রামাঞ্চল ফুটে উঠেছে চমৎকারভাবে।
সংগীত-ভাবনায় রাহুল আনন্দ অনবদ্য। বাঁশি, ঢোল আর ঝাঁঝের মতো দেশজ বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজে বেঁধেছেন তিনি বৌবসন্তির প্রেক্ষাপট। এছাড়াও সময় সময় ইফেক্ট হিসেবে লাইভ সাউন্ড ব্যবহার করেছেন তিনি। হাত আর মুখের আওয়াজে সৃষ্ট কলাবাদুড়ের উড়ে যাবার শব্দটি চমৎকৃত করে দর্শকদের। সংগীত-প্রয়োগে তাঁকে যথার্থ সহায়তা দিয়েছেন আকাশ আহমেদ।
সাবলীল অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শক-মানসে দাগ ফেলতে সমর্থ হয়েছেন প্রায় সকল অভিনেতা-অভিনেত্রী। বিশেষত মনু-চরিত্রে আনোয়ারুল হক এবং ফাহমিদা হক কলির জোৎস্নার চরিত্র চিত্রণ-অনুল্লেখে রচনার অঙ্গহানি হয়।
বৌবসন্তি নাটক-নির্মাণে উদীচীকে শ্রম আর মেধা দিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে প্রাচ্যনাট। তাদের সঙ্গে সৃষ্ট সহযোগ উদীচী গ্রহণ করেছে সহর্ষে। বৌবসন্তি বাংলার লোকজ ক্রীড়া ‘বৌ-চি’র অন্য নাম। বৌ-চি খেলতে খেলতে এই নাটকের আরম্ভ আর খেলতে খেলতেই একসময়ে নেমে আসে যবনিকা – শেষ হয় নাটক – নাট্যামোদীরা ফিরে যান যে যার গণ্ডিবদ্ধ জীবনে – শুধু মনে জড়িয়ে নিয়ে যান এক ধরনের অনুভূতি।
বৌবসন্তি নাটকের অবলোকন সুখানুভূতি নিয়ে ফিরে-আসার নিশ্চয়তা দেয়। য়কোনো-এক অনাদৃত গ্রামীণ জনপদের কিছু মানুষের বিচিত্র জীবনালেখ্যের চিত্রায়ণ বৌবসন্তি নাটকটি।
নাটকের কেন্দ্রে স্থাপিত দুটি চরিত্র বদর আর মনু। চুরি করা পেশা তাদের। চোর হলেও বদরের মানবিক সত্তায় একসময় দোলা দেয় একই গ্রামের ভিক্ষুক মোতালেবের মেয়ে রিজিয়া। রিজিয়ার প্রতি ভালোবাসা ভাসিয়ে নিয়ে যায় বদরকে জাগতিক পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে রংধনু-রং পৃথিবীতে। ভেসে যায় রিজিয়াও। কিন্তু জাগতিক মানুষের সৃষ্ট সামাজিক অবস্থানের গণ্ডিতে বাঁধা রিজিয়া এক পর্যায়ে প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয় বদরকে।
এরই মধ্যে বদর আর মনু একদিন চোরাইমালসমেত ধরা পড়ে গ্রামের মানুষের হাতে। অনিবার্যভাবেই কপালে জোটে তাদের প্রচণ্ড প্রহার। অধিকন্তু চেয়ারম্যানের ছেলে সেকান্দার বিচার করে গ্রামছাড়া করে বদর আর মনুকে।
সমাজের চোখে ঘৃণিত, ভালোবাসার মানুষের কাছে প্রত্যাখ্যাত বদর আর মনু অন্যন্যোপায় হয়ে চলে যায় গঞ্জে। গঞ্জে তাদের আশ্রয় দেয় চোরাইমালের ব্যবসায়ী হালিম।
একাত্তরের উত্তাল সময় তখন ঘিরে ধরেছে ভূখণ্ডের মানুষগুলোকে। যুদ্ধের আঁচ এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে জনপদের জীবনাচারে। কিন্তু প্রবহমান সময়ের স্রোতে জীবনের পদচারণা থেমে নেই। থেমে নেই মানুষের মনে বসন্তের আগমন।
বসন্ত এসে আবারও মাতিয়ে তোলে বদরকে। চোরাইমালের ব্যবসায়ী হালিমের মেয়ে জোৎস্নার আলোতে ফিকে হয়ে আসে বদরের মনে চিত্রিত রিজিয়ার মুখাবয়ব। বদর বিয়ে করে ফেলে জোৎস্নাকে। আনন্দের আতিশয্যে কেটে যায় কিছুদিন। কিন্তু পৃথিবীতে কোনো আনন্দই দীর্ঘস্থায়ী নয়। বস্তুগত প্রয়োজনে একসময় প্রতিস্থাপিত হয় ভাব। একসময় প্রকট হয়ে ওঠে মৌলিক চাহিদাপূরণসামগ্রীর অপ্রতুলতা। শুধু তাই নয়, প্রকাশ পায় জোৎস্নার অন্তরে স্বাভাবিকভাবেই লালিত লাল বেনারসি, টিকলি, গলার হারের স্বপ্ন।
জীবনের তাগিদে চৌর্যবৃত্তিতে আপাত নিষ্ক্রিয় বদর পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠার চিন্তা করতে বাধ্য হয়। এতে উৎসাহিত বোধ করে তার সহকর্মী মনু। খবর পাওয়া যায় সেকান্দার বিয়ে করেছে। বদর আর মনু একরাতে চুরি করতে যায় সেকান্দারের বাড়িতে। মৌলিক তাগিদের পাশাপাশি তাদের মধ্যে কাজ করে প্রতিশোধস্পৃহাও। চুরি করতে গিয়ে বদর দেখে সেকান্দারের স্ত্রী তারই পূর্বপ্রেমিকা রিজিয়া। বদরের ভেতর সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব। ফিকে হয়ে যাওয়া ভালোবাসা মুহূর্তের অসতর্কতায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার মনে। ভাবনায় পড়ে বদর – আসলে কে তার আপন? প্রেমিকা রিজিয়া নাকি স্ত্রী জোৎস্না? জোৎস্নার সঙ্গে বদরের সামাজিক বন্ধনের কাছে হার মানে রিজিয়ার প্রতি বদরের ভালোবাসা। জোৎস্নার জন্য অবশেষে বয়ে নিয়ে আসে রিজিয়ার জিনিসপত্র। ভোররাতে বাড়ি ফেরে বদর – সেই জোৎস্নার কাছে, যে তার একান্ত আপনজন। কিন্তু ফিরে এসে দেখে তার স্ত্রী জোৎস্না পালিয়ে গেছে পাকিস্তানি আর্মির খেদমতে নিয়োজিত ধূর্ত প্রতারক মঈনের সঙ্গে – এই হচ্ছে সারাৎসার বৌবসন্তি নাটকের। নাট্যঘটনার আরম্ভ পূর্ব
পাকিস্তানে – সমাপ্তি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে। নাট্যকার রতন সিদ্দিকীর বহু পূর্বে লেখা একটি ছোটগল্পের নাট্যরূপান্তর এটি। নাট্যরূপান্তরে রতন সিদ্দিকীর দক্ষতা সংশয়াতীত। উদাহরণ টানতে খুব বেশি পেছনে তাকাবার প্রয়োজন পড়ে না নাট্যরসিকদের। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের স্নায়ু-উদ্দীপ্তকারী উপন্যাস চিলেকোঠার সেপাইয়ের অসাধারণ নাট্যরূপান্তর ঘটেছিল এই রতন সিদ্দিকীর হাতেই। আর তাকে কেন্দ্র করে প্রযোজিত হয়েছিল উদীচীর নবম নাট্যপ্রযোজনা চিলেকোঠার সেপাই।
কিন্তু এই বৌবসন্তি নাটকটির কয়েকটি অংশ দর্শকদের সুযোগ তৈরি করে দেয় ভ্রƒ-কুঞ্চনের। নাটকে ব্যবহৃত গান, এম.আর. আখতার মুকুলের চরমপত্রের ব্যবহার, দৃশ্যচিত্রণে নির্দেশকের নিপুণ আঁচড়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপট বুঝতে বিন্দুমাত্র হোঁচট খেতে হয় না নাট্য-উপভোগকারীদের এবং নির্দেশনার স্তর-বিবেচনায় স্পষ্টতই বোঝা যায় ’৭১ এই নাটকের মূল উপজীব্য বিষয় নয় এবং ’৭১-এর অর্জিত সত্য অনেকগুলো খণ্ডিত সত্যের সুসংবাদ রূপ আর সেই খণ্ডিত সত্যের একটি অংশকে তুলে ধরা বৌবসন্তি নাটকের লক্ষ্য, তথাপিও নাটকের শুরুতে এবং শেষে যথাক্রমে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারপ্রমত্ত বাঙালি আর বাংলাদেশের বাঙালিদের মধ্যে লুকিয়ে-থাকা কতিপয় স্বাধীনতাবিরোধীদের অবস্থান সম্পর্কিত তথ্যবহনকারী নাট্যমুহূর্তদুটির অন্তর্নিহিত সুর, সমগ্র নাট্যঘটনার মূল সুরের সঙ্গে একসুরে বাঁধা পড়তে আন্তরিক ছিল কিনা অথবা একসুরে বাঁধবার প্রচেষ্টাটি আদতেই যথার্থতার দাবি রাখে কিনা এই ভাবনায় প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে নাট্য-অবলোকনকারীদের চিত্ত।
উল্লেখযোগ্য কোনো নাট্যসংঘাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি নাটকের কাহিনী। উপরন্তু বদর-চরিত্রটির মানসিক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশের মঞ্চরূপের সঙ্গে সংযোগ গড়তে প্রায়শই সমর্থ হয়নি তার চরিত্রের চিত্রিত গভীরতা। রিজিয়ার প্রতি বদরের ভালোবাসার প্রচণ্ডতা অতি দ্রুত জোৎস্নার প্রতি স্থানান্তরিত হওয়াটা চরিত্রের মানসিক অগভীরতার প্রকাশ। আর অগভীর চরিত্রের আবেগচিত্রণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আতিশয্যের দোষে দুষ্ট বলে মনে হয়েছে অবলোকনকারীদের কাছে। এর দায় যতটুকু বহন করতে হয় নাট্যকারকে; তার চাইতে এতটুকু কম বহন করতে হয় না নির্দেশককেও, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি।
যদিও একটি নাট্যপ্রচেষ্টার প্রতিটি স্তর সমন্বিত করাটা ভীষণ কঠিন, তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে খুব বেশি আপোসে সম্মত হতে আপত্তি নাট্যামোদীদের। কারণ নির্দেশক আজাদ আবুল কালামের পূর্ববর্তী নাটকসমূহের ঊর্ধ্বমুখী সাফল্যের আলোতেই তাকে খুঁজে ফিরবেন নাট্যামোদীরা, সেটিই স্বাভাবিক। আর চিলেকোঠার সেপাইয়ের দক্ষতার স্বাদ যদি নাট্যকারের আলোচ্য নাট্যরূপেও খুঁজে পেতে চায় নাট্যামোদীদের জিহ্বা; কতটুকু দোষ দেওয়া যায় তাদের?
পাণ্ডুলিপি থেকে একটি নাটকের মঞ্চে উঠে-আসার পথটুকু কণ্টকাকীর্ণ নিঃসন্দেহে। মূল রস অক্ষুণ্ন রেখে নাটকের ভেতরকার গল্পের আবেগ ও কল্পনার ডালপালা ছেঁটে প্রোসেনিয়ামের ‘ইউ’ আকৃতির ফুলদানিতে সুন্দর করে সাজানোর সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রয়োগকৌশল নির্ধারণ – এই ক্ষেত্রে যতটুকু শ্রম দাবি করা উচিত একজন নির্দেশকের কাছে, তার প্রায় পুরোটুকুই দিতে সক্ষম হয়েছেন আজাদ আবুল কালাম।
আপাত প্রত্যক্ষ রাজনীতির বাইরে – নগর নয়, গঞ্জ নয়, কোনো-এক নিভৃত গ্রামের প্রচ্ছদে এক চোর, চোরের সহচর, দুই নারী, এক সম্ভ্রান্ত পুরুষ, উঠতি সুযোগসন্ধানী এক পাক-সহযোগী আর অকিঞ্চিৎকর কিছু মানুষের সম্মিলিত ছবি; তাদের জীবনাচার মঞ্চে একের পর এক দৃশ্যমান করেছেন তিনি। প্রায় কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই অনেকগুলো কনফিউশনকে মিলিয়েছেন এক ফিউশনে। নাটকে তুলে এনেছেন একাত্তর, তবে যেভাবে আমরা একাত্তরকে চিনি ঠিক সেভাবে যেন নয়।
নাটকটির পটভূমি দাবি করে মঞ্চস্থানে অনেকগুলো মানুষের একত্র পদচারণা। মুখোশ-ব্যবহারের মাধ্যমে উদীচীর মঞ্চকর্মীর অপ্রতুলতা ঢাকার প্রচেষ্টার পাশাপাশি বহু মানুষের ইলিউশন-সৃষ্টির সফলতায় পাওয়া যায় নির্দেশকের বুদ্ধিদীপ্ততার প্রমাণ। মাহিহুদ্দৌলা আজাদ ছিলেন মুখোশ-নির্মাণের নেপথ্যকর্মী।
মঞ্চ ও আলোক-পরিকল্পনায় ছিলেন সাইফুল ইসলাম। কাঠ, দড়ি আর ¯েপ্র করা মশারির নেটে সাজিয়েছেন তিনি মঞ্চটিকে। কয়েকটি লেয়ার তৈরির মাধ্যমে তিনি সৃষ্টি করেছেন দর্শকদৃষ্টিতে দূর-ভ্রমণের অনুভূতি। তার উপর যথাযথ বর্ণ ও প্রখরতার আলোকসম্পাতে মঞ্চতলে আবহমান বাংলার প্রত্যন্ত এক গ্রামাঞ্চল ফুটে উঠেছে চমৎকারভাবে।
সংগীত-ভাবনায় রাহুল আনন্দ অনবদ্য। বাঁশি, ঢোল আর ঝাঁঝের মতো দেশজ বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজে বেঁধেছেন তিনি বৌবসন্তির প্রেক্ষাপট। এছাড়াও সময় সময় ইফেক্ট হিসেবে লাইভ সাউন্ড ব্যবহার করেছেন তিনি। হাত আর মুখের আওয়াজে সৃষ্ট কলাবাদুড়ের উড়ে যাবার শব্দটি চমৎকৃত করে দর্শকদের। সংগীত-প্রয়োগে তাঁকে যথার্থ সহায়তা দিয়েছেন আকাশ আহমেদ।
সাবলীল অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শক-মানসে দাগ ফেলতে সমর্থ হয়েছেন প্রায় সকল অভিনেতা-অভিনেত্রী। বিশেষত মনু-চরিত্রে আনোয়ারুল হক এবং ফাহমিদা হক কলির জোৎস্নার চরিত্র চিত্রণ-অনুল্লেখে রচনার অঙ্গহানি হয়।
বৌবসন্তি নাটক-নির্মাণে উদীচীকে শ্রম আর মেধা দিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে প্রাচ্যনাট। তাদের সঙ্গে সৃষ্ট সহযোগ উদীচী গ্রহণ করেছে সহর্ষে। বৌবসন্তি বাংলার লোকজ ক্রীড়া ‘বৌ-চি’র অন্য নাম। বৌ-চি খেলতে খেলতে এই নাটকের আরম্ভ আর খেলতে খেলতেই একসময়ে নেমে আসে যবনিকা – শেষ হয় নাটক – নাট্যামোদীরা ফিরে যান যে যার গণ্ডিবদ্ধ জীবনে – শুধু মনে জড়িয়ে নিয়ে যান এক ধরনের অনুভূতি।
বৌবসন্তি নাটকের অবলোকন সুখানুভূতি নিয়ে ফিরে-আসার নিশ্চয়তা দেয়। য়’৭১ এই নাটকের মূল উপজীব্য বিষয় নয় এবং ’৭১-এর অর্জিত সত্য অনেকগুলো খণ্ডিত সত্যের সুসংবাদ রূপ আর সেই খণ্ডিত সত্যের একটি অংশকে তুলে ধরা বৌবসন্তি নাটকের লক্ষ্য, তথাপিও নাটকের শুরুতে এবং শেষে যথাক্রমে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারপ্রমত্ত বাঙালি আর বাংলাদেশের বাঙালিদের মধ্যে লুকিয়ে-থাকা কতিপয় স্বাধীনতাবিরোধীদের অবস্থান সম্পর্কিত তথ্যবহনকারী নাট্যমুহূর্তদুটির অন্তর্নিহিত সুর, সমগ্র নাট্যঘটনার মূল সুরের সঙ্গে একসুরে বাঁধা পড়তে আন্তরিক ছিল কিনা অথবা একসুরে বাঁধবার প্রচেষ্টাটি আদতেই যথার্থতার দাবি রাখে কিনা এই ভাবনায় প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে নাট্য-অবলোকনকারীদের চিত্ত।
উল্লেখযোগ্য কোনো নাট্যসংঘাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি নাটকের কাহিনী। উপরন্তু বদর-চরিত্রটির মানসিক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশের মঞ্চরূপের সঙ্গে সংযোগ গড়তে প্রায়শই সমর্থ হয়নি তার চরিত্রের চিত্রিত গভীরতা। রিজিয়ার প্রতি বদরের ভালোবাসার প্রচণ্ডতা অতি দ্রুত জোৎস্নার প্রতি স্থানান্তরিত হওয়াটা চরিত্রের মানসিক অগভীরতার প্রকাশ। আর অগভীর চরিত্রের আবেগচিত্রণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আতিশয্যের দোষে দুষ্ট বলে মনে হয়েছে অবলোকনকারীদের কাছে। এর দায় যতটুকু বহন করতে হয় নাট্যকারকে; তার চাইতে এতটুকু কম বহন করতে হয় না নির্দেশককেও, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি।
যদিও একটি নাট্যপ্রচেষ্টার প্রতিটি স্তর সমন্বিত করাটা ভীষণ কঠিন, তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে খুব বেশি আপোসে সম্মত হতে আপত্তি নাট্যামোদীদের। কারণ নির্দেশক আজাদ আবুল কালামের পূর্ববর্তী নাটকসমূহের ঊর্ধ্বমুখী সাফল্যের আলোতেই তাকে খুঁজে ফিরবেন নাট্যামোদীরা, সেটিই স্বাভাবিক। আর চিলেকোঠার সেপাইয়ের দক্ষতার স্বাদ যদি নাট্যকারের আলোচ্য নাট্যরূপেও খুঁজে পেতে চায় নাট্যামোদীদের জিহ্বা; কতটুকু দোষ দেওয়া যায় তাদের?
পাণ্ডুলিপি থেকে একটি নাটকের মঞ্চে উঠে-আসার পথটুকু কণ্টকাকীর্ণ নিঃসন্দেহে। মূল রস অক্ষুণ্ন রেখে নাটকের ভেতরকার গল্পের আবেগ ও কল্পনার ডালপালা ছেঁটে প্রোসেনিয়ামের ‘ইউ’ আকৃতির ফুলদানিতে সুন্দর করে সাজানোর সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রয়োগকৌশল নির্ধারণ – এই ক্ষেত্রে যতটুকু শ্রম দাবি করা উচিত একজন নির্দেশকের কাছে, তার প্রায় পুরোটুকুই দিতে সক্ষম হয়েছেন আজাদ আবুল কালাম।
আপাত প্রত্যক্ষ রাজনীতির বাইরে – নগর নয়, গঞ্জ নয়, কোনো-এক নিভৃত গ্রামের প্রচ্ছদে এক চোর, চোরের সহচর, দুই নারী, এক সম্ভ্রান্ত পুরুষ, উঠতি সুযোগসন্ধানী এক পাক-সহযোগী আর অকিঞ্চিৎকর কিছু মানুষের সম্মিলিত ছবি; তাদের জীবনাচার মঞ্চে একের পর এক দৃশ্যমান করেছেন তিনি। প্রায় কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই অনেকগুলো কনফিউশনকে মিলিয়েছেন এক ফিউশনে। নাটকে তুলে এনেছেন একাত্তর, তবে যেভাবে আমরা একাত্তরকে চিনি ঠিক সেভাবে যেন নয়।
নাটকটির পটভূমি দাবি করে মঞ্চস্থানে অনেকগুলো মানুষের একত্র পদচারণা। মুখোশ-ব্যবহারের মাধ্যমে উদীচীর মঞ্চকর্মীর অপ্রতুলতা ঢাকার প্রচেষ্টার পাশাপাশি বহু মানুষের ইলিউশন-সৃষ্টির সফলতায় পাওয়া যায় নির্দেশকের বুদ্ধিদীপ্ততার প্রমাণ। মাহিহুদ্দৌলা আজাদ ছিলেন মুখোশ-নির্মাণের নেপথ্যকর্মী।
মঞ্চ ও আলোক-পরিকল্পনায় ছিলেন সাইফুল ইসলাম। কাঠ, দড়ি আর ¯েপ্র করা মশারির নেটে সাজিয়েছেন তিনি মঞ্চটিকে। কয়েকটি লেয়ার তৈরির মাধ্যমে তিনি সৃষ্টি করেছেন দর্শকদৃষ্টিতে দূর-ভ্রমণের অনুভূতি। তার উপর যথাযথ বর্ণ ও প্রখরতার আলোকসম্পাতে মঞ্চতলে আবহমান বাংলার প্রত্যন্ত এক গ্রামাঞ্চল ফুটে উঠেছে চমৎকারভাবে।
সংগীত-ভাবনায় রাহুল আনন্দ অনবদ্য। বাঁশি, ঢোল আর ঝাঁঝের মতো দেশজ বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজে বেঁধেছেন তিনি বৌবসন্তির প্রেক্ষাপট। এছাড়াও সময় সময় ইফেক্ট হিসেবে লাইভ সাউন্ড ব্যবহার করেছেন তিনি। হাত আর মুখের আওয়াজে সৃষ্ট কলাবাদুড়ের উড়ে যাবার শব্দটি চমৎকৃত করে দর্শকদের। সংগীত-প্রয়োগে তাঁকে যথার্থ সহায়তা দিয়েছেন আকাশ আহমেদ।
সাবলীল অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শক-মানসে দাগ ফেলতে সমর্থ হয়েছেন প্রায় সকল অভিনেতা-অভিনেত্রী। বিশেষত মনু-চরিত্রে আনোয়ারুল হক এবং ফাহমিদা হক কলির জোৎস্নার চরিত্র চিত্রণ-অনুল্লেখে রচনার অঙ্গহানি হয়।
বৌবসন্তি নাটক-নির্মাণে উদীচীকে শ্রম আর মেধা দিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে প্রাচ্যনাট। তাদের সঙ্গে সৃষ্ট সহযোগ উদীচী গ্রহণ করেছে সহর্ষে। বৌবসন্তি বাংলার লোকজ ক্রীড়া ‘বৌ-চি’র অন্য নাম। বৌ-চি খেলতে খেলতে এই নাটকের আরম্ভ আর খেলতে খেলতেই একসময়ে নেমে আসে যবনিকা – শেষ হয় নাটক – নাট্যামোদীরা ফিরে যান যে যার গণ্ডিবদ্ধ জীবনে – শুধু মনে জড়িয়ে নিয়ে যান এক ধরনের অনুভূতি।বৌবসন্তি নাটকের অবলোকন সুখানুভূতি নিয়ে ফিরে-আসার নিশ্চয়তা দেয়।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.