ব্যক্তিগত স্তরে আবুল হাসনাতের সঙ্গে আমার তেমন পরিচয় ছিল না। তাঁকে জেনেছি তাঁর সম্পাদিত দুটি পত্রিকার মধ্য দিয়ে – কালি ও কলম আর শিল্প ও শিল্পী। কালি ও কলমে লেখার জন্য অনেক আগে একবার ফোন করেছিলেন আমাকে। খুব সম্ভব অরুণ সেনের কাছে আমার কথা শুনেছিলেন। কয়েকটা সংখ্যায় লিখেছিলাম তখন। কালি ও কলম ঢাকা থেকে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পত্রিকা। এর একটি সংস্করণ কলকাতা থেকেও কিছুদিন প্রকাশিত হয়েছিল এবং যথেষ্ট সাড়া জাগিয়েছিল। কলকাতা থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকায় প্রায় নিয়মিতই লিখেছি। তখন যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও সম্পাদক সুশীল সাহা। ঢাকার কালি ও কলম এতই বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজ যে সে-সম্পর্কে আমার কিছু বলা বাহুল্য মাত্র। অনেক যোগ্য মানুষ এই পত্রিকা ও এর সম্পাদক সম্পর্কে আলোচনা করবেন।
আমার বিশেষ আগ্রহের জায়গা ছিল শিল্প ও শিল্পী পত্রিকা। এই পত্রিকাটি সম্পাদনা করে আবুল হাসনাত শিল্পকলার ক্ষেত্রে ও বাংলাভাষায় শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন, তা বিশেষভাবে স্মরণীয়। এপার বাংলা অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে সে-কাজটি আমরা করে উঠতে পারিনি। একটি উদ্যোগ অবশ্য আছে, সে-সম্পর্কে একটু পরে আসছি। এখানে ইংরেজির দিকেই প্রবণতা বেশি। মনে করা হয় – ইংরেজিতে করলে প্রচার ব্যাপক হবে। অর্দ্ধেন্দ্র কুমার গাঙ্গুলি ১৯২০ সালে যে রূপম পত্রিকা করেছিলেন, তা ছিল ইংরেজিতে। পরবর্তীকালে ১৯৬০ সালে দিল্লির ললিতকলা অ্যাকাডেমি থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে ললিতকলা কন্টেম্পোরারি পত্রিকা। অবশ্যই ইংরেজিতে। ভারতের আধুনিক শিল্পকলার ক্ষেত্রে এর অভিঘাত ছিল প্রগাঢ়। বাংলাভাষায় প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-পত্রিকা চারুকলা প্রকাশিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ চারুকলা পর্ষদ থেকে ১৪০৩ বঙ্গাব্দে (১৯৯৬)। যতদিন অশোক ভট্টাচার্য সম্পাদনা করেছেন, খুবই সমৃদ্ধ ছিল এই পত্রিকা। এ পর্যন্ত এর সাতটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এর প্রকাশ বড় অনিয়মিত। এছাড়াও এই বঙ্গে বাংলায় শিল্প পত্রিকা কয়েকটি প্রকাশিত হয়েছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। সেসব প্রয়াসে ঐকান্তিকতা কিছু কম নেই। শিল্পকল্পকথা সেরকমই একটি পত্রিকা।
এ-সমস্ত পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা থেকে প্রকাশিত শিল্প ও শিল্পী পত্রিকা, বাংলাভাষায় শিল্প-আলোচনার ক্ষেত্রে যে নতুন বাতাস এনেছিল, এক কথায় তা ছিল অভূতপূর্ব। এই পত্রিকাটি নিয়ে কিছুটা তন্নিষ্ঠ, যদিও সংক্ষিপ্ত, আলোচনার মধ্য দিয়ে এর সম্পাদকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনই এই লেখার উদ্দেশ্য।
শিল্প ও শিল্পীর প্রথম সংখ্যা বেরিয়েছিল ভাদ্র ১৪১৮, আগস্ট ২০১১-তে। পত্রিকাকে বলা হয়েছে চিত্রকলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক ত্রৈমাসিক। এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সূচিপত্রের ওপরে লেখা ছিল : ‘চিত্রকলা ও সংস্কৃতি আন্দোলনের সাম্প্রতিক প্রবণতা ও কর্মপ্রবাহ সম্পর্কে আলোকপাত’। দৃশ্যকলা ছাড়াও এই পত্রিকায় নিয়মিত আলোচিত হয়েছে নাটক, সংগীত ও চলচ্চিত্র। পত্রিকার লেখকসূচিতে সব সময়ই ছিলেন দুই বাংলার লেখকরা। বাংলাদেশের শিল্পকলার আলোচনায় বেশি গুরুত্ব থাকলেও সমান মাত্রায় আলোচিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও সর্বভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের প্রধান শিল্পীদের কথা। ফলে এই পত্রিকার একটি আন্তর্জাতিক মান তৈরি হয়েছে। এর প্রকাশক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে এরকম : ‘আইস মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে আবুল খায়ের কর্তৃক কুশল সেন্টার, প্লট ২৯, সেক্টর ৩, উত্তরা আ/এ, ঢাকা ১২৩০ থেকে প্রকাশিত।’ প্রথম সংখ্যায় প্রকাশক আবুল খায়ের একেবারে শুরুতে ‘প্রকাশকের পত্র’ শীর্ষকে জানিয়েছিলেন : ‘বাংলাদেশের চিত্রকলা ও সাংস্কৃতিক কর্মপ্রবাহকে আরো গতিশীল করার লক্ষ্যে শিল্প ও শিল্পী নামে চিত্রকলাবিষয়ক একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হলো।’ এর আলোচনার পরিধি যে অন্যান্য বিষয় ও অন্যান্য দেশেও প্রসারিত হবে, সে-কথাও জানানো হয়েছিল উক্ত বক্তব্যে।
কলকাতায় এর আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ঘটেছিল ৪ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে ‘আকার প্রকার গ্যালারি’তে। খুবই বর্ণময় ছিল সেটির প্রকাশ অনুষ্ঠান। সেখানেই পত্রিকাটি প্রথম দেখার সুযোগ হয়েছিল। ১১৬ পৃষ্ঠার ১২ x ১০.৫ ইঞ্চি মাপের পুরো পত্রিকাটি ছিল আর্ট-পেপারে ছাপা। প্রতি পাতায় অত্যন্ত উন্নতমানের ছাপা রঙিন ছবি। দাম ছিল মাত্র একশ টাকা। এরকম সমৃদ্ধ একটি পত্রিকা এত কম দামে কী করে দেওয়া যায় – ভাবলে অবাক হতে হয়। কলকাতায় এ-পত্রিকার খুবই চাহিদা ছিল। কিন্তু সরবরাহ ছিল খুবই কম। সেটা এখানকার অনেক শিল্পানুরাগীকেই হতাশ করেছে।
প্রথম সংখ্যায় বাংলাদেশের যেসব শিল্পীর বিষয়ে সচিত্র আলোচনা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে ছিলেন জয়নুল আবেদিন, আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়া আর ভারতের ছিলেন মকবুল ফিদা হুসেন। এই কজন শিল্পীর ওপর এই পত্রিকা সব সময়ই গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। কেননা প্রথমোক্ত তিন শিল্পী ছিলেন বাংলাদেশে আধুনিকতা বিস্তারের প্রধান পথিকৃৎ। হুসেনেরও গুরুত্ব তাঁর শিল্পের গভীরতা ও আন্তর্জাতিক বিস্তারের জন্য। পশ্চিম বাংলা থেকে লিখেছিলেন যোগেন চৌধুরী ‘শিল্পকলার আধুনিকতা’ বিষয়ে, প্রণবরঞ্জন রায় লিখেছিলেন ‘আহত হৃদয়ের ছবি : সোমনাথ হোর’, সুশোভন অধিকারী – ‘রবীন্দ্রনাথ ও যামিনী রায়’, ইনা পুরী লিখেছিলেন কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী নিয়ে ‘শরৎশেষের উজ্জ্বল বেলা’ শিরোনামে। চার্লস ড’য়লির ওপর আলোচনা করেছিলেন মৌমিতা বসাক। এই লেখাটি দেখে মনে হয়েছিল, যদি পরবর্তী সংখ্যাগুলিতে এরকমভাবে ঊনবিংশ শতকে ইউরোপ থেকে আসা এক-একজন শিল্পী নিয়ে বা সেই সময়ের একটি আঙ্গিক প্রবণতা নিয়ে ক্রমিক আলোচনা হয়, যেমন কোম্পানি স্কুল, প্রত্নবঙ্গীয় ঘরানা, কালীঘাটের পট ইত্যাদি – তাহলে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে এই পত্রিকা। কিন্তু সেরকম কোনো প্রবণতা দেখা যায়নি। নাটক, ফিল্ম ও সংগীত নিয়েও আলোচনা ছিল এই সংখ্যায়।
দ্বিতীয় সংখ্যা বেরিয়েছিল নভেম্বর ২০১১-তে। প্রথম সংখ্যায় ছিল প্রকাশকের কথা, সম্পাদকীয় কিছু ছিল না। দ্বিতীয় সংখ্যায় সম্পাদকের কলম থেকে পাওয়া গিয়েছিল সম্পাদকীয়। এরপর থেকে প্রতিটি সংখ্যাতেই তাই। সম্পাদকীয়তে লেখা হতো, ওই সংখ্যায় কী কী বিষয়ে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সে-সম্পর্কে। শিল্পকলার তত্ত্বগত দিক নিয়ে বিশেষ আলোচনা করতেন না সম্পাদক। তিনি অবশ্য একথা জানাতেন, শিল্পকলা বিষয়ে ভালো লেখা সংগ্রহ করা খুবই দুরূহ। তবু প্রতিটি সংখ্যাই নানা বিষয়ের লেখায় সমৃদ্ধ থাকত। প্রতিষ্ঠিত লেখকের পাশাপাশি এই পত্রিকা অনেক নতুন লেখকও তৈরি করেছে। সফিউদ্দীন আহমেদকে নিয়ে আলোচনা ছিল এই সংখ্যার প্রথম রচনা। লিখেছেন আবুল মনসুর। বাংলাদেশের পঞ্চাশের দশকের শিল্পীদের নিয়ে লিখেছেন নজরুল ইসলাম। ফ্রিদা কাহলোর ছবি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন মঈনুস সুলতান। ফ্রিদাকে নিয়ে আরো আলোচনা হয়েছে এই পত্রিকায়। ‘পশ্চিম বাংলার সমকালীন ভাস্কর্যের রূপরেখা’ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা ছিল এ-সংখ্যায়। সুশোভন অধিকারী লিখেছিলেন চিত্তপ্রসাদের ছবি নিয়ে। শঙ্করলাল ভট্টাচার্য লিখেছিলেন দেবব্রত বিশ্বাসের গান নিয়ে।
প্রথম বর্ষের তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ফেব্রুয়ারি ২০১২-তে। এতে বাংলাদেশের সমকালীন ভাস্কর্যের ওপর বিস্তৃত আলোচনা যেমন ছিল নাসিমূল খবিরের লেখা, তেমনই বাংলাদেশের ষাটের দশকের শিল্পীদের নিয়ে আলোচনা করেছিলেন নজরুল ইসলাম। অমৃতা শেরগিলের ওপর আলোচনা ছিল। ছিল পাশ্চাত্যের ভাস্কর লুইস বুর্জোয়া সম্পর্কে আলোচনা। ‘আলোকচিত্র ও চিত্রকলা : অন্তর্গত সম্পর্ক’ বিষয়ে একটি ভিন্ন ধারার প্রবন্ধও ছিল এই সংখ্যায়। তপন ভট্টাচার্য লিখেছিলেন নন্দলাল বসুর ড্রয়িং নিয়ে। সম্পাদকীয়তে ‘চট্টগ্রাম ধারা’ নামে স্বাধীনতা পরবর্তী একটি শিল্প-আন্দোলন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করেছেন সম্পাদক, যা তাঁর শিল্পপ্রজ্ঞার ইঙ্গিত বহন করে।
দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যা বেরিয়েছিল সেপ্টেম্বর ২০১২-তে। এই সংখ্যা থেকে পত্রিকার দাম হল দুশো টাকা। বাংলাদেশের লোকশিল্প নিয়ে এই সংখ্যায় আলোচনা করেছেন দুজন। নভেরা আহমেদ বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ভাস্কর। তাঁর শৈশব কেটেছিল কলকাতায়। ভাস্কর্য শিখেছেন বিদেশে। তারপর সারা জীবন বিদেশেই কাটিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে অপরিসীম সম্মান করে থাকেন। তাঁকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে এই সংখ্যায়। পরবর্তী দুএকটি সংখ্যাতেও আবার হয়েছে। তপন ভট্টাচার্য লিখেছেন বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে। বব ডিলানকে নিয়ে লিখেছেন শঙ্করলাল ভট্টাচার্য। ইউরোপের সিম্বলিস্ট নিসর্গচিত্র নিয়ে লিখেছেন রাজীব ভৌমিক। এই কয়েকটি সংখ্যার আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা এই পত্রিকাটির বিষয়বৈচিত্র্য বোঝানোর চেষ্টা করলাম।
এরকম একটি পত্রিকা এত সমৃদ্ধ মানে ত্রৈমাসিক হিসেবে চালানো যে কঠিন, বোঝা গেল চতুর্থ বর্ষ থেকে পত্রিকার প্রকাশ যখন ষান্মাসিক হয়ে গেল। এই সংক্যা প্রকাশিত হল ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে। এই সংখ্যায় একটি মূল্যবান লেখা ছিল ‘গুরুসদয় দত্তের বাংলার লোকশিল্প ভাবনা’ প্রসঙ্গে। লিখেছেন শামসুজ্জামান খান। কার্টুনশিল্পী আর কে লক্ষ্মণকে নিয়ে লিখেছিলেন আন্দালিব রাশদী। সোমনাথ হোরের একটি বিস্তৃত সাক্ষাৎকারও বেরিয়েছিল এই সংখ্যায়। সপ্তম বর্ষ থেকে পত্রিকার আকার একটু ছোট হয়ে গেল। দৈর্ঘে পৌণে-বারো ও সাড়ে-আট ইঞ্চি। বিষয়বৈচিত্র্য ও প্রকাশনার মানের কোনো পরিবর্তন হলো না। সপ্তম বর্ষের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ডিসেম্বর ২০১৭ সালে। এর পরে আর কোনো সংখ্যা বেরিয়েছিল কিনা খবর পাইনি। আমার একটি লেখাও দেওয়া ছিল পরবর্তী সংখ্যার জন্য। বেরোলে হয়তো খবর পেতাম। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দুঃখজনক। এ থেকে বোঝা যায় বাংলা-ভাষায় শিল্পকলা বিষয়ক একটি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করা কত কঠিন। কিন্তু যে ছয় বছর ধরে পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে, তা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে আবুল হাসনাত ছিলেন অত্যন্ত বড় মাপের একজন সম্পাদক। শুধু সাহিত্য নয়, শিল্পকলাতেও তাঁর আগ্রহ ও প্রজ্ঞা ছিল উজ্জ্বল। এই পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ তাঁর একটি স্মরণীয় কাজ।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.