মৃত্যুশয্যায় লেখা মাহমুদ দারবিশের একটি চিঠি

প্যালেস্টাইনের কিংবদন্তি কবি মাহমুদ দারবিশ মারা গেছেন ১৭ বছর হলো। তিনি তাঁর মৃত্যুর মাত্র তিন মাস আগে এ-চিঠি লিখেছিলেন ‘প্যালেস্টাইন সাহিত্য সম্মেলন’-এর আয়োজকদের উদ্দেশে – যখন তাঁরা তাঁকে দাওয়াত করেছিলেন সম্মেলনের পৃষ্ঠপোষক হওয়ার জন্য। কিন্তু স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে সম্মেলনে উপস্থিত হতে না পেরে তিনি এ-চিঠিতে দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু আশাবাদ ব্যক্ত করেন সাহিত্য ও রাজনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। বহুবিধ সাহিত্যগুণসম্পন্ন হওয়ায় চিঠিটি এখানে যুক্ত করা হলো।

চিঠি

প্রিয় বন্ধুরা আমার,

আমি দুঃখিত যে, আপনাদের সকলকে দেখার জন্য আজ ব্যক্তিগতভাবে আমি এখানে উপিস্থত থাকতে পারছি না। এই শোকাহত ভূমিতে আপনাদের স্বাগতম, সাহিত্য সম্পর্কে যে-দেশটির উপলব্ধি এর বাস্তবতার চেয়ে অনেক সুন্দর। আপনাদের সাহসী সংহতি প্রদর্শন স্বায়ত্তশাসন ও জীবন যাপনের অধিকারবঞ্চিত মানুষদের শুভেচ্ছা জানানোর চেয়ে বেশি কিছু। এটি মানুষের কাছে জানান দেবে যে, প্যালেস্টাইন এখন কী এবং এর দ্বারা কী বোঝায়?

এই সাহিত্য উৎসবের প্রতিপাদ্য হলো – বিচার, সত্য ও স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর সঙ্গে লেখকদের সরাসরি সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরা।

লেখকগণ অবশ্যই সত্য অনুসন্ধান করবেন এবং অবশ্যই তুলে ধরবেন প্যালেস্টাইনে বাস্তবিকই কী ঘটছে।

আমরা এখন ‘নাকবা’র ষাট বছরে আছি। যারা এখনো আমাদের কবরগুলোর ওপর নৃত্য করছে, তারা এখনো আমাদের তাদের ভোগ্যবস্তুই মনে করছে। কিন্তু ‘নাকবা’ কোনো স্মৃতি নয়; এটা ক্রমাগত জন্মভূমির ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে – প্যালেস্টাইনিদের তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সতর্ক করে তোলে। ‘নাকবা’ চালু আছে, কারণ দখলদারিত্ব অব্যাহত আছে। অব্যাহত দখলদারিত্বের মানে হলো – যুদ্ধও অব্যাহত থাকা।

আমাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের এই স্থায়ী যুদ্ধ এর অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ নয়। এটা আমাদের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। সুতরাং, ইসরায়েল যেমন প্রচার করছে যে, এ-যুদ্ধ দুটি অস্তিত্বের মধ্যকার যুদ্ধ, আসলে এটি সত্য নয়।

আরবরা সম্মিলিতভাবে ইসরায়েলের কাছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে প্যালেস্টাইনিদের উপস্থিতির স্বীকৃতির বিনিময়ে একটি সম্মিলিত সামষ্টিক শান্তি প্রকল্প উপস্থাপন করেছে। কিন্তু সে (ইসরায়েল/ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু) তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তার যুক্তি হলো : যা আমার হওয়ার হয়েছে এবং যা অবশিষ্ট আছে সেসব তোমাদের এবং আমারও।

প্রিয় বন্ধুরা, আপনারা জড়ো হয়েছেন, এই বাস্তবতা দেখার জন্য যে, প্যালেস্টাইনিরা কেমন আছে? গতকাল আমরা একসঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতিবিদ্বেষের অবসান উদযাপন করেছি। কিন্তু প্যালেস্টাইনে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, জাতিবিদ্বেষ এখানে এর সকল শক্তিতে সমৃদ্ধিশালী হচ্ছে।

গতকাল আমরা একসঙ্গে বার্লিন প্রাচীরের পতন উৎসব উদযাপন করেছি এবং এখানে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, সেরকমই দেয়ালের উত্থান ঘটছে। তারা আমাদের ঘাড়ে বিশাল সাপের মতো বিষ নিশ্বাস ছাড়ছে, প্যালেস্টাইনিদের

ইসরায়েলিদের থেকে আলাদা করার জন্য নয়, বরং

প্যালেস্টাইনিদের নিজেদের থেকে আলাদা করার জন্য এবং দিগন্তটি অধিকারে নেওয়ার জন্য। এটা ইতিহাসকে মিথ্যা থেকে আলাদা করা জন্য নয়, বরং ইতিহাসকে বর্ণবাদী অবিচারের সঙ্গে মিলমিশ করানোর জন্য।

দেখুন, এখানে জীবনকে হালকাভাবে নেওয়ার কিছু নেই, এটি একটি নিত্যদিনের অলৌকিকতা। সামরিক প্রতিবন্ধকতা সবকিছুকে অন্য সবকিছু থেকে আলাদা করছে।

সকল কিছু, এমনকি ভূমিরূপও ক্ষণস্থায়ী এবং প্রভাবাধীন, কারণ বুলডোজার প্রতিদিন এটিকে বদলে দিচ্ছে। জীবন এখানে জীবনের চেয়ে কম, ধীর মৃত্যুর মতো। হাস্যকরভাবে, দমন-পীড়ন, অবরোধ, নিত্যনৈমিত্তিক হত্যাকাণ্ড এবং বসতির সম্প্রসারণ, তথাকথিত শান্তি প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে একটি দুষ্টচক্রে আবর্তিত হচ্ছে, যা যন্ত্রণাকাতর আত্মার শান্তির ধারণাকে কতল করার হুমকি দেয়। শান্তি ও ধর্ম বৈধতা দেয় স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারকে। কিন্তু এখানে দখলদারিত্ব সহিংসতার বৈধ পিতা হিসেবে গণ্য।

শান্তির দুটি অনুষঙ্গ : স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার। আর দখলদারিত্ব স্বাভাবিকভাবেই সহিংসতাকে উস্কে দেয়। এখানে ঐতিহাসিক প্যালেস্টাইন অংশে দখলদারিত্বের অধীনে দুটি প্রজন্মের প্যালেস্টাইনিরা জন্মগ্রহণ করেছে এবং বেড়ে উঠেছে। তারা কোনো স্বাভাবিকতা জানে না। তাদের স্মৃতি নরকের বিষাক্ততায় ভরা। তারা দেখতে পায়, তাদের আগামীকাল তাদের আঙুলে শুয়ে ঘুমোয়। যদিও তাদের অধিকাংশই এখনো মনে করে যে, এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার (ইসরায়েলের তাণ্ডব) বাইরের সবকিছুই স্বর্গ। তারা স্বর্গে যেতে চায় না। তারা তাদের জন্মভূমিতে থাকতে চায়। কারণ তারা আশাবাদে জর্জরিত।

ইতিহাসের এমন কঠিন সময়েও প্যালেস্টাইনি কবি লেখকগণ বেঁচে আছেন। তাদের দেশের মানুষদের থেকে তাদের আলাদা করার কিছু নেই – কেবল একটি জিনিস ছাড়া, তারা এই জীবনের এবং স্থানের টুকরোগুলো শব্দের গাঁথুনিতে জড়ো করার চেষ্টা করেন। তারা অপূর্ণ শব্দগুলোর পূর্ণতা দেন।

আমি আগেও বলেছি, একজন লোকের পক্ষে প্যালেস্টাইনি হওয়া কঠিন এবং একজন প্যালেস্টাইনির পক্ষে কবি বা লেখক হওয়া আরো কঠিন ও কষ্টের। একদিকে যেমন একজন লেখককে বাস্তবতার প্রতি সত্যনিষ্ঠ হতে হয়, অপরদিকে তাঁকে সাহিত্যপেশার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে হয়।

তারা প্রত্যেকে প্যালেস্টাইনে জন্মগ্রহণ করেন এবং বেড়ে ওঠেন দখলদারিত্বের অধীনে। তারা কখনো স্বাভাবিকতা অনুভব করেন না। তাদের স্মৃতি নরকের ভয়াবহতায় ভরা। [Palestinians have been born and raised under occupation. They have never known normality. Their memories are filled with visons of hell.]

দীর্ঘস্থায়ী ‘জরুরি অবস্থা’ এবং লেখকের কল্পনার মধ্যবর্তী এই উত্তেজনার ক্ষেত্রটিতে, কবির ভাষা চলমান থাকে। কবিকে সামরিক দখলদারিত্ব প্রতিহত করার জন্য শব্দ ব্যবহার করতে হয়। এবং শব্দ দিয়েই সাধারণ, গতানুগতিক ও পুনরাবৃত্তিমূলক বিপদের মোকাবিলা করতে হয়। এরকম মনবিরাগী পরিস্থিতিতে কবি কীভাবে তাঁর সাহিত্যিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেন? এবং এরকম নির্মম সময়ে কবি কীভাবে তাঁর সাহিত্যে সাহিত্যিকতা রক্ষা করতে পারেন।

প্রশ্নগুলো কঠিন। কিন্তু প্রত্যেক কবি কিংবা লেখকের নিজের এবং তাঁর বাস্তবতা প্রকাশ করার নিজস্ব উপায় থাকে। একটি ঐতিহাসিক অবস্থা বহু লেখকের হাত দিয়ে একরকম লেখা তৈরি করে না। এমনকি এমন লেখাও তৈরি করে না যা একইরকম শোনায়, কারণ লেখকদের সংখ্যা যত বেশি হয় তাঁদের বৈচিত্র্যের অনুসন্ধানও তত বেশি হয়। এজন্য

প্যালেস্টাইনি সাহিত্য ইতোমধ্যে তৈরিকৃত (প্রচলিত) ছাঁচে খাপ খায় না।

প্যালেস্টাইনি হওয়া কোনো নীতিবাক্য নয়, এটি কোনো পেশাও নয়। প্যালেস্টাইনিও একজন মানুষ, প্রতিদিনের প্রশ্নের মুখোমুখি এক একটি নির্যাতিত আত্মা; জাতিগত এবং অস্তিত্বগত উভয় ভাবেই। প্যালেস্টাইনিদের রয়েছে একটি ভালোবাসার গল্প, যারা একটি ফুল আর অজ্ঞেয় কিছুর জন্য জানালা খুলে ভাবতে বসে। প্যালেস্টাইনিদের রয়েছে ধর্মতাত্ত্বিক ভয় এবং একটি অভ্যন্তরীণ জগৎ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে, যা তাদের আজীবন ঘোষিত সংগ্রামী করে রেখেছে।

একটি সংজ্ঞায়িত বাস্তবতা থেকে জন্ম নেওয়া সাহিত্য এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করতে সক্ষম যা বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে যায়। প্যালেস্টাইনিদের সাহিত্য করার উদ্দেশ্য – নৃশংসতার ইতিহাস থেকে পালানোর জন্য সুখের মিথের সন্ধান করা নয়, বরং ইতহাসকে কম মিথে পরিণত করার জন্য, মিথকে তার সঠিক, রূপক স্থানে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং ইতিহাসের শিকার থেকে তাদের মানবিক ইতিহাসের অংশীদারে রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টা।

আমার প্রিয় বন্ধু ও সহকর্মীরা,

আপনাদের সম্মানজনক সংহতির জন্য ধন্যবাদ। আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আবেগিক অবরোধ প্রতিহত করার জন্য আপনাদের সাহসী উদ্যোগের জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আমাদের কবরের ওপর নাচের আমন্ত্রণ প্রতিরোধ করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। জেনে রাখুন যে, আমরা এখনো এখানে আছি এবং আমরা এখনো বেঁচে আছি।

ইতি

আপনাদের, মাহমুদ