শামীম আখতারের চলচ্চিত্র স্মৃতি-বিস্মৃতির পুনর্র্নিমাণ

শামীম আখতার (৩ নভেম্বর ১৯৫৪) এ যাবৎ যে তিনটি চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন- সে, ইতিহাসকন্যা এবং শিলালিপি – স্মৃতি ধরে রাখে এমন সব উপাদানই প্রত্যেকটি চলচ্চিত্রের অধিকাংশ জায়গা জুড়ে বিরাজ করে। এইসব উপাদানের মধ্যে আত্ম-জৈবনিক উপাদান আছে; আছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রগত অভিজ্ঞতার বয়ান; আছে স্মৃতিকথা যা এসেছে সাক্ষাৎকারের ছলে; আছে লালচে হয়ে যাওয়া পুরনো ফটোগ্রাফ; আছে বিভিন্ন স্মৃতি-জাগানিয়া মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনাকর্ম; আছে পুরনো পোস্টার, পুরনো পত্রিকা, পুরনো গান, খোদাই করা কথামালা, পুরনো স্লোগান, ৮ মি. মি.-এ তোলা জগন্নাথ হলের গণকবরের দৃশ্য, বিগ্রহ; আছে চলচ্চিত্রের ভাষায় যাকে বলে ফ্ল্যাশব্যাক তা-ও। সবকিছুর ঐকত্রিক অবস্থানে স্মৃতি-বিস্মৃতিকেই শামীম আখতার পুনর্র্নিমাণ করেন তাঁর চলচ্চিত্র-সৃষ্টিতে ।

যে-কোনো স্রষ্টার সৃষ্টিতে তাঁর যাপিত জীবনের নানাদিক উঠে আসে। শামীম আখতারের সৃষ্টিও তার ব্যতিক্রম নয়। নিজ জীবন, নিজ দেশের রাজনৈতিক ঘটনাবলি, নিজ সমাজ-সংসারে নারীর অবস্থা ও অবস্থান, নিজের ভাবনা – সবকিছুর জারিত রস সিঞ্চিত হয়েছে প্রতিটি চলচ্চিত্রে। তাঁর তিনটি চলচ্চিত্রের বিষয় ও নির্মাণশৈলী বিশ্লেষণ করলে এ আকাঙ্ক্ষিত সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় বৈকি।

সে্লসেশ্ ১৯৯১-তে নির্মিত হয়। শামীম আখতার ও তারেক মাসুদ মিলে যৌথভাবে এটি নির্মাণ করেন। এর গল্প, সংলাপ ও চিত্রনাট্য শামীম আখতারের। ১০ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটি ১৯৯৩-তে প্রথম প্রদর্শিত হয় জর্মন কালচারাল ইনস্টিটিউটে। এটিই ছিল ্লসেশ্-র প্রিমিয়ার শো। শামীম ও তারেক আমার এত কাছের মানুষ যে, এঁদের যে-কোনো কাজের খবর আমার কাছে পৌঁছতে সময় লাগে না। এঁরাও আমাকে ডাকে – ওঁদের ডাকে সাড়া দিতেই ঐ প্রিমিয়ার শোতে হাজির হই। খুশী কবীর, আরমা দত্ত, পারভীন আহমেদ, মুহম্মদ জাহাঙ্গীর, তারেক বুলবুল, মাসুদ বিবাগী ও আরো অনেক চলচ্চিত্র-কর্মী ও সাংবাদিক উপস্থিত। সারা হোসেনও ছিলেন। একসময়ে তারেক মাসুদ আমাকে কিছু বলার জন্যে ডাকে। যাই, একপাশে তারেক অন্যপাশে শামীম। বললাম : এ যাবৎ দেখা স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের মধ্যে এটি আমার কাছে শ্রেষ্ঠ মনে হয়। কারণ এতে চলচ্চিত্রের যে মূল ক্ষমতা, ঘটনাকে সংকুচিত করে দেখানো, তার চেষ্টা আছে। কম কথা ব্যবহার করে শুধু দৃশ্যের সংস্থাপনের মাধ্যমে এই সংকোচনের কাজটি করতে হয়।

অনেক পরে মাসুদ বিবাগী আমাকে পেয়ে জানতে চাইলেন: আমার কাজটি দেখেছেন? কোনটি জানতে চাইলে বললেন: ্লছোবলশ্। বললাম : দেখিনি। বুঝতে পারলাম, ঐদিন ্লসেশ্-কে শ্রেষ্ঠ বলাতে উনি এ প্রসঙ্গ তুলেছেন। বিনীতভাবে বললাম: ভাই, আপনার কাজটি তো দেখিনি -তাছাড়া যে-কটা দেখেছি তার মধ্যে ্লসেশ্-কে শ্রেষ্ঠ বলেছি। কথা আর বাড়েনি। আজ মনে হয় সম্ভবত কম কথা ছিল বলেই হয়তো ্লসেশ্ আমাকে প্রথমত টেনেছিল। শামীম নিজেও কম কথা বলে। আজ ভাবি: যে-গল্পটা এতে পাই এটা কি ওঁর নিজের যাপিত জীবনের? নাকি এমনটা ঘটতে সে দেখেছে? নাকি নিজে থেকে ভেবে নিয়েছে? এই লেখা দাঁড় করানোর জন্যে ্লসেশ্ আবার তাঁর ঘরে বসে দেখেছি। শুধু ্লসেশ্ নয়, ্লইতিহাসকন্যাশ্ ও ্লশিলালিপিশ্-ও দেখেছি। দুদিন দেখেছি, প্রতিদিনই দেখার পর একসঙ্গে বসে চা খেয়েছি। কিন্ত্ত একবারও তাঁর ব্যক্তিজীবন ও তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে সরাসরি কোনো প্রশ্ন করিনি। নিজের বিদ্যা জাহির করব বলে এমনটা করিনি। আসলে তাঁর তিনটি কাজই নিজেই নিজের ব্যাখ্যাতা। ঘটনা নিজেই যখন ঘটনার ব্যাখ্যাতা হয় তখন প্রশ্ন করে নয়, কী কী প্রশ্ন নির্মাতা তাঁর কাজের ভেতর দিয়ে দর্শকদের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দিয়েছেন, তার সন্ধান করাই চলচ্চিত্র-সমালোচকের প্রধান কাজ বলে আমার ধারণা। তাই দ্বিতীয়বার ্লমাটির ময়নাশ্ তারেক মাসুদের সঙ্গে মধুমিতায় দেখলেও তাঁকে চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে কোনো প্রশ্নই করিনি। বরং গরম কফি নিয়ে আমার কাছে এলে ওঁকে বলেছি: যতটুকু বুঝবো, ততটুকুই লেখার চেষ্টা করবো, ভুল বুঝলে তা-ই সই। তারেক বলল: না, না – আমি বসবো না, কফিটা দিতেই এসেছি।

শামীমকেও কিছুই জিজ্ঞাসা করা হয়নি। ওঁর কাজই ওঁর হয়ে কথা বলেছে আমার সঙ্গে। শামীম তাঁর প্রথম কাজেই চলচ্চিত্র-ভাষার প্রতি তাঁর দখল প্রমাণ করেছে। সংলাপ কম রেখে দৃশ্যের গতিপ্রবাহ দিয়ে ্লসেশ্-এর গল্পটা বলেছে শামীম ও তারেক। বস্তুত দুজনেরই চলচ্চিত্র-ভাষার প্রতি দখল তৈরি হয়েছে তাঁদের দীর্ঘকালীন চলচ্চিত্র সংসদকর্মী হিসেবে কাজ করা, চলচ্চিত্রবিষয়ক অধ্যয়ন, লেখা ও চলচ্চিত্র-দর্শনের মাধ্যমে। শামীম ১৯৭৭ সাল থেকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ-এর কর্মী হিসেবে অনেক ফিল্ম দেখেছে, বই পড়েছে, কিছু রচনাও লিখেছে। ১৯৮০-৮১-তে আমরা দুজনই পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের বাগা অধ্যাপক সতীশ বাহাদুর ও অধ্যাপক সৌরেন্দ্র চৌধুরী পরিচালিত ্লফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সশ্-এ অংশগ্রহণ করি। সব মিলে শামীমের মধ্যকার চলচ্চিত্রনির্মাতার জাগরণ।

শামীম শুধু সেলসেশ্-তে নয়, এর পরবর্তী দুটো কাজেও দৃশ্যের গতিপ্রবাহকে গুরুত্ব সহকারে ব্যবহার করেছে, প্রয়োজন ছাড়া কথা ব্যবহার করেনি। তাঁর এই গুণটি লক্ষ করে তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই চিঠিটি পড়েছে কি-না, যেখানে তিনি চলচ্চিত্র সম্পর্কে তাঁর ভাবনা লিপিবদ্ধ করেছেন। শামীম বলে, না, সে পড়েনি। বলি: ১৯২৯ সালে মুরারি ভাদুড়ীকে লিখিত একটি পত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: ছায়াচিত্রের প্রধান জিনিসটা হচ্ছে দৃশ্যের গতিপ্রবাহ। এই চলমান রূপের সৌন্দর্য বা মহিমা এমন করে পরিস্ফুট করা উচিত যা কোনো বাক্যের সাহায্য ব্যতীত আপনাকে সম্পূর্ণ সার্থক করতে পারে। আমার মতে, রবীন্দ্রনাথই এই অঞ্চলের প্রথম চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক। যাই হোক, রবীন্দ্রনাথের কথা আজো প্রাসঙ্গিক। শামীমের তিনটি চলচ্চিত্র দেখার পর এটিই বলা সংগত হবে যে, শামীম ্লছায়াচিত্রের প্রধান জিনিসটা, নিজের দীর্ঘকালের চলচ্চিত্র-অনুশীলন ও নিজস্ব চলচ্চিত্রবোধের মাধ্যমে আত্মস্থ করেছে।

্লসেশ্-এর শরীরে চলচ্চিত্র-ভাষার নিপুণ প্রয়োগ লক্ষণীয়। এর মধ্যকার বক্তব্যকে উপস্থাপনার ধরনে ছোট গল্পের একটা পরিচ্ছাপ বিদ্যমান : অলস বিড়ালের মতন ঘুমিয়ে থাকা দুপুর, শুধু কল চাপার শব্দ। এই শব্দের মধ্যে ডিজলভ্ করে দৃশ্যের প্রবাহ শুরু। আমরা দেখতে পাই পুরুষ চরিত্রটি এগিয়ে আসছে পুরনো ঢাকার একটা গলি দিয়ে। তারপর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে। উঠার সময় তার ছেলের সঙ্গে ক্রস হয়, কেউ কাউকে চিনতে পারে না। উপরে উঠে পুরুষটি বেল টিপে, একটি নারী বের হয়, বলে: এসো। ভেতরে এসো। সময়ের ক্ষেপণ, নারী অদূরে বসা মামাকে শুধু ডাকে: মামা…। মামা উঠে চলে যায়। পুরুষটি কাঁধ থেকে ব্যাগ পাশে রাখে, তারপর বসে। নারীটি দাঁড়ানো। পুরুষ: এ বাড়ি কবে থেকে? মেয়েটি সময় নিয়ে বলে: প্রায় সাত বছর। মামি মারা গেলেন…তারপর থেকেই – তা, কী মনে করে হঠাৎ! পুরুষটি জানায়, দুদিন আগে সে বাইরে থেকে এসেছে, নারীটির চাচার কাছ থেকে ঠিকানা পেয়েছে, তার কাছেই নিজের ছেলে হওয়ার খবর পেয়েছে। এরপর ছোট ছোট বাক্যবিনিময়, চা খাওয়া, কলের শব্দ। জানতে পারে ছেলের নাম অনন্ত রাখা হয়েছে। ছেলেকে ডাকতে বলে। ডাকা হয় না। কিছু খেলনা বের করে পুরুষটি। চাচার কাছে ছেলের হার্টের সমস্যার কথা শুনেছিল, তাই চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা দিতে চায়। নারীটি নেয় না। পুরুষটি: আামি তাহলে উঠি। নারী: যাবে। পুরুষটি দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। নারীটি দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। একটু পর অনন্ত এসে মাকে প্রশ্ন করে: লোকটা কে মা? মা: কেউ না বাবা। গল্পটা এই পর্যন্তই।

কথা কম, গতি শ্লথ, ডিটেলসের ব্যবহার লক্ষণীয়। চলচ্চিত্র যে শুধু দৃশ্যের সমাহার নয়, শব্দের যোজনাও, তা সংলাপের পরিমিত ব্যবহার, কল চাপার শব্দ, কাপ-পিরিচের টুং-টাং ইত্যাদির মাধ্যমে শামীম প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শ্লথ গতি দুপুরের আবহের সঙ্গে মানিয়ে গেছে। লক্ষণীয় যে শুধু ছোট ছেলেটি ছাড়া আর কারো কোনো নাম নেই। কেউ কাউকে নাম ধরে ডাকেও না। শামীমের মনোজগতকে উন্মোচন করে এই নামহীনতার বিষয়টি। তাঁর ভুবনে নাম অপ্রাসঙ্গিক। কেন? তবে কি ্লসেশ্-এর নারীর দুঃখের সাথে শামীমের কোনোদিন কোনো সখ্য গড়ে উঠেছিল? পুরুষ কি তাঁর কাছে কেবলই ্লকেউ নাশ্? গল্পের পুরুষ তার স্ত্রীকে ফেলে রেখে দেশ ছেড়েছে, ছেড়ে-যাওয়া পুরুষ গল্পে তাই নীরবে আসে, নীরবে যায়। নারীটির কাছে দূরের কেউ হয়েই থাকে। সন্তানের প্রশ্নের উত্তরেও তাই বলে: কেউ না বাবা।

মনে পড়ে প্রিমিয়ার শো-র পর মুক্ত আলোচনার সময় মুহম্মদ জাহাঙ্গীর প্রশ্ন রাখেন এই বলে যে, এইটুকুন বাচ্চার কাছে মা মিথ্যে বলল কেন? উত্তরে সারা হোসেন বলেছিলেন: যেখানে সম্পর্কটাই নেই, সেখানে সত্য আর মিথ্যা দিয়ে কী হবে? এই বিতর্কের সূত্র ধরেই বলেছিলাম: এ-চলচ্চিত্র বুঝতে নারীবাদী হওয়ার দরকার নেই। একে বুঝতে হবে এর স্টোরিস্পেসের মধ্যে যে-প্রশ্ন বা যে-অনুধাবন শামীম উত্থাপন করেছে, তার নিরিখেই। ্লকেউ নাশ্ এই ছোট্ট বাক্যটি উচ্চারণ করে শামীম আমাদের বিরাট একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। ্লকেউশ্ তাহলে হয় কে? একজন ্লকেউশ্ হয়ে আবার ্লকেউ নাশ্ হয় কখন? কি কি কারণে? নারী-পুরুষের সম্পর্কের ধরনটি নির্মিত হয় কোন কোন মৌল উপাদান দ্বারা? টিকে থাকে কিসের ভিত্তিতে? ইত্যাকার যাবতীয় প্রশ্ন হানা দেয় দর্শকের চেতনায়। আর এখানেই শামীম কাহিনীকার হিসেবে স্টোরিস্পেসে একটা অবস্থান নিয়ে নেন। নারীটি, শামীম নিজে যে-চরিত্রে অভিনয় করেছে, সে ্লকেউ নাশ্ উচ্চারণ করে এবং দশ মিনিটের মধ্যে বেশিরভাগ সময়ই নীরব থেকে আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্কের ধরনের প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত ধারণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।

এই প্রতিবাদ মূর্ত হয় নীরবতায়, সরবতায় নয়। তবে কি নারীর প্রতিবাদ নীরবতাতেই ফুটে উঠে বেশি? হয়তো তাই, আর তাই হয়তো নারীটির বেদনা আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়, আমাদের মুখ নত করে দেয়, আমাদের ভাবায়। তবে কি শামীম পুরুষ-বিদ্বেষী? না তা-ও নয়। তাঁর কথা: আমি নারীর কল্যাণ চাই, ক্ষমতায়ন চাই, অধিকার চাই – এ কথা সত্য, কিন্ত্ত তাই বলে ভাববেন না যে আমি পুরুষ-বিদ্বেষী (ভোরের কাগজ: ৩১ মে, ২০০০)।

শামীমের বড় গুণ, তাঁর প্রথম কাজ স্লোগানধর্মী হয়ে যায়নি। শিল্পিতভাবে নিজের বলবার বিষয়টি উপস্থাপিত। হ্যাঁ, এই উপস্থাপনায় পুরুষ-চরিত্র নিষ্প্রভ-নিষ্ক্রীয়, কিন্ত্ত নারী-চরিত্রটি তা নয়। সে প্রো-অ্যাকটিভ। শুধু ্লসেশ্-এর পুুরুষ-চরিত্রটি নয়, পরবর্তী দুটো কাজেও পুরুষ-চরিত্রগুলো স্টোরিস্পেসে তেমনভাবে প্রাধান্য পায় না। এই প্রাধান্য না দেওয়াও শামীমের এক নীরব প্রতিবাদ। ্লইতিহাসকন্যাশ্-র আলোচনায় আমরা তার প্রমাণ পাবো।

ইতিহাস কন্যা বিটা ফর্মেটে তৈরি। ১২৫ মিনিটের এই পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রটি ১৯৯৯ সালে নির্মিত ও ২০০০ সালে প্রদর্শিত হয়। মনে পড়ে ৩১ জানুয়ারি, ২০০০ সালে এর উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনটি দর্শকে ভরে গিয়েছিল। দ্বিতীয়বার ্লইতিহাসকন্যাশ্ দেখার জন্য যাই সাভারে, গণবিশ্ববিদ্যালয়ে। তখনকার ভিসি প্রফেসর আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর উৎসাহে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনে সর্বতোভাবে সাহায্য করেন আমার ও শামীম আখতারের বন্ধু খন্দকার সাখাওয়াত আলী। সাখাওয়াত ভাই বললেন: ্লযাবেন না-কি?শ্ রাজি হয়ে যাই। তারেক মাসুদের ওখান থেকে ভিডিও প্রজেক্টর নিয়ে শামীম আখতারসহ আমরা পৌঁছে যাই সাভারে। প্রদর্শনীর পর আলোচনা করেন শ্রদ্ধেয় সরদার ফজলুল করিম। ইতিহাস ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে দীর্ঘ এক ভাষণ দেন তিনি। বলেন: নতুন প্রজন্মকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, এই ইতিহাস-নির্মাণে নারীর ভূমিকা কীরূপ ছিল ইত্যাদি সম্পর্কে জানাতে হবে।শ্ শামীম ঠিক কাজটিই করেছে বলে শামীমের কাজের প্রশংসা করেন সরদার স্যার। বলেন: ভবিষ্যতের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে হলে অতীতকে আমাদের জানতেই হবে।শ্ এই প্রসঙ্গে নিজের সংগ্রামী জীবনের অতীতের স্মৃতিও তুলে ধরেন উপস্থিত তরুণ প্রজন্মের কাছে।

শামীম আখতার অতীতকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজন থেকেই ্লইতিহাসকন্যাশ্ নির্মাণ করেছেন। অতীত বলতে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। শামীমের উৎসাহ এই মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবস্থা ও অবস্থান বিচার। শামীমের বিবেচনা: মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসে যোদ্ধার শৌর্য-বীর্য-সাফল্যই চিত্রায়িত হয় কেবল! নারীর অনুপস্থিতি সেক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রকট। মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ ও ভূমিকাকে শনাক্ত করতে চাইলে ইতিহাসের ভিন্ন পাঠ অনিবার্য। নারীবাদী চৈতন্যে ইতিহাসের পাঠ-প্রচেষ্টায় বানানো হয়েছে মৃত্তিকা প্রডাকশনসের ্লইতিহাসকন্যাশ্।… মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসচর্চার বাইরে এর কাহিনী নারীচৈতন্যের পাঠ (সংবাদ : ৩১ জানুয়ারি, ২০০০)।

ইতিহাস দর্শনে শামীম নারীর দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করেছে ্লইতিহাসকন্যাশ্তে। এ-দৃষ্টিকোণ শামীমের নিজেরও। দীর্ঘ ১৪-১৫ বছর শামীম দৈনিক সংবাদ-এর মেয়েদের পাতা সম্পাদনা করেছে। এই পাতায় এমন সব রচনাই স্থান পেয়েছে, যেগুলো সরাসরি নারীবাদী চেতনাকে প্রসারিত করতে চেয়েছে। তরুণ চিন্তাবিদ খন্দকার সাখাওয়াত আলী শামীমের এই দিকটি, বিশেষ করে তাঁর ভাবনার কাঠামোটি ভালোভাবে জানেন। সাখাওয়াত ভাই আর আমি একসঙ্গে দুবারই ্লইতিহাসকন্যাশ্ দেখেছি। তাঁর সাথে শামীমের কাজ নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়েছে। তাঁর মতে, ষাটের দশকে নারীবাদী চিন্তা-চেতনার যে-ধারা পশ্চিমা নারীবাদীদের মধ্যে লক্ষ করা যায়, সেই চিন্তার পরিচ্ছাপ শামীমের ভাবনার মধ্যে পাওয়া যায়।

দৈনিক সংবাদ ছেড়ে শামীম রূপান্তর নামে খুব পরিচ্ছন্ন ও মুক্তবুদ্ধির কাগজ সম্পাদনা করেন, যার আটটি সংখ্যাই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের মুক্তির পক্ষে সরব ছিল। তবে নারীর রূপান্তর-কামনাই প্রতিটি সংখ্যার মূল বিষয় ছিল। বর্তমানে শামীম অনন্যা পত্রিকায় কর্মরত। তাঁর চিন্তা ও কাজের মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা আছে। সাখাওয়াত ভাই যখন বলেন যে, শামীম হচ্ছে নলেজ অর্গানাইজার – তখন তাঁর বিবেচনাকে গ্রহণ করতেই হয়। শামীম প্রিন্ট মিডিয়াতে নলেজকে তথা নারীবাদী চিন্তা-চেতনাকে জাগ্রত করার কাজটি করেছে। কে-না লিখেছে, বরং বলা ভালো কাকে দিয়ে না-লিখিয়েছে শামীম মেয়েদের পাতায়! দিলারা বেগম জলি, রেহনুমা আহমেদ, সারা হোসেন, হামিদা হোসেন, হাসনা বেগম, আনু মুহম্মদ, হোসেন জিল্লুর রহমান, মেঘনা গুহঠাকুরতা, শিরীন হক – কে-না লিখেছে! সকলের লেখাতেই নারীকে অগ্রসর সমাজের একটি অংশ করার ভাবনা স্থান পেয়েছে। প্রিন্ট মিডিয়া থেকে শামীম অডিও-ভিজুয়্যাল মিডিয়াতে আসে। এখানেও তাঁর লক্ষ্য নারীর অবদমিত সত্তাকে মুক্ত করা। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই শামীম ্লইতিহাসকন্যাশ্ নির্মাণ করে।

ইতিহাসকন্যা নির্মাণের পেছনে শামীমের যে-এষণা কাজ করেছে, তাঁর ভাষায়: ্লআমাদের (নারীদের) একটা নিজস্ব মতবাদ আছে। সেটা সুদৃঢ় করতে হবে। তবে কাউকে ফেলে নয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটা বিষয় বা অংশ প্রায় অলিখিত। ত্রিশ লাখ শহীদের কথা বলা হয়। কিন্ত্ত দুলাখ ধর্ষিত নারীর কথা বলা হয় না। আমরা সেই দুলাখ নারীর কথা বলতে চেয়েছি। আমি তাদেরকে বোল্ড করে দেখাতে চেয়েছিশ্ (সংবাদ : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০০০)। বলা চলে, শামীম অডিও-ভিজুয়্যাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবস্থানকে ধরতে চেয়েছে, আর এখানেও সাংবাদিক শামীম আখতার উপস্থিত। তাই উপস্থাপনার ঢঙে সাংবাদিকতার ছাপ তথা ডক্যুমেন্টেশনের ঝোঁক লক্ষ করা যায়। তাই তাঁর কাজ অনেকটা নথিচিত্রগত চরিত্রের।

কাহিনী-কাঠামোর মধ্যেও সাংবাদিকতা ও গবেষণা-কর্মে রত নারী-চরিত্রের উপস্থিতি লক্ষণীয়। ্লইতিহাসকন্যাশ্-য় পাকিস্তান থেকে আসা লালারুখ নামের নারী চরিত্রটিও সাংবাদিক। শুভ রহমানের দৃষ্টিতে কাহিনী-কাঠামোটি এইরকম: লালারুখ এসেছিলেন সাংবাদিকতার পেশাগত অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে ছোটবেলার বন্ধু ও মিশনারি স্কুলের সহপাঠী মনিকার কাছে। সেই পরিবারে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে যুদ্ধাপরাধের তথ্য উদ্ঘাটনে ব্রতী মনিকা, অনন্যা, অনন্যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক মানস, অনন্যার সহকর্মী রূপা, ২৮ বছর ধরে বেদনা বুকে চেপে নিজেকে আড়াল করে রাখা ও নীরব হয়ে থাকা বৃদ্ধ নানা, বেদনায় প্রায় নির্বাক কনক – এসব চরিত্রের কাছ থেকে মাত্র ৭ দিনেই ইতিহাসের নির্মম সত্যটাকে জেনে ফিরে গেলেন পাকিস্তানে। জেনে গেলেন নিজেকে আড়াল করে রাখা নানা কেন বেদনায় পাথর, কেন কনক খালার প্রায় নিঃশব্দ জীবনযাপন, কেন ছোটবেলার বন্ধু মনিকার ইতিহাসের সত্য জানার জন্য এই প্রাণপাত। ফিরে গিয়ে ই-মেইল পাঠান লালারুখ। সাত দিনের অভিজ্ঞতা তাঁকে নিশ্চয়ই পাকিস্তানিদের যুদ্ধাপরাধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় উদ্বুদ্ধ করবে। বিদায়ের প্রাক্কালেই নানা একসঙ্গে খাবার টেবিলে লালারুখের সামনে কঠিনতম সত্য ও পাঁজরভাঙা প্রশ্ন তুলে ধরেন: ্লতোমার মেয়ে ধর্ষিতা হলে তুমি কি ক্ষমা করবে ধর্ষণকারীদের?শ্ অপমানিতা অনন্যার মাকে তো কন্যা জন্ম দিয়ে উদ্বন্ধনে আত্মাহুতি দিতে হয়েছে। বাবা প্রাণ দিয়েছে যুদ্ধে। ইতিহাসকন্যা অনন্যা (জনকণ্ঠ : ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০০০)।

অনন্যা এই চলচ্চিত্রের ইতিহাসকন্যা তথা ওয়ারচাইন্ড। একেবারে শেষে খাবার টেবিলে তার কাছে সত্য ধরা দেয়, সে জানে যে সে ওয়ারচাইল্ড। খাবারের দৃশ্যটি আসার পর এবং এই দৃশ্যে চরম সত্যটি লালারুখ, বিশেষ করে অনন্যা জানার পর মনে হয়েছিল কাহিনীটি এখানেই শেষ হবে। এখানে শেষ করার মতো স্পেস ছিল – একা একা অনন্যা ভাবছে, নানা এসেছে আদর করতে। এই রকম একটি জায়গায় শেষ করলে এরপর কী হতে পারে অথবা কী হয়েছে – এসব ভাববার ভার দর্শকদের ওপর ছেড়ে দেয়া যেত। এতে করে দর্শকরাও যে চলচ্চিত্রকলার একটি বিশেষ অংশ, তা মূর্ত হতো। যে-আবেগ, যে-খারাপ লাগা বোধ এই পর্যায়ে তৈরি হয়েছিল, তাতেই ডুবিয়ে দেওয়া যেত দর্শক-চৈতন্য। কিন্ত্ত অনন্যার সত্য জানার পরও শামীম কাহিনীকে টেনে নিয়ে গেছে। মনিকা ও মানসের পার্কে বসে কথা বলা, মনিকাকে লেখা অনন্যার চিঠি পড়া, মনিকার অফিসে রূপার লালারুখের পাঠানো চিঠি পাঠ করা – এসব না হলেও বোধকরি চলত। অহেতুক টেনে নিয়ে গিয়ে নির্মাতা একদিকে যেমন আবেগের জায়গাটি (যা এতক্ষণ ধরে তৈরি করা হয়েছে) নষ্ট করে দেন, তেমনি দর্শকদেরও চলচ্চিত্রটির শেষটার সাথে মিথস্ত্রিয়ায় যেতে বাধ সাধেন। টেনে নেওয়াতে চলচ্চিত্রটি অনাবশ্যকভাবে দৈর্ঘ্যে কিছুটা বেড়ে গেছে।

একটা অভিযোগ চলচ্চিত্র-সমালোচক জাহিদ তুলেছে এই বলে যে: ছবিটি গতিশীল নয়। মাঝে মাঝেই থেমে যেতে চায়। মাঝে মাঝে মনে হয় শেষ হয়ে গেছে। কাহিনীর শীর্ষবিন্দু খুঁজতে খুঁজতে একটু ক্লান্তি আসে, তারপরও শেষ পর্যন্ত যাওয়া গেছে যে-কারণে, তা হলো বিষয় (ইত্তেফাক : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০০)। একথা ঠিক যে প্রচলিত ধারায় যেসব চলচ্চিত্র বা নাটক দেখে আমরা অভ্যস্ত, তাতে গতি থাকে। দৃশ্যের সময়কাল সংক্ষিপ্ত করে দ্রুতলয়ের কাট্-এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রে এই গতি আনা হয়। শামীম সেই পথ মাড়াননি। কারণ তাঁর আখ্যান বর্ণনাধর্মী, এখানে গতি শ্লথ হতে বাধ্য; কাঠামোর দিক দিয়ে বিবেচনা করলে ্লইতিহাসকন্যাশ্ পিরামিডিক কাঠামোর নয় বরং অনুভূমিক কাঠামোর। তাই এর কাহিনীর পরিসরে কোনো উল্লম্ব রেখা নেই। উল্লম্ব রেখা নেই বলে প্রচলিত ধাঁচের নাটক ও চলচ্চিত্রে কাহিনীর মাঝামাঝি সময়ে যে শীর্ষবিন্দু থাকে বা তুরীয় পর্যায় থাকে, তা ্লইতিহাসকন্যাশ্-য় নেই। কিন্ত্ত এই শীর্ষবিন্দু বা তুরীয় পর্যায় পাওয়া যায় একেবারে অনুভূমিক রেখার শেষে, যখন অনন্যা জানতে পারে তার সত্যিকার পরিচয়। আগেই বলা গেছে, শামীম এই তুরীয় পর্যায়ে ্লইতিহাসকন্যাশ্ শেষ না করে আরো কিছুটা টেনে নিয়ে গেছে; যার সম্ভবত বিশেষ প্রয়োজনই ছিল না।

ধারণা করি, এই শ্লথ গতিই ্লইতিহাসকন্যাশ্র একটা বৈশিষ্ট্য। এই ধাঁচের গতি বা পেইস শামীম ইচ্ছে করেই বেছে নিয়েছে। ্লসেশ্-তেও এই পেইস ছিল। আমরা ্লশিলালিপিশ্-র আলোচনাকালে দেখব যে ওখানেও একই ধাঁচের পেইস ত্র্কিয়াশীল। তবে কি এই পেইস শামীমের নিজের পেইস? একজন নারী ইতিহাসে প্রবেশ করে তার তথা ইতিহাসের ব্যাখ্যা দাঁড় করালে কি পেইস ধীর লয়ের হয়ে পড়ে? বারে বারে নীরবতাকে আহ্বান করে? নাকি চরিত্রের চেতনা-প্রবাহকে ধরতে গেলে কাহিনী-পরিসরের পেইস শ্লথ হয়ে যায়?

গতিশীলতা না-থাকার আরেকটি কারণ: ধর্ষণ-দৃশ্য নেই, ঘাতক নেই, যুদ্ধ নেই, অথচ সবই আছে সংলাপে তথা কথায় বা বর্ণনায়, যেন শামীম চলচ্চিত্র বলতে চেয়েছে। চলচ্চিত্র বলার এই ধরনই ্লইতিহাসকন্যাশ্-য় একটা নতুন চিত্রভাষা হয়ে উঠেছে। এই চিত্রভাষা উপন্যাসের চেতনা-প্রবাহ পদ্ধতির সাথে তুলনীয়। চেতনা-প্রবাহের বিষয়টি শামীম আখতারই আমাদের চলচ্চিত্রে প্রথম এনেছে, যা উপন্যাসে এনেছিলেন সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ তাঁর কাঁদো নদী কাঁদো-তে সেই ১৯৬৮ সালে। লালারুখের সমস্ত কথকতা, ভাবনা সবকিছুই চেতনা-প্রবাহরীতিতে চলচ্চিত্রে স্থান পেয়েছে। সংগীত ও চলচ্চিত্রবোদ্ধা শ্রদ্ধেয় ওয়াহিদুল হক ্লইতিহাসকন্যাশ্র আলোচনাকালে শামীম যে-ভিন্নতর একটি চলচ্চিত্রভাষা তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকাকে চিত্রিত করতে চেয়েছে, সে-বিষয়ে মূল্যবান মতামত রেখেছেন: এই মতো ছবি করতে গিয়ে শামীমকে নিজের চলচ্চিত্র-ভাষা তৈরির কাজে লাগতে হয়েছে। অনিশ্চিত দ্বিধান্বিতভাবে, সফলভাবেও। মানুষগুলো যেন সবকিছু না বলে দেয়, ছবিই যেন বেশি বলে, অনেক বেশি – এ করতে গিয়ে সংলাপকে ছাঁটা হয়েছে যেন নিষ্ঠুরভাবেই।…কথা কম কিন্ত্ত তবু এটা কথায়-কথায়ই গেঁথে তোলা ছবি। মানুষ কম, দৃশ্যও কম। কথা কম, কথা প্রধান। এইগুলো দোষ নয়। এইগুলোই ছবির সামগ্রিক চরিত্রটি গড়ে তুলেছে (সুন্দরম : হেমন্ত সংখ্যা, ১৪০৬)।

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি থেকে এ-সত্য ধরা দেয় যে, শামীম রবীন্দ্রনাথ-কথিত ্লদৃশ্যের গতিপ্রবাহশ্ দিয়ে চলচ্চিত্র বলেছেন। তাঁর তিনটি চলচ্চিত্রই এমন এক চরিত্রের ধারক, যা একান্তভাবেই শামীমীয়। বাংলা চলচ্চিত্রে এই দিকটি প্রকৃত প্রস্তাবে এক নতুন সংযোজন। বাংলা চলচ্চিত্রে কথা বেশি থাকে, শামীমের কাজেও আছে, কিন্ত্ত দৃশ্যের গতিপ্রবাহের কারণে তা প্রকট হয়ে ওঠে না। ওয়াহিদুল হক এই ্লইতিহাসকন্যাশ্ প্রসঙ্গে তাঁর আরেকটি রচনায় জানান: বাংলা ছবি ঐতিহাসিকভাবেই বাগবহুল।… ঐ ঐতিহ্যের চাপ থেকে এক লাফে চলচ্চিত্র-ফিল্ম নামের এক দুনিয়া-ছাড়া জঙ্গমতার দৃশ্যের চলৎময়তার জগতে চলে গেলেন। কথা দিয়ে কথা না বলা, দৃশ্য দিয়ে কথা আঁকলেন প্রধানত। ছবির প্রথম দিকে এই স্বল্পভাষ সিনেমার অত্যন্ত বাস্তব থেকে নড়তে না-চাওয়া মনকে অস্বস্তি দেয় বিস্তর। ধীরে ধীরে প্রায় যেন অজান্তে এইটাই ভালো লেগে যায়। আমরা নতুন একটা স্টাইলে ঢুকে যাই (জনকণ্ঠ : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০০)।

এই স্টাইলটাই শামীমের চলচ্চিত্র-ভাষার বিশেষ দিক। চলচ্চিত্রে চৈতন্য-প্রবাহরীতির প্রয়োগের ফলে এই স্টাইলের উদ্ভব হয়েছে বলে আমার ধারণা।

শুরুতেই সালমা হক অনন্যাকে যে-সাক্ষাৎকার দেন, তার মধ্যে সালমার চেতনা-প্রবাহের নজির বিদ্যমান। তিনি স্বাধীনতা-সংগ্রামের সময় তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন। স্বাধীনতার বিরোধী শক্তির বাঙালি প্রতিনিধিদের হাতেই তাঁর স্বামী মারা যান। অনন্যাকে বলে: আমার বিছানার চাদর তো একটাও ছেঁড়েনি। কেবল বিয়ে হয়েছে।…সেই চাদর, বালিশের ওয়ার, সেই শাড়ি। কোনোটাই একটা ছিঁড়ে…দ্বিতীয়টাও হয়নি, তাহলে কেন এরকম হবে? কী করে ২৮টা বছর পার করলেন, তাও বললেন। বললেন: এখন তো মুক্তিযুদ্ধটুদ্ধর চেতনা আছে বলে তো আমার মনে হয় না।

শামীম আখতার এই ভুলে-যাওয়া চেতনা পুনরুদ্ধার করার পরিকল্পনা থেকেই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি-বিস্মৃতিকে পুনর্র্নিমাণ করতে চেয়েছেন ্লইতিহাসকন্যাশ্য়। শামীমের মতে: মধ্যবিত্তকে, ছাত্রদেরকে ঝাঁকুনি দেওয়ার জন্য আমার এ কাজ। শ্৭১-এ যে-গণহত্যা হয়েছে সেটা এখনো স্বীকৃতি পায়নি।…গণহত্যার কারণে যেসব পরিবার ধসে গেছে তাদের যতদিন পর্যন্ত তুলে আনতে না পারব ততদিন আমরা দায়বদ্ধ থাকব। এসব পরিবারগুলোকে তুলে আনতে চেয়েছি।…গল্পকাহিনীর চেয়ে এখানে গণহত্যাকে একটা প্রপাগান্ডা হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি। …কিছু সত্য চরিত্রের সমন্বয় ঘটিয়েছি এখানে (সংবাদ: ৬ জানুয়ারি, ২০০০)। এই সত্য চরিত্ররা তাঁদের পরিবারে যাঁরা আলবদর, আল শামসদের হাতে নিহত হয়েছেন তাঁদের কথা, নিজেদের কথা বলেছে এই চলচ্চিত্রে। শামীম সাক্ষাৎকারকে একটি চলচ্চিত্রিক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যা ্লসত্য চরিত্রেরশ্ চেতনাপ্রবাহকে প্রকাশ করেছে। সালমা হক ও অধীর দেশ্র সাক্ষাৎকার যেমন ্লইতিহাসকন্যাশ্র শরীর-নির্মাণে সহায়তা করে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রেখেছে এমন কিছু স্থাপনা যেমন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, শহীদ মিনার, সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের আইল্যান্ডে স্থাপিত মাটির ফলক ইত্যাদিও চলচ্চিত্রটিকে বর্তমান ও অতীতকে একই চেতনাপ্রবাহে মিলে যেতে সাহায্য করেছে।

সালমা হক তাঁর চারিদিকে যে-বাস্তব অবস্থা দেখছেন তার আলোকে তাঁর কাছে মনে হয়েছে এখন আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে কিছুই নেই। এই চেতনা ফিরিয়ে আনার জন্য শহীদ জননী জাহানারা ইমাম মুক্তিযুদ্ধে যারা ঘাতক ও দালাল হিসেবে কাজ করেছে তাদের বিচারের জন্যে গণআদালত গঠন করেন নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে। সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে এই গণআদালত বসে, আমরা সবাই এতে যোগ দিই। শামীম আখতার তো ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সদস্যই ছিলেন। এই সময়েই একাত্তরে যে নারীরা ধর্ষিত হয়েছিল এবং এঁদের ঔরসে যেসব শিশু জন্ম নিয়েছিল, তাঁদের নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়। একাত্তরে জন্ম নেওয়া ওয়ারচাইল্ড তথা যুদ্ধ-শিশুদের অনেককেই দেশের বাইরে দত্তক হিসেবে নিয়ে গিয়েছিল বিদেশী মাতা-পিতারা। নব্বইয়ের দশকে এঁদের একটি দল তাঁদের জন্মভূমিকে দেখার জন্য বাংলাদেশে আসে। শামীম এঁদের দেখেছে, তখনই কি শামীমের মনে অনন্যার জন্ম হয়? শামীম যে চলচ্চিত্রটি অনন্যাকে ঘিরে তৈরি করে, তা শুধু সালমা হক, অধীর দে, লালারুখ, মনিকা, কনক, নানা বা অনন্যার চেতনাপ্রবাহের দলিল নয়, তা একটি নির্যাতিত-দলিত অঞ্চলের স্বাধীনতাপ্রাপ্তিরও দলিল। কনক হিন্দু ধর্মাবলম্বী, তার চেতনাপ্রবাহে তার ধর্মীয় আচারগুলোর স্মৃতি শামীম ফ্ল্যাশব্যাকে তুলে ধরেছেন। বলা চলে, শামীম চরিত্রনিচয়ের চেতনাপ্রবাহের মৌল দিকগুলো হাজির করেছে ্লইতিহাসকন্যাশ্-য় কখনো সাক্ষাৎকার, কখনো স্থাপনা, কখনো ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে। অনন্যা যখন জেনে যায় তার মা কনিকা আত্মহত্যা করেছিল, তখন সে খাওয়ার টেবিল ছেড়ে চলে যায়। শূন্য চেয়ারের দিকে তাকিয়ে থাকে কনক খালা। তাঁর স্মুৃতিতে ভেসে ওঠে তাঁর হাতের ইশারায় আর ডাকে, ছোট অনন্যা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। এখানে শামীম চেতনাপ্রবাহকে ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে দারুণ কাব্যময়তায়।

সংলাপ হচ্ছে আরেকটি উপাদান যা দিয়ে ্লইতিহাসকন্যাশ্-য় চেতনাপ্রবাহকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, স্মৃতি-বিস্মৃতিকে মূর্ত করা হয়েছে, বেশকিছু দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। লালারুখ জানতে চায় অনন্যার কাছে: আমরা যে স্কুলে পড়তাম সেটা ছিল ওল্ড টাউনে আগে, পরে মোহাম্মদপুর…সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স কনভেন্ট, আছে স্কুলটা? কয়েকটি দৃশ্যের পর আমরা দেখি অনন্যা আর লালারুখ পুরনো স্কুলে, সিস্টারের সঙ্গে তাদের দেখা হয়, সিস্টার তার সংলাপে পিছনে ফিরে যায় মানে একাত্তরের স্মৃতিতে এবং জানায় যে, কলকাতা থেকে বাহাত্তরে মাদার তেরেসা যুদ্ধ-শিশুদের জন্য একটা হোম করেছিলেন, প্রচুর মেয়ে এখানে বাচ্চা প্রসব করে এবং এই দেব-শিশুদের অনেককেই বিদেশের বিভিন্ন সংস্থা নিয়ে যায়। এইভাবে স্মৃতিতে ফিরে গিয়ে সিস্টারও তার চেতনাপ্রবাহের মধ্যেই পুনর্র্নিমাণ করে সেই সময়কে।

লালারুখের চেতনাপ্রবাহ কাজ করে অন্যস্তরে। সে স্কুলের চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে ছোট্টবেলার কথা, শামীম আমাদের দেখায় ছোট লালারুখ আর মনিকা লুকোচুরি খেলছে স্কুল চত্বরে। লালারুখের সংলাপে তার অতীতের স্মৃতি ফিরে এসেছে। নানার সংলাপ তো পুরোপুরিভাবেই তাঁর চেতনাপ্রবাহের প্রতিরূপ। স্মৃতি নিয়েই বেঁচে আছেন তিনি। তাঁর মেয়ের ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যা করার দৃশ্য তিনি কিভাবে ভোলেন? তাঁর সংলাপে সেই দৃশ্য মূর্ত হয়ে ওঠে। তাঁর চেতনায় স্থিত ১৯৪২-এর আগস্ট মুভমেন্টের কথা, দেশভাগের কথা, পাকিস্তান হবার কথা, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কথা, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের কথা – সব তাঁর সংলাপে প্রকাশ পায়। তাঁর সংলাপেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার মূল দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের অত্যাচার কী মাত্রায় ২৪ বছর ধরে চলছিল, তা বের হয়ে আসে নানার সংলাপে। আমরা বুঝতে পারি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামের দুটি দেশ এই অঞ্চলে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে প্রকাশ পায় বটে, কিন্ত্ত পাকিস্তানের পূর্বাংশ পশ্চিম অংশের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ হিসেবে পরিগণিত হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তি-সংগ্রামের মাধ্যমে এই উপনিবেশ লুপ্ত হয়, জন্ম হয় বাংলাদেশের। কিন্ত্ত কিছুদিন যেতে-না-যেতেই আবার পাকিস্তানের ভূত চেপে বসে এই দেশের অনেকের মধ্যেই। নানা তাই বলেন: চারিদিকে পাকিস্তানি মনোভাবের ছড়াছড়ি দেখছি। কত বছর ধরে, আমার এই বকাঝকা, প্রলাপ…আত্মীয়-স্বজনরা পর্যন্ত ভয়ে কাছে আসে না। নানা নব্বই দশকের শেষ প্রান্তে এসে এইসব বলছেন আর স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন লাঠিতে ভর দিয়ে।

মূলত সংলাপ ও পালটা সংলাপের ভেতর দিয়েই ্লইতিহাসকন্যাশ্র দ্বন্দ্বগুলো প্রকাশিত হয়। লালারুখের আগমনের শুরু থেকেই নানার সাথে লালারুখের একটা দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। এটা আসলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বন্দ্বের একটা রূপ। মনিকা আর লালারুখের মধ্যেও ভাবাদর্শগত দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটে, বিশেষ করে যখন লালারুখ পাকিস্তানের কাঠামো থেকে বের হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়াটাকে সেপারেশন হওয়া মনে করে। কিন্ত্ত মনিকা তখন বলে: তোমাদের কাছে যা সেপারেশন, আমাদের কাছে তা লিবারেশন, স্বাধীনতা।

কিন্ত্ত এই স্বাধীনতার স্বরূপ নব্বই দশকের শেষে এসে কী অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, তা নিয়েই শামীম বেশি ভাবিত। এই সময়ে স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজনৈতিকভাবে সত্র্কিয় হয়ে ওঠে। লালারুখ যখন জানতে চায়: মুক্তিযুদ্ধ হলো কিন্ত্ত পাকিস্তানের জন্য সফটনেস…এটা কী করে হয়? মনিকা জানায়: শেখ মুজিবের হত্যার পরে সোশ্যালিস্ট চেতনাকে ধ্বংস করে আমেরিকান লবি চেপে বসে। আমেরিকান লবি মানেই হচ্ছে পাকিস্তানের ফিরে-আসা। মনিকার সংলাপ থেকে বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার মধ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রধান দ্বন্দ্বের স্বরূপটি পরিষ্কার হয়। চিৎ হয় এই তর্ক: দেশটি ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র হবে, না ধর্মভিত্তিক? মনিকা এরপর যা বলে তা সবাইকে জানানোর জন্যই যেন শামীম এই ্লইতিহাসকন্যাশ্ তৈরি করে। মনিকার কথাগুলোই যেন শামীমের কথা। তবে কি মনিকাই শামীম? মনিকার চেতনাপ্রবাহই শামীমের চেতনাপ্রবাহ। মনিকা বলে: স্বাধীনতার পরে মধ্যবিত্ত আর এলিটরা ভাবল তারা সব পেয়ে যাবে। শেখ মুজিবের হত্যার ফলে এই নতুন শ্রেণিটাই লাভবান হলো। ফুলে ফেঁপে উঠল। নতুন একটা শ্রেণি, নতুন টাকা। এই নতুন এডুকেটেড জ্ঞানপাপী শ্রেণিটাই হলো সমস্যা, যারা জেনেও জানে না…এই শ্রেণিটা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝে না। পাকিস্তান যে এত বড় একটা অপরাধ করে গেল, সেটা তারা ভুলে যেতে চায়। এরা পাকিস্তানিদের চাইতেও বেশি পাকিস্তানি।

শামীম ্লইতিহাসকন্যাশ্র মাধ্যমে এই ভুলতে-বসা স্মৃতিকে তুলে ধরেছে। তাই তার প্রোটাগনিস্ট চরিত্ররা ওর্যাল হিস্ট্রি সংগ্রহ করে, লালারুখকে সাহায্য করে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাস্তবে পূর্ব বাংলায় কী করেছিল, তা জানতে। ্লইতিহাসকন্যাশ্ এইভাবে একটা নথিচিত্রগত মূল্য অর্জন করে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মাধ্যমে যা করতে চেয়েছিলেন, শামীম আখতার ্লইতিহাসকন্যাশ্র মাধ্যমে সেই একই কাজ করতে চেয়েছেন। শামীম এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করে পাকিস্তানিদের যুদ্ধাপরাধকে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন।

আর এই কাজে নারী-চরিত্ররা সরব, সত্র্কিয়। ্লইতিহাসকন্যাশ্র প্রায় সব নারী-চরিত্রই প্রো-অ্যাকটিভ। চিত্রনাট্যে তাদের প্রাধান্য বেশি, যদিও নানার চরিত্রটি বলিষ্ঠ একটা অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্ত্ত কাহিনীকে ডমিনেট করে নারী-চরিত্রগুলোই। নারী-চরিত্রগুলো ভীষণ স্বাবলম্বী ও আত্মবিশ্বাসী। শামীম আখতার নারীবাদী বলেই কি তাঁর সৃষ্ট নারী চরিত্রগুলো কাহিনী-পরিসরে এমন দেদীপ্যমান? এ-প্রসঙ্গে ওয়াহিদুল হকের ভাষ্য: শামীমের ব্যথা-যন্ত্রণা কেবল নারী হবার নয়, মানুষ হবার, কেবল মুসলমান হবার নয়, হিন্দু হবার। মানুষ হবার অন্তহীন চেষ্টার কারণে মানুষের ব্যথায় ব্যথী হবার কারণে তাঁর বোধগুলো প্রখর হয়, চলে যায় ইতিহাসে, সমাজে, তাঁর প্রত্যক্ষ বাস্তবে, যা তাঁকে হানে বেশি…(সুন্দরম : হেমন্ত সংখ্যা, ১৪০৬)।

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতির আলোকে এবং ্লইতিহাসকন্যাশ্র সার্বিক অনুধাবনে বুঝতে পারি যে, এই চলচ্চিত্রে শুধু দুই লাখ ধর্ষিত নারীর প্রশ্নটিই বড় হয়ে সামনে আসেনি, এসেছে পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নটিও। আমরা জানি পাকিস্তান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি। যদিও লালারুখ যে নারী সংগঠনটির সাথে জড়িত বলে জানায় সেটি পশ্চিম পাকিস্তানের হয়ে বাংলাদেশের কাছে একাত্তরে তাদের সকল অপকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়েছে। শামীম চায় পাকিস্তান যাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চায়, একাত্তরের ঘাতক দালালদের যাতে বিচার হয়। তাঁকে এই যজ্ঞে ক্যাম্পেইনারের ভূমিকা নিতে হয়েছে। তাঁর ্লইতিহাসকন্যাশ্ বক্তব্যের দিক দিয়ে একটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্ত্ত নির্মাণশৈলীর নিরিখে বিচার করতে গেলে বেশ কিছু দুর্বলতা পীড়া দেয়, যা ্লসেশ্-তে ছিল না। ্লসেশ্-তে যে পরিমিত বোধের পরিচয় পাওয়া যায়, তা ্লইতিহাসকন্যাশ্য় উধাও। সম্ভবত নথিচিত্রগত চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে শামীম ঐতিহাসিক উপাদানের ওপর বেশি জোর দিয়ে ফেলেছেন। তাই সেই সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে এমন সব গান বারবার সাউন্ড ট্র্যাকে বাজতে শুনি, যা কিছু কিছু দৃশ্যের গভীরতা ক্ষুণ্ন করে, চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে বাধ সাধে। সব কথা খুলে বলা, সবকিছু দেখিয়ে দেওয়া সম্ভবত শিল্পের জন্যে ক্ষতিকর। অনন্যার সত্য জানার পর শেষ করলে দর্শক হিসেবে একটা অজানা দিক নিয়ে ভাবা যেত, ঘরে ফিরতে ফিরতে। অথচ অনন্যার মাথায় নানার হাত রাখতে গিয়েও না-রাখা, মানস ও মনিকার অনন্যাকে নিয়ে পার্কে বসে ভাবা, মনিকার দিগন্তে যাত্রা, অনন্যার চিঠি পাঠ, লালারুখের পত্র আসা ও কিছুটা পড়ে শোনানো – আগেই বলা হয়েছে এতে কাহিনীর গভীরতা হারিয়ে গেছে। এটা চিত্রনাট্যগত দুর্বলতা। এই দুর্বলতা শামীম তাঁর পরবর্তী কাজ ্লশিলালিপিশ্তে অনেকটা কাটিয়ে উঠেছেন।

শিলালিপি

্লশিলালিপিশ্ তৈরি করার পূর্বে শামীম ১৯৯৪ সালে ্লগ্রহণকালশ্ নামে ফতোয়াবিরোধী একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে। মকবুল চৌধুরী, শাহীন আখতার ও শামীম আখতার – এই তিনজন মিলে প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করেন। বাংলাদেশে তখন গ্রামে-গঞ্জে ফতোয়া জারি করার হিড়িক পড়ে এবং এর ফলে অনেক নিরীহ নারী ফতোয়ার স্বীকার হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত বরণ করে। ্লগ্রহণকালশ্ ১৯৯৫ সালে শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কারও পায়। বিটা ফরম্যাটে তৈরি এই প্রামাণ্যচিত্রে সমাজ-সংসারে নারীর অধস্তন হয়ে থাকার পেছনে যে মুসলিম মৌলবাদ দায়ী, সেই সত্যটি তুলে ধরা হয়। শামীমের সব কাজেই নারীর মুক্তির প্রসঙ্গটি এসে যায়।

্লশিলালিপিশ্তেও আমরা একজন নারীর একাকী সংগ্রাম করে যাওয়ার সত্যিকার কাহিনী দেখতে পাই। ১০০ মিনিটের এই কাহিনীচিত্রটি বিটা ফরম্যাটে তৈরি। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধে এদেশে নারীদের অবদানকে তুলে ধরতে নির্মিত হয়েছে এই চলচ্চিত্রটি। এটি প্রযোজনা করেছে প্রশিকা-র অঙ্গসংগঠন ্লউন্নয়ন সহায়ক যোগাযোগ কর্মসূচি ট্রাস্টশ্। ট্রাস্টের উদ্দেশ্য মহৎ, শুধু অর্থ দেওয়া নয়, দেশ ও দেশের মানুষের ইতিহাস তুলে ধরবে বলেই ্লশিলালিপিশ্কে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ্লশিলালিপিশ্ শহীদ সেলিনা পারভীন সম্পাদিত পত্রিকার নাম। এই পত্রিকার বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে তিনি স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ, অর্থ, খাবার দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। নিভৃতচারী এই নারী বাংলাদেশের স্বাধীনতার আয়োজনে উচ্চকিত ষাটের দশকে রেখে গেছেন অবদান। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা-সংগ্রামের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করা এবং স্বাধীনতা-সংগ্রামের সময় কাজ করে যাওয়ার দায়ে তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ। ১৪ ডিসেম্বর রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি আর্মি ও এদেশীয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন তিনি। ্লশিলালিপিশ্ শহীদ সেলিনা পারভীনের হুবহু আলেখ্য নয়। এ চলচ্চিত্রে তাঁর ছায়া উপস্থিতি কখনো তাঁর, কখনো সে-সময়কালের প্রেক্ষাপটে হয়েওঠা প্রতিবাদী নারীর।

২০০১ সালে শুরু করা এই চলচ্চিত্রটি ২০০২-এ প্রথম প্রদর্শিত হয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার সপ্তাহ দুয়েক আগে তড়িঘড়ি করে প্রিমিয়ার শোর আয়োজন করা হয়। কে জানে যদি পরে ছাড়পত্র না পাওয়া যায়! প্রথমবার প্রিমিয়ার শোতে খসরু ভাই, সাখাওয়াত ভাইসহ দেখি। দ্বিতীয়বার শামীমের বাসায়। প্রথমবার দেখার পর খুব স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিলাম। আমি আর সাখাওয়াত ভাই কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে, শামীমকেও কিছু না বলে, রাস্তায় নেমে আসি। একটা রিকশা নিয়ে সাখাওয়াত ভাই ধানমন্ডির দিকে যেতে বললেন। সাখাওয়াত ভাইয়ের মন ইদানীং নিম ফলের মতো তিতা থাকে সারাক্ষণ। আমি তাঁকে সঙ্গ দেই মাঝে মধ্যে, তাঁর সন্তান ও সন্তানের মা তাঁর সঙ্গে থাকছে না বলে তাঁর ঘর এলোমেলো, নাওয়া-খাওয়ারও ঠিক নেই। আমার মন কেমন করে তাঁর জন্য। আজো রিকশায় তিনি চুপ করে আছেন। এরকম ঘরভাঙা মানুষ দেখলে, নারী বা পুরুষ যেই হোক, আমার মন কেমন করে। একে তো এরকম একজন ঘরভাঙা মানুষের পাশে বসে আছি, তার ওপর সদ্য দেখা শামীমের ্লশিলালিপিশ্র চাপ – দুয়ে মিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিলাম।

মুখ খুললাম: শুরুতে সেলিনা পারভীনের ছেলের (চৌধুরী সুমন জাহিদ) কথাগুলোর আদৌ কোনো দরকার ছিল না। একটা কাহিনীচিত্রের শুরুর ফ্রেম থেকে শেষ ফ্রেম পর্যন্ত চলচ্চিত্র-সৃষ্টি প্রত্র্কিয়ার অংশ। শুরুতেই তাই একটু যেন ধাক্কা লাগে, তাঁর মহিয়সী শহীদ মা-কে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার অবশ্যই আছে। তবে তা হতে পারত আউট অব দ্য স্ক্রিন। চলচ্চিত্রটির ভেতরে ওরকম একটি দৃশ্য শুরুতেই জুড়ে দেওয়াতে চলচ্চিত্রীয় গুণ ক্ষুণ্ন হয় বৈকি। সাখাওয়াত ভাই কিছুই বলছেন না। আবার বলি: শামীম নিজের মতো করে ইতিহাসে ঢুকেছে, সেলিনা পারভীনের জীবনচর্চাকে (চলচ্চিত্রে চরিত্রটির নাম নাসরিন) কেন্দ্রে রেখে শামীম ঐ সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রবেশ করে তার একটা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়েছে। সাখাওয়াত ভাই বললেন: ১৯৭১-এর আগের কাহিনী ্লশিলালিপিশ্। ্লইতিহাসকন্যাশ্য় আমরা একাত্তর পেয়েছি। শামীম একটু পেছনে ফিরে নিজের দেশের ইতিহাসটা পুনর্র্নিমাণ করতে চেয়েছেন। তাঁর কাজকে গুরুত্ব দিতেই হবে। বললাম: অবশ্যই, ্লইতিহাসকন্যাশ্ও আমরা একসঙ্গে দেখেছি। তাঁর কাজ আমাদের ভাবায়।

রিকশা সাইন্স ল্যাবরেটরির মোড়ে এলে সাখাওয়াত ভাই রিকশাচালককে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের দিকে যেতে বললেন। একটু অবাক হলাম, আমি আর সাখাওয়াত ভাই আবাহনী মাঠের উলটোদিকে থাকি, ঐদিকে না গিয়ে ৩২ নম্বর কেন? তিনি বললেন: চলেন আপনাকে কফি খাওয়াব। বুঝলাম তিনি নিজের জীবনের জটিলতা ছেড়ে সদ্য দেখা ্লশিলালিপিশ্ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী। ৩১ নম্বরের মাথায় একটা কফিশপে নেমে পড়ি, অল্প আলোয় মুখোমুখি বসে পড়ি। কফি আর গরম লেমন কেকের অর্ডার দেন সাখাওয়াত ভাই। মুখোমুখি আমরা, আমাদের সামনে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, এই পটভূমির একটা ক্ষুদ্র অংশের ইতিহাস নিয়েই নির্মিত ্লশিলালিপিশ্। সাখাওয়াত ভাই কথা শুরু করলেন: ্লশিলালিপিশ্র ইতিহাস মধ্যবিত্তের চোখে দেখা ইতিহাস, শ্রেণির একটা প্রভাব আছে। বললাম: সব শ্রেণির কথা আনতে গেলে ঝুলে যেত না? বললেন: এই জন্যেই তো বললাম ্লশিলালিপিশ্ বুঝতে হলে শামীমের শ্রেণিদৃষ্টিকোণটা প্রথমে বুঝতে হবে। সাখাওয়াত ভাইয়ের কথায় কখনোই কোনো মেদ খুঁজে পাইনি। যা বলেন টু দ্য পয়েন্ট। হয়তো অল্প বয়স থেকে গ্রামসী নিয়ে আছেন বলে তাঁর চিন্তা-ভাবনা এমন পরিপক্ব। ্লশিলালিপিশ্তে শামীম আগের কাজটির মতোই স্থাপনাকর্ম, পুরনো দৈনিক পত্রিকা, ঐ সময়কার স্লোগান, পুরনো ফটোগ্রাফ, ওই সময়ের গণসংগীত ও সিনেমার গান, সাক্ষাৎকার ইত্যাদি ব্যবহার করেছে। এবং এই চলচ্চিত্রটিও ভীষণভাবে চেতনাপ্রবাহরীতিতে তৈরি। এর কাহিনী-কাঠামোর সংক্ষিপ্ত বয়ানে তার প্রমাণ মিলবে।

সুবর্ণ, সেলিনা পারভীন তথা নাসরীনের ছেলে। সে ও তার বন্ধু সামিনা মিলে ্লদ্য ওয়ার উই ফরগেটশ্ শিরোনামের একটি স্থিরচিত্রের প্রদর্শনী দেখছে। যুদ্ধের দৃশ্য-সংবলিত চিত্র দেখতে দেখতে সুবর্ণর তার মায়ের কথা মনে পড়ে। সুবর্ণর চেতনায় তাঁর মায়ের স্মৃতি ধরা আছে, তার ভাবনার অনুষঙ্গ হিসেবে ফ্ল্যাশব্যাকে তার মায়ের কথা, দীপা মাসীমা, অমল কাকু, অলক কাকু – যারা তাদের প্রতিবেশী ছিল, আসাদ দাদু – যিনি তার মা-কে আশ্রয় দিয়েছিলেন, মন্টু মামা ও আরো কিছু চরিত্রের কথা আমরা জানতে পারি। ্লশিলালিপিশ্ বস্তুত সুবর্ণর চেতনাপ্রবাহের ওপর ভর করে এগিয়ে চলে। সামিনার সাথে কথপোকথনের সময় সুবর্ণর চেতনার সঙ্গী হয়ে আমরাও সেই ১৯৭১-এর পটভূমিতেই ফিরে যাই।

সুবর্ণ এই চলচ্চিত্রের প্রধান কথক, তার কথকতা ও স্মৃতিতে ভ্রমণের মধ্য দিয়েই কাহিনীর বেশির ভাগ উন্মোচিত হয়। সে যখন রেজা সাহেবের কাছে তার মা সম্পর্কে জানতে যায়, তখন রেজা সাহেবের চেতনাপ্রবাহের পথ ধরে আমরা কাহিনীর আরো কিছু অংশের সাথে পরিচিত হই। সুবর্ণর মা আবার যখন সুবর্ণ বা রেজা সাহেবের স্মৃতির পথ ধরে হাজির হয়, তখন তিনিও আবার প্রতিবেশী রাহেলার কাছে নিজের কমিউনিস্ট পার্টি করা স্বামীর কথা বলেন, আমরা ফ্ল্যাশব্যাকে স্বামীর সঙ্গে তাকে দেখতে পাই। চলচ্চিত্রের ভাষায় একে জ্যাম্প কাট ইনটু দ্য ফ্ল্যাশব্যাক বলে। মা-র চেতনাপ্রবাহ এইভাবে কাহিনীর বাকি অংশ তুলে ধরে। শামীম স্মৃতি ও বাস্তবের বুনন এমনভাবে চিত্রনাট্যে ঘটিয়েছেন যে তা কাহিনী-প্রবাহে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। সুবর্ণ ও তার মা এবং রেজা সাহেবের চেতনাপ্রবাহের সাথে ভ্রমণ করে আমরা যেমন শহীদ সেলিনা পারভীনের জীবনসংগ্রামের নানামুখী বয়ান পাই, তেমনি ওই সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষের প্রেক্ষাপট, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিযুক্ত হয়ে আলাদা জাতি-রাষ্ট্র অজর্নের সংগ্রামের নানা প্রসঙ্গ সম্পর্কে জানতে পারি। ্লশিলালিপিশ্ প্রকৃতপ্রস্তাবে একটা টাইম ক্যাপসুলধর্মী চলচ্চিত্র। সেই সময়কে প্রতিষ্ঠিত করে এমন সব স্লোগান, গান, পত্রিকার হেডলাইন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে চলচ্চিত্রটিতে।

সুবর্ণ এখনো শুনতে পায় সেই সব স্লোগান: জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো; এক কথা এক দাবি, ভুট্টো তুই কবে যাবি; ভুট্টোর মুখে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো ইত্যাদি। আরো শুনতে পায়: ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে গান। সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের সময় বেয়ে ১৩ ডিসেম্বরে এসে শেষ হয় সুবর্ণ ও রেজা সাহেবের স্মৃতিপ্রবাহ। ১৩ ডিসেম্বরই সুবর্ণর সামনেই তার মা-কে রাজাকাররা ধরে নিয়ে যায়। নির্বাচনের সময় ও পরের পরিস্থিতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে শামীম ব্যবহার করেন ওই সময়কার বাংলা-ইংরেজি দৈনিকের হেডলাইন: বাংলার স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দিন; খয়মভথ ঊয়ঢ়য়ক্ষন ঙক্ষভলন খভশভড়ঢ়নক্ষ ইত্যাদি। কিন্ত্ত মুজিব প্রধানমন্ত্রী হননি, শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। রেজা সাহেব সুবর্ণর মা-কে মুক্তিযুদ্ধে নিয়ে যেতে চান, কিন্ত্ত তিনি যেতে রাজি হননি। আসাদ মামাও তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান, যাননি তিনি। বলেন: না মামা, আমার এখানে অনেক দায়িত্ব। ছেলেরা আসবে…আমাকে না পেয়ে আবার কোথায় খুঁজবে? মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র তিনি নিজের কাছে রাখতেন। অর্থ ও খাবার দিতেন, তাই তিনি বাড়ি ছাড়তে চাননি। আসাদ মামা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তখন বলেন: রাজনৈতিক জাগরণ সহজ, মেরে কেটে আদায় করতে শেখা। কিন্ত্ত যখন স্বাধীন হবে তখন ওই আবেগটাকে বশ করতে হবে। তার জন্য দরকার গভীর চেতনা, দেশপ্রেম, কষ্ট করার ক্ষমতা – সেটা গড়ে উঠলে হয়। সেটা কালে কালে গড়ে ওঠার ব্যাপার। সেই ধৈর্য বাঙালির আছে তো?

সুবর্ণ ও সামিনা রেজা সাহেবের কাছে গিয়েছিল একটা লেখা আদায়ের জন্য যাতে সুবর্ণর মা-র অজানা কথা থাকবে। প্রকৃতপক্ষে শামীমই এইসব অজানা তথ্য সবাইকে জানাতে চেয়েছে ্লশিলালিপিশ্র মাধ্যমে। এবং ্লশিলালিপিশ্ স্মৃতি-বিস্মৃতির পুনর্র্নিমাণ হলেও চলচ্চিত্রটি হতাশার দিকটিকে বড় করে দেখাতে চায়নি। তাই সুবর্ণ ও সামিনা, যারা নতুন প্রজন্মের অগ্রপথিক তারা তাদের সংকলনের জন্য রেজা সাহেবকে লেখার তাগিদ দিতে ভোলে না। শামীম চায় সবকিছু নথিভুক্ত হোক, যাতে যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল তাদের বিচার করা যায়। আজ যখন রাজাকার-আলবদরদের হত্যাযজ্ঞের বিচার চেয়ে বিভিন্ন সময় রুজু করা মামলার নথিপত্র সরকারি সংস্থাসমূহ থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে, পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে – তখন শামীমের ্লশিলালিপিশ্ আমাদেরকেও দাঁড় করিয়ে দেয় বাংলাদেশ নামের একটা খোলা উঠোনে, যে-উঠোনে আজ নৃত্যরত একাত্তরের পরাজিত পক্ষ!!!

সুবর্ণ ও সামিনার মতো আমাদেরও আজ রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়ানো প্রয়োজন। এই স্থাপনা আমাদের কাতর করে বটে, কিন্ত্ত আবার যাতে এই ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করার প্রয়োজন এই বাংলায় না দেখা দেয়, তার জন্যে কাজ করার অনুপ্রেরণাও দেয়। যে-প্রশ্ন এই বধ্যভূমিতে প্রজন্ম শ্৭১ কর্তৃক স্থাপিত শিলালিপিতে খোদিত: তোমরা যা বলেছিলে, বলছে কি তা বাংলাদেশ? তার উত্তর খোঁজা আজকের বাংলাদেশের উঠোনে জরুরি। এই জরুরি কাজে শামীম আখতার একজন সত্যিকারের ক্যাম্পেইনার।

সাখাওয়াত ভাই কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলেন: শামীমের ্লইতিহাসকন্যাশ্ ও ্লশিলালিপিশ্-দুটো কাজেরই উপস্থাপনার ঢংটা স্মৃতিকাতরতায় ভরা, স্মৃতিমেধের জায়গা থেকেই কাজগুলো  এসেছে। বললাম: শুধু স্মৃতিরোমন্থন করাই কি শামীমের উদ্দেশ্য? বললেন: না, তা কেন! ্লশিলালিপিশ্-তে ব্যক্তি পর্যায়ের স্মৃতি নিয়ে কাজ করলেও         শামীম ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে গিয়ে রাষ্ট্রের গড়ে-ওঠার ইতিহাসকেও তাঁর চলচ্চিত্র-পরিসরে স্থান দিয়েছে। একটা আর্কাইভাল ভ্যালু আছে তাঁর কাজের।

বস্তুত ইতিহাস পুনরুদ্ধারের আকুতি থেকেই নির্মাণ করা হয়েছে ্লশিলালিপিশ্। বলা চলে ্লশিলালিপিশ্ হচ্ছে ্লমুক্তিযুদ্ধের সমাজতত্ত্বশ্। ব্যক্তির চেতনাপ্রবাহ, স্মৃতিকণা, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনিক প্রত্র্কিয়া, চরিত্রসমূহের ট্রমাটিক সিচ্যুয়েশন – সবকিছুর উপস্থিতি ্লশিলালিপিশ্-তে প্রবল। আহত মানুষ শামীমের সকল কাজের বিষয়। এই মানুষ শুধু নারী নয়, পুরুষও। আবার এক পর্যায়ে নারী ও পুরুষ উভয়কে টপকে শামীম ঢুকে যান সমাজের কন্দরে। আমার মতে, শামীমকে যতই বাইরে থেকে ্লনারীবাদীশ্ বলে মনে হোক না কেন, যতই একজন শিল্পী নিজেকে নারীবাদী বলে ঘোষণা করুক না কেন, ্লমানুষশ্ নিয়ে কাজ করতে গেলে তা একসময়ে একটি সামাজিক প্রশ্ন হিসেবেই তাঁর শিল্পকর্মে আবির্ভূত হবে। সেদিন ্লক্যাফে ম্যাঙ্গোশ্তে আমরা আলোচনা শেষ করেছিলাম এই ঐকমত্যে যে, শামীমের ভুবনদৃষ্টিতে পশ্চিমা নারীবাদের পরিশীলিত পরিমিত মার্ক্সীয় ধারার প্রতি আনুগত্য আছে বলেই তাঁর সব কাজেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ ও তাদের আহত হবার কারণগুলো উঠে আসে। আমরা নিশ্চিত যে শামীম আখতারের পরের কাজগুলোতেও তা আসবে। ক্ষ

গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। এখানে শামীম চেতনাপ্রবাহকে ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে দারুণ কাব্যময়তায়।

সংলাপ হচ্ছে আরেকটি উপাদান যা দিয়ে ্লইতিহাসকন্যাশ্-য় চেতনাপ্রবাহকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, স্মৃতি-বিস্মৃতিকে মূর্ত করা হয়েছে, বেশকিছু দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। লালারুখ জানতে চায় অনন্যার কাছে: আমরা যে স্কুলে পড়তাম সেটা ছিল ওল্ড টাউনে আগে, পরে মোহাম্মদপুর…সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স কনভেন্ট, আছে স্কুলটা? কয়েকটি দৃশ্যের পর আমরা দেখি অনন্যা আর লালারুখ পুরনো স্কুলে, সিস্টারের সঙ্গে তাদের দেখা হয়, সিস্টার তার সংলাপে পিছনে ফিরে যায় মানে একাত্তরের স্মৃতিতে এবং জানায় যে, কলকাতা থেকে বাহাত্তরে মাদার তেরেসা যুদ্ধ-শিশুদের জন্য একটা হোম করেছিলেন, প্রচুর মেয়ে এখানে বাচ্চা প্রসব করে এবং এই দেব-শিশুদের অনেককেই বিদেশের বিভিন্ন সংস্থা নিয়ে যায়। এইভাবে স্মৃতিতে ফিরে গিয়ে সিস্টারও তার চেতনাপ্রবাহের মধ্যেই পুনর্র্নিমাণ করে সেই সময়কে।

লালারুখের চেতনাপ্রবাহ কাজ করে অন্যস্তরে। সে স্কুলের চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে ছোট্টবেলার কথা, শামীম আমাদের দেখায় ছোট লালারুখ আর মনিকা লুকোচুরি খেলছে স্কুল চত্বরে। লালারুখের সংলাপে তার অতীতের স্মৃতি ফিরে এসেছে। নানার সংলাপ তো পুরোপুরিভাবেই তাঁর চেতনাপ্রবাহের প্রতিরূপ। স্মৃতি নিয়েই বেঁচে আছেন তিনি। তাঁর মেয়ের ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যা করার দৃশ্য তিনি কিভাবে ভোলেন? তাঁর সংলাপে সেই দৃশ্য মূর্ত হয়ে ওঠে। তাঁর চেতনায় স্থিত ১৯৪২-এর আগস্ট মুভমেন্টের কথা, দেশভাগের কথা, পাকিস্তান হবার কথা, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কথা, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের কথা – সব তাঁর সংলাপে প্রকাশ পায়। তাঁর সংলাপেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার মূল দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের অত্যাচার কী মাত্রায় ২৪ বছর ধরে চলছিল, তা বের হয়ে আসে নানার সংলাপে। আমরা বুঝতে পারি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামের দুটি দেশ এই অঞ্চলে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে প্রকাশ পায় বটে, কিন্ত্ত পাকিস্তানের পূর্বাংশ পশ্চিম অংশের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ হিসেবে পরিগণিত হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তি-সংগ্রামের মাধ্যমে এই উপনিবেশ লুপ্ত হয়, জন্ম হয় বাংলাদেশের। কিন্ত্ত কিছুদিন যেতে-না-যেতেই আবার পাকিস্তানের ভূত চেপে বসে এই দেশের অনেকের মধ্যেই। নানা তাই বলেন: চারিদিকে পাকিস্তানি মনোভাবের ছড়াছড়ি দেখছি। কত বছর ধরে, আমার এই বকাঝকা, প্রলাপ…আত্মীয়-স্বজনরা পর্যন্ত ভয়ে কাছে আসে না। নানা নব্বই দশকের শেষ প্রান্তে এসে এইসব বলছেন আর স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন লাঠিতে ভর দিয়ে।

মূলত সংলাপ ও পালটা সংলাপের ভেতর দিয়েই ্লইতিহাসকন্যাশ্র দ্বন্দ্বগুলো প্রকাশিত হয়। লালারুখের আগমনের শুরু থেকেই নানার সাথে লালারুখের একটা দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। এটা আসলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বন্দ্বের একটা রূপ। মনিকা আর লালারুখের মধ্যেও ভাবাদর্শগত দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটে, বিশেষ করে যখন লালারুখ পাকিস্তানের কাঠামো থেকে বের হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়াটাকে সেপারেশন হওয়া মনে করে। কিন্ত্ত মনিকা তখন বলে: তোমাদের কাছে যা সেপারেশন, আমাদের কাছে তা লিবারেশন, স্বাধীনতা।

কিন্ত্ত এই স্বাধীনতার স্বরূপ নব্বই দশকের শেষে এসে কী অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, তা নিয়েই শামীম বেশি ভাবিত। এই সময়ে স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজনৈতিকভাবে সত্র্কিয় হয়ে ওঠে। লালারুখ যখন জানতে চায়: মুক্তিযুদ্ধ হলো কিন্ত্ত পাকিস্তানের জন্য সফটনেস…এটা কী করে হয়? মনিকা জানায়: শেখ মুজিবের হত্যার পরে সোশ্যালিস্ট চেতনাকে ধ্বংস করে আমেরিকান লবি চেপে বসে। আমেরিকান লবি মানেই হচ্ছে পাকিস্তানের ফিরে-আসা। মনিকার সংলাপ থেকে বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার মধ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রধান দ্বন্দ্বের স্বরূপটি পরিষ্কার হয়। চিৎ হয় এই তর্ক: দেশটি ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র হবে, না ধর্মভিত্তিক? মনিকা এরপর যা বলে তা সবাইকে জানানোর জন্যই যেন শামীম এই ্লইতিহাসকন্যাশ্ তৈরি করে। মনিকার কথাগুলোই যেন শামীমের কথা। তবে কি মনিকাই শামীম? মনিকার চেতনাপ্রবাহই শামীমের চেতনাপ্রবাহ। মনিকা বলে: স্বাধীনতার পরে মধ্যবিত্ত আর এলিটরা ভাবল তারা সব পেয়ে যাবে। শেখ মুজিবের হত্যার ফলে এই নতুন শ্রেণিটাই লাভবান হলো। ফুলে ফেঁপে উঠল। নতুন একটা শ্রেণি, নতুন টাকা। এই নতুন এডুকেটেড জ্ঞানপাপী শ্রেণিটাই হলো সমস্যা, যারা জেনেও জানে না…এই শ্রেণিটা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝে না। পাকিস্তান যে এত বড় একটা অপরাধ করে গেল, সেটা তারা ভুলে যেতে চায়। এরা পাকিস্তানিদের চাইতেও বেশি পাকিস্তানি।

শামীম ্লইতিহাসকন্যাশ্র মাধ্যমে এই ভুলতে-বসা স্মৃতিকে তুলে ধরেছে। তাই তার প্রোটাগনিস্ট চরিত্ররা ওর্যাল হিস্ট্রি সংগ্রহ করে, লালারুখকে সাহায্য করে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাস্তবে পূর্ব বাংলায় কী করেছিল, তা জানতে। ্লইতিহাসকন্যাশ্ এইভাবে একটা নথিচিত্রগত মূল্য অর্জন করে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মাধ্যমে যা করতে চেয়েছিলেন, শামীম আখতার ্লইতিহাসকন্যাশ্র মাধ্যমে সেই একই কাজ করতে চেয়েছেন। শামীম এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করে পাকিস্তানিদের যুদ্ধাপরাধকে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন।

আর এই কাজে নারী-চরিত্ররা সরব, সত্র্কিয়। ্লইতিহাসকন্যাশ্র প্রায় সব নারী-চরিত্রই প্রো-অ্যাকটিভ। চিত্রনাট্যে তাদের প্রাধান্য বেশি, যদিও নানার চরিত্রটি বলিষ্ঠ একটা অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্ত্ত কাহিনীকে ডমিনেট করে নারী-চরিত্রগুলোই। নারী-চরিত্রগুলো ভীষণ স্বাবলম্বী ও আত্মবিশ্বাসী। শামীম আখতার নারীবাদী বলেই কি তাঁর সৃষ্ট নারী চরিত্রগুলো কাহিনী-পরিসরে এমন দেদীপ্যমান? এ-প্রসঙ্গে ওয়াহিদুল হকের ভাষ্য: শামীমের ব্যথা-যন্ত্রণা কেবল নারী হবার নয়, মানুষ হবার, কেবল মুসলমান হবার নয়, হিন্দু হবার। মানুষ হবার অন্তহীন চেষ্টার কারণে মানুষের ব্যথায় ব্যথী হবার কারণে তাঁর বোধগুলো প্রখর হয়, চলে যায় ইতিহাসে, সমাজে, তাঁর প্রত্যক্ষ বাস্তবে, যা তাঁকে হানে বেশি…(সুন্দরম : হেমন্ত সংখ্যা, ১৪০৬)।

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতির আলোকে এবং ্লইতিহাসকন্যাশ্র সার্বিক অনুধাবনে বুঝতে পারি যে, এই চলচ্চিত্রে শুধু দুই লাখ ধর্ষিত নারীর প্রশ্নটিই বড় হয়ে সামনে আসেনি, এসেছে পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নটিও। আমরা জানি পাকিস্তান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি। যদিও লালারুখ যে নারী সংগঠনটির সাথে জড়িত বলে জানায় সেটি পশ্চিম পাকিস্তানের হয়ে বাংলাদেশের কাছে একাত্তরে তাদের সকল অপকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়েছে। শামীম চায় পাকিস্তান যাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চায়, একাত্তরের ঘাতক দালালদের যাতে বিচার হয়। তাঁকে এই যজ্ঞে ক্যাম্পেইনারের ভূমিকা নিতে হয়েছে। তাঁর ্লইতিহাসকন্যাশ্ বক্তব্যের দিক দিয়ে একটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্ত্ত নির্মাণশৈলীর নিরিখে বিচার করতে গেলে বেশ কিছু দুর্বলতা পীড়া দেয়, যা ্লসেশ্-তে ছিল না। ্লসেশ্-তে যে পরিমিত বোধের পরিচয় পাওয়া যায়, তা ্লইতিহাসকন্যাশ্য় উধাও। সম্ভবত নথিচিত্রগত চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে শামীম ঐতিহাসিক উপাদানের ওপর বেশি জোর দিয়ে ফেলেছেন। তাই সেই সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে এমন সব গান বারবার সাউন্ড ট্র্যাকে বাজতে শুনি, যা কিছু কিছু দৃশ্যের গভীরতা ক্ষুণ্ন করে, চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে বাধ সাধে। সব কথা খুলে বলা, সবকিছু দেখিয়ে দেওয়া সম্ভবত শিল্পের জন্যে ক্ষতিকর। অনন্যার সত্য জানার পর শেষ করলে দর্শক হিসেবে একটা অজানা দিক নিয়ে ভাবা যেত, ঘরে ফিরতে ফিরতে। অথচ অনন্যার মাথায় নানার হাত রাখতে গিয়েও না-রাখা, মানস ও মনিকার অনন্যাকে নিয়ে পার্কে বসে ভাবা, মনিকার দিগন্তে যাত্রা, অনন্যার চিঠি পাঠ, লালারুখের পত্র আসা ও কিছুটা পড়ে শোনানো – আগেই বলা হয়েছে এতে কাহিনীর গভীরতা হারিয়ে গেছে। এটা চিত্রনাট্যগত দুর্বলতা। এই দুর্বলতা শামীম তাঁর পরবর্তী কাজ ্লশিলালিপিশ্তে অনেকটা কাটিয়ে উঠেছেন।

শিলালিপি

্লশিলালিপিশ্ তৈরি করার পূর্বে শামীম ১৯৯৪ সালে ্লগ্রহণকালশ্ নামে ফতোয়াবিরোধী একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে। মকবুল চৌধুরী, শাহীন আখতার ও শামীম আখতার – এই তিনজন মিলে প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করেন। বাংলাদেশে তখন গ্রামে-গঞ্জে ফতোয়া জারি করার হিড়িক পড়ে এবং এর ফলে অনেক নিরীহ নারী ফতোয়ার স্বীকার হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত বরণ করে। ্লগ্রহণকালশ্ ১৯৯৫ সালে শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কারও পায়। বিটা ফরম্যাটে তৈরি এই প্রামাণ্যচিত্রে সমাজ-সংসারে নারীর অধস্তন হয়ে থাকার পেছনে যে মুসলিম মৌলবাদ দায়ী, সেই সত্যটি তুলে ধরা হয়। শামীমের সব কাজেই নারীর মুক্তির প্রসঙ্গটি এসে যায়।

্লশিলালিপিশ্তেও আমরা একজন নারীর একাকী সংগ্রাম করে যাওয়ার সত্যিকার কাহিনী দেখতে পাই। ১০০ মিনিটের এই কাহিনীচিত্রটি বিটা ফরম্যাটে তৈরি। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধে এদেশে নারীদের অবদানকে তুলে ধরতে নির্মিত হয়েছে এই চলচ্চিত্রটি। এটি প্রযোজনা করেছে প্রশিকা-র অঙ্গসংগঠন ্লউন্নয়ন সহায়ক যোগাযোগ কর্মসূচি ট্রাস্টশ্। ট্রাস্টের উদ্দেশ্য মহৎ, শুধু অর্থ দেওয়া নয়, দেশ ও দেশের মানুষের ইতিহাস তুলে ধরবে বলেই ্লশিলালিপিশ্কে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ্লশিলালিপিশ্ শহীদ সেলিনা পারভীন সম্পাদিত পত্রিকার নাম। এই পত্রিকার বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে তিনি স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ, অর্থ, খাবার দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। নিভৃতচারী এই নারী বাংলাদেশের স্বাধীনতার আয়োজনে উচ্চকিত ষাটের দশকে রেখে গেছেন অবদান। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা-সংগ্রামের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করা এবং স্বাধীনতা-সংগ্রামের সময় কাজ করে যাওয়ার দায়ে তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ। ১৪ ডিসেম্বর রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি আর্মি ও এদেশীয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন তিনি। ্লশিলালিপিশ্ শহীদ সেলিনা পারভীনের হুবহু আলেখ্য নয়। এ চলচ্চিত্রে তাঁর ছায়া উপস্থিতি কখনো তাঁর, কখনো সে-সময়কালের প্রেক্ষাপটে হয়েওঠা প্রতিবাদী নারীর।

২০০১ সালে শুরু করা এই চলচ্চিত্রটি ২০০২-এ প্রথম প্রদর্শিত হয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার সপ্তাহ দুয়েক আগে তড়িঘড়ি করে প্রিমিয়ার শোর আয়োজন করা হয়। কে জানে যদি পরে ছাড়পত্র না পাওয়া যায়! প্রথমবার প্রিমিয়ার শোতে খসরু ভাই, সাখাওয়াত ভাইসহ দেখি। দ্বিতীয়বার শামীমের বাসায়। প্রথমবার দেখার পর খুব স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিলাম। আমি আর সাখাওয়াত ভাই কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে, শামীমকেও কিছু না বলে, রাস্তায় নেমে আসি। একটা রিকশা নিয়ে সাখাওয়াত ভাই ধানমন্ডির দিকে যেতে বললেন। সাখাওয়াত ভাইয়ের মন ইদানীং নিম ফলের মতো তিতা থাকে সারাক্ষণ। আমি তাঁকে সঙ্গ দেই মাঝে মধ্যে, তাঁর সন্তান ও সন্তানের মা তাঁর সঙ্গে থাকছে না বলে তাঁর ঘর এলোমেলো, নাওয়া-খাওয়ারও ঠিক নেই। আমার মন কেমন করে তাঁর জন্য। আজো রিকশায় তিনি চুপ করে আছেন। এরকম ঘরভাঙা মানুষ দেখলে, নারী বা পুরুষ যেই হোক, আমার মন কেমন করে। একে তো এরকম একজন ঘরভাঙা মানুষের পাশে বসে আছি, তার ওপর সদ্য দেখা শামীমের ্লশিলালিপিশ্র চাপ – দুয়ে মিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিলাম।

মুখ খুললাম: শুরুতে সেলিনা পারভীনের ছেলের (চৌধুরী সুমন জাহিদ) কথাগুলোর আদৌ কোনো দরকার ছিল না। একটা কাহিনীচিত্রের শুরুর ফ্রেম থেকে শেষ ফ্রেম পর্যন্ত চলচ্চিত্র-সৃষ্টি প্রত্র্কিয়ার অংশ। শুরুতেই তাই একটু যেন ধাক্কা লাগে, তাঁর মহিয়সী শহীদ মা-কে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার অবশ্যই আছে। তবে তা হতে পারত আউট অব দ্য স্ক্রিন। চলচ্চিত্রটির ভেতরে ওরকম একটি দৃশ্য শুরুতেই জুড়ে দেওয়াতে চলচ্চিত্রীয় গুণ ক্ষুণ্ন হয় বৈকি। সাখাওয়াত ভাই কিছুই বলছেন না। আবার বলি: শামীম নিজের মতো করে ইতিহাসে ঢুকেছে, সেলিনা পারভীনের জীবনচর্চাকে (চলচ্চিত্রে চরিত্রটির নাম নাসরিন) কেন্দ্রে রেখে শামীম ঐ সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রবেশ করে তার একটা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়েছে। সাখাওয়াত ভাই বললেন: ১৯৭১-এর আগের কাহিনী ্লশিলালিপিশ্। ্লইতিহাসকন্যাশ্য় আমরা একাত্তর পেয়েছি। শামীম একটু পেছনে ফিরে নিজের দেশের ইতিহাসটা পুনর্র্নিমাণ করতে চেয়েছেন। তাঁর কাজকে গুরুত্ব দিতেই হবে। বললাম: অবশ্যই, ্লইতিহাসকন্যাশ্ও আমরা একসঙ্গে দেখেছি। তাঁর কাজ আমাদের ভাবায়।

রিকশা সাইন্স ল্যাবরেটরির মোড়ে এলে সাখাওয়াত ভাই রিকশাচালককে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের দিকে যেতে বললেন। একটু অবাক হলাম, আমি আর সাখাওয়াত ভাই আবাহনী মাঠের উলটোদিকে থাকি, ঐদিকে না গিয়ে ৩২ নম্বর কেন? তিনি বললেন: চলেন আপনাকে কফি খাওয়াব। বুঝলাম তিনি নিজের জীবনের জটিলতা ছেড়ে সদ্য দেখা ্লশিলালিপিশ্ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী। ৩১ নম্বরের মাথায় একটা কফিশপে নেমে পড়ি, অল্প আলোয় মুখোমুখি বসে পড়ি। কফি আর গরম লেমন কেকের অর্ডার দেন সাখাওয়াত ভাই। মুখোমুখি আমরা, আমাদের সামনে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, এই পটভূমির একটা ক্ষুদ্র অংশের ইতিহাস নিয়েই নির্মিত ্লশিলালিপিশ্। সাখাওয়াত ভাই কথা শুরু করলেন: ্লশিলালিপিশ্র ইতিহাস মধ্যবিত্তের চোখে দেখা ইতিহাস, শ্রেণির একটা প্রভাব আছে। বললাম: সব শ্রেণির কথা আনতে গেলে ঝুলে যেত না? বললেন: এই জন্যেই তো বললাম ্লশিলালিপিশ্ বুঝতে হলে শামীমের শ্রেণিদৃষ্টিকোণটা প্রথমে বুঝতে হবে। সাখাওয়াত ভাইয়ের কথায় কখনোই কোনো মেদ খুঁজে পাইনি। যা বলেন টু দ্য পয়েন্ট। হয়তো অল্প বয়স থেকে গ্রামসী নিয়ে আছেন বলে তাঁর চিন্তা-ভাবনা এমন পরিপক্ব। ্লশিলালিপিশ্তে শামীম আগের কাজটির মতোই স্থাপনাকর্ম, পুরনো দৈনিক পত্রিকা, ঐ সময়কার স্লোগান, পুরনো ফটোগ্রাফ, ওই সময়ের গণসংগীত ও সিনেমার গান, সাক্ষাৎকার ইত্যাদি ব্যবহার করেছে। এবং এই চলচ্চিত্রটিও ভীষণভাবে চেতনাপ্রবাহরীতিতে তৈরি। এর কাহিনী-কাঠামোর সংক্ষিপ্ত বয়ানে তার প্রমাণ মিলবে।

সুবর্ণ, সেলিনা পারভীন তথা নাসরীনের ছেলে। সে ও তার বন্ধু সামিনা মিলে ্লদ্য ওয়ার উই ফরগেটশ্ শিরোনামের একটি স্থিরচিত্রের প্রদর্শনী দেখছে। যুদ্ধের দৃশ্য-সংবলিত চিত্র দেখতে দেখতে সুবর্ণর তার মায়ের কথা মনে পড়ে। সুবর্ণর চেতনায় তাঁর মায়ের স্মৃতি ধরা আছে, তার ভাবনার অনুষঙ্গ হিসেবে ফ্ল্যাশব্যাকে তার মায়ের কথা, দীপা মাসীমা, অমল কাকু, অলক কাকু – যারা তাদের প্রতিবেশী ছিল, আসাদ দাদু – যিনি তার মা-কে আশ্রয় দিয়েছিলেন, মন্টু মামা ও আরো কিছু চরিত্রের কথা আমরা জানতে পারি। ্লশিলালিপিশ্ বস্তুত সুবর্ণর চেতনাপ্রবাহের ওপর ভর করে এগিয়ে চলে। সামিনার সাথে কথপোকথনের সময় সুবর্ণর চেতনার সঙ্গী হয়ে আমরাও সেই ১৯৭১-এর পটভূমিতেই ফিরে যাই।

সুবর্ণ এই চলচ্চিত্রের প্রধান কথক, তার কথকতা ও স্মৃতিতে ভ্রমণের মধ্য দিয়েই কাহিনীর বেশির ভাগ উন্মোচিত হয়। সে যখন রেজা সাহেবের কাছে তার মা সম্পর্কে জানতে যায়, তখন রেজা সাহেবের চেতনাপ্রবাহের পথ ধরে আমরা কাহিনীর আরো কিছু অংশের সাথে পরিচিত হই। সুবর্ণর মা আবার যখন সুবর্ণ বা রেজা সাহেবের স্মৃতির পথ ধরে হাজির হয়, তখন তিনিও আবার প্রতিবেশী রাহেলার কাছে নিজের কমিউনিস্ট পার্টি করা স্বামীর কথা বলেন, আমরা ফ্ল্যাশব্যাকে স্বামীর সঙ্গে তাকে দেখতে পাই। চলচ্চিত্রের ভাষায় একে জ্যাম্প কাট ইনটু দ্য ফ্ল্যাশব্যাক বলে। মা-র চেতনাপ্রবাহ এইভাবে কাহিনীর বাকি অংশ তুলে ধরে। শামীম স্মৃতি ও বাস্তবের বুনন এমনভাবে চিত্রনাট্যে ঘটিয়েছেন যে তা কাহিনী-প্রবাহে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। সুবর্ণ ও তার মা এবং রেজা সাহেবের চেতনাপ্রবাহের সাথে ভ্রমণ করে আমরা যেমন শহীদ সেলিনা পারভীনের জীবনসংগ্রামের নানামুখী বয়ান পাই, তেমনি ওই সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষের প্রেক্ষাপট, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিযুক্ত হয়ে আলাদা জাতি-রাষ্ট্র অজর্নের সংগ্রামের নানা প্রসঙ্গ সম্পর্কে জানতে পারি। ্লশিলালিপিশ্ প্রকৃতপ্রস্তাবে একটা টাইম ক্যাপসুলধর্মী চলচ্চিত্র। সেই সময়কে প্রতিষ্ঠিত করে এমন সব স্লোগান, গান, পত্রিকার হেডলাইন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে চলচ্চিত্রটিতে।

সুবর্ণ এখনো শুনতে পায় সেই সব স্লোগান: জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো; এক কথা এক দাবি, ভুট্টো তুই কবে যাবি; ভুট্টোর মুখে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো ইত্যাদি। আরো শুনতে পায়: ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে গান। সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের সময় বেয়ে ১৩ ডিসেম্বরে এসে শেষ হয় সুবর্ণ ও রেজা সাহেবের স্মৃতিপ্রবাহ। ১৩ ডিসেম্বরই সুবর্ণর সামনেই তার মা-কে রাজাকাররা ধরে নিয়ে যায়। নির্বাচনের সময় ও পরের পরিস্থিতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে শামীম ব্যবহার করেন ওই সময়কার বাংলা-ইংরেজি দৈনিকের হেডলাইন: বাংলার স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দিন; খয়মভথ ঊয়ঢ়য়ক্ষন ঙক্ষভলন খভশভড়ঢ়নক্ষ ইত্যাদি। কিন্ত্ত মুজিব প্রধানমন্ত্রী হননি, শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। রেজা সাহেব সুবর্ণর মা-কে মুক্তিযুদ্ধে নিয়ে যেতে চান, কিন্ত্ত তিনি যেতে রাজি হননি। আসাদ মামাও তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান, যাননি তিনি। বলেন: না মামা, আমার এখানে অনেক দায়িত্ব। ছেলেরা আসবে…আমাকে না পেয়ে আবার কোথায় খুঁজবে? মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র তিনি নিজের কাছে রাখতেন। অর্থ ও খাবার দিতেন, তাই তিনি বাড়ি ছাড়তে চাননি। আসাদ মামা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তখন বলেন: রাজনৈতিক জাগরণ সহজ, মেরে কেটে আদায় করতে শেখা। কিন্ত্ত যখন স্বাধীন হবে তখন ওই আবেগটাকে বশ করতে হবে। তার জন্য দরকার গভীর চেতনা, দেশপ্রেম, কষ্ট করার ক্ষমতা – সেটা গড়ে উঠলে হয়। সেটা কালে কালে গড়ে ওঠার ব্যাপার। সেই ধৈর্য বাঙালির আছে তো?

সুবর্ণ ও সামিনা রেজা সাহেবের কাছে গিয়েছিল একটা লেখা আদায়ের জন্য যাতে সুবর্ণর মা-র অজানা কথা থাকবে। প্রকৃতপক্ষে শামীমই এইসব অজানা তথ্য সবাইকে জানাতে চেয়েছে ্লশিলালিপিশ্র মাধ্যমে। এবং ্লশিলালিপিশ্ স্মৃতি-বিস্মৃতির পুনর্র্নিমাণ হলেও চলচ্চিত্রটি হতাশার দিকটিকে বড় করে দেখাতে চায়নি। তাই সুবর্ণ ও সামিনা, যারা নতুন প্রজন্মের অগ্রপথিক তারা তাদের সংকলনের জন্য রেজা সাহেবকে লেখার তাগিদ দিতে ভোলে না। শামীম চায় সবকিছু নথিভুক্ত হোক, যাতে যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল তাদের বিচার করা যায়। আজ যখন রাজাকার-আলবদরদের হত্যাযজ্ঞের বিচার চেয়ে বিভিন্ন সময় রুজু করা মামলার নথিপত্র সরকারি সংস্থাসমূহ থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে, পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে – তখন শামীমের ্লশিলালিপিশ্ আমাদেরকেও দাঁড় করিয়ে দেয় বাংলাদেশ নামের একটা খোলা উঠোনে, যে-উঠোনে আজ নৃত্যরত একাত্তরের পরাজিত পক্ষ!!!

সুবর্ণ ও সামিনার মতো আমাদেরও আজ রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়ানো প্রয়োজন। এই স্থাপনা আমাদের কাতর করে বটে, কিন্ত্ত আবার যাতে এই ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করার প্রয়োজন এই বাংলায় না দেখা দেয়, তার জন্যে কাজ করার অনুপ্রেরণাও দেয়। যে-প্রশ্ন এই বধ্যভূমিতে প্রজন্ম শ্৭১ কর্তৃক স্থাপিত শিলালিপিতে খোদিত: তোমরা যা বলেছিলে, বলছে কি তা বাংলাদেশ? তার উত্তর খোঁজা আজকের বাংলাদেশের উঠোনে জরুরি। এই জরুরি কাজে শামীম আখতার একজন সত্যিকারের ক্যাম্পেইনার।

সাখাওয়াত ভাই কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলেন: শামীমের ্লইতিহাসকন্যাশ্ ও ্লশিলালিপিশ্-দুটো কাজেরই উপস্থাপনার ঢংটা স্মৃতিকাতরতায় ভরা, স্মৃতিমেধের জায়গা থেকেই কাজগুলো          এসেছে। বললাম: শুধু স্মৃতিরোমন্থন করাই কি শামীমের উদ্দেশ্য? বললেন: না, তা কেন! ্লশিলালিপিশ্-তে ব্যক্তি পর্যায়ের স্মৃতি নিয়ে কাজ করলেও         শামীম ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে গিয়ে রাষ্ট্রের গড়ে-ওঠার ইতিহাসকেও তাঁর চলচ্চিত্র-পরিসরে স্থান দিয়েছে। একটা আর্কাইভাল ভ্যালু আছে তাঁর কাজের।

বস্তুত ইতিহাস পুনরুদ্ধারের আকুতি থেকেই নির্মাণ করা হয়েছে ্লশিলালিপিশ্। বলা চলে ্লশিলালিপিশ্ হচ্ছে ্লমুক্তিযুদ্ধের সমাজতত্ত্বশ্। ব্যক্তির চেতনাপ্রবাহ, স্মৃতিকণা, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনিক প্রত্র্কিয়া, চরিত্রসমূহের ট্রমাটিক সিচ্যুয়েশন – সবকিছুর উপস্থিতি ্লশিলালিপিশ্-তে প্রবল। আহত মানুষ শামীমের সকল কাজের বিষয়। এই মানুষ শুধু নারী নয়, পুরুষও। আবার এক পর্যায়ে নারী ও পুরুষ উভয়কে টপকে শামীম ঢুকে যান সমাজের কন্দরে। আমার মতে, শামীমকে যতই বাইরে থেকে ্লনারীবাদীশ্ বলে মনে হোক না কেন, যতই একজন শিল্পী নিজেকে নারীবাদী বলে ঘোষণা করুক না কেন, ্লমানুষশ্ নিয়ে কাজ করতে গেলে তা একসময়ে একটি সামাজিক প্রশ্ন হিসেবেই তাঁর শিল্পকর্মে আবির্ভূত হবে। সেদিন ্লক্যাফে ম্যাঙ্গোশ্তে আমরা আলোচনা শেষ করেছিলাম এই ঐকমত্যে যে, শামীমের ভুবনদৃষ্টিতে পশ্চিমা নারীবাদের পরিশীলিত পরিমিত মার্ক্সীয় ধারার প্রতি আনুগত্য আছে বলেই তাঁর সব কাজেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ ও তাদের আহত হবার কারণগুলো উঠে আসে। আমরা নিশ্চিত যে শামীম আখতারের পরের কাজগুলোতেও তা আসবে। ক্ষআসেনি, এসেছে পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নটিও। আমরা জানি পাকিস্তান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি। যদিও লালারুখ যে নারী সংগঠনটির সাথে জড়িত বলে জানায় সেটি পশ্চিম পাকিস্তানের হয়ে বাংলাদেশের কাছে একাত্তরে তাদের সকল অপকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়েছে। শামীম চায় পাকিস্তান যাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চায়, একাত্তরের ঘাতক দালালদের যাতে বিচার হয়। তাঁকে এই যজ্ঞে ক্যাম্পেইনারের ভূমিকা নিতে হয়েছে। তাঁর ্লইতিহাসকন্যাশ্ বক্তব্যের দিক দিয়ে একটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্ত্ত নির্মাণশৈলীর নিরিখে বিচার করতে গেলে বেশ কিছু দুর্বলতা পীড়া দেয়, যা ্লসেশ্-তে ছিল না। ্লসেশ্-তে যে পরিমিত বোধের পরিচয় পাওয়া যায়, তা ্লইতিহাসকন্যাশ্য় উধাও। সম্ভবত নথিচিত্রগত চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে শামীম ঐতিহাসিক উপাদানের ওপর বেশি জোর দিয়ে ফেলেছেন। তাই সেই সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে এমন সব গান বারবার সাউন্ড ট্র্যাকে বাজতে শুনি, যা কিছু কিছু দৃশ্যের গভীরতা ক্ষুণ্ন করে, চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে বাধ সাধে। সব কথা খুলে বলা, সবকিছু দেখিয়ে দেওয়া সম্ভবত শিল্পের জন্যে ক্ষতিকর। অনন্যার সত্য জানার পর শেষ করলে দর্শক হিসেবে একটা অজানা দিক নিয়ে ভাবা যেত, ঘরে ফিরতে ফিরতে। অথচ অনন্যার মাথায় নানার হাত রাখতে গিয়েও না-রাখা, মানস ও মনিকার অনন্যাকে নিয়ে পার্কে বসে ভাবা, মনিকার দিগন্তে যাত্রা, অনন্যার চিঠি পাঠ, লালারুখের পত্র আসা ও কিছুটা পড়ে শোনানো – আগেই বলা হয়েছে এতে কাহিনীর গভীরতা হারিয়ে গেছে। এটা চিত্রনাট্যগত দুর্বলতা। এই দুর্বলতা শামীম তাঁর পরবর্তী কাজ ্লশিলালিপিশ্তে অনেকটা কাটিয়ে উঠেছেন।

শিলালিপি

্লশিলালিপিশ্ তৈরি করার পূর্বে শামীম ১৯৯৪ সালে ্লগ্রহণকালশ্ নামে ফতোয়াবিরোধী একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে। মকবুল চৌধুরী, শাহীন আখতার ও শামীম আখতার – এই তিনজন মিলে প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করেন। বাংলাদেশে তখন গ্রামে-গঞ্জে ফতোয়া জারি করার হিড়িক পড়ে এবং এর ফলে অনেক নিরীহ নারী ফতোয়ার স্বীকার হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত বরণ করে। ্লগ্রহণকালশ্ ১৯৯৫ সালে শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কারও পায়। বিটা ফরম্যাটে তৈরি এই প্রামাণ্যচিত্রে সমাজ-সংসারে নারীর অধস্তন হয়ে থাকার পেছনে যে মুসলিম মৌলবাদ দায়ী, সেই সত্যটি তুলে ধরা হয়। শামীমের সব কাজেই নারীর মুক্তির প্রসঙ্গটি এসে যায়।

্লশিলালিপিশ্তেও আমরা একজন নারীর একাকী সংগ্রাম করে যাওয়ার সত্যিকার কাহিনী দেখতে পাই। ১০০ মিনিটের এই কাহিনীচিত্রটি বিটা ফরম্যাটে তৈরি। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধে এদেশে নারীদের অবদানকে তুলে ধরতে নির্মিত হয়েছে এই চলচ্চিত্রটি। এটি প্রযোজনা করেছে প্রশিকা-র অঙ্গসংগঠন ্লউন্নয়ন সহায়ক যোগাযোগ কর্মসূচি ট্রাস্টশ্। ট্রাস্টের উদ্দেশ্য মহৎ, শুধু অর্থ দেওয়া নয়, দেশ ও দেশের মানুষের ইতিহাস তুলে ধরবে বলেই ্লশিলালিপিশ্কে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ্লশিলালিপিশ্ শহীদ সেলিনা পারভীন সম্পাদিত পত্রিকার নাম। এই পত্রিকার বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে তিনি স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ, অর্থ, খাবার দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। নিভৃতচারী এই নারী বাংলাদেশের স্বাধীনতার আয়োজনে উচ্চকিত ষাটের দশকে রেখে গেছেন অবদান। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা-সংগ্রামের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করা এবং স্বাধীনতা-সংগ্রামের সময় কাজ করে যাওয়ার দায়ে তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ। ১৪ ডিসেম্বর রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি আর্মি ও এদেশীয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন তিনি। ্লশিলালিপিশ্ শহীদ সেলিনা পারভীনের হুবহু আলেখ্য নয়। এ চলচ্চিত্রে তাঁর ছায়া উপস্থিতি কখনো তাঁর, কখনো সে-সময়কালের প্রেক্ষাপটে হয়েওঠা প্রতিবাদী নারীর।

২০০১ সালে শুরু করা এই চলচ্চিত্রটি ২০০২-এ প্রথম প্রদর্শিত হয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার সপ্তাহ দুয়েক আগে তড়িঘড়ি করে প্রিমিয়ার শোর আয়োজন করা হয়। কে জানে যদি পরে ছাড়পত্র না পাওয়া যায়! প্রথমবার প্রিমিয়ার শোতে খসরু ভাই, সাখাওয়াত ভাইসহ দেখি। দ্বিতীয়বার শামীমের বাসায়। প্রথমবার দেখার পর খুব স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিলাম। আমি আর সাখাওয়াত ভাই কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে, শামীমকেও কিছু না বলে, রাস্তায় নেমে আসি। একটা রিকশা নিয়ে সাখাওয়াত ভাই ধানমন্ডির দিকে যেতে বললেন। সাখাওয়াত ভাইয়ের মন ইদানীং নিম ফলের মতো তিতা থাকে সারাক্ষণ। আমি তাঁকে সঙ্গ দেই মাঝে মধ্যে, তাঁর সন্তান ও সন্তানের মা তাঁর সঙ্গে থাকছে না বলে তাঁর ঘর এলোমেলো, নাওয়া-খাওয়ারও ঠিক নেই। আমার মন কেমন করে তাঁর জন্য। আজো রিকশায় তিনি চুপ করে আছেন। এরকম ঘরভাঙা মানুষ দেখলে, নারী বা পুরুষ যেই হোক, আমার মন কেমন করে। একে তো এরকম একজন ঘরভাঙা মানুষের পাশে বসে আছি, তার ওপর সদ্য দেখা শামীমের ্লশিলালিপিশ্র চাপ – দুয়ে মিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিলাম।

মুখ খুললাম: শুরুতে সেলিনা পারভীনের ছেলের (চৌধুরী সুমন জাহিদ) কথাগুলোর আদৌ কোনো দরকার ছিল না। একটা কাহিনীচিত্রের শুরুর ফ্রেম থেকে শেষ ফ্রেম পর্যন্ত চলচ্চিত্র-সৃষ্টি প্রত্র্কিয়ার অংশ। শুরুতেই তাই একটু যেন ধাক্কা লাগে, তাঁর মহিয়সী শহীদ মা-কে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার অবশ্যই আছে। তবে তা হতে পারত আউট অব দ্য স্ক্রিন। চলচ্চিত্রটির ভেতরে ওরকম একটি দৃশ্য শুরুতেই জুড়ে দেওয়াতে চলচ্চিত্রীয় গুণ ক্ষুণ্ন হয় বৈকি। সাখাওয়াত ভাই কিছুই বলছেন না। আবার বলি: শামীম নিজের মতো করে ইতিহাসে ঢুকেছে, সেলিনা পারভীনের জীবনচর্চাকে (চলচ্চিত্রে চরিত্রটির নাম নাসরিন) কেন্দ্রে রেখে শামীম ঐ সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রবেশ করে তার একটা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়েছে। সাখাওয়াত ভাই বললেন: ১৯৭১-এর আগের কাহিনী ্লশিলালিপিশ্। ্লইতিহাসকন্যাশ্য় আমরা একাত্তর পেয়েছি। শামীম একটু পেছনে ফিরে নিজের দেশের ইতিহাসটা পুনর্র্নিমাণ করতে চেয়েছেন। তাঁর কাজকে গুরুত্ব দিতেই হবে। বললাম: অবশ্যই, ্লইতিহাসকন্যাশ্ও আমরা একসঙ্গে দেখেছি। তাঁর কাজ আমাদের ভাবায়।

রিকশা সাইন্স ল্যাবরেটরির মোড়ে এলে সাখাওয়াত ভাই রিকশাচালককে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের দিকে যেতে বললেন। একটু অবাক হলাম, আমি আর সাখাওয়াত ভাই আবাহনী মাঠের উলটোদিকে থাকি, ঐদিকে না গিয়ে ৩২ নম্বর কেন? তিনি বললেন: চলেন আপনাকে কফি খাওয়াব। বুঝলাম তিনি নিজের জীবনের জটিলতা ছেড়ে সদ্য দেখা ্লশিলালিপিশ্ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী। ৩১ নম্বরের মাথায় একটা কফিশপে নেমে পড়ি, অল্প আলোয় মুখোমুখি বসে পড়ি। কফি আর গরম লেমন কেকের অর্ডার দেন সাখাওয়াত ভাই। মুখোমুখি আমরা, আমাদের সামনে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, এই পটভূমির একটা ক্ষুদ্র অংশের ইতিহাস নিয়েই নির্মিত ্লশিলালিপিশ্। সাখাওয়াত ভাই কথা শুরু করলেন: ্লশিলালিপিশ্র ইতিহাস মধ্যবিত্তের চোখে দেখা ইতিহাস, শ্রেণির একটা প্রভাব আছে। বললাম: সব শ্রেণির কথা আনতে গেলে ঝুলে যেত না? বললেন: এই জন্যেই তো বললাম ্লশিলালিপিশ্ বুঝতে হলে শামীমের শ্রেণিদৃষ্টিকোণটা প্রথমে বুঝতে হবে। সাখাওয়াত ভাইয়ের কথায় কখনোই কোনো মেদ খুঁজে পাইনি। যা বলেন টু দ্য পয়েন্ট। হয়তো অল্প বয়স থেকে গ্রামসী নিয়ে আছেন বলে তাঁর চিন্তা-ভাবনা এমন পরিপক্ব। ্লশিলালিপিশ্তে শামীম আগের কাজটির মতোই স্থাপনাকর্ম, পুরনো দৈনিক পত্রিকা, ঐ সময়কার স্লোগান, পুরনো ফটোগ্রাফ, ওই সময়ের গণসংগীত ও সিনেমার গান, সাক্ষাৎকার ইত্যাদি ব্যবহার করেছে। এবং এই চলচ্চিত্রটিও ভীষণভাবে চেতনাপ্রবাহরীতিতে তৈরি। এর কাহিনী-কাঠামোর সংক্ষিপ্ত বয়ানে তার প্রমাণ মিলবে।

সুবর্ণ, সেলিনা পারভীন তথা নাসরীনের ছেলে। সে ও তার বন্ধু সামিনা মিলে ্লদ্য ওয়ার উই ফরগেটশ্ শিরোনামের একটি স্থিরচিত্রের প্রদর্শনী দেখছে। যুদ্ধের দৃশ্য-সংবলিত চিত্র দেখতে দেখতে সুবর্ণর তার মায়ের কথা মনে পড়ে। সুবর্ণর চেতনায় তাঁর মায়ের স্মৃতি ধরা আছে, তার ভাবনার অনুষঙ্গ হিসেবে ফ্ল্যাশব্যাকে তার মায়ের কথা, দীপা মাসীমা, অমল কাকু, অলক কাকু – যারা তাদের প্রতিবেশী ছিল, আসাদ দাদু – যিনি তার মা-কে আশ্রয় দিয়েছিলেন, মন্টু মামা ও আরো কিছু চরিত্রের কথা আমরা জানতে পারি। ্লশিলালিপিশ্ বস্তুত সুবর্ণর চেতনাপ্রবাহের ওপর ভর করে এগিয়ে চলে। সামিনার সাথে কথপোকথনের সময় সুবর্ণর চেতনার সঙ্গী হয়ে আমরাও সেই ১৯৭১-এর পটভূমিতেই ফিরে যাই।

সুবর্ণ এই চলচ্চিত্রের প্রধান কথক, তার কথকতা ও স্মৃতিতে ভ্রমণের মধ্য দিয়েই কাহিনীর বেশির ভাগ উন্মোচিত হয়। সে যখন রেজা সাহেবের কাছে তার মা সম্পর্কে জানতে যায়, তখন রেজা সাহেবের চেতনাপ্রবাহের পথ ধরে আমরা কাহিনীর আরো কিছু অংশের সাথে পরিচিত হই। সুবর্ণর মা আবার যখন সুবর্ণ বা রেজা সাহেবের স্মৃতির পথ ধরে হাজির হয়, তখন তিনিও আবার প্রতিবেশী রাহেলার কাছে নিজের কমিউনিস্ট পার্টি করা স্বামীর কথা বলেন, আমরা ফ্ল্যাশব্যাকে স্বামীর সঙ্গে তাকে দেখতে পাই। চলচ্চিত্রের ভাষায় একে জ্যাম্প কাট ইনটু দ্য ফ্ল্যাশব্যাক বলে। মা-র চেতনাপ্রবাহ এইভাবে কাহিনীর বাকি অংশ তুলে ধরে। শামীম স্মৃতি ও বাস্তবের বুনন এমনভাবে চিত্রনাট্যে ঘটিয়েছেন যে তা কাহিনী-প্রবাহে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। সুবর্ণ ও তার মা এবং রেজা সাহেবের চেতনাপ্রবাহের সাথে ভ্রমণ করে আমরা যেমন শহীদ সেলিনা পারভীনের জীবনসংগ্রামের নানামুখী বয়ান পাই, তেমনি ওই সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষের প্রেক্ষাপট, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিযুক্ত হয়ে আলাদা জাতি-রাষ্ট্র অজর্নের সংগ্রামের নানা প্রসঙ্গ সম্পর্কে জানতে পারি। ্লশিলালিপিশ্ প্রকৃতপ্রস্তাবে একটা টাইম ক্যাপসুলধর্মী চলচ্চিত্র। সেই সময়কে প্রতিষ্ঠিত করে এমন সব স্লোগান, গান, পত্রিকার হেডলাইন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে চলচ্চিত্রটিতে।

সুবর্ণ এখনো শুনতে পায় সেই সব স্লোগান: জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো; এক কথা এক দাবি, ভুট্টো তুই কবে যাবি; ভুট্টোর মুখে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো ইত্যাদি। আরো শুনতে পায়: ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে গান। সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের সময় বেয়ে ১৩ ডিসেম্বরে এসে শেষ হয় সুবর্ণ ও রেজা সাহেবের স্মৃতিপ্রবাহ। ১৩ ডিসেম্বরই সুবর্ণর সামনেই তার মা-কে রাজাকাররা ধরে নিয়ে যায়। নির্বাচনের সময় ও পরের পরিস্থিতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে শামীম ব্যবহার করেন ওই সময়কার বাংলা-ইংরেজি দৈনিকের হেডলাইন: বাংলার স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দিন; খয়মভথ ঊয়ঢ়য়ক্ষন ঙক্ষভলন খভশভড়ঢ়নক্ষ ইত্যাদি। কিন্ত্ত মুজিব প্রধানমন্ত্রী হননি, শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। রেজা সাহেব সুবর্ণর মা-কে মুক্তিযুদ্ধে নিয়ে যেতে চান, কিন্ত্ত তিনি যেতে রাজি হননি। আসাদ মামাও তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান, যাননি তিনি। বলেন: না মামা, আমার এখানে অনেক দায়িত্ব। ছেলেরা আসবে…আমাকে না পেয়ে আবার কোথায় খুঁজবে? মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র তিনি নিজের কাছে রাখতেন। অর্থ ও খাবার দিতেন, তাই তিনি বাড়ি ছাড়তে চাননি। আসাদ মামা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তখন বলেন: রাজনৈতিক জাগরণ সহজ, মেরে কেটে আদায় করতে শেখা। কিন্ত্ত যখন স্বাধীন হবে তখন ওই আবেগটাকে বশ করতে হবে। তার জন্য দরকার গভীর চেতনা, দেশপ্রেম, কষ্ট করার ক্ষমতা – সেটা গড়ে উঠলে হয়। সেটা কালে কালে গড়ে ওঠার ব্যাপার। সেই ধৈর্য বাঙালির আছে তো?

সুবর্ণ ও সামিনা রেজা সাহেবের কাছে গিয়েছিল একটা লেখা আদায়ের জন্য যাতে সুবর্ণর মা-র অজানা কথা থাকবে। প্রকৃতপক্ষে শামীমই এইসব অজানা তথ্য সবাইকে জানাতে চেয়েছে ্লশিলালিপিশ্র মাধ্যমে। এবং ্লশিলালিপিশ্ স্মৃতি-বিস্মৃতির পুনর্র্নিমাণ হলেও চলচ্চিত্রটি হতাশার দিকটিকে বড় করে দেখাতে চায়নি। তাই সুবর্ণ ও সামিনা, যারা নতুন প্রজন্মের অগ্রপথিক তারা তাদের সংকলনের জন্য রেজা সাহেবকে লেখার তাগিদ দিতে ভোলে না। শামীম চায় সবকিছু নথিভুক্ত হোক, যাতে যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল তাদের বিচার করা যায়। আজ যখন রাজাকার-আলবদরদের হত্যাযজ্ঞের বিচার চেয়ে বিভিন্ন সময় রুজু করা মামলার নথিপত্র সরকারি সংস্থাসমূহ থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে, পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে – তখন শামীমের ্লশিলালিপিশ্ আমাদেরকেও দাঁড় করিয়ে দেয় বাংলাদেশ নামের একটা খোলা উঠোনে, যে-উঠোনে আজ নৃত্যরত একাত্তরের পরাজিত পক্ষ!!!

সুবর্ণ ও সামিনার মতো আমাদেরও আজ রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়ানো প্রয়োজন। এই স্থাপনা আমাদের কাতর করে বটে, কিন্ত্ত আবার যাতে এই ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করার প্রয়োজন এই বাংলায় না দেখা দেয়, তার জন্যে কাজ করার অনুপ্রেরণাও দেয়। যে-প্রশ্ন এই বধ্যভূমিতে প্রজন্ম শ্৭১ কর্তৃক স্থাপিত শিলালিপিতে খোদিত: তোমরা যা বলেছিলে, বলছে কি তা বাংলাদেশ? তার উত্তর খোঁজা আজকের বাংলাদেশের উঠোনে জরুরি। এই জরুরি কাজে শামীম আখতার একজন সত্যিকারের ক্যাম্পেইনার।

সাখাওয়াত ভাই কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলেন: শামীমের ্লইতিহাসকন্যাশ্ ও ্লশিলালিপিশ্-দুটো কাজেরই উপস্থাপনার ঢংটা স্মৃতিকাতরতায় ভরা, স্মৃতিমেধের জায়গা থেকেই কাজগুলো          এসেছে। বললাম: শুধু স্মৃতিরোমন্থন করাই কি শামীমের উদ্দেশ্য? বললেন: না, তা কেন! ্লশিলালিপিশ্-তে ব্যক্তি পর্যায়ের স্মৃতি নিয়ে কাজ করলেও         শামীম ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে গিয়ে রাষ্ট্রের গড়ে-ওঠার ইতিহাসকেও তাঁর চলচ্চিত্র-পরিসরে স্থান দিয়েছে। একটা আর্কাইভাল ভ্যালু আছে তাঁর কাজের।

বস্তুত ইতিহাস পুনরুদ্ধারের আকুতি থেকেই নির্মাণ করা হয়েছে ্লশিলালিপিশ্। বলা চলে ্লশিলালিপিশ্ হচ্ছে ্লমুক্তিযুদ্ধের সমাজতত্ত্বশ্। ব্যক্তির চেতনাপ্রবাহ, স্মৃতিকণা, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনিক প্রত্র্কিয়া, চরিত্রসমূহের ট্রমাটিক সিচ্যুয়েশন – সবকিছুর উপস্থিতি ্লশিলালিপিশ্-তে প্রবল। আহত মানুষ শামীমের সকল কাজের বিষয়। এই মানুষ শুধু নারী নয়, পুরুষও। আবার এক পর্যায়ে নারী ও পুরুষ উভয়কে টপকে শামীম ঢুকে যান সমাজের কন্দরে। আমার মতে, শামীমকে যতই বাইরে থেকে ্লনারীবাদীশ্ বলে মনে হোক না কেন, যতই একজন শিল্পী নিজেকে নারীবাদী বলে ঘোষণা করুক না কেন, ্লমানুষশ্ নিয়ে কাজ করতে গেলে তা একসময়ে একটি সামাজিক প্রশ্ন হিসেবেই তাঁর শিল্পকর্মে আবির্ভূত হবে। সেদিন ্লক্যাফে ম্যাঙ্গোশ্তে আমরা আলোচনা শেষ করেছিলাম এই ঐকমত্যে যে, শামীমের ভুবনদৃষ্টিতে পশ্চিমা নারীবাদের পরিশীলিত পরিমিত মার্ক্সীয় ধারার প্রতি আনুগত্য আছে বলেই তাঁর সব কাজেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ ও তাদের আহত হবার কারণগুলো উঠে আসে। আমরা নিশ্চিত যে শামীম আখতারের পরের কাজগুলোতেও তা আসবে। ক্ষকাছে তার মা সম্পর্কে জানতে যায়, তখন রেজা সাহেবের চেতনাপ্রবাহের পথ ধরে আমরা কাহিনীর আরো কিছু অংশের সাথে পরিচিত হই। সুবর্ণর মা আবার যখন সুবর্ণ বা রেজা সাহেবের স্মৃতির পথ ধরে হাজির হয়, তখন তিনিও আবার প্রতিবেশী রাহেলার কাছে নিজের কমিউনিস্ট পার্টি করা স্বামীর কথা বলেন, আমরা ফ্ল্যাশব্যাকে স্বামীর সঙ্গে তাকে দেখতে পাই। চলচ্চিত্রের ভাষায় একে জ্যাম্প কাট ইনটু দ্য ফ্ল্যাশব্যাক বলে। মা-র চেতনাপ্রবাহ এইভাবে কাহিনীর বাকি অংশ তুলে ধরে। শামীম স্মৃতি ও বাস্তবের বুনন এমনভাবে চিত্রনাট্যে ঘটিয়েছেন যে তা কাহিনী-প্রবাহে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। সুবর্ণ ও তার মা এবং রেজা সাহেবের চেতনাপ্রবাহের সাথে ভ্রমণ করে আমরা যেমন শহীদ সেলিনা পারভীনের জীবনসংগ্রামের নানামুখী বয়ান পাই, তেমনি ওই সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষের প্রেক্ষাপট, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিযুক্ত হয়ে আলাদা জাতি-রাষ্ট্র অজর্নের সংগ্রামের নানা প্রসঙ্গ সম্পর্কে জানতে পারি। ্লশিলালিপিশ্ প্রকৃতপ্রস্তাবে একটা টাইম ক্যাপসুলধর্মী চলচ্চিত্র। সেই সময়কে প্রতিষ্ঠিত করে এমন সব স্লোগান, গান, পত্রিকার হেডলাইন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে চলচ্চিত্রটিতে।

সুবর্ণ এখনো শুনতে পায় সেই সব স্লোগান: জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো; এক কথা এক দাবি, ভুট্টো তুই কবে যাবি; ভুট্টোর মুখে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো ইত্যাদি। আরো শুনতে পায়: ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে গান। সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের সময় বেয়ে ১৩ ডিসেম্বরে এসে শেষ হয় সুবর্ণ ও রেজা সাহেবের স্মৃতিপ্রবাহ। ১৩ ডিসেম্বরই সুবর্ণর সামনেই তার মা-কে রাজাকাররা ধরে নিয়ে যায়। নির্বাচনের সময় ও পরের পরিস্থিতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে শামীম ব্যবহার করেন ওই সময়কার বাংলা-ইংরেজি দৈনিকের হেডলাইন: বাংলার স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দিন; খয়মভথ ঊয়ঢ়য়ক্ষন ঙক্ষভলন খভশভড়ঢ়নক্ষ ইত্যাদি। কিন্ত্ত মুজিব প্রধানমন্ত্রী হননি, শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। রেজা সাহেব সুবর্ণর মা-কে মুক্তিযুদ্ধে নিয়ে যেতে চান, কিন্ত্ত তিনি যেতে রাজি হননি। আসাদ মামাও তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান, যাননি তিনি। বলেন: না মামা, আমার এখানে অনেক দায়িত্ব। ছেলেরা আসবে…আমাকে না পেয়ে আবার কোথায় খুঁজবে? মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র তিনি নিজের কাছে রাখতেন। অর্থ ও খাবার দিতেন, তাই তিনি বাড়ি ছাড়তে চাননি। আসাদ মামা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তখন বলেন: রাজনৈতিক জাগরণ সহজ, মেরে কেটে আদায় করতে শেখা। কিন্ত্ত যখন স্বাধীন হবে তখন ওই আবেগটাকে বশ করতে হবে। তার জন্য দরকার গভীর চেতনা, দেশপ্রেম, কষ্ট করার ক্ষমতা – সেটা গড়ে উঠলে হয়। সেটা কালে কালে গড়ে ওঠার ব্যাপার। সেই ধৈর্য বাঙালির আছে তো?

সুবর্ণ ও সামিনা রেজা সাহেবের কাছে গিয়েছিল একটা লেখা আদায়ের জন্য যাতে সুবর্ণর মা-র অজানা কথা থাকবে। প্রকৃতপক্ষে শামীমই এইসব অজানা তথ্য সবাইকে জানাতে চেয়েছে ্লশিলালিপিশ্র মাধ্যমে। এবং ্লশিলালিপিশ্ স্মৃতি-বিস্মৃতির পুনর্র্নিমাণ হলেও চলচ্চিত্রটি হতাশার দিকটিকে বড় করে দেখাতে চায়নি। তাই সুবর্ণ ও সামিনা, যারা নতুন প্রজন্মের অগ্রপথিক তারা তাদের সংকলনের জন্য রেজা সাহেবকে লেখার তাগিদ দিতে ভোলে না। শামীম চায় সবকিছু নথিভুক্ত হোক, যাতে যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল তাদের বিচার করা যায়। আজ যখন রাজাকার-আলবদরদের হত্যাযজ্ঞের বিচার চেয়ে বিভিন্ন সময় রুজু করা মামলার নথিপত্র সরকারি সংস্থাসমূহ থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে, পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে – তখন শামীমের ্লশিলালিপিশ্ আমাদেরকেও দাঁড় করিয়ে দেয় বাংলাদেশ নামের একটা খোলা উঠোনে, যে-উঠোনে আজ নৃত্যরত একাত্তরের পরাজিত পক্ষ!!!

সুবর্ণ ও সামিনার মতো আমাদেরও আজ রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়ানো প্রয়োজন। এই স্থাপনা আমাদের কাতর করে বটে, কিন্ত্ত আবার যাতে এই ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করার প্রয়োজন এই বাংলায় না দেখা দেয়, তার জন্যে কাজ করার অনুপ্রেরণাও দেয়। যে-প্রশ্ন এই বধ্যভূমিতে প্রজন্ম শ্৭১ কর্তৃক স্থাপিত শিলালিপিতে খোদিত: তোমরা যা বলেছিলে, বলছে কি তা বাংলাদেশ? তার উত্তর খোঁজা আজকের বাংলাদেশের উঠোনে জরুরি। এই জরুরি কাজে শামীম আখতার একজন সত্যিকারের ক্যাম্পেইনার।

সাখাওয়াত ভাই কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলেন: শামীমের ্লইতিহাসকন্যাশ্ ও ্লশিলালিপিশ্-দুটো কাজেরই উপস্থাপনার ঢংটা স্মৃতিকাতরতায় ভরা, স্মৃতিমেধের জায়গা থেকেই কাজগুলো          এসেছে। বললাম: শুধু স্মৃতিরোমন্থন করাই কি শামীমের উদ্দেশ্য? বললেন: না, তা কেন! ্লশিলালিপিশ্-তে ব্যক্তি পর্যায়ের স্মৃতি নিয়ে কাজ করলেও শামীম ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে গিয়ে রাষ্ট্রের গড়ে-ওঠার ইতিহাসকেও তাঁর চলচ্চিত্র-পরিসরে স্থান দিয়েছে। একটা আর্কাইভাল ভ্যালু আছে তাঁর কাজের।

বস্তুত ইতিহাস পুনরুদ্ধারের আকুতি থেকেই নির্মাণ করা হয়েছে ্লশিলালিপিশ্। বলা চলে ্লশিলালিপিশ্ হচ্ছে ্লমুক্তিযুদ্ধের সমাজতত্ত্বশ্। ব্যক্তির চেতনাপ্রবাহ, স্মৃতিকণা, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনিক প্রত্র্কিয়া, চরিত্রসমূহের ট্রমাটিক সিচ্যুয়েশন – সবকিছুর উপস্থিতি ্লশিলালিপিশ্-তে প্রবল। আহত মানুষ শামীমের সকল কাজের বিষয়। এই মানুষ শুধু নারী নয়, পুরুষও। আবার এক পর্যায়ে নারী ও পুরুষ উভয়কে টপকে শামীম ঢুকে যান সমাজের কন্দরে। আমার মতে, শামীমকে যতই বাইরে থেকে ্লনারীবাদীশ্ বলে মনে হোক না কেন, যতই একজন শিল্পী নিজেকে নারীবাদী বলে ঘোষণা করুক না কেন, ্লমানুষশ্ নিয়ে কাজ করতে গেলে তা একসময়ে একটি সামাজিক প্রশ্ন হিসেবেই তাঁর শিল্পকর্মে আবির্ভূত হবে। সেদিন ্লক্যাফে ম্যাঙ্গোশ্তে আমরা আলোচনা শেষ করেছিলাম এই ঐকমত্যে যে, শামীমের ভুবনদৃষ্টিতে পশ্চিমা নারীবাদের পরিশীলিত পরিমিত মার্ক্সীয় ধারার প্রতি আনুগত্য আছে বলেই তাঁর সব কাজেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ ও তাদের আহত হবার কারণগুলো উঠে আসে। আমরা নিশ্চিত যে শামীম আখতারের পরের কাজগুলোতেও তা আসবে।