ফারো থেকে লিসবন
পর্তুগালের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো তার দক্ষিণ অংশে আলগার্ভ অঞ্চলে। সেখানকার প্রধান শহর ফারো ছিল আমাদের প্রথম স্টপ। এই লেখার প্রথম পর্বে সে-অঞ্চলের কথা ছিল। ফারো থেকে লিসবন ট্রেনে যেতে লাগে তিন ঘণ্টার মতো। প্লেনে ফ্লাইটের সময় কম হলেও মোট সময় প্রায় একই লেগে যায়। প্লেনের যাত্রায় পৌঁছানো হয়, দেখা হয় না। দিনের বেলায় ট্রেন; দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। সুতরাং ঠিক হলো ট্রেনেই যাবো। আমাদের হোটেল থেকে ট্রেন স্টেশনে যেতে উবারের ট্যাক্সিতে আধঘণ্টার মতো লাগল।
ফারোর স্টেশনটি ছোটখাটো; পর্যটক মুখরিত জায়গায় যেমন হবে ভেবেছিলাম তেমন নয়। আমরা সময়ের একটু আগে গিয়েছিলাম; ভেবেছিলাম ট্রেনে চড়ার আগে কিছু খেয়ে নেব। আশা অনুযায়ী না হলেও ছোট্ট একটি দোকানে স্যান্ডউইচ জাতীয় খাবার আর কফি পাওয়া গেল। সুতরাং আমাদের তখনকার প্রয়োজন মিটে গেল। কিন্তু টয়লেট খুঁজতে গিয়ে পেলাম প্ল্যাটফর্মের একপাশে একটি সর্বজনীন শৌচাগার, যা আমার কাছে একটু বেমানান মনে হলো। পর্তুগাল যে ইউরোপের দরিদ্র ভাই এবং এখনো সেরকমই রয়ে গিয়েছে তা মনে করিয়ে দিলো ফারোর ট্রেন স্টেশন।
তবে ট্রেন মোটামুটি সময়মতো এসে গেল। ব্রডগেজের ট্রেন, তাই বগিগুলো বেশ চওড়া। ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট বলে ভিড় তেমন ছিল না। আর সিটগুলোও ছিল বেশ আরামদায়ক। তবে দু-পাশের দৃশ্য তেমন আকর্ষণীয় ছিল না। এমনিতেই সবুজের অভাব; তার ওপর তীব্র রোদে চরাচর আরো রুক্ষ।
সাত পাহাড়ের শহর লিসবন
উঁচু-নিচু বিভিন্ন আয়তনের এবং আকারের সাতটি পাহাড় লিসবন শহরে। শুধু তাই নয়, ইউরোপের (ব্রিটেন আর আইসল্যান্ড বাদ দিয়ে বিবেচনা করলে) সবচেয়ে পশ্চিম প্রান্তের রাজধানী শহর এটি।
যে-স্টেশনে আমাদের নামার কথা, সেটা একটা বড় সেতু পার হওয়ার পর, এটা আমাদের জানা ছিল। তবে নদী এত চওড়া হবে ভাবতে পারিনি। আসলে লিসবন শহরটি তাগুস নদীর একেবারে মোহনার কাছে। সে-কারণে নদী সেখানে অনেক চওড়া। আর তারপরই নদী সাগরে মিশে গিয়েছে। তাই শহর থেকে সমুদ্রসৈকত খুব কাছে। আমরা একদিন এ-ধরনের একটি সৈকত শহরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সে-কথায় আসবো একটু পরই।
স্টেশনের ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে হলো এক মজার অভিজ্ঞতা। শিশু আয়লাসহ যাত্রী আমরা পাঁচজন। সঙ্গে মালপত্র বেশি না হলেও নেহায়েত কমও নয়। লাইনের প্রথম ট্যাক্সিটির ড্রাইভারকে মৃদু আপত্তির ভঙ্গি করতে দেখে পরের ড্রাইভার (একজন নারী) নেমে এলো তার গাড়ি থেকে, দেখিয়ে দিলো কীভাবে লাগেজগুলোর জায়গা করা যায়। তারপরও ওই ড্রাইভার তার ঘাড় নেড়ে জানালো, সে আমাদের নিতে অপারগ। সঙ্গে সঙ্গেই সেই নারী ড্রাইভার আমাদের বলল, এসো, আমি নিচ্ছি তোমাদের। শুধু তাই নয়, সে নিজে আমাদের সঙ্গে হাত লাগিয়ে লাগেজগুলোর জায়গা করে নিল সুন্দরভাবে।
চলতে চলতে আলাপ শুরু হয়ে গেল টাক্সিচালকের সঙ্গে। জানলাম ওর জন্ম প্রাক্তন পর্তুগিজ উপনিবেশ মোজাম্বিকে। কিন্তু বড় হওয়ার পরই চলে এসেছে এদেশে। ফারাজ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক; কথা শুরু হলো ট্রাম্পকে নিয়ে। অনেক ইউরোপিয়ানের মতো আমাদের চালকও পছন্দ করে না তাকে। মূল কারণ, ইউরোপকে এখন নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে। শুধু তাই নয়, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অবস্থানও ওর পছন্দ নয়। পর্তুগালে অনেক অভিবাসী মানুষ; তাতে তার কোনো আপত্তি নেই। তবে অনেক বিদেশি মানুষ ভাষাটি ভালো করে না শিখেই উবারচালক হয়ে যায় আর তাতে যে অসুবিধা সেটি সে স্পষ্টই বলল। আমরাও মানলাম। আমি নিজে সবসময় মনে করি যে, যেখানে থাকব এবং কাজ করব সে-দেশের ভাষাটি আয়ত্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হোটেলে নামিয়ে দেওয়ার সময় ট্যাক্সি ড্রাইভার বলে গেল যে, তার সামনের রেস্তোরাঁটি খুব নামকরা। আমরা সেখানে একদিন ডিনার খেয়েছিলাম; সে-কথায় আসব একটু পর। হোটেল বুক করার সময় আমরা চেয়েছিলাম ডাউনটাউনের কাছে থাকতে, যাতে হেঁটেই শহরটি সম্পর্কে একটু ধারণা পাওয়া যায়। সেরকমই ছিল জায়গাটা। আমাদের ঘরের জানালা দিয়ে সামনের চওড়া স্কোয়ার আর তার মাঝখানের স্বাধীনতাস্তম্ভটি দেখা যায়। স্পেনের শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য পর্তুগালের যুদ্ধ ছিল দীর্ঘ ২৮ বছর – ১৬৪০ থেকে ১৬৬৮। তবে এই স্তম্ভটি নির্মিত হয়েছে ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে।
আমাদের হোটেলটি অষ্টাদশ শতকের একটি প্রাচীন ভবনে, আর সে-কথা রুমের এক জায়গায় একটি লেখায় জানিয়ে দেওয়া ছিল। তার সঙ্গে লেখা ছিল, আপনি এখানে ইতিহাসের সঙ্গে থাকবেন। ওই ইতিহাস অবশ্য তেমন পরিষ্কার নয়। তবে যেমনটা হয়, কোনো ধনী ব্যক্তির প্রাসাদ ছিল সেটা, পরে হাতবদল হয়ে এখন হোটেল। হোটেল হিসেবে তৈরি করার জন্য ভবনটির ভেতরটা পুরো বদলে অতিথিদের থাকার ঘর, বাথরুম ইত্যাদি বানানো হয়েছে।
সন্ধ্যায় ডিনারের জন্য হোটেলের রিসেপশন থেকে পরামর্শ নিয়ে এক রেস্তোরাঁ খুঁজতে বের হলাম। আরেকটি স্কোয়ার পার হয়ে বেশ কাছেই ছিল সেটি। পর্তুগিজ খাবারের সাদামাটা ধরনের রেস্তোরাঁ। কিন্তু তার জনপ্রিয়তা বোঝা গেল ভিড় দেখে। আমরা অবশ্য টেবিল পেলাম সহজেই। মেন্যুতে বিভিন্ন আইটেমের সঙ্গে পেলাম সেই ডিশ, যেটি ফারোর এক রেস্তোরাঁয় খেয়েছিলাম – ভাতের সঙ্গে সিফুড মিশিয়ে কিছুটা ইতালিয়ান রিজোটোর মতো। কিন্তু তাতে যে-সস ব্যবহার করা হয় সেটিই তার বৈশিষ্ট্য, আর তাতেই সৃষ্টি হয় স্বাদ।
প্রথমবার যেখানে এটা খাই সেখানে ওয়েটারের বর্ণনা শুনে আমরা বলেছিলাম, এটা তাহলে স্প্যানিশ পায়েয়ার মতো। তখন সে প্রতিবাদ করে বলেছিল, না, এটা একেবারেই আলাদা। আমাদের হোটেলের সামনে যে নামি রেস্তোরাঁ সেখানে আমরা দুটোই নিয়ে একটু একটু করে খেলাম। আর তখন বুঝলাম যে, দুটো সত্যিই আলাদা ধরনের খাবার। লিসবন ডাউনটাউনের রেস্তোরাঁয় খাবার অর্ডার করার সঙ্গে সঙ্গে স্টার্টার হিসেবে এসে গেল পরিচিত সেই ভাজা ম্যাশ করা কড মাছ (যা ফারোর রিসোর্টে খেয়েছিলাম। পরে লিসবন এয়ারপোর্টের লাউঞ্জেও পেয়েছিলাম এটি আর শ্রিম্প রিজোল (বা চিংড়ি মাছের বড়া)। বুঝতে পারলাম যে, এগুলো বেশ সাধারণ জনপ্রিয় পর্তুগিজ খাবার।
আলফামায় কয়েক ঘণ্টা
যে-সাত পাহাড় নিয়ে গড়ে উঠেছে লিসবন শহর তার একটি আলফামা। নামটি এসেছে আরবি শব্দ আলহামা থেকে – যার অর্থ উষ্ণ ঝরনা। আরবি হামাম (অর্থাৎ উষ্ণ স্নানাগার) শব্দটির উৎপত্তিও সেখান থেকে। আলফামা লিসবনের পুরনো এলাকাগুলোর একটি। সরু সরু রাস্তা এঁকেবেঁকে উঠে গিয়েছে পাহাড়টির গায়ে। রাস্তাগুলোর আশেপাশে গড়ে উঠেছে বাড়িঘর, দোকানপাট, রেস্তোরাঁ ইত্যাদি। আর পাহাড়ের চূড়ায় বিখ্যাত দুর্গ/ প্রাসাদ কাসতেলো (বা কাসল) দ্য সাও জর্জ। ডাউনটাউন থেকে সেখানে যাওয়ার ভালো ব্যবস্থা – বিখ্যাত ২৮ নম্বর ট্রাম যায়। বাসও আছে। সরু সরু রাস্তা দিয়ে ট্রাম বাস কীভাবে উঠে যায় – বিশেষ করে সংকীর্ণ বাঁকগুলোতে কীভাবে গাড়িগুলো ঘোরে – সেটা দেখার মতো। কোনো কোনো জায়গায় রাস্তা বা মোড় এতই সংকীর্ণ যে পায়ে হাঁটার মানুষদের একপাশে কোথাও সরে দাঁড়াতে হয়।
লিসবনের ট্রাম বেশ বিখ্যাত। ছোট্ট এক কামরার গাড়ি। বিভিন্ন ধরনের উজ্জ্বল রঙে এবং বিজ্ঞাপনে শোভিত তাদের গা। তাদের আকৃতি দেখলে মনে হয় মধ্যযুগীয় কোনো খেলনা রাস্তায় নামানো হয়েছে। ভাড়া অবশ্য একটু বেশির দিকেই। আলফামার পুরনো শহর আর দুর্গ দেখতে যাওয়ার সময় আমরা বাসেই গেলাম। ঠিক হলো যে, ফেরার সময় ট্রাম নেওয়া যাবে। তাতে দুই ধরনের যান ব্যবহার করার সুযোগ হবে। লিসবনে তৃতীয় আরেকটি যান পাওয়া যায় – সেটি হলো তুকতুক। দেখতে অনেকটা আমাদের সিএনজিচালিত তিন চাকার গাড়ির মতো; কিন্তু পায়ের সামনে অনেক বেশি জায়গা। ট্যাক্সি হিসেবে শহরের কিছু জায়গায় চলে এসব গাড়ি।
ডাউনটাউন থেকে ৭৩৭ নম্বর বাস পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে উঠে গেল শেষ স্টপ কাসতেলো পর্যন্ত। সেখানে নেমে সামনেই পেলাম দুর্গের টিকিট কাউন্টার আর প্রবেশপথ। সেদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে দাবদাহের সতর্কবার্তা ছিল। তাই আমরা রোদ বেশি তেতে ওঠার আগেই দুর্গের ভেতরটা দেখতে গেলাম। এখানে বলে রাখতে হয় যে, এই দুর্গটি পাহাড়ের একেবারে চূড়ায় বলে সেখান থেকে নিচের দিকে তাকালে লিসবন শহরের একটা বড় অংশ আর তাগুস নদীর মোহনার দৃশ্য দেখা যায়। শহরের বাড়িঘরের ছাদগুলোর কমলা রং তাগুস নদী আর দূরের আকাশের পটভূমিতে একটা সুন্দর দৃশ্যপট তৈরি করে রেখেছে। সে-দৃশ্য পর্যটকদের জন্য একটি বড় আকর্ষণ। আর সেটি দেখা যায় ঢোকার পরেই একটি বড় চত্বর থেকে। বড় বড় পুরনো গাছ সেখানে ছায়া দিচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় বেঞ্চে বসার ব্যবস্থা। আশেপাশে কয়েকটি ময়ূর তাদের বর্ণিল পাখা দুলিয়ে হাঁটছে অলসভাবে। সব মিলিয়ে এমন একটি মায়াময় পরিবেশ, যা দুর্গ বা পুরনো প্রাসাদ দেখতে গিয়ে আশা করা হয় না।
আলফামার দুর্গটিতে নাকি প্রায় তিন হাজার বছর আগে থেকে মনুষ্যবাসের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। বয়সের তুলনায় অবশ্য এর বাইরের দিকের দেয়ালটি বেশ ভালো অবস্থায় আছে। বাকিটা মূলত ভগ্নাবশেষ।
তবে ঢোকার পথে একটি বোর্ডে তার বিভিন্ন অংশের বর্ণনা এবং ম্যাপ দেওয়া আছে। সেখান থেকে আদি স্থাপনাটি সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা পাওয়া যায়। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, অষ্টম শতাব্দী থেকে কয়েকশো বছর মুর মুসলমানদের শাসনের সময় এই দুর্গ তাঁরা ব্যবহার করেছেন।
পৃথিবীতে এক জাতির ওপর অন্য জাতির আক্রমণ চলছে আদিকাল থেকে। আর বাইরের শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য শাসকশ্রেণি নিজেদের জন্য নির্মাণ করেন দুর্ভেদ্য দুর্গ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের বাসস্থান। দুর্গগুলোর পরিকল্পনায় সুরক্ষার বিষয়টি কমবেশি সর্বত্রই দেখা যায়। আলফামার দুর্গে প্রাথমিক প্রতিবন্ধকতার জন্য চারধারে ছিল সুপরিসর পরিখা, যা সে-সময় পানিতে ভরে রাখা হতো। তারপর অনেক উঁচু দেয়াল এবং তার ভেতরে আবারো দেয়াল দিয়ে বিভিন্ন ঘর। আমরা সেরকম কয়েকটি ঘর ঘুরে দেখলাম। তবে এত কিছুর পরও শত্রুর (বা ভিন্ন শক্তির) কাছে পরাজিত হতে হয়। ইতিহাস এরকম সাক্ষ্যই দেয়। এখানেও মুসলমান শাসকগণকে একসময় পরাজিত হয়ে বিদায় নিতে হয়েছিল।
দুর্গ দেখা শেষ হতে হতে মাথার ওপর রোদ বেশ চড়ে যায়। পুরনো শহরে হাঁটা সংক্ষিপ্ত করলেও আবার বাসস্ট্যান্ডে আসতে কয়েকটি গলি পার হতে হলো। আর তখনই দেখলাম সরু গলিগুলোর দু-পাশে ছোট ছোট বাড়ি কত সুন্দর। মাঝে মাঝে স্যুভেনির আর খাবারের দোকান। ট্যুরিস্টদের পদচারণায় মুখর এলাকা। দুটি রাস্তা একসঙ্গে হয়েছে এরকম এক কোণে বসে গিয়েছে এক ব্যান্ডের দল। শুনেছি সেখানকার রাস্তায় এখানে-সেখানে শোনা যায় ঐতিহ্যবাহী ফাদো সংগীত। কিন্তু আমরা যে-দলটিকে দেখলাম তাদের বাদ্যযন্ত্র দেখে মনে হলো না যে ওরা সে-গান করবে।
আলফামা এলাকাটি পুরনো হলেও সবুজের অভাব নেই। কোনো কোনো চত্বরে গাছের ছায়ায় বসে গিয়েছে ক্যাফে/ রেস্তোরাঁ। দু-তিনটে রাস্তা হাঁটতেই এসে গেলাম একটি ছোট্ট বাগানে, যেটি পাহাড়ের ঢালে একপাশে। সেখান থেকে নিচে দেখা যায় নদী/ সমুদ্র। পর্যটকদের ছবি তোলার জন্য আদর্শ জায়গা। স্বাভাবিকভাবেই ভিড় জমে গিয়েছিল সেখানে। দু-একটি জায়গায় ছবি তুলতে দাঁড়ানোর জন্য রীতিমতো অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। খাদের কিনারের সেই বাগান থেকে বের হতেই পাওয়া গেল সেই বিখ্যাত ২৮ নম্বর ট্রামের স্টপ। দু-মিনিট দাঁড়াতেই আমরা পেয়ে গেলাম নিচে নামারটি।
নাইট লাইফ আর রেস্তোরাঁর পাহাড় ‘ব্যারো আলতো’
ডিনারের জন্য ফারাজ খুঁজে বের করলো এক ইতালিয়ান রেস্তোরাঁ। কিন্তু সেটি অন্য একটি পাহাড়ে। ট্যাক্সি বা তুকতুক নিয়ে যাওয়া যায় সেখানে। তবে একটি ফুনিকুলার ধরনের গাড়িও রয়েছে, আর সেটি আমাদের হোটেলের কাছেই এক জায়গা থেকে ছাড়ে। পাঁচ মিনিট হেঁটে পৌঁছে গেলাম সেখানে। সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকায় বেড়াতে গিয়ে এ-ধরনের ট্রেন আমরা দেখেছি। তবে এ-গাড়িটি বেশ পুরনো ধরনের, যদিও রেললাইনের মতো লাইন ব্যবহার করেই পাহাড়ের ওপরে ওঠানামা করে। ট্রেনলাইনের পাশেই হেঁটে ওঠার রাস্তা। শমী, ফারাজ আর আয়লা হেঁটেই উঠে গেল। কিন্তু আমরা ট্রেনের আরাম আর অভিজ্ঞতার সুযোগ নিলাম, যদিও তার জন্য সামান্য অর্থ ব্যয় করতে হলো। আমাদের পর্তুগাল ভ্রমণের দু-মাস পর এই ট্রামটিই দুর্ঘটনায় উল্টে পড়ে যায় আর তার ফলে হতাহত হয়েছিল অনেক মানুষ।
ট্রেন থেকে নেমে ডান দিকেই দেখা গেল একটি চত্বর যেখানে বার, কফিশপ আর নানা ধরনের ছোট ছোট দোকান। চত্বরের দু-পাশ ঘেঁষে দোকান আর মাঝখানের খোলা জায়গায় টেবিল-বেঞ্চ পাতা। সবকিছু মিলে বেশ জমজমাট পরিবেশ। ওপর থেকে দূরের অন্যান্য পাহাড় আর নিচে শহরের বিভিন্ন এলাকা দেখা যাচ্ছিল।
এ-ধরনের পরিবেশে কিছুক্ষণ বসে থাকতেই ভালো লাগে। কিন্তু আমাদের ডিনারের সময় হয়ে যাচ্ছিল বলে পা চালাতে হলো।
সরু সরু কয়েকটি রাস্তা ধরে মিনিট পাঁচেক হেঁটে পেলাম সেই ইতালীয় রেস্তোরাঁয়। যখন সেখানে পৌঁছেছি, তখনো রেস্তোরাঁটি খোলেনি। হাতে কয়েক মিনিট সময়। রাস্তার ওপাশে একটি ছোট্ট স্যুভেনিরের দোকান। সামনে কয়েকজন তরুণ নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলেন। শুনে বোঝা গেল তারা বাংলাদেশের। আমরা দোকানটিতে ঢুকে দেখলাম তার বাইরের চেহারা আকর্ষণীয় না হলেও কিছু কেনাকাটা করা যায়। আমরা বাংলাদেশের মানুষ শুনেই তরুণটি আমাদের কিছু ডিসকাউন্টও দিলেন।
রেস্তোরাঁটির বাইরের চেহারা দেখে আমি একটু দমে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভেতরে বসে তার মেন্যু দেখেই বুঝতে পারলাম কেন ফারাজ এটি খুঁজে বের করেছে। খাবার ছিল একেবারে খাঁটি ইতালীয়। আবারো দেখলাম যে, যেখানে ট্যুরিস্টদের ভিড় সেখান থেকে সামান্য দূরের রেস্তোরাঁয় চাকচিক্য না থাকলেও ভালো মানের খাবার পাওয়া যায়।
ফেরার সময় ট্যাক্সির জন্য গলিগুলো ছেড়ে বড় রাস্তার দিকে যেতে যেতে বুঝলাম কেন ব্যারো আলতো তার সান্ধ্যজীবনের জন্য বিখ্যাত। তখনো অনেক রেস্তোরাঁ, বার আর আইসক্রিম পার্লারে ভিড়। নাইটক্লাবগুলোর সামনে কম বয়সের মানুষের জটলা।
সৈকত শহর কাসকাইস
তাগুস নদীটি লিসবন শহরের কাছেই সমুদ্রে গিয়ে মিলেছে। নদীর পাড়ের এক রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে সমুদ্রসৈকতে পৌঁছা যায়। সে-রাস্তার পাশে বিভিন্ন জায়গায় সৈকত আর ছোট ছোট শহর। তেমনি একটি শহর কাসকাইস। সেখানে লিসবন থেকে ট্রেন যায়। আমাদের এবারের পর্তুগাল ভ্রমণের শেষ দিনটি রাখা হয়েছে তার জন্য। সেখানে সময় কাটানো যায় সমুদ্র স্নান বা রৌদ্র স্নানে। আবার চাইলে ছোট শহরটিতে ঘুরে বেড়ানো যায়।
লিসবন শহরের স্যান্তোস স্টেশন থেকে ট্রেন যায় কাসকাইস পর্যন্ত। আমাদের হোটেল থেকে কয়েক মিনিট হেঁটে পৌঁছে গেলাম এক ট্রামস্টপে, যেখান থেকে স্যান্তোস যাওয়ার ট্রাম পাওয়া যায়। সেই ট্রামে যেতে যেতে দেখা যায় শহরের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি এলাকা। লিসবন নগর পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিভিন্ন আয়তনের প্লাজা বা চত্বর। শহরের ভেতরে যেমন, নদীর পাড়েও রয়েছে এরকম প্লাজা। তেমনি একটি প্লাজা মার্কেট স্কোয়ার। ভারি সুন্দর জায়গাটি। চারপাশের ভবনগুলো দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের ভালো উদাহরণ। বাণিজ্যিক ভবনগুলো পার হয়ে সরকারি অফিসের এলাকা। তার পরই আমাদের নামার স্টপ।
স্যান্তোস স্টেশন থেকে কাসকাইস যাওয়ার ট্রেনের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। নদীর সঙ্গে প্রায় সমান্তরাল ট্রেনের লাইন। তাই নদীর পাড় আর একটু পর সমুদ্রসৈকত দেখতে দেখতে যাওয়া। মাঝে মাঝে পার্ক আর হাঁটার রাস্তা। নারী-পুরুষ কেউ হাঁটছে, কেউ দৌড়াচ্ছে, আবার কেউ কেউ পার্কের বেঞ্চে বসে বই পড়ছে বা রোদ পোহাচ্ছে। দৃশ্য দেখতে দেখতে সময় কেটে গেল দ্রুত, পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।
ট্রেন স্টেশন থেকে দু-মিনিট হেঁটেই পৌঁছে গেলাম শহরটিতে ঢোকার এক রাস্তায়। ভারী সুন্দর পাথরে বাঁধানো সে-রাস্তা। দু-পাশের কোনো ভবনই দু-তিন তলার বেশি নয়। সেগুলোতে ছোট ছোট দোকানপাট। পরের রাস্তাটি আরো সুন্দর। তার ফুটপাতের ধারে ফুলের বাগান। আর একপাশের ভবনগুলোর দেয়াল রং করা বিভিন্ন রঙে। সব মিলিয়ে একটা ছবি বা রূপকথার মতো পরিবেশ। তেমন গরম ছিল না সেদিন। তাই হাঁটতে বেশ ভালো লাগছিল। কফি খেতে হয় তো এরকম রাস্তার পাশের কোনো ক্যাফেতেই বসতে হয়। একটু হেঁটেই পেয়ে গেলাম সেরকম একটি। সেখানে কফির সঙ্গে পেলাম কিছু হালকা খাবার যাতে আমাদের লাঞ্চ হয়ে গেল।
আয়লাকে নিয়ে শমী আর ফারাজ চলে গেল সৈকতে। আমরা শহরেই থাকলাম। একটি স্যুভেনিরের দোকানে ঢুকে এটা-সেটা কিনলাম। একসময় মনে হলো, এবার ঠান্ডা কিছু দিয়ে গলা ভেজানো দরকার। কিন্তু সামনে যে-দোকান পেলাম তার নাম কাবাব জয়েন্ট। ওয়েটারকে দেখে মনে হলো বাংলাদেশের এবং ঠিকই ছিল আমার অনুমান। একটু সংকোচ নিয়েই জিজ্ঞেস করলাম, শুধু সফট ড্রিংক পাওয়া যাবে কি না। অবশ্যই, কী চাই আপনাদের? শুধু ওয়েটার নয়, দোকানের মালিক বাংলাদেশের। জানা গেল, রাস্তার ওপাশের রেস্তোরাঁটির মালিকও তাই। আশেপাশের স্যুভেনিরের দোকানগুলোতে কাজ করছেন আরো কয়েকজন বাঙালি। তাঁদের পরিশ্রম আর পাঠানো টাকা আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু সৈকত আর শহরের সৌন্দর্য নয়, কাসকাইসে রয়েছে ঐতিহাসিক ‘সিতাদেলা দ্য কাসকাইস’। সমুদ্রের পাড়ে পঞ্চদশ শতকে নির্মিত হয়েছিল এই দুর্গ। বলার অপেক্ষা রাখে না, উদ্দেশ্য ছিল বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে লিসবন শহরকে রক্ষা করা। সাগর পাড়ি দিয়ে ইংরেজরা এসে হামলা চালাতো বলে এই স্থাপনা। যেমনটা অন্যান্য জায়গায় দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে এই দুর্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে – কখনো ভূমিকম্প বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে, কখনো হামলায়। অষ্টাদশ শতক থেকে পর্তুগালের তখনকার রাজপরিবার এটিকে ব্যবহার করেছে নিজেদের আবাস হিসেবে। আধুনিক পর্তুগালেও রাষ্ট্রপতির গ্রীষ্মকালীন বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এই ভবন। তবে এখন এটি একটি বিলাসবহুল হোটেল। সেখানে থাকলে অথবা তার কোনো রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে দেখা যেতে পারে ভেতরের সাজসজ্জা। সে-বিষয়ে আমাদের কারো তেমন উৎসাহ ছিল না। তাছাড়া সন্ধ্যা সাতটায় ডিনারের জন্য টেবিল বুক করা ছিল লিসবনে আমাদের হোটেলের সামনের সেই রেস্তোরাঁ ‘পিনোকিও’তে। সুতরাং আমাদের ফেরার তাড়া ছিল।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.