কসমস : পৃথিবী দর্শনের আলোকবর্তিকা

বিংশ শতাব্দীতে এসে প্রথম মানুষ অনুভব করল, এত অর্জন আর সমৃদ্ধি সবকিছু জলাঞ্জলি হতে পারে মহাবিশ্ব বিকাশের সঙ্গে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করতে ব্যর্থ হলে এবং মানবসমাজে নিজেরা পরস্পরকে বুঝতে অসমর্থ হলে।
এ-অবস্থান থেকেই কার্ল সাগান তাঁর অসাধারণ গ্রন্থ কসমস লিখলেন। কসমস-এ তিনি বললেন, বিশ্বের শুধু বিকাশোন্মুখ সৌন্দর্য রয়েছে বা এটি মানুষের পক্ষে শুধু অনুধাবন করাই সম্ভব নয়, বরং বিজ্ঞান এটিও দেখিয়েছে যে, অত্যন্ত বাস্তব এবং নিগূঢ়ার্থে আমরা মহাবিশ্বের একটি অংশ। আমরা জন্মেছি এটি থেকে; আমাদের নিয়তি এটার সঙ্গে জড়িত। মানবেতিহাসের সবচেয়ে মৌলিক ঘটনা এবং পেছনের তাৎপর্যহীন অতি সাধারণ ঘটনা; এ সবকিছুই এই মহাবিশ্ব এবং তার উৎপত্তির সঙ্গে জড়িত। এটি শুধু বিজ্ঞানের বই নয়; বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের জীবনযাপনের সংগতি না থাকলে যে সভ্যতায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে সে-সংক্রান্ত অগ্রিম সতর্কবাণীর এক গ্রন্থ, যা স্বল্প পরিসরে হলেও ঘটেছে পৃথিবীতে বারবার।

কার্ল সাগান তাঁর বিখ্যাত কসমস (Cosmos) গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন, গ্রন্থটিকে তাই মহাজাগতিক প্রেক্ষাপট উন্মোচনের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে। তিনি জগৎ-জীবন ও বিশ্বকে বোঝার জন্য বিজ্ঞানকে শক্তিশালী এবং দারুণ পথ বা পদ্ধতি হিসেবে পরিগণিত করেছেন। এই পথ বা পদ্ধতি বিশ্বকে আমাদের কাছে এত প্রাচীন আর বিশাল হিসেবে প্রকাশ করেছে যে, মানবীয় ব্যাপার বা বিষয়গুলোকে খুব ছোটমাপের মনে হয়। মহাবিশ্বের ধারণাকে দূরে রেখেই আমরা বেড়ে উঠেছি। প্রাত্যহিক ভাবনা থেকে মহাজাগতিক ভাবনা সম্পূর্ণ পৃথক বা অপ্রাসঙ্গিক এবং অতি দূরের বলে মনে হয়।

আয়োনীয়রা যুক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছিল এই বিশ্ব প্রাকৃতিক কিছু নিয়ম-শৃঙ্খলা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিশ্বের এই শৃঙ্খলাপূর্ণ বিস্ময়কর ও মুগ্ধকর চরিত্রকে বলা হয় কসমস বা মহাবিশ্ব। পিথাগোরাসই প্রথম কসমস শব্দটি ব্যবহার করেন একটি সুশৃঙ্খল ও সমন্বয়পূর্ণ বিশ্ব নির্দেশ করার জন্য – মানববোধগোম্যতার কাছে বশীভূত এক জগৎ। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে এসে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী কার্ল সাগান যেন কসমস শব্দটি বোঝানোর উদ্দেশ্যেই বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ, মানুষের সঙ্গে মহাবিশ্বের সম্পর্ক, সামাজিক ঘটনাবলি ও বিজ্ঞানের ক্রমাগ্রগতি কীভাবে পরস্পরকে প্রভাবিত করে, মানবেতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকসহ বিস্ময়কর নাটকীয়তায় আবৃত গ্রন্থ কসমস রচনা করেন।

সাগান গ্রন্থটিতে প্রতি পদে সমাজের সাধারণ ঘটনাবলির সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্কগুলো তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। তিনি এগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে এমন এক আবেগ অনুভব করেছিলেন যে আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিজ্ঞানের বর্ণনাকে তিনি কাব্যের পর্যায়ে নিয়ে এসেছিলেন। সাধারণ মানুষকে বুঝিয়েছিলেন বিজ্ঞান কোনো বিরক্তিকর কঠিন বিষয় নয়। দেখতে জানলে এর সৌন্দর্য যে-কোনো কিছু থেকেই বেশি। ১৯৮০ সালে কসমস বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। কসমস বইটি ইংরেজি ভাষায় রচিত সবচেয়ে পঠিত বিজ্ঞানের বইগুলোর একটি। এই বইটির প্রায় ৫০ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছিল। বইটি এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, কসমস-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ১৩ পর্বের টিভি সিরিজটি ৬০টি দেশের প্রায় ৫০ কোটি দর্শক মোহিত হয়ে দেখেছিল। এই সিরিজটি ১৯৮৫ সালের দিকে বাংলাদেশের টেলিভিশনেও দেখানো হয়েছিল। তবে এই নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কখনো চোখে পড়েনি। আমি নিজেও কসমস ও কার্ল সাগানের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম এই টিভি সিরিজের মাধ্যমে।

কসমস গ্রন্থের ভূমিকাতে খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ বছর পূর্বের একটি কবিতার উদাহরণ দিয়ে সাগান বলেছেন, প্রাচীনকালে, প্রাত্যহিক কথাবার্তা ও রীতিনীতির ভেতরে সবচেয়ে পার্থিব ঘটনাপ্রবাহও মহাজাগতিক ঘটনাবলির সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রাচীন পূর্বপুরুষদের কল্পনায় ওই ধরনের বিশ্বে মানুষরা কেন্দ্রীয় না হলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। আমরা প্রকৃতির বাকি অংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কসমস গ্রন্থটিতে ভূমিকা ছাড়াও ১৩টি অধ্যায় আছে, প্রতিটি অধ্যায়ের আছে কাব্যময় শিরোনাম এবং অধ্যায়গুলো পরস্পরের সঙ্গে একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক তৈরি করেছে; আবার এগুলোকে স্বতন্ত্র হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। এগুলো হচ্ছে – মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি, মহাজাগতিক ঐকতানে এক অনুপম সুর, জগতের শৃঙ্খলা, স্বর্গ ও নরক, একটি লাল গ্রহের জন্য নীল, পথিকের গল্প, রাত্রির মেরুদণ্ড, স্থান ও সময়ের ভিতর ভ্রমণ, নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, চিরকালের প্রান্ত, স্মৃতির আঁধার, এনসাইক্লোপিডিয়া গ্যালাক্টিকা, কারা পৃথিবীর জন্য কথা বলবে?

মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি

কসমস-এর প্রথম অধ্যায় ‘মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি’তে বলা হয়েছে যে মানব-প্রজাতি বিবর্তিত হয়েছে বিস্মিত হওয়ার জন্য, সে বিস্ময়-নিবৃত্তি হচ্ছে ‘আনন্দ’ আর বেঁচে থাকার পূর্বশর্ত হচ্ছে ‘জ্ঞান’। সাগান এখানে বিশালতায় ভরা বিশ্বকে আমাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, বিশ্বের সংজ্ঞায় বলেছেন – যা কিছু আছে, যা কিছু ছিল আর যা কিছু থাকবে, তার সবটা মিলেই হচ্ছে এ-মহাবিশ্ব। গ্যালাক্সি, গ্রহ-নক্ষত্রের বর্ণনাসহ তাদের অপরূপ সৌন্দর্যের কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। সেইসঙ্গে এই অপরিমেয় বিশালতায় ভরা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমরা কতটা জানি সে-প্রশ্ন তুলে বলেছেন, এই জানার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের টিকে থাকা।

মহাবিশ্বের বিশালতা ও তার গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহের বর্ণনা শেষে মহাজাগতিক সমুদ্রে হারানো আমাদের ক্ষুদ্র ভঙ্গুর নীল-সাদা পৃথিবীতে নিয়ে এসেছেন। এটা হলো পৃথিবী, অসংখ্য জগতের একটি। তারপরও পৃথিবীটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের জানামতে এখানেই সচেতন বস্তুর অস্তিত্ব রয়েছে : বৈচিত্র্যময় প্রাণিজগৎ। পৃথিবীটা হলো আমাদের ঘর, আমাদের জন্মভূমি। মানবপ্রজাতি এখানে বিকশিত হচ্ছে। এটা হলো সেই জগৎ যে-জগতে আমরা আমাদের আবেগ ও ইচ্ছাকে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শনের জন্য উন্নত করেছি।

কসমসে পৃথিবীকে মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি বলে দেখানো হয়েছে। এখান থেকেই মানবজাতির দীর্ঘভ্রমণ আরম্ভ হয়েছে – এক অর্থে চেতনার যাত্রাভূমি, এখনো পর্যন্ত আমাদের জানামতে। এই বেলাভূমি থেকে বিশ্বকে জানার জন্য কেবল আমরা সমুদ্রে পায়ের গোড়ালি ডুবিয়েছি। এই বেলাভূমি থেকে মহাশূন্যের মহাজাগতিক সাগরে সাঁতার কাটার প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে ভূমিকা নিয়েছে মিসরের কসমোপলিটন শহর আলেক্সান্দ্রিয়া, বর্ণনা করেছেন সেখানকার অসাধারণ প্রতিভাবানদের কথা। ভূমধ্যসাগরের তীরে এই শহর পরিণত হয়েছিল আন্তঃসভ্যতার মিলনমেলায়, যেখানে বিশ্বের তাবৎ জ্ঞানীরা একত্রিত হয়েছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর গবেষণার জন্য তাঁদের ছিল ১০টি বিশাল গবেষণাকক্ষ। আধুনিক সভ্যতার মূল বিষয়গুলো – গণিতশাস্ত্র, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, ভূগোল, চিকিৎসাবিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ইত্যাদি সবকিছুরই গোড়াপত্তন হয়েছিল এই গ্রন্থাগারে। এক অর্থে পৃথিবীর প্রথম বিশ^বিদ্যালয়ও বলা যায়। এর উদ্যোক্তারা সারা পৃথিবীর ভাষা সংস্কৃতি চষে বেড়িয়েছিলেন তাঁদের সংগ্রহের আকাক্সক্ষা পূর্ণ করতে, তাঁদের লোকেরা টাকার থলে নিয়ে দেশে দেশে যেত বই কেনার জন্য। আলেক্সান্দ্রিয়া বিশাল সমুদ্রবন্দর হওয়ার কারণে পৃথিবীর প্রায় সব জাতির লোক এখানে আসত ব্যবসা, বসবাস ও জ্ঞান অর্জন করতে। এই নগরীতে গ্রিক, আরবীয়, মিসরীয়, হিব্রু, পারসিক, নুবিয়ান, সিরিয়ান, আইবেরিয়ান, ফিনিসীয়, ইতালীয়, গল এমনকি ভারত থেকেও লোক আসত এবং তাদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান হতো, বিভিন্ন জাতির সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হতো। সম্ভবত এই নগরীতেই কসমোপলিটন শব্দটি প্রকৃত অর্থ খুঁজে পেয়েছিল – যেন তারা একটি জাতি বা দেশের নাগরিক নয়, বরং মহাবিশ্বের নাগরিক।

গ্রন্থাগারের শেলফগুলোতে স্যামসের জ্যোতির্বিদ

অ্যারিস্টোকার্সের লেখা একটি বই ছিল। তিনি যুক্তিপ্রমাণ দ্বারা বলেছিলেন পৃথিবী হলো গ্রহগুলোর একটি, যা অন্যগুলোর মতোই সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে এবং নক্ষত্রগুলো বিশাল দূরত্বে অবস্থিত। এই সিদ্ধান্তগুলোর প্রতিটি সম্পূর্ণভাবে সঠিক হওয়ার পরও আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রায় দু-হাজার বছর এগুলো পুনরাবিষ্কারে। এই ধরনের রচনা হারানোর মতো লক্ষাধিক ক্ষতিকে বিবেচনায় ধরলে ধ্রুপদ ও প্রাচীন সভ্যতার কীর্তির বিশালতা ও এর ধ্বংসের ভয়াবহতার মর্ম আমরা উপলব্ধি করতে পারব। যদিও হাতে লেখা প্যাপিরাসের স্ক্রলের সংখ্যা অনুমান করা দুঃসাধ্য তবু মনে করা হয়, সম্ভবত পুস্তকের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লক্ষ। ধ্রুপদী বা প্রাচীন সভ্যতায় এমন কিছু ঘটেছিল যা তাদের নানাভাগে বিভক্ত করে ফেলে এবং ফলাফল হিসেবে গ্রন্থাগার আপনিই ধ্বংস হয়ে যায়। গুটিকয়েক রচনাশৈলীর বিচ্ছিন্ন টুকরোসহ কর্মকাণ্ডের খুব অল্প অংশই টিকেছিল। কি প্রচণ্ড কৌতূহলপূর্ণ কিন্তু নাগালের বাইরে ওই অংশ ও টুকরোগুলো! সাগান গ্রন্থের সর্বত্র প্রশ্ন করেছেন, কিন্তু কী এমন ঘটে যাতে একটি উন্নত সভ্যতা নির্দিষ্ট স্তরে এসে ধ্বংস হয়ে যায়? নিজের আগুনে নিজে জ্বলে-পুড়ে মরার কারণ কী? ধারণা করা হয়, গ্রন্থাগারে ব্যাবিলনের এক যাজক বেরোসাসের লিখিত তিনখণ্ডে সমাপ্ত প্রাচীন পৃথিবীর ইতিহাস ছিল যা আমাদের কাছে আর পৌঁছয়নি। এর প্রথম খণ্ডে সৃষ্টিপর্ব থেকে নুহের প্লাবন পর্যন্ত সময়কালকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যে-সময়কে তিনি ৪ লক্ষ ৩২ হাজার বছর বলেছেন অথবা ওল্ড টেস্টামেন্টে উল্লিখিত সময়পঞ্জির চেয়ে তা শতগুণ বেশি। অতীত ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞানের অপূরণীয় ফাঁক থাকার এটাও একটি কারণ।

‘মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি’তে, কার্ল সাগান বলেছেন, প্রাচীন মানবেরা জানতেন যে, পৃথিবী হলো খুবই পুরনো। তাঁরা দূরবর্তী অতীতের মধ্য দিয়ে গভীরভাবে অনুসন্ধান করে তা খোঁজার চেষ্টা করেছেন। আমরা এখন জানি যে, তাঁরা এ-পর্যন্ত যা চিন্তা করেছেন তারচেয়েও অনেক বেশি পুরনো হলো শৃঙ্খলাপূর্ণ মহাবিশ্ব বা কসমস। আমরা মহাশূন্যে বিশ্বকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি ও দেখেছি যে, আমরা বসবাস করছি ধূলির একটি কণায় যা একটি অন্ধকারময় গ্যালাক্সির দূরবর্তী কোণে অবস্থিত এবং সাধারণ একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে চলেছি। এই অপরিমেয় মহাশূন্যে আমাদের অবস্থান একটি কণার মতো হলে যুগের বিস্তৃতিতে আমরা হই ক্ষণিকের আভাসমাত্র।

মহাজগতিক ঐকতানে এক অনুপম সুর

গ্রন্থটির এই দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, পৃথিবীর ছাড়া যে অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র রয়েছে সেখানে কী প্রাণ নেই; যদি থাকে, সেই প্রাণ কেমন হবে? কিসের দ্বারা তৈরি হবে? পৃথিবী জীবকুল যেমন কার্বন অণুর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে? প্রাণ উৎপত্তির পূর্বে একটা সময় ছিল, যখন পৃথিবীটা অনুর্বর এবং সম্পূর্ণ বিরান ছিল। কেমন করে প্রাণের অনুপস্থিতিতে কার্বনভিত্তিক জৈব অণুগুলো তৈরি হয়েছিল? প্রথম জীবন্ত বস্তুগুলোর উদ্ভব কীভাবে ঘটেছিল? কেমন করে প্রাণ মানুষের মতো জটিল বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোয় পৌঁছল, যারা মহাজাগতিক রহস্যের উন্মোচনে বিরামহীনভাবে কাজ করে চলেছে? বহির্জাগতিক প্রাণের অস্তিত্ব যদি থাকে তবে তা কি দেখতে পৃথিবীর মতো হবে? নাকি হতবুদ্ধিকরভাবে ভিন্ন-অন্য পরিবেশের কাছে অন্য ধরনের অভিযোজন। আর কী কী সম্ভব? কার্ল সাগান এর গুরুত্ব অনুধাবন করাতে গিয়ে একটি দার্শনিক উক্তি করেছেন – পৃথিবীতে প্রাণের প্রকৃতি এবং আর কোনো জায়গায় প্রাণ আছে কি না তার অনুসন্ধান করা হলো একই প্রশ্নের দুটো দিক – তাহলো আমরা কারা তার অনুসন্ধান।

গ্রহ-নক্ষত্র ও এদের মধ্যবর্তী শূন্যস্থান পরীক্ষা করে জৈব অণুর প্রাচুর্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, বোঝা যায় – প্রাণের উপাদান সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পর্যাপ্ত সময় দেওয়া গেলে প্রাণের উৎপত্তি ও বিবর্তন হলো মহাজাগতিক অবশ্যম্ভাবিতা (cosmic inevitability)। কিন্তু জগতের স্বল্প অংশেই বুদ্ধিমত্তা ও সভ্যতার বিকাশ ঘটে থাকতে পারে যারা হয়তো আমাদের থেকে এগিয়ে আছে। এই সমস্ত বিষয় আনতে গিয়ে পৃথিবীতে জীবনের বিকাশ, বুদ্ধিমত্তার উন্নতি, প্রাণরসায়নের কথা, বিবর্তনের কথা নিয়ে আসা হয়েছে, আনা হয়েছে ডারউইন ও ওয়ালেসের প্রাকৃতিক নির্বাচনের কথা। পৃথিবীতে প্রাণের বিবর্তনের কথা তুলে ধরেছেন। ডারউইন ও ওয়ালেসের তত্ত্বকে সহজবোধ্যভাবে তুলে ধরার জন্য জাপানের অভ্যন্তরীণ সাগর দানো-উরা’তে হেইকি কাঁকড়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। এই কাঁকড়া কিভাবে নয়শো বছরের মধ্যে জাপানি সামুরাইদের মুখচ্ছবির ছাপসহ কৃত্রিম নির্বাচনের অবতারণা করেছে। বিবর্তনবিদ্যাকে না অনুধাবন করার কারণ হিসেবে বলেছেন, বিবর্তনের মূলমন্ত্রই হলো মৃত্যু ও সময় – এটি হলো অসংখ্য প্রাণরূপের সেই মৃত্যু যারা পরিবেশের সঙ্গে অসম্পূর্ণরূপে অভিযোজিত হয়েছিল; আর এটি হলো সেই সময় যা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিব্যক্তির (mutation) দীর্ঘ পর্যায়ক্রমের জন্য ব্যয়িত হয়েছে – যেগুলো ঘটনাক্রমে অভিযোজিত হয়েছিল। ইয়নের চেয়ে অনেক ছোট যে সহস্রাব্দ তাকে বোঝার ক্ষেত্রেও আমরা দুর্বোধ্যতার সম্মুখীন হই। এর ফলেই চার্লস ডারউইন ও রাসেল ওয়ালেসের মতবাদ অনুধাবন করতে অসুবিধা হয়, এক ধরনের বিরোধিতা গড়ে ওঠে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী সাগান কসমস গ্রন্থে ডিএনএ’র কথাও বলেছেন। এই ডিএনএ বা ডি-অক্সি রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড, প্রাণীদেহে কীভাবে কাজ করে, তার সামান্য পরিবর্তনে কতটুকু পরিবর্তন হতে পারে তা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। মানুষের ডিএনএ হলো শতকোটি নিউক্লিওটাইডের সমান লম্বা একটি মই। নিউক্লিওটাইডের সম্ভাব্য সমাবেশগুলোর বেশিরভাগই অর্থহীন : তারা যে সমস্ত প্রোটিন সংশ্লেষণ ঘটায় তা কোনো উপযোগী কার্যক্রম সম্পন্ন্ন করতে পারে না। নিউক্লিক অ্যাসিডগুলোকে একত্রে রাখার উপযোগী সংখ্যাও হতবুদ্ধিকরভাবে বিপুল – সম্ভবত বিশ্বে ইলেকট্রন প্রোটনের সর্বমোট সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি। সেই মতানুসারে এ-পর্যন্ত যত মানুষ বাস করে গেছেন তার চেয়েও ব্যাপক সংখ্যক স্বতন্ত্র মানুষ সম্ভব। অতএব মানব প্রজাতির নতুন অস্তিত্বের সম্ভাবনার বিস্তৃতি হলো অপরিমেয়। মানুষের কালো ও সাদা রঙের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন, ইউরোপের মানুষের রক্তের লোহিত কণিকা স্থূলভাবে বর্তুলাকার দেখায়, আর আফ্রিকার মানুষের রক্তের লোহিত কণিকা সিকল (Sickle) বা অর্ধচন্দ্রের মতো দেখায়। সিকল কোষ অপেক্ষাকৃত কম অক্সিজেন বহন করে এবং এক প্রকারের রক্তস্বল্পতা ঘটায়। ফলে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিরোধে সক্ষম হয়। বলা বাহুল্য মৃত্যুর চেয়ে রক্তস্বল্পতা অপেক্ষাকৃত ভালো। মানুষের একটি সাধারণ কোষে ডিএনএ’র ভেতরে এক হাজার কোটির বাইরে একটি একক নিউক্লিটাইডের পরিবর্তনেই এটা ঘটে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আমরা এখনো অন্যান্য বেশিরভাগ নিউক্লিটাইডের পরিবর্তনের ফলাফল সম্পর্কে অজ্ঞ।

পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী দুটো প্রাণও প্রাণরাসায়নিকভাবে বহির্জাগতিক প্রাণের চেয়ে অনেক ঘনিষ্ঠ। এ-প্রসঙ্গে উক্ত প্রবন্ধে কার্ল সাগান লিখেছেন, ‘জীববিজ্ঞানের শুধুমাত্র একটি প্রকার নিয়ে, প্রাণসংগীতের একটি নিঃসঙ্গ সুর নিয়ে কাজ করে। হাজার হাজার আলোকবর্ষ বিস্তৃত এই বেণু বাঁশির ক্ষীণ রেশটিই কি একমাত্র পরিপূর্ণ সুর? কিংবা এমন কি হতে পারে না যে, শতকোটি কণ্ঠ অজস্র রাগ-রাগিণী ও সুরময় গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে কখনো সুরে কখনো বেসুর ঐকতানে জীবন সংগীত গেয়ে যাচ্ছে গ্যালক্সি থেকে গ্যালাক্সিতে?’

পদার্থবিজ্ঞানের চেয়ে ইতিহাসের সঙ্গে জীববিজ্ঞানেরই বেশি মিল। বর্তমানকে বোঝার জন্য আমাদের জানতে হবে অতীতকে এবং জানতে হবে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিস্তৃতির মধ্য দিয়ে। জীববিজ্ঞানে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক তত্ত্ব (predictive theory) নেই, যেমন নেই ইতিহাসে। আমরা আমাদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানি অন্য ক্ষেত্রগুলো বোঝার দ্বারা। কোনো বিষয় না তারা কি পর্যায়ের প্রাণ, বহির্জাগতিক প্রাণের একটি ঘটনা জীববিজ্ঞানের বিস্তৃতি (deprovincialize) বৃদ্ধি করবে। প্রথমবারের মতো জীববিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবেন আর কী কী ধরনের প্রাণকাঠামো সম্ভব। যখন আমরা বলি বহির্জাগতিক প্রাণের অনুসন্ধান খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তখন এ-কথা বোঝাই না যে আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি বহির্জাগতিক প্রাণের ব্যাপারে – আমরা শুধু একথা বলতে চাইছি যে, এই অনুসন্ধান মূল্যবান।

মহাজগতের ঐক্য

মহাজগতের শৃঙ্খলাপর্বে সাগান আরম্ভ করেছেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও প্রথমদিককার কল্পকাহিনির লেখক জোহানস কেপালারের একটি উক্তি দিয়ে, ‘আমরা জিজ্ঞেস করি না কী উপকারের উদ্দেশ্যে পাখিরা গান গায়, কারণ গান হলো তাদের আনন্দ যেহেতু তাদের সৃষ্টি হয়েছিল গান গাওয়ার জন্য। অনুরূপভাবে, আমাদের জিজ্ঞাসা করা ঠিক হবে না – কেন মানব মন অস্থির বা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে মহাকাশের রহস্য উন্মোচনে বা অনুধাবনে। চারপাশের ঘটনাবলি খুব বেশি অপরিবর্তিত থাকলে তার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা যেত না, আবার বেশি বিশৃঙ্খলাপূর্ণ থাকলে সেখানেও কিছু করা যেত না, সৃষ্টি হতো না বিজ্ঞানের জন্য অনুপ্রেরণা বা আবেগ। কিন্তু আমরা এই দুইয়ের মাঝামাঝি এমন একটি জগতে বসবাস করি, যেখানে বস্তুর পরিবর্তন ঘটে, তবে বিন্যাস, নিয়মানুসারে। শৃঙ্খলাকে প্রকৃতির নিয়ম বলে ডাকি। কোনো লাঠিকে ওপর দিকে বাতাসের মধ্যে নিক্ষেপ করলে, এটা সর্বদা নিচের দিকে পড়বে। যদি সূর্য পশ্চিমদিকে অস্ত যায়, এটা সর্বদা আবার পরবর্তী সকালে পূর্বদিকে উদিত হবে। এবং এর বৈশিষ্ট্য বা নিয়মকানুনকে বের করা সম্ভব হবে। জানতে শুরু করলাম বৈজ্ঞানিক পথের ধরন। বুঝতে পারলাম বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে আমাদের জীবনযাপনকে উন্নত করতে পারি। মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে বিশাল অংশ অতিবাহিত হয়েছিল ওই সময়ের মধ্যে দিয়ে যখন বর্তমানের কোনো প্রাযুক্তিক সুবিধা ছাড়াই ক্যাম্পফায়ারের নিভন্ত আগুন আর চন্দ্রহীন রাত্রির মধ্য দিয়ে, আমরা নক্ষত্রকে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম।

তারপরও প্রশ্ন জাগে, প্রাচীন মানুষেরা এতটা জ্যোতির্বিজ্ঞানে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল কেন? সে-সময় মানুষ গজলা হরিণ এবং কৃষ্ণমৃগ এবং মহিষ শিকার করত যেগুলোর অভিপ্রয়াণ বা জায়গা বদলানো ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। কৃষিকাজের উদ্ভাবনের পর লক্ষ্য রাখতে হয়েছিল কোন সময়ে কোন ঋতুতে আমাদের শস্য বা ফসল বপন করতে হবে এবং কোন সময়ে ফসল কাটতে হবে। যাযাবর আদিবাসীদের বার্ষিক সভা হতো নির্ধারিত সময়গুলোতে। আকাশের পঞ্জিকা পড়ার ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল জীবন ও মৃত্যুর বিষয়টি। নির্দিষ্ট নক্ষত্রগুলো ওঠে ঠিক সূর্য ওঠার পূর্বে এবং অস্ত যায় সূর্য ডোবার পরে। যুগের প্রবাহে, মানুষেরা শিক্ষা নিয়েছিল তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে। আরো সঠিকভাবে আমরা জেনেছিলাম সূর্য ও চাঁদ এবং নক্ষত্রের অবস্থান সম্পর্কে, আরো অধিকতর নির্ভরযোগ্যভাবে আমরা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পেরেছিলাম শিকারের সময়কে, বীজ বপনের এবং ফসল কাটার সময়, ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে একত্র করার সময়। পরিমাপের সূক্ষ্মতার উন্নতির সঙ্গে, রেকর্ড রক্ষিত হয়েছিল। অতএব জ্যোতির্বিজ্ঞান উৎসাহিত করেছিল পর্যবেক্ষণ ও গণিতশাস্ত্রকে; উদ্দীপনা জুগিয়েছিল লেখার বিকাশ ও অর্থনীতিকে। আসলে মানুষ সূর্য, চাঁদ এবং নক্ষত্রের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিল তাদের জীবনের প্রয়োজনে, বেঁচে থাকার তাগিদে।

টলেমি থেকে আরম্ভ করে টাইকোব্রাহে, কোপার্নিকাস, কেপলার হয়ে নিউটন পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের উন্নতি তুলে ধরেছেন সাগান তাঁর কসমস গ্রন্থে। অন্ধকার যুগে টলেমির প্রতিরূপগুলো চার্চের সহযোগিতায় এক সহস্রাব্দ ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বাধা দিয়েছিল। অবশেষে, ১৫৪৩ সালে, এক পোলিশ ক্যাথলিক নিকোলাই কোপার্নিকাস গ্রহগুলোর আপাত গতিকে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকল্পের আলোকে ব্যাখ্যা করেন। প্রকল্পের সবচেয়ে মারাত্মক দিকটি ছিল ওই প্রস্তাবটি যে, পৃথিবী নয়, সূর্যই ছিল বিশ্বের কেন্দ্রে।

কেপলারের কথা বলতে গিয়ে সাগান বলেন, তাঁর জন্ম এমন এক সময় যখন ভূ-কেন্দ্রিক ও সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশে^র দুটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যকার টানাপড়েনের দ্বন্দ্বে পৃথিবী আলোড়িত। যুগ সন্ধিক্ষণের এই সময়টা ছিল ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দী। কেপলারের ব্যক্তিত্বের মধ্যে ছিল টলেমির মতো জ্যোতিষবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যার দ্বৈত অবস্থান। তাঁর সময়ে মানবীয় উদ্দীপনাগুলো ছিল পায়ের বেড়িতে বাঁধা এবং মানসিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ। সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান অপেক্ষা এক বা দুই সহস্রাব্দ পূর্বের গির্জার মতাদিকে চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু মহাবিশ্বের সৃজনশীল ক্ষমতাই কেপলারের ঈশ্বর ছিলেন। তিনি বালক বয়সে অদম্য কৌতূহল দিয়ে সেই সময়কার ধর্মীয় বিশ্বাস বা প্রচলিত সামাজিক অনুশাসন বা ভয়কে জয় করেছিলেন। তিনি জগতের পরিণতি জানতে ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, মানবজাতির শেষ গন্তব্য অনুধাবনে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ঈশ্বরের মনকে বুঝতে সাহসী হয়েছিলেন। কেপলারের গাণিতিক জীবনের আনন্দ, ইউক্লিডীয় জ্যামিতির প্রভাব, সেইসঙ্গে জ্যামিতির সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক কেপলারের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একটি সৌরকেন্দ্রিক বিশ্ব মিলে গিয়েছিল; তাই তিনি এই ধারণাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন পরম আবেগে। সূর্য হলো একটি ঈশ্বরের রূপক, যার চারিদিকে বাকি সবকিছু আবর্তন করে।

আমরা প্রকৃতির নিয়মানুসারে ছুটে চলি যা কেপলার প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন। যখন আমরা গ্রহের উদ্দেশে স্পেসক্র্যাফট পাঠাই, পর্যবেক্ষণ করি যুগ্মনক্ষত্র, যখন আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি দূরবর্তী গ্যালাক্সির গতি, তখন আমরা বিশ্বের সর্বত্র কেপলারের নিয়মকে মেনে চলাকেই অবলোকন করি। কেপলারের গ্রহগতি সংক্রান্ত তিনটি নীতিমালা শৃঙ্খলা, সৌন্দর্য, গতিকে ব্যাখ্যায় এমন এক গাণিতিক সূত্রের দিকে নিয়ে যায় – যা আমাদের পিথাগোরীয় অনুভবের কাছে পৌঁছে দেয়। ঘড়ির নিয়মকানুনে চলা জগৎকে তিনি ডেকেছিলেন দ্য হারমনি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড বলে। কেপলার বলেছিলেন – ‘জ্যোতির্বিজ্ঞান হলো পদার্থবিজ্ঞানের অংশ।’ কার্ল সাগান বলেছিলেন, কেপলার দাঁড়িয়েছিলেন ইতিহাসের চূড়ায়; তাঁকে বলা যায় শেষ বৈজ্ঞানিক জ্যোতিষী এবং প্রথম জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্য, তার তত্ত্বকে প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য সায়েন্স ফিকশন লিখেছিলেন। নাম Somnium, ‘The Dream’ – চন্দ্রপৃষ্ঠে দাঁড়ানো অভিযাত্রীর ঘূর্ণনরত পৃথিবী পর্যবেক্ষণ। সাগান বলেছেন, যিনি একই সঙ্গে সায়েন্স ফিকশনের স্রষ্টা আবার কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও সারির বিজ্ঞানী ছিলেন। আজ অভিযাত্রীরা কম্পিউটার, রোবট ব্যবহার করে মহাশূন্যের বিশালতায় অনুসন্ধান পরিচালনা করে চলেছে এবং পথ চলছে গ্রহগতির তিনটি সূত্রের নির্দেশনায়, যা কেপলার তাঁর জীবনব্যাপী কঠোর পরিশ্রমে উন্মোচন করেছিলেন।

কার্ল সাগান খেদের সঙ্গে বলেছেন, এত সংগ্রাম, এত কষ্ট, ত্যাগের মধ্য দিয়ে এসেও সমসাময়িক পশ্চিমা সমাজে, পত্রিকাগুলোতে জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর প্রতিদিন একটি কলাম বের হয়। সেখানে সপ্তাহে জ্যোতির্বিদ্যার ওপর একটি কলাম থাকাও খুবই কঠিন। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে জ্যোতির্বিদ থেকে দশগুণ বেশি জ্যোতিষবিদ আছে। আর বাংলাদেশ বিজ্ঞানচর্চা থেকে বহু দূরে। সাগান এই গ্রন্থের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমের গভীর গিরিখাতের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের আর্তনাদ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা ৪০ হাজার প্রজন্মের নারী-পুরুষের পৃথিবীতে সংগ্রামের কথা, বর্তমানে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই তা শোনার জন্য, যাদের সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না, যাদের ওপর ভিত্তি করে আমাদের সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে।

স্বর্গ ও নরক

‘স্বর্গ ও নরক’ বা ‘হ্যাভেন অ্যান্ড হেল’-এ কার্ল সাগান দেখিয়েছেন, পৃথিবী একটি মনোরম জায়গা, অন্তত আমাদের মতো প্রাণের জন্য। অথচ আমরা ক্রমাগত প্রতিবিপরীতভাবে গ্রহের ক্ষতি করে চলেছি। একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথিবীকে শুক্রগ্রহের ভয়াবহ পরিবেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছি, আরেকদিকে বন-জঙ্গল, গাছ ও তৃণভূমি উজাড় করে ‘অ্যালবেডো’ প্রতিক্রিয়ায় মঙ্গলের প্রাণহীন অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছি। এছাড়াও ধূমকেতু, উল্কাপিণ্ডের আঘাতে নির্দিষ্ট সময় পরপর পৃথিবীর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশ ভালো রকম রয়েছে; তার জ্বলন্ত প্রমাণ হলো তাঙ্গুসকার ১৯০৮ সালের সেই বিস্ফোরণ, যা ধূমকেতুর আঘাতে বিস্ফোরিত হয়েছিল। বিস্ফোরণের ফলে লন্ডনের রাস্তায় গভীর রাতে পত্রিকা পড়া যেত। আমাদের মনোরম নীল গ্রহ হলো পৃথিবী, এটা হলো আমাদের বাড়ি। শুক্র হলো খুবই উত্তপ্ত, মঙ্গল হলো খুবই ঠান্ডা। কিন্তু পৃথিবী সঠিক অবস্থায় আছে। ওই গ্রহগুলোর তুলনায় পৃথিবী হলো মানবজাতির জন্য একটি স্বর্গ। মোটের ওপর আমাদের উদ্ভব এখানে ঘটেছে। কিন্তু এই উপযোগী স্থানীয় জলবায়ু অস্থায়ী হতে পারে। আমরা ক্রমাগতভাবে আমাদের গ্রহকে মারাত্মক এবং অতিবিপরীত উপায়ে ক্ষতি করে চলেছি। আমরা কি মারাত্মক পরিণতির কোনো প্রক্রিয়াকে জাগিয়ে তুলছি যা শুক্রগ্রহের নারকীয় পরিবেশ অথবা মঙ্গলের গ্লোবাল বরফযুগের মতো পরিবেশের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? এর সহজ উত্তর হলো – কেউ জানে না।

প্রায় ৩০-৪০ লক্ষ বছর আগে মানুষের আগমন ঘটেছিল এই পৃথিবীতে। ৪৫০ কোটি বছরের ইতিহাসে নানারকম

চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে পৃথিবী এ-পর্যায়ে এসেছে। বর্তমানে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রাযুক্তিক উৎকর্ষ দ্বারা এমন একটি পর্যায়ে এসেছি যেখানে এর জলবায়ুকে আমরা প্রভাবিত করতে পারি। কীভাবে আমরা এই শক্তি ব্যবহার করব তার ওপর নির্ভর করছে এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। পৃথিবীর সম্পদের ওপর স্বল্পমেয়াদি সুবিধার মূল্য দেব না দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার মূল্য দেব, যার ভিত্তিতে আমাদের প্রজন্মের প্রজন্ম নিরাপদ থাকে। দীর্ঘ সময়ের ভিত্তিতে চিন্তা করলে আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম অথবা তৃতীয় প্রজন্মের শিশুদের জন্য উদ্বিগ্ন হওয়াটাই এখন স্বাভাবিক। তাদের এবং আমাদের গ্রহে জটিল জীবনকাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে হলে পৃথিবী নামের বাড়িটিকে ভালোবাসা জরুরি।

লালগ্রহের জন্য নীল

‘একটি লালগ্রহের জন্য নীল’ বা ‘দ্য ব্লু ফর রেড প্লানেট’-এ সাগান পুরোটাই মঙ্গলগ্রহ নিয়ে লিখেছেন। তিনি প্রশ্ন করেছেন, মঙ্গল নিয়ে কেন মানুষের এত আগ্রহ, এত মাথাব্যথা? কেন শনিগ্রহ নয়, কেন প্লুটো নয়, কেন অন্য গ্রহ নয়। তার কারণ, প্রথম দৃষ্টিতে মঙ্গল দেখতে অনেকটা পৃথিবীর মতো। এটা সবচেয়ে কাছের গ্রহ যার পৃষ্ঠ আমরা দেখতে পাই। যার দুই মেরুতে আছে বরফের টুপি, বয়ে যাওয়া সাদা মেঘের ভেলা, প্রচণ্ড ধূলিকণার ঝড়, ঋতু অনুযায়ী পরিবর্তন ঘটে মঙ্গলের লাল পৃষ্ঠে, এমনকি ২৪ ঘণ্টায় দিনরাত্রি হয়। এইগুলো আমাদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছিল মঙ্গলগ্রহকে প্রাণী অধ্যুষিত জগৎ হিসেবে। এইভাবে মঙ্গল পরিণত হয় একধরনের উপকথার জগতে, যার উপর আমরা মেলে ধরেছিলাম পৃথিবীর আশা-নিরাশার ছায়া। মঙ্গলকে ঘিরে অবশ্য পৌরাণিক কাহিনি বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্ব নামক প্রথম গ্রন্থ জেনেসিস-এর মতোই প্রাচীন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রকৌশলিক বিস্ময়, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল বিশাল বিশাল সব খাল কাটার কাহিনি : সুয়েজ খাল সম্পূর্ণ হলো ১৮৬৯ সালে; করিন্থ খাল হলো ১৮৯৩-এ; পানামা খাল তৈরি হলো ১৯১৪ সালে; এবং গ্রেট লেক লক, আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সেচ খালগুলো। যদি ইউরোপ-আমেরিকার লোক এই ধরনের কৃতিত্ব দেখাতে পারে, কেন তাহলে মঙ্গলবাসীরা পারবে না? সেখানে কি এমন হতে পারে না – প্রাচীন ও জ্ঞানী প্রজাতিরা লাল গ্রহের শুষ্কতার বিরুদ্ধে আরো বিস্তৃত চেষ্টা ও সাহসী সংগ্রামে লিপ্ত? এসব ঘটনা সত্য প্রমাণিত না হলেও বাস্তবে আমাদের অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে।

মঙ্গলকে নিয়ে এই আবেগ লয়েল মানমন্দিরের মতো একটা ভালো মানমন্দির উপহার দিয়েছে তারা-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের ব্যপারে এবং অন্য গ্রহের প্রাণ অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেছে; পৃথিবীর চিন্তাভাবনাকে বহুদূর এগিয়ে দিয়েছে। লয়েলের বক্তৃতা শুনে কনস্ট্যানটিন সিওলকোভস্কি ও রবার্ট গর্ডাডের মতো মানুষেরা তরুণ বয়সে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। প্রথমজন রকেটকে মহাশূন্যে অর্থাৎ গ্রহ অভিযানের বাহন হিসেবে চিন্তা করেছিলেন এবং দ্বিতীয়জন প্রথম অনেক উঁচু দিয়ে চলার জন্য তরল জ্বালানি ব্যবহার করে তা সম্ভব করে তুলেছিলেন। তাঁরা কক্ষপথে প্রদক্ষিণনরত একটি বিজ্ঞান পরীক্ষাগারের এবং প্রাণের অনুসন্ধানে প্রোব মঙ্গলে যাত্রা নিয়ে কল্পনায় বিভোর ছিলেন। এই দুটো স্বপ্নই আজ পূরণ হয়েছে। শেষের স্বপ্ন্ন পূরণে কার্ল সাগান নিজেও অনেক বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। মঙ্গলের রহস্য উন্মোচনে অনেকে অনেক ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেছেন, কেউ কেউ জীবনও বাজি রেখেছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন উলফ ভিস্নিয়াক, যিনি ১৫০ ফুট পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে পড়ে মারা গিয়েছিলেন।

প্রবন্ধটিতে মঙ্গলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন কার্ল সাগান, বলেছেন, আমরা প্রতিষ্ঠিত করেছি একটি উপস্থিতি – সেখানে আমরা পূরণ করেছি শতাব্দীর একটি স্বপ্নকে। কার্ল সাগান বলেছেন, ‘মঙ্গলের মাটিতে আমরা নামবো। কিন্তু আমি আতঙ্কিত, কারণ পৃথিবীকে বাজেভাবে ব্যবহার করার প্রচুর উদাহরণ আছে। মঙ্গলে অণুজীবের মতো প্রাণ পাওয়া গেলেও আমাদের সেখানে ‘কিছুই করা উচিত হবে না’ – যেকোনো বিচারেই চিন্তা করি না কেন। পার্শ্ববর্তী একটি গ্রহে স্বতন্ত্র জীববিজ্ঞানের (Independent Biology) অস্তিত্ব আমাদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। সুতরাং সংরক্ষণের মাধ্যমে অন্য যে-কোনো ব্যবহার থেকে তাকে দূরে রাখতে হবে। আর যদি প্রাণ না থাকে তাহলে এটাকে ধীরে ধীরে বাসযোগ্য করে তুলতে পারি, যদিও তাতে শত শত বছর এমনকি হাজার বছরও লেগে যেতে পারে।’

পথিকের গল্প

‘পথিকের গল্প’তে সাগান ত্রয়োদশ শতকের আলবার্টাস ম্যাগনাসের একটি উক্তি দিয়ে শুরু করেছেন। সেটি হলো, ‘আরো কি অনেক জগৎ আছে, না একটিই জগৎ – এটাই প্রকৃতি অধ্যায়নে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।’ ১৯৭৭ সালে এরকম কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সন্ধানে মানববিহীন ভয়েজার মহাকাশযান আধাবুদ্ধিবৃত্তিক কম্পিউটার নিয়ে নক্ষত্রের পথে চলে গেছে। সৌরজগৎকে উন্মোচনে এই ভ্রমণ মানবজাতিকে মহিমান্বিত করবে। মানুষের ক্ষমতা বৃদ্ধির সীমানা দেখাতে গিয়ে তিনি বলেছেন, পনেরো কি ষোলো শতকের দিকে কয়েকদিনের মধ্যে স্পেন থেকে অুড়ৎবং-এ যাওয়া যেত, বর্তমানে ঠিক একই সময়ে পৃথিবী থেকে চাঁদে যাওয়া সম্ভব। অল্প কয়েক মাসের মধ্যে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে নতুন জগৎ নামে পরিচিত আমেরিকায় পৌঁছানো যেত। বর্তমানে এই সময়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সৌরজগৎকে অতিক্রম করে শুক্র বা মঙ্গলে নামা যায়। এগুলিও বাস্তবিকই নতুন জগৎ যা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দীতে হল্যান্ড থেকে চীনে যাওয়া যেত এক বছর কি দু-বছরের মধ্যে। এখন ভয়েজারে একই সময়ে বৃহস্পতিতে যাওয়া যায়। পনেরো থেকে সতেরো শতকের মধ্যে ইতিহাস অনেকগুলো বড় বাঁক নিয়েছিল। এই হল্যান্ড জ্ঞানের জন্য উল্লেখযোগ্য স্থানে পরিণত হয়েছিল। যখন গ্যালিলিও ও ব্রুনোকে তাঁদের বিপ্লবাত্মক ধারণার জন্য শাস্তি ও ভয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে সেই সময়ে হল্যান্ডে একটু অন্যরকম পরিবেশ ছিল। উদ্ভাবক ও আবিষ্কারকদের জন্য নিরাপদ জায়গা ও তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছিল। তার জ্বলন্ত প্রমাণ হলেন জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনস। সাগান প্রবন্ধটিতে হল্যান্ডের এই বিজ্ঞানীর আবিষ্কার ও কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক কথাই বলেছেন। সাগান যেন মহাকাশে ভয়েজারের ভ্রমণের সঙ্গে মানবজাতির ফেলে আসা অতীতের গল্প বলে চলেছেন বারবার অতীতকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। কীভাবে আমরা পুরো পৃথিবীকে ঘর বানিয়ে ফেললাম। এ যেন ফেলে আসা স্মৃতি আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে কথোপকথন।

স্মৃতির আধার

‘স্মৃতির আধার’ বা ‘পারসিসট্যান্স অফ মেমোরি’ অধ্যায়টি হয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ বছর আগেকার মানুষের সৃষ্টি সংক্রান্ত এশিরীয় বর্ণনার একটি কবিতা দিয়ে। কবিতাটিতে তাদের নিজেদের এবং প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের তীব্র ইচ্ছাকে ব্যক্ত করা হয়েছে। পৃথিবীর সকল গ্রন্থাগারে বিভিন্ন বইয়ের শব্দ ও ছবিতে তথ্যসংখ্যা হলো অনেকটা ১০১৬ বা ১০১৭ বিট। অবশ্যই এর বেশির ভাগ প্রয়োজনাতিরিক্ত। কিন্তু আর কোনো প্রাচীন জগতে, যেখানে প্রাণের উদ্ভব ঘটেছে পৃথিবীর চেয়ে অনেক আগে, সম্ভবত তারা জানে ১০২০ বা ১০৩০ বিট – শুধু তথ্যই নয়, বরং তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভিন্ন তথ্য। তিমিদের নিঃসঙ্গতার কথা বলেছেন। বলেছেন পৃথিবীর দু-প্রান্তে থেকেও দুটি তিমির সাবসনিক শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগের কথা। কীভাবে মানুষ লিপস্টিকের মতো প্রসাধনের জন্য তিমি হত্যা করেছে। সমুদ্রে স্টিম ইঞ্জিন চলার ফলে ফিনব্যাক তিমির যোগাযোগ ৫০০ মাইল জায়গায় মধ্যে কমে এসেছে। তাদের মস্তিষ্কের দৈহিক গঠনের মতো মস্তিষ্কের পরিমাণ যে-কোনো কিছু থেকে বেশি। হাম্পব্যাক তিমির সম্ভাষণসহ পৃথিবীর আরো ৫৫টি ভাষায় এই সম্ভাষণের রেকর্ড নিয়ে ১৯৯০ সালের দিকে সৌরজগতের বাইরে চলে গেছে।

লাগামছাড়া বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ও প্রচারণা আমাদের বিভ্রান্ত করে ফেলেছে। মস্তিষ্ক বিবর্তনের খারাপ ফলাফলকেই আমরা জাগিয়ে তুলছি আমাদের অর্জিত প্রাযুক্তিক উৎকর্ষ দিয়ে। পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার মানুষের সঙ্গে, অপেক্ষাকৃত কম বুদ্ধিমান প্রাণীদের সঙ্গে, বৃহৎ নরবানরদের, ডলফিনদের সঙ্গে আমাদের যে আচরণ তাতে যদি অনেক উন্নত বহির্জাতিক প্রাণের সঙ্গে দেখা হয়, তারা যদি আমাদের ধ্বংস করতে চায়, তাহলে আমাদের কী নৈতিকভাবে বলার কিছু আছে? মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশের কথা আলোচনা করতে গিয়ে সাগান বলেছেন, স্টপাইনাল কর্ডের স্ফীত ঊর্ধ্বাংশে অবস্থান করছে সবচেয়ে পুরনো অংশ ‘ব্রেইন-স্টেম’। এই অংশটিকে জবঢ়ঃরষরধহ পড়সঢ়ষবী বা আর-কমপ্লেক্স বা সরীসৃপজাতীয় মস্তিষ্ক ঢেকে রাখে। যার উদ্ভব ঘটেছিল ২৫ কোটি বছর আগে সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীদের মাঝে। আমাদের প্রত্যেকের স্কালের একেবারে ভেতরের দিকটা কুমিরের মস্তিষ্কের মতো অনেকটা। আক্রমণাত্মক আচরণ, ধর্মীয় আচার-আচরণ, দেশরক্ষা, সামাজিক যাজকতন্ত্রের জন্য এই অংশ দায়ী – এই অংশের কারণেই আমরা নেতা নামক ব্যক্তিটির পেছনে যুক্তিহীনভাবে অন্ধের মতো দৌড়াই।

আর-কমপ্লেক্সকে ঘিরে আছে যে-অংশটা তা হলো লিম্বিক সিস্টেম অথবা স্তন্যপায়ীদের মস্তিষ্ক, যার উদ্ভব ঘটেছিল কোটি কোটি বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে। ‘লিম্বিক সিস্টেম’ হলো আমাদের মেজাজ-মর্জি, আবেগ, উদ্বেগের এবং নবীনদের প্রতি স্নেহ-বাৎসল্যের একটা বড় উৎস। মস্তিষ্কের আগের আদিম অংশগুলোকে নিচে রেখে এবং তাদের সঙ্গে বৈরিতামূলক সহাবস্থান বজায় রেখে লক্ষ লক্ষ বছর আগে আমাদের প্রাইমেট পূর্বপুরুষদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল সেরেব্রাল কর্টেক্স। সেরেব্রাল কর্টেক্স এখানে আছে বলে আমাদের আছে ধারণা ও প্রেরণা, এটা এখানে বলেই আমরা পড়ালেখা করি, এখানে বলেই গণিতশাস্ত্র নিয়ে মাথা ঘামাই, সংগীত রচনা করি, কবিতা লিখি। কর্টেক্স আমাদের সচেতন জীবন-যাপনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটা হলো আমাদের প্রজাতির স্বতন্ত্রতা, মানবিকতার আবাসস্থল। সভ্যতা হলো ‘সেরেব্রাল কর্টেক্সে’র একটি ফলাফল। মানুষের মধ্যে শুভ ও অশুভ প্রবৃত্তির যে চিরন্তন দ্বন্দ্ব তা প্রকৃতপক্ষে আর-কমপ্লেক্সের সঙ্গে লিম্বিক সিস্টেম ও সেরেব্রাল কর্টেক্সের বিরোধ।
আর-কমপ্লেক্স মুক্ত হওয়ার একটাই উপায় তা হলো, অন্তহীন জ্ঞানচর্চা, যা সেরেব্রাল কর্টেক্সকে বিকশিত করবে; সেই তুলনায় আর-কমপ্লেক্সকে ক্রমশ দুর্বল করে দেবে। আর জ্ঞানচর্চা তথা গণিত, বিজ্ঞান, সংগীতচর্চা, কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে আমাদের নিয়ে যাবে সেই উপলব্ধিতে, যা আমাদের শেখাবে মহাবিশ্বের তুলনায় মানুষ কত ক্ষুদ্র, কত অল্প সময় অধিকার করে আছে; ক্ষমতার লোভ কত অর্থহীন।

এনসাইক্লোপিডিয়া গ্যালাকটিকা

‘এনসাইক্লোপিডিয়া গ্যালাকটিকা’তে বহির্জাগতিক প্রাণের সন্ধানে আমরা কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করেছি, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিপজ্জনক দিকগুলো কী, আমাদের গ্যালাক্সিতে উন্নত প্রাযুক্তিক সভ্যতা থাকার সম্ভাবনা কতটুকু, থাকলে সংখ্যা কত? এক কোটি উন্নত প্রাযুক্তিক সভ্যতার হিসাব তিনি দিয়েছেন। কীভাবে একটি সভ্যতা জৈবিক বিবর্তন ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন ধারায় উচ্চশিখরে উঠে এসে তাঁর অন্তঃগ্যালাকটিক জাল বিস্তার করে তা বর্ণনা করেছেন। হয়তো সেসব সভ্যতা এত উন্নত হতে পারে যে তারা আমাদের কাছে থাকলেও তাদের অস্তিত্ব আমরা অনুভব করতে পারব না। কিন্তু পৃথিবীর বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায় যে, কোনো সময়ে ১০টির বেশি সভ্যতার অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না। তাহলে কী এমন সমস্যা সৃষ্টি হয় যার ফলে প্রাযুক্তিক জ্ঞানসম্পন্ন সভ্যতার এক কোটির মধ্যে শুধু ১০টির টিকে থাকার সম্ভাবনা দেখা যায়। কেন প্রাযুক্তিক সভ্যতার আত্মধ্বংসের বিষয়টা মারাত্মক হয়ে ওঠে? সভ্যতাগুলোর প্রাযুক্তিক জ্ঞানসম্পন্ন অবস্থায় পৌঁছানোর পর নিজেদের ধ্বংস করার প্রবণতা যদি খুব বেশি হয় তাহলে আমাদের ছাড়া অন্য কাউকে কথা বলার জন্য পাব না, আমরাও নিয়তির মতো ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাব। যে-সভ্যতার বিবর্তনের সর্পিল পথ ধরে গড়ে উঠতে কয়েক শত কোটি বছর লেগে যায়, ক্ষমার অযোগ্য এক ভুলে এভাবেই সেটি নিজেকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে। হয়তো সভ্যতাগুলো পরাভূত হয় লোভ আর অজ্ঞানতার কাছে, ধ্বংস হয়ে যায় নিউক্লিয়ার যুদ্ধের কাছে। সাগানের মতো বিজ্ঞানীরা বলেছেন, সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারা হিসাব করে ও বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বলা যায়, প্রতি শতাব্দীতে পৃথিবীর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অর্ধেকের বেশি (ষাট শতাংশের) সম্ভাবনা আছে।

কিন্তু অন্যরকম অবস্থা বিবেচনা করা যাক, যেখানে অন্তত অল্প কিছু সভ্যতা উচ্চস্তরের প্রযুক্তিসম্পন্ন জ্ঞান নিয়ে বাঁচতে শিখেছে; যেখানে মস্তিষ্কের বিবর্তনে উদ্দেশ্যহীনভাবে আরোপিত অসংগতি সচেতনভাবে দূর করে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পেরেছে; অথবা যদি বড় রকমের বিপর্যয় ঘটে, সেই বিপর্যয়ও শতকোটি বছরের বিবর্তনে কাটিয়ে উঠতে পারবে। ওই রকম সমাজগুলোর দীর্ঘ সময় ধরে সাফল্যজনকভাবে টিকে থাকা সম্ভব।

সাগান তাঁর কসমস গ্রন্থের শেষ অধ্যায় ‘কারা পৃথিবীর জন্য কথা বলবে’ পর্বে অনেকগুলো প্রশ্ন তুলে এনেছেন – বিবর্তনের এই অসংগতি কেমনভাবে দূর হবে? বারবার আয়োনিয়া, আলেক্সান্দ্রিয়ার ঘটনা থেকে বোঝা যায়, কোনো এক অঞ্চলে একটি সভ্যতা কিছুদিন পর আপন ইচ্ছায় ধ্বংস হয়ে যায়। রাজনৈতিক-সামাজিক অনেক কারণই হয়তো সেখানে থাকে। ঢাকা শহর তার উদাহরণ হতে পারে। কিন্তু একটি ব্যাপার স্পষ্ট। তা হলো, সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিজ্ঞানের গণবিচ্ছিন্নতা সেই সময়কার জ্ঞানবিজ্ঞানের ধারণা থেকে। ‘হু স্পিকস ফর আর্থ’ প্রবন্ধে সাগান পৃথিবীর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকের নিয়ামক ভূমিকা পালনকারী কয়েকজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরমাণু অস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষমতাধর দেশ ছাড়াও ছোট দেশগুলো নানা মাত্রায় পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। আর বলছে, তাদের দেশের জনগণের অধিকতর নিরাপত্তা বিধানে তারা এই কাজ করছে। কিন্তু পৃথিবীর আবহাওয়া ক্রমাগতভাবে মনুষ্যবসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। তেজস্ক্রিয়তার কারণে নানা ধরনের মরণব্যাধি বেড়ে যাচ্ছে। সবাই তাদের দেশ এবং জাতির জন্য কথা বলছে। কিন্তু পৃথিবীর জন্য কারা কথা বলবে? পৃথিবীকে এই ভয়াবহ বিপদ থেকে কারা রক্ষা করবে? এটা তো সত্যি যে, এই পৃথিবী না বাঁচলে এই জাতি, রাষ্ট্র কোনো কিছুই থাকবে না।

উপসংহার

চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে ২০২৫ সালের প্রথম দিকে এক বক্তৃতায় আমি ভয়েজারের গোল্ডেন রেকর্ডে সুরশ্রী কেশরবাই কেরকারের একটি ঠুমরি শোনাই। ঠুমরিটি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে আয়োজনটি শেষ হয়। সংগীত এবং বিজ্ঞানের অখণ্ড বা ইনটিগ্রেটেড মেলবন্ধন দর্শকদের বিমোহিত করে। অনুষ্ঠান শেষে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩০০ দর্শক-শ্রোতার অনেকের চোখ ছিল আর্দ্র; ধ্রুপদী সংগীতের সঙ্গে বিজ্ঞানের এই সম্পর্ক উন্মোচনে বিস্ময় ও মুগ্ধতা আমাকে আপ্লুত করে।

পাঁচ ঘণ্টার গোল্ডেন রেকর্ডে পৃথিবীকে বহির্জাগতিকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শব্দাবলি ও ছবির রেকর্ড রয়েছে। বহির্জাগতিক বুদ্ধিমত্তার মুখোমুখি হলে পৃথিবীর শিশুদের পক্ষ থেকে ছয় বছর বয়সী শিশু, নিক সাগান বলে উঠবে : ‘হ্যালো, ফ্রম চিলড্রেন অফ দ্য প্লানেট আর্থ।’ বাংলায়, ‘পৃথিবীর শিশুদের পক্ষ থেকে অভিবাদন।’ এমন একটি শুভেচ্ছাসহ বহু বার্তা নিয়ে ভয়েজার মহাকাশযান ছুটে চলেছে আন্তঃনাক্ষত্রিক শূন্যতার মহাসাগরে। এখানে পাঁচ ঘণ্টার একটি রেকর্ডে পৃথিবীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শব্দ, ছবি, সংগীত, অনুভূতি লিপিবদ্ধ রয়েছে। এখানে নেই উঁচু-নিচু, নেই বিভেদ, নেই ক্ষমতা আর সম্পদের বড়াই; রয়েছে বৈচিত্র্যময়তা, সম্প্রীতি আর সৃজনশীলতার প্রকাশ। আজো পৃথিবীর মানুষ কার্ল সাগানের তত্ত্বাবধানে সৃষ্ট এই রেকর্ড আত্তীকরণে সক্ষম হয়নি। কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাটেরিয়াল পৃথিবীর স্কুলশিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি তা স্পষ্ট নয়! অথচ পৃথিবী ভয়াবহ সাংস্কৃতিক সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে।

গোল্ডেন রেকর্ডকে না পারলেও কসমস বইটিকে পৃথিবীর মানুষের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। পৃথিবীতে বিজ্ঞানের বইয়ের ইতিহাসে কসমস এমন একটা বই যেখানে বিজ্ঞানের বর্ণনাকে কাব্যময়তার জগতে নিয়ে আসা হয়েছে। যেখানে গণিতের যুক্তি বিজ্ঞানের তত্ত্ব, ইতিহাসের কাহিনি আর চলচ্চিত্রের নাটকীয়তার এক মহাসমাবেশ ঘটানো হয়েছে। এজন্য বিজ্ঞানকে খাটো করতে হয়নি। সাধারণ মানুষকে বোঝানোর জন্য ‘জনপ্রিয় বিজ্ঞান’ বলে কোনো নতুন বিভাগ খুলতে হয়নি। বিজ্ঞান মানুষের কাছে ধরা দিয়েছে আরো ব্যাপকতা নিয়ে, আরো গভীরভাবে। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন এই মহাবিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলই খালি। সেই তুলনায় আমাদের অবস্থান কত ক্ষুদ্র। প্রাণ কোনো বিশেষ ব্যাপার নয়। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে বিশ্বের যে-কোনো জায়গায় প্রাণের উদ্ভব সম্ভব। ইতিহাসের পর ইতিহাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, সাংস্কৃতিক পার্থক্য, মূল্যবোধের অভাব, সামান্য লোভ আর তুচ্ছ সব কারণে পৃথিবীর এক সভ্যতা আর এক সভ্যতাকে কত নির্মমভাবে ধ্বংস করেছে।

সাগান বলেছেন, ‘বিজ্ঞান কখনো শেষ হবে না এবং আমরা পৃথিবীকে অর্থবহ করে তুলতে পারব আমাদের প্রশ্ন করার সাহস এবং উত্তরের গভীরতা দ্বারা।’ বর্তমান সভ্যতার প্রেক্ষাপটে তিনি এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, উন্নতির সঙ্গে বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির যদি সমন্বয় ঘটানো না যায়, তাহলে পুনরায় মধ্যযুগের মতো অন্ধকার যুগ আসন্ন।

ষষ্ঠ গণবিলুপ্তি, প্রাযুক্তিক বয়ঃসন্ধিকাল, নিউক্লিয়ার অস্ত্রের হুমকি আর সাংস্কৃতিক দ্বণ্ড আমাদের জানাচ্ছে, আমরা সেই অন্ধকার পথ ধরে হাঁটছি।