আধুনিক বাংলা ছড়াসাহিত্যের এক অনন্য সাধক সুকুমার বড়ুয়া (১৯৩৮-২০২৬)। প্রায় পঁয়ষট্টি বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ছড়াসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন তিনি। বাংলাদেশে এত দীর্ঘকাল নিবিষ্ট ছড়াসাহিত্যচর্চা আর কেউ করেননি। তবে তাঁর ছড়ার সংখ্যা বিপুল-বেশুমার নয়। সাকল্যে হাজার দুয়েকের মতো ছড়া লিখেছেন তিনি। চর্চার ব্যাপ্তিকাল বিবেচনা করলে রচনার এই পরিমাণ অনেকের তুলনায় হয়তো কম। কিন্তু তাঁর পাঠকপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়। এর পেছনে নিশ্চয় কারণ আছে। কারণ তাঁর ছড়া স্বতঃস্ফূর্ত, জীবনঘনিষ্ঠ এবং সর্বভোগ্য। ছড়ার আনন্দকে তিনি বয়সের বিভাজনে খণ্ডিত করেননি। ছোটদের বড়দের এই বিভাজনের চেয়ে ছড়ায় বিষয়ের ব্যঞ্জনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন সর্বাগ্রে। তাঁর ছড়ার শিশু ছোট মানুষ নয়, ভিন্ন যুক্তি-বুদ্ধিসম্পন্ন বিশিষ্ট মানুষ। তাই তাঁর ছড়ার আনন্দ সর্বজনীন।
ছড়াসাহিত্যে সুকুমার বড়ুয়ার আত্মপ্রকাশ ১৯৫৮ সালে। দেশবিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান নামের এই ভূখণ্ডের সাহিত্য-সংস্কৃতি তখন নতুন বর্ণ-বৈভবে জেগে উঠছিল। শিশুসাহিত্যের ছড়া শাখাটিও তখন নবোদ্যমে বিকাশমান। জাতীয় দৈনিকগুলোর ছোটদের পাতায় ছড়ার বেশ সমাদর। সেই তখন, ১৯৫৮ সালের ৩রা জুলাই দৈনিক সংবাদ পত্রিকার ছোটদের আসর ‘খেলাঘর’ পাতায় সুকুমার বড়ুয়ার প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয়। সেটি ছিল বর্ষা সংখ্যা। ছড়াটির শিরোনাম ছিল ‘বৃষ্টি নেমে আয়’। প্রকাশিত লেখাগুলোর মান নির্ধারণপূর্বক পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা ছিল। সুকুমার বড়ুয়ার ছড়াটি তৃতীয় স্থান লাভ করে। সেই তাঁর সাহিত্যযাত্রার শুরু। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
বাংলাদেশের ছড়ার সর্বমুখী আধুনিক শিল্পসম্মত অগ্রযাত্রার সূচনা হয় গত শতকের ষাটের দশকে। এই অগ্রযাত্রার শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন সেনানীর মধ্যে সুকুমার বড়ুয়া ছিলেন অন্যতম। সেই সময় নতুন জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত বিক্ষোভ-সংগ্রামমুখর রাজনীতি ছড়াকারদেরও আন্দোলিত করে প্রবলভাবে।
সম্ভবত এ-কারণেই সুকুমার বড়ুয়ার সাহিত্যিক ভাবনার বিশাল অংশ জুড়ে আছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দারিদ্র্যপীড়িত মুক্তিকামী মেহনতি মানুষের জীবনসংগ্রামের চালচিত্র। তাঁর ছড়ার প্রধান উপজীব্য সমকালীন জীবন ও সমাজমনস্কতা। তবে পরিহাসপ্রবণতা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপাত্মক উপাদানেও তাঁর ছড়া সমৃদ্ধ। শৈশব-কৈশোরের দুরন্তপনা আর শিশু-মনস্তত্ত্ব সংলগ্নতাও তাঁর প্রিয় অনুষঙ্গ। এভাবে খুঁটিয়ে দেখতে গেলে তাঁর ছড়ার বিষয়-বৈচিত্র্য রীতিমতো বিস্ময়কর মনে হয়। বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্য আন্দোলন সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা গ্রাম-শহর বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অগ্রগতি সবই তাঁর ছড়ায় পেয়েছে নতুন মাত্রা। ছন্দ-কুশলতা, শব্দচয়ন, অন্ত্যমিল, অনুপ্রাস ও ধ্বনিব্যঞ্জনা সৃষ্টি – এসব শিল্পকারিগরিতেও তাঁর দক্ষতা অসামান্য।
সুকুমার বড়ুয়ার প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭০ সালে, বাংলা একাডেমি থেকে। নাম ছিল পাগলা ঘোড়া।
এ-বইয়ে মোট লেখা ছিল ২২টি। গঠন-প্রকৃতি ও ভাবনার সুপরিসর বিস্তারের দিক থেকে এ-লেখাগুলোকে ঠিক ছড়া বলা যায় না, অনেকটা পদ্য বা সহজ কবিতা। তবে প্রকাশভঙ্গির সারল্যে ও কল্পনার অভিনবত্বে প্রতিটি লেখা সুখপাঠ্য। যেমন একটি লেখা পড়া যাক –
চোখেও দেখা, হাতেও ধরা যায় না কোনো দিন-তা,
কেমন করে মাথায় ঢোকে এত্ত রকম চিন্তা?
কোথায় তাদের চাষ হলো বা কোথায় যে উৎপত্তি
খবরটুকু কেউ কোনো দিন পায় নিকো একরত্তি।
মাথার ভেতর ঢুকেই সে যে জড়িয়ে ধরে মনকে
মিথ্যা এবং ভুলের পথে নেয় সে কতজনকে।
চিন্তা কারুর মাথায় ঢুকে দেয় ফিরিয়ে ভাগ্য
ঘর ছেড়ে কেউ বাইরে এসে লাভ করে বৈরাগ্য
চিন্তা কারুর ভালোই করে কারুর করে মন্দ
কেউ হয়ে যায় পাগল – কেউবা চোখ থেকেও অন্ধ।
মাথায় কারো টাক পড়ে যায় কেশ যে অকালপক্ব
হাট বাজারে পথে-ঘাটে দেখবে কত লক্ষ।
এসব দেখে চিন্তাবিদে ভাবে হয়ে মত্ত –
চিন্তা করে লেখেন পুঁথি – শেখেন মনস্তত্ত্ব।
নানান যুগে জন্মে থাকে নানান রকম চিন্তা
জোড়াতালি পড়ে পড়ে বাড়ছে প্রতিদিন তা।
চিন্তার যে কেরামতি – দেখায় কত যুক্তি
চিন্তা থেকে কেউ কোনো দিন পায় না তো আর মুক্তি।
অসীম আকাশ অকূল সাগর আজ মানুষের বাধ্য
চিন্তা-সাগর পাড়ি দেবার নাই যে কারো সাধ্য।
(‘চিন্তা নিয়ে ভাবনা’, ১৯৬৫)
আপাত সরল উপস্থাপনার কারণে ছোটদের জন্য মনে হলেও এ-লেখা বড়দেরও রসনাতৃপ্তি করে। এমনি সব মজাদার ও কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়বৈচিত্র্যে ভরা পাগলা ঘোড়া বইয়ের লেখাগুলো। এ-বই প্রকাশের ছয় বছর পর ১৯৭৬ সালে মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত হয় সুকুমার বড়ুয়ার দ্বিতীয় বই ভিজে বেড়াল। এর মধ্যে পটপরিবর্তন হয়ে গেছে কত। পূর্ব পাকিস্তান ‘বাংলাদেশ’ নামে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার জন্য এ-ভূখণ্ডের জনগণকে করতে হয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম। এ-সময়ও সুকুমার বড়ুয়া লেখক হিসেবে ছিলেন সক্রিয়। চিরায়ত সাধারণ বিষয়ের পাশাপাশি এসময় সমাজ-ভাবনামূলক বিষয়-অনুষঙ্গও তাঁর লেখায় সন্নিবেশিত হতে থাকে। তবে এর প্রকাশ খুব শিল্পিত ও নম্র আঙ্গিকে। যেমন ভিজে বেড়াল বইয়ের প্রথম লেখাটি –
হুলো হুলো হুলো রে
গায়ে ভরা তুলো রে
ডাকিস কেন মেঁয়াও?
খুঁজতে গেলে সবাই জানে
মেঁয়াও কথার আসল মানে
‘মাছ ভাজাটা লে আও’।
খেয়ে খেয়ে মাছের ভাজা
গতরখানা বানিয়ে তাজা
ঢেঁকুর তুলিস হেঁয়াও। (‘বেড়াল’, ১৯৬৭)
ছন্দ, অন্ত্যমিল ও শব্দচয়নের চমৎকার দ্যোতনায় প্রাথমিকভাবে মনে হয় এটি নিতান্ত সাধারণ একটি ছড়া। কিন্তু রচনাকালের (১৯৬৭) সঙ্গে মিলিয়ে এর শব্দগত অর্থের বাইরে অন্তর্নিহিত অন্য একটি অর্থও বের করা যায়। রূপক অর্থে ছড়ার এই বেড়ালের মধ্যে আমরা কি পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের প্রতিমূর্তি খুঁজে পাই না? নিশ্চয় পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ-পীড়নের কায়দা ওই বেড়ালের মতোই ছিল।
সুকুমার বড়ুয়া এভাবে দেশের রাজনৈতিক চরিত্রের খোলস উন্মোচন করেন শিল্পমণ্ডিত রূপকের আশ্রয়ে। তাঁর এমন একটি অসামান্য সৃষ্টি :
শিয়াল নাকি লোভ করে না
পরের কোনো জিনিসটার,
কি পরিচয় দিল আহা!
কি সততা! কি নিষ্ঠার!
তাই সে হল বনের মাঝে
এডুকেশন মিনিস্টার। (‘শিয়াল মন্ত্রী’, ১৯৬৭)
পাকিস্তান আমলের শেষদিকে অস্থিতিশীল শিক্ষা-পরিস্থিতির কারণে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীকে ব্যঙ্গ করে লেখা হয় ছড়াটি। এ-ছড়ায় অন্ত্যমিল যোজনায় মুনশিয়ানার দিকটিও লক্ষণীয়। ‘জিনিসটার’, ‘কি নিষ্ঠার’ সঙ্গে দিয়েছেন ইংরেজি শব্দ ‘মিনিস্টার’-এর মিল। সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ-ধরনের অন্ত্যমিল ছিল সত্যি অভিনব।
ভিজে বেড়াল-এর পর প্রকাশিত সুকুমার বড়ুয়ার অন্যান্য ছড়ার বই হলো যথাক্রমে চন্দনা রঞ্জনার ছড়া (মুক্তধারা, ১৯৭৯), এলোপাতাড়ি (বাংলা একাডেমি, ১৯৮০), নানা রঙের দিন (বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ১৯৮১), সুকুমার বড়ুয়ার ১০১টি ছড়া (বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ১৯৯১), চিচিং ফাঁক (ওলট পালট প্রকাশনী, ১৯৯২), কিছু না কিছু (বিশাকা প্রকাশনী, ১৯৯৫), প্রিয় ছড়া শতক (দি মিডিয়া, ১৯৯৭), বুদ্ধ চর্চা বিষয়ক ছড়া (সৌগত প্রকাশন, ১৯৯৭), ঠুস্ ঠাস্ (প্রজাপতি প্রকাশন, ১৯৯৮), নদীর খেলা (বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ১৯৯৯), আরো আছে (আরো প্রকাশন, ২০০২) ইত্যাদি। উল্লিখিত ১৩টি বইয়ের লেখা তাঁর ছড়া সমগ্র বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০০৩ সালে যখন সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া সমগ্র প্রকাশিত হয়, তখনই তাঁর অগ্রন্থিত ছড়া অনেক। সেখান থেকে ৪২৪টি অগ্রন্থিত ছড়াও ছড়া সমগ্র গ্রন্থের শেষভাগে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
সুকুমার বড়ুয়া সব ধরনের ছড়া লিখেছেন। তাঁর ছোটদের উপযোগী নির্মল আনন্দঘন ছড়ার সংখ্যাও কম নয়। সেগুলোর শিল্পগুণও এত উন্নত যে, পরিণত পাঠকের কাছে সমান উপভোগ্য। সে-কারণে তাঁর প্রকাশিত বইগুলোতে ছোটদের বড়দের ছড়ার কোনো ভেদাভেদ নেই, সবই রয়েছে সহাবস্থানে। তাঁর চন্দনা রঞ্জনার ছড়া বই থেকে এবার দুটো ছড়া পড়ে দেখি –
পুতুল পুতুল তুলতুলে
যায় পুতুলের চুল খুলে
চুলের ফিতে লাগিয়ে দিতে
যাচ্ছে কানের দুল খুলে,
পুতুল পুতুল তুলতুলে
স্বভাব বড়ো চুলবুলে
হলুদ শাড়ি মানায় ভারি
দাও না তাতে ফুল তুলে
পুতুল পুতুল তুলতুলে। (‘পুতুল’, ১৯৬৭)
বালখিল্য রসস্নিগ্ধ এই ছড়ার পাশেই প্রকাশিত আরেকটি ছড়া এবার পড়ি –
এক হাঁচিতে শান্তি ভাঙে
পড়শী বলে মিটিং ডাক,
দুই হাঁচিতে বদ্ধ ঘরের
কপাটগুলো চিচিং ফাঁক।
তিন হাঁচিতে দেশ-বিদেশের
তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন …
চার হাঁচিতে মশা মরে
ম্যালেরিয়া নিশ্চিহ্ন। (‘হাঁচি’, ১৯৬৬)
অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছিলেন, ‘ছড়া সাংবাদিকতার পদ্য বিশেষ।’ সুকুমার বড়ুয়ার অনেক ছড়া এমনি স্মরণীয় হয়ে আছে সাংবাদিকতার পদ্যের মর্যাদা নিয়ে।
জ্যান্তে দিতে দানাপানি
মরণকালে দাফন
সর্বহারা ফকির আলীর
কেউ ছিল না আপন
বেঁচে থাকার পায় না টিকেট
মৃত্যুরও নাই সার্টিফিকেট
উভয় বিপদ জেনেও খোঁজে
ন্যায্য দামে কাফন। (‘কাফন’, ১৯৭৩)
সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের অনাকাক্সিক্ষত নির্মম বাস্তবতাকে ধারণ করে আছে এ-ছড়া।
ভারতীয় উপমহাদেশসহ নানা দেশে মাঝে মঝেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটে। সেইসঙ্গে মানবতা বিপর্যস্ত হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ১৯৯৩ সালে এরকম একটি পরিস্থিতিতে সুকুমার বড়ুয়া লেখেন –
বিশ^াস মতবাদ ধর্ম ও দর্শন
একটার সাথে লেগে একটার ঘর্ষণ
বাপরে কি জ¦লে ওঠে হিংসার অগ্নি
মানবে না মাতা-পিতা শিশু-ভাই-ভগ্নি।
ধর্মের অস্ত্রটা কী ভীষণ শক্ত
ছুতো পেলে খেতে চায় মানুষের রক্ত।
শান্তির নামে জপে শুধু এক মন্ত্র
মানুষেরে করে দেয় নিশ্চল যন্ত্র।
বিজ্ঞান জিজ্ঞাসা একেবারে বন্ধ
সন্ধানী মানুষের চোখ রাখে অন্ধ।
স্বার্থের সংঘাত দেশে দেশে সত্য –
তার সাথে যোগ হয় ধর্মের দৈত্য।
রাজনীতি জুয়াড়ির দর্শন ধর্ম
মানবতা পিষে মেরে করে অপকর্ম।
(‘ধর্মদৈত্য’, ১৯৯৩)
ধর্মের অন্ধ ধ্বজাধারী সুবিধাবাদীদের বন্য-বর্বরতায় বিপন্ন মানবতার নিপুণ চিত্র এই লেখা। মোবাইল সংস্কৃতির অভানীয় প্রসারণ নিয়েও অপূর্ব একটি ছড়া লিখেছেন সুকুমার বড়ুয়া –
হ্যালো-হ্যালো-হ্যালো
সব ভেসে গ্যালো
ঢাকা থেকে পুবাইলে
ফোন করি মোবাইলে
কতগুলো গরু এসে
কত ধান খেলো?
হ্যালো-হ্যালো-হ্যালো
সব গরু খোঁয়াড়েতে
জমা দিয়ে ফেলো।
হ্যালো-হ্যালো-হ্যালো
তুমি নাকি সারাদিন
ভ্যানগাড়ি ঠেলো
ঘরে নাই চাল ডাল
সরিষার তেলও
লোন করে ফোন কিনে
কোন খেলা খেলো?
হ্যালো-হ্যালো-হ্যালো (‘হ্যালো’, ১৯৯৯)
সর্বব্যাপী বর্তমান মোবাইল নির্ভরতার ছন্দ-মিলে এর চেয়ে সুন্দর চিত্রায়ণ আর হয় না। ছড়ার ছড়াত্ব অটুট রেখে এর একদিকে ধ্বনিমাধুর্য অন্যদিকে অর্থ-সৌন্দর্যের প্রকাশও বড় আকর্ষণীয়। আরেকটি অনুপ্রাসের ছড়া শোনা যাক –
রোস্তম আলির দোস্ত ছিল
পোস্তগোলার ওস্তাগার
সস্তা দামে গোস্ত নিতে
বস্তা খোঁজে মোস্তফার।
গেন্ডারিয়ায় ঠান্ডা মিয়ার
আন্ডা বেচে দণ্ড যায়
হোন্ডা চড়ে গুণ্ডা এসে
ডাণ্ডা মেরে মুণ্ডু চায়।
আগ্রাবাদের তাগড়া ষাঁড়ে
খাগড়াছড়ির জঙ্গলে
নাগরা পরে বাগড়া দেবে
শুক্র-শনি-মঙ্গলে।
(অনুপ্রাস)
ছন্দ-শব্দের সুষম অনুপ্রাসের সহযোগ অসংলগ্ন বিষয়কেও কত মনোগ্রাহী করে তুলতে পারে এ-ছড়া তারই প্রমাণ। সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ায় বৈচিত্র্যপূর্ণ এমন রস-মজার শেষ নেই। আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অগ্রগতিও তাঁর ছড়াচিন্তা থেকে বাদ পড়েনি। যেমন –
ছোট ছোট বানরের
বড় বড় পেট
বাদাবনে বসিয়েছে
ইন্টারনেট –
কোন দেশে কোন মাসে
কী কী ফল পায়
ফ্যাক্সের মাধ্যমে
সব জানা যায়।
(‘বুদ্ধি’)
ছড়ায় দারিদ্র্যপীড়িত নির্মম বাস্তবতার চিত্র অংকনে সুকুমার বড়ুয়ার দক্ষতা অতুলনীয়।
ফেকু বাড়িও’লা ভুঁড়ি তার ফোলা
খেয়ে কাঁচা ছোলা
গড়েছে টাকার পর্বত
ভাড়াটের ঘরে জল যদি পড়ে
জবাব সে করে
তবে কি পড়িবে শরবত?
কৌতুকরসের সঙ্গে এখানে মিশিয়ে দিয়েছেন ব্যঙ্গরস – মিছরির ছুরির মতো খোঁচা। তাঁর এমনই আরেকটি অসাধারণ সৃষ্টি ‘ঠিক আছে’ ছড়াটি একবার পড়া যাক –
অসময়ে মেহমান
ঘরে ঢুকে বসে যান
বোঝালাম ঝামেলার
যতগুলো দিক আছে
তিনি হেসে বললেন
ঠিক আছে ঠিক আছে!
রেশনের পচা চাল
টলটলে বাসী ডাল
থালাটাও ভাঙাচোরা
বাটিটাও লিক আছে
খেতে বসে জানালেন
ঠিক আছে ঠিক আছে!
মেঘ দেখে মেহমান
চাইলেন ছাতাখান
দেখালাম ছাতাটার
শুধু কটা শিক আছে
তবু তিনি বললেন
ঠিক আছে ঠিক আছে!
বাঙালির দৈনন্দিন জীবনচর্যায় ‘ঠিক আছে’ একটি সাধারণ শব্দবন্ধ, যা ছোটখাটো অপারগতা, অযোগ্যতা, অপূর্ণতা ও অক্ষমতা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে অনুমোদনার্থে ব্যবহৃত হয়। সেই সাধারণ শব্দবন্ধকে সুকুমার বড়ুয়া গৃহকর্তার দারিদ্র্যের চিত্র অংকনে ব্যবহার করেছেন অসামান্য নৈপুণ্যে। এটি তাঁর জীবনের অন্যতম একটি সেরা ছড়া।
জীবনরসিক সংবেদনশীল মানুষ সুকুমার বড়ুয়া।
শিল্পী-হৃদয় দিয়ে তিনি যা উপলব্ধি করেছেন তা-ই লিখেছেন কলম দিয়ে। জীবনের করুণ অমøমধুর প্রায় সব ধরনের বিষয়-আশয়কে তিনি ছড়ার কলকব্জায় ধরার চেষ্টা করেছেন। ফুটবলের ধারাভাষ্যকেও তিনি ছড়ায় রূপদান করেছেন দারুণ ছন্দব্যঞ্জনায়। যেমন –
খেলা শুরু ফাইনাল
মাঠ থেকে জয়নাল
উত্তরে ডালপুরি
দক্ষিণে ঝালমুড়ি
নামকরা দুটো দল
মাঝ মাঠে এল বল
এই জোরে দিল কিক
বল পেল কার্তিক
ছুটে এল আনোয়ার
কর্ণার কর্ণার
ঘুষি দিল অনিমেষ
ফাউলের নির্দেশ
শট্ মারে ফরিদালী
দক্ষিণে মাঠ খালি
গোল গোল গোল না না
বল পেয়ে গেছে রানা
রক্ষক আব্বাস
বল ধরে সাব্বাস
ছুড়ে দিল বাবুকে
বাবু দিল সাবুকে
সাবু ফের রানাকে
রানা দেয় ছানাকে
সেন্টারে পরিমল
হ্যান্ডবল হ্যান্ডবল
গ্যালারিতে গোলমাল
ঠোকাঠুকি বেসামাল
হাতাহাতি মারামারি
রেফারির হুঁশিয়ারি
বেড়ে যায় দ্বন্দ্ব
খেলা হয় বন্ধ।
(‘ধারাভাষ্য’, ১৯৯০)
সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া সহজাত সাবলীল। পণ্ডিতেরা বলেন,
কৃত্রিমতা ছড়ার শত্রু। সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ায় কোনো
কৃত্রিমতা নেই। তাঁর ছড়া শাণিত, লক্ষ্যাভিমুখী ও অব্যর্থ, আবার একই সঙ্গে শিল্পমান সমৃদ্ধ। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়ও প্রচুর সাহিত্যমান উত্তীর্ণ ছড়া লিখেছেন তিনি। এক্ষেত্রে তাঁর কোয়াল খাইয়ে (২০০৬) একটি পথিকৃৎ ছড়ার বই। সম্ভবত এটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত প্রথম ছড়ার বই।
সুকুমার বড়ুয়ার সৃষ্টির ঐশ্বর্য আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের আয়নায় ফেলে তা বিশ্লেষণ করা হয়। অকপটতা, সততা, সাধনা ও একনিষ্ঠতা যে কাউকে অনন্য প্রতিভাদীপ্ত মানুষে পরিণত করতে পারে তার উজ্জ্বল উদাহরণ সুকুমার বড়ুয়া। পুরোদস্তুর একজন স্বশিক্ষিত মানুষ তিনি। দরিদ্র এক বৌদ্ধ পরিবারের সন্তান। জন্ম ৫ই জানুয়ারি ১৯৩৮। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে মন্বন্তরের সময় পিতা সর্বানন্দ বড়ুয়া নিরুদ্দেশ হন। তাই অতিশৈশবে ভাগ্যবিড়ম্বনায় নানা পেশা গ্রহণ করতে হয় সুকুমার বড়ুয়াকে। সর্বশেষ তিনি কর্মজীবন অতিবাহিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগে। স্বল্প উপার্জনে খুব সাধারণ জীবন যাপন করেছেন। তবু অভাব ও সাংসারিক প্রতিকূলতা তাঁকে অন্ধ করতে পারেনি। নিজের সৃজনশক্তির আলোয় খুঁজেছেন জীবনের পথ। আশ্চর্য নিষ্ঠায় তিনি বাংলা ভাষার জটিল ব্যাকরণ মেনে ছড়ার সুললিত ছন্দ প্রয়োগ করে যাপিত জীবনের যাবতীয় সংবেদনশীল বিষয়কে রূপান্তরিত করেছেন শিল্পে। দুই সহস্রাধিক ছড়া লিখেছেন। বাংলাদেশে সাহিত্য মাধ্যম হিসেবে ছড়াকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অপরিসীম। তিনি বাংলাদেশের ছড়ার আইকন। বাংলাদেশে শুধু ছড়া লিখে তিনিই প্রথম একুশে পদক (২০১৭) লাভ করেছেন। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেছেন ১৯৭৭ সালে। এই অগ্রণী ছড়াসাহিত্যিক গত ২রা জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ তাঁর জন্মস্থান চট্টগ্রামের রাউজানের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু মৃত্যুতে সবার অস্তিত্ব বিলীন হয় না। সুকুমার বড়ুয়ার মতো মানুষের মৃত্যু নেই। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর অনন্য সাধারণ সৃষ্টি-সম্ভারের মধ্যে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.