ছিঃ! ছিঃ! ছিঃ!
অকস্মাৎ একদলা ঘৃণা আমার গায়ে এসে না পড়লে আমি বোধহয় কখনোই এ-গল্প লিখতে বসতাম না। যদিও চার বছর ধরে সময়ে-সময়ে রাগ, ঘৃণা, অপমানের নানা ছিটেফোঁটা বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে পেয়ে এসেছি; কিন্তু গায়ে মাখিনি। সম্ভবত এর কারণ ছিল, মানুষ যখন নিজের মনে জানে সে অপরাধী নয়, তখন তার মনে নির্দিষ্ট বিষয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাওয়ার ইচ্ছে তেমন জোরালো হয় না। আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রয়োজনে, অথবা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে কি না জানি না, আমার মনে হচ্ছে সিনেমার ক্যামেরা ঘুরিয়ে যেভাবে ঘটনার অন্যদিক দেখানো হয়, সেভাবে আমারও উচিত একদিকে ক্যামেরায় যা দেখানো হয়েছিল তার উল্টোপাশে আসল ঘটনা কী ছিল সেটা জানানো। এমন ভাবার কারণ নেই, আজ আমি প্রবলভাবে ঘৃণিত হয়েছি বলেই নিজের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। না, তেমন নয়, এর পেছনে আরেকটি জরুরি কারণ আছে – সেটি গল্পের শেষে বলব।
টুং-টাং।
আজ একটু পরপর বেজে উঠছে আমার মোবাইল। কখনো খুব কাছের বন্ধুদের ফোন, বেশির ভাগ হোয়াটসআপ অথবা মেসেঞ্জারে নতুন মেসেজ আসার ঘণ্টা। একবার মনে হলো, বাড়ির দরজায় সত্যি কলিংবেল বাজাচ্ছে কেউ। বিষাদে নুয়ে পড়া শরীর, অনিচ্ছায় বিছানায় একপাশে কাত হলাম। পায়ের শব্দে বুঝলাম আমার মেয়ে রিনি গেছে দরজা খুলতে। চোখ বন্ধ করে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আজ আমার অবসাদের দিন। আমি আজ কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ করব না। রিনির কণ্ঠ শুনতে পেলাম, চেঁচিয়ে বলল, ‘মা অ্যামাজন থেকে তোমার একটা পার্সেল এসেছে।’
কম্বলের ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে দিলাম। রিনি না বললেও আমি জানি বই এসেছে। গত সপ্তাহে বেশ কিছু বই অর্ডার করেছিলাম। পার্সেল বড় হওয়ায় লেটারবক্স দিয়ে ঢোকাতে পারছিল না পেরে ডেলিভারিম্যান বেল বাজিয়েছে। বাংলাদেশ হলে যখন-তখন বাড়ির বেল বাজত আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী কিংবা ভিখিরিদের প্রয়োজনে। বিদেশে এসব বাড়তি পাওনা জোটে না আমাদের। রুটিনের জীবনে মা ও মেয়ের খোঁজ নিতে আসে কেবল পিয়ন, উইন্ডো ক্লিনার, মাঝেমধ্যে আসে নিজস্ব ব্যবসা আরম্ভ করতে চাওয়া লোকজন তাদের কিছু অফার শোনাতে।
‘তোমার ঘরের আলো জ্বেলে দেব মা?’
বেশ অনেকক্ষণ পরে মেয়ের প্রশ্নে চমকে উঠি। শীতের সময় এখানে বিকেল চারটার আগেই কেমন অন্ধকার হয়ে যায়। একেবারে ডিপ্রেসিভ আবহাওয়া। ঘোলা আবহাওয়ার সঙ্গে মনের অন্ধকার এমন করে জেঁকে ধরেছে যে বাইরের দুনিয়া ঢেকে দেওয়া আঁধারচাদরের সাধ্য নেই আমাকে আরো কালি দেখায়।
‘অন্ধকার থাকুক।’
টুং-টাং।
মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠছে অনেকের উৎকণ্ঠিত বার্তা। বেশকিছু মিসড কল। আমার আপনজন হিসেবে এই দেশে তেমন কোনো আত্মীয় নেই। তবে আত্মার কাছাকাছি কয়েকজন বন্ধু ও বান্ধবী আছে। দুঃসময়ে তারা আমার জন্য চিন্তিত হয়, আমাকে নিয়ে ভয় পায়, আমার মঙ্গল কামনা করে। বন্ধু হিসেবে আমিও তাদের জন্য একই রকম আশা করি। যদিও নিজের অনিচ্ছায়, কখনো মনের ভুলে, কখনো উদ্বেলিত হৃদয়ের উচ্ছ্বাসে, আমার কথায় অথবা কাজে, কারো কারো কিছু ক্ষতি হয়ে গেছে, সেসবের জন্য আমাকে অনেকে দায়ী করেছে, আমার নিজের মনের কাছে আমি লজ্জিত হয়েছি; কিন্তু ইচ্ছে করে কোনোদিন প্রিয়জনের ক্ষতি কামনা করিনি বলে নিজের মনের কাছে আমি স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ।
মেসেজ ওপেন না করলেও মোবাইলের স্ক্রিনে মেসেজের শুরুর একটি লাইন ভেসে উঠেছে। নওশীন লিখেছে : ‘সানজু, তুমি কোথায়? খুব খারাপ লাগছে। কল …’
এর নিচেই দেখা যাচ্ছে সিফাতের টেক্সট : ‘এক ঘণ্টা পরে একটা গ্রুপ কল করব, বিষয়টি নিয়ে …’
১৮টি মিসড কল।
৩৫টি আনরিড মেসেজ।
মোবাইল বালিশের নিচে ঢুকিয়ে অন্ধকার ঘরে চোখ বুঁজে ফেললাম। সন্ধ্যায় ঘুমানোর অভ্যাস নেই আমার। নিচের ঘরে রিনি টিভিতে ‘ফ্রেন্ডস’ সিরিজ দেখছে। একটু পরপর সিরিজে যুক্ত করা অডিয়েন্সের হাসির জোরালো শব্দ শোনা যাচ্ছে। টিভি সিরিজের হাসির শব্দের কারণে কি না আমার নিজের জীবনের একটি হাসিভরা দিনের কথা মনে পড়ে গেল। সেসব দিনে আমরা সবাই কত কাছের মানুষ ছিলাম! ভালোবাসার সম্পর্ক এখনো আছে, কিন্তু প্রিয় একজন সরে যাওয়ার ফাঁকা জায়গাটা মাঝেমধ্যে শূন্য আওয়াজ করে, শীতের রাতে জানালার কাচে বাতাসের শোঁ-শোঁ গোঙানির মতো দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে বুকের ভেতর থেকে।
আমরা দুজন বান্ধবী ছিলাম। একই বয়সের না হলেও কাছাকাছি বয়সের। আমাদের আচরণ ও স্বভাব আলাদা হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ আগ্রহে মিল থাকার কারণে আমাদের দুজনের প্রতি দুজনের ভালোলাগা ও শ্রদ্ধাবোধ প্রবল ছিল। সেসময় আমরা দুজন গান ভালোবাসতাম; ছবি আঁকা, বই পড়া, ভ্রমণ আমাদের প্রিয় ছিল। আচ্ছা এখনো ওর নাম বলা হয়নি, যাকে নিয়ে এই গল্প কিংবা বলা যায়, যাকে কেন্দ্র করে লেখা হচ্ছে এই গল্প, তার নাম অনিন্দিতা। পাঠক অবশ্যই বুঝতে পারছেন নামটি বানানো, কারণ গল্পে আমি সত্যিকার নাম ব্যবহার করতে চাই না। দূরের পাঠকেরা বুঝতে না পারলেও কাছের কিছু পাঠক যে ধরে না ফেলবেন আমি কার কথা বলছি,
সে-নিশ্চয়তা আমাকে আপনারা দিতে পারবেন না। তাই বানানো নাম হিসেবে কয়েকটি নামের মধ্যে এই নাম বেছে নিয়েছি, কারণ, যখনকার কথা বলছি তখন সে আমার চোখে অনিন্দিতা মেয়েই ছিল।
একবার বন্ধুদের একটি গেট টুগেদারে আমরা দলবেঁধে লিভারপুল গিয়েছিলাম। সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে আমাদের সবার প্রাণখোলা হাসি ও গানের শব্দ যেন চারপাশের জঙ্গলের পাখির ডাকের মতো শোনাচ্ছিল। বন্ধুদের হল্লাগোল্লার সে-শব্দ যেন এখন আমার কানে এসে লাগছে, আমার বলে দেওয়া উচিত এই শব্দ মোটেই সুরেলা পাখির কণ্ঠ নয়, নির্ঘাত চোখ গেল, কিংবা মাদি কোকিল, অথবা সমস্বরে ডেকে ওঠা একদল কাকের মতো ছিল। নাকি বলা উচিত বুলবুল পাখির মতো, যে-পাখি দেখতে চোখ জুড়ানো সুন্দর হলেও কণ্ঠস্বর খুবই খরখরে ও কর্কশ! সবুজের চাদরে শুয়ে বসে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত দেখাচ্ছিল তন্ময়কে। একই রকম ড্রেস পরা তন্ময়ের যমজ মেয়েরা আমাদের সবার কাছে ঘুরে ঘুরে এসে আদর নিয়ে যাচ্ছিল। ওদের দিকে তাকিয়ে আমরা আমাদের শৈশবের কথা ভাবছিলাম।
‘তোমার চায়ে চিনি দেব?’ আমাকে বলেছিল অনিন্দিতা।
‘ফ্লাক্সের চা, একটু চিনি তো লাগবেই …’
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই তন্ময় কথার মাঝে ঢুকে বলেছিল, ‘অনিন্দিতার হাতের চা এমনিতেই মিষ্টি আর গায়ের সৌরভ ফ্লাক্সের চায়ের বোটকা গন্ধ কাটিয়ে দেয় ফিল্টারের মতো।’
আমি হেসে বলেছিলাম, ‘ফ্লাস্কের চায়ে তুমি বোটকা গন্ধ পাও নাকি তন্ময়?’
‘আমি পাই, সবাই পায়, তুমিও পাও মিয়া, এখন স্বীকার করছো না।’
‘আমার কাছে গন্ধ লাগলে তো আমি বলতামই, কী বিচ্ছিরি চা! থুক! কিন্তু এটা লুকানোর মতো কী কথা হলো বুঝলাম না, আজব তো!’
‘সব মাছেই আঁশটে গন্ধ আছে, কেউ পায় খাওয়ার সময় আর কেউ পায় খাওয়ার পরে। তোমার নাকের ফুটো কোন জাতের সেটার ওপরেও নির্ভর করে।’
‘আমার নাকের ফুটো নিয়ে কথা? আচ্ছা আমি গন্ধ পাই, এই যে এখন পাচ্ছি, তুমি একটা ঘোড়া, তোমার গায়ে আস্তাবলের বদগন্ধ!’
‘তুমি একটা বদমহিলা!’
আমাদের এসব অকারণ তর্ক ও শিশুসুলভ ঝগড়া চালিয়ে যাওয়ার সময় অনিন্দিতা একপাশে বসে চুপচাপ হাসছিল। ওর হাতে ছিল প্লাস্টিকের মগে ফ্লাক্সের চা। কিছুক্ষণ ওর দৃষ্টি আমাকে ও তন্ময়কে, কিছুক্ষণ দলের অন্যদের, কিছুক্ষণ পার্কের সবখানে ফুটে থাকা রঙিন ফুলের দিকে ভেসে বেড়াচ্ছিল। বন্ধুরা কেউ কেউ যখন জানপ্রাণ দিয়ে ইংল্যান্ডের অর্থনীতি, বাংলাদেশের রাজনীতি, বিদেশের দেশে আমাদের সন্তানদের বেড়ে ওঠার নানা কুফল নিয়ে সিরিয়াস আলোচনায় ব্যস্ত – অনিন্দিতা তখন তার চারিত্রিক নম্রতায় সবার সঙ্গে টুকটাক আলাপ করছিল। বরাবরই দেখেছি ওর আচরণে কখনো সৌজন্যের বাড়াবাড়ি প্রকাশ পায় না, মাঝেমধ্যে চাবি দেওয়া পুতুল যেন। তবু তন্ময়টার মতো উথলে ওঠা আবেগের চেয়ে মাপা হিসাবের চাবি-আচরণই বেশি ভালো, আমার মনে হতো তখন।
বালিশের নিচ থেকে মোবাইল বের করলাম। আজকাল ফেসবুক আমাদের বেশিরভাগ সময় খেয়ে নেয়। আবার এই মাধ্যমটি ছাড়া জীবন যেন অচল। সবাই এত দূরে থাকে, তারের যোগাযোগ ছাড়া নিয়মিত রক্তমাংসের যোগাযোগ অসম্ভব প্রায়।
মনিরার মেসেজগুলো পড়লাম আগে : ‘তোমার সঙ্গে কথা বলা দরকার।’ ‘জরুরি একটা কথা আছে, ফ্রি হলে কল দিও।’ ‘তুমি আজ ক্লাসে গেছো নাকি?’
সপ্তাহে দুদিন আমি স্প্যানিশ ল্যাঙ্গুয়েজ শিখতে যাই। মঙ্গলবার ও শুক্রবার সন্ধ্যায়। আজ শনিবার। মাঝেমধ্যে নিজের সুবিধামতো দিন বদলে ক্লাসে যাই।
‘এইরে তুমি কই? ছোটমাছের চচ্চড়ি রান্নার রেসিপি দাও। জলদি।’ তন্ময়ের একাধিক মেসেজের একটি। কিছুদিন আগে ওর বউ দেশে বেড়াতে গেছে, তাই নিজের রান্নার ব্যবস্থা নিজেই করতে হচ্ছে। কয়েকদিন আগে নওশীনের কাছে ডাল রান্নার রেসিপি চেয়েছিল।
মোবাইলের আরো কিছু মেসেজ পড়ার আগেই মনিরার কল আসে। আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জাজমেন্টাল মানসিকতা মনিরার। হাজার প্রশ্ন, শতেক নীতিবাক্য, কড়া কথার শাসানি – এখন শুনতে ইচ্ছে করছে না, একদম মুড নেই। জানি, ওর কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই আমার। কিন্তু আমি যেমন দোষে-গুণে মানুষ, মনিরাও তেমনই, তাই সে নিজের দোষ দেখে না বলে আমরাও ওকে ওর দোষগুলো দেখাতে যাই না। বরং বাধ্য ছেলেমেয়ের মতো আমাদের সবার দোষ নিয়ে আলোচনা শুনি ওর মুখে।
মনিরার রিং কেটে গেছে। আমি আবার ফেসবুক ওপেন করলাম। হোমপেজে একজন একটি সুন্দর লোমশ জিঞ্জার বিড়ালের ছবি দিয়েছে। বিড়ালের তপস্বী মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন আদুরে লাগছে। রিনি একটা নার্সিংহোমে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করে। ওর কাছে গল্প শুনেছিলাম, ওদের হোমে নাকি মাঝেমধ্যে একটা বিড়াল আসে। এই দেশে কুকুর, বিড়াল মালিকহীন হয় না। কিন্তু কলার ছাড়া বিড়ালটি আশেপাশের কোন বাড়ির, কেউ জানে না। বিড়াল যেদিন নার্সিংহোমে আসে, সেদিন নাকি হোমে একটা না একটা মৃত্যু ঘটে। রিনি এটাও বলেছিল, বিড়ালটি প্রতিটি মৃত্যুর সময় আসে না যদিও, কিন্তু বিড়াল যেদিন আসবে সেদিন একটি মৃত্যু অবশ্যই ঘটবে। কৌতূহলী হয়ে রিনিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘বিড়ালের সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক সাদারা বিশ্বাস করে?’ জোরালো কণ্ঠে মেয়ে বলেছে, ‘মা, ব্রিটিশরা এগুলো তোমার চেয়েও বেশি বিশ্বাস করে।’
‘আচ্ছা, মানুষগুলো কি বিড়াল আসার পরে মারা যায়, নাকি কেউ মারা গেলে পরে বিড়াল আসে?’
‘বিড়ালটা সবসময় খুব ভোরে আসে। নাইট শিফটের স্টাফরা চলে যাওয়ার আগে রিসিপশনের সামনে ধবধবে সাদা বিড়ালটিকে হাঁটাহাঁটি করতে দেখে। সেদিন সবাই জেনে যায় আজ যে-কোনো সময় কোনো পেশেন্ট মারা যাবে।’
টুং-টাং।
আমার মোবাইল বেজে উঠেছে। নওশীনের ফোন। ধরলাম। মনে হচ্ছে এখন আমার কথা বলা উচিত। বন্ধুদের সবাইকে দুশ্চিন্তায় ফেলার মানে হয় না। ফোনে ‘হ্যালো’ বলে ধীরে উঠে গিয়ে ঘরের বাতি জ্বেলে দিলাম। ওপাশে নওশীনের নরম কণ্ঠ শোনা যায়। কণ্ঠের সুরে মমতা ও উদ্বেগের ছোঁয়া সুস্পষ্ট।
‘কথা বলতে পারবে?’
‘হ্যাঁ, পারব। একটু শুয়ে ছিলাম। কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না।’
‘বুঝতে পেরেছি। কিন্তু এখন কথা বলা উচিত।’
‘হুম।’
‘মেসেজগুলো দেখেছো?’
‘কিছু দেখেছি। সব না।’
‘বর্ষার স্ক্রিনশট?’
‘দেখেছি। অদ্ভুত।’
‘অনিন্দিতার সঙ্গে কথা বলেছো?’
‘বলেছি।’
‘জাফরভাইয়ের সঙ্গে অনিন্দিতার প্রেম চলছে – এমন কথা নাকি তুমি ছড়িয়েছো?’
‘প্রেমের আগুন আপনাআপনি ছড়ায়, আমি ছড়ানোর কে?’
‘ফাজলামো না। ব্যাপারটা সিরিয়াস। অনিন্দিতার জন্য খুব অসম্মানের ঘটনা হয়ে গেছে। ওর হাজব্যান্ড যদি জানতে পারে, মেয়েটার সংসারের কী হবে চিন্তা করতে পারো?’
‘পারি। আর ওসব কথা আমি ছড়াইনি।’
আমার স্পষ্ট অস্বীকার শুনে মোবাইলের অপর পাশে চুপ করে আছে নওশীন। মনিরা হলে এতক্ষণে জবাবদিহির তিরে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলত, নওশীন বলে চুপ করে আছে। আমি নিজের মনে ভাবতে লাগলাম : হায়! অনিন্দিতা জাফরভাইকে পছন্দ করে, দুজন প্রকাশ্যে একে অন্যের পাবলিক পোস্টে রসিকতার কমেন্ট করে, এই নিয়ে শুনেছি অনেকে ইনবক্সে স্ক্রিনশট আদান-প্রদান করে, যদিও আমার কাছে একটিও আসেনি, আমি জেনেছি বর্ষার কাছে। অনিন্দিতাকে আমি ভালোবাসতাম, বন্ধুদের সবার মধ্যে ওর জন্য আমার সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা ছিল, জাফরভাই অথবা অন্য কারো পোস্টে কী কমেন্ট করেছে দেখলেও আমার কাছে সেসব মোটেই আপত্তিকর মনে হয়নি। যেহেতু আমার নিজেরও অনেক ছেলেবন্ধু আছে, বড়ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, আমি মনে করি, বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে পৃথক করার জামানা অথবা বয়স আমাদের আর নেই।
‘কিন্তু দোষ তো এখন তোমার ঘাড়ে পড়েছে।’ ভীষণ উদ্বিগ্ন শোনায় নওশীনের কণ্ঠ।
‘তোমরা তো জানছো কেবল এখন, ওদের সম্পর্কের কথা বর্ষা আমাকে বলেছে আরো দুই বছর আগে।’
‘তুমি অনিন্দিতাকে জানিয়েছিলে?’
‘কেন জানাতে যাবো? বর্ষার কথা আমার বিশ্বাস হয়নি।’
‘কিন্তু অনিন্দিতাকে সাবধান করতে পারতে।’
‘দরকার মনে করিনি। ওর জীবন ও নিজের ইচ্ছেমতো আনন্দে যাপন করবে, সেখানে বাইরের মানুষের মতামত শুনিয়ে ওকে থমকে দিলে সেটি বরং আমার অন্যায় হতো।’
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক থেকে। এরপর বেখাপ্পাভাবে একটি গানের লাইন গেয়ে উঠলাম : ‘তুমি সুজন দেইখা কইরো পিরিত, মরলে যেন ভোলে না …’
আমার এমন হয়, মনে করুন কারো সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছি, ওপাশের মানুষটা খুব আগ্রহ নিয়ে নিজের গল্প বলে যাচ্ছে – তার বোনের শ্বশুরবাড়িতে কে কী করেছে, বোনের বাচ্চাটা কেমন পাকা কথা বলে, সম্পত্তি ভাগাভাগির সময় ওর মা কীভাবে মেয়েদের ঠকিয়েছে – যেসব গল্পে আমার মোটেও আগ্রহ নেই, তখন আমি হঠাৎ সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে গান গেয়ে উঠি, ইচ্ছে করে যে গান গাই তা কিন্তু নয়; আমার কাছে যখন কিছু পছন্দ হয় না, তখন আমি শারীরিকভাবে সেখানে উপস্থিত থাকলেও মনের কল্পনায় নিজেকে অন্য কোথাও নিয়ে যাই : হয়তো কোনো পার্কে হাঁটছি, প্রিয় কোনো সিনেমায় দৃশ্য ও সংলাপ মনে করছি, হয়তো স্নোফলের সময় মাঠে গড়ানোর অনুভূতি কল্পনা করছি!
মোবাইলের অন্যপাশে নওশীনকে চুপ করিয়ে রেখে আমি যেন নিজের মনে ডুবে গেছি। ঘিনঘিনে সেই বিশ্রী প্রসঙ্গটা নিয়ে আবার ভাবতে লাগলাম। বর্ষার কৌতূহল জাফরভাইয়ের ব্যাপারে বেশি ছিল নাকি আমাদের বন্ধু অনিন্দিতার ব্যাপারে ছিল – আমি বুঝতে পারিনি। আসলে ব্যাপারটিকে আমি তেমন গুরুত্বই দিইনি। এরপরেও অনিন্দিতা ও জাফরভাইয়ের সঙ্গে দুয়েকবার আমার দেখা হয়েছে সারাদিনের আয়োজনে, তাদের মধ্যে আলাদা কিছু আছে বলে মনে হয়নি। আমি হয়তো সেভাবে দেখার চেষ্টাও করিনি। কারণ, আমার মনে হয়েছে, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে কী ঘটছে সেসব নিয়ে আমার মাথা ঘামানোর কোনো মানে নেই। আমি যদি নিজের জন্য প্রাইভেসি আশা করি, তাহলে নিশ্চয় অন্যরাও সেটি আশা করতে পারে।
‘সবাই তো মনে করছে তুমিই কথা রটিয়েছো? তোমার সঙ্গে আমাদের দিকেও ইঙ্গিত করছে। বিশেষ করে অনিন্দিতার কাছের বন্ধুরা?’ নওশীনের কথায় চিন্তার জগৎ থেকে ফিরে এলাম।
রটানো কথার না আছে মাথা, না আছে পেট – আছে শুধু এত্তগুলা পা আর লেজ – হাজার পায়ে রটনা ছুটে বেড়ায় আকাশে-বাতাসে, সবখানে। হেসে ফেললাম আমি। বললাম, ‘আমি যদি রটিয়ে থাকি তাহলে সবার আগে তোমাদের সঙ্গে বলতাম, বলেছিলাম কি?’
‘এই জন্যেই তো বলছি, নিজেকে পরিষ্কার প্রমাণ করতে তুমি কিছু করো।’
‘কী করব, স্ক্রিনশটে লেখা আছে আমার এলাকার সবাই এই ঘটনা জানে, সেটা আমি জানিয়েছি এমন কথা কি লেখা আছে?’
‘কিন্তু তুমি অনিন্দিতাকে সরি বলেছো।’
‘হ্যাঁ বলেছি। এখনো বলি। অবশ্যই আমি সরি। ওই ঘটনার সঙ্গে আমার যেটুকু সংযোগ আছে তার জন্য আমি সরি, অনিন্দিতার মনে যে যন্ত্রণার ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার সঙ্গে আমার নামটি কোনোভাবেও যুক্ত আছে বলে আমি সরি, পুরো ঘটনার জন্য আমিও দুঃখ পেয়েছি; কিন্তু এসব কথা আমি রটাইনি।’
আমার রাগ বেড়ে যাচ্ছে। আমি অনেকদিন পর আমার পুরনো রাগ অনুভব করছি। কথা বাড়ালাম না আর। নওশীনের দোষ নেই। তাকে আরো কিছু ব্যাখ্যা না করে ফোন রেখে দিলাম। আমি দেখেছি আমার কথা মানুষ বুঝতে পারে না, অথবা ভুল বোঝে। বিশেষ করে উত্তেজিত হয়ে গেলে, যেসব কথা বলা উচিত নয় এমন কিছু কথাও অনেক সময় আমার মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, ইচ্ছাকৃত নয়, বেফাঁস। তাই এই মুহূর্তে সবার সঙ্গেই আমার যোগাযোগ বন্ধ রাখা জরুরি।
ধুর! এত প্রেশার নেওয়া যায় নাকি! আমার কিছু ভালো লাগছে না। কী এক প্রসঙ্গ আরম্ভ হয়েছে – অনিন্দিতা, জাফরভাই, ডিভোর্সি বান্ধবী বর্ষা, স্ক্রিনশট, কথা ছড়ানো, সামনে বন্ধু পেছনে ঘাতক – উফ ফালতু, খুবই ফালতু বিষয়!
সালমান রুশদির লেটেস্ট বই দ্য ইলেভেনথ আওয়ার-এ একটি গল্প আছে ‘দক্ষিণে’ নামে। জীবন ও মৃত্যু নিয়ে আলাপরত দুটি চরিত্র : সিনিয়র ও জুনিয়র, যেখানে সিনিয়রের আগে জুনিয়র মারা যায়, আর সিনিয়র ভাবে – এখনো সে আগের সেই বারান্দায় জুনিয়রের উপস্থিতি অনুভব করতে পারে, বাতাসের মতো জুনিয়র এসে দাঁড়ায় বারান্দায় তার নির্দিষ্ট জায়গায়। গল্পের একদম শেষ প্যারায় রুশদি বলেছেন : জীবন ও মৃত্যু কেবল পাশাপাশি দুটি লাগোয়া বারান্দা!
রুশদির কথার সূত্র ধরে আমিও কি ভাবতে পারি : বন্ধু ও শত্রু কেবল পাশাপাশি দুটি চলমান নৌকা, যে-কোনো আঘাতে, ভুল বোঝাবুঝিতে, অন্যের শত্রুতায়, ঈর্ষায়, অপমানে, অহংকারের দোলায় বন্ধু নৌকা ডুবে গিয়ে শত্রুর পাটাতনে আশ্রয় চাইতে পারে? তবে এখানে আরেকটি কথা আছে, জীবন থেকে মৃত্যুতে যাওয়া গেলেও মৃত্যু থেকে আবার জীবনে ফেরা যায় না, তেমনি বন্ধু থেকে শত্রু হওয়া সম্ভব হলেও একবার শত্রু হয়ে যাওয়ার পর আগের মতো বন্ধু হওয়া যায় না আর কোনোদিন। কাচের হৃদয়ে দাগ পড়ে যায় যে!
আমাদের জীবনে অনেকবার আকস্মিক আঘাত আসে। দীর্ঘ জীবন – আঘাত, দুর্ঘটনা, অপমান, অনাকাক্সিক্ষত কিছু লজ্জাজনক মুহূর্তের স্বাদ পাওয়া ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। মানুষের জীবনকে প্রায়শই উপন্যাসের সঙ্গে তুলনা করা হয়, যে-উপন্যাসের একেকটি অধ্যায় একেক গল্প বলে। তাই মানুষের জীবনে প্রেম, ভালোবাসা পাওয়ার আনন্দের সঙ্গে কিছু লুকিয়ে রাখতে চাওয়ার ঘটনাও ঘটে – কিছু মৃত্যু, হাহাকার, প্রতারণা, প্রবঞ্চনার গল্পও থাকে। নেতিবাচক ঘটনায় মানুষ তাৎক্ষণিক ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া দেখায় তার ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী। আচ্ছা, ব্যক্তিত্ব কী? অনেকে বলে ব্যক্তিত্ব হচ্ছে মানুষের মুখোশ। দুনিয়ার সামনে একজন মানুষ নিজেকে কোন মুখোশে দেখাতে চায় – সেটিই তার ব্যক্তিত্ব। আমি ভাবছি, অনিন্দিতার ব্যক্তিত্বের মুখোশ তাহলে কয়টি? যে-অনিন্দিতাকে আমরা এতদিন দেখে এসেছি সবার চেয়ে নরম, কোমল, বিড়ালের মতো মোলায়েম মানুষ হিসেবে – সেই মেয়েটি কেমন করে কল্পনার বাইরে আচরণ করতে পারে? গুডগার্ল মুখোশ খুলে ফেলে এমন প্রতিহিংসাপরায়ণ মুখোশ পরার আগে ভালো করে ভেবে নিয়েছিল কি? নাকি আদতে অনিন্দিতা বরাবরই একটি প্রতিহিংসাপরায়ণ দুষ্টু বিড়াল ছিল?
নাহ, আমি আর ভাবতে পারছি না। খুব চা খেতে ইচ্ছে করছে। রিনির সিরিজ দেখা মনে হয় শেষ হয়েছে, হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছি না আর। ওর মোবাইলে টেক্সট পাঠিয়ে এক মগ চা দিতে বললাম। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। একটা প্যারাসিটামল খাব কি না ভাবছি। আচ্ছা, অনিন্দিতা আমাদের বন্ধুদের সবার নাম, আড্ডার গল্প, ব্যক্তিগত কথাবার্তা মোটামুটি হুবহু রেখে ফেসবুকে যে পাবলিক পোস্ট করেছে এই ব্যাপারটি নিয়ে সে কি এখন খুব আনন্দে আছে? ভাবছে, দেখো, আমি চাইলে কি না করতে পারি? আমি তোমাদের সবার মুখোশ খুলে দিতে পারি? হয়তো সে-ও ভাবছে আমাদের মুখোশের আড়ালে কত কুৎসিত সত্যি ঢাকা আছে! বলে, ক্রোধ মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। প্রচণ্ড ক্রোধ ও প্রতিহিংসার আগুন অন্যদের পোড়ানোর আগে ব্যক্তিকেই পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, তখন অনিন্দিতার মতো মেয়েদের গুডগার্ল মুখোশ খুলে গিয়ে বোকা ও হিংসুটে মুখোশে দেখা যায়। বোকা বললাম, কারণ, একটু যদি বুদ্ধি থাকত তাহলে বুঝতে পারত, যাদের এমন শত্রু ভাবছে তারা আসলে তাকে ভালোইবাসত।
আজ সকালে অনিন্দিতা ফেসবুকে পাবলিক পোস্ট দিয়েছে, বন্ধুত্বের আড়ালে কয়েকজন ওকে নিয়ে কেমন ষড়যন্ত্র করেছে সেই ফিরিস্তি দিয়ে। মূলত আমাকে নিয়েই লিখেছে। প্রাসঙ্গিকভাবে পোস্টে এসেছে আমাদের আরো কয়েকজন বন্ধু, বান্ধবী, আমাদের নানা আড্ডা ও আনন্দকর্মের বিবরণ। বর্ষা কয়েক বছর আগে খুব চেষ্টা করেছিল আমার সঙ্গে আলাপ জমাতে। জাফরভাইয়ের সঙ্গে সম্ভবত বর্ষার তখন প্রেম চলছিল। মাঝে আমাদের বান্ধবী অনিন্দিতার কিছু আচরণ ও জাফরভাইয়ের পোস্টে ওর কমেন্ট দেখে বর্ষার মনে সন্দেহ জাগে, অনিন্দিতা বুঝি জাফরভাইকে পটানোর চেষ্টা করছে। অনিন্দিতার কমেন্টগুলো দেখে বর্ষা খুব রেগে যায়, আমাদের অনেকের কাছে ফোন করে অনিন্দিতার নামে নানা আপত্তিকর কথা বলে; কিন্তু যার জন্য এত প্রচেষ্টা করছে সেই জাফরভাই মানুষটিকে নিয়ে একটিও খারাপ কথা মুখে আনেনি। মেয়েরাও যে মনের ভেতরে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব পোষণ করে, বুঝেছিলাম সে-সময়ের বর্ষাকে দেখে।
রিনি চমৎকার এক মগ চা নিয়ে এসেছে। দ্রুতগতিতে বলল, ‘তোমার আর কিছু লাগবে?’
‘না, চায়ের জন্য থ্যাংকস!’
‘আমি গোসলে যাচ্ছি।’
‘এখন! এই রাতের বেলা!’
মিষ্টি করে হেসে রিনি চলে গেল। ওকে দেখে আমার নিজের ওই বয়সের কথা মনে হয়। কত উচ্ছল, প্রাণবন্ত দিন ছিল সেসব। জীবনের সোনালি দিনগুলো অনেক বছর আগেই ফেলে এসেছি, তবু মনে হয় এই তো খুব কাছেই আছে, যেন হাত বাড়ালে ছোঁয়া যাবে! কিন্তু সে ভ্রম। কিছুতেই আর পাওয়া যায় না সেসব দিন।
সেদিনের কথা আমার পরিষ্কার মনে আছে। দুই বছর আগে এক ভোরে, ঘুম ভাঙার পর খাটে শুয়ে মোবাইল ওপেন করেছি। দেখলাম অনিন্দিতার একটি মেসেজ ও একটি স্ক্রিনশট। মেসেজে অনিন্দিতা লিখেছে, ‘আমি এই ডিস্টার্বিং স্ক্রিনশটটি পেয়েছি। আমাকে বলা হয়েছে তুমি আমাকে ও জাফরভাইকে নিয়ে মিথ্যা অবৈধ সম্পর্কের গুজব ছড়াচ্ছো। গুজবটি এত মিথ্যা বানোয়াট যে এটি নিয়ে আমি এক মুহূর্তও নষ্ট করতাম না। কিন্তু আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে এসব গুজব তুমি ছড়াচ্ছো। আমি আসলে প্রকৃত সত্য জানতে চাই।’ সঙ্গে স্ক্রিনশটে দুজনের মেসেজ। একজন লিখেছে : ‘আহা অনিন্দিতা দিদি আর প্রিয়াংশু দাদা কি চমৎকার জুটি অথচ তাদের নিয়ে কি সব কথা, তখন থেকেই আমার মন উঠে গেছে। সানজানা আপাদের এলাকার সবাই এ গল্প জানে।’ মেসেজের অন্যজন লিখেছে, ‘তুমি কার কাছে শুনলে?’ জবাবে লিখেছে, ‘এমন একজনের কাছ থেকে যিনি তাদের বন্ধু গ্রুপের কেউ না, পারিবারিক সম্পর্কের কেউ।’
মেসেজে আমার নাম দেখে স্বাভাবিকভাবেই আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। অসমাপ্ত ঘুমভাঙা ঘোলা মাথায় মেসেজের আগামাথা সূত্রপাত কোথায় হতে পারে, কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না। শুধু তাড়াহুড়ো করে লিখেছিলাম বেশ কয়েকটি মেসেজ যার সারাংশ ছিল : এসব কথা যেন বিশ্বাস করো না, পরে আমরা ফোনে কথা বলব।
সেই সকালের পরে যখন কথা হয়েছিল অনিন্দিতার সঙ্গে, ওর কণ্ঠস্বরে বুঝতে পারছিলাম ওর ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গেছে। খুব মায়া লাগছিল। এমন পরিস্থিতিতে একটা মানুষের ওপর দিয়ে কী যেতে পারে, সেটি অনুমান করা মোটেই কষ্টকর ছিল না। আরো কিছু কথার পরে যখন জানতে পারলাম মেসেজের মানুষ দুটির নাম, তখন একটি ছোট্ট ঘটনা মনে পড়ে যায় আমার। অনিন্দিতাকে বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ, এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, কিন্তু সেটি তো দুই বছর আগের কথা। এতদিন পর এই কথা তোমাকে বলতে এসেছে কে?’
‘তাহলে তো স্ক্রিনশট ঠিকই বলছে!’
‘আমি খুবই সরি এই বিষয়টার জন্য। তোমার মেসেজ দেখে ওইদিনের কথা আমার মনে পড়েনি। কিন্তু এখন মনে পড়ছে।’
এরপর আরো অনেক বাজে ও দীর্ঘ দিন ও রাতের পর, ধীরে ধীরে বিষয়টি বাড়তে বাড়তে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়, বন্ধুদের মধ্যে দোটানা দেখা দেয়, কেউ অনিন্দিতার পক্ষে, কেউ আমার পক্ষে। আমাদের দুজনের জন্য কি না জানি না, অন্তত আমার জন্য বিষয়টি ভীষণ কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনিন্দিতার কষ্টে খারাপ লাগছিল, ওকে নিয়ে নোংরা এই গসিপের সঙ্গে আমার নামটি জুড়ে যাওয়ার ব্যাপারেও আমি ভীষণ লজ্জিত হচ্ছিলাম। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা যে একেবারে করিনি তা নয়, কিন্তু খুব একটা লাভ হয়নি। একসময় পুরো ব্যাপারটিকে সম্পূর্ণভাবে সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। অনিন্দিতার চেয়েও যারা আমাকে বেশি কাছে থেকে চিনত, তারাও কেউ কেউ আমাকে ভুল বুঝেছিল, কিন্তু আমার সৌভাগ্য ছিল বন্ধুরা কিছুটা শীতল ব্যবহার করলেও কেউ আমার হাত ছেড়ে দেয়নি।
মোটামুটিভাবে বললে, আমাদের বন্ধুত্বের বলয়ে সেই দুর্যোগময় সময়টুকু একসময় স্তিমিত হয়ে আসে। বর্ষার সঙ্গে আমরা বন্ধুরা প্রায় সবাই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করি, এমনকি অনিন্দিতাও। দুয়েকবার কোথাও দেখা হয়েছে অনিন্দিতার সঙ্গে আমার। খুব সামান্য কথাবার্তা বলেছি আমরা। তবু বলেছি, মুখ ঘুরিয়ে থাকিনি। কিন্তু আলাদা করে আর কখনোই ওর সঙ্গে আমার কথা হয়নি। যদিও আমি মনে মনে ভেবেছিলাম, কোনোদিন, একদিন হয়তো আমরা আবার সব বন্ধুরা একসঙ্গে বসতে পারবো, আবার আমাদের সবার সঙ্গে মিষ্টি মেয়ে অনিন্দিতাও থাকবে, সমস্ত অভিমান ও রটনার আঘাত কাটিয়ে আমরা ফের নিজেদের ভালোবাসবো।
রাস্তায় একটি বড় লরি যাওয়ার শব্দ শোনা গেল।
চায়ের খালি মগ রাখতে রান্নাঘরে গেলাম। দেখি রিনি ওভেনে আমাদের জন্য পাস্তা দিয়েছে। শাওয়ার শেষে এখন সে চুল শুকাচ্ছে। বাথরুম থেকে শ্যাম্পুর মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। রিনির ঘরে স্পিকারে হালকা মেজাজের কি একটা ইংলিশ গান বাজছে। ডিশ ওয়াশার থেকে প্লেট গ্লাসগুলো বের করে ময়লা মগটি রাখলাম। এরপর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমাদের মা ও মেয়ের রাতের খাবার, সামান্য আলাপ ও আবার যার যার ঘরে চলে যাওয়ার পালা। রাত মাত্র আটটা বেজেছে, কিন্তু শীতের রাত বলে মধ্যরাতের মতো নিস্তব্ধতা চারপাশে।
গুডনাইট বলে রিনি নিজের ঘরের দরজা ভিড়িয়ে দিয়েছে। আমিও চলে এলাম আমার শোবার ঘরে। প্লে-লিস্ট থেকে রবীন্দ্রসংগীত চালু করলাম। রাতে ঘুমানোর আগে রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে আমার ভালো লাগে।
‘এল আঁধার ঘিরে, পাখি এল নীড়ে, তরী এল তীরে, শুধু আমার হিয়া বিরাম পায় নাকো …’
পরপর কয়েকটি গান বেজে যাওয়ার পর উপলব্ধি করলাম, আমি আসলে গান শুনছি না। শুনতে পারছি না। বারবার আমার মন চলে যাচ্ছে অন্য কোথাও। সেই একই পুরনো প্রসঙ্গে। এতদিনে মনে হয়েছিল যে-প্রসঙ্গ চাপা পড়ে গেছে, সে-প্রসঙ্গ আবার জরুরি হয়ে উঠেছে অনিন্দিতার সকালের ফেসবুক পোস্টের কারণে। অনিন্দিতা লিখেছে, সে জানতে চায় বর্ষা কেন ওকে অনেক গোপন কথা বলেছে? জানতে চায়, আমি যখন জেনেছিলাম ওকে আর জাফরভাইকে নিয়ে ওসব নোংরা কথাবার্তা রটানো হচ্ছে, কেন বিষয়টি ওকে জানাইনি? ভাবতে ভাবতে মনে হলো, আমার মনও তো এতদিন একটি প্রশ্ন উত্তর খুঁজছিল, জাফরভাই কেন আমাদের বন্ধুদলের দুটি মেয়ের সঙ্গে একসঙ্গে সম্পর্ক করতে গেলেন, আর আমাদের বন্ধুদলের ব্যাপারে তার এত আগ্রহ অথবা মাথাব্যথা কেন? আজ আমার মনে আরেকটি প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে, অনিন্দিতা এতদিন পর বন্ধুদের নানা কেচ্ছা লিখে পাবলিক পোস্ট দিয়েছে কেন, ফেসবুক কি এখন জনতার আদালত? যদি আদালত হয়, তাহলে সে কার কাছে কৈফিয়ত দিচ্ছে, অথবা কার কাছে সে বিচার প্রত্যাশা করছে?
মাথা থেকে প্রসঙ্গটি দূর করার চেষ্টায় ভাবলাম পুরো বিষয়টি নিয়ে আবার ভাবা যাক। নিজেকে আমি কল্পনা করতে পারছি ফাহমিদা ভাবির বেডরুমে। সেদিন তাদের ঘরে আমাদের লাঞ্চ করতে বলেছিল। শুধু আমরাই ছিলাম, আর কারো দাওয়াত ছিল না। আমি খাটে বসে মোবাইলে মেসেজ পড়ছি আর রিপ্লাই লিখছি। ফাহমিদা ভাবি আলমারি থেকে জায়নামাজ বের করছেন, জোহরের নামাজ পরে টেবিলে খাবার দেবেন।
আমি বারবার মোবাইল দেখায় তিনি বলেছিলেন, ‘কার সঙ্গে কথা বলছেন ভাবি?’
‘বর্ষা, আমাদের বান্ধবী হয়।’
‘জরুরি কিছু?’
‘অনিন্দিতা ও জাফরভাইকে জড়িয়ে কারা নাকি আজেবাজে কথা বলছে। মেসেঞ্জারে ওদের দুজনের কমেন্টের স্ক্রিনশট শেয়ার করে কথাবার্তা বলছে।’
‘আয় হায়! কেন বলছে, এগুলা কি সত্যি?’
‘অনিন্দিতা ক্যারিয়ারে ভালো করছে তো, ওর এখন কিছু সুনাম হয়েছে, কিছু মানুষ ওর পেছনে লেগেছে। ফালতু হিংসা।’
ফাহমিদা ভাবির সঙ্গে আমার আলাপ ওখানেই শেষ। তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যান। আমরা লাঞ্চ করে বাড়ি চলে আসি। কিন্তু আমার মনে অ্যালার্ম বেজেছিল, গুজব আর স্ক্রিনশটের কথাটি মুখ ফসকে ভাবিকে বলে ফেলা ঠিক হয়নি মনে হয়। তাই দুয়েক সপ্তাহ পরে ভাবি যখন আমাকে অনিন্দিতার ঘটনার আপডেট জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি শুকনোভাবে বলেছি, ‘না, ওগুলো বানোয়াট কথা ছিল। আর কারো কাছে আমি কিছু শুনিনি।’
ফাহমিদা ভাবি কিন্তু বিষয়টি নিজের মধ্যে রাখেনি। সে আমাদের পরিচিত আরেকটি মেয়েকে কথাটি জানায়, যে আবার বর্ষার সঙ্গে ভাব জমাতে গিয়ে আমার কথাকে রং মাখিয়ে বাড়িয়ে বলেছে – আমাদের এলাকার সবাই এই বিষয়ে গল্প করে!
দিন যতই ভারি হোক, দিন গড়িয়ে যায়। রাত যতই অন্ধকার হোক, আলো ফুটে ওঠে। বিশ্বাসে যদি ফাটল ধরে, সে যত ক্ষুদ্রই হোক একদিন প্রাসাদ চৌচির করে দেবে। এই একটি প্রসঙ্গে, একটি স্ক্রিনশটে লেখা ছিল – ‘আমার এলাকায় ওদের নিয়ে গুজব ছাড়াচ্ছে’ এই অপরাধে আমার সঙ্গে বিভিন্ন মানুষের, বন্ধুদের অনেক রকম চেহারা আমি দেখেছি। সেই থেকে অনিন্দিতা আমার কাছ থেকে দূরেই থেকে গেছে। যদিও আমার মনে হালকা আশা জেগেছিল, হয়তো বন্ধুত্ব ঠিক হয়ে যাবে! কিন্তু হয়নি। ওর দুর্নামের জন্য নিজেকে আমি দায়ী মনে না করলেও সেদিন ফাহমিদা ভাবির সামনে প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে ফেলার অপরাধের গ্লানিতে জর্জরিত আমাকে মুক্তি দিয়ে দিয়েছে আজ সকালে অনিন্দিতার একটি খোলা পোস্ট। নিজেকে বলেছি : যাক ভালোই হলো, আমাকে আর ওর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না; একইসঙ্গে, আমার মুখ ফসকে বলে ফেলা একটি কথার জন্য যতটা শাস্তি পাওনা ছিল, সেটুকু আমায় সে নিজেই দিয়েছে, তাই আজ থেকে আমি শাস্তির অপেক্ষায় থাকার ভার থেকেও মুক্ত হয়েছি।
ঘরের বাতি নিভিয়ে দিয়ে ডুভেটের ভেতরে ঢুকে গেলাম। ঘুম না এলেও বিছানায় গা এলিয়ে পড়ে থাকব, রেস্ট দরকার আছে। মাথার ভেতরে অনিন্দিতার প্রশ্ন ভাসছে, কে বা করা ওকে নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে কথাটি আমি ওকে জানাইনি কেন? কেন জানাইনি – এর কারণ কী হতে পারে আমি আগে কখনো ভাবিনি। এখন মনে হচ্ছে, সত্যিই তো কেন জানালাম না? আমার কি উচিত ছিল না ওকে সাবধান করা? নাকি আমি চাচ্ছিলাম ওর খুব বদনাম হোক? সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরের আত্মা বলে উঠল, কখনোই না, কোনোদিন আমি ওর বদনাম অথবা ক্ষতি চাইনি। আমি বলিনি, কারণ আমার বলতে ইচ্ছে করেনি। আমি বলিনি, কারণ আমার কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। আমি বলিনি, কারণ অনিন্দিতাকে আমি খুব ভালোবাসলেও ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বে কিছুটা ফরমাল ব্যাপার ছিল, কারণ ও সবার সঙ্গে দূরত্ব রেখে মেশে। বর্ষা যদি মনিরা অথবা নওশীনের সম্পর্কে কিছু বলত, আমি নিশ্চয়ই ওদের সঙ্গে সঙ্গে জানতাম; কিন্তু অনিন্দিতা ছিল অন্যরকম, ওকে সহজে একটি দুঃসংবাদ দেওয়া যায় না!
এইবার আমার কিছুটা হালকা লাগছে। কেন বলিনি, তার চেয়ে বড় কথা, শোনা কথা শোনাতে আমি বাধ্য ছিলাম না, বাধ্য নই। তাছাড়া, আমার হয়তো মনে হয়েছিল, বর্ষার কথামতো সবাই যদি ওদের স্ক্রিনশট চালাচালি করতে থাকে, অনিন্দিতা তাহলে কারো না কারো কাছে বিষয়টি জেনেই যাবে, এ-ব্যাপারে আমার যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু এসবের পরেও আরেকটি প্রশ্ন থেকে যায় আমার নিজের কাছে, আমাদের বান্ধবীদের ব্যাপারে জাফরভাই লোকটির এত কৌতূহলের কারণ কী ছিল? একটি বিষয় পরিষ্কার বোঝা যেত, তিনি নারী-পরিবেষ্টিত থাকতে পছন্দ করেন। তিনি কি আমাদের বন্ধুদলের সঙ্গে ভিড়তে চেয়েছিলেন, কারণ এখানে অনেক নারী ছিল তাই? নাকি তিনি আসলে আমাদের দলে ভিড়তে চাননি, বরং আমাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরিয়ে দিয়ে দল ভাঙতে চেয়েছিলেন, কারণ আমরা সবাই একজোট হয়ে থাকলে তার সিক্রেট প্রকাশিত হয়ে যাবে, একই দলের দুই নারীর সঙ্গে প্রেম অথবা প্রেমের অভিনয় করে যাচ্ছেন, ধরা পড়ে যাবে? আর সেই কারণে একদিকে অনিন্দিতাকে বান্ধবীদের সম্পর্কে খারাপ ধারণা দিয়েছেন, আর অন্যদিকে বর্ষাকে বারবার বান্ধবীদের সঙ্গ পরিত্যাগ করতে বলছিলেন?
হায়রে পুরুষের নারীপ্রীতি! হায়রে নারীর প্রেমপ্রীতি!
উফ! নাহ! থামতে হবে এবার। বুঝতে পারছি নিজেকে আমার জোর করে থামাতে হবে। মোবাইল বন্ধ করে দিতে গিয়েও পারলাম না। অনেকদিন পর বর্ষার মেসেঞ্জার খুললাম। তাকে আমি ব্লক করে দিয়েছি। কিন্তু আসা-যাওয়া করা মেসেজগুলো পড়া যাচ্ছে। একটি মেসেজে চোখ আটকে গেল। এটি ছিল বর্ষার পাঠানো শেষ মেসেজ। এই মেসেজ পড়ার পর সঙ্গে সঙ্গে আমি মেসেঞ্জারেও ব্লক করে দিয়েছিলাম। বর্ষা লিখেছিল : ‘সানজিদা, আমি ঠিক করেছি আমার মাকে নিয়ে হজে যাব, যাওয়ার আগে আমার কিছু কাজ আছে। অনিন্দিতার সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব আমি আবার ঠিক করে দেব। অনিন্দিতা তোমাকে খুব ভালোবাসে …’
বর্ষার এই মেসেজের কারণেই মনে হলো অন্য সবার কাছে নিজেকে প্রমাণ করা জরুরি না হলেও কোনোদিন হয়তো অনিন্দিতার মনে আমার জন্য শ্রদ্ধা ছিল, ভালোবাসা ছিল, সেই অনুভূতির সম্মানে হলেও সিনেমার দৃশ্যায়নে ক্যামেরার লেন্স ঘুরিয়ে দেখানোর মতো করে আমার দিকের ঘটনা ওকে জানানো প্রয়োজন। যে কারণে আমার এই লম্বা ইশতাহার লিখতে বসা। হয়তো অনেকের উদ্দেশে, হয়তো অন্য কেউ নয়, আমার নিজের জন্যই এই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা জরুরি ছিল। আমার আর কিচ্ছু ভালো লাগছে না। এবারে সত্যি আমি মোবাইল টার্ন অফ করে দিয়েছি। চোখ বন্ধ করে প্রিয় গান মনে করতে চেষ্টা করলাম। কয়েকবারের চেষ্টায় সফলও হলাম। মনে হচ্ছে অদিতি মহসিন যেন আমার কানের কাছে গুনগুন করে গাইছেন : ‘আমায় পরশ ক’রে প্রাণ সুধায় ভ’রে/ তুমি যাও যে সরে, বুঝি আমার ব্যথার আড়ালেতে দাঁড়িয়ে থাক/ ওগো দুঃখজাগানিয়া …’


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.