মিতুর জন্মদিন ও একটি ছবি

রাতে খাবার সেরে স্ত্রীর হাতে যত্ন করে বানানো পানটা মুখে পুড়ে নতুন কেনা সোফায় হেলান দিয়ে হোসেন আলী বলে, ‘কী, কেমন লাগতাছে, ভালা না?’

স্বামীকে দেওয়ার পর এবার নিজের পানটা মুখে চালান করে দিলো শানু। পানটা বেশ ঢাউস সাইজের হওয়ায় মুখের ভেতরের প্রায় সবটা জায়গা দখল হয়ে গিয়েছিল। এমনিতে পান সে বেশ সময় নিয়ে আরাম করে চিবায়। কিন্তু হোসেন আলীর প্রশ্নের উত্তরটা দেওয়ার তার তর সইছিল না। খুব দ্রুতগতিতে পানটা জাবর কাটতে কাটতে ওটাকে মুখের একপাশে নেওয়ার পর তার মুখ থেকে অর্ধেক বোধগম্য কয়েকটা শব্দ বের হলো, ‘ভালা মানে, কী কন আপনে, বহুত ভালা অইছে।’

এরপর হোসেন আলী আর শানুর কারো মুখে কোনো কথা নেই, দুজনে আরাম করে পান চিবায় আর টিভি দেখে। পঞ্চাশ ইঞ্চি একটা টিভি কিনেছে তারা এ-বাসায় ওঠার পর। কিন্তু টিভিতে তারা বেশিক্ষণ মনোযোগ দিতে পারে না। একবার টিভি দেখে তো আরেকবার জানালার দিকে তাকায়, জানালার ওপর সুন্দর করে লাগানো পর্দাটা দেখে। শানু টানা তিনদিন ঢাকা শহর ঘুরে কয়েক ডজন পর্দার দোকানে অনেক যাচাই-বাছাই করে শেষমেশ এই পর্দার কাপড়টা এলিফ্যান্ট রোড থেকে কিনেছে। পর্দা দেখা শেষ হলে তারা সিলিং ফ্যানটা দেখে। সিলিং ফ্যান দেখা হলে তারা এ-রুম থেকে ও-রুমে যায়, বারান্দায় যায়, নতুন কেনা ডাইনিং টেবিলের ওপর সামান্য কিছু পড়ে থাকলে তাড়াতাড়ি সেটা পরিষ্কার করে। তারপর কখনো কখনো তারা মিতু আর খোকনের রুমের দরজাটা একটু আলতো করে উঁকি মেরে দেখে। তারা নিজেদের ছেলেমেয়েদের দেখে আর খুশি হয়।

– দ্যাখছ শানু, পোলা-মাইয়া দুইডা কি খুশি?

– হ, ঠিক কইছেন।

– কিন্তু ভাবতাছি গরম তো এহনো শুরুই হয় নাই। গরমের কালে ওগো ঘরে এসি লাগামু। দুইজনের লাইগা দুইডা এসি।

– কী কন আপনে। এই বাসা কিননের পর তো হাতে আর কিছু নাই। এসি কিনার টেহা পাইবেন কই?

– চিন্তা কইরো না, বাসা যহন কিনতে পারছি, এসিতে ঠেইকা থাকব না।

মুদি দোকানদার হোসেন আলী বড়লোকের এলাকায় নতুন ফ্ল্যাট কিনেছে – এ-খবরটা বাজারে হু-হু করে ছড়াতে সময় লাগলো না। পাশের খুচরা রড-সিমেন্টের কারবারি আলতাফ বলে, ‘কী হোসেন ভাই, এক্কেরে গিয়া উঠলেন দেহি কোটিপতি পাড়ায়। দেহাইলেন খেল আপনি একটা। দেহান দেহান, ভালা কইরা দেহান, এহন আপনের সময়।’

এলাকার কমিশনার কবিরউদ্দিন হেঁয়ালি করে বলে, ‘ওই মিয়া হোসেন আলী, তুমি নাহি বড়লোকের এলাকার ভিসা পাইছো? অহন কি দোকানও হেদিকে উড়াইয়া নিয়া যাইবা নিহি? তয় এই টাইপের দোকানপাট চলত না ওইহানে, বুলডোজার দিয়া গুঁড়া গুঁড়া কইরা হালাইব।’

নতুন ফ্ল্যাট কেনার পর কম কিছু সহ্য করতে হয়নি হোসেন আলীকে। বাজারের সামান্য মুদি দোকানদার যে ঢাকার বড়লোকের পাড়ায় তল্পিতল্পা নিয়ে পাড়ি দিয়েছে, সেটাতে শুধু যে চেনাজানা লোকেরই গা-জ্বালা ধরেছে তা নয়, আত্মীয়স্বজনের মুখও ব্যাজার। তার ভায়রা ভাই, রানুর জামাই, যে কি না একটা ঠিকাদারি কোম্পানির সুপারভাইজার, সে বলে, ‘কী দিয়া যে কী করলেন ভাইজান! এক্কেবারে জাতে উইঠা গেলেন দেহি। এরপর আমগো পরিচয় দিবেন তো?’

হোসেন আলী বলে, ‘মতিন, হারা জীবন কষ্ট কইরা টাহা জমাইয়া পোলাপানের লাইগা বাসাডা কিনছি। সকালে নাস্তা না কইরা চাউল চাবাইয়া খাইছি, একবেলা খাইছি তো আরেকবেলা উপাস দিছি। কষ্টের কামাইর টাহায় করছি, আল্লায় চাইলে তোমগোও একদিন হইব।’

মতিন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘হ, আমাগো আর হইছে। যেই টিনের চালের ঘরে ভাড়া থাহি, ওইহানেই থাকতে হইব। লটারি না পাইলে ঘরবাড়ি আর কপালে নাই। সুপারভাইজার হইয়া ভুল করছি, আপনের লাহান মুদিগিরি করলেই মনে অয় ভালা আছিল।’

মতিনের অপমান গায়ে মাখে না হোসেন আলী। মানুষের কথা এত গায়ে মাখলে চলে না, গায়ের চামড়া পুরু হলে অনেক সুবিধা।

মিতু আর খোকনকে দুটি ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে অনেক টাকা বের হয়ে গেল হোসেন আলীর। নামিদামি স্কুল, খরচ তো হবেই, নিজেকে সান্ত্বনা দেয় হোসেন আলী। নিজের ছেলেমেয়ে বলে কথা।

দুই বছর হয়ে গেছে এই ফ্ল্যাটে উঠেছে তারা। গত বছর ছেলেমেয়েদের ঘরে এসি লাগানো যায়নি, স্কুলে ভর্তি করানোর পর হাত একেবারে খালি হয়ে গিয়েছিল। এই এক বছরে একটু একটু করে জমিয়ে দুটি এসি কিনে মিস্ত্রি দিয়ে বসিয়ে নিয়েছে। মেয়েটা এখন ক্লাস নাইনে, লেখাপড়ার বেজায় চাপ। ছেলেটাও লেখাপড়ায় বেশ ভালো। সন্ধ্যার পর মাঝে মাঝে কারেন্ট থাকে না। একদিন মিতু এসে বলল, বাবা, লোডশেডিংয়ে লেখাপড়ায় বেশ কষ্ট হচ্ছে। একটা জেনারেটর কিনতে পারবে?

এই দুই বছরে মিতু আর খোকনের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ভদ্রপাড়ায় থেকে আর ভালো স্কুলে পড়লে এই লাভ। সব ভালো ভালো মানুষের সঙ্গে চলাফেরা। ভালো না হয়ে কি উপায় আছে? মিতু এখন বাংলা আর ইংরেজি সমানে বলে। মাঝে মাঝে হোসেন আলী আর শানুর মনে হয়, তাদের ছেলেমেয়েরা বাংলার চাইতে ইংরেজিই বেশি বলে। ছেলেমেয়ের মুখে যখন ইংরেজির খই ফোটে, দেখে খুব ভালো লাগে হোসেন আলী আর শানুর, বুকটা গর্বে ফুলে ওঠে আর চোখেমুখে প্রশান্তির ভাব চলে আসে। মনে মনে তারা ভাবে, সারা জীবনের কষ্ট বুঝি এবার ফল দিলো।

মেয়ের জেনারেটর কেনার কথায় সায় দেয় হোসেন আলী। বলে, ‘কেন কিনুম না মা? অবশ্যই কিনুম। কাইলকাই একটা জেনারেটর নিয়া আমুনে।’

শানু বলে, ‘কাইলকাই কিনবেন? হুনছি জেনারেটরের অনেক দাম।’

‘দাম-টাম কোনো ব্যাপার না, আমার মায়ের পড়ালেহা বইলা কতা।’

এই দালানে মোট আটটা ফ্ল্যাট। কোনো ফ্ল্যাটের বাসিন্দার সঙ্গেই হোসেন আলীর মুখের চেনাজানা ছাড়া বিশেষ কোনো আলাপ-পরিচয় নেই। এদের কেউ তার সঙ্গে পরিচিত হতে এখন পর্যন্ত কোনো আগ্রহ দেখিয়েছে, এমনটা দেখা যায়নি। হোসেন আলীকে দেখে তারা বুঝে গেছে, সে ঝাঁকের বাইরের মাছ, ভুল করে বা ঘটনাক্রমে তাদের সুরক্ষিত ঝাঁকে ঢুকে পড়েছে। শানুর অবস্থা কিছুটা ভালো, তার সঙ্গে অন্য দুইটা ফ্ল্যাটের ভাবিদের সঙ্গে সামান্য কথাবার্তা হয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে একবার তিনতলার ভদ্রমহিলা নামছিলেন। দোতলায় নিজেদের ফ্ল্যাটের দরজার সামনের জায়গাটা ঝাড়ু দিচ্ছিল শানু। ভদ্রমহিলাকে দেখেই সালাম দিয়ে বলল, ‘আপা, এতবার আপনারে দাওয়াত দিলাম আমগো বাসায় এক কাপ চা খাইয়া যাইতে, আইলেন না তো!’ ভদ্রমহিলা একগাল নকল হাসি দিয়ে বললেন, ‘সময় পাই না, এত ব্যস্ত থাকি আর বলবেন না। তবে সময় পেলেই চলে আসবো, চিন্তা করবেন না।

একমাত্র ব্যতিক্রম পাশের বাসার মেয়েটা। মিতুর এক ক্লাস নিচে পড়ে। বলতে গেলে দুজন সমবয়সী। সে মাঝে মাঝে আসে মিতুর কাছে। সেদিন এসেছিল মেয়েটি বিকেলবেলা। মিতু বাথরুমে থাকাতে শানু দরজা খুলে দিয়েছিল। মেয়েটিকে দেখে সে বেজায় খুশি। তার থুতনিটা তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের মাঝখানে ধরে বলেছিল, ‘দেখছনি, কী সুন্দর মাইয়া আল্লাহ গো। আহো, বহো, মিতু বাথরুমে আছে, অক্ষণই  চইলা আইব।’

মিতু এসে দেখে তার মা মেয়েটির সঙ্গে গল্প জমানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু জমছে না। মেয়েটা হাসি হাসি মুখ করে শুধু শানুর কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছে।

শানু বলছে, কোন ক্লসে পড়ো, ‘এইটে?’

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

– ‘ভালা ভালা। লেহাপড়া ঠিকঠাক চলতাছেনি? লেহাপড়াডা ঠিকমতো কইরো কিন্তু, ঠিক আছে?’

মেয়েটি আবার মাথা নাড়ল।

মিতু এসে মেয়েটিকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, ‘এসো সায়রা, আমার রুমে যাই।’

রাতে সবাই মিলে খেতে বসেছে। মিতু বলল, ‘মা, একটা কথা বলবো?’

– ‘ক, ক, কী কবি।’ শানু বলল।

– আমার বন্ধুরা কেউ বাসায় এলে তুমি ওদের সঙ্গে কথা বলবে না। ওরা এটা ভালো চোখে দেখে না।

– ক্যান, আমি আবার কী করলাম। আমি তো কী সুন্দর কইরা আইজ মাইয়াডারে ঘরে আইনা বয়াইলাম, এতে খারাপটা কী দেখলি?

সরাসরি কিছু না বলে মিতু বললো, ‘এতো ডিটেইলস বলতে পারবো না। শুধু বললাম, ওরা এলে আমাকে বলবে, আমি এসে ওদের সঙ্গে কথা বলবো। আর …।

– ‘আর কী?’ হোসেন আলী প্রশ্ন করে।

মিতু বলে, ‘তোমরা যেভাবে কথা বলো ওরা সেটা বোঝে না। আর ওরা কেউ তোমাদের পান খাওয়াও পছন্দ করে না। জর্দার গন্ধে নাকি ওদের বমি আসে।’

মিতুর কথায় হোসেন আলী আর শানুর মুখ শুকিয়ে গেল, কী বলবে ভেবে পেল না।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে শানু বলল, ‘মিতু তো ঠিক কতাই কইছে। এই যুগের শিক্ষিত পোলাপান, পান-জর্দা খায় না, পছন্দও করে না।’

হোসেন আলী বলে, ‘তাইলে কি পান খাওয়া ছাইড়া দিমু, তুমি কি কও। অরা যহন পছন্দ করে না, তহন চলো ছাইড়া দেই।’

– ‘পান খাওয়া না অয় ছাইড়া দিমু। কিন্তু কতা?’

– ‘কিসের কতা?’ হোসেন আলীর প্রশ্ন।

– ‘ক্যান, মিতু কয় নাই। আমরা যেমনে কতা কই, হেইডা।’

– ‘হারা জীবন এই রহম কইরা কতা কই, হেইডা ঠিক করুম কেমনে? হোসেন আলী ভীষণ ধন্দে পড়ে যায়।’

হোসেন আলী দোকানে বেচাবিক্রিতে ব্যস্ত, এমন সময় একটা ফোন আসে তার মোবাইলে। ওপাশ থেকে একজন মহিলার কণ্ঠ।

– ‘হ্যালো, হোসেন আলী সাহেব বলছেন?’

– ‘হ, আমি হোসেন কইতাছি, আপনি কেডা?’

– ‘হোসেন আলী সাহেব, আমি মিতুর স্কুলের হেড মিস্ট্রেস, সুলতানা জামান।’

হোসেন আলী হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়ালো। তার সামনে কয়েকজন কাস্টমার, তাদের সামনে হই-হট্টগোলের মধ্যে মেয়ের স্কুলের হেড মিস্ট্রেসের সঙ্গে কথা বলাটা বেয়াদবির মতো মনে হলো তার কাছে। দোকান থেকে বের হয়ে একটা অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি জায়গায় এসে সে বলে, ‘ম্যাডাম বলেন, আমি হুনতাছি।’

সুলতানা জামান বলেন, ‘আপনি তো কাল এলেন না আমাদের অনুষ্ঠানে, এলে খুশি হতাম।’

হোসেন আলী ভাবল তাকে হয়তো ভুল করে ফোন দিয়েছে। স্কুল পড়ালেখার জায়গা, অনুষ্ঠান আবার কিসের? বললো, ‘ম্যাডাম, কিসের অনুষ্ঠান আমি তো বুঝতাছি না।’

সুলতানা জামান বললেন, ‘সে কী, আপনি জানেন না? এটা আমাদের স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান। প্রতিবছর আমরা ফাইনাল পরীক্ষার পর করি। সব স্টুডেন্ট আর তাদের গার্জিয়ানরা আসেন, আমরা আপনার মতো সব গার্জিয়ানকেই দাওয়াত দিই প্রতিবছর। আপনি গতবারও আসেননি, এবারো এলেন না। তাই ভাবলাম একবার আপনাকে ফোন করি। আপনি কি আমাদের এই অনুষ্ঠান পছন্দ করেন না?’

হোসেন আলী এবার নিশ্চিত হলো, তাকে ভুল করে হেড মিস্ট্রেস ফোন করেননি। কিন্তু এইসব দাওয়াতের ব্যাপার-স্যাপার যে কী, সেটা তার মাথায় ঢুকছে না। ম্যাডামকে প্রশ্ন করার তার সাহস না থাকলেও খুব বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, ‘ম্যাডাম, কই আমি তো এসবের কিছুই জানি না। আপনি দাওয়াত দিলে না আইয়া ক্যামনে পারি।’

এবার সুলতানা জামান আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন, আপনার ও আপনার স্ত্রীর নামে ইনভাইটেশন কার্ড তো ওর ক্লাস টিচার মিতুর হাতে দিয়ে দিয়েছে। গতবছরও দিয়েছিল। তার ওপর মৌখিকভাবেও মিতুকে বারবার বলে দেওয়া হয়েছিল যেন বাবা-মাকে জানিয়ে দেয় আর কার্ড আপনার হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়, আপনি কার্ড পাননি?’

হোসেন আলী বলল, ম্যাডাম, ‘মনে অয় কুনহানে কিছু একটা ঝামেলা হইছে। হয়তো কার্ড দিতে বা কইতে ভুইলা গেছিল।’

– ‘উঁহু, উঁহু’, হেড মিস্ট্রেস বললেন, ‘না হোসেন সাহেব, কোনো ভুল হয়নি। আমি ক্লাস টিচারকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়েছি, মিতুর হাতে ইনভাইটেশন কার্ড পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল, ও রিসিভ করে সইও করেছে। ও আপনাকে কোনো কার্ড দেয়নি?’

হোসেন আলী হ্যাঁ বা না কোনো উত্তর দিতে পারল না সেদিন।

দেখতে দেখতে মিতুর জন্মদিন ঘনিয়ে এলো। তারা যখন সেই আগের বাসায় থাকতো তখন কোনোদিন জন্মদিন পালন করা হয়নি। তারা যে-পাড়ায় থাকতো, সেখানে কাউকে কোনোদিন জন্মদিন পালন করতে তারা দেখেনি, নিজেরাও সেটা করেনি। নতুন এই বাসায় আসার পরে মাত্রই গত বছর মিতুর আগ্রহে ঘরোয়াভাবে তার জন্মদিন পালন করেছে তারা। কিন্তু এবার সে বায়না ধরেছে, তার জন্মদিনটা ধুমধাম করে করতে হবে। এরই মধ্যে সে তার কয়েক বন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছে। এই তো সেদিন সে গেল তার ক্লাসমেট মিথিলার জন্মদিনের পার্টিতে। বড় ব্যবসায়ীর একমাত্র মেয়ে মিথিলা। সেই অনুষ্ঠানে গিয়ে মিতুর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে – ওটাকে শুধু একটা জন্মদিনের পার্টি না বলে বলা ভালো রাজকীয় কোনো আয়োজন। কয়েকশো মানুষ এসেছিল সেদিন। মিতুর একটা অন্যরকমের অনুভূতি হয়েছিল মিথিলাকে দেখে – রাজকন্যার মতো লাগছিল ওকে। কত অতিথি কত দামি উপহার নিয়ে এসেছিল তার হিসাব নেই। তার কিছুটা সে নিজ চোখে দেখেছিল আর কিছুটা পরে মিথিলার কাছে শুনেছিল। কেউ দামি ঘড়ি, কেউবা বিদেশ থেকে আনা দামি জুতা বা পোশাক। অনেকেই খামভর্তি টাকা উপহার দিয়েছে। মিথিলার এক মামা এসেছিল সেখানে, সে নাকি মিথিলাকে একটা নতুন গাড়িই উপহার হিসেবে দিয়েছে, যদিও তার গাড়ি চালানোর বয়স হতে এখনো দুই বছর বাকি।

জন্মদিনের সেই অনুষ্ঠান থেকে ফিরে কয়েকদিন সে মনমরা হয়ে ছিল। মিথিলার সঙ্গে তার নিজের, মিথিলাদের বাড়ির সঙ্গে নিজেদের এই ছোট ফ্ল্যাট, যে-ফ্ল্যাটটা নিয়ে তার মা-বাবার গর্বের শেষ নেই, তার তুলনা করে সে মনে মনে কুঁকড়ে যেতে লাগল। এই ভেবে তার লজ্জার শেষ নেই, মিথিলাকে সে কীভাবে তার জন্মদিনে দাওয়াত দেবে। মিথিলা কি তাদের এই বাসায় আসবে, নাকি তারা গরিব বলে কোনো অজুহাতে এড়িয়ে যাবে। আর কোন মুখেই বা সে মিথিলাকে তার জন্মদিনে দাওয়াত দেবে? ওদের বড়লোকির কাছে নিজেদের এই গরিবি হাল দেখাতে তার কি লজ্জা করবে না? কিন্তু দাওয়াত না দিলেও কি মুখরক্ষা হয়?

মেয়ের ইচ্ছায় হোসেন আলী ব্যস্ত হয়ে পড়লো মেয়ের জন্মদিনটা ধুমধামের সঙ্গে উদযাপন করতে। ঘর সাজানো শুরু হলো, কিছু ফার্নিচার বদল করতে হলো। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা গেল নতুন একটা সোফাসেট কিনতে। মিতু বলল, বাবা, এই সোফাটা পাল্টাও। মেয়ের কথামতো নতুন সোফাসেট নিয়ে এলো হোসেন আলী। অনেকগুলি প্লেট আর কাটলারিজ কিনতে হলো। সেইসঙ্গে ছোটখাটো আরো অনেক জিনিস। সেসব করতে হোসেন আলীকে কখনো নিউমার্কেট, কখনো গুলশান মার্কেট, কখনো বা আরো হরেক জায়গায় ছোটাছুটি করে বেড়াতে হলো। প্রায় সপ্তাহখানেক নিজের দোকান কর্মচারীদের ওপর ছেড়ে দিয়ে সে পরের দোকানে দোকানে ঘোরাঘুরি করে জন্মদিনের যোগাড়যন্ত্র করার কাজে গলদঘর্ম হতে থাকল।

শানুর অবস্থা আরো খারাপ। হোসেন আলীর সঙ্গে তার শুধু এটুকু তফাৎ যে, সে থাকে ঘরের ভেতরে। এ-ঘর থেকে ও-ঘরে, এটা ঘষো তো ওটা মাজো, এটা ফেলো তো ওটা আনো, এখানে অনেক ময়লা, টেবিল ক্লথটা ফেলে দিয়ে নতুন একটা দাও, খাবার-দাবারের কোনো আইটেমে ঘাটতি পড়লো কি না – এইসব করতে করতে কীভাবে তার দিন পার হয়ে যায় তা সে ঠাহর করতে পারে না।

তারপর শুরু হলো মিতুর তার বাবা-মাকে ভদ্রমানুষ করার মিশন। বারবার তাগাদা দিয়ে হোসেন আলীকে বাধ্য করলো এক জোড়া স্যুট কিনতে, তার সঙ্গে মানানসই টাই। জীবনে হোসেন আলী কোনোদিন স্যুট পরেনি। টাইটা সে এ-জীবনে কোনোদিন বাঁধতে পারবে বলে তার ভরসা হয় না। শানুর জন্য কয়েকটা নতুন শাড়িও কেনা হলো।

জন্মদিনের একদিন আগেই সারা বাসা সাজানো হলো মনের মতো করে, যতটা হোসেন আলীর সাধ্যে কুলায়। ঘরের দেয়ালে লাগানো হলো ‘হ্যাপি বার্থডে’ ব্যানার। হোসেন আলীর দোকানের কর্মচারী মন্টু কয়েকদিন ধরে সেই সকালে আসে আর রাতে যায়। এখানে-ওখানে ছোটাছুটি থেকে শুরু করে নানা ফাইফরমাশ খেটে খেটে ক্লান্ত ছেলেটা। প্রায় শ’খানেক নানা রঙের বেলুন ফুলিয়ে স্কচটেপ দিয়ে সেগুলি দেয়ালে সাজিয়ে দিয়েছে সে। সঙ্গে হাত মেলায় খোকন। খোকনের উৎসাহ আর আনন্দের সীমা নেই। সে মনেপ্রাণে চাইছে তার বোনের একটা জমজমাট জন্মদিন হোক। সেটা হলে সে তার জন্মদিনটাও একইভাবে করার আবদার করতে পারবে।

প্রায় বিশ-পঁচিশটি ছেলেমেয়ে এলো জন্মদিনের অনুষ্ঠানে। সারা বাসা ওদের হইচইয়ে মুখরিত। মিতুর সেই বান্ধবী মিথিলাও এলো। মেয়েটি অতি বড়লোকের সন্তান হলেও অসম্ভব বিনয়ী। হোসেন আলী আর শানু এই ভিড়ের মধ্যে চুপসে গিয়ে নিজেদের ঘরে চুপচাপ বসে আছে। মিতু এসে বললো, ‘দেখো মা, ওই যে মিথিলা।’ দরজাটা একটু ফাঁক করে তারা মিথিলাকে দেখল। তারপর মিতু বললো, ‘আচ্ছা, তোমরা ভালোই করেছ এই রুমের মধ্যে এসে বসেছ। ওদিকে যে ভিড়, তোমরা এদিকেই থাকো, আমি ওদিকটা সামলে নেব।’

নিজেদের ঘরে বসে হোসেন আলী আর শানু হাসে। ছেলেমেয়েদের আনন্দ দেখে তাদের মন ভরে গেছে। হোসেন আলী বলে, ‘বুঝছো মিতুর মা, টাকা গেলেও জিনিসটা কিন্তু ভালা হইছে। মিতুর একটা সমাজ আছে না? তার সন্মান না রাখলে চলে? কত বড়লোকের পোলা-মাইয়া হের বন্ধু, একটু খরচ না করলে চলব কেমনে?’

শানু বলে, ‘ঠিকই কইছেন আপনে। পোলা-মাইয়ার শান্তিই তো আমগো শান্তি। হেরা খুশি না থাকলে টাহা দিয়া কাম কী আমগো?’

হঠাৎ ঘরের দরজায় টোকা পড়লো। শানু উঠে দরজা খুলে দিতেই দেখা গেল মিথিলা। বলল, ‘চাচা, চাচি, তাড়াতাড়ি চলেন। এখন বার্থডে’র কেক কাটা হবে। মিতুকে কত করে বললাম – চাচা-চাচিকে নিয়ে আয়, তা শুনলই না। আপনাদের ছাড়া কেক তো কাটা উচিত হবে না।’

মিথিলার কথা শুনে দুজনেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। জন্মদিনে কেক কাটা হয় সেটা তারা শুনেছে, কিন্তু সেই কাজে যে আজ তাদেরও উপস্থিত থাকতে হবে সেটার জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। গায়ের কোটটা গরমে অনেকক্ষণ আগেই হোসেন আলী খুলে রেখেছিল। এখন সে একটা পাঞ্জাবি পরে আছে। মিথিলা তাদের দুজনের হাত ধরে প্রায় টানতে টানতে ড্রইংরুমে নিয়ে এলো। দেখা গেল ছেলেমেয়েরা ডাইনিং টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে, আর টেবিলের ওপর মিথিলার আনা বিশাল কেকটা। তার ওপর ইংরেজিতে লেখা ‘হ্যাপি বার্থডে টু মিতু-১৬’। সেই কেকের ওপর ১৬টি মোমবাতি। মিথিলা হোসেন আলী আর শানুকে মিতুর পাশে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল,
‘চাচা-চাচি, আপনারা মিতুর সঙ্গে দাঁড়ান। আমরা সবাই মিলে ছবি তুলব।’

জন্মদিনের অনুষ্ঠানের পর ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিলো হোসেন আলী আর শানু। শানু বলল, ‘ক্যামন দেখলেন সব, ভালা হইছে না?’

হোসেন আলী গর্বের সঙ্গে বলল, ‘ভালা হইছে মানে, খুবই ভালা অইছে। মিতু খুশি হইছে, কী কও?’

– ‘খুশি না হওনের কী আছে? হে খুবই খুশি।’ শানু বলে, ‘হের মুখ দেখলেই তো কওন যায়।’

সেই রাতে হোসেন আলী আর শানু মনে বিশাল এক প্রশান্তি নিয়ে ঘুমাতে যায়।

পরদিন হোসেন আলী দেরি করে বাসায় ফেরে। গত কয়েকদিনে কর্মচারীদের হাতে ছেড়ে আসা ব্যবসার যা-তা অবস্থা, ঠিক করতে আরো কয়েকদিন সময় লাগবে, তারপরও তার মন ভালো। খাওয়া-দাওয়া সেরে নিত্যদিনের মতো শানুর হাতে বানানো পান মুখে দিয়েছে, শানু নিজের পান মুখে নিতে যাবে এমন সময় খোকন এসে বলে, ‘এই দেখো মা, আপুর জন্মদিনের ছবি।’ সে একটা ফোন তার মায়ের সামনে ধরে।

শানু বলে, ‘কই, দেহি দেহি।’

খোকন একটার পর একটা ছবি দেখায়। বলে, ‘এই দেখো মা, আপু কত ছবি পোস্ট করেছে।’

শানু আর হোসেন আলী দুজনেই সেই ফোনে একটার পর একটা ছবি দেখতে থাকে।

কত ছবি, কত দৃশ্য –

মিতু মাথায় মুকুট পরেছে, সেই ছবি।

মিতুর বন্ধুরা বেলুন ফাটাচ্ছে, সেই ছবি।

মিতু খোকনকে কোলে নিয়ে কেক তুলে দিচ্ছে তার মুখে, সেই ছবি।

মিতু আর তার বন্ধুরা উল্লাস করছে, সেই ছবি।

মিতু কেক কাটছে, সেই ছবি।

কেকের ওপর হ্যাপি বার্থডে মিতু-১৬, সেই ছবি।

ছবিগুলি দেখছে আর হোসেন আলী ও শানুর চোখ-মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। নিজেদের গর্বিত মা-বাবা মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে তাদের। এইসব ছবির কাছে সব কষ্টকে তুচ্ছ মনে হয় তাদের।

তারা আরো ছবি দেখে, যত দেখে ততো ভালো লাগে তাদের।

তারপর, আরো অনেক ছবি দেখার পর একটা ছবিতে তাদের চোখ আটকে যায়। খোকন পরের ছবিটাতে যায়। শানু বলে, খোকন, আগের ছবিডা দেহা আরেকবার। খোকন আগের ছবিটাতে ফিরে যায়। সেই ছবিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে শানু। তারপর হোসেন আলীর দিকে ফিরে তাকায়। হোসেন আলী বারবার সেই ছবিটার দিকে তাকায়। তার সন্দিগ্ধ দৃষ্টি বলে দেয় সে যা খুঁজছে তা সে পায় না। শানু আরো দশবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, সেও পায় না। শানু ও হোসেন আলী দুজন আবার একে অপরের দিকে তাকায়, তাদের মুখের ওপর এ সময় একটা ছায়া নেমে আসে। প্রত্যাশিত কিছু খুঁজে না পাওয়ার প্রশ্ন তাদের চোখেমুখে।

শানু কিছুটা ইতস্তত করে খোকনকে জিজ্ঞেস করে, ‘ওই খোকন, আমি আর তোর বাপেও না এই ছবি তোলনের সময় আছিলাম? ক আছিলাম না? আমার বাঁ পাশে মিতু তার পাশে তুই, আর তোর পাশে তোর বাপে?’

খোকন হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে।

তখন শানু প্রশ্ন করে, ‘তাইলে আমরা কই, আমগো দেহন যায় না ক্যান?’

হোসেন আলী মুখে প্রশ্ন করে না। সে শুধু খোকনের দিকে তাকায়, খোকনও ইশারায় বুঝে নেয় তার বাবাও মায়ের মতো একই প্রশ্ন করেছে।

কোনো সময় না নিয়েই খোকন উত্তর দেয়, ‘আপু তোমাদের ছবি থেকে মুছে দিছে।’

খোকনের উত্তর শুনে শানু আর হোসেন আলী কোনো কথা বলতে পারে না। তাদের মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না। কথা বলার মতো বাকশক্তি যেন এক মুহূর্তের মধ্যে তাদের ভেতর থেকে উধাও হয়ে গেছে।