মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন – ‘হারামণি’র সন্ধানে নিরন্তর যাত্রা

লোকসংস্কৃতির অনুরাগী অন্নদাশঙ্কর রায় (১৯০৪-২০০২) ছিলেন মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের (১৯০৪-৮৭) প্রিয় সুহৃৎ, গুণগ্রাহী ও সহমর্মী। দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ ও আলাপ ১৯৩১ সালে, রাজশাহী জেলার মহকুমা-শহর নওগাঁয়। অন্নদাশঙ্কর এখানে ছিলেন মহকুমা শাসক আর মনসুরউদ্দীন স্কুল সাব-ইন্সপেক্টর। তাঁদের আলাপ ও ঘনিষ্ঠতার মূলে ছিল লোকসংস্কৃতি। সম্পর্কের সূচনা হয় মনসুরউদ্দীনের তরফ থেকে তাঁর

সংকলিত-সম্পাদিত লোকগীতিসংগ্রহ হারামণি (১৩৩৭) উপহার দিয়ে এবং পরে তা পূর্ণতা পায় হারামণির অষ্টম খণ্ড (১৩৮৩) অন্নদাশঙ্কর ও লীলা রায়ের নামে উৎসর্গের মাধ্যমে। প্রতিদানে অন্নদাশঙ্করও মনসুরউদ্দীনকে তাঁর বই লালন ও তাঁর গান (১৩৮৫) উৎসর্গ করেন এবং হারামণি নিয়ে হ্রস্ব অথচ মনোজ্ঞ আলোচনা করেন
দুই-দুইবার। এসব আলোচনায় তিনি মনসুরউদ্দীন ও তাঁর কাজ সম্পর্কে যে-মন্তব্য করেন তা স্পষ্টই
মর্ম-মানসউন্মোচক। অন্নদাশঙ্কর ছিলেন লোকগানের রসজ্ঞ বোদ্ধা। এ-ধারায় তাঁর পূর্বসূরি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ,
এ-কথা সুবিদিত – তবে এই রসলোকে মগ্ন হয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলামও, সে-কথা বোধকরি অল্পজনেরই জানা। রসপন্থি অন্নদাশঙ্কর হারামণিকে বাউল ও লোকগানের ‘পদকল্পতরু’ আখ্যা দিয়েছেন (মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন স্মারকগ্রন্থ : আবুল আহসান চৌধুরী-সম্পাদিত, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ১৯৮৮; পৃ ৮)। নওগাঁয় অন্নদাশঙ্করের সঙ্গ-সান্নিধ্য মনসুরউদ্দীনকে নানাভাবে ঋদ্ধ করে। অন্নদাশঙ্করের সৌজন্যেই এখানে তিনি দেখা পান ডক্টর আরনল্ড বাকের। ডক্টর বাকে বাংলা মুলুক ঘুরে ঘুরে নানা ধরনের লোকগান যন্ত্রে ধারণের উদ্যোগ নেন। নওগাঁতেও অন্নদাশঙ্করের সহায়তায় তিনি বাউল-ফকিরদের বেশকিছু গান, মনসুরউদ্দীনের ভাষায় ‘বিস্তর পল্লীগান’, ফোনোগ্রামে রেকর্ড করেন। এই আসরে মনসুরউদ্দীনও উপস্থিত ছিলেন। তিনি গানগুলো টুকে নেন এবং তা হারামণির দ্বিতীয় খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়। লোকগীতি সংগ্রহের সূত্রে অন্নদাশঙ্করের সঙ্গে তাঁর যে গাঢ় সম্পর্ক রচিত হয় তা প্রয়াণ-অবধি অক্ষুণ্ন ছিল। মনসুরউদ্দীনের সখ্য ও সাহচর্য অন্নদাশঙ্করকেও লোকসংস্কৃতি বিশেষ করে বাউল ও লালনের গানের প্রতি অনুরাগী করে তোলে। নওগাঁ-পর্ব নানা কারণে মনসুরউদ্দীনের জীবনে স্মরণীয় হয়ে আছে।

দুই

ঐতিহ্য-সাধনা ও স্বদেশ-অন্বেষার এক অক্লান্ত পথিক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন। বাঙালির লোকজ জীবনের
সংস্কৃতি-সাধনার রূপ-স্বরূপকে তিনি সানুরাগ শ্রদ্ধা-প্রীতিতে তুলে ধরেছেন জাতির সমুখে। লোকজীবনের সঙ্গে তাঁর ছিল প্রাণের যোগ। আক্ষরিক অর্থেই আজীবন তিনি ছিলেন ‘মাটির কাছাকাছি’। তাই লোকসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ছিল নিবিড় ও আত্মিক। তাঁর অর্জন ও সিদ্ধি এই মাটি আর মানুষকে অবলম্বন করেই রচিত। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তাঁরই প্রেরণায় মনসুরউদ্দীন লোকসংস্কৃতির যে-উপকরণ সংগ্রহ করেছেন সারাজীবন, তা বাংলার প্রায় অজ্ঞাত-অবলুপ্ত তৃণমূল-সংস্কৃতির ‘উজ্জ্বল উদ্ধার’ হিসেবে চিহ্নিত। তাঁর আন্তরিক প্রয়াস ও চর্চায় বাংলা ও বাঙালির লুপ্তপ্রায় অবজ্ঞাত সাংস্কৃতিক সম্পদ গৌরব ও মর্যাদার আসন লাভ করেছে।

মনসুরউদ্দীনের জন্ম পাবনা জেলার সুজানগর থানার মুরারিপুর গ্রামে। নিম্নবিত্তের কৃষিজীবী পরিবারের সন্তান। নানাজনের, বিশেষ করে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর-পরিবারের সহায়তা আর আনুকূল্যে তাঁর জীবন গড়ে ওঠে। মেধাবী ছাত্র হিসেবে খ্যাতি ছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে এম.এ. পরীক্ষায় বাংলায় প্রথম শ্রেণি পান। তিনিই প্রথম মুসলমান ছাত্র হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন। অথচ শিক্ষাগত সাফল্যের নিরিখে তাঁর কোনো যোগ্য চাকরির ব্যবস্থা হয়নি। কর্মজীবনের সূচনা ১৯২৯ সালে। স্কুল সাব-ইন্সপেক্টর, স্কুল-শিক্ষক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সরকারি সাময়িকপত্রের সম্পাদক – বিভিন্ন পদমর্যাদায় এসব ক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন। কর্মসূত্রে তাঁকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে ও থাকতে হয়েছে। তাঁর লোকসংস্কৃতির উপকরণ সংগ্রহে এই পরিভ্রমণ ও অবস্থান বিশেষ সহায়ক হয়েছিল।

তিন

মনসুরউদ্দীন ছিলেন লোকসংস্কৃতিচর্চায় নিবেদিত।

লোকসংস্কৃতিই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। তবে সাহিত্য-সাধনায় তাঁর জিজ্ঞাসা ও চর্চার বৈচিত্র্য ছিল। প্রথম জীবনে

গল্প-কবিতা লিখেছেন, উপন্যাসও। কিন্তু অল্পদিনেই সাহিত্যের এই সৃজনশীল শাখা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। পুরোপুরি মনোযোগ নিবেদন করেন লোকসংস্কৃতি-সংগ্রহ, আলোচনা-গবেষণা ও মননচর্চায়। লোকসংস্কৃতিকে তাঁর চিন্তা ও চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেও সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর আগ্রহের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর এই উৎসাহ ও সন্ধিৎসার ফসল পারস্যের মরমি কবিদের জীবন ও কাব্যের আলোচনা-গ্রন্থ ইরানের কবি (১৯৬৮)। অজ্ঞাত দুষ্প্রাপ্য সব তথ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অনেক শূন্যপূরণ করেছেন, নির্মাণ করেছেন নতুন ইতিহাসের কাঠামো – তার পরিচয় মিলবে বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা (১ম, ২য় খণ্ড/ ১ম-৩য় অখণ্ড : ১৯৬০/ ১৯৬১) গ্রন্থে। ভিন্ন ভাষা থেকে শ্রদ্ধায়-মমতায় তুলে এনেছেন ইতিহাস-খ্যাত ব্যক্তিত্বের নিপুণ পরিচয়, যেমন আওরঙ্গজেব (১৯৪৬)। গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লোককথা-রূপকথাকে অবিকল সেই গ্রামীণ কথকের মুখের ভাষায় পরিবেশন করেছেন বিদগ্ধ নগরবাসীর কাছে শিরণী (১৯৩২) পেশ করে। আউল-বাউলের গান সংগ্রহ করতে করতে কখন একসময় চলে যান পেছনের পথে সোজা সেই মধ্যযুগে – নানা ফুল কুড়িয়ে এনে মালা গাঁথেন বৈষ্ণব কবিতার (১৯৪২)। পুথির জগৎও তাঁকে হাতছানি দিয়েছে – পুথিসাহিত্যচর্চার প্রবাদপুরুষ আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহও জেগেছে তাঁর। সেইসূত্রে দৌলত কাজীর
সতীময়না-লোরচন্দ্রানী পুথি যৌথ-সম্পাদনায় সত্বর প্রকাশের বিজ্ঞাপনও তাঁর তরফে পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়, যদিও এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। তবে পুথির প্রতি ঝোঁক মনে রয়েই যায়, অনেক পরে তিনি সম্পাদনা করেন কাজী হায়াৎ মামুদ-বিরচিত হিতজ্ঞান বাণী (১৯৭৮)। অবসরের খেয়ালে সংকলন করেন ক্ষিতিমোহন
সেন-সংগৃহীত বাউলগান (১৯৮০) কিংবা শব্দকোষ (১৯৫৭)। শব্দ-প্রয়োগের শুদ্ধাশুদ্ধি সম্পর্কেও পুস্তিকা (১৯৮০) রচনায় আগ্রহী হন। শিশুপাঠ্য পুস্তকও আছে তাঁর – হাসির পড়া (১৯৬৩) ও Hashi Passages for Translation

 (১৯৬৫?)। প্রবল সামাজিক চেতনা ও শুভবুদ্ধির প্রেরণায় রচনা করেন হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ। মহাপুরুষের জীবন ও বাণীকে তাঁর জীবনের পাথেয় বিবেচনা করেছেন। তার ফলেই রচিত হয় হজরত মুহম্মদের জীবন ও সাধনা। টুকরো টুকরো এইসব কাজের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠেন একজন প্রাজ্ঞ শিল্প-শ্রমিক মনসুরউদ্দীন – যেখানে তাঁর চিন্তা-চেতনা-মনন-মনীষা-প্রকৃতি-মেধার অখণ্ড রূপের সন্ধান মেলে।

চার

মনসুরউদ্দীনের শ্রেষ্ঠ কাজ তাঁর লোকসংগীত-সংগ্রহ হারামণি। সাকল্যে এগারো খণ্ডে প্রকাশিত হারামণি এ-দেশের

লোকসংস্কৃতিচর্চার ইতিহাসে এক মাইলফলক। বৈশাখ ১৩২২ থেকে প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের সংগ্রহ নিয়ে তাঁরই দেওয়া ‘হারামণি’ নামে একটি বিভাগ প্রবর্তিত হয় – উদ্দেশ্য ছিল লোকসাহিত্যের বিলুপ্তপ্রায় অজ্ঞাত সব গীতি-নিদর্শন প্রকাশ। উত্তরকালে এই নামের তাৎপর্য ও আকর্ষণেই মনসুরউদ্দীন তাঁর লোকসংগীত-সংগ্রহের নাম দেন হারামণি। কালক্রমে নামের মূল উৎসের স্মৃতি হারিয়ে তা নতুনভাবে বেঁচে রইল মনসুরউদ্দীনের বইয়ের নামের ভেতর দিয়ে। শেষ পর্যন্ত ‘হারামণি’ ও ‘মনসুরউদ্দীন’ এই নাম দুটি পরস্পরের পরিপূরক ও পরিচয়জ্ঞাপক হয়ে দাঁড়ায়।

রবীন্দ্রনাথের আদর্শ ও প্রেরণায় নিজের গ্রাম মুরারিপুরের এক বৈরাগীর কাছ থেকে লালনের একটি গান সংগ্রহ করে ছাপার জন্যে প্রবাসী পত্রিকায় পাঠান। ততদিনে ‘হারামণি’ বিভাগ বিলুপ্ত, তাই ১৩৩০-এর আশ্বিন সংখ্যায় সাধারণ শিরোনামেই গানটি প্রকাশ পায় – ‘বাঁকির কাগজ মন তোর গেল হুজুরে’। এই হলো মনসুরউদ্দীনের প্রথম প্রকাশিত লোকগান এবং সৌভাগ্যের কথা সেটি লালনের পদ। এই দৃষ্টান্তগত প্রেরণা কেবল নয়, রবীন্দ্রনাথ হারামণির একটি অসাধারণ ভূমিকা লিখে দিয়ে নবীন মনসুরউদ্দীনকে অনুপ্রাণিত করেন ও লোকসংস্কৃতিচর্চার আঙিনায় স্বাগত জানান। এরপর মনসুরউদ্দীন লোকসাহিত্যের ভুবনে পাকাপাকি ঘর বাঁধেন। একনিষ্ঠ সাধনায়, পরম যত্ন-শ্রম-মমতায় একের পর এক হারামণির বিভিন্ন খণ্ড প্রকাশ করে লোকসংগীতের বিচিত্র ও অনবদ্য নিদর্শন শিক্ষিত বাঙালির কাছে তুলে ধরেন। ‘… মনসুরউদ্দীন তাঁর … অধ্যবসায়ে যে মধুচক্র রচনা করেছেন “গৌড়জন তাহে আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি।” দেশ তাঁর কাছে ঋণী’ (‘প্রবন্ধ’, কলকাতা, সেপ্টেম্বর ১৯৬৪; পৃ ৪৫০) – হারামণি সূত্রে অন্নদাশঙ্কর রায়ের এই মন্তব্য  কোনোক্রমেই অতিকথন নয়।

কোনো কোনো খণ্ডে কবিগান, মেয়েলিগীত, জারি, সারি, বারোমাসি বা মিশ্রলোকগীতির নিদর্শন প্রকাশিত হলেও হারামণি মূলত বাউল ও মরমি গানের সংকলন হিসেবেই পরিচিত। আর এই বাউলগানের প্রধান অংশ জুড়ে আছে লালন ফকিরের পদ। হারামণির প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালে, শেষ খণ্ডের প্রকাশকাল ১৯৮৪। শেষ খণ্ডটিকে ত্রয়োদশ খণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হলেও আসলে কালক্রম অনুসারে এটি একাদশ খণ্ড। কেননা একাদশ ও দ্বাদশ খণ্ড অজ্ঞাত কারণে প্রকাশিতই হয়নি। হারামণির দ্বিতীয় খণ্ড কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৪২ সালে। চতুর্থ ও পঞ্চম খণ্ডের প্রকাশকাল যথাক্রমে ১৯৫৯ ও ১৯৬১। এই খণ্ড দুটি প্রকাশিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্‌যোগে। সপ্তম (১৯৬৩), অষ্টম (১৯৭৬), নবম (১৯৮৮) ও দশম (১৯৮৪) খণ্ডের প্রকাশক বাংলা একাডেমি। দ্বিতীয় খণ্ডের তৃতীয় সংস্করণও (১৯৭২) বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়। ত্রয়োদশ খণ্ড প্রকাশ করে বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ, ১৯৮৪ সালে। এর বাইরে দু-একটি খণ্ড (যেমন তৃতীয় খণ্ড : ১৯৪৮ ও ষষ্ঠ খণ্ড : ১৯৬৭) এবং কোনো কোনো খণ্ডের পুনর্মুদ্রণ মনসুরউদ্দীন নিজস্ব উদ্যোগে তাঁর প্রকাশনা-সংস্থা হাসি প্রকাশনালয় থেকে প্রকাশের ব্যবস্থা হয়। হারামণির সম্পূরক হিসেবে লালন ফকিরের গান, বাউলগান, Folksongs of Lalan Shah তাঁর এইসব গীতিসংগ্রহ-পুস্তকের নাম উল্লেখ করা যায়। তাঁর পরিকল্পিত হারামণির অবশিষ্ট খণ্ডগুলো প্রকাশের ব্যবস্থা হলে মনসুরউদ্দীনের লোকসংস্কৃতিচর্চার স্বরূপ বোঝা ও পূর্ণ পরিচয় পাওয়া সহজ হতো।

মনসুরউদ্দীন কী জীবনে কী সাধনায় খুব যে সুশৃঙ্খল বা হিসেবি ছিলেন তা নয়। একটু অগোছালো – একটু অবিন্যস্ত থাকা এ-যেন তাঁর স্বভাবের অন্তর্গত ছিল। লেখক বা সংগ্রাহক বা গবেষক হওয়ার কোনো জোরালো পটভূমি বা পরিকল্পনা ছিল না, এ-পথে আসাটা নিতান্তই আকস্মিক ব্যাপার বলতে হয়। তবে এসে পড়ে আর ফেরেননি, পথ বদলাননি। লোকজীবনের সঙ্গে মিশে গিয়ে সেই জীবনের সাহিত্যশিল্প চর্চাকেই সাধনার অঙ্গ বিবেচনা করেছেন। মনসুরউদ্দীন যদি লোকসাহিত্যের নেশায় না মজতেন তাহলে বাঙালি তার আবহমান বৃহত্তর জীবনধারার শিল্প-পরিচয় থেকে বঞ্চিত হতো। মনসুরউদ্দীন নিজেও তাই মনে করতেন। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘গল্প-কবিতা-উপন্যাস এসব লেখা ছেড়ে দিলেন কেন?’ নির্লিপ্তভাবে জবাব দিয়েছিলেন, ‘কী হবে ওইসব ছাইপাশ লিখে! ওসব লেখার অনেক যোগ্য লোক আছে। চাষাভুষোর ফকির-বাউলের গান-টান ধরে রাখার লোক তো নেই।’ লোকজ জীবন ও সংস্কৃতিকে তিনি দু’চোখ ভরে দেখেছেন, তন্ময় হয়ে শুনেছেন, অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর সংগ্রহ তাই মুগ্ধ অনুরাগীর নির্বিচার সংগ্রহ। ঐতিহ্যের অহংকারই ছিল তাঁর প্রেরণা।

পাঁচ

মনসুরউদ্দীন বাঙালির স্বরূপ-সন্ধানে পথ দেখিয়ে গেছেন। তিনি আত্মবিস্মৃত ঐতিহ্যবিমুখ জাতির মগ্নচৈতন্যে যে জাগরণ-স্পর্শের সূচনা করে গেছেন, সেই বিষয়টি স্মরণে রাখলে তাঁর কৃতি ও অবদানকে কোনো ক্রমেই খাটো করা যায় না। যে উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ‘যৎশ্রুতং তৎলিখিতং’ এই মন্তব্য করে মনসুরউদ্দীনের সংগ্রহ-পদ্ধতি সম্পর্কে আপত্তি তুলেছিলেন, তিনিও শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছেন যে, বাউলগান সংগ্রহের ক্ষেত্রে ‘তিনিই পথিকৃৎ’ (বাংলার বাউল ও বাউলগান, কলকাতা, ১৩৮৮, পৃ ৫৩৬)। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় হারামণিকে ‘সংহিতা পুস্তক’ স্বরূপ ‘মহাগ্রন্থ’ বলে অভিহিত করেছেন (হারামণি, ৮ম খণ্ড, ঢাকা, জ্যৈষ্ঠ ১৩৮৩; পৃ ছয়)। অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর এক লেখায় বলেছেন, ‘‘হারামণি’ মনসুরউদ্দীনের জীবনের বড়ো কাজ’ (মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন স্মারকগ্রন্থ, পূর্বোক্ত; পৃ ৭)। লোকবিজ্ঞনী শামসুজ্জামান খান তাঁকে সনাক্ত করেছেন এইভাবে : ‘তিনি ছিলেন ফোকলোরের শ্রমনিপুণ এক মহান সাধক। তাই তাঁকে বাঙলাদেশের আধুনিক ফোকলোরচর্চার পিতৃপুরুষ (founding father) হিসেবে আখ্যাত করা যায়’ (আধুনিক ফোকলোরচিন্তা, ঢাকা, আগস্ট ২০০১; পৃ ১১৭)। সবার ওপরে স্মরণ করতে হয় রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য। হারামণির ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেছেন : ‘…মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন মহাশয় বাউল সঙ্গীত সংগ্রহ ক’রে প্রকাশ করবার যে উদ্যোগ করেচেন, আমি তার অভিনন্দন করি, – সাহিত্যের উৎকর্ষ বিচার ক’রে নয়, কিন্তু স্বদেশের উপেক্ষিত জনসাধারণের মধ্যে মানব-চিত্তের যে-তপস্যা সুদীর্ঘকাল ধ’রে আপন সত্য রক্ষা ক’রে এসেচে তারই পরিচয় লাভ করব এই আশা ক’রে’ (হারামণি : কলকাতা, বৈশাখ ১৩৩৭; পৃ
‘আশীর্ব্বাদ’ – পাঁচ-ছয়)। আবার জীবনের সায়াহ্নবেলায় আরেকবার মনসুরউদ্দীনকে শুভকামনা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : ‘তোমার গ্রাম্য গীতি সংগ্রহের অধ্যবসায় সফলতা লাভ করুক এই আমি কামনা করি’ (শান্তিনিকেতন, ২৩শে, জুলাই ১৯৩৭)। হারামণির প্রথম খণ্ড হাতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত নজরুল বলেছিলেন : ‘ভৈরব নদীর তীরে ঝাউ-তলায় নিরালায় বসে ‘হারামণি’ দেখছিলাম। মাথার উপর ঝাউশাখার করুণ মর্মর-ধ্বনি, দূরে গো-চারণের মাঠে রাখালের তলতা বাঁশের বাঁশীর সুর, সামনে উদাস মাঠের বুকে হাটুরে পথিকের পায়ে-চলা পথ; মনে হচ্ছিল – ‘হারামণি’র গান যদি শুনতে হয়, তা হলে এমনি নিরালা একটু স্থান খুঁজে নিতে হয় …। এ গানে বাঙ্লার স্নেহ-সিঞ্চিত ভেজা মাটির গন্ধ, বাঙ্লার নিরক্ষর পল্লী-কবির অনাড়ম্বর প্রকাশ-স্বচ্ছতা, নিরাবিল প্রাণ, নিস্তরঙ্গ স্তব্ধতা; এ তো কোলাহল-মুখর জলসার জন্য নয়। … ক্ল্যারিওনেট আর তানপুরার আসরে মেঠো রাখালকে তিনি ধরে এনেছেন; আর কার কেমন লাগবে জানিনে, কিন্তু আমার চোখে জল এসেছে’ (জয়তী, মাসিক, কলকাতা, শ্রাবণ ১৩৩৭/ নজরুল-রচনা-সম্ভার, আবদুল কাদির-সম্পাদিত, দ্বি-স : ঢাকা, জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৬; পৃ ২২১)।

ছয়

তাঁকে প্রথম দেখার স্মৃতি মানসপটে উজ্জ্বল হয়ে আছে। যতদূর মনে পড়ে সেটা ১৯৬৭-তে, ছেঁউড়িয়ায়
লালন-স্মরণোৎসবে। মজা কালীগাঙের প্রান্ত-ছুঁয়ে লালনের আখড়ার মধ্য-চত্বরে বাউলের গানের আসর বসেছে, পুবের বাঁশবাগানের মাথার ওপরে দোল-পূর্ণিমার অপার্থিব পূর্ণ-চাঁদের মেলা, জোছনার রুপালি ধারায় অবগাহন করে বাউল গেয়ে চলেছে : ‘কবে সাধুর চরণধূলি লাগবে মোর গায়’। ঠিক মাঝখানে বসে আছেন মাথায় সামান্য জরি-চুমকির কাজ-করা বিশেষ ধরনের কালো সুফি-টুপি আর গাঢ় রঙের গেরুয়া আলখাল্লা পরে মনসুরউদ্দীন –  অবিন্যস্ত সাদা-কালো চুলের লম্বা গোছা বটের ঝুরির মতো ঘাড় বেয়ে পিঠ প্রায় ছুঁই ছুঁই করছে, মাথাটা একটু নুয়ে আছে, গানের গমকে তা মাঝে-মধ্যে দুলে উঠছে। চেহারা আর বেশভূষায় তাঁকে মরমি সাধকদের থেকে পৃথক করা কঠিন – যেন এক মগ্ন-বাউল বসে আছেন সভা আলো করে।

সাত

মনসুরউদ্দীনের সঙ্গে আলাপের সুযোগ এলো আরো দু-বছর পরে, ১৯৬৯ সালে। এবারেও এসেছিলেন
লালন-উৎসবে। ছেলেবেলা থেকেই বাউল-ফকিরদের গানের প্রতি টান ছিল। একটু বড়ো হলে এখানে-সেখানে ঘুরে কিছু গান সংগ্রহ করেছিলাম, নেহাতই শখের বশে। তাঁর সামনে মেলে ধরলাম গানের সেই খেয়াল-খাতা। একটু উলটে-পালটে দেখে তারপর রহস্য করে বললেন, ‘ভালোই তো, তবে কিনা জানিস্ এ-তো সব গুরুমুখী বিদ্যেরে, গুরু র্ধ, অম্নি অম্নি কী হয়! আর হ্যাঁ, গুরুদক্ষিণার কথা ভুলিস্নে যেন।’ মনে মনে সেইদিনই গুরুপদে দীক্ষা নিলাম – ‘গুরু দোহাই তোমার মনকে আমার লওগো সুপথে।’ মামুলি দু-চার কথা, কিন্তু তাতেই আপন করে নিলেন। আর সেইসঙ্গে ধরিয়ে দিলেন নেশা। সাধক-গুরু তো, তাই সে নেশা জ্ঞান-গঞ্জিকার, সুরের খাঁচার অচিন পাখি ধরার মরমি নেশা। গুরুসংসর্গে ছেদ পড়ে প্রায় দু-দশক পর, তাঁর প্রয়াণের ফলে।

আট

ধীরে ধীরে পরিচয় গাঢ় হয়, তাঁর একান্ত সাহচর্যে আসি, একেবারে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয় যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন। এই পরিচয় শেষ পর্যন্ত পারিবারিক সম্পর্কে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। আমি থাকতাম মাতুল জাতীয় অধ্যাপক ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের ১১৩ সেগুনবাগিচার বাড়িতে। মোতাহার হোসেনের সঙ্গে মনসুরউদ্দীনের বিশেষ অন্তরঙ্গতা ছিল। দুই বৃদ্ধকে রসের ভিয়েন দিয়ে সব গল্পসল্প করতে শুনেছি। সেবাদাসী বা চারিচন্দ্র কিংবা নীরক্ষীরের তত্ত্বকথার ভেদ ভাঙতে দেখেছি মনসুরউদ্দীনকে। আড়াল থেকে উপভোগ করেছি মোতাহার হোসেনের সরল জিজ্ঞাসা ও কৌতুক-মন্তব্য শুনে। পরে যখন মোতাহার হোসেনকে দিয়ে ফকির লালন সাঁই সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লিখিয়ে নিই, তখন হয়তো এই আলাপের জ্ঞান তাঁর কিছু কাজে লাগলেও লাগতে পারে। যা-হোক, এতে মনসুরউদ্দীনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভিন্ন এক মাত্রা পায় – মাতুল তাঁর সুহৃৎ, সেইসূত্রে মনসুরউদ্দীনও হয়ে গেলেন মাতুলস্থানীয়। এতে করে তাঁর স্নেহ-প্রীতিলাভের বাড়তি সুযোগ জুটে যায়। যখন ঢাকায় ছিলাম, সপ্তাহে নিদেনপক্ষে একদিন তো তাঁর শান্তিনগরের মোকামে যাওয়া হতোই হতো, অনেকটা যেন নিত্য-রুটিনে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো দিন বিকেলে আমাকে নিয়ে বেড়াতে বেরুতেন। বেশিরভাগ দিনই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বাসায় যাওয়া হতো। শিল্পাচার্যের সঙ্গে তাঁর ভারি ভাব ছিল। বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে শিল্পাচার্য নিজের আঁকা কয়েকটি ছবি মনসুরউদ্দীনকে উপহার দিয়েছিলেন, সেসব হয়তো এখনো তাঁর ঘরে শোভা পায়। মনসুরউদ্দীনের মাধ্যমে শিল্পাচার্যকে কাছের মানুষ হিসেবে পেয়েছিলাম। এই সম্পর্কের কারণেই প্রীতিবশত তিনি আমার সম্পাদিত লোকসাহিত্য পত্রিকার প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন। মনে পড়ে মনসুরউদ্দীনের সঙ্গে এক-দুইবার কবি জসীম উদ্দীনের আবাসেও গিয়েছি, ‘সাহিত্য সাধনা সংঘে’র সভায়।

মনসুরউদ্দীনের বাড়িতে নানা গল্পে আসর জমে উঠতো – চায়ে চুমুক দিয়ে আয়েশ করে গড়গড়ায় টান দিতেন – গল্প করতে করতে বাংলার মানচিত্রের প্রায় সবটুকুই স্পর্শ করা হয়ে যেতো তাঁর – চলে যেতেন ফেলে আসা দিনগুলোতে। লালনের গানের কলি মাঝেমধ্যে উচ্চারিত হতো তাঁর কণ্ঠে। জ্ঞানদাস বাঘেলির একটি কবিতাও তাঁর খুব প্রিয় ছিল, প্রায়ই আওড়াতেন :

ফজর মে জব আয়া য়ল্চী পুশাক সুন্হলী তেরী

গমক ভর জব শ্বাঁস লগায়া চীত জগায়া মেরী।

ধূপমে হমকো কিয়া উদাসা ক্যা পীড় দূর সমায়া

গায়া গেরুয়া সুর মগ্রবী মরণ সা রৈন আয়া।

কাগজ কালা হরফ উজালা ক্যা ভারী খৎ পায়া

ইত্তী রৌনক ক্যৌঁ রে য়ল্‌চী তুঁহী ইয়াদ ভুলায়া।

ভারী জলসা আজম দাবৎ তুঁহী ইক মেহমান

খল্‌ক্ খল্ক্ মে খৎ হৈ ফৈলী মঘ্রূর হম ফরমান ॥

ডক্টর সুকুমার সেন এই মরমি রূপক কবিতার অর্থ করেছেন এইরকম : ‘দূত তুমি যখন প্রত্যুষে এলে তখন তোমার সোনালি পোশাক। গমক ভরে তুমি যখন শ্বাস ছাড়লে তখন আমার চিত্ত জাগলো। রৌদ্র আমাকে উদাস করলো, কী বেদনা দূর-দূরান্তে ব্যাপ্ত হলো। অপরাহ্ণে গেরুয়া সুর গাইলো, মরণের মতো রাত এলো। কাগজ কালো, হরফ উজ্জ্বল – কী বিরাট চিঠি পাওয়া গেল। দূত, এত জাঁকজমক কেন? তুমি আমার কাজ ভুলিয়ে দিচ্ছ। ভারি জলসা, বিরাট আয়োজন। তুমিই একমাত্র অতিথি। বিশ্বসংসারে নিমন্ত্রণপত্র ছাড়া হয়েছে। আমি সেই পরোয়ানার দূত।’

নয়

মনসুরউদ্দীনের স্নেহ-ভালোবাসা যা পেয়েছি তার তুলনা নেই। আমার কত তুচ্ছ কাজের প্রশংসা করেছেন, প্রেরণা দিয়েছেন আজ সেসব কথা ভাবলে চোখটা ভিজে আসে। নানা ভাবে তিনি পণ্ডিতজনকে আমার প্রতি মনোযোগী করে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষক আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ঢাকায় এলে মনসুরউদ্দীন একদিন তাঁকে প্রাতরাশের নেমন্তন্ন করেন। দিনটার কথা বেশ মনে পড়ে, ১৯৭৪ সালের ২০শে ডিসেম্বর। সেই চা-নাশতার আসরে উপস্থিত ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক, ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিম, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী এবং আরো কেউ কেউ। স্নেহবশত আমাকেও তিনি এই মজলিশে ডেকেছিলেন। শুধু তাই নয়, সুনীতিকুমারের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে একান্তে কিছুক্ষণ আলাপের সুযোগও করে দেন। এ-আমার জীবনের এক স্মরণীয় মুহূর্ত। সুনীতিকুমার পরে আমার বই (লালন স্মারকগ্রন্থ) ও পত্রিকা (লোকসাহিত্য পত্রিকা) সম্পর্কে আলোচনাধর্মী অভিমত লিখে দেন, সেও আমার কম বড়ো প্রাপ্তি নয়।

অন্নদাশঙ্কর রায় আমাকে আগেই চিনতেন, তাঁর স্নেহেও স্নাত আমি। কুষ্টিয়ায় মহকুমা শাসক থাকাকালে অন্নদাশঙ্করের সঙ্গে আমার পিতা কুষ্টিয়ার অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট ও সাহিত্যসেবী ফজলুল বারি চৌধুরীর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। অন্নদাশঙ্কর নানা জায়গায় তাঁর কথা উল্লেখ করেছেন। আমার পিতা, মনসুরউদ্দীন ও অন্নদাশঙ্কর – এই তিনজনেরই জন্ম ১৯০৪ সালে, তিনজনই জলপানি পেয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করেন ১৯২১ সালে। অন্নদাশঙ্করকে আমার প্রতি আরো মনোযোগী করে তোলেন মনসুরউদ্দীন। কবি জসীম উদ্দীনের সঙ্গেও পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয়েছিল মনসুরউদ্দীনের সৌজন্যেই। ডক্টর আশুতোষ ভট্টাচার্যকে চিঠি লিখে আমার গবেষণা-কাজে সহায়তার অনুরোধ জানান। হয়তো মৈত্রেয়ী দেবী আর বিশিষ্ট ওড়িয়া-সাহিত্যিক ও গবেষক শচীরাউত রায়ের সঙ্গেও তিনিই পরিচয় করিয়ে দেন।

তরুণদের কাজে সবসময়ই উৎসাহ জোগাতেন। এই নতুন প্রজন্মের প্রতি তাঁর বিশ্বাস, ভালোবাসা, মনোযোগ ও কর্তব্যবোধ ছিল প্রবল। নিজের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এর প্রমাণ পেয়েছি। ১৯৭৪ সালে ফকির লালন সাঁইয়ের জন্মের দুশো বছর যখন পূর্ণ হয়, সেই সময় একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের চিন্তা মাথায় আসে। বলা চলে অনেকটা মনসুরউদ্দীনের প্রেরণাতেই কাজটা আরম্ভ করি – লালন স্মারকগ্রন্থ নামে এই বই প্রকাশ করে বাঙলাদেশ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। আমার কুষ্টিয়ার বাউলসাধক (১৯৭৪) বইখানা বের হলে তিনি খুবই খুশি হন এবং এর একটি দীর্ঘ আলোচনা করেন পত্রিকায়। আমি মীর মশাররফ হোসেন সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার কাজ আরম্ভ করলে তিনি বরাবর উৎসাহিত করে এসেছেন, নানা পরামর্শ দিয়েছেন, বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন। আমার সম্পাদনায় লোকসাহিত্য পত্রিকা  নামে লোকসংস্কৃতি-বিষয়ক যে-পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল তারও মূল প্রেরণা ছিলেন তিনি। তাই এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি (জানুয়ারি ১৯৭৫) শ্রদ্ধা-কৃতজ্ঞতা-অনুরাগে তাঁকেই উৎসর্গ করেছিলাম। এই পত্রিকায় লেখা দিয়েও তিনি আনুকূল্য করেন – প্রকাশিত হয় তাঁর প্রবন্ধ – ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন’, ‘লালন ও তাঁর গান’, ‘বাঙলার লোকসাহিত্য প্রসঙ্গে’, ‘আশুতোষ ভট্টাচার্যের স্মৃতি-চারণা’।

মনসুরউদ্দীন ছিলেন তারুণ্যের প্রতীক। তরুণদের প্রতি তাঁর প্রীতি ও প্রেরণা ছিল অপরিসীম। দেখা হলেই বয়সের বাছ-বিচার না করে হাত বাড়িয়ে দিতেন মুসাফার জন্যে। চলনে-বলনে ছিল না কোনো আড়ষ্টতা, একটা ঋজুতা সবসময়ই লক্ষ করা যেতো। নবীন-প্রবীণের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রায়ই একটা ব্যবধান থাকে,
চিন্তা-চেতনা-কর্মে, সাধারণত তাঁরা হয়ে থাকেন দুই মেরুর বাসিন্দা। কিন্তু মনসুরউদ্দীন এ-ক্ষেত্রে ছিলেন বিরল ব্যতিক্রম। দেখেছি তিনি কী তীব্রভাবে তরুণদের আকর্ষণ করতেন, আপন করে নিতেন – আপন হতেন। অনুসন্ধিৎসু করে তুলতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। একধরনের তারুণ্যের ঝলক বৃদ্ধ বয়সেও তাঁকে অধিকার করে রেখেছিল। কপট গাম্ভীর্য, পোশাকি অহমিকা আর বয়সের সংস্কার থেকে মুক্ত ছিলেন তিনি। মনে পড়ে ১৯৮৫-র মার্চে যখন কুষ্টিয়া এসেছিলেন তখনকার একদিনের কথা। তিনি ছিলেন বিটিসির রেস্টহাউসে।
লালন-স্মরণোৎসব উপলক্ষে ঢাকা থেকে এসেছিলেন বিটিসির করপোরেট রিলেশনস্ ম্যানেজার রুহুল আমিন মজুমদার। তিনি বিটিসির তরফ থেকে মনসুরউদ্দীনকে সদ্য বাজারে আসা এক কার্টন মাইল্ড গোল্ড লিফ সিগারেট উপহার দেন। একটু রহস্য করে আমি বললাম, ‘লোকসংস্কৃতির স্বার্থে এই বিজাতীয় তাম্রকূট ত্যাগ করাই ভালো, নইলে ধূমপানের লোক-উপকরণ হুঁকাকে যে অবহেলা করা হয়। এগুলো বরঞ্চ বিলিয়ে দিলেই ভালো হয়।’ ধমকে উঠলেন তিনি, তারপর সিগারেটের কার্টনটা তাঁর মেয়ে ঊষাকে (অধ্যাপিকা রোকেয়া মনসুর) দিয়ে বললেন, ‘শিগ্গির ব্যাগে তুলে রাখ্, চৌধুরীর পো-র নজর খারাপ।’ বিকেলে লালনের আখড়ায় বেড়াতে গেছেন, চারদিক ঘুরেফিরে এসে শ্রান্ত হয়ে বসলেন একজায়গায়। চারপাশে বাউলের মেলা, উৎসবের মেজাজ ছড়িয়ে পড়েছে সারা প্রাঙ্গণে, বেশ খোশমেজাজে আছেন তিনি। একসময় ছোট মেয়ে পুষুকে (অধ্যাপিকা জাকিয়া মনসুর) ডেকে তার হাতে
দু-প্যাকেট সিগারেট গুঁজে ইশারায় আমাকে আর পাশে থাকা ভেড়ামারার ফকির আজিম শাহকে দেখিয়ে দিয়ে তারপর মুখ ফিরিয়ে নিলেন। গুরুর প্রসন্ন প্রসাদ পেয়ে ধন্য হলাম। এইভাবে মনসুরউদ্দীন বয়সের পার্থক্য ঘুচিয়ে আনতেন – প্রচলিত সংস্কারকে তুচ্ছ করে সহজ সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। তাঁর বাংলাসাহিত্যে মুসলিম সাধনা (অখণ্ড) বইখানা উপহার দিতে গিয়ে লিখেছিলেন – ‘আবুল আহসান চৌধুরী বন্ধুবরেষু’। আবার ধানের মঞ্জরী, হারামণি (১৩শ খণ্ড)-তে লিখে দিলেন – ‘To my young friend Abul Ahsan Choudhury’। বয়সের বাধাকে সরিয়ে দিয়ে এইভাবে এগিয়ে এসে হাত ধরলেন ‘আপন সখার মতো’, সমুখের গন্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে মুর্শিদ বললেন, ‘চলো।’ মনে-প্রাণে তিনি ছিলেন উদার ও আধুনিক। ধমকাতেন খুব – তিরস্কার করতেন ঢের – ভালোবাসতেন তারো চেয়ে বেশি, আর ছিলেন রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে মাথার ওপরে দয়ার্দ্র ছায়ার এক মরমি বৃক্ষ।

দশ

মনসুরউদ্দীন ছিলেন একটু অস্থির-খেয়ালি-এলোমেলো-আউলাঝাউলা। যার সঙ্গেই দেখা হতো, তা সে পরিচিত হোক আর স্বল্প বা সদ্য পরিচিত হোক, কোনো না কোনো একটা কাজের দায়িত্ব দিতেনই তাকে। কালাচাঁদ বাউলের গান সংগ্রহ করে দাও, হরিচরণ আচার্যের কবির ঝংকার বইখানা চাই, ‘কোহিতুর’ আমের কলম জোগাড় করো, ভাঁড়ারায় গিয়ে লালনের ভিটেমাটির খোঁজ নাও, গোঁসাই গোপালের আখড়ার একখানা ছবি তুলে আনো, – এই ধরনের নানা ফরমায়েশ। তাড়ায়-ধমকে-নির্দেশে-উপদেশে-ভালোবাসায়-তিরস্কারে মুখর হয়ে উঠতেন তিনি। তাঁর দৃঢ় অস্তিত্বের কথা মুহূর্তেই জারি হয়ে যেতো।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে-পরেই কুষ্টিয়া এসেছেন লালন-উৎসবে, উঠেছেন সার্কিট হাউসে। সকালে ডেকে বললেন, ‘গন্ধভাদাল চেনো? খেয়েছো কখনো? ওর পাতার অনেক গুণ, সর্দি-কাশিতে ভালো কাজ দেয়। জলদি যাও, গন্ধভাদালের পাতা জোগাড় করে আনো, বাবুর্চিকে বলবে বড়া ভাজতে, দুপুরে গরম গরম খাবো।’ বহু কষ্টে বন-বাদাড় ঘুরে গন্ধভাদাল জোগাড় হলো, খুশি হয়ে ‘বাহ্, খুব খলিফা ছেলে দেখছি’ – বলে পিঠ চাপড়ে সাবাসি দিলেন। সেই গন্ধভাদালের পাতা ঢাকায় নিয়ে গিয়ে বিদেশের কোনো এক গবেষণা-প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেন এর গুণবিচারের জন্যে। কয়েক মাস পর সেখান থেকে এক লম্বা চিঠি আসে গন্ধভাদাল সম্পর্কে তাঁর জিজ্ঞাসার জবাব নিয়ে। মাঝে-মধ্যেই এই ধরনের নানা খেয়াল আর কৌতূহল তাঁর মনে জাগতো। আর তা সুরাহা না-হওয়া পর্যন্ত স্বস্তি মিলতো না।

একবার কুষ্টিয়ার শতাব্দী-প্রাচীন রেণউইক কোম্পানিতে গেরস্থালির প্রয়োজনে দা-বঁটি-কাটারি তৈরি করতে দেন। সেগুলো পেতে দেরি হওয়ায় অস্থির হয়ে বারবার ডক্টর আনোয়ারুল করীম আর আমাকে চিঠি লিখতে থাকেন।

বেশ কিছুদিন চেষ্টা-তদ্বির করে জিনিসগুলো তৈরি করিয়ে আমার বন্ধু (বর্তমানে পরলোকগত) বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা

সৈয়দ বাহাউদ্দীন আহমেদকে দিয়ে ঢাকা পাঠাই। এগুলো পেয়ে তিনি তো মহাখুশি, বাহাউদ্দীনকে বললেন, ‘তুমি তো খুব বাহাদুর ছেলে হে! মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক তুমি, আমি তো ফকির মানুষ, কী দেবো তোমাকে! যাও তোমাকে আমি প্রমোশন দিয়ে ‘ক্যাপ্টেন’ করে দিলাম।’ এরপর থেকে ওকে ‘ক্যাপ্টেন’ বলেই ডাকতেন। কুষ্টিয়ায় মনসুরউদ্দীনের দেখভালের জন্যে বাহাউদ্দীনকে তাঁর হাওলা করে দিয়েছিলাম। বাহাউদ্দীনের মর্মান্তিক অকালমৃত্যু মনসুরউদ্দীনকে শোককাতর করে তোলে। সামান্য পরিচয়েও গভীরভাবে মনে রেখেছিলেন তাকে।

এগারো

আক্ষরিক অর্থেই মনসুরউদ্দীন ছিলেন সহজ-সরল, পোশাকি আভিজাত্য বা ছদ্ম-কপটতা ছিল না তাঁর। ‘আমি চাষার ছেলে, গরিব ঘরে জন্ম আমার’ – এই ধরনের অসংকোচ সত্য-প্রকাশে অভ্যস্ত ছিলেন। থেলো হুঁকোয় তামাক খেতে কুণ্ঠা ছিল না তেমনি বাউল-ফকিরের মাজারে আখড়ায় বাড়িতে রাত্রিযাপনেও স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব হয়নি তাঁর। বাউলগান সংগ্রহের লোভে হুডুম-নাড়ুর জিয়াফত খেতে দুই-চার ক্রোশ পথ হেঁটে চলে গেছেন ভিনগাঁয়ে।

লোক-লৌকিকতায় গ্রামীণজীবনের ছাপ মুছে যেতে দেননি। চলে যাওয়ার কয়েকমাস আগে কলকাতায় গেলেন সাম্মানিক ডিলিট আনতে। খালি হাতে যান কী করে, গুরু সুনীতিকুমার আছেন, বয়স্য অন্নদাশঙ্কর আছেন, আছেন আর আর সব বন্ধুজন, কিছু তো একটা নিয়ে যেতে হয়! শেষ পর্যন্ত বেছে বেছে নিয়ে গেলেন বাজারের সেরা পদ্মার ইলিশ – কুটুমবাড়ি কী খালি হাতে যাওয়া চলে! এই হলেন মনসুরউদ্দীন। আপাদমস্তক ছিলেন গ্রামমনস্ক, তাঁর সাধনা আর সাফল্যের মূলই ছিল গ্রাম – গ্রামীণজীবনের স্মৃতি তাই কী করে ভুলবেন! তাই তো শান্তিনগরে বসে স্বপ্ন দেখতেন মুরারিপুরের – স্মৃতির মিনারে ঠেস দিয়ে কান পেতে শুনতেন বহুকালের ওপার থেকে ভেসে আসা প্রেমদাস বৈরাগীর গানের সুর।

মনসুরউদ্দীন ছিলেন বাউলপ্রাণ, বাউলপ্রেমিক। বাউলদের সঙ্গে তাঁর ছিল সহজ সম্পর্ক – আত্মার বন্ধন। ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়ায় বাউলদের দেখেছি গড় হয়ে তাঁকে ‘ভক্তি’ দিতে। ঢাকায় তাঁর বাড়িতে ছিল বাউলদের অনায়াস প্রবেশাধিকার। কেউ কেউ যেয়ে থাকতেনও মাঝে-মধ্যে, সাধ্যমতো সাহায্যও পেতেন তাঁরা। তিনি ছিলেন বাউলদের পরমাত্মীয়। বাউলদল নিয়ে দেশান্তরে গেছেন একসময়। মনসুরউদ্দীন যশোরের ঝিকরগাছার নামকরা বাউল-গায়ক কানাই খ্যাপার গান খুবই পছন্দ করতেন। কুষ্টিয়ায় এলেই জিজ্ঞেস করতেন, ‘খ্যাপা এসেছে নাকি?’ লালন-উৎসবে মঞ্চ কাঁপিয়ে নেচে নেচে কানাই যখন গাইতেন, – ‘গেড়ে গাঙেরে খ্যাপা হাপুর-হুপুর ডুব পাড়িলে,/ করছো মজা যাবে বুঝা কার্তিকের উলানের কালে’, – মনসুরউদ্দীন তখন ভাবে আত্মহারা হয়ে যেতেন – রচিত হতো এক অপূর্ব দৃশ্য। ১৯৮৫ সালে লালন-স্মরণোৎসবের এক বাসন্তী-সন্ধ্যায় এই দুই সাধকের শেষ দেখা ও ভাব-বিনিময় হয়।

বারো

লালনের সুবাদে কুষ্টিয়ার সঙ্গে তাঁর একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বহুবার এসেছেন এখানে। অশক্ত শরীর নিয়ে শেষবারের মতো আসেন ১৯৮৫ সালের মার্চে  লালন-স্মরণোৎসবে, আমার আমন্ত্রণে আর অনুরোধে। আমি তখন লালন একাডেমীর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক। ছিলেন বিটিসির রেস্ট হাউসে। এখানে বসে ৬ই মার্চ দুপুরে আমি প্রায় দু-ঘণ্টা ধরে ক্যাসেট-রেকর্ডারে তাঁর ইন্টারভিউ গ্রহণ করি। এই সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের পাশাপাশি সাহিত্য-রাজনীতি-মুক্তিযুদ্ধ নানা বিষয়ে অনেক কথা বলেন, বিষয়-বক্তব্যে যা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মুক্ত মন আর অসীম সাহস নিয়ে তিনি কিছু স্পষ্ট কথা বলেছিলেন সেদিন। মনসুরউদ্দীনের স্বদেশভাবনা আর সমাজমনস্কতার পরিচয় পেয়ে নতুনভাবে চিনেছিলাম তাঁকে। দেশ তখন স্বৈর-সামরিক শাসনের কবলে,
দেশ-সরকার-জনগণ-রাজনীতি এসব বিষয়ে তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে বলেছিলেন : ‘পলিটিক্সের ঘরদোরের কাছে ঘুরে ফিরে বেড়িয়েছি, কিন্তু কোনো দিনও জ্বলন্ত চুল্লির দিকে যাইনি। এঁরা যাঁরা দেশ শাসন করেন তাঁরা সব একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, কোনো পরিবর্তন নেই। তো একমাত্র কথা হচ্ছে আমাদের দেশে প্রত্যেকেই যদি – শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত – দেশকে ভালোবাসে, তাহলেই দেশের মঙ্গল সাধিত হবে।… রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্বন্ধে আমাদের সেই প্রভাত মুখুজ্জের গল্পের মতো বলতে পারি – সেখানে দুই দলের ইংরেজি জানা নিয়ে তর্ক হচ্ছে। একজন কৌশলে অন্যজনের মুখ থেকে বের করছে – ‘আই ডোন্ট নো’ – ‘এটার অর্থ কি বলো?’ তখন সে বলে, ‘আমি জানি না।’ মিনিস্টার এবং পলিটিশিয়ানদের ঠকার ব্যাপার হচ্ছে – ‘আই ডোন্ট নো’-এর রাজনীতি। আজকে আছে কালকে নেই। তবে একটা কথা সত্যি – ‘জলের তিলক ভালে কতক্ষণ থাকে।’ অযোগ্যের শাসন-ব্যবস্থা ধ্বংসে পরিণত হবেই হবে, সে যতই সামরিক দল থাকুক। চেঙ্গিস খাঁ, হালাকু খাঁ, হিটলাররা চলে গেছে, এরা সকলেই যাবে। তবে একটা যে ক্ষত, এ ক্ষত থেকে রক্ত বহুদিন ধরে ঝরবে’

(কথোপকথন : বিষয় লালন, আবুল আহসান চৌধুরী সংকলিত-সম্পাদিত, ঢাকা, এপ্রিল ২০২২; পৃ ৪০)।

আমাদের দেশের মান্য, মেধাবী ও কীর্তিবাস লেখক-বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই অসামান্য বুদ্ধিমান ও তীক্ষ্ন
সময়-নিরীক্ষক। আত্মপ্রীতিজাত বাস্তববুদ্ধি তাঁদের এই সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে, কখন নীরব থাকতে হয় আর মুখর হওয়ার অনুকূল সময় কখন আসে। মনসুরউদ্দীন ছিলেন এর বিপরীতে। উচ্চাভিলাষ বা
প্রাপ্তি-আকাঙ্ক্ষা কখনো তাঁকে বশ করেনি। তিনি ছিলেন সরল মন ও সহজ বুদ্ধির মানুষ – আবার নীতি-আদর্শ-ন্যায়ের ক্ষেত্রে নিরাপস। প্রায় সবক্ষেত্রে বিবেকী ভূমিকা পালনের চেষ্টা করেছেন। সবমিলিয়ে মনসুরউদ্দীন ছিলেন এক বিশুদ্ধ বাঙালি, যাঁর হারামণি নামের শিল্প-দর্পণে শাশ^ত স্বদেশের ছবি বিম্বিত। চিরকালই তিনি মুক্তবুদ্ধির মানুষ। যুক্ত ছিলেন শিখাগোষ্ঠীর বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে। রাষ্ট্রীয় অন্যায়-অনাচার, সামাজিক অবক্ষয় ও দুর্নীতি, গণতন্ত্রের সমস্যা ও সংকট, ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আগ্রাসন – এসব বিষয়ে সচেতন ও প্রতিবাদী ছিলেন। মনসুরউদ্দীন এক বাউলের নাম – বেশভূষা ও চিন্তা-চেতনায় তাদেরই সমানধর্মা। বাউলদের মতো তিনিও ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, মানবমনস্ক আর সমন্বয়পন্থি।

তেরো

তরুণ বয়স থেকেই মনসুরউদ্দীন মানবমুখী, সমাজমনস্ক ও কল্যাণব্রতী। সামাজিক দায়বদ্ধতা তিনি কখনো অস্বীকার করতে পারেননি, তাই সমাজকাঠামো পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন সবসময়ই। মানসিক জড়তা ও সামাজিক সংস্কার থেকে মুক্তির পথও পেয়ে যান তিনি। এতে তাঁর সহায় হয় ঢাকার ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। ১৯২৬ সালের গোড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই ‘সাহিত্য সমাজ’। এর বীজমন্ত্র ছিল : ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের এই সংগঠনের সঙ্গে মনসুরউদ্দীনের ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল। তিনি এই ‘সাহিত্য সমাজে’র নানা অধিবেশনে উপস্থিত থাকতেন, প্রবন্ধ-পাঠ বা আলোচনায় অংশ নিতেন এবং কখনো কখনো ভাটিয়ালি বা বাউল গান গেয়েও শোনাতেন। মনসুরউদ্দীন ‘সাহিত্য সমাজে’র সপ্তম বার্ষিক অধিবেশনে (৩রা এপ্রিল ১৯৩৩) ‘মারফতী সাহিত্য’ ও অষ্টম বার্ষিক অধিবেশনে (৩০শে মার্চ ১৯৩৪) ‘বাংলার লোকশিল্প’ বিষয়ে প্রবন্ধ পড়েন। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’ লোকসংস্কৃতিচর্চার আবহ সৃষ্টিতে মনসুরউদ্দীনের ভূমিকার কথা বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়। লোকজ সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে ‘সাহিত্য সমাজে’র অন্যতম পুরোধা কাজী আবদুল ওদুদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব উদার বা অনুকূল ছিল না। এ-বিষয়ে ওদুদের এমন ধারণা ও মত নিয়ে মনসুরউদ্দীন নীরব থাকতে পারেননি। ওদুদের সঙ্গে মনসুরউদ্দীনের ‘মতানৈক্যে’র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ বোধহয় লোকসাহিত্য বা বাউলসাহিত্য সম্পর্কে ওদুদের বিরূপ ও তাচ্ছিল্যসূচক মনোভাব (শিখা : বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের মুখপত্র, আবুল আহসান চৌধুরী-সম্পাদিত, ঢাকা, অক্টোবর ২০২৫; পৃ ‘ভূমিকা’-৩৮)। যা-হোক, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র চেতনা তাঁর জীবনে ব্যর্থ হয়নি – সারাজীবনই তিনি মুক্তমনের পরিচয় দিয়ে এসেছেন। আহমদ শরীফের পর্যবেক্ষণে যথার্থই ধরা পড়ে, ‘দেশের ও মানুষের হিতচেতনা তাঁর চিত্তের গভীরে প্রোথিত। এ জন্যে যে-কোনো বিষয়ক সভায় তাঁর প্রদত্ত ও প্রদেয় বক্তৃতায়-ভাষণে তিনি প্রায়ই গঠনমূলক কিছু না কিছু, কোনো না কোনো প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কল্যাণবুদ্ধি সদাসক্রিয় না থাকলে এমনি অভিব্যক্তি সম্ভব হত না’ (মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন স্মারকগ্রন্থ, পূর্বোক্ত;

পৃ ১৩)।

চোদ্দো

মনসুরউদ্দীনের জীবনের শেষ লালন-শ্রদ্ধাতর্পণ নানা কারণে উল্লেখের যোগ্য। ৬ই মার্চ (২২শে ফাল্গুন ১৩৯১) সন্ধ্যায় মোহিনী মিলের মাঠে লালন-উৎসব শুরু হয়। বহুকাল স্মরণ রাখার মতো সমাবেশ হয় সেখানে। অতিরিক্ত লোকসমাগমের ফলে অনুষ্ঠানের শুরুতে কিছু বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এতে মনসুরউদ্দীন ক্ষুণ্ন হন, অবশ্য সেটা জানা গেল প্রধান অতিথি হিসেবে তাঁর ভাষণ দিতে গিয়ে যখন তিনি ইংরেজিতে বক্তৃতা শুরু করলেন। সুন্দর-স্বচ্ছন্দ ইংরেজিতে তিনি প্রায় আধঘণ্টা বক্তৃতা দিলেন। আমরা তো হতভম্ব – মনে মনে কিছুটা শঙ্কিতও হলাম, কেননা ক’দিন আগেই ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয়েছে। শ্রোতাদের বিশেষ করে
ছাত্র-তরুণদের মধ্যে হয়তো ইংরেজি-বক্তৃতার একটা প্রতিক্রিয়া হতে পারে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে এক-দুইবার তাঁকে ব্যাপারটা ইঙ্গিত দিতে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই, আমার কোনো কথাই গ্রাহ্য করলেন না। যা-হোক, মনসুরউদ্দীনের প্রতি শ্রদ্ধাবশত কিংবা তাঁর বয়সের কথা বিবেচনা করেই হোক কোনো প্রতিক্রিয়া-প্রতিবাদ কিছুই হলো না, বরঞ্চ পুরোপুরি না-বুঝলেও তাঁর বক্তৃতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবাই শুনলেন। অনুষ্ঠানের চেহারা ও মেজাজই গেল পালটে। অনুষ্ঠান-শেষে সাহস করে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, ইংরেজিতে বক্তৃতা দিলেন কেন?’ গম্ভীরভাবে জবাব দিলেন, ‘ও, তোমার বোধহয় জানা নেই, এর-চেয়ে বেশি রাগলে আমি ফারসিতে বক্তৃতা দিয়ে থাকি!’

পনেরো

১৯৮৬ সালে পরিকল্পনা করলাম, লোকসাহিত্য পত্রিকার পক্ষ থেকে ‘মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন সংবর্ধনা-গ্রন্থ’ বের করবো। মনসুরউদ্দীনকে জানালাম, শুনে খুশি হলেন খুব, অনুমোদন পেলাম তাঁর। সংবর্ধনা-গ্রন্থ প্রকাশের
প্রাক্-প্রস্তুতি শেষ করে ছাপার কাজ শুরু হওয়ার আগ দিয়ে ১৮ই সেপ্টেম্বর ঢাকা গেলাম তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য। ১৯শে সেপ্টেম্বর বিকেলে তাঁর বাসায় যাব স্থির করলাম। ওইদিন বেশ সকালে ঘুম ভাঙিয়ে শিল্পী-বন্ধু আবদুর রউফ সরকারকে মনসুরউদ্দীনের একটা স্কেচ করার জন্যে ফটো দিয়ে এলাম। তারপর সকাল নটা-দশটা নাগাদ বাংলা একাডেমিতে গিয়ে শুনি, তিনি নেই – ভোররাতে খাঁচা ভেঙে পাখি উড়াল দিয়েছে অনন্ত অসীমের উদ্দেশে। খবরটা শুনে হতবাক হয়ে গেলাম। কেমন যেন একটা বিহ্বল-করা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়লো সারা শরীরে। শুধু মনে হতে লাগলো, দেখা হলো না, কথা হলো না, আর কোনো-দিন হবে না। এই তো ক’দিন আগে চিঠি পেলাম, আঁকাবাঁকা হস্তাক্ষরে, সব কথা গুছিয়ে লিখতে পারেননি, তবু কী এক অস্থির আবেগে মনের কথা লেখার চেষ্টা করেছেন। সেই চিঠি আমার হাতে পৌঁছয় ৩১শে আগস্ট ১৯৮৭। এই তাঁর জীবনের শেষ চিঠি।

সেই চিরপরিচিত পথ ধরে ৩৭ শান্তিনগরে মনসুর-ভবনে গেলাম কুণ্ঠিত পদক্ষেপে। নিচের তলার পশ্চিমের ঘরে শুয়ে আছেন, প্রশান্ত-সৌম্য মুখখানা, অনেক কাজের শ্রান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন, হয়তো এখনই জেগে উঠে বলবেন, – ‘কখন এলে! লালনের সেই গানখানা এনেছো নাকি?’ – ‘কোন গানটা ?’ – ‘ওই যে সাঁইজির সেই খেদের গানখানা’ –

এ দেশেতে এই সুখ হলো আবার কোথা যাই না জানি।

পেয়েছি এক ভাঙা নৌকা জনম গেলো সেচতে পানি ॥

ষোলো

মনসুরউদ্দীন ছিলেন বাঙালির মূলধারার সংস্কৃতিচর্চার প্রধান সাধক। এদেশে লোকজ সংস্কৃতির চর্চায় তিনিই পথিকৃৎ। তবে তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন ও সমাদর এখানে হয়েছে এমন কথা বলা যায় না, তা হয়েছে ভিনদেশে। এ আমাদের লজ্জা ও অগৌরবের বিষয় এবং তা গুণগ্রাহিতার অভাবকে নির্দেশ করে। এ-প্রসঙ্গে মনসুরউদ্দীনের গুণী ছাত্র ডক্টর আহমদ শরীফ না-বলে পারেননি : ‘এ সেদিন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সর্বোচ্চ ‘ডি-লিট’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেছে। এতে বাঙলাদেশী হিসেবে আমাদের গৌরব ও গর্ব অনুভব করা স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষোভ ও লজ্জার বিষয় এই যে আমরা ঘরের গুরুকে, সমাজের ও সাহিত্যের কৃতী পুরুষকে আদর-কদর করিনি, দিইনি তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান’ (মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন স্মারকগ্রন্থ, পূর্বোক্ত; পৃ ১৪)।

বাঙালি ‘আত্মবিস্মৃত’, কিছু পরিমাণে ‘আত্মঘাতী’ও বটে – মহাজন-কথিত এই নৈরাশ্যজনক ও নেতিবাচক জাতীয় বৈশিষ্ট্য, আমাদের কর্ম-কথা-চিন্তা-আচরণে প্রতিফলিত ও প্রমাণিত। তাই মনসুরউদ্দীনের জন্মশতবর্ষ নীরবে অতিক্রান্ত হয়, তাঁর কোনো স্মারকচিহ্ন স্থান পায় না কোনো প্রতিষ্ঠানে, বাউল ও লোকগানের ‘পদকল্পতরু’ যে হারামণি তা এখন দৃষ্টির অতীত কোনো ধূসর পুথিপত্র। তবে সব ঔদাসীন্য ও অবহেলা মাড়িয়ে ‘সুপ্রাচীন বটবৃক্ষের মতো জ্ঞানবৃদ্ধ বহুদর্শী এ ব্যক্তিত্ব’ ‘সার্থক-সাধনার প্রতীক হয়ে, একাগ্রচিত্ত গবেষকদের আদর্শরূপে জিজ্ঞাসু-সন্ধিৎসু শ্রমপ্রিয় গবেষকদের প্রেরণার উৎস রূপে তিনি প্রজন্মক্রমে চিরকাল স্মরেণ্য ও বরেণ্য হয়ে থাকবেন’ (ওই; পৃ ১৪) – আহমদ শরীফের এই

মত-মন্তব্য-আকাক্সক্ষা আক্ষরিক-অর্থেই সত্যমূল্য পাবে। কেননা ঐতিহ্যের বহমান ধারা সাক্ষ্য দেয় লোকসংস্কৃতির ক্ষয় থাকলেও লয় নেই, কাল থেকে কালান্তরে আশ্রয় পেয়ে যায় জনমানসপটে, – তেমনি প্রায়-বিস্মৃত হয়েও মনসুরউদ্দীন বারবার গৃহীত হবেন, জেগে  উঠবেন শেকড়সন্ধানী অস্তিত্বের টানে। এখানেই রয়ে গেছে নশ্বর মনসুরউদ্দীনের অবিনশ্বরতার জাদুরহস্য।

* রচনায় ব্যবহৃত ছবিসমূহ প্রবন্ধকারের সৌজন্যে প্রাপ্ত