ভাষা-আন্দোলনের চালচিত্র

১৯৪৭-এর পূর্ব থেকেই আধা-বাঙালি, উর্দুভাষী-বাঙালি, রক্ষণশীল চিন্তার বাঙালি মুসলমান বাংলার মাটিতে উর্দুকে মাতৃভাষারূপে প্রতিষ্ঠ তিষ্ঠার । যড়যন্ত্রে | লিপ্ত থাকেন। তাঁরা চেয়েছেন উর্দুকে মাতৃভাষা ও জাতীয় ভাষারূপে আর আরবিকে ধর্মীয় ভাষারূপে প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু সাহিত্য । সংস্কৃতি অঙ্গনে এর প্রতিক্রিয়ায় প্রচণ্ড বিরোধিতাও করা হয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তায় বিশ্বাসী কতিপয় লেখক বুদ্ধিজীবী জীবী ছাড়া ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ বুদ্ধিজীবী মাতৃভাষার পক্ষে যুক্তি উত্থাপন করেছেন বিভিন্ন লেখায়।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত একটি বাঙালি মুসলিম শ্রেণি গড়ে ওঠে। তারাই গভীরভাবে অনুরক্ত হয়ে ওঠেন মাতৃভাষা বাংলার প্রতি। তাঁদের মধ্যে বাংলা ভাষাকে নিয়ে গর্ব করতে দেখা যায়— পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে। কিন্তু পাকিস্তানের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের জন্যে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন উর্দুর পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে রাষ্ট্রভাষা বিতর্কের বিষয়টিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯৪৭-এ ভারত বিভক্তির পূর্ব পর্যন্ত ভাষা- বিতর্ক অব্যাহত ছিল।

মাতৃভাষা বাংলা ও জাতিসত্তার উদ্বোধন

১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক ভারত বিভক্তির প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের একটি ভূখণ্ড হিসেবে পূর্ববাংলা স্থিত হয়। নতুন ভূখণ্ডে যেমন নতুন জীবনের প্রবাহ সূচিত হয় তেমনি সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় বিচিত্র পরিসরে বাঙালি মুসলমানের স্বকীয় পদসঞ্চার শুরু হয়। এর ফলে নতুনভাবে ভূখণ্ডনির্ভর রাজনৈতিক চেতনা এদেশের মানুষের মধ্যে পঞ্চাশের দশকের প্রারম্ভ থেকেই পরিদৃষ্ট হয়। যে আশা এবং প্রত্যাশা নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্ম হয়েছে সে আশা ব্যাহত হয়ে শোষণ, ত্রাসন বাঙালির স্বপ্নভঙ্গের বেদনাকে জাগ্রত করেছে। তাই শুরু থেকেই ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা নতুন করে তাদের মধ্যে উজ্জীবিত হয়।

বাংলা ভাষা বাঙালির সংস্কৃতিতে ততদিনে উত্তরাধিকার বহন করে বিকশিত হচ্ছিল। কিন্তু ১৯৪৭-এর পর পাকিস্তানি শাসকচক্র বাঙালিকে শোষণ ও নিপীড়নের জন্যে ভাষাগত সাংস্কৃতিক আঘাতটি হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়। বাঙালির ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারকে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ঘোষণা করে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে।

কিন্তু বাঙালি যে স্বপ্নের ভাষায়, প্রাণের ভাষায়, মায়ের ভাষায় অর্থাৎ মাতৃভাষা বাংলা ভাষায় কথা বলে, সে ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সঠিক সময়ে অনুধাবন করতে পারে। ভাষার বিরুদ্ধে যে চক্রান্ত পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী এদেশের মাটিতে রোপণ করতে চেষ্টা চালায় তা ফলপ্রসূ হতে পারেনি। বাঙালি তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় গড়ে তোলে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অংশে নেয় ছাত্র-শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক। এই যে মাতৃভাষা বাংলাকে নিয়ে আন্দোলন তা ছিল সাংস্কৃতিক। একটি জাতিসত্তার উদ্বোধন সে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাগ্রত হয়। অবশ্য এই ভাষা আন্দোলন পর্বের সাংস্কৃতিক আন্দোলন থেকেই পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আন্দোলনের ধারা সূচিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশেরও জন্ম হয়।

ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়

১৯৪৭-এর আগস্ট মাসে ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত আর পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা পেলে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বাংলাভাষা যাতে বিকশিত হতে না পারে সে জন্য সরকারি খাম, পোস্টকার্ড, ডাকটিকিট, রেল টিকিট, মানি অর্ডার ফর্ম প্রভৃতিতে উর্দুর পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে বাংলা ভাষা বাদ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার পর উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে আরেকটি ঘটনার অবতারণা করা হয়।

১৯৪৭-এর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে করাচিতে অনুষ্ঠিত হয় শিক্ষা সম্মেলন। করাচি ছিল পাকিস্তানের রাজধানী। সেখানে শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু পূর্ব বাংলায় এ খবর পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ ওঠে। তীব্র বিক্ষোভে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয় ছাত্র-শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। ১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে ‘তমদ্দুন মজলিশ’ নামে যে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়, সেই তমদ্দুন মজলিশের উদ্যোগে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। তবে একটি কথা স্বীকার করতে হয় সে সময় রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বাংলা ভাষা নিয়ে আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। আন্দোলন না গড়ে ওঠার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা গেছে—রাজনৈতিক গুরুত্ব সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক উপলব্ধি করতে না পারা। ১৯৪৭-এর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গঠিত হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ‘পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ’। এই সংগঠন থেকেও তাঁদের কর্মী সম্মেলনে ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব গৃহীত হয়। অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ-এর ‘অমর একুশে’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হলো, “পূর্ব পাকিস্তান কর্মী-সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক”।

বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সংঘের পক্ষ থেকেও বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার দাবিতে ভূমিকা রাখা হয়।

পাকিস্তান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা আরবি হরফে বাংলা লেখার পক্ষে মাঠে নামেন। বাংলাবিরোধী নীতির অন্যতম মুখপাত্র হয়ে ওঠেন তিনি। সে সময় আরো একটি ব্যাপার লক্ষণীয়- ঢাকার স্থানীয় অধিবাসী ও ছাত্রদের একটি অংশ উর্দুর পক্ষে ছিল। ফলে ১৯৪৭-এর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে পলাশী ব্যারাকে স্থানীয় উর্দু সমর্থকদের সঙ্গে বাংলা ভাষার সমর্থকদের সংঘর্ষ বাধে। এই ঘটনার ফলে ভাষা আন্দোলন দ্রুত সমর্থন লাভ করতে থাকে।

ভাষা আন্দোলনকে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায় আর ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্যায়- যাকে ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় বলা যায়।

১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পলাশী ব্যারাকে উর্দু ভাষার সমর্থক ও বাংলা ভাষার সমর্থকদের সংঘর্ষ বাধলেও ভাষা আন্দোলনের সূচনা মূলত ১৯৪৮ সাল থেকে।

পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতে। গণপরিষদের পূর্ব বাংলার অন্যতম প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান বর্বর বাহিনীর হাতে শহীদ) ইংরেজি ও উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলে ভাষা বিষয়ে একটি শোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু গণপরিষদের মুসলিম লীগ দলীয় বাঙালি সদস্যরা বাংলাকে গণপরিষদের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবটি বাতিল করে দেন। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও পূর্ববঙ্গের মন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনসহ একাধিক নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবের বিরোধিতা করার পর যে অভিমত ব্যক্ত করেন তার ম বক্তব্য ছিল ‘মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে এবং দেশের সংহতি রক্ষার জন্য পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে মাত্র একটি এবং তা হবে উর্দু।

গণপরিষদের বাংলা ভাষার বিরোধিতা করার খবর ঢাকায় পৌঁছলে ঢাকার ছাত্রসমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আর এই সূত্রে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ১১ মার্চ প্রতিবাদ দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়া হয়। ১১ মার্চের প্রতিবাদ দিবসকে সফল করার লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ-এর বিলুপ্তি ঘটিয়ে ২ মার্চ ঢাকার ফজলুল হক হলে পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের এক সভায় নতুন করে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কামরুদ্দিন আহমদ। কমিটির আহ্ববায়ক মনোনীত হন শামসুল হক। অনুষ্ঠিত সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন প্রগতিশীল লেখক সংঘের রণেশ দাশগুপ্ত, অজিত গুহ, গণতান্ত্রিক যুবলীগের মোহাম্মদ তোয়াহা, ছাত্র ফেডারেশনের শহীদুল্লা কায়সার। এছাড়াও সরদার ফজলুল করিম, তাজউদ্দিন আহমদ, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুবসহ আরো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী। ১১ মার্চে পুলিশি নির্যাতনের শিকার ও অনেকে গ্রেফতার হওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন আরো বেগবান হয়।

১৯ মার্চ পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। পূর্ব বাংলা সরকার ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করে জিন্নাহ সাহেবের আগমন উপলক্ষে। সংবর্ধনা সভায় জিন্নাহ সাহেব ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। সভার প্রাঙ্গণ থেকেই তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়, জিন্নাহর ঘোষণা প্রচারিত হবার পরপরই। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে ছাত্র-জনতার বিরোধিতার পরও ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে বিশেষ এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে বক্তব্য দিতে গিয়ে জিন্নাহ সাহেব | পুনরায় বলে বসলেন, Urdu and Urdu shall be the state language of Pakistan. তাঁর এই ঘোষণা প্রবল প্রতিবাদের সঞ্চার করে সমবেত ছাত্রসমাজের মধ্যে। ছাত্ররা ‘নো নো’ ধ্বনিতে প্রতিবাদ জানায়। ঐদিন বিকেলে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে দাবি নিয়ে জিন্নাহর সঙ্গে দেখা করেন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ। স্মারকলিপি প্রদান করেন। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রশ্নে ছাত্রদের দাবি বাস্তবায়নে জিন্নাহ সাহেব মত দেননি। শুধু তাই নয়, ১৫ মার্চের নাজিমুদ্দিন সম্পাদিত ছাত্রদের ৮টি চুক্তির গুরুত্বও অস্বীকার করা হয়।

জিন্নাহ সাহেবের মৃত্যুর পর ভাষা আন্দোলনের গতি কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসে।

ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়

১৯৫০ সালেই উদ্যোগ নেওয়া হয় দেশব্যাপী রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের। ১৯৫১ সালে ১১ মার্চ পালনের জন্য সারাদেশে প্রচারপত্র বিলি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আব্দুল মতিনকে (ভাষা সৈনিক) আহ্বায়ক করে নবগঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এর মধ্যে লিয়াকত আলী খানকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। ফলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন খাজা নাজিমুদ্দিন। আর তাঁর জায়গায় অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন মুসলিম লীগের নূরুল আমিন। ১১ মার্চের আন্দোলন দিবস শুরুর আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি (১৯৫১) শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং নানা পেশার বুদ্ধিজীবী এমনকি সরকারি কর্মচারীদেরও একাংশের তরফ থেকে অবিলম্বে পূর্ববঙ্গের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের দাবি জানিয়ে একটি স্মারকলিপি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের কাছে পাঠানো হয়। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১১ মার্চ খুবই উদ্দীপনার সঙ্গে সকল শিক্ষায়তনে ধর্মঘট ও সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫০ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বাংলা ভাষা আন্দোলনকে পরিণতির দিকে এগিয়ে না নিতে পারলেও গতিশীল রাখে।

পাকিস্তানের সরকার বাঙালিদের ওপর শুধু সাংস্কৃতিক আঘাতই নয়, অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্যনীতিতে নির্যাতন চালিয়ে আসে। ইতোমধ্যে সরকারবিরোধী কয়েকটি রাজনৈতিক দলও গঠিত হয়। ফলে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা এমনিতেই ক্ষমতাসীন সরকারের শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসছিলেন, তার মধ্যে বাংলা ভাষার প্রশ্নে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে লড়াই চলছিল, সে লড়াইকে বেগবান করতে আরো তৎপর হন।

১৯৫২ সালে বাংলা “ভাষা আন্দোলন নতুন করে এবং সংগঠিত হয় নতুন পর্যায়ে চূড়ান্ত । এসে দাঁড়ায়। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি করে বাঙালিকে আন্দোলনমুখী করে তোলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তব্য। এবারেও বলা হয় উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় সর্বস্তরের মহলে ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই”। স্লোগানে আবার সোচ্চার হয় ছাত্র-জনতা। ২৯ জানুয়ারি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। ৩০ জানুয়ারির সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ৪ ফেব্রুয়ারি সকল প্রতিষ্ঠানে হরতাল পালনের। ভাষা বিতর্কের এই পর্যায়ে যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সহযোগিতায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এক সর্বদলীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠিত কর্মপরিষদে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ছাত্র এবং সাংস্কৃতিক কর্মীরা যুক্ত হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি যে ছাত্র ধর্মঘট, শোভাযাত্রা এবং জনসভার আহ্বান জানানো হয় তার প্রতি সমর্থন দেয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ। এছাড়াও ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কর্মপরিষদ। ৪ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি সফল করার জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২ হাজার ছাত্রছাত্রী মিছিল । সহকারে শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে। শুধু তাই নয়, মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের বাস বাসভবনের সামনের রাস্তা দিয়েও মিছিল। থেকে স্লোগান ওঠে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘আরবি হরফে বাংলা লেখা চলবে না’। ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনতাও অংশগ্রহণ করে। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা মর্যাদার দাবি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া হবে—এই মর্মে ৪ ফেব্রুয়ারির ছাত্রসভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়াও পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের অধিবেশন ২১ ফেব্রুয়ারি বসবে জেনেই এদিন সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী হরতাল, ছাত্র ধর্মঘট ও মিছিলসহ আইন পরিষদ ঘেরাও করার প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং ২১ ফেব্রুয়ারির প্রস্তুতি হিসেবে ১১, ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস পালনের কর্মসূচি নেয়া হয়। প্রতিটি কর্মসূচিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ সমর্থন প্রদান করে। মওলানা ভাসানী ১১, ১২, ১৩ ও ২১ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচিকে সফল করে তুলবার জন্য ছাত্র-জনতার প্রতি আহ্বান জানান।

১১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লেখা পতাকা বিক্রির মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে পতাকা দিবস পালন করে। সংগ্রাম পরিষদ বা কর্মপরিষদের বাইরেও যুবলীগের নামে আনিসুজ্জামান, (অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) রচনা করেন একটি পুস্তিকা যা জনতার মালো বিলি করা হয়। এসময় পুস্তিকাটির নাম ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কী কেন?’

সর্বদলীয় কর্মপরিষদের পক্ষ থেকেও একই বিষয়ে আরেকটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। পুস্তিকাটি লিখেছিলেন মোহাম্মদ তোয়াহা। ভাষা আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্য মুসলিম লীগের নূরুল আমিন সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি সঙ্গ ৬টায় ক্রমাগত ১ মাসের জন্য ঢাকা জেলার সর্বত্র হরতাল, সভা, মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারির ঘোষণা দেন। সংগ্রামী ছাত্রসমাজের পক্ষ ১ ফেব্রুয়ারির রাতেই। থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের শপথ উচ্চারিত হয় ২০ ফেব্রুয়ারির রাতেই।

২১ ফেব্রুয়ারি ছিল যেন আগুনঝরা ফাগুনের দিন। বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের অবস্থান ছিল বর্তমানের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একটি অংশে। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্র আসতে থাকে। জমায়েত হয় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের সভা বসে। বেলা দশটার মধ্যেই ছাত্রদের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বেলা প্রায় এগারটায় আমতলায় সভা শুরু হয় ছাত্রদের।

এই সভায় সভাপতিত্ব করেন ফজলুল হক হলের বয়োজেষ্ঠ্য ছাত্র গাজীউল হক।

প্রতিবাদী উত্তেজিত ভাষাসৈনিকরা সে সময় ১৪৪ ধারার ভয়ে পিছিয়ে যাবে না বলে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়।

আমতলায় বসে ছাত্রদের সভা। আর গেটের বাইরে রাস্তায় বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে খাকি হাফপ্যান্ট পরা সশস্ত্র পুলিশ প্রস্তুত থাকে ছাত্রদের বাধা দেয়ার জন্যে, গ্রেফতার করার জন্যে।

সিদ্ধান্ত কয়েকজন করে একসঙ্গে বেরিয়ে গিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবে। কোনো কোনো লেখক চারজন করে, কোনো কোনো লেখক পাঁচজন বা সাতজন বা দশজন করে ছোট ছোট দলে গেট পেরিয়ে রাস্তায় নেমে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন।

এই দিনে পূর্ববঙ্গ বিধান সভার অধিবেশন ছিল বেলা তিনটায়। তাই ছাত্ররা মেডিক্যাল হোস্টেল প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে পরিষদ ভবনের সামনে সংঘবদ্ধ হতে চেষ্টা করে। তখন দুপুর গড়িয়ে যায়। কিন্তু পুলিশের বাধা। আক্রমণের ফলে ছাত্ররা অগ্রসর হতে পারছিল না। প্রতিবাদী ছাত্রদের সঙ্গে তখনো খণ্ডযুদ্ধ চলে পুলিশের। ছাত্রদের কণ্ঠে তখনো স্লোগান প্রতিধ্বনি হচ্ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’, পুলিশের জুলুম চলবে না। এর আগে মিছিল থেকে বহু ছাত্রকে গ্রেফতার করে ট্রাকে উঠিয়ে থানায় নিয়ে যায়। বিক্ষোভরত ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দেয় এলাকার হোটেল বয়, সরকারি কর্মচারী, শ্রমিক-রিকশাওয়ালা।

ছাত্র-পুলিশের খণ্ডযুদ্ধের সময় অনুমান বেলা ৩টার পর পাকিস্তান সরকারের লেলিয়ে দেয়া পুলিশ বাহিনী আকস্মিক মেডিক্যাল হোস্টেলের গেটের ভেতরে ঢোকে এবং রাস্তায় ও বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠের কোণায় সমবেত ছাত্রজনতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পথের ওপরে মাথার খুলি উড়ে মগজ বেরিয়ে পড়ে মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের আই.কম-এর ছাত্র ও বাদামতলির কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের পুত্র রফিকউদ্দিনের। রফিকউদ্দিন রাস্তাতেই শহীদ হন পুলিশের গুলিতে।

মেডিক্যাল কলেজের ভেতরে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ-র ছাত্র আবুল বরকত। মেডিক্যাল কলেজের ভেতরেই গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানায় পাঁচুয়া গ্রামের কৃষক যুবক আব্দুল জব্বার। দুয়েকজন নাম না জানা আরো শহীদ হয়েছেন এই দিনে। এছাড়া অসংখ্য আহত হয়েছেন। গুরুতর আহতদের মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ এপ্রিল মারা যান সেক্রেটারিয়েটের পিয়ন আবদুস সালাম।

একুশের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া

২১ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন শহীদ হবার ঘটনার প্রভাব পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের অভ্যন্তরেও বিক্ষোভে রূপ নেয়। পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্যরা ছাত্রহত্যার তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের দাবি জানালেন। পদত্যাগ দাবি করেন নূরুল আমিনের। বাংলা ভাষার দাবি নিয়ে এবং ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় যাঁরা তুমুল বিতর্ক তুলেছিলেন ব্যবস্থাপক পরিষদে তাঁরা হলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মনোরঞ্জন ধর, মওলানা তর্কবাগীশ, গোবিন্দলাল ব্যানার্জি, বসন্তকুমার দাস, শামসুদ্দিন আহমদসহ আরো অনেকে। আবুল কালাম শামসুদ্দীন ছাত্রদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।

২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলন কেবল ঢাকা শহরকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ থাকেনি। ঢাকার বাইরে মফস্বল থানা শহর এমনকি গ্রামাঞ্চলের স্কুল-কলেজেও ভাষা আন্দোলনের প্রভাব বিস্তার ঘটে খুব দ্রুতই।

একুশের চেতনায় লেখক-শিল্পী-কবি-গীতিকার, স্থাপত্যশিল্পী, ঔপন্যাসিক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে কেউ লিখেছেন কবিতা, কেউবা গান, কেউবা গল্প, কেউবা উপন্যাস, কেউবা শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে নির্মাণ করেছেন শহীদ মিনার। একুশের চেতনা সমগ্র জাতির মধ্যে নবজাগরণের সৃষ্টি করেছিল।

() প্রথম শহীদ মিনার

ভাষা আন্দোলনে ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলির আঘাতে ঢাকার মাটি যাঁদের বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, সেইসব শহীদের স্মৃতিকে ধরে রাখবার প্রত্যয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রগতিশীল ও সংগ্রামী ছাত্রদের উদ্যোগে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে নির্মাণ করা হয় ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ”। প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের আকৃতি ছিল ১০ ফুট উচ্চ ও ৬ ফুট চওড়া। ২৩ ফেব্রুয়ারির রাত ছিল প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের রাত। একদিকে সারাদেশে মিছিল- মিটিংয়ের ঢল, অন্যদিকে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে শুরু হয় শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির কাজ। তখনো কার্ফু জারি ছিল। কার্ফু জারি করা ছিল রাত ৮টা থেকে পরদিন ভোর পাঁচটা পর্যন্ত। শহীদ মিনার তৈরির উপকরণ সংগ্রহ করা হয় মেডিক্যাল কলেজ থেকেই। কলেজের সম্প্রসারণের কাজ চলছিল। ফলে প্রচুর ইট বালি সিমেন্ট কলেজের আঙিনায় জমা ছিল। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা ইট, বালি, সিমেন্ট নিজেরাই বহন করে আনে। ভাষা আন্দোলনে প্রথম শহীদ বরকত যেখানটায় শহীদ হয়েছিলেন সেখানেই প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়।

প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভর কৃতিত্ব মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদেরই তবুও গোলাম মওলা, বদরুল আলম, আহমদ রফিক, সাঈদ হায়দার, শরফউদ্দীন প্রমুখের ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত।

প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের নকশা প্রণয়নের কৃতিত্ব মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দারের।

২৪ ফেব্রুয়ারি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন করা হয় শহীদ শফিউরের পিতাকে এনে। প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ দ্বিতীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবেও উদ্বোধন করা হয় ২৬ ফেব্রুয়ারির সকালে। উদ্বোধন করেন আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন। এই স্মৃতিস্তম্ভ শুধু শহীদদের স্মৃতিকে ধারণ করে নয় বাঙালি জাতির মনন ও চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে। ফলে নূরুল

আমিন সরকার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় স্মৃতিস্তম্ভটি ভেঙে ফেলে। কিন্তু শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলার পর সারা দেশের মানুষ চেতনাবাদী হয়ে ওঠে। সারা দেশের স্কুল-কলেজে ছোট্ট আঙ্গিকে অসংখ্য শহীদ মিনার তৈরি হয়ে যায়। কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ স্মৃতিস্তম্ভকে নিয়ে লেখেন কবিতা। তিনি উচ্চারণ করেন-

স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কী বন্ধু

চার কোটি পরিবার

খাড়া রয়েছি তো! যে-ভিত কখনো কোনো রাজন্য পারে নি ভাঙতে …

হাজার মুঠির বজ্র শিখরে সূর্যের মতো জ্বলে শুধু এক

শপথের ভাস্কর।

() একুশের প্রথম কবিতা

ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয় কবিতায়। একুশের ঘটনার পরপরই তরুণ কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী লেখেন ‘কাঁদতে আসি নি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ শিরোনামে কবিতা।

কবিতাটি একুশের চেতনায় প্রথম কবিতা হিসেবে খুবই আলোচিত এবং পাঠক সমাদৃত। কবিতাটি চট্টগ্রামে রচিত হয়েছিল এবং ঐ দিনই একটি বিশেষ বুলেটিনে তা প্রকাশ পায়। প্রকাশ এবং প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে কবিতাটি তৎকালীন সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।

মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীর কবিতায় উদ্ভাসিত হয়েছে এদেশের মানুষ কেবল কাঁদতে জানে না, অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মরতেও জানে, জানে প্রতিবাদ করতে। মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীর কবিতার কয়েকটি পঙক্তি উল্লেখ করা হলো :

যারা আমার অসংখ্য ভাইবোনকে হত্যা করেছে

যারা আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যময় ভাষার অভ্যন্ত

মাতৃসম্বোধনকে কেড়ে নিতে গিয়ে

আমার এই সব ভাইবোনদের হত্যা করেছে

আমি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।

(গ) একুশের প্রথম গান

ঢাকা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবদুল গাফফার চৌধুরী একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত দিনে একুশের প্রথম গানটি উপহার দেন। গানটি প্রথমে লেখা হয় কবিতা হিসেবে। ১৯৮৩ সালে সচিত্র ‘স্বদেশ’ পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, ঐ দিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বুলেটবিদ্ধ জনৈক তরুণের শিয়রে বসে তিনি কবিতাটি লিখেছেন। কবিতাটির কয়েকটি ছত্র এরকম : আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রুঝরা ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি?

কবিতাটিতে প্রথমে আবদুল লতিফ সুর দিয়েছিলেন। তারপর আলতাফ মাহমুদ নতুন সুরারোপ করে গাইলেন। আবদুল গাফফার চৌধুরীর এই কবিতাটি একুশের গান হিসেবে প্রতি একুশের প্রভাত ফেরিতে গাওয়া হয়।

() একুশের প্রথম সংকলন

১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশের প্রথম সংকলন-একুশে ফেব্রুয়ারি’ প্রকাশিত হয়। প্রকাশক পুঁথিপত্র প্রকাশনীর পক্ষে যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ সুলতান কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ একুশের দিনলিপি নিয়ে সংকলনটি সাজান। যাঁরা কবিতা লিখেছিলেন তাঁরা হলেন-শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল গণি হাজারী, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনিস চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, জামালুদ্দিন, আতাউর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান।

একুশের সংকলনে গল্প স্থান পেয়েছে-শওকত ওসমান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম, আতোয়ার রহমান প্রমুখের একুশের নকশা লিখেছেন—মুর্তজা বশীর, সালেহ আহম্মদ। একুশের গান লিখেছেন-আবদুল গাফফার চৌধুরী ও তোফাজ্জল হোসেন। একুশের ইতিহাস লিখেছেন কবির উদ্দিন আহমদ।

একুশের চেতনায় হাসান হাফিজুর রহমানের যে সচেতনতার প্রয়াস সে সময় আমরা লক্ষ করি তার মূল্যায়নে আবু হেনা মোস্তফা কামাল যে মন্তব্য করেছেন তা স্মর্তব্য, “হাসান হাফিজুর রহমান এই আন্দোলনের আঘাতে যেভাবে সাড়া দিলেন তার ভেতরে বাংলাদেশের ‘তৎকালীন সমাজমানসের একটা চেহারা উৎকীর্ণ”।

‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনটি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।

একুশের প্রথম নাটক

মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ একুশের চেতনায় লেখা একুশের প্রথম নাটক। সমালোচকদের অভিমত এই যে, রাজনৈতিক চেতনার এমন কল্যমণ্ডিত রূপ আমাদের সাহিত্যে খুব অল্পই দেখা গেছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অবস্থানকালে রণেশ দাশগুপ্তের অনুরোধে মুনীর চৌধুরী ‘কবর’ রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন।