বিংশ শতকের ষাটের দশক বাংলাদেশের কবিতায় এক যুগান্তকারী দশক। যে-দশক ফুলে-ফলে ভরিয়ে রেখেছে বাংলাদেশের কবিতার জমিন। কবিতা যাঁরাই লিখেছেন এই সময়ে, তাঁরাই কবি হয়ে উঠেছেন, বিষয়টি এমন নয়; কিন্তু যাঁরা এই সময়ে কবি হয়েছেন, তাঁরা হয়ে উঠেছেন অপ্রতিরোধ্য, নানা বিচার-বিবেচনার নিক্তিতে। এমন একসময় সমগ্র বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছিল, যে-সময় কেবল শোষিত-নিপীড়িত হওয়ার বিপরীতে বিপ্লব-বিদ্রোহ আর স্বাধিকার আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেই কালে সমুদ্রের জোয়ারের মতো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের
শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাটাতনও ঘনীভূত হয়ে মিছরির দানার আকৃতি গ্রহণ করেছিল। সেই যুগে কবিতা লিখেছিলেন যাঁরা, যাঁরা কবি হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম মহাদেব সাহা (জ. ১৯৪৪)। কিন্তু ওই সময়ের মূলধারার কবিতা-বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তাঁর কবিতা-বৈশিষ্ট্য ভিন্নধারায় প্রবাহিত, রয়েছে মোটাদাগে বেশ কিছু পার্থক্যও। তবে ষাটের মূলধারার কবিতা-বৈশিষ্ট্যও তাঁর কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায়। প্রচলিত নিয়মে প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের বিবেচনায় বাংলাদেশের দশকওয়ারি কবি ও কবিতার সমালোচনা-হিসাবটি সম্পাদিত হয়। কিন্তু এই হিসাবটিও মহাদেব সাহা ঠিকঠাক ধরে রাখতে পারেননি। তিনি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলেন এক নতুন আর স্বাধীন বাংলাদেশে, ১৯৭২ সালে; কাব্যগ্রন্থের নাম এই গৃহ এই সন্ন্যাস।
এই লেখার যে শিরোনাম দিয়েছি, সেই শিরোনামের ভেতরে ষাটের কবিতার ম্যানিফেস্টোর তীব্র বিরোধিতা লুকায়িত রয়েছে। ষাটের দশকের কবিতার প্রধান ধারা আর বৈশিষ্ট্য যদি আলোচনা করা যায় তবে এই বিষয় আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে-ম্যানিফেস্টোর তাপ-চাপে হাসান আজিজুল হকের (১৯৩৯-২০২১) মতো শক্তিমান লেখকও এই ধারার বাইরে বের হয়ে সাহিত্যচর্চা করেছেন। কিন্তু হাসান আজিজুল হক কেন ষাটের
সাহিত্য-আন্দোলনের ম্যানিফেস্টোর বাইরে (কণ্ঠস্বর গোষ্ঠী) থাকতে চেয়েছিলেন; বলতে হবে থাকলেন? আদতে এটি কেবল নন্দনতাত্ত্বিক বিষয়ের ভেতরে আবদ্ধ থাকেনি; শেষ পর্যন্ত ভাবাদর্শিক – রাজনৈতিক আদর্শ তো বটেই – আদর্শ এই ক্ষেত্রে বেশ প্রবল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মহাদেব সাহাকে আমি স্বদেশের দিকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছি; কিন্তু ষাটের কবিতা তো স্বদেশবিমুখ।
‘আধুনিকতাবাদী’ আর ‘প্রতীকবাদী’ কবিতার প্রবাদপুরুষ – যাঁর দ্বারা কলকাতায় ত্রিশের কবিরা বিপুলভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন – তিনি শার্ল বোদলেয়ার (১৮২১-৬৭)। তেমনি বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-৭৪) কর্তৃক অনূদিত শার্ল বোদলেয়ার : তাঁর কবিতা (১৯৬০) পড়ে বাংলাদেশের ষাটের দশকের কবিরাও ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। শার্ল বোদলেয়ারের Paris Spleen (১৮৬৭)-এর ‘The Foreigner’ কবিতা স্বদেশবিমুখতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে আমাদের কাছে রয়েছে। অথবা যাঁকে বাংলাদেশের কবিরা একটু হলেও ‘গুরু’ মেনে আর জেনে এই ধারার কবিতা লিখেছিলেন, বুদ্ধদেব বসুর কথাই বলছি, তিনি তাঁর ‘বুড়োকালে’ লেখা যে-আঁধার আলোর অধিক (১৯৫৮) কাব্যের ‘মরুপথ’ কবিতায় বলছেন, ‘তারপর চেয়ে দ্যাখে, শুধু বালি; দিগন্তের নেই অন্তরাল;/ মাকড়সা, কাঁটার ঝোপ, দু-একটা উটের কঙ্কাল।’ এই কবিতার বক্তব্য কী – তা মনে হয় আর আলোচনার দাবি রাখে না। কিন্তু মহাদেব সাহা কবিতা লিখতে গিয়ে স্বদেশ আর স্বাজাত্যবোধের আবেগে ভেসেছেন সর্বদা। এত এত কবিতা তিনি লিখেছেন, তাঁর তুলনা করা যেতে পারে কেবল বাংলাদেশের আরেক গুরুত্বপূর্ণ কবি শামসুর রাহমানের (১৯২৯-২০০৬) সঙ্গে।
দুই
মহাদেব সাহার কাব্যযাত্রার সূচনা তাঁর ঘর থেকে, সহজিয়া আর প্রাচ্যদেশীয় পারিবারিক কাঠামোয় অবস্থান করে এবং নিজস্ব শৈশব-কল্পনার ভেতরে তাঁর ঘরে কী কী বইপুস্তক পাঠ হতো – এই বিষয়সমূহ সংগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে তাঁর কাব্যপাঠের বেলায়। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁর স্বদেশের প্রতি যে তীব্র রোমান্টিকতা ও নস্টালজিয়া তা কোনো হিসাবেই মেলানো যেন বেশ কঠিন হয়ে পড়ে ষাটের কবিতার ম্যানিফেস্টোর সঙ্গে। স্বদেশ মহাদেব সাহার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে কাজ করেছে। এই স্বদেশের বিষয় তিনি তাঁর কাব্য-প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁর কবিতায় হাজির করেছেন। একটি বাংলাদেশের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে তাঁর কবিতায়, শেষাবধি। এই রাষ্ট্র কোনো ধূসরতার প্রতীক হিসেবে ধরা তো দেয়নি, যেমনটা মাঝে মাঝে জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯-১৯৫৪) কবিতার বেলায় হয়েছিল। বরঞ্চ এক নধর, স্পষ্ট আর উজ্জ্বল দেহের অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত বাংলাদেশের সচিত্র প্রতিবেদন ক্রমাগত তিনি তাঁর
কবিতা-কাব্যে তৈরি করেছেন আর প্রকাশ করে গেছেন।
এই প্রসঙ্গে কেউ কেউ তাঁকে ‘গ্রাম্য’ কিংবা ‘গেঁয়ো’ বলতে পারেন। হ্যাঁ, তা বলা সম্ভব। কবি জসীমউদ্দীন
(১৯০৩-৭৬) সম্পর্কে এই কথা সুবিদিত বাংলাদেশের কাব্যজগতে। আর মহাদেব সাহা যে সময় আর যুগের কবি, সেই হিসাবে স্বদেশ ও স্বাজাত্যমুখীনতাকে কেউ ‘গ্রাম্য’ কিংবা ‘গেঁয়ো’ বললে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তা বলার আগে ‘কৃষ্টি’ আর ‘সভ্যতা’ সম্পর্কে যৌক্তিক আলাপ-আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো দরকার। না হলে তা তো ‘বাঙালের একগুঁয়ে’ ব্যাপার হবে। বাংলাদেশের ‘কৃষ্টি’ আর পশ্চিমের ‘কৃষ্টি’ এক নয়। আলাদা। দুই অঞ্চলে পার্থক্য আছে ‘বেইজ স্ট্রাকচার’ আর ‘সুপার স্ট্রাকচারে’। দুই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতের স্বরূপ এই কথাই বলে। ফলে সভ্যতার প্রশ্নে কৃষ্টি বদলানোর ব্যাপারটা সবসময় ঠিকঠাক বিষয় হিসেবে থাকবে না। আমি মহাদেব সাহাকে নিয়ে পক্ষপাত করছি না। কিন্তু এই কৃষ্টি আর সভ্যতার প্রশ্নে এই পার্থক্য এক সমাজ থেকে আরেক সমাজে বিদ্যমান থাকে। সাহিত্য যেহেতু এই বিষয় দুটোকেও বিশেষভাবে প্রতিনিধিত্ব করে, তাই এই বিষয় দুটো খারিজ করে আমাদের সাহিত্যের আলাপ করা বেশ দুষ্কর হবে। এই কারণে মহাদেব সাহার স্বদেশানুরাগ কিংবা স্বাজাত্যবোধ পশ্চিমের কৃষ্টির বিবেচনায় গ্রাম্য হতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের বিবেচনায় এই কৃষ্টির প্রসঙ্গ ঠিকঠাক। কেজো। দরকারি তো বটেই। সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার জন্যও জরুরি।
মহাদেব সাহা তাঁর কবিতায় এমনসব স্বদেশবাচক শব্দ ব্যবহার করেছেন, যেসব শব্দ তাঁকে একটি নতুন ভাবধারা-প্রভাবিত বাস্তবতার ভেতরে নেয় না। পুরনো কোনো ভূগোলবাচকতায় এই বিষয়ের পরিসমাপ্তি ঘটে। তিনি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের ‘বৈশাখে নিজস্ব সংবাদ’ কবিতায় বলছেন, ‘এখন আমার বছর কাটে বিদেশ বিভুঁয়ে।’ কিন্তু মহাদেব সাহা কি দেশ ছেড়ে প্রকৃত-প্রস্তাবে বিদেশে ছিলেন এই সময়ে? না। তিনি প্রকৃত-প্রস্তাবে দেশ ছেড়েছেন বহু পরে। তাহলে এই বাক্যের অর্থ কী? তিনি কোন ‘বিদেশ’ আর ‘বিভুঁয়ের’ কথা বললেন? কোন ‘বিদেশ’ আর ‘বিভুঁয়ের’ কথা নিজের দেশের ভেতরে থেকেও তিনি বলছেন আর এর তীব্র বিরোধিতা করছেন? একটি দুঃসহ হাহাকারে ভিজে যাচ্ছে তাঁর কবিতার জগৎ? আদতে তিনি ষাটের দশকের ঢাকা নগরীর সঙ্গেই তাঁর
মন-মানসিকতার দ্বেন্দ্বের একটি বর্ণনা কবিতায় নির্মাণ করলেন। কিন্তু অপরদিকে তাঁর সঙ্গী কবিরা এই ধারণা মুখেও আনেননি। আনলেও শেষমেশ কিন্তু বিচ্ছিন্নতা আর নাগরিক সংবাদে ঢাকা পড়েছে সেই প্রবণতা। কেউ কেউ রাজনৈতিক চাপে একটু-আধটু করতে বাধ্য হয়েছেন। তাও কাব্য রচনার প্রথম থেকেই নয়। মহাদেব এই কবিতায় বারবার ‘মা’ এবং ‘বৈশাখের’ প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছেন। যে-বিষয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আলাপের সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত।
একই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের সঙ্গে কবিতার কী সম্পর্ক হতে পারে, এই বিষয় নিয়েও মহাদেব সাহা কবিতা লিখেছেন। দেখা যাচ্ছে ত্রিশের কবিদের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য রাষ্ট্রহীনতা; মানে তীব্র অনিকেত-ভাবনা তাঁদের কবিতাকে বিশেষভাবে শাসন করে চলেছে। কিন্তু মহাদেব সাহার কবিতা যেমন পূর্বে আধুনিক-সাহিত্য বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণরূপে মানেনি, তেমনি রাষ্ট্রিক আদর্শের বেলায়ও দেখা যাচ্ছে তিনি একেবারেই ছেড়ে কথা বলছেন না। ছেড়ে দিচ্ছেন না। তিনি কিছু বিষয় একেবারেই বাতিল করে দিচ্ছেন না। কিছু কিছু বিষয় তিনি তাঁর কবিতায় যে-কোনো নন্দনতাত্ত্বিকভাবে কিংবা আদর্শিক প্রশ্নে আমাদের সামনে উপস্থাপন করছেন। কিছু উদাহরণ দেবো। বিশ্লেষণ করবো এই সত্যকে।
ক. কেড়ে নেবে নগরকোটালের হাতের বাঁশি, বর্ম/ মাথার টুপি, শাদা পোশাক/ সরল চাষার লণ্ডভণ্ড করবে খামার, শস্যক্ষেত/ নিশিরাতে গোয়াল থেকে খেদিয়ে নেবে গরুর পাল কালো খোঁয়াড়ে (‘নিসর্গের খুন’)
খ. আবার এসেছি ফিরে তোর কাছে মধুর মানব/ আমাকে মাটি দে মাটি দে/ মাটির মমতা দে, মন্ত্র দে/ তুলে দে তুলে দে! (‘মাটি দে, মমতা দে’)
গ. কালিন্দীর কোন ক‚লে ভরেছো কলস, কোন তমালের মূলে/ ছয়টি কালিমা খুলে করেছো ভূষণ!/ সাক্ষী থাকো তুমি হে তৃষ্ণার নদী, হে রাখাল, অশত্থ বাউল/ আমি তো তোমারই বশ ওই যে সাতটি হরিণ তৃণ, সোমত্ত সাতটি তারা/ কামিনীর সাতগুচ্ছ চুল, আমি তোমারই বশ (‘আমি তো তোমারই বশ’)
ঘ. আমার দুঃখিনী গ্রাম কিছুতেই তোমাকে পারিনি ভুলে যেতে;/ এই গ্রাম, লতাগুল্ম-আচ্ছাদিত শৈশবের স্মৃতি (‘ফিরে আসা গ্রাম’)
ঙ. তোমাকে কেমন করে ছেড়ে যাই ধানক্ষেত, মেঠোপথ,/ স্বদেশের সবুজ মানচিত্র,/ তোমাকে কেমন করে ছেড়ে যাই প্রিয় নদী,/ প্রিয় ঘাস, ফুল। (‘তোমাকে যাইনি ছেড়ে’)
ক-সংখ্যক কবিতায় গ্রামীণ আর্থ-উৎপাদনকাঠামো প্রসঙ্গে কথা বলেছেন মহাদেব সাহা। যে আর্থ-উৎপাদনকাঠামো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রধানতম এবং প্রাচীনতম আর্থ-উৎপাদনকাঠামো হিসেবে বিবেচিত। যাকে কেন্দ্র করে একটি অঞ্চলের আর সব বিষয় বিবর্তিত হয়েছে। নির্মিত হয়েছে এই অঞ্চলের কৃষ্টি ও সভ্যতা, নিজস্বতায়। বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রও এই আর্থ-উৎপাদনকাঠামো থেকে সম্পূর্ণরূপে বের হতে পারেনি। খ-সংখ্যক কবিতায় ‘এমন এক মাটির’ দিকে কবি ফিরে আসতে চান, যে-মাটি তাঁর একান্তই নিজের, বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁর পরিচিত আর দরদের। এই পরিচয় আর দরদের ভার তাঁর শব্দের ভেতর দিয়েই প্রকাশিত হয়েছে। পরিবর্তন ইতিবাচক। কিন্তু পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যদি বিষয়টি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়ে পড়ে, তাহলে মনে হয় একটি বৃহৎ সমস্যা তৈরি হয়। গ-সংখ্যক কবিতা আলোচনা করতে আমাদের এমন দুজন কবিকে নিয়ে আসতে হবে যাঁদের মধ্যে প্রথমজন ত্রিশের আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ। তাঁর রূপসী বাংলা কাব্যের যে-মৌল প্রবণতা সেই প্রবণতাই সিঞ্চিত হয়েছে এই কাব্যাংশের প্রথমভাগে। আর সৈয়দ আলী আহসান, তাঁর কবিতা ‘আমার পূর্ব-বাংলা’র সুর ছুঁয়ে,
ছেনে-কুঁদে যেন নতুনের মাত্রায় প্রকাশিত হলো এই কাব্যাংশের শেষে। অর্থাৎ কবির অন্তর্গত চিন্তা-চাপের বিষয়টিই বস্তুগত চিন্তা-চাপের সঙ্গে সংশ্লেষিত হয়েছে। একটি নির্ধারিত ভূগোলকে এই পদ্ধতিতে কবিতায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন মহাদেব সাহা।
ঘ-সংখ্যক কবিতায় আছে গ্রামের প্রতি তীব্র টান-অনুভব। তাঁর কবিতায় যে রাশি রাশি স্মৃতি আর নস্টালজিয়া নির্মাণের প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়, তার কারখানাও এই গ্রাম। গ্রামীণ সমাজের গণপরিসরের বিবিধ কর্মকাণ্ডও স্পষ্ট হয় এই প্রক্রিয়ায়। মহাদেব সাহা ‘দেশ’ বলতেও এই গ্রামকে বুঝিয়েছেন। নগর ও নাগরিকতার বিপরীতে প্রতিরোধ-প্রবণতা জারি রাখার যে বিষয়, তাও এই গ্রাম আর ‘গ্রাম্যতার’ ভেতর লুকায়িত রয়েছে। তাঁর
কবিতা-পাঠের পর বলা সম্ভব, তিনি মনে করতেন, গ্রামের ভেতরেই তাঁর স্বদেশের প্রাণ লুকিয়ে আছে। ঙ-সংখ্যক কবিতায় মহাদেব সাহা প্রকৃত-প্রস্তাবে যে-সমস্ত বিষয় ছেড়ে গেছেন, সে-সমস্ত বিষয় সম্পর্কে তিনি বলছেন যে, তা তিনি ছেড়ে যাননি। একটি আপাতবৈপরীত্য আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ তিনি যে-সমস্ত বিষয় নিয়ে কথা বলছেন, তার প্রতিটিই তিনি এই কবিতা লেখার সময়ে সম্পূর্ণরূপে ছেড়ে এসেছেন। তাহলে? মূলত নস্টালজিয়াই এক্ষেত্রে একটি কার্যকর বিষয় হিসেবে সক্রিয় থেকেছে।
তাঁর কাব্যযাত্রার শেষ পর্যন্ত তিনি এই মাটিসংলগ্ন থাকার ধারণাকে জারি রেখেছিলেন। নিজের জন্মসূত্র আর মাটিসংলগ্ন প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানান দিয়ে গেছেন। বর্তমানে যে পরিস্থিতিই বিরাজ করুক না কেন; তিনি তাঁর ফেলে আসা স্বদেশের বিপরীতে বর্তমান এক অচেনা আর অজানা স্বদেশের তীব্র বিরোধিতা করে গেছেন। তিনি বলছেন, ‘আমি এসবের কেউ নই, এই শহর, লোহা যন্ত্র,/ ইটকাঠ, মিস্ত্রির করাত/ লেদ মেশিনের শব্দ, আমি এসবের কেউ নই, এই/ যন্ত্রের ধোঁয়ার/ আমি দূর উত্তরবঙ্গের সবুজ বনের/ স্নিগ্ধ ছায়ার মানুষ’ – এই কবিতাংশ পাঠ-পরবর্তী সারাংশ পাঠককে ওয়াকিবহাল করে যে, মহাদেব সাহা আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার চিহ্নকে ধুয়ে-মুছে ফেলতে চান। কিন্তু তিনি যে-পদ্ধতিতে এই কাজটি সম্পন্ন করতে চান তা তাঁর নিজস্ব ভ‚গোলে বিদ্যমান বাস্তবতা। তাঁর শক্তির উৎসও এইখানে নিহিত। প্রথাগত ইতিহাস-ঐতিহ্য, যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে কৃষ্টি অর্থে সম্পৃক্ত, সেই সমস্ত বিষয় মহাদেব সাহা পূর্বে আলোচিত বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লেষিত করেছেন। একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
তিন
তীব্র নস্টালজিয়া মহাদেব সাহার কবিতায় স্পষ্ট। তাহলে নস্টালজিয়া কীভাবে প্রকাশিত হয়? হয় ব্যক্তির জীবনের নানা স্মৃতির ভেতর দিয়ে। কিন্তু ব্যক্তির নস্টালজিয়া কি ব্যক্তির ভেতরেই নির্মাণ হয়? তা অনেক সময় হতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ব্যক্তির নস্টালজিয়া তৈরিতে সামষ্টিক বস্তু-ভিত্তি বৃহৎ প্রভাব রাখে। অর্থাৎ ব্যক্তি যে-ভূগোলে আর যে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা-প্রভাবিত জনসমাজ আর জনপরিসরে বসবাস করে, তা ব্যক্তির নস্টালজিয়া নির্মাণে অনুঘটক হিসেবে সক্রিয় থাকে। মহাদেব সাহার কবিতায় নস্টালজিয়া নির্মাণে এই বিষয়টিই বিশেষভাবে পাঠকের কাছে পরিলক্ষিত হবে। অর্থাৎ পূর্বে যে আলাপ-আলোচনায় যে-স্বদেশানুভূতি ও স্বাজাত্যবোধের প্রসঙ্গে কথা বলা হলো, এই বিষয়ই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে। অর্থাৎ মহাদেব সাহা যা কিছু পুরনো স্মৃতি, তথা নস্টালজিয়া, নিয়ে আসেন তা তাঁর নিজস্ব জনসমাজ আর জনপরিসরেই পূর্বে ঘটেছে এমন বিষয়সমূহের ভিত্তিতে নির্মিত। এই তীব্র স্মৃতিকাতরতা অনেক সময় অনেকাংশেই রোমান্টিক গুণ-মানসম্পন্ন। আঠারো শতকের শেষে আর উনিশ শতকের শুরুতেই ইউরোপে সমাজ-পরিবর্তনের যে-ঝড় বয়ে গেল, সে-ঝড়ের বিপরীতেও তা সজীবতায় সক্রিয়।
ক. স্মৃতি ছাড়া আর কোনো নোটবুক নাই/ টুকে রাখি কোথা ইট বা খোয়াই/ ভাঙা বাড়িটার ধূলি-জঞ্জাল/ বুক ভরে যারা ছিলো এতোকাল;/ কোথা লিখে রাখি এতো প্রিয় নাম/ যার পাশাপাশি একদা ছিলাম! (‘স্মৃতি’)
খ. আমারও শীতকাল আসে, আসে হুহু প্রকৃতির জ্বর/ পাতা ঝরে, পাতা ঝরে যায়!/ এমন শৈশব কেন আমি আছি আর তুমি নাই! (‘আবুল হাসানের জন্য এলিজি’)
ক-সংখ্যক কবিতায় মহাদেব সাহা একইসঙ্গে ব্যক্তি আর সমষ্টির নস্টালজিয়া নিয়ে আলাপ করেছেন। স্মৃতিকাতরতার বিষয় তিনি নির্মাণ করেছেন এমনসব বস্তুবাচক শব্দ দ্বারা, যার ভেতরে রয়েছে স্বদেশের ছবি, তার পরিপাশের্^র লোকজন। খ-সংখ্যক কবিতায় মহাদেব সাহা আবুল হাসানের জন্য কবিতা রচনা করেছিলেন। কিন্তু সেই কবিতার ভেতরে কেবল আবুল হাসান নেই, আছে আরো অনেকে। আছে পুরনো সময়। গ্রাম মহাদেব সাহার কবিতার বড় দিক। মহাদেব সাহা আধুনিক কবি। কিন্তু গ্রামীণ জীবনের এক অনুপুঙ্খ বয়ান কীভাবে তাঁর কবিতায় তিনি উপস্থাপন করলেন? এই নস্টালজিয়ার মাধ্যমে ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে তিনি গ্রামে ফিরে গেছেন এবং গ্রামের একটি সচিত্র বিবরণী যেন ক্রমাগত তিনি তাঁর কবিতায় দিয়ে যেতে থাকলেন। এই নস্টালজিয়া যেমন মহাদেব সাহার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তেমনি করে দুনিয়ায় মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি-সম্পর্ক বিষয়েও সতর্ক থেকেছে। আলোচ্য পরিসরে বিষয়টি সক্রিয় থেকেছে।
চার
পূর্বে সূচনা-আলোচনায় আমি বলেছি, মহাদেব সাহা ষাটের দশকের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যান্য ‘আধুনিক কবিদের’ মতো তাঁর কবিতা কেবল আধুনিক বৈশিষ্ট্যে ভরিয়ে তোলেননি। তিনি ভারসাম্য রক্ষা করতে চেয়েছেন তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ দুই জীবনের ভেতরে – ফেলে আসা স্মৃতিসম্পৃক্ত গ্রাম ও গ্রামীণ সমাজ আর যে-নগর ও নাগরিক সমাজে তিনি বর্তমানে বসবাস করছেন। অর্থাৎ তিনি একটি সময়ে এসে এক বাস্তবতা আর এক গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সেই যুগের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। সেই যুগের যুগ-বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেছেন। এমন একজন কবি তো অবশ্যই সেই বর্ণনা দেবেন। তিনি তা কম হলেও দিয়েছেন। বিরোধী হলেও দেবেন। তাঁর কবিতায় আধুনিক সাহিত্য-বৈশিষ্ট্য এবং নাগরিক অনুষঙ্গ তাই স্বাভাবিকভাবেই গ্রন্থিত হয়েছে। নাগরিক জীবনের বাস্তবতা তাঁকে করেছে নানাভাবে বিষণ্ন, বিপর্যস্ত, একাকী, নিঃসঙ্গ, ধূসর-জীবনের মালিক। এই সবই কিন্তু বানোয়াট নয়। কারণ ষাটের দশকেই ঢাকা প্রকৃত ঢাকা হয়ে উঠছিল। সেই ঢাকার নানান চিহ্ন ‘আধুনিক নগর সভ্যতার’ চিহ্নের সঙ্গে পুরোপুরি না মিললেও কিছুটা হাবভাব তার ভেতরে ছিল। কিন্তু যাঁরা এই বাস্তবতায় পশ্চিমের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে অনুকরণের মাধ্যমে আধুনিক কবিতার পসার নিয়ে বসেছিলেন, তাঁদের শৈশব-কৈশোরের বড় একটা সময় তো কেটেছে গ্রামে, গ্রামীণ বাস্তবতায়। ফলে পশ্চিমের যে-দান তা কি তিনি অস্বীকার করলেন? না। একেবারেই না। তিনি পূর্ব-পশ্চিম মিলেই তাঁর কবিতার জমিন তৈরি করেছিলেন। যেখানে অবশ্য স্বদেশই শাসন করেছে বেশিরভাগ সময়। অনিকেত ভাবনা, ধূসর জগতের বর্ণনা, নেতিবাচকতা, নিখিল নেতির প্রভাবে নির্মিত অনিঃশেষ হাহাকার, শূন্যতাবোধ, একাকিত্ববোধ তাঁর কবিতার বিষয় হিসেবে এসেছে। বিপুল যুগযন্ত্রণায় ব্যক্তির এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য তিনি ধারণ করেছিলেন এবং তা থেকে মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষাও তিনি প্রকাশ করে গেছেন। উদহারণ –
ক. আমি কি কিছুর মতো? শিশু ও শিল্পের মতো?/ রদাঁর মূর্তির মতো?/ হয়তোবা পাখি, হয়তোবা ফুল, হয়তো সে দরবেশ/ আমি এ কিসের মতো? – যে/আমাকে মেলাবে; (‘স্বভাব’)
খ. সবখানে ব্যর্থ হয়ে যদি যাই/ তুমিও ফেরাবে মুখ স্নিগ্ধ বনভূমি/ ক্ষুধায় কাতর তবু দেবে না কি অনাহারী মুখে দুটি ফল?/ বড়োই ব্যথিত যদি কোনো স্নেহ ঝরাবে না অনন্ত নীলিমা! (‘সবাই ফেরালে মুখ’)
গ. অসুস্থতা আমার নির্জন শিল্প, আমি তাকে/ দুঃখভরা নকশীকাঁথার মতো আমার শরীরে/ করেছি সেলাই, (‘অসুস্থতা আমার নির্জন শিল্প’)
ঘ. আমি কি অনন্তকাল বসে আছি, কেন তাও তো জানি না/ চোখে মুখে উদ্বেগের কালি, থেকে থেকে ধূলিঝড়/ আতঙ্কের অন্তহীন থাবা; ভিতরে ভীষণ গলযোগ (‘ভালো আছি কিন্তু ভালো নেই’)
ঙ. তাহাকে বিশ্বাস করো তিনি জল, বৃক্ষকে বিশ্বাস করো,/ আগুনে বিশ্বাস রাখো, জলে রাখো,/ জলের অতীত আরো সুদর্শন তাহাতে বিশ্বাস রাখো/ শুদ্ধ বিশ্বাস রাখো একদিন শাপমুক্ত হবে। (‘তখন সুবর্ণ হবে ঘাস’)
‘Foreigner’ কবিতায় বোদলেয়ার নিজেকে যেমন নিরন্তর খুঁজে ফিরেছিলেন, ক-সংখ্যক কবিতায় মহাদেব সাহা তেমনিই নিজেকে খুঁজে ফিরেছেন। এক দারুণ উদ্ভিন্নতা তাঁকে যেন ক্লান্ত করে রেখেছিল। সেই উদ্ভিন্নতা আবার তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল অনিকেত-ভাবনার দিকে। এই দুটি বিষয় মিলে কবিতার মূল সুর তৈরি হয়েছে, সমর্পিত হয়েছে শেষমেশ পরিচয়হীনতায়। খ-সংখ্যক কবিতায় আধুনিক মানুষের ব্যর্থতাবোধের এক করুণ ফিরিস্তি নিয়ে হাজির হচ্ছেন কবি। কিন্তু সেই ফিরিস্তি কাউকে, কারো মুখের দিকে তাকিয়ে যেন বলছেন কবি। সেই মুখ এক রমণীর। কিন্তু রমণী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আগেই। এরই ফলে স্নিগ্ধ বনভূমির বিপরীতে তৈরি হচ্ছে আধুনিক মানুষের ব্যর্থতাবোধের বাস্তবতা। গ-সংখ্যক কবিতায় বোদলেয়ারীয় কাব্য-প্রকল্প জারি থেকেছে। ক্লেদজ কুসুম কাব্যগ্রন্থ, কিংবা ঝিনুকের অসুস্থতায় সৃষ্ট মুক্তোর প্রসঙ্গ এক্ষেত্রে কার্যকর হবে। আধুনিক কাব্যে শিল্পই প্রধান। কলুষিত সমাজের ভেতর থেকে নিটোল আপেল কিংবা নগর-নির্মিত যান্ত্রিক সভ্যতার ক্লেদের ভেতরে সুগন্ধী ফুলের নির্মাণই বড় কথা। কবি তাই করেছেন। ঘ-সংখ্যক কবিতায় আধুনিক বিশ্বের কল্লোলিত সময়, সমাজ-বাস্তবতায় মানুষের অবস্থান কী হয় – সে-সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। আধুনিক সমাজের সময়-বাস্তবতায় এসব মেনে চলার পরও মহাদেব সাহা ইতিবাচক থেকেছেন শেষাবধি। তিনি তবুও যেন বিশ্বাস রাখতে চান। ইতিবাচক থাকতে চান। একটি রোমান্টিক ইতিবাচকতা ঘ-সংখ্যক কবিতায় পরিস্রুত হয়েছে।
পূর্বে আলোচিত স্বদেশ-স্বাজাত্যবোধ আর আধুনিক কাব্য-বৈশিষ্ট্যের দ্বৈততায় মহাদেব সাহার কবিতায়
গৃহ-সন্ন্যাসবোধের দ্বন্দ্বও প্রকটিত হয়ে উঠেছে। মহাদেব সাহার কবিতায় প্রথম থেকেই এই বিষয় সক্রিয় থেকেছে। তিনি প্রথাগত পরিবার-সম্পর্কে একেবারে যেমন আস্থা রাখতে পারেননি, তেমনি করে তিনি এই পরিবার-সম্পর্ক থেকে বের হতেও পারেননি। একটি যুগ্ম-বৈপরীত্য তাঁর কবিতায় স্থির থেকেছে এই
‘গৃহ-সন্ন্যাসবোধের দ্বন্দ্ব’ প্রসঙ্গে। তিনি একইসঙ্গে যেমন গৃহকে নিয়ে আছেন তেমনি তিনি সন্ন্যাসবোধের আলাপকেও বাতিল করতে পারেননি। ব্যাপারটি পরিবর্তনশীল সমাজের ভেতরেই সমাধা ও সম্পন্ন হয়েছে।
পাঁচ
তাঁর কবিতার আরেকটি অন্যতম প্রসঙ্গ যান্ত্রিক সভ্যতা এবং নিসর্গের মধ্যে তুলনা। যন্ত্র আর সভ্যতার ক্রমবর্ধমান চাপে সমাজ আর মানুষের ভেতরে যে-পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছিল, সেই বিষয়ে তিনি সতর্ক ছিলেন সর্বদা।
সমাজ-পরিবর্তনে ব্যক্তির অভ্যাসগত আর সম্পর্কগত বহির্জগৎ পরিবর্তিত হতে থাকে। বিষয়টি ব্যক্তিকে নানাভাবে ভোগাতে থাকে। ভুগতে থাকার বিষয়টি কেবল একক ব্যক্তি হিসেবে মহাদেব সাহার একার নয়। এই বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে সমাজের আরো অনেকে। কিন্তু এই বিষয় অনেক কবিই পাশ কাটিয়ে অন্য পথে হাঁটেন, যেন কিছুই ঘটছে না তাঁর পরিপার্শ্বের; যেন ভুলে যান সব বেমালুম। মহাদেব সাহা বেমালুম ভুলে যাননি। তিনি এই বিষয় মাথায় রেখেই তাঁর কবিতার জমিন তৈরি করেছেন। কয়েকটি উদাহরণ দেবো এই বিষয়ে।
ক. আমি কোনো ছাপাখানা নই, আমি সেই/ হাতে আঁকা মৃৎশিল্প (‘ছাপাখানা আর মৃৎশিল্প’)
খ. আমরা যখন গান গাইতে পারি না তখন/ বিজ্ঞান ও ব্যাকরণ নির্দেশ করি,/ কিন্তু পাখিদের কোনো বাদ্যযন্ত্র নেই/ প্রেম যেমন সবসময়ই প্রথম। (‘আদি আর বর্তমান’)
গ. মাটির কলস আর মাটির সরা ভুলে গেল সে/ মানুষ এইভাবে নদী থেকে সরে গেল সবুজ, সবুজ/ থেকে সরে গেল/ তার নদীসংলগ্ন জীবন হলো লৌহশাসিত। (‘এই যন্ত্রজালে’)
উপরের ক-সংখ্যক কবিতায় শিল্প আর তার সঙ্গে প্রযুক্তির মিশেলে নতুন এক অবস্থা তৈরির প্রসঙ্গ এসেছে। যেখানে নিজস্ব শিল্পের সঙ্গে বৈদেশিক আর বিজাতীয় শিল্পকে একটি দ্বন্দ্বমূলক প্রকল্পের ভেতরে হাজির করা হয়েছে। আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে এই প্রক্রিয়ায়। আবার কবি খ-সংখ্যক কবিতায় ব্যাকরণ নয়, পাখিদের সহজাত আর প্রাকৃতিক সুর-সংগীতকে বেছে নিচ্ছেন। যেখানে তত্ত্বের চেয়ে আধিভৌতিক আর জৈববস্তুক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। এই বস্তুক বিষয়ের প্রকৃতিস্থ বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছে। শেষ কবিতা, গ-সংখ্যক কবিতায় তিনি নিজস্ব পরিমণ্ডলে নির্মিত পদার্থগত বস্তুর মাধ্যমে বহিরাগত সভ্যতা-প্রযুক্তিনির্ভর পদার্থগত বস্তুকে খারিজ করতে চেয়েছেন। যদিও এই প্রক্রিয়ায় তিনি মাঝে-মাঝেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করছেন। বলছেন, ‘মাটির কলস আর মাটির সরা ভুলে গেল সে’; কিংবা ‘তার নদীসংলগ্ন জীবন হলো লৌহশাসিত।’ যান্ত্রিকতা কিংবা পশ্চিমের সভ্যতার বিপরীতে বয়ান দাঁড় করাতে হলে প্রতিরোধ-প্রকল্পও তো দরকার। এক্ষেত্রে মহাদেব সাহা যে-সমস্ত সাধনী গ্রহণ করেছেন, তা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আবহাওয়া, জলবায়ু, ভ‚গোল, নিসর্গকে ঘিরে আবর্তিত। পূর্বে তার আলোচনা হয়েছে এবং এই বিষয় অবশ্যই বাংলাদেশ সমাবেশিত।
ছয়
প্রেম – বাংলা কবিতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় – প্রভাবশালী শাসনকর্তারূপে প্রাচীন, মধ্যযুগ আর আধুনিক যুগ – এই তিন যুগকে শাসন করে যাচ্ছে। মহাদেব সাহা বাংলা ভাষার কবি। তিনিও তাঁর পূর্বসূরিদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে পারেননি। তাঁর কবিতার একটি বড় অংশ প্রেমবিষয়ক। তিনি প্রেম নিয়ে অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। যে-কোনো পাঠক তাঁকে নির্দ্বিধায় প্রেমের কবি বললে বিশেষ বাড়িয়ে বলা হবে না।
দৈনন্দিন জীবনের নানারূপ বিষয়-আশয় তাঁর প্রেমের কবিতার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। প্রেম হয়েছে তাঁর চাক্ষুষ পরিপার্শ্বের বাস্তবতা প্রকাশের পরিবাহী। প্রেম পরিবহন করেছে একইসঙ্গে প্রেম ও পরিপার্শ্বের বাস্তবতা। প্রেমিকাকে কল্পনা করতে গিয়ে মহাদেব সাহা নিয়ে এসেছেন নিজ স্বদেশের প্রকৃতি, নিসর্গ আর শ্যামলিমার বিবরণ। তিনি প্রেম বা প্রেম-সম্পর্ককে কেবল প্রথাগত-প্রচলিত নারী-পুরুষের সম্পর্ক তৈরি আর সেই সম্পর্কের ভেতরেই অবরুদ্ধ করেননি। প্রেমিকা হয়ে উঠেছে পূর্ব বাংলার শ্যামলিমার বর্ণনার মাধ্যম। তাঁর মতে, ‘তার বুকে আছে স্বর্ণচাঁপার গাছ, আকাশের মতো বড়ো নীল পোস্টাপিস’ – এই কবিতাংশে প্রেমিকার বর্ণনায় তিনি নিয়ে এলেন স্বর্ণচাঁপা গাছের বর্ণনা, আর বাংলাদেশের ভূগোলের বাস্তবতায় আকাশের সঙ্গে তুলনা করলেন পোস্টাপিসকে। কালিদাস তাঁর মেঘদূত কাব্যে ভারতের ভ‚দৃশ্যের যে-বর্ণনা দিয়েছেন, যেন ঠিক তেমন করে বর্ণনা দিলেন মহাদেব সাহা। প্রকৃতির বর্ণনায় তিনি বারবার নিজের দুর্বলতার কথাও জানান দিয়েছেন। তিনি বলছেন, ‘তার বুকে আছে/ অরণ্যের চিত্রকলা, গোপন স্টুডিও।’
কেবলই যে প্রকৃতি, নিসর্গ কিংবা শ্যামলিমার ভেতরে তিনি প্রেমকে গচ্ছিত রেখেছেন, বিষয়টি এমন নয়। তিনি একইসঙ্গে নাগরিক জীবনের যে-ধূসর প্রান্তসীমা আছে, তাও প্রকাশ করেছেন প্রেমের ভেতর দিয়ে। শহুরে বিষয় তিনি নাকচ করতে চেয়েছেন বরাবরই। তিনি গ্রহণ করতে পারেননি নাগরিকতা এবং নগরপ্রসূত নাগরিক যুগযন্ত্রণা। কিন্তু এই যুগযন্ত্রণা থেকে তিনি কি বের হতে পেরেছেন? অবশ্যই তিনি তা থেকে বের হতে পারেননি। তিনি বের হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বের হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি তাই কেবল রোমান্টিক কিংবা আবেগ-অনুভ‚তিনির্ভর প্রেমের জগতের ভেতরেই আবদ্ধ থাকতে পারেননি। তাই তিনি সাময়িক হলেও মুখ ফিরিয়েছেন তাঁর ফেলে আসা গ্রামীণ সমাজের পটভ‚মিতে নির্মিত হতে পারে এমন প্রেমের জগৎ থেকে। যে-জগৎ অধরা। কিন্তু বাস্তবে ছিল। অথবা এখনো কোথাও কোথাও আছে। কিন্তু কবির বাস্তবতায় এই বিষয়টি এখন আর বাস্তব হতে পারে না। তাই তাঁকে ফিরে আসতে হয় নগরে। তিনি ফিরে আসেনও।
তিনি বলছেন, ‘শহরে এখন এতো এতো বাস, ছোটো বড়ো গাড়ি/ যানবহনের ভিড়ে চলা দায়/ তবু নেই জায়গা কোথাও, সব বাস ভর্তি লোক/ স্টপজে এলেই ড্রাইভার হাত নাড়ে/ যেন তার হাত সিনেমা হলের/ সামনে হাউসফুল টাঙানো পোস্টার’ – এই কবিতায় যে-নারীর প্রতি মহাদেব সাহা প্রেমের রূপকল্প দাঁড় করিয়েছেন, সেই নারীর প্রেমের বাস্তবতা আর কবির নিজের অবস্থা দুভাবে বর্ণিত হয়েছে। কারো হাত ধরতে চাওয়া মানুষ
যে-নারীর দিকে হাত বাড়ালো সে-নারীর হাত নগরের সিনেমা হলের সামনে টাঙানো ‘হাউসফুল’ লেখা পোস্টারের মতো। এই যে শব্দ তিনি ব্যবহার করলেন, এ-শব্দ বেশ পরিচিত পাঠকের কাছে। কিন্তু এর মর্মার্থ ভয়াবহ। নিঃসঙ্গতার নিরিখে নির্মিত।
আবার নারীকে শ্যামলিমার সঙ্গে তুলনা করছেন, বলছেন, ‘তোমার মতো কোনো গাছ নেই/ সীতা, তুমি গাছ, জীবনের পরিপূর্ণ তরু/ অরণ্যে, প্রকৃতিতে দাঁড়ালেই বুঝি/ সীতা, তোমার মতন কোনো গাছ নেই/ এমন সম্পূর্ণ, মানবিক।’ এই কয় চরণ আমাদের ভাবনার জগতে নিয়ে যায়। যেখানে আধুনিক প্রেম হয় কপট, স্বেচ্ছাচারী, ক্ষণবাদী; সম্পর্কের নেই কোনো স্থায়িত্ব : সেখানে মহাদেব সাহা ‘সীতা’র বর্ণনায় সীতাকে ‘মানবিক’ বৃক্ষ হিসেবে তুলনা করেছেন এবং আশ্রয় হিসেবে নিয়ে এসেছেন। পুরাণেও সীতার প্রেম ক্ল্যাসিক প্রেমের দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এই কবিতা পড়তে গিয়ে আমাদের অবশ্য জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার কথা মনে পড়বে। যে-কবি ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সময়ের বিপরীতে বনলতা সেনকে নিজের সামনে নিয়ে আসেন। বসেন মুখোমুখি। কথা বলেন এবং তাঁকে যে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিল, এমন কথাও বলেন। সেই কথা বলার আরেক রকম, অর্থাৎ নতুন ধরন মহাদেব সাহার এই কবিতায় অবিমিশ্র। তাঁর এই ধারণাগত প্রকল্পে প্রকৃতি যেন মাতৃদায়িনী, আবার প্রকৃতি নারীর রূপকল্পে এসেও হাজির হয়েছে। এক দারুণ সমন্বয়।
আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রেমের ব্যাপারে মহাদেব সাহা বিষাদকেই মহিমান্বিত করেছেন। পুরো বাংলা সাহিত্যে প্রেম ব্যাপারটা আসলে বিশেষ হয়ে উঠেছে বিষাদ আর না-পাওয়ার ভেতর দিয়ে। প্রাপ্তিযোগে, অর্থাৎ মিলনে যে প্রেমের মৃত্যু হয় – এমন কথা প্রবাদপ্রতিম হয়ে প্রচলিত আছে বাংলা অঞ্চলে। বাংলা সাহিত্যে প্রেমবিষয়ক ক্ল্যাসিকগুলোতেও এই বিষয়ই সত্য হয়েছে সর্বদা। অর্থাৎ আজীবন কেউ কেউ ‘ইন দ্য সার্চ অফ লাভের’ পেছনে দৌড়ে গেল; কিন্তু হয়তোবা সেই প্রেমের দেখা আর মিলল না। আধুনিক মানুষের জন্য এও এক নিদারুণ ট্র্যাজেডি হিসেবে কাজ করেছে। এই ট্র্যাজেডি আধুনিক মানুষকে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়। বয়ে নিয়ে বেড়ানো ব্যতীত তার আর কিছুই করার থাকে না। কিন্তু এ থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষাও যে-কারো থাকতে পারে। কিন্তু শেষাবধি ব্যক্তি কি এই পাপ-অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে পারে? আমার উত্তর নয়, মহাদেব সাহা নিজেই সেই উত্তর দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, ‘আজীবন শুধু হাঁটছি আমি’; কিন্তু ‘কোনো বাস নেয় না আমাকে’। এ যেন নিয়তির নির্মম পরিহাস। এ থেকে কি মুক্তি আছে? হ্যাঁ, থাকতে পারে। কিন্তু তাতে আবার মানুষের আগ্রহ আছে কি না, সেটাও দেখা জরুরি। কারণ বিষাদই বাঁচিয়ে রাখে প্রেমকে, শেষ পর্যন্ত।
অভিমানবোধের মাধ্যমে নির্মিত রোমান্টিক প্রেম-আবেদন সৃষ্টি প্রক্রিয়াও তাঁর প্রেমের কবিতার গুরুত্বপূর্ণ এক বৈশিষ্ট্য। তিনি বলছেন এইভাবে, ‘সব মানুষের মধ্যে কিছু অভিমান তাকে,/ এইটুকু থাক, এইটুকু থাকা ভালো’ আর আকাক্সক্ষী প্রেম আবেদন-নিবেদনের বিষয় তাঁর প্রেমের কবিতার ধারণাগত কাঠামোকে দিয়েছে অন্যরকম অবস্থান। তাঁর এমন এক পথচিহ্ন সংবলিত কবিতা হিসেবে বিবেচিত হবে ‘চিঠি দিও’। এই কবিতা দিয়েই বোধহয় তাঁর সর্বাধিক পরিচিতির বিষয়টিও নির্মিত হয়েছে। তিনি যশস্বী হয়েছেন এই কবিতার মাধ্যমে। যদিও সাহিত্যে জনপ্রিয়তার মূল্য কী – সেই বিষয়ে রয়েছে নানা মুনির নানা মত। তবে জনপ্রিয়তাও বোধহয় একজন কবিকে বৈশিষ্ট্যগত আর নিজ বাসভ‚মের অবস্থানে নতুন করে চিনতে সাহায্য করে। তিনি ‘চিঠি দিও’ শীর্ষক কবিতায় বলছেন, ‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও/ আঙুলের মিহিন সেলাই/ ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,/ এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো/ অক্ষরের
পাড়-বোনা একখানি চিঠি।’ এই কবিতায় প্রকাশিত প্রেমের আবেগ, অনুভূতি আর আমেজ মহাদেব সাহার অন্যান্য প্রেমের কবিতার মধ্যেও যেন সমানভাবে সিঞ্চিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি যেসব প্রেমের কবিতা রচনা করেছেন, সেই কবিতাসমূহে বিধৃত প্রেমের স্বরূপ কী? তিনি কি কেবল প্রেমকে নারী-পুরুষের সম্পর্কের বিবেচনায় দেখেছেন? না। তিনি তাঁর চারপাশে বসবাসরত মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেছেন। বলেছেন আরো বিশেষ কিছু। তিনি আজীবন যে-প্রেমকে কেবল নারী-পুরুষের দ্বান্দ্বিক অনুষঙ্গে দেখেছেন বিষয়টি এমন নয়। তিনি মানবিক প্রেমের বিষয়ও তাঁর কাব্যের একটি অনুষঙ্গ হিসেবে নিয়ে এসেছেন। অর্থাৎ, মহাদেব সাহার কবিতায় প্রেম বহুমাত্রিকতায় একটি সংশ্লেষিত পদ্ধতিতে ছাঁকনির ভেতর দিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে।
সাত
তিনি তাঁর কবিতায় তাঁর চারপাশে ঘটে যাওয়া দৈশিক ও বৈদেশিক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়াদি উপস্থাপন করেছেন। তাঁর কবিতায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রসঙ্গ যেমন হাজির থেকেছে, তেমনি করে বৈদেশিক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়াদিও হাজির থেকেছে। তিনি তা উপস্থাপন করেছেন বিভিন্ন রূপকল্পে। কবিতার উৎস-সন্ধানে ব্যাপৃত হয়েছেন এই বিষয়সমূহ উপস্থাপনের ভেতর দিয়ে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের হয়ে ওঠার যে দীর্ঘ রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক পরিক্রমা, সেই রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক পরিক্রমার ভেতরে মহাদেব সাহা নিজে উপস্থিত ছিলেন; একইসঙ্গে এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। এজন্য বলতে হয়, তিনি কেবল রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক দলিল ঘেঁটে তাঁর রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক বিষয়সমৃদ্ধ কবিতা রচনা করেছেন, এমন নয়। ষাটের দশকের কবি হিসেবে তিনি ষাটের দশকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র নির্মাণের নানা ঘটনাকে তাঁর কবিতায় স্থাপন করেছেন দর্শকের ভূমিকায় থেকে; কখনো কখনো কমীর্র মতো করে। তিনি ‘রবীন্দ্রোত্তর আমরা কজন যুবা’ কবিতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটি বড় পরিপ্রেক্ষিত-ভ‚মিকা তৈরি করে দিয়েছেন। আধুনিক কবিতা যেহেতু রাষ্ট্রের কোনো উপযোগবাদী ধারা ও ধারণাকে ধারণ করে না, কেবলই শিল্পের জন্য লড়ে যায় শেষ পর্যন্ত। সেই ধারণার ভেতরে আলাপ করতে হয় যে, অন্য কবিরা যেখানে ষাটের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নিজেদের একেবারেই তাঁদের শিল্প-আদর্শ থেকে সরে এসে সঁপে দিয়েছিলেন, মহাদেব সাহা তা বৃহৎ আকারে করেননি। তিনি মৃদুমন্দ ধারায় এই বিষয়ে কবিতা রচনা করেছেন। তিনি বলছেন : ‘যেন ধীরে ধীরে বেঁচে উঠি/ তখন মনে হয় এমনি করেই বুঝি এদেশে/ বিপ্লব আসে, একুশে ফেব্রæয়ারি আসে, নববর্ষ আসে।’
স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে তাঁর লেখার পরিমাণ বেশি নয়। অন্যরা যখন সব ছেড়ে দিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মেতে উঠেছেন, মহাদেব সাহা তখন মেতে উঠেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় নিয়ে। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত বলছেন, ‘আমার ক্রোধেরা তাই জন্ম দেয় এক-একটা/ বিখ্যাত আগুন, রক্তাক্ত পতাকা আমি কাঁধে নিয়ে/ ফিরে আসি আহত পাড়ায় …।’ এই বোধহয় সংহত রাজনৈতিক ভাব প্রকাশের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি। যে-পদ্ধতিতে বেশি না বলেও বেশি বলা সম্ভব হয়ে গেল। অর্থাৎ মহাদেব সাহা বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পূর্বে কবিতায় রাজনৈতিক বিষয় চাপানোর বেলায় যতটা না আগ্রহী ছিলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যেন আরো বেশি করে তিনি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে পড়লেন। বিশেষ করে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চারদিকের যে পরিস্থিতি তিনি দেখছিলেন, সেই সমস্ত বিষয় নিয়েও তিনি লিখেছেন। বিশেষ করে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য পুনরায় যে
গণ-আন্দোলন হলো, তা কোনো কবির চেয়ে কি কম এসেছে মহাদেব সাহার কবিতায়? না। কিন্তু তিনি তা এনেছেন একটু ভিন্ন পদ্ধতিতে এবং তাঁর কাব্যযাত্রার শেষাবধি পর্যন্ত জারি রাখায় সচেষ্ট ছিলেন, আছেন।
কিন্তু তিনি শেষে যেমন বলেছেন, তেমনি করে পূর্বেও বলেছেন। স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি কেবল নিজের রাষ্ট্রের ভেতরে থেকেই আলাপ-আলোচনায় স্থির থাকেননি। তিনি স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনায় বৈদেশিক প্রসঙ্গও টেনে এনেছেন। একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে বাংলাদেশে যে স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, সেই আন্দোলন কেবল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গেই সম্পৃক্ত থাকবে, তা সর্বাবস্থায় সত্য নয়। তিনি তা বুঝেছিলেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্মাণের ক্ষেত্রে বিদেশি শক্তি কীভাবে কাজ করেছিল, সেই বিষয় আমাদের অজানা নয়। বিশ্ব যে দুটি শিবিরে ভাগ হয়ে পড়েছিল, সেই কথাও অজানা নয় এখন কারো কাছে এবং এই বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের ভেতরে বিদ্যমান ‘স্টেট অ্যাপারেটাসগুলো’ কীভাবে জনগণের স্বাধীনতাকে নানাভাবে অবরুদ্ধ করেছিল, এবং এই অবরুদ্ধতার ফলে স্বাধীনতার বিষয়টি কেমন পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়, তাও তিনি জানিয়েছেন। উদাহরণ : ক. ‘মানুষ বুঝি বড়ো বেশি কিছুই পারে না/ কেবল আইনের হাত ধরে কিছুটা রাস্তা হাঁটা ছাড়া’; খ. ‘অথচ এখন কোনো রাজা নেই, রাজ্য নেই/ কেবল আছে রাজ্যশাসন’; গ. ‘তার চেয়ে আমাদের ফিরে দাও রাজবংশ, রাজকীয়/ অলীক বিশ্বাস/ রাজকুমার তোমার রক্তে জন্ম নিক/ জান্তব যৌবন, যুদ্ধ করে মরি।’ পূর্বে আলোচিত বিষয় প্রকাশের বেলায় এই তিনটি উদাহরণই যথেষ্ট বলে মনে করছি।
বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। এই দুর্যোগের ঘনঘটা যেমন এই রাষ্ট্রকে বারবার বিপর্যস্ত করেছে তেমনি রাষ্ট্রের ভেতরে বসবাসরত জনগণের সমাজকেও নানাভাবে আলোড়িত করেছে। এই দুর্যোগের নানা রকমফের আছে। এর ভেতরে একটি বিশেষ অবস্থা হলো বন্যা-পরিস্থিতি। বন্যার বিষয়টি বঙ্গীয় বদ্বীপের একটি বৃহৎ সমস্যা হিসেবেই পরিগণিত। মহাদেব সাহা এই বিষয়ও তাঁর কবিতায় উপস্থাপন করেছেন। এই দুর্যোগের বিষয় কেবল দুর্যোগের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই বিষয়টি একটি দেশকেও চিহ্নিত করার পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই বিষয় কবিতায় যখন তিনি উপস্থাপন করছেন, বলছেন কাউকে, তখন তিনি বলছেন এমন এক অঞ্চলে বসবাসরত মানুষকে, যে-মানুষ এই বন্যার বাস্তবতা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা থেকে বেশ দূরে অবস্থান করছে। কবি বলছেন, ‘তাই আমি যখন ঢাকার রাজপথে/ বন্যাত্রাণ মিছিলের পাশাপাশি/ তুমি তখন কলকাতার রাস্তায়।’
অথচ বিপ্লবী চিন্তার বিপরীতে এমনসব কবিতা মহাদেব সাহা রচনা করেছেন, যে-কবিতসমূহে বিপ্লব-আকাঙ্ক্ষার চেয়ে বিপ্লবী চিন্তার বিপরীতে নেতিবাচক চিন্তা-ধারণাই বেশি করে উপস্থাপিত হয়েছে। আধুনিক মানুষের
বিপ্লব-বিদ্রোহ সম্পর্কে আধুনিক চিন্তা-দর্শন প্রকাশই এই সমস্ত কবিতার মূল বিষয়। একটি কবিতায় তিনি বলছেন, ‘কতো নতজানু হবো, দাঁতে ছোঁবো মাটি’ – পূর্বোক্ত বিষয় উপস্থাপনের বেলায় ভালো উদহারণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে এই কবিতা। কবি আবার বলছেন, ‘আজীবন সেজদার ভঙ্গিতে কতো আর নোয়াবো শরীর?’ – এই উদ্ধৃতির ভেতরে একটি জিজ্ঞাসা-চিহ্ন রয়ে গেছে। আছে নতজানু হওয়ার সামষ্টিক ইতিহাস-বিষয়, যা এই জাতির এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মহাদেব সাহা যতই বিপ্লব-বিদ্রোহের বাণী তাঁর কবিতায় প্রচার করুন না কেন, এই সত্যকেও তিনি বাতিল বা খারিজ করার সাহস দেখাননি এবং নিজের ব্যাপারেও মহাদেব সাহা একই মন্তব্য করেছেন। তিনি কবিতার একটি অংশে বলছেন, ‘বুকভাঙা বাঁকানো কোমর আমি নতজানু লোক/ কতো আর নতজানু হবো কতো দাঁতে ছোঁবো মাটি!’ – এই উক্তি কবির নিজের প্রতি নিজের। মানে উক্তিটি ব্যক্তিক। কিন্তু এরকম অনেক ব্যক্তি মিলেই তো তৈরি হয় সমাজ, রাষ্ট্র। ফলে এই আলাপকে এত ঠুনকো হিসেবে দেখা যায় না।
মানুষকে তিনি বিপ্লবের সারথি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। বিপ্লব-বিদ্রোহের কবিতা লেখার বেলায় এই মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। সেই মানুষকেই তিনি আধুনিক চোখে নিকৃষ্ট আর হিংস্র হিসেবে বিবেচনা করেছেন। সমাজে যখন একজন মানুষ নিকৃষ্ট আর হিংস্র হয়ে ওঠে, ঠিক বিপরীতে এর প্রভাবে কিছু মানুষ হয়ে পড়ে হতাশায় নিমজ্জিত আর অসহায়। মানুষের জন্যই ভুগতে হয় মানুষকে। মানুষের হাতের পিস্টনের চাপেই উড়ে যায় মানুষের মাথার খুলি। কবির ভাষায়, ‘এই মানুষকে কখনো দেখেছি কতো স্বেচ্ছাচারী/ কখনো দাম্ভিক তাকে/ হিংসাপরায়ণ আরো বহুবার/ কখনো সে নির্মম ঘাতক!’ আবার এর বিপরীতে অপর মানুষের যে আলাপ আমি পূর্বে করেছি, সে-প্রসঙ্গে বলছেন, ‘এতো অসহায় হয়েছে দেখিনি/ এতো ভাবান্তর শুধু তার, এমন কাতর শুধু ভগবান,/ তোমরা মানুষ!’ – কবিতার শেষের বিস্ময়সূচক যতিচিহ্ন কেবল কবির যতিচিহ্ন নয়, এই বিস্ময়বোধক যতিচিহ্ন-বিষয়টি বোধহয় এই সমাজের এমন ‘অসহায়’ সব মানুষের যতিচিহ্ন।
দৈশিক প্রেক্ষাপটে মানুষের গণআন্দোলনকে তিনি কেবল দৈশিক সীমানায় সীমাবদ্ধ করেননি। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা-আদর্শ প্রচারের বেলায় যে-সমস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়ে এসেছেন তাঁর কবিতায়, এঁদের মধ্যে অন্যতম চে গুয়েভারা। লাতিন আমেরিকায় সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণের বিপরীতে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলার ব্যাপারে চে গুয়েভারার একটি বৃহৎ অবদান আছে; বলতে হয় তাঁর নেতৃত্বেই বিষয়টি সম্পাদিত হয়েছিল। তিনি চে গুয়েভারা প্রসঙ্গে কবিতায় বলছেন, ‘চে, যখন দেখি তোমার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে শত শত/ বিপ্লবীর জন্ম হয়।’ আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলে লেনিনের মূর্তি ভেঙে ফেলা হয়। ব্যাপারটি মহাদেব সাহার কাছে ঠিকঠাক ঠেকেনি। পৃথিবীতে সমাজ বিকাশের ধারায় যাঁদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন লেনিন এবং তাঁর নেতৃত্বেই সর্বপ্রথম কার্ল মার্কসের ‘ইউটোপিয়ান সাম্যবাদী’ ধারণা কোনো রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে বাস্তবে রূপলাভ করে এবং সমগ্র বিশ্বে তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কিন্তু সেই ইতিহাস ভুলে লেনিনের মূর্তি ভাঙার ব্যাপারে মহাদেব সাহা বলছেন, ‘এই মূঢ় মানুষেরা জানে না কিছুই, জানে না কখন তারা/ কাকে ভালোবাসে, কাকে করে প্রত্যাখ্যান,/ না বুঝেই কাকে বা পরায় মালা,/ কাকে ছুঁড়ে ফেলে।’ আবার পুঁজিবাদী আর্থ-উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পর্কেও তাঁর সমালোচনা ছিল। তিনি কবিতায় বলছেন, ‘এই টাকা ঘুমের মধ্যে দেবদূতেরা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে যান।’
আট
কবিতা কী এবং কীভাবে কবিতা সৃষ্টি হয়? কবি কীভাবে কবিতা সৃষ্টি করেন? – কবি ও কবিতা সম্পর্কে এই রকম অনেক প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজের রচিত বেশ কিছু কবিতার মাধ্যমে দিয়েছেন। কবিরা যে নিজের অন্তর্গত দহনের মাধ্যমে কবিতার জন্ম দেন, এমন কথাই তিনি উদাহরণের প্রথম কবিতায় বলেছেন এবং কবির পরিচয় কী হবে সে-প্রশ্নে তিনি বলছেন, কবি হবেন ‘সকাম সন্ন্যাসী’ আর ‘অসংলগ্ন গৃহস্থ মানুষ’। আবার প্রেম-স্মৃতির বিপরীতে যে কবিতা তৈরি হয়, এই ব্যাপারটি সবিস্তার আলোচনা করেছেন দ্বিতীয় কবিতায়। শেষ কবিতা ‘শব্দ’-এ তিনি কবিতার প্রাণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন শব্দকে। উদহারণ :
ক. আমরা জন্মাই মরে যাই আত্মীয় আত্মজ কিছু নাই/ গোলাপের বংশে জন্ম আমাদের, আমরা কবি, আমরা/ সকাম সন্ন্যাসী, আমরা অসংলগ্ন গৃহস্থ মানুষ (‘গোলাপের বংশে জন্ম’)
খ. কেমন আছো আমার ফেলে আসা কবিতা তুমি কেমন আছো, কেমন/ আছো তোমরা সুখ দুঃখ, তোমরা তোমরা? (‘তোমরা কেমন আছো’)
গ. শব্দ আমার ভালোবাসার পাত্র/ মাত্র তাকে দিয়েছি এই শান্তি কোমল শান্তি (‘শব্দ’)
নয়
কবিতার আলোচনা এখানে সমাপ্ত রাখতে চাই। ইচ্ছে করলে আরো একটু বাড়ানো যেত। মহাদেব সাহার সমগ্র কাব্যপাঠের পর প্রথম যে অভিজ্ঞতা-বিষয় উপস্থিত হয়, তা হলো, তাঁর কবিতা বিবৃতির প্রাধান্যে ভারাক্রান্ত। তিনি কেবল যেন বলে যান। কবিতার ব্যঞ্জনা আর কাঠিন্যের বিপরীতে তাঁর কবিতা ক্রমশই যেন একটি স্পষ্ট ভূগোল নির্মাণে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। এমনকি ষাটের কবিদের কবিতা যতটুকু বিমূর্ততা ধারণ করেছে, তাঁর কবিতা প্রথম থেকেই এর বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করেছে। ষাটের কবিদের কবিতা দুই ভাগে ভাগ করে পড়া যায় – প্রথম ভাগে বিমূর্ততায় মোড়া কবিতা, আর দ্বিতীয় ভাগে স্বদেশের নানারূপ বিষয়-আশয় – এই বিষয় তিনি মেনে চলেননি। বরঞ্চ তাঁর বেলায় এই আলাপটি একটু ভিন্নভাবে করতে হয়। অর্থাৎ তাঁর কবিতা ষাটের পরপরই
সত্তর-আশির কবি ও কবিতার বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশদ আকারেই ধারণ করেছে। স্লোগান আর রাজনীতিসচেতনতার বিষয় এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য হবে। কিন্তু তার প্রকাশের পদ্ধতি মহাদেব সাহার নিজস্বতায় মোড়া।
শেষ কথা। মহাদেব সাহার কবিতা বিচিত্র অনুষঙ্গে পাঠ করা সম্ভব; পাঠ করতেও হবে এই বিচিত্র অনুষঙ্গ আর বৈচিত্র্যের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে হলেও। এত বেশি তিনি কবিতা লিখেছেন, সেই তুলনা পূর্বে আমি করেছি শামসুর রাহমানের সঙ্গে। ফলে একপাক্ষিক প্রবণতা দিয়ে আবুল হাসান (১৯৪৭-৭৫) কিংবা শহীদ কাদরীকে (১৯৪২-২০১৬) যেভাবে পড়ে ফেলা সম্ভব, সেভাবে মহাদেব সাহার কবিতা পড়া সম্ভব নয়। তাঁর কবিতা পড়তে হলে আমাদের নন্দনতাত্তি¡ক ও ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নে সজাগ থাকতে হবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র কিংবা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভেতর যে-সমস্ত কবি সুপ্রাচীনকাল থেকে কবিতা লিখে চলেছেন, তাঁদের হিসাবটাও মহাদেব সাহার কবিতা পড়ার বেলায় সক্রিয় রাখা জরুরি বিষয় হবে। না হলে ভুল পাঠের শিকার হবেন তিনি। ৎ
মহাদেব সাহা
কবিতা, গীতিকার ও সাংবাদিক। জন্ম ১৯৪৪ সালের ৫ই আগস্ট সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া গ্রামে। বাবা গদাধর সাহা, মা বিরাজমোহিনী সাহা। ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা বিষয়ে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু। দৈনিক ইত্তেফাক শেষ কর্মস্থল। সম্মাননা : স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ইত্যাদি। উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা – কবিতা : এই গৃহ এই সন্ন্যাস, মানব এসেছি কাছে, ধুলোমাটির মানুষ, ফুল কই, শুধু অস্ত্রের উল্লাস, মানুষ বড়ো ক্রন্দন জানে না, যদুবংশ ধ্বংসের আগে, সুন্দরের হাতে আজ হাতকড়া, গোলাপের বিরুদ্ধে হুলিয়া, বহুদিন ভালোবাসাহীন, সোনালি ডানার মেঘ, কালো মেঘের ওপারে পূর্ণিমা, মহাদেব সাহার রাজনৈতিক কবিতা; প্রবন্ধ : গরিমাহীন গদ্য, আনন্দের মৃত্যু নেই, মহাদেব সাহার কলাম; শিশুসাহিত্য : টাপুর টুপুর মেঘের দুপুর, ছবি আঁকা পাখির পাখা, আকাশে ওড়া মাটির ঘোড়া, মহাদেব সাহার কিশোর কবিতা (সংকলন) ইত্যাদি।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.