আলোকশিখা হয়ে ওঠা একজন সন্‌জীদা খাতুন

বিভূতিভূষণের ‘কিন্নর দল’ গল্পটি আমরা অনেকেই পড়েছি। গ্রামের সবচাইতে সচ্ছল পরিবারের বড় ছেলে শ্রীপতি বৌ নিয়ে আসেন কলকাতা শহর থেকে। সে-বৌ এসে পড়েন এক জীর্ণ গ্রামে, যেখানে লোকে খেতে পায় না। অভাবে পড়ে যা হয় আর কি, কারো সামান্য উন্নতিও যেন সহজে অন্যের সহ্য হয় না। গ্রামের বৃদ্ধা, বৌ, মেয়ে একে অপরকে হিংসা করে আর একসঙ্গে বসে একে অপরের নামে কুৎসা রটিয়ে, নানা কুসংস্কার ছড়িয়ে দিনযাপন করে। এমন সময় গ্রামে আলোকবর্তিকা হাতে প্রবেশ করেন শ্রীপতির বৌ। এই বৌটিকে প্রথমে গাঁয়ের লোক বাঁকা চোখে দেখলেও পরে ভালোবেসে ফেলে। কেন? কারণ, বৌটি গাঁয়ের লোকের দুঃখ-দুর্দশা ঘুচিয়েছেন অনেকটাই। অভাবীর মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন, গাঁয়ের নিঃসন্তান বিধবার আশ্রয় হয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় কাজ করেছেন গাঁয়ের লোকের মধ্যে সংস্কৃতির বিনিময় ঘটিয়ে। গাঁয়ের মেয়ে-বৌদের গান শিখিয়েছেন। শহরে যাদের সঙ্গে কাজ করেছেন তাদের ডেকে এনে এই অজপাড়াগাঁয়ের মানুষের মধ্যে একরকম শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা চালিয়েছেন। পরে দেখা গেল, গাঁয়ের কেউ কাউকে আর তেমন হিংসা করে না। কেউ সেলাই কাজে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন, কেউ রন্ধনশৈলীর কাজে, কেউ যাত্রাপালার প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।  আপাতত গল্প এটুকুই।

‘কিন্নর দল’ গল্প অবলম্বনে তরুণ মজুমদারের আলো চলচ্চিত্রটিও আমরা দেখেছি অনেকে।

কেন বিভূতিভূষণের ‘কিন্নর দল’ গল্পটি দিয়ে শুরু করলাম? যাঁকে নিয়ে আসলে লিখতে বসেছি, তাঁকে নিয়ে লেখার জন্য গল্পটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক মনে করছি। বিভূতিভূষণ সেই কোনকালে শ্রীপতির বৌয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর মতো এক স্বপ্নদ্রষ্টাকে নির্মাণ করে গেছেন! আমি বলছি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী, কৃতী শিক্ষিকা, ‘ছায়ানট’-এর প্রতিষ্ঠাতাদের একজন, আমাদের পরম শ্রদ্ধার মানুষ সন্ জীদা খাতুনের কথা।

প্রথমেই তাঁর লেখা ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ – তিন আমলে’ প্রবন্ধ থেকে একটি ছোট্ট ঘটনা উল্লেখ করতে চাই, তাহলে বিভ‚তিভ‚ষণের এই ছোটগল্প দিয়ে শুরু করার হেতু আরেকটু স্পষ্ট হবে। ১৯৬৩ সালে ‘ছায়ানট’ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৬৫ সালে সন্ জীদা খাতুনসহ ছায়ানটের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলে বাইশে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবসকে কেন্দ্র করে কবিতীর্থ শিলাইদহে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেন। বেগম সুফিয়া কামাল, কাজী মোতাহার হোসেন, ফিরোজা বারীসহ মোট সত্তরজন নিয়ে  তিনি রওনা হলেন শিলাইদহের পথে। স্টিমারের ডেকে দড়ি বেঁধে ঘেরাও করে নেওয়া হয় একটি জায়গা। মহড়া চলতে থাকে সেই স্টিমারেই। কুষ্টিয়া থেকে বোটে করে শিলাইদহ ঘাটে পৌঁছে ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও’ গাইতে গাইতে কুঠিবাড়ির দিকে যাত্রা করেন তাঁরা। কুঠিবাড়ির আমগাছের নিচে সকালের আসর হলো। বিকেল তিনটে নাগাদ জনস্রোত এসে হাজির। গ্রামীণ মানুষের সামনে তাঁরা গাইতে শুরু করেন। তাতে বাউল অঙ্গের গান, কীর্তনাঙ্গের রবীন্দ্রগান গাওয়া হলো। তবে, বেশিক্ষণ গাইতে দেওয়া হয়নি। পাকিস্তান সরকারের প্রশাসনিক কর্তারা ঠিকমতো সহযোগিতা না করে, অনুষ্ঠান ভঙ্গের আদেশ দেন। গল্পের শ্রীপতির বৌ অবশ্য এহেন কোনো ঝামেলার শিকার হননি। পাকিস্তান সরকারের রক্তচক্ষু সামলে সন্জীদা খাতুনের সংগ্রাম তাই আরো কঠিন মনে হলো প্রবন্ধটি পড়তে পড়তে। যাক, শিলাইদহের কিছু সংস্কৃতিসেবীর সহায়তায় পরে সন্ধ্যার সময় আয়োজন শুরু করেন তাঁরা। মজার বিষয় হলো, গাঁয়ের লোক সেইসব প্রমিত ভঙ্গিমায় আর ভাষায় রবীন্দ্রসংগীত শুনে সে-গানকে প্রথমে উর্দু গান মনে করে। তবু অজানা সুরের মূর্ছনায় সেদিন বাঁধা পড়তে বাধ্য হয় শিলাইদহের গাঁয়ের লোক।

খুব চাইছিলাম একটা সাক্ষাৎকার রেকর্ড করতে। ফোনে যোগাযোগ করেছিলাম। অমায়িক সুরে তাঁর অপারগতার কথা বললেন আমায় – ‘কিন্তু আমি যে টানা পাঁচ মিনিটের বেশি কথা বলার শক্তি রাখি না। শরীরটা একদম ভালো নেই। অনেক বয়স হলো তো।’

তবে এমনি ছেড়ে দেননি; কোথায় কোথায় তাঁর সাক্ষাৎকারগুলো আর্কাইভ করা আছে, কোন বইয়ে কী তথ্য পেতে পারি বলে দিলেন স্নেহভরে। ফোনটা রেখে আরো উপলব্ধি করলাম, কেন তিনি সবার সন্ জীদা আপা! কিছুই হালকাভাবে নেন না। পথ বাতলে দেন। এই জাতিকে বাঙালিয়ানা চর্চার পথটা তিনি শিখিয়েছেন একরকম নিভৃতচারীর মতো।

অনেকেই রমনার বটমূলের সেই গাছটা আমরা অনেকেই ছায়ানটের বর্ষবরণ আয়োজনের সুবাদে দেখেছি। সন্ জীদা খাতুন তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, গাছটি আসলে অশ্বত্থ গাছ। ‘রমনার বটমূল’ একসঙ্গে শুনতে ভালো লাগে বলে বটমূল বলা হয়। ‘দেশ টিভি’র একটি সাক্ষাৎকারে তিনি এর ব্যাখ্যা হিসেবে বলেন, ‘যে গাছের ডাল-পাতা বড় জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থেকে ছায়া দেয়, তাকেই বলে বট, তাই অশ্বত্থমূলকে বটমূল বলায় ভুল নেই।’ মহৎপ্রাণ এই মানুষটির চিরজীবনের কাজ মানুষটিকে সত্যিই এক বটবৃক্ষে পরিণত করেছে, তাতে সন্দেহ নেই। এত বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সেই অশ্বথ গাছের মতো ছায়া দিয়ে চলেছেন নিবিড় মমতায়।

ছেলেবেলায় সন্জীদা খাতুন বাড়িতে যে-পরিবেশটি পেয়েছিলেন, তা ছিল বিদ্যাচর্চার আঁতুড়ঘর। তাঁর বাবা কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। বাড়ির পরিবেশ সন জীদা খাতুনকে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে অনেকটাই। তাঁর বড় বোন বাড়িতে শিক্ষক রেখে গান শিখতেন। সন্ জীদা খাতুনও বসে যেতেন বোনের সঙ্গে গাইতে। বাড়িতে তাঁর দিদিরা নানা ধরনের গান গাইতেন। দিদিকে বারান্দায় মাদুর পেতে বসতে দেখলেই বসে পরতেন সন্ জীদা খাতুন। ‘কলকল ছলছল – এসো হে তৃষ্ণার জল’ গানটি দিদির কণ্ঠে শোনার জন্য বসে থাকতেন। শৈশবে – কান্নাহাসির দোল দোলানো, পৌষফাগুনের পালা, আমি কান পেতে রই, তারপর তাঁর বাবার মুখে শোনা – ‘মম যৌবননিকুঞ্জে গাহে পাখি’, ‘ছিন্ন পাতায় সাজাই তরণী’, ‘যদি বারণ করো, তবে গাহিব না’, ‘আহা জাগি পোহালো বিভাবরী’ শুনে বেড়ে উঠেছেন সন্জীদা খাতুন।

তাঁদের বাড়িতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিশেষ যাতায়াত ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর বাবা কাজী মোতাহার হোসেনের চিঠি আদানপ্রদান হতো। সন্ জীদা খাতুন বলেন, বাড়িতেও প্রাত্যহিক বাক্যালাপে তাঁর বাবা ভাষার সঠিক ব্যবহারের বিষয়ে খুবই স্পর্শকাতর ছিলেন। বাড়িতে সুস্পষ্ট বাংলা ভাষায় কথা বলার চর্চা ছিল। সাহিত্যের চর্চা ছিল। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন সংগীতের অনুরাগী। ছোটবেলায় বাবার অনুপ্রেরণায় নজরুল সংগীতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব সোহরাব হোসেনের কাছে নজরুলের গানের তালিম থেকে শুরু হয় সন্ জীদা খাতুনের সংগীতশিক্ষা। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য পড়ার সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়ে তাঁর মনে হয়, তিনি রবীন্দ্রসংগীত শিখবেন। সাহিত্য পড়াকালে শেষের কবিতা, চিত্রাঙ্গদা, ক্ষণিকা, সোনার তরী, চিত্রা পড়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। অতঃপর একরকম ব্যক্তিগত প্রয়াসেই কলকাতা বেতারের শিল্পী হুসনা বানু খানমের কাছে রবীন্দ্রসংগীত শিখতে যাওয়া শুরু।

কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে, আবার কখনো সেগুনবাগিচার বাড়ি থেকে চলে যেতেন আজিমপুরে। সন্জীদা খাতুনের ভাষ্যমতে, তাঁর বাবার নাকি দুঃখ ছিল তিনি কেন শুধু রবীন্দ্রনাথের গানকে বেছে নেন, অন্য গানও কেন করেন না। তিনি অবশ্য বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে, তাঁর স্মৃতিকথায়, বিভিন্ন লেখায় স্বীকার করেন রবীন্দ্রনাথের বাণী আর সুরের প্রতি তাঁর বিশেষ পক্ষপাতের কথা। তবে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) বিভিন্ন সময়ে নজরুলের গান এবং লোকগানও গেয়েছেন। আসলে তিনি সামগ্রিকভাবে সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করতে চেয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে সন্ জীদা খাতুন বলেন, অঞ্চলভিত্তিক গানকে বলা হয় লোকগান। অর্থাৎ, উচ্চাঙ্গসংগীতের গভীরে গেলে দেখা যাবে, সেটা লোকসুর   থেকে উঠে এসেছে। রাগসংগীত অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে বলে লোকগানের সংজ্ঞার সঙ্গে কিঞ্চিৎ সমার্থক। বলেন, ‘রাগসংগীত হলো আকাশ। আমরা সংগীত নির্মাণ করে যত উপরেই উঠে যাই না কেন, আকাশ পেরুতে পারবো না। তেমনিভাবে, লোকগান হলো মাটি; যত দূরের পথ হাঁটি না কেন, পা তো মাটিতেই রাখতে হবে। আর আমরা গাই কাব্যসংগীত যা একেবারেই একটি মধ্যমনীতি অবলম্বন করে নির্মিত হয় – যেমন রবীন্দ্রসংগীত, নজরলসংগীতসহ আধুনিক, আর যা কিছু আছে, তা কখনো আকাশের রাগসংগীত থেকে, আবার কখনো মাটির লোকসংগীত থেকে নিয়ে নির্মিত হয়। আমরা এর বাইরে যেতে পারি না।’ আমাদের এই বাংলাদেশে বাঙালিয়ানা রক্ষার প্রয়োজন দেখা দেয় ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে। ছায়ানটের নিজস্ব একটি অনুষ্ঠানে ড. সন্ জীদা খাতুনের বক্তব্য ছায়ানটের ইউটিউব চ্যানেলে দেখেছিলাম। শুনেছি, ভাষা-আন্দোলনের সময় নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি কী উপায়ে বিভিন্ন সভায় অংশগ্রহণ করতে যেতেন। ১৯৫২ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারির একটি অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সেদিন আমি প্রথম কোনো সভায় বক্তৃতা রাখি। প্রথম কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করি।’ আসলে শিল্পীরা যে সমাজের কাছে হাজারো দায় নিয়ে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন, ড. সন্ জীদা খাতুনের মতো একজন সংগঠক তার সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত। তাঁর মুখ থেকেই শোনা, সেদিন সভায় ছিলেন তাঁর মা সাজেদা খাতুন, কবি বেগম সুফিয়া কামাল, বেগম দৌলতুন্নেসা, নূরজাহান মুরশিদ প্রমুখ।

ভাষা-আন্দোলনে ছাত্রদের ওপর গুলি চালানোর প্রতিবাদে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, বাংলা ভাষার চর্চা আরো জোরালো হবে যখন শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে সে-ভাষার চর্চা করা হবে। সেই লক্ষ্যে তাঁরা একটি কমিটি গঠন করেন এবং বিভিন্ন আয়োজন করতে থাকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময় থেকে তাঁর রবীন্দ্র সাহিত্য ও সংগীতের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।  তিনি সিদ্ধান্ত নেন, শান্তিনিকেতনে চলে যাবেন, ‘বিশ্বভারতী’তে এম.এ. পড়বেন। বাবা শুরুতে রাজি না হলেও পরে মেয়েকে পাঠাতে বাধ্য হন। সন্ জীদা খাতুন বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লিখে নিজেই উদ্যোগী হয়ে পড়তে চলে যান।

১৯৬১ সাল। সে-বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ। সারাবিশ্বে কবির জন্মশতবর্ষ উদযাপিত হয়। কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে সে-বছরের একুশে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য আরো একটি কমিটি গঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথের গান সে-অনুষ্ঠানে বাদ যায়নি। তাছাড়া চট্টগ্রামে সাহিত্যিক আবুল ফজল,  এম এ বারি, লুৎফুল হায়দার চৌধুরী একত্র হয়ে সে-সময়ে শতবার্ষিকী উদযাপন করেছিলেন। আর একজন বিশেষ মানুষের কথা সন্জীদা খাতুন বিভিন্ন বইয়ে, সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, তিনি বুলবুল ললিতকলা একাডেমির রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষক ভক্তিময় দাশগুপ্ত। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে নিজের যাত্রা করাকে সন্ জীদা খাতুন বরাবর লড়াই হিসেবেই প্রকাশ করেছেন। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রচর্চাকে পাকিস্তান শাসনামলে বস্তুত লড়াই করেই চালিয়ে নিতে হয়। ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘তেপান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারির পর রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের মানুষের সকল সংগ্রামের সাথী। সরকারি রোষের তোয়াক্কা রইলো না আর সংস্কৃতির অনুরাগীদের মনে। ছায়ানট একের পর এক অনুষ্ঠান করতে লাগলো। কিন্তু, বাধা একটি দুটি নয়। সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রতিবন্ধক – বিলাসপ্রবৃত্তি, বিকশিত করবার সরকারি নীতি। এর প্রভাব এতো প্রবল যে, বাঙালি সংস্কৃতির আন্দোলন করেছেন যাঁরা, তাঁরাও সকলে এসব থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেননি।’

পাকিস্তান সরকারের যাবতীয় চোখ রাঙানি এড়িয়ে প্রতিবাদ, গান, বক্তৃতা সব হয়েছিল সেদিনের সে-আয়োজনে। পরবর্তীকালে তাঁরা সকলে মিলে একটি বনভোজনের আয়োজন করেন। সেখানে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, সাংগঠনিকভাবে চলমান শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চাটিকে ধরে রাখবেন। ১৯৬১ সালের শেষ দিকে বিভিন্ন শ্রোতার আসর আয়োজন করা শুরু করেন তাঁরা। নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, উচাঙ্গসংগীত সব ধরনের গান থাকত সেসব আয়োজনে। নজরুলসংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগম, রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ফাহমিদা খাতুন, উচ্চাঙ্গসংগীতের বারীন মজুমদার, ইলা মজুমদার, সেতারশিল্পী খাদেম হোসেন খান প্রমুখের পরিবেশনা থাকতো সেই সব আসরে। একটা সময়ে শিল্পী-সংকট দেখা দেয়। সেই সংকট ঠেকাতে তাঁরা পরিকল্পনা করেন, সংগীতশিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন। নানা অর্থসংকটকে তোয়াক্কা না করে সংগীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হক, মোখলেসুর রহমান, ফরিদা হাসান, মতিউর রহমান, বজলুল করিম, ফরিদা বারীসহ সবাইকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ছায়ানট। সূচনা করেন সংগীতশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নতুন শিল্পী তৈরি করার প্রক্রিয়া। ছায়ানটের নিয়মিত আয়োজনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বাঙালিয়ানার চর্চা সাংগঠনিক রূপ পেতে শুরু করে।

সন্জীদা খাতুন শুধু একজন গায়িকাই ছিলেন না, সাহিত্যের ছাত্রী হওয়ার কারণে কাব্যসংগীতের ভাষার ব্যবচ্ছেদ করে গানের ভেতরে প্রবেশ করতেন। কী করে গানের বাণী, সুর আর ছন্দ এক সুরে গেঁথে আছে, গবেষণা করতেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের পাশাপাশি নজরুলের গান, লালনের গান, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান, অতুলপ্রসাদ সেনের গান, রজনীকান্তের গান, এমনকি শ্রীরামপাঁচালী নিয়ে গভীর গবেষণার মধ্য দিয়ে বাংলা সংগীতের ইতিহাস তুলে ধরেছেন মানুষের কাছে। পাঁচালী কাব্য নিয়ে সন্ জীদা খাতুনের একটি বাড়তি আগ্রহ ছিল। আসলে এসব গান বাংলার নিজস্ব সম্পদ। লোকশিল্প সংগ্রাহক গুরুসদয় দত্তের সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে ইতিহাসের অলিগলি হেঁটে বাংলা গানের একরকম সংগ্রহ করতে চেয়েছিলেন সন্ জীদা খাতুন। তাই মধ্যযুগে পাঁচালী যেমন – বিষহরির পাঁচালী, মঙ্গলচণ্ডীর পাঁচালী, ধর্মমঙ্গল পাঁচালী, আরো কিছু পাঁচালী যেমন – সত্যনারায়ণ, বিদ্যাসুন্দর, ময়নামতি, শীতলামঙ্গল পাঁচালীসহ বাংলার আদি সংগীত নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা করেছেন। আধুনিক বিভিন্ন গান কোথা থেকে এসেছে, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রায়ই এসকল আদি গানের উদাহরণ টানতেন তিনি। তাছাড়া, টপ্পা, ঠুমরি, ব্রহ্মসংগীত, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যজাত কবিগান, বাউল গান কি নিয়ে গবেষণা করেননি। তিনি বেশিরভাগ সময়েই গানের বাণী নিয়ে স্পর্শকাতর ছিলেন। সাহিত্যের অধ্যাপক হওয়ার কারণেই বোধ করি গানের কথা ও দর্শনে মনোনিবেশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের গানে একটু বেশি মনোনিবেশ করেছেন বলে আমরা সাধারণত জানি। তবে বাংলা গানের কোনো শাখাই বাদ পড়েনি সন্ জীদা খাতুনের আগ্রহ থেকে। লালন শাহ, মদন বাউল, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, গগন হরকরা, পাগলা কানাই প্রমুখের গানে খুঁজে পেতেন মহামানব ধর্মের বাণী। এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে আবার ঘুরে আসতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসব গান নিয়ে কী ভাবতেন, তাতে। সবেতেই যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বারা একটু প্রভাবিত হতে চাইতেন সন্ জীদা খাতুন। আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে গোটা পৃথিবীর সংগীত, বিশেষ করে তিনি বাংলা ভাষার গানের স্রষ্টা ছিলেন বলেই, সে-রবীন্দ্রগানের রহস্য খুঁড়তে খুঁড়তে সন্জীদা খাতুন পৌঁছে যেতেন সংগীতের বিবর্তনবাদের দ্বারে দ্বারে।

তাঁর রচিত ‘বাংলা কাব্য ও সঙ্গীতের ধারা’ প্রবন্ধে তিনি এসব বিষয়ের উল্লেখ্য করে লেখেন, ‘The mingling of music and poetry is a notable feature in the earlier stages of evolution in every languages. Poetry and music were born as twins in the womb of nature. The sisters grew up together in the same candle, and had at first, such an exact passed for one goddess, were worshipped in one name and received a joint homage.’

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আবার শান্তিনিকেতন চলে যান পিএইচ.ডি করতে। গবেষণার বিষয় নির্দিষ্ট করেন ‘রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ’। পরবর্তীকালে গবেষণাপত্রটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। এই বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আবু সায়ীদ আইয়ুব, অরুণ ভট্টাচার্য, গৌরীপ্রসন্ন ঘোষ প্রমুখ রবীন্দ্রগবেষকের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে তাঁর। রবীন্দ্রসংগীতের প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব নীলিমা সেন, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, অমিয় কুমার সেন, ধীরেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস, পঙ্কজ মল্লিক, সাবিত্রী কৃষ্ণান্দ প্রমুখ শিল্পীর সান্নিধ্যে সংগীতজীবনকে আরো শানিত করার সুযোগ পান সন্জীদা খাতুন।

এবারে আবার একটু ছায়ানটের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বস্তুত এই কিংবদন্তিপ্রতিম সংগঠক মানুষটির ব্যক্তিজীবন আর কাজ নিয়ে লিখতে গেলে জন্মসাল, বেড়ে ওঠা, কিছু কাজের নমুনা এসবেই আলাপটা সীমাবদ্ধ রাখলে সন্জীদা খাতুনকে চেনা যাবে না। সামান্য গভীরে ঢোকার চেষ্টা করি। সেই যে ১৯৫২ সালের ২২শে ফেব্রæয়ারি তিনি প্রথম অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, তা মাতৃভাষা আর মাতৃভূমির প্রতি আঘাত এসেছিল বলেই। বাঙালিয়ানা রক্ষার জন্য বাংলা ভাষার পাশাপাশি শিল্প ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে সে-সাংস্কৃতিক লড়াইটি সাংগঠনিকভাবেই লড়তে হবে বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। অনলাইন বার্তা সংস্থা বিডিনিউজ২৪-এর একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বাংলার রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের গান বিভিন্ন সময়ে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলো।’

সংস্কৃতির উপাদানকে বাঙালির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েছিল কেন? সাতচল্লিশের দেশভাগের পর থেকে এ-অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ এসেছে বারেবারে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের পর পাকিস্তান সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর। সে-সময়ে শিল্পীদের লাল টিপ পরে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়াও নিষিদ্ধ হয়েছিল। সন্ জীদা খাতুনের লেখা স্মৃতিকথাতে এসব তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিবাদস্বরূপ পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রসংগীতের আয়োজন করা হতো বিভিন্ন স্থানে। ১৯৬৭ সালে বাংলা বছরের প্রথম দিনটিকে বাছাই করে বড় পরিসরে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা চলতে থাকে। রমনার বটমূলে শুরু হয় বাঙালিয়ানা রক্ষার এক  অসাধারণ  আয়োজন। ২০০১ সালের কথা আজো মনে আছে নিশ্চয়ই বাঙালির। সেই বছর বোমা হামলার ঘটনায় বাঙালি জাতিসত্তায় আরো একবার ঝাঁকুনি পড়েছিল। এই ঘটনার প্রভাবে, সন্ জীদা খাতুনের নেতৃত্বে নালন্দা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জাতিকে মুক্ত করতে হলে, চিন্তাশীল হিসেবে তৈরি করতে হলে, সর্বোপরি নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটাতে হলে শিল্পশিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ লেখাপড়ার কারিকুলামে বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর বিকল্প কোনো পথ নেই। এতে বহুমুখী শিক্ষার সঙ্গে শিশুরা পরিচিত হবে। গড়ে উঠবে সংস্কৃতিবান্ধব একটি প্রজন্ম।’  নালন্দা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিশুদের সামগ্রিক বিকাশকেন্দ্র নালন্দা, লক্ষ্য – শিশুর গ্রহণ ও ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তার পরিণতিতে শিশুচিত্তে উদ্ভাবন-মনস্কতা ও বিচার-বোধ উস্কে দেওয়া। সমস্তই সম্ভব যদি শিশুকে আগ্রহী করে তোলা যায়। শিশুর আগ্রহ ছোটে আনন্দের দিকে। নালন্দার অতিক্রান্ত-শৈশব সকল দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষ নিজেরা আনন্দের খনি, শিশুদের অনুক্ষণ আনন্দের উৎস ও সঙ্গী।’

এ-প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘২০০৩ সালে তিনটি শ্রেণি নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি বছর একটি করে শ্রেণি বাড়িয়ে প্রাক-প্রাথমিকের তিনটি শ্রেণি – অঙ্কুর, কিশলয়, মঞ্জরীসহ বর্তমানে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি  থেকে প্রতিষ্ঠিত, আধুনিক এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলির ভালো দিকগুলো পর্যালোচনা করে তা বাঙালি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ দিয়ে জারিত করে পাঠক্রম ও শিক্ষা পদ্ধতি নির্ধারণ করার চেষ্টা হয়েছে নালন্দায়। প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতিনিয়ত এই পদ্ধতি ও পাঠক্রমের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধন করা হচ্ছে।’

দূরদর্শী এই মানুষটি জনমভর লড়াই করে গেলেন বাঙালিয়ানা রক্ষার জন্য। দেশ ১৯৭১ সালে ঠিকই স্বাধীন হলো; কিন্তু তাঁর লড়াই থামলো না। কারণ চারপাশের আগ্রাসী সংস্কৃতির চাপে বাংলা সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখা একটা সংগ্রামে রূপ নিল। পরবর্তীকালে ব্রতচারী আন্দোলনের সূচনাকারী প্রধান ব্যক্তিত্ব, লোকশিল্প সংগ্রাহক গুরুসদয় দত্তের অনুসারী ও তাঁর ছাত্র কামরুল হাসানের সান্নিধ্যে ব্রতচারী আন্দোলনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত হন সন্জীদা খাতুন। ছায়ানটে ব্রতচারীর দীক্ষা তিনি নিয়ে এসেছেন তাঁর সেই আগ্রহের জায়গা থেকেই। তিনি বলেন, এটি ধর্মদীক্ষার মতো কোনো বিষয় নয়। ব্রতচারী আন্দোলন হলো, জীবন যাপনের জন্য কিছু সংকল্প গ্রহণের পদ্ধতি মাত্র। সন্ জীদা খাতুন বলেন, স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে স্কাউট থাকে। তেমনি একটি বিষয় হিসেবে দেখলে ব্রতচারী আন্দোলন হলো ১৯৩১ সালে লোকশিল্প সংগ্রাহক গুরসদয় দত্ত কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উন্নয়নের আন্দোলন। ব্রিটিশ ভারতের বাঙালি নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেম, বাঙালির জাতীয় চেতনা ও নাগরিকত্ববোধ তৈরি করা ছিল এ-আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

সন্ জীদা খাতুনের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৪ঠা এপ্রিল। তিনি মোট ১৬টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাবসম্পদ, ধ্বনি থেকে কবিতা, অতীত দিনের স্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ : বিবিধ সন্ধান, ধ্বনির কথা আবৃত্তির কথা, স্বাধীনতার অভিযাত্রা, সাহিত্য-কথা সংস্কৃতি কথা, জননী জন্মভ‚মি, রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ, শান্তিনিকেতনের দিনগুলি এবং জীবনবৃত্ত।

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বহু পুরস্কার পেয়েছেন সন্ জীদা খাতুন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত), দেশিকোত্তম পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)। এছাড়া কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৯৮৮ সালে তাকে ‘রবীন্দ্র তত্ত্বাচার্য’ উপাধি দেয়, ২০১৯ সালে নজরুল মানস গ্রন্থের জন্য ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ২০২১ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভ‚ষিত করে।

সন্জীদা খাতুন বিয়ে করেছিলেন বাংলা সংস্কৃতি ও রবীন্দ্রসংগীতে আরেক তত্ত¡জ্ঞ ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হককে।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর দেশ টিভির এক অনুষ্ঠানে সন্ জীদা খাতুনের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইল তিনি বলেন, ওয়াহিদুল হক তাঁদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন। সেখান থেকে পরিচয়, তারপর বিয়ে। দুজনের সম্মিলিত উদ্যোগেই ছায়ানট প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ছায়ানটের সহ-সভাপতির ভূমিকা আমৃত্যু পালন করে গেছেন ওয়াহিদুল হক।

পৃথিবীর বুকে অনেক ঘরানার শিল্পী জন্মান। শিল্পী তাঁর দক্ষতার পাশাপাশি জীবনবোধ, মনন, দর্শন – সব মিলিয়ে শিল্পীমানুষ হয়ে ওঠেন। কিন্তু খুব কম শিল্পী সাংগঠনিক মেধার জোরে নিজের একটি পরম্পরা তৈরি করতে এবং নিজের দক্ষতা, মেধা, দর্শন নিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লালন সাঁইজির শিল্পী ও মনুষ্যজীবন বিবেচনা করলে দেখব, তাঁরা এক একটি গোষ্ঠী তৈরি করে গেছেন। অর্থাৎ, তাঁদের চেতনা, শিক্ষা, দক্ষতা, শিল্প অন্যদের মধ্যে দিয়ে গেছেন, পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে ভাগাভাগি করার প্রক্রিয়া নির্মাণ করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বসে দিব্যি কেবল নিজের শিল্পসাহিত্যের চর্চাটা চালিয়ে যেতে পারতেন। কী প্রয়োজন ছিল তাঁর শান্তিনিকেতনে শিল্পশিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করার? বা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কালের শেষার্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যখন মাথাচাড়া দেয়, তখন খালি পায়ে বেরিয়ে মসজিদের ইমামকে রাখি বাঁধার? তিনি তা করেছিলেন সমাজের প্রতি দায় থেকে। কারণ শিল্পীর কাজ গণমানুষকে ঘিরে হতে হয় এবং শিল্পীর শুধু নিজের কথা ভাবার অধিকার নেই। অন্যদিকে, কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের সহযোগিতায় সাধক লালনও জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেছিলেন। সন্ জীদা খাতুন অনেক আগেই বুঝেছিলেন, নিশ্চিন্ত  চিত্তে সমাজ, রাষ্ট্র, মানুষ এড়িয়ে  শিল্পচর্চার পরিবেশ পাওয়া সহজ নয়। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু শিল্প নির্মাণ করে বা নিজের দক্ষতা প্রচার করে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা লালন সাঁইজির মতো তিনিও বুঝেছিলেন, সাংগঠনিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টের প্রয়োজন  আছে। সংগীতশিল্পী সন্ জীদা খাতুন একজন লড়াকু সংগঠক, যিনি দৃষ্টান্ত রেখেছেন, শিল্পীকে হতে হয় আপসহীন। এজন্য তিনি হয়ে উঠেছেন বিভ‚তিভ‚ষণের ‘কিন্নর দল’ গল্পের সেই স্বপ্নের মতো আলোকিত এক প্রধান চরিত্র। ৎ

সন্ জীদা খাতুন

রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী, লেখক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংস্কৃতিক সংগঠক। জন্ম ১৯৩৩ সালের ৪ঠা এপ্রিল ঢাকায়। বাবা ড. কাজী মোতাহার হোসেন, মা সাজেদা খাতুন এবং স্বামী রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশেষজ্ঞ ও দার্শনিক ওয়াহিদুল হক। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক এবং ১৯৫৫ সালে ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ১৯৭৮ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবনে ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সভাপতি। জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতাসদস্য। নিরীক্ষাধর্মী শিশুশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘নালন্দা’র সভাপতি। সম্মাননা : একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের রবীন্দ্র-পুরস্কার, বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’ উপাধি, ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ প্রভৃতি। উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা – প্রবন্ধ : কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাবসম্পদ, ধ্বনি থেকে কবিতা, রবীন্দ্রনাথ : বিবিধ সন্ধান, স্বাধীনতার অভিযাত্রা; স্মৃতিকথা : অতীত দিনের স্মৃতি, শান্তিনিকেতনের দিনগুলি, জীবনবৃত্ত ইত্যাদি।