কবি অজিত দত্ত (১৯০৭-৭৯) তাঁর কবিতাসংগ্রহের ভূমিকায় হয়তোবা ঈষৎ আত্মকরুণায় নিজেকে কালবৈগুণ্যের কবি হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন। নিশ্চয় তা জীবনানন্দ-সুধীন্দ্রনাথ-বিষ্ণু দে-অমিয় চক্রবর্তীদের কথা ভেবে। তাঁদের কবিতার দুরূহতা, দুর্বোধ্যতা, অভিনতুনত্বের কথা ভেবে। অজিত দত্ত যদি কালবৈগুণ্যের কবি হন, তাহলে তো তাঁর সমসাময়িক কবি জসীমউদ্দীন (১৯০৩-৭৬) একেবারেই কালবারিত। কিন্তু জসীমউদ্দীনকে কখনোই আত্মগ্লানিতে ভুগতে দেখি না। জসীমউদ্দীন যে-কোনো আধুনিক কবির মতনই আত্মসচেতন কবি। গদ্যকবিতার ভরা জোয়ারের দিনে জসীমউদ্দীন (এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, ১৯০০-৬০) একটিও গদ্যকবিতা লেখেননি – যদিও এই দুজন কবি পরস্পর থেকে মেরু-দূর (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত-সম্পাদিত পরিচয় পত্রিকায় অবশ্য জসীমউদ্দীনের কবিতাগ্রন্থ সমালোচিত হয়েছে।) আত্মগ্লানি ও আত্মকরুণা তো দূরের কথা জসীমউদ্দীন বরং আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। তাই শেষ- বিশ্লেষণে দ্বন্দ্বজর্জরিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে যেমন তারাশঙ্কর-বিভূতিভূষণ তাঁদের সারল্য নিয়ে দাঁড়িয়ে যান, তেমনি আলো-অন্ধকারে দুল্যমান জীবনানন্দ-সুধীন্দ্রনাথের পাশে জসীমউদ্দীনের অরুগ্ন-উজ্জ্বল উপস্থিতি। প্রবহমান জীবন ও সাহিত্য সমস্তকেই অঙ্গীকার করে নেয়। ঈষদ্দূর থেকে আজ এরকমই মনে হয় বিংশ শতাব্দীর রবীন্দ্র-নজরুলোত্তর কবিতামত্ত তিরিশের দশকটিকে।
জসীমউদ্দীন তাঁর ঘরের শোয়ার খাটের শিয়রে দীনেশচন্দ্র সেনের ছবি টাঙিয়ে রেখেছিলেন, তাঁর বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি স্মৃতিকথা লিখেছেন, কিন্তু যে ময়মনসিংহ গীতিকা, পূর্ববঙ্গ গীতিকা-র জন্যে দীনেশচন্দ্র সেনের এত খ্যাতি, সে সম্পর্কে জসীমউদ্দীনের মন্তব্য : … এত বৎসর যে আমি গীতিকা-সংগ্রাহক হইয়া রহিলাম, ময়মনসিংহ জেলায় শত-সহস্র গ্রামে ঘুরিলাম তবুও চন্দ্রকুমার বাবুর সংগৃহীত পালাগানগুলির মতো একটিও গ্রাম্যগাথা তো খুঁজিয়া পাইলাম না।’ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়ে জসীমউদ্দীন তাঁর নকসী কাঁথার মাঠ-এর ভূমিকা লিখিয়ে নিলেন; কিন্তু তাঁর পরিবর্তন-সংযোজনের সব প্রস্তাব গ্রহণ করলেন না। গভীরতম শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথকে; কিন্তু জসীমউদ্দীন মনে করেন শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতীর জন্যে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নজরুল ইসলামকে বলেছেন তিনি মুসলিম বঙ্গের শ্রেষ্ঠ কবি’, কিন্তু নজরুলের কবিতাকে তাঁর অনেক সময়ে মনে হয়েছে প্রবন্ধে’র মতন। -শ্রদ্ধাশীল কিছু বিচারবোধে সদাজাগ্রত জসীমউদ্দীনকে এজন্যেই, মনে হয়, সচেতন আধুনিক। এই বিবেচনাগুলোই প্রমাণ করে জসীমউদ্দীন নন নির্মনন। কবিতায় ও গদ্যরচনায় আবেগ-উন্মথিত তিনি, কিন্তু রাশ টেনে ধরতেও জানেন। অচ্ছেদ্য ব্যক্তিত্বের এই কবি যেমন গদ্যছন্দে কবিতা লিখতে রাজি নন, তেমনি গদ্যে চলতি রীতিকেও সহজে আমল দিতে চান না।
তাঁর সচেতনতার মূল খুঁজতে হবে তাঁর কবিতার ভিতরে। আবহমান বাংলা কবিতার প্রধান দুটি ধারারই তিনি অনুবর্তন করেছেন : কাহিনীকবিতা এবং লিরিক কবিতায়।
জসীমউদ্দীনের কেন্দ্রীয় স্বাতন্ত্র্য এখানে যে, তিনি রবীন্দ্রনাথ-প্রবর্তিত লিরিক কবিতার নতুন রাস্তা ছেড়ে কাহিনীকবিতার পুরোনো মেঠো পথ ধরেছিলেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তও কাহিনীকবিতা লিখেছিলেন, মেঘনাদবধ কাব্য, কিন্তু তা বিশিষ্টার্থে মহাকাব্য। কাহিনীকবিতারও (Narrative Verse) মহাকাব্যের মতনই দুটি ধরন আছে : একটি লোক -প্রচলিত, অজ্ঞাত কোনো রচয়িতার; অন্যটি বিশেষ কোনো কবি-প্রণীত। মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১) এবং নকসী কাঁথার মাঠ (১৯২৯)-এর মধ্যে মিল এখানে যে, দুটিই লোকপ্রচলিত নয় – রচিত সাহিত্য। অনেক বছর আগে কবি-সমালোচক হাসান হাফিজুর রহমান মাইকেল ও জসীমউদ্দীনের মধ্যে একটি সামান্য সাযুজ্য লক্ষ করেছিলেন। দুজনকেই তাঁর মনে হয়েছিল ধারাচ্ছিন্ন ও আকস্মিক উদ্গম। যে-কোনো তুলনার মতনই এই মিল কিছুদূর পর্যন্ত সত্য : মেঘনাদবধ কাব্য-এর কোনো পূর্বজ নেই, তা নীলাকাশ থেকে সদর্থক বজ্রপাততুল্য; আর নকসী কাঁথার মাঠ-এর পূর্বসূত্র খুঁজতে খুঁজতে বড়– দাসচণ্ডীদাস-মালাধর বসু-কৃত্তিবাস-কাশীরাম দাস পর্যন্ত যাওয়া যেতে পারে। সন্নিকট উদাহরণ দীনেশচন্দ্র সেন-পরিচায়িত ময়মনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকা (১৯২৩-৩২)। মাইকেল-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ যে-আধুনিকতার আস্বাদ এনেছিলেন, তাঁদের পরে এসে পুরোনো বাংলা কবিতার সঙ্গে মিলিয়ে-মিশিয়ে জসীমউদ্দীন আর-এক আধুনিকতার জন্ম দিলেন। তাঁর অগ্রজদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও জসীমউদ্দীন তাঁদের অনুসরণ করলেন না, এখানেই তাঁর দীপ্যমান ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য।
মধ্যযুগের কবিদের মতন পূর্ণাঙ্গ কাহিনীকাব্য রচনা করলেন তিনি; কিন্তু কোনো ধর্মীয় বা পৌরাণিক বিষয় বেছে নিলেন না, রচনা করলেন সাধারণ মানুষেরÑ গ্রামজীবনের – আলেখ্য। অগ্রজ কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতনই তিনি অক্ষরবৃত্তকে সরিয়ে রেখে অবলম্বন করলেন মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত ছন্দ; কিন্তু নজরুলের সঙ্গে তফাৎ হলো, তিনি মুক্তকে লিখলেন না, কোনোরকম ছন্দপরীক্ষায় গেলেন না, প্রায় অনিবার্যভাবে অবলম্বন করলেন ছান্দসিক প্রবোধচন্দ্র সেন যার নাম দিয়েছেন ‘পয়ার’, অর্থাৎ মিলান্ত দুই পঙ্ক্তি। এই ধারাই জসীমউদ্দীনে আনুপূর্ব বহমান। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে :
আজিকার রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাটে মেঘের আড়ে,
কেয়া-বন-পথে স্বপন বুনিছে ছলছল জলধারে।১
কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝঝুম নিরালায়,
ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়!২
বাদলের জলে নাহিয়া সে-মেয়ে হেসে কুটিকুটি হয়,
যে-হাসি তাহার অধর নিঙাড়ি লুটাইছে বনময় ॥৩ [পল্লীবর্ষা]
স্বরবৃত্ত ছন্দে :
দূর্বাবনে রাখলে তারে দূর্বাতে যায় মিশে,
মেঘের থানে শুইয়ে দিলে খুঁজে না পাই দিশে ॥১
লাউয়ের ডগায় লাউয়ের পাতা, রৌদ্রেতে যায় উনে,
গা-ভরা তার সোহাগ দোলে তারির লতা বুনে ॥২
যে পথ দিয়ে যায় চলে সে, যে পথ দিয়ে আসে,
সে পথ দিয়ে মেঘ চলে যায়, বিজলী বরণ হাসে ॥৩
বনের মাঝে বনের লতা, পাতায় পাতায় ফুল
সে-ও জানে না নম্র মেয়ের শ্যামল শোভার তুল ॥৪ [সোজনবাদিয়ার ঘাট]
পুরোনো পয়ারের সঙ্গে এর পার্থক্য ছন্দে, এবং এর পয়ারের চালগুলো একদাঁড়ি-দুই দাঁড়িতে বিভাজিত নয়। এই পয়ার বাংলার পুরোনো চাল। তুলনীয় কৃত্তিবাস ওঝার কয়েক লাইন :
দিবাকর-কিরণে উত্তানে উত্তাপিতা।
চলিলা কাতরা অতি জনক দুহিতা ॥১
হিঙ্গুল-ম-িত তাঁর পায়ের অঙ্গুলি।
আতপে মিলায় যেন ননীর পুত্তলি ॥২
মুনির নগর দিয়া যান তিনজন।
দেখিতে পাইল পথে মুনিপতœীগণ ॥৩
জিজ্ঞাসা করিল সবে জানকীর প্রতি।
পদব্রজে কেন যাও তুমি রূপবতী ॥৪
অনুভব করি তুমি রাজার নন্দিনী।
সত্য পরিচয় দেহ কে বট আপনি ॥৫
বাংলার কবিতার এই আদি চাল হঠাৎ অমিয় চক্রবর্তী, সমর সেন বা বিষ্ণু দে-ও ব্যবহার করেছেন।
অমিয় চক্রবর্তী :
আমি যেন বলি আর তুমি যেন শোনো।
জীবনে জীবনে তার শেষ নেই কোনো ॥১
দিনের কাহিনী কত, রাত চন্দ্রাবলী।
মেঘ হয়, আলো হয়, কথা যাই বলি ॥২
কিংবা সমর সেন :
যৌবনের প্রেম শেষ প্রবীণের কামে।
বছর দশেক পরে যাব কাশীধামে ॥১
সমর সেন, বিষ্ণু দে বা অমিয় চক্রবর্তীর মতন পরীক্ষামূলকভাবে নয়, স্থায়ী ভাবপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবেই জসীমউদ্দীন ব্যবহার করেছিলেন পয়ারকে। অথবা বড় অর্থে এ পরীক্ষাই; কিন্তু এত সাবলীল ও সংগোপন ও বিষয়বস্তুর সঙ্গে নিষিক্ত যে একে পরীক্ষা বলে মনে হয় না আর। শালীন নাগরিক কবিতায়, বিংশ শতাব্দীর বিশের, তিরিশের দশকে, এ এক দুঃসাহসিক অভিযান। দীনেশচন্দ্র সেনকে দিয়ে জসীমউদ্দীন তাই বলিয়ে নিতে পারেন, আমি হিন্দু, আমার কাছে বেদ পবিত্র, ভাগবত পবিত্র। কিন্তু সোজনবাদিয়ার ঘাট পুস্তকখানি তাহার চাইতেও পবিত্র। কারণ ইহাতে আমার বাংলাদেশের মাটির মানুষগুলির কাহিনী আছে।’ বাস্তব অভিজ্ঞতা আর কল্পনার মিশেল : সব কবিশিল্পীর মতনই এই ছিল জসীমউদ্দীনের উপকরণ। কবি নিজেই লিখেছেন, গ্রামদেশে ঘুরিতে ঘুরিতে কত যে সুন্দর সুন্দর হলুদ-বরণী চাষী মেয়েদের দেখিতাম! তারা চকিত হরিণীর মতো আমাকে দেখিয়া বিজলি-ঝলকে পালাইয়া যাইত! কেহ কেহ আবার ডাগর দুইটি চোখে দূরের একটি গ্রাম হইতে বহু বহুক্ষণ চক্ষু মেলিয়া আমার দিকে চাহিয়া কৌতূহল মিটাইত। ভাবিতাম, এই গাঁয়ের একটি মেয়ে আর অপর গাঁয়ের আর একটি ছেলের সঙ্গে ভালোবাসা হইলে কেমন হয়? ঘুরিতে ঘুরিতে যত ছেলে দেখিতাম, আর যত মেয়ে দেখিতাম, তাদের লইয়া মনে মনে জাল বুনিতাম আর ভাবিতাম ওদের দুইজনকে লইয়া একটি কাহিনীকাব্য রচনা করিব।’ এই কাহিনীকাব্যটিই জসীমউদ্দীনের খ্যাততম কাব্যগ্রন্থ নকসী কাঁথার মাঠ। সোজনবাদিয়ার ঘাট-ও (১৯৩৩) প্রায় একই আদলে গড়া। জসীমউদ্দীনের উক্তি থেকে এটাও বেরিয়ে আসে : তাঁর কবিতার উৎস মানুষ Ñ গ্রামীণ মানুষ।
১৯২৭ সালে প্রকাশিত জসীমউদ্দীনের প্রথম কবিতাগ্রন্থ রাখালী-তেই তাঁর কবিতার চারিত্রলক্ষণ নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। এই বইয়ের ১৯টি কবিতার ভিতরেই গ্রামীণ জীবন, মানুষ, প্রকৃতি রূপায়িত-রূপান্তরিত। নাম-কবিতা রাখালী’-তেই তাঁর খ্যাতিমান কাহিনীকাব্যগুলোর সারসংক্ষেপ ধরা আছে যেন। কাহিনীকবিতার টান জসীমউদ্দীনের সেই প্রথম থেকেই। তারই মধ্যে একটু হেরফের – সংলাপ-কবিতা (সিঁদুরের বেসাতি’, রাখাল ছেলে’), মনোনাট্য (কবর’), গান (মনই যদি নিবি’, গহীন গাঙের নায়া’) প্রভৃতি। জসীমউদ্দীন যে পরে আরো গান লিখবেন, নাটক লিখবেন – সবই গ্রামের প্রেক্ষিতে, এ তো অনিবার্য। লোকসাহিত্য-সংগ্রাহক হিসেবে যে-জসীমউদ্দীন বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ঘুরছেন, সে-সবও তাঁর কবিতার ভিত্তি রচনা করে দিয়েছিল। জসীমউদ্দীনের জন্ম ফরিদপুরে। তাঁর সমসাময়িক কবি জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯-১৯৫৪) জন্ম বরিশালেÑ তাঁরই পাশের জেলায়। জীবনানন্দেরও প্রথম কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ঐ ১৯২৭ সালেই, ঝরা পালক। ঝরা পালক আর রাখালী-র মধ্যে দুজন কবির দুই দৃকভঙ্গি ও মানস প্রতিবিম্বিত – ঝরা পালক গ্রন্থে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও বিবেকানন্দের বন্দনা করে কবিতা লিখেছেন জীবনানন্দ, হিন্দু-মুসলমান মিলনের কবিতা লিখেছেন, -বেদিয়া’ ও -ডাহুকী’ নামে গ্রামনির্ভর কবিতাও আছে, কিন্তু তারপরেও একটি -গোধূলিলোক’ (শব্দটি ঝরা পালক-এর প্রথম বইয়ের প্রথম কবিতা থেকে ব্যবহার করছি) যেন বিস্তারিত হয়ে আছে পুরো বইটিতে। অন্যদিকে -বোশেখ শেষের মাঠ’-এর মতন নৈসর্গিক কবিতা দিয়ে শেষ হলেও রাখালী কবিতাগ্রন্থে আছে স্বজনহারা গ্রামবৃদ্ধ, পল্লীজননী, কৃষক-কন্যা, শাকতুলুনি, জেলে, বৈরাগী আর বোষ্টমী। জসীমউদ্দীনের ঝোঁক সাধারণ গ্রামীণ মানুষের জীবনধারণের ছবি তোলায়, জীবনানন্দের প্রতিন্যাস মনোজগতের চিত্রণে। ঝরা পালক আর রাখালী একই বছরে প্রকাশিত হয়ে সমকালীন প্রায় অভিন্ন পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে দুজন কবি কতখানি পৃথক হতে পারেন, তার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে কার্যত মানবজীবনের বিচিত্র জটিল দুরবগাহ রহস্যের দিকেই ইশারাপাত করে।
এখন আমরা এসে পড়েছি সেখানে, যেখানে জসীমউদ্দীনীয় বিশিষ্টতাকে নির্ণয় করা যায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা কবিতায় বিমূর্ততার প্রবর্তয়িতা ও সম্রাট। রবীন্দ্রনাথেরই সমকালে আবহমান বাংলা কবিতার বাস্তবতার ধারা প্রবাহিত ছিল। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও প্রমথ চৌধুরী, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ও কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার ও যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত সকলেই আপনাপন চারিত্রচিহ্নিত বাস্তবতার আরাধনা করেছিলেন। এমনকি রবীন্দ্রানুসারী কবি বলে গণনা করা হয় যাঁদের – কালিদাস রায়, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, যতীন্দ্রমোহন বাগচী প্রমুখ -তাঁরাও আসলে রবীন্দ্রনাথের বহিরঙ্গে মজেছিলেন; অন্তর্লোকের হদিস পাননি। তাঁরা রবীন্দ্রনাথের পল্লীপ্রাণতার পশ্চাদ্ধাবন করেছেন – এইটুকু মাত্র। সেদিক থেকে এঁরাও আসলে রবীন্দ্রানুসারী নন – বাস্তবতারই পথিক।
বাংলা কবিতায় বিমূর্ততার দ্বিতীয় স্তবক রচনা করেছিলেন তিরিশের প্রধান কয়েকজন কবি। কিন্তু অরাবীন্দ্রিক বিমূর্ততা। নতুন বিমূর্ততা। জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, উপান্ত-সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, উপান্ত-বুদ্ধদেব বসু এই বিমূর্ততার প্রধান নায়ক। কবি জসীমউদ্দীন এঁদেরই সমসাময়িক। তবে সম্পূর্ণ বিপরীত পথ ধরেছিলেন। এমন পথ, যা জীবনানন্দ প্রমুখদের তো নয়ই, রাবীন্দ্রিক-বিমূর্ততা বা নজরুলীয়-বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।
একটু আগে বলেছি যে, জসীমউদ্দীন রবীন্দ্রনাথ – প্রবর্তিত লিরিক কবিতার নতুন রাস্তা ছেড়ে কাহিনীকবিতার পুরোনো পথ ধরেছিলেন। আমার লেখার এইখানে এসে বলতে চাই : এই কথাটি সত্যের আধখানা মাত্র। জসীমউদ্দীনের কেন্দ্রীয় চারিত্র ও স্বাতন্ত্র্য কাহিনীকবিতাতেই – দীর্ঘ ও ক্ষুদ্রাকার কাহিনীকবিতাতেই। কিন্তু লিরিক কবিতার সারাৎসার জসীমউদ্দীনও আত্মস্থ ও ব্যবহার করেছিলেন। সেটা সব সময়ে আমাদের নজরে পড়েনি। এখানে এখন আলো ফেলতে চাই।
লিরিক কবিতার দুটি ধাঁচ : আত্মলীন আর বিষয়মুখ। পৃথিবীর আদিতম মিশরী-হিব্রু-গ্রিক কবিতা থেকে অদ্যাবধি কবিতা এই দুই খাতেই বইছে। কাহিনীকাব্যে তো বটেই, লিরিক কবিতাতেও জসীমউদ্দীন মূলত বিষয়মুখ। লিরিক কবিতার প্রধান একটি বিষয় : নারীবন্দনা। মাইকেল মধুসূদন দত্তের বীরাঙ্গনা কাব্যে নারীস্তোত্র শুরু হয়েছে বাংলা কবিতায়। রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সমসাময়িক কবিগণ আপাতভাবে যত আলাদাই হোন না কেন – দেবেন্দ্রনাথ সেন, অক্ষয়কুমার বড়াল, কায়কোবাদ, গোবিন্দচন্দ্র দাস Ñ নারীবন্দনায় সকলেই উন্মুখর। বাংলা কবিতায় এই প্রথম সমবেতভাবে একদল কবি নারীর নান্দীপাঠ শুরু করলেন। পরবর্তী কবিতায় চলেছে এরই ধারাবাহিকতা।
নারী ও নিসর্গ – রোমান্টিক কবির এই দুই প্রধান উপচার। জসীমউদ্দীন তাঁর নিজস্ব গ্রামীণ পটভূমিতেই, তাঁর ব্যক্তিগত স্বরে কত-যে নারীস্তোত্র রচনা করেছেন, ক্রমাগত পল্লীকবি’ মার্কা মেরে তা আমাদের চোখেই পড়েনি।
কবিতা’ নামে একটি কবিতায় জসীমউদ্দীন এরকম লিখেছেন একজন নারীর উদ্দেশে- তুমি আমাকে তোমাকে নিয়ে কবিতা লিখতে বারণ করেছ, সে-কথা না হয় আমি শুনলাম, কিন্তু কবিতা থেকে তোমার মুক্তি নেই। সন্ধ্যা তোমার সন্ধ্যামালতী অধরে কবিতা লিখবে; যখন মেঘডম্বরু শাড়ি পরে বেরোবে তখন আকাশের কালো মেঘ তোমাকে অনুসরণ করবে; রাতে যখন শিয়রে এলোচুল ছড়িয়ে ঘুমাবে, তখন চাঁদ তার জ্যোৎস্নায় জড়িয়ে নেবে তোমাকে; রাতের বাতাস ফুলের সুগন্ধ মেখে চুম্বন করবে তোমাকে। সর্বশেষ পঙ্ক্তিদ্বয়ে লিখছেন : তাহারা তোমার লিখিবে কবিতা লিখিবে লিখিবে লিখিবে, / যখন যেখানে যাইবে সেখানে যেমনি তোমারে দেখিবে।’-’কবিতা’ কবিতাটি সারল্যে-সৌন্দর্যে মুগ্ধকর।
১৯৫৮ সালের ২১ অক্টোবর প্যারী হইতে লন্ডনের পথে’ যেতে যেতে একটি কবিতা লিখেছিলেন কবি, Ôতোমারে ধ্যানেতে পেয়ে’। এ-কবিতাটি এক-অর্থে অ-জসীমউদ্দীনীয়। এখানে কোনো পার্থিব নারীর কথা বলছেন না কবি, বলছেন এক মানস-সুন্দরীর কথা : আমি যে কথার জেলে,/কথা-ইন্দ্রজাল মেলে/ দেশে দেশে ফিরি কন্যা তোমারে ধরিতে, /ভাঙিয়া কথার ফাঁদ/বাহিরিয়া যায় চাঁদ / মেঘের ভাঙিয়া খাঁচা / বিজলী পালায়ে যায় কোথায় ত্বরিতে।’ তারপরও তাকে ধরবার জন্যে কবি সচেষ্ট। অপরিচিতা’ (রচনা : আর্টিস্ট কলোনি, প্যারিস) নামে একটি কবিতায়ও যেন একটি বিদেশিনীর ছায়ায় আবার সেই মানসীর কথাই বলেছেন কবি।
১৯৫৮ সালের ১২ই জুলাই শেষ নিবেদন’ নামে যে-কবিতা লিখেছিলেন কলকাতায় বসে, তার উদ্দিষ্টা সম্ভত কোনো বাস্তব নারীই। মানসী নয়। মিনতি’ কবিতায় শেষ নিবেদন’-এর মতন নারীর কাছে কাকুতি আছে, কিন্তু সেই সঙ্গে আছে চির-বিচ্ছেদের এক হাহাকার : অনেক পাইয়া অনেক ঠকেছি, সপ্ত সাগর ভরে/জগতের বারি তবুও সিন্ধু কাঁদে জল জল করে।’
ক্ষতিপূরণ’ নামে একটি কবিতায় জসীমউদ্দীন তাঁর হারানো কিন্তু অবিস্মরণীয়া দয়িতার উদ্দেশে লিখছেন – তোমাকে আমার গান দিলাম, ফুল দিলাম, তার প্রতিদানে আমি জীবন ভরে নিলাম শুধু ভুল। তোমাকে আমার সুর দিলাম, আমার রইল শূন্য বাঁশির ক্ষত। তোমাকে দিলাম চন্দ্র তারকা প্রত্যুষ ও প্রভাত, আমার আকাশ খালি থাকল। তোমাকে দিলাম ঘুম, আমার থাকল নিদ্রাহীনতা।’ তারপর বলছেন, তোমার রইল আলো আর সুখ, আমার কিছু থাকল না, তবু সবচেয়ে ভাল লাগে। মরে গিয়েও সুখ পায় পতঙ্গ, অগ্নিও প্রজ্বলন মানে না। ভালবেসে দুঃখ পেয়েছি বটে, সে দুঃখের সহন-সুখে’ বাঁশি আকাশ-বাতাস ভরিয়ে তুলছে সুরে সুরে।’ – ঠিক এরকম সরাসরি বিচ্ছেদের কবিতা কমই লিখেছেন জসীমউদ্দীন, তিনি বিচ্ছেদেরই কবি, এলেজি রচনাতেই তাঁর কুশলতা, শোকান্তিক কবিতা রচনা করেই তিনি এত খ্যাতি অর্জন করেছেন, কিন্তু সে-সব বেশির ভাগই এসেছে কাহিনীরেখার মাধ্যমে। এখানে স্মরণীয় : ক্ষতিপূরণ’ নামে অমিয় চক্রবর্তীও এরকম একটি বিচ্ছেদের অসামান্য কবিতা লিখেছিলেন, বিচ্ছেদের বেদনা সেখানে বিশ্বে ব্যাপ্ত হয়ে যায়।
উপহার’ কবিতাটি অধরা এক রূপসীর স্তোত্র। কবিতাটির অনেকখানি রূপের বর্ণনা। কবি বলছেন : তোমার অধরে সোনালি ভোরের শিশু-রোদ, কালো চুলের অন্ধকার ঠেলে রূপের উষা জেগে উঠেছে তোমার মুখম-লে, হাসিতে যেন আকাশের উদাসীন মেঘ আবছা আলোর রেখা পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তুমি কোনো গৃহের অধীশ্বরী হলে না। শেষ চারটি পঙ্ক্তি এরকম : বৃথাই কবিরা কথার বাঁধনে তোমারে বাঁধিতে চায়, / শিল্পীরা চাহে রেখার জালেতে ধরিতে ও-অলকায়।/ অবহেলে তুমি ভাঙিয়া চলেছ সে-মায়ার কারাগার, / তাহারই ধ্বংসাবশেষ আনিয়া দিনু তোমা উপহার।’
জসীমউদ্দীন নারীবন্দনার একটি সমগ্র কবিতাগ্রন্থই রচনা করেছিলেন, রূপবতী (১৯৪৬)। সমসাময়িক দুজন কবির প্রায় সমকালে প্রকাশিত নারীবন্দনার দুটি বই পাশাপাশি রাখতে চাই, তাতে জসীমউদ্দীনের বিশেষত্ব উদ্ভাসিত হবে। জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন (কবিতাভবন-সংস্করণ ১৯৪২ নয়, বইটির পূর্ণাঙ্গ পরিণত সিগনেট-সংস্করণ ১৯৫২) আর জসীমউদ্দীনের ঐ বই রূপবতী। জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন-এর বনলতা সেন’, সুচেতনা’, সবিতা’, শ্যামলী’ প্রভৃতি কবিতা শেষ পর্যন্ত নারী-উত্তর। বনলতা সেন নারীই বটে, হয়তো শাশ্বতী নারী; – কিন্তু সেখানেও কিরকম দূরতর গভীরতর আবছায়া লুটিয়ে থাকে। কিন্তু ’সুচেতনা’ কি নারী? ‘’শ্যামলী’ কি নারী? সবিতা’ কি নারী? আমরা জীবনানন্দের নারী আর বিশ্ববোধের মধ্যে কোনো ফারাক করতে পারি না যেন। অন্যপক্ষে জসীমউদ্দীনের নারী-দেহিনী নারী, পার্থিব নারী। বেদেনী’, চাষীর মেয়ে’, বস্তির মেয়ে’ – এসব নাম থেকেই প্রকাশিত জসীমউদ্দীনের নারী কোন জগতের। শাহজাদী’ বা রাজার কুমারী’ যে-সব কবিতার নাম তার নায়িকাও সুদূরিকা নয় – রাজার প্রাসাদের একটি মহলে সুগন্ধি আলো জ্বলছে, আর রাখাল ছেলের মেঠো বাঁশি বাজছে। নির্বাসিতা’ কবিতায় চঞ্চলা কিশোরী বিবাহোত্তর জীবনে একটি বাড়িতে বন্দিনী হয়ে আছে, এই বেদনা খচিত হয়ে থাকে। নিতান্ত ঘরোয়া ছবিও কবিতায় ধরে রেখেছেন জসীমউদ্দীন – একটি মেয়ে হলুদ বাটছে কিংবা সেলাই করছে (সীবনরতা’, হলুদ-বরণী গ্রন্থে) তার অপরূপ চিত্রণ। জসীমউদ্দীনীয় রূপায়ণ। -সার্থক দিন’ কবিতায় একটি মেয়েকে দেখেছেন কবি, তারই প্রশস্তিতে ভরে উঠেছে তিনটি স্তবক। (১) আকাশ ভরেছে নীলে, ছুটোছুটি করছে মেঘ। (২) মেঘ, পাখি, ফুল আনন্দে উন্মাতাল। (৩) প্রজাপতি ঘুরে বেড়াচ্ছে বনে বনে, বেজে উঠেছে রাখাল ছেলের বাঁশি। একটি মেয়ের গান শোনবার প্রতিক্রিয়ায় রচিত হয়েছে একটি কবিতা, যে-গান শুনে আকাশ আর পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গেছে, সৃষ্টি থেমে গেছে। সাধারণ নারীর মধ্যেই জসীমউদ্দীন আবিষ্কার করেছেন অসাধারণত্ব : তুমি আকাশের চাঁদ হয়েছিলে, কাহার ফুলের শরে/ বিদ্ধ হইয়া হে নভোচারিণী নেমেছ মাটির ঘরে।’ কিংবা বিপরীতভাবে মাটির পৃথিবীর নারীকেই তিনি করে তুলেছেন আকাশী। সোনার মেয়ে’ কবিতার দুটি অংশ এরকম : এত রূপ তুমি বাঁধিয়াছ দেহে, সোনালি মুখের হাসি/ হরণ করিতে গগনেতে ভেড়ে চাঁদের তরণী আসি।’ এবং বিজলী বুঝিবা বাহুখানি চায়, তারা চায় বুঝি আঁখি,/ বাতাস চাহিছে কুন্তলভার গায়ে ফুলবাস মাখি।’ জীবনানন্দের বনলতা সেন’ আর জসীমউদ্দীনের উষাবতী সেন’ (বনলতা সেন’ কবিতা থেকেই উদ্বুদ্ধ মনে হয়)-এর তফাৎ চিরন্তনী আর ক্ষণিকার তফাৎ। বনলতা সেন-এর শ্যামলী’ আর রূপবতী-র শ্যামলী’ কবিতার মধ্য দিয়ে জীবনানন্দ দাশের লোক-অতিক্রমী কবিস্বভাব আর জসীমউদ্দীনের লোকায়ত কবিচারিত্র নির্ণীত হয়ে যায়। কল্পনা-বিলাস’ কবিতায় জসীমউদ্দীন লিখেছেন, একটি সে মেয়ে অতি সাধারণ, অসাধারণ যে তাই,/ ফুলের মতন চাঁদের মতন তারার মতন না চাই।’ কামিনীর রূপবর্ণনায় জসীমউদ্দীন অবিরলভাবে চন্দ্র-নক্ষত্র-পুষ্পের উপমা-ইমেজ ব্যবহার করেছেন; সেই জসীমউদ্দীনই যখন অতি সাধারণ মেয়ের মধ্যেই অসাধারণত্ব প্রত্যক্ষ করেন, তখন এটা পরিষ্কার হয়ে যায় : জসীমউদ্দীনের লৌকিক সত্তাটিই তাঁর কেন্দ্র। আসলে জসীমউদ্দীনের সমগ্র সাহিত্যের কেন্দ্র ও পরিধিই এই অতি সাধারণ মানুষ ও প্রকৃতির মধ্য দিয়ে অসাধারণত্বের আবিষ্কার। আমরা এদিক থেকেই বলতে পারি : জসীমউদ্দীন কল্লোল যুগে’র সন্তান, বিশ-তিরিশের দশকে বাংলা কবিতায় ও কথাসাহিত্যে প্রথমবারের মতন সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ঘটেছিল। যাঁদের সৌজন্যে ঘটেছিল তাঁদের আমরা চিনি সবাই : যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, কাজী নজরুল ইসলাম, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মনীশ ঘটক, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। জসীমউদ্দীন এঁদের সঙ্গেই সমোচ্চার্য, একটি আন্দোলনের শরিক, একই সমতলে দাঁড়িয়ে।
প্রথম জীবনে দুটি অসামান্য মনোনাট্য লিখেছিলেন জসীমউদ্দীন : বালুচর গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত কাল সে আসিবে’ এবং কাল সে আসিয়াছিল’। প্রিয়তমের জন্যে প্রতীক্ষা এবং প্রিয়তম চলে যাবার পর স্মৃতিমাখা বেদনার বিস্তার দুটি কবিতার উপজীব্য। লক্ষণীয় : দয়িত-দয়িতার মিলিত হওয়ার দিনটির প্রত্যক্ষ বিবরণ নেই, আছে স্বপ্নকাচ ও স্মৃতিকাচের ভেতর দিয়ে। কবিতাদ্বয়ে পুরুষের (তরুণ যুবকের) রূপের বর্ণনা আছে। কাল সে আসিবে, মুখখানি তার নতুন চরের মতো/ চখা আর চখী নরম ডানায় মুছায়ে দিয়েছে কত।’ (কাল সে আসিবে) -এই বর্ণনা একটি পুরুষের – নারীর নয়, নারীর চোখে পুরুষের। কাল সে আসিয়াছিল’ কবিতায়ও আছে পুরুষের রূপবর্ণনা। প্রিয়তমের উদ্দেশে রচিত হলেও কবিতা দুটিতে নারীহৃদয়ের পরিস্পন্দন আশ্চর্য রূপায়িত। কাল সে আসিবে’ কবিতার এই পঙ্ক্তিগুলোর কম্পন চলতেই থাকে :
কাল সে আসিবে ওই বালুচরে, আমি কি আবার হায়,
আসমান-তারা শাড়িখানি আজ উড়াব সারাটি গায়?
রামলক্ষ্মণ শঙ্খ দুগাছি পরিব আবার হাতে,
খোঁপায় জড়ান কিংশুক-কলি, কাজল চোখের পাতে;
গলায় কি আজ পরিতে হইবে পদ্মরাগের মালা,
কানাড়া ছন্দে বাঁধিব কি বেণী কপালে সিঁদুর-জ্বালা?
কাহিনীকাব্যের খ্যাতি জসীমউদ্দীনের লিরিক কবিপ্রতিভাকে আড়াল করেছে। দীর্ঘ ও ক্ষুদ্র কাহিনীকাব্য, মনোনাট্য, সংলাপ-কবিতা, লিরিক – এইসব মিলিয়েই জসীমউদ্দীন এক ও অনন্য। এমনকি তাঁর গদ্যসাহিত্য ও লোকসাহিত্য সন্ধান – তাও এক অভিন্ন আয়তনের। শেষ-বিশ্লেষণে, জসীমউদ্দীন অখ- ও অবিভাজ্য এক চারিত্র নির্মাণ করেছেন।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.