শরৎ তখনো আসেনি, আসি আসি করছে। তবুও কেমন একটা শরতের গন্ধ চারদিকে। তেমনি এক সন্ধ্যায় মুখোমুখি হলাম নতুন এক অভিজ্ঞতার, নতুন এক বোধের, নতুন এক নাট্যদর্শনের। রহস্য না করে সোজাসাপ্টা বলাই ভালো। সেই সন্ধ্যায় দেখছিলাম স্পর্ধার নতুন নাটক তবুও জেগে উঠি। স্পর্ধার এর আগের দুটি নাটকও দেখা ছিলো। আমি বীরাঙ্গনা বলছি এবং বিস্ময়কর সবকিছু। এ দুটি নাটকের কথা কেন উল্লেখ করছি? নিশ্চয়ই একটি কারণ আছে। আমি বীরাঙ্গনা বলছি নাটকটি যারা দেখেছেন কিংবা ড. নীলিমা ইব্রাহিমের এই গ্রন্থটি যারা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, এর বিষয়বস্তু কী। আমরা আজ যে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক, সেই স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণে এদেশের লাখ লাখ নারীর ভূমিকা কী ছিলো, তারই ক্ষুদ্র একটা অংশের উপস্থাপন আমি বীরাঙ্গনা বলছি। এদেশের নারীসমাজের অনেকেই ১৯৭১ সালে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। অনেকে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন, অনেকে তাঁদের সম্ভ্রম ও জীবন বিসর্জন দিয়ে আমাদের জন্য লাল-সবুজের পতাকা উপহার দিয়েছেন। দুই লক্ষ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের যে স্বাধীনতা, সেই স্বাধীনতা নারীরা কতটা ভোগ করতে পারছেন? এ প্রশ্নের উত্তর আমি বীরাঙ্গনা বলছি থেকে তবুও জেগে উঠি-তে পর্যন্ত বিস্তৃত।
‘বিস্ময়কর সবকিছু’তেও দেখা যায়, সাত বছরের একটি কন্যাসন্তান তার বিষণ্ণতাক্লিষ্ট মাকে আত্মহত্যার পথ থেকে ফেরাতে চায়। মাকে বাঁচিয়ে রাখার অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য মানব জীবনের বিস্ময়কর সব ঘটনার একটি তালিকা তৈরি করে মাকে উপহার দেয় তার অদম্য কন্যাসন্তানটি। সে-তালিকা মাকে বাঁচাতে ব্যর্থ হলেও কন্যার জীবনে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের এক জীবন্ত দলিল হয়ে থাকে। জীবনে বিয়োগ থাকবে, ব্যর্থতা থাকবে, হেরে যাওয়া থাকবে, তাই বলে প্রাণনাশের চেষ্টা কখনো নয়, উঠে দাঁড়াতে হবে বারবার। জীবনে সবকিছু যেমন সম্ভব নয়, আবার অনেককিছুই অসম্ভবও নয় – এই জীবনবোধে উজ্জীবিত হওয়া এক নারীর গল্প ‘বিস্ময়কর সবকিছু’।
তবুও জেগে উঠি নাটকটি আগের দুটি নাটকের পরম্পরা বহন করে। এই নাটকের বিষয় ও বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে নারী। কাহিনির দিক থেকে না হলেও বিষয়বস্ত্ত ও বোধের দিক থেকে এই তিনটি নাটক মিলে তৈরি হয়েছে ট্রিলজি। প্রথাগত ধারণায় আমরা ট্রিলজি দেখতে পাই রচয়িতার রচনায় কিংবা পরিচালকের পরিচালনায়। এই প্রথার বাইরে গিয়ে দেখলে আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে যে, একটি নাটকের দলের নির্মাাণেও ট্রিলজি তৈরি হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন নির্দেশকের হাতে, অথচ একই নাট্যদলের নাট্যভাবনায়।
তবুও জেগে উঠি নাটকের পরিকল্পক ও নির্দেশক মহসিনা আক্তার। এটি স্পর্ধার সাম্প্রতিকতম প্রযোজনা।
এ-নাটক দেখার অভিজ্ঞতায় নতুনত্ব রয়েছে। নিরাভরণ মঞ্চে, খুব সামান্য প্রপসের ব্যবহার করা হয়েছে। আলোর কোনোরকম কারিশমা নেই, মিউজিকও খুব সামান্যই। সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো ঘটনা হলো এ-নাটকে তেমন কোনো সংলাপ নেই। সামান্য যা আছে, তা হলো বোধ ও রসের সমন্বয়ে স্বরের অভিব্যক্তি। প্রায় ঘণ্টাখানেক ব্যাপ্তির এ-নাটক দর্শকদের দাঁড় করিয়ে দেয় বর্তমান বাংলাদেশে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের সকরুণ অবস্থিতির মাঝে। নাটকের ব্রোশিওরে সারসংক্ষপে উল্লেখ করা হয়েছে – ‘২৪ পরবর্তী বাস্তবতায় নারীর প্রতি এই কাঠামোগত নিপীড়ন আরো তীব্রভাবে দৃশ্যমান। সেই ক্রোধ থেকে উজ্জীবিত হয়ে উত্তরাধুনিক ভাষাশূন্য এই পারফরম্যান্সটি তৈরি। নারীকে বেশ্যাকরণ-এর মধ্য দিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যেই নিপীড়ন চালিয়ে যায়, সেই বেশ্যাকরণকে আত্তীকরণ করলে পুরুষতন্ত্র যে হাতিয়ারশূন্য হয়ে পড়ে, তাই এ পারফরম্যান্স-এর মাধ্যমে নিরীক্ষা করা হয়েছে।’ স্পর্ধার এই স্বীকারোক্তির সত্যতার কথা তো আমরা জানিই।
প্রচলিতক্ষমতা কাঠামোতে নারীকে শূন্য করে দেওয়া, পুরুষতন্ত্রকে আরো বলীয়ান করা,ক্ষমতায়িত করা এসব কি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনতে পারবে? এটা কি ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ বিনির্মাণের নমুনা? এটা কি স্বপ্নভঙ্গ নাকি প্রতারণা? জাতি এ-ব্যাপারে স্পিকটি নট। তবে স্পর্ধা সত্যিকারেই স্পর্ধা দেখিয়েছে। তারা ’২৪-পরবর্তী নারীর অবস্থা চিহ্নিত করতে পেরেছে এবং এক্ষত্রে তাদের শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে তার প্রতিবাদ জানিয়েছে তাদের সাম্প্রতিকতম প্রযোজনা তবুও জেগে উঠি নাটকের মাধ্যমে।
তবুও জেগে উঠি যে খুব সাদামাটা প্রযোজনা সে-কথা আগেই উল্লেখ করেছি। এই নাটকে কোনো সংলাপ না থাকার পরও দর্শকদের কানে অনেক বক্তব্য পৌঁছে যায়। আদিকাল থেকে চলে আসা নারী-পুরুষের সম্মিলিত সমাজে নারী কীভাবে গৌণ হয়ে ওঠে, কীভাবে পীড়নের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তবুও জেগে উঠি। নির্দেশক এ-নাটকে ফিচারধর্মী কিংবা প্রতিবেদনধর্মী কোনো দৃশ্য উপস্থাপন করেননি। বরং নারীকে পুরুষ কীভাবে তার পণ্য হিসেবে, সম্ভোগের উপকরণ হিসেবে, ক্ষমতার ক্রীড়নক হিসেবে দেখে, সেটাই নির্দেশক তুলে ধরেছেন কিছু মেটাফরিক দৃশ্য রচনার মাধ্যমে। নারী-পুরুষ আলাদা, নারীর অবস্থান আড়ালে – এসব বয়ান তৈরি করছে যে-সমাজ, সেই সমাজকে পরিকল্পক ও নির্দেশক মহসিনা আক্তার সমালোচনা করতে পিছপা হননি। তিনি দর্শকদের এও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, নারী সৃষ্টিশীল। তার যোনি থেকে মানুষের জন্ম। সন্তান জন্মদান, লালন-পালনের সেই বেদনা-আবেগকে উপেক্ষা করে পুরুষতন্ত্র কীভাবে নারীকে অবমানিত-অবনমিত করে, কীভাবে ঘরের কোণে আবদ্ধ করে রাখার অপচেষ্টা করে তারই আখ্যান তবুও জেগে উঠি। নির্দেশক শেষ পর্যন্ত শেষ পর্যন্ত লড়াই করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। জেগে ওঠার কথা বলেছেন।
এ-নাটকে যে-অভিনবত্ব আমাকে স্পর্শ করেছে, তা হলো নির্মাতা নিজেই একটা চরিত্র হয়ে ওঠেন। নাটক চলতে চলতে মঞ্চের বাইরে থেকে নির্দেশক নাটক থামিয়ে দিয়ে নতুনভাবে পরিবেশন করার কথা বলেন। অভিনয়শিল্পীরা নির্মাতার কথামতো তাই করেন। এ কাজটি আরো অর্থবহ করে তোলার অবকাশ রয়েছে। যদি নাটকের তুলনামূলক আরো গুরুত্বপূর্ণ কোনো অংশের উপস্থাপনে, যেটি নাটকটির বক্তব্যকে তীব্রভাবে শানিত করে, তেমন এক বা একাধিক দৃশ্যে নির্দেশক সূক্ষ্মভাবে থামিয়ে দিয়ে আবার উপস্থাপনের চেষ্টা করতেন, তাহলে আরো অর্থপূর্ণ করা সম্ভব হতো। মেধাবী নির্দেশক মহসিনা আক্তার নিশ্চয়ই এ-বিষয়ে ভেবে দেখবেন।
তবুও জেগে উঠি নাটকে অভিনয় করেছেন শারমিন আক্তার শর্মী, সিফাত নওরীন বহ্নি, ফারিহা জান্নাত মিম, সাদিয়া মরিয়ম রুপা, নূরে জান্নাত ওরিশা, রিয়াসাত সালেকিন ঋত্বিক, সাইফুল ইসলাম, রবি প্রারম্ভ, মো. মেহেদী হাসান সোহান, জাদিদ ইমতিয়াজ আহমেদ ও বিপস্নব হাসান। এই নাটকে কোনো অভিনেতার এককভাবে ভালো করার সুযোগ তেমন ছিল না। সম্মিলিতভাবে বা টিমওয়ার্কের মাধ্যমে নাটকটির পরিপূর্ণতা প্রদানে সবাই আন্তরিক ছিলেন।
তবুও জেগে উঠি নাটকে শৈল্পিকভাবে নারীশক্তির জাগরণের ইঙ্গিত রেখেছেন নিদের্শক মহসিনা আক্তার। সেই জাগরণের স্পৃহা ছড়িয়ে পড়ুক চারদিকে। যখন এই লেখা লিখছি, তখন শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হয়ে গেছে। নাটক আর উৎসবের মাঝে কোথায় যেন অশুভের বিনাশ আর শুভের আহবান শুনতে পাই সেই পৌরাণিক মিথোচ্চারণে –
‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক-মঞ্জির;
ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা; প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোর্তিময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা’


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.