‘চিকিৎসা নয় এটি একটি নারী অধিকার’ – বছর কয়েক আগেও এইচ.আর.টি বা হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির বিজ্ঞাপনে একথা ব্যবহৃত হতো। দুনিয়াজুড়ে মেনোপজ হয়ে যাওয়া মধ্যবয়সী নারীরা মুড়ি-মুড়কির মতো এই অধিকার কিছুদিন গিলে খাবার পর বলা হলো যে, দুটি বড় গবেষণায় হরমোন থেরাপিতে উপকারের চাইতে ঝুঁকি বেশি প্রমাণিত হওয়ায় সুস্পষ্ট প্রয়োজন ব্যতিরেকে মহিলাদের হরমোন ব্যবস্থাপত্র দেওয়া উচিত নয়। কালি ও কলম প্রথম বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যায় পূরবী বসুর জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির জয়গান পড়তে গিয়ে একথা মনে পড়ল। আজ পর্যন্ত আবি®কৃত জন্মশাসন-পদ্ধতিগুলোর মধ্যে পিল নিরাপত্তা ও ঝুঁকিহীনতার দিক থেকে একেবারে প্রথম সারিতে নেই, যদিও একথা সত্যি যে, ষাটের দশকে পিলের ব্যাপক জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়ে নারীদের এক ভিন্ন ধরনের নারী-স্বাধীনতার স্বাদ দিয়েছিল। নিজ-শরীর ও জরায়ুর ওপর পূর্ণ অধিকার নারীকে যৌনতার ক্ষেত্রে যে-নিশ্চিত স্বাধিকার এনে দেয় তার আনন্দে বহুদিন অবধি নারী এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে প্রায় অন্ধকারেই থেকে যায় বা থাকতে পছন্দ করে। এর পেছনে ছিল পিল বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও তার মালিক পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রমাগত প্ররোচনা। পূরবী বসু তাঁর রচনাতেই জানিয়েছেন যে, মনুষ্যদেহে পিলের প্রভাব-সংক্রান্ত বড় গবেষণাটি আমেরিকাতে করা সম্ভব না হওয়ায় তা শেষে করা হয় পোর্তোরিকোতে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এ নতুন কোনো তথ্য নয় এবং এ-নিয়ে বিস্তর তর্কবিতর্ক হয়ে গেছে। আজ পর্যন্ত অনেক ঝুঁকিপূর্ণ গবেষণাই পশ্চিমা উন্নত দেশের উন্নত মানুষের দেহে করার ‘অনুমতি’ মেলেনি, যদিও তা তৃতীয় বিশ্বের ছোট কোনো দেশে বা আফ্রিকার কোনো জনপদে সহজেই করে ফেলা গেছে। দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর মতে, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জনসংখ্যা, সুতরাং এখানে নারীদের শরীরে নরপ্ল্যান্ট জাতীয় জন্মনিরোধক-টিকা বসিয়ে তারা আমাদের উন্নয়ন করতে মনস্থ করেন, যদিও তখনো পর্যন্ত মানবদেহে এ-ধরনের টিকার কুপ্রভাব নিয়ে তেমন বড় কোনো গবেষণাই হয়নি! তৃতীয় বিশ্বের নারীরা এভাবে বহুবারই পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর গিনিপিগে পরিণত হয়েছে আর এর মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়েছে তথাকথিত নারী-স্বাধীনতা! তাছাড়া পিল-আবিষ্কারের পর পরিবারের মাথা নিয়ন্ত্রণের দায় পুরোপুরি এসে পড়ে নারীরই ওপর এবং পুরুষ বা স্বামী এইসব ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলতে পারে। শোষণের হাতিয়ার শেষ পর্যন্ত পুরুষের হাতেই থেকে যায়, মাঝখান থেকে নারীকে নিজ স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে পরিবার-পরিকল্পনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। পরবর্তীকালে নারীর শরীরে পিলের নানা ক্ষতিকর প্রভাব, যেমন – উচ্চ রক্তচাপ, ওজনবৃদ্ধি বা স্তন-ক্যান্সার ইত্যাদি-সম্পর্কে জানা গেলে এবং অধিক নিরাপত্তা ও সংক্রমণ-প্রতিরোধ-ক্ষমতার কারণে গবেষক ও চিকিৎসকরা আবার কনডম-ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে শুরু করেন, যদিও আমাদের মতো দেশে পিলের অফুরন্ত সরবরাহ অব্যাহত থাকে। এইসব বিতর্ককে পূরবী বসু ‘অতি উৎসাহী নারীবাদীদের আপত্তি’ বলে অভিহিত করেছেন। উপরন্তু তিনি পিল-আবিষ্কারের ঘটনাকে পশ্চিমা নারীবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গিতেই যৌন বিপ্লব হিসেবে নিয়েছেন, পরিবারের কাঠামো-নিয়ন্ত্রণ এবং সন্তানের সংখ্যা ও বয়সের ফারাক নির্বাচনে নারীর মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখেননি। প্লেবয় বা সেক্স অ্যান্ড সিঙ্গল গার্ল জাতীয় পত্রিকা যে নারীকে ক্রমশ এক যৌনসামগ্রীতে বা সেক্সি বারবি-ডলে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করেছে, তা হয়তো লেখকের মনে হয়নি। যখন দুনিয়াজুড়ে পারিবারিক ও সামাজিক নৈতিকতা পুনরুদ্ধার করতে প্রাচ্যদেশীয় যৌনাচারকে মডেল ধরা হচ্ছে, তখন আমাদের পশ্চিমা নারীবাদকে নিজেদের করে তোলার প্রয়াস না নেওয়াই উচিত। পশ্চিমের প্রেসক্রিপশন যে প্রাচ্যে খাটে না তা ইতোমধ্যেই অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়নি কি?
তানজিনা হোসেন এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.