সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে যেমন জেনেছি

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আজ আমাদের মাঝে শুধুই স্মৃতি। তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবকতুল্য। আমাদের একান্ত কাছের লোক। কালি ও কলমের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন তিনি। সপ্তাহান্তে দু-একবার দেখা হতো তাঁর সঙ্গে। যতটুকু সময় থাকতেন, গল্পে, আলাপ-আলোচনায় আমাদের মাতিয়ে রাখতেন। আমাদের সৌভাগ্য যে, তাঁর মতো একজন ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে আমরা আসতে পেরেছিলাম।

মনজুরুল ইসলাম সম্বন্ধে যতটুকু জেনেছি, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই শিক্ষক সমাচার নামে একটি পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে তিনি তাঁর প্রথম গল্প ‘বিশাল মৃত্যু’ লিখে ফেলেন। এর মধ্য দিয়ে ছোটকাল থেকেই তাঁর মধ্যে প্রতিভার ছাপ দেখতে পাই আমরা। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রতিভা তাঁকে একজন সম্পন্ন মানুষ করে তোলে।

অধ্যাপক মনজুরুল ইসলাম কালি ও কলমের পাশাপাশি ছিলেন ত্রৈমাসিক ইংরেজি পত্রিকা Jamini ও চিত্রকলাবিষয়ক ত্রৈমাসিক শিল্প ও শিল্পীর সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য। সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার কালি ও কলমে এসে কবি-লেখকদের পাঠানো লেখা বাছাই ও লেখাগুলো দেখে দিতেন তিনি এবং কালি ও কলমের সম্পাদক সুব্রত বড়ুয়া। মনোযোগ দিয়ে সেগুলো সংশোধন করতে হতো আমাদের। ইংরেজির অধ্যাপক হলেও বাংলায় তিনি ছিলেন পারদর্শী।

তাঁর মধ্যে জ্ঞানের গরিমা কখনো আমরা দেখতে পাইনি। লেখা সংশোধনের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে তিনি কোনো লেখা সংশোধন করতেন না। অনেক শব্দে তিনি প্রশ্নবোধক চিহ্ন ব্যবহার করতেন। আমরা সেগুলো অনুসন্ধান করে জেনে নিয়ে তাঁর সঙ্গে পরামর্শক্রমে ঠিক করতাম। লেখার ঘাটতি থাকলেও নিম্নমানের লেখাকে তিনি ও সুব্রত বড়ুয়া কখনোই প্রশ্রয় দিতেন না। ছেনে-বেছে শুধু উপযুক্ত লেখাগুলোকেই তাঁরা স্থান দিতেন কালি ও কলমে

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন একজন বরেণ্য কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্য-সমালোচক। ছিলেন একজন গবেষকও। সেইসঙ্গে অনুবাদও করেছেন। কালি ও কলমে অনুবাদ গল্প ও অনুবাদ সাহিত্যগুলো তিনি অত্যন্ত যত্ন করে সম্পাদনা করতেন। কঠিন ও দুর্বোধ্য শব্দ সর্বদা পরিহার করতেন। 

চিত্রকলা সম্বন্ধেও তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক শিল্প ও শিল্পীতে চিত্রকলা সম্বন্ধে তাঁর বেশ কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। লেখাগুলো এতই সমৃদ্ধ ছিল যে, ওই পত্রিকার সম্পাদক আবুল হাসনাত তাঁর বেশিরভাগ লেখাকে হাইলাইট করতেন। ইংরেজি ত্রৈমাসিক যামিনীতেও তাঁর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

বেঙ্গলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দিতেন কখনো বক্তা আবার কখনো সভাপতির আসন অলংকৃত করে। তিনি ছিলেন খুবই মৃদুভাষী। দু-চার কথায় তাঁর বক্তৃতাপর্ব শেষ করতেন। ২০২৪-এর কালি ও কলমের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে একসঙ্গে মঞ্চে উপবিষ্ট হন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও তিনি। সেখানে আমরা লক্ষ করি, অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে তাঁর শিক্ষক বলে পরিচয় দিতে। এতেই তাঁর ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়।

গল্পে ও আড্ডায় তিনি ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। আমরা যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে চিনেছি, তিনি ছিলেন রাজনীতিবিমুখ একজন মানুষ। ঠাট্টাচ্ছলেও তিনি কখনো কোনো আলোচনায় রাজনীতিকে তুলে আনতেন না। মোট কথা, তিনি ছিলেন একজন সদালাপী ও হাসিখুশি মানুষ। সমাজে তিনি একজন শিক্ষক ও সাহিত্যিক হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। 

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন সমকালীন বাংলাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের আলোচিত একজন মানুষ। পিতার আদর্শ অনুসরণ করে একজন আদর্শ শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন এবং অবশ্যই হতে পেরেছিলেন তিনি। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ৭৪ বছর বয়সে এ-বাসভূমের মায়া ত্যাগ করেন, যা আমাদের কাছে চরম অপ্রত্যাশিত ও অনাকাক্সিক্ষত। তাঁর মৃত্যু আমাদের ও আমাদের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।‘‘‘‘‘‘‘