প্রায় বছর কুড়ি আগে, বইপত্র নিয়ে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে আলাপন

২০০৭ সালের আগস্টে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন কবি পিয়াস মজিদ। সেই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছিল সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চাসহ দেশ-বিদেশের
সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং পাঠাভ্যাস নিয়ে তাঁর ভাবনা। সাক্ষাৎকারটি এ-সংখ্যায় পত্রস্থ করা হলো।

আপনার প্রথম লেখা কোথায় প্রকাশিত হয়?

যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি, ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত শিক্ষাবার্তা নামে একটি ম্যাগাজিনে। একটি গল্প। শিক্ষাবার্তার ওই সংখ্যাটি ছিল শিশু-কিশোর সাহিত্য নিয়ে।

সম্প্রতি কী পড়ছেন?

মাত্র কিছুদিন আগে আমার এক সহকর্মী লন্ডন থেকে আমার জন্য সেজার ভায়োহোর Trilce এবং Complete letter & Poems ১৯২৩-১৯৩৮ নিয়ে এসেছেন। দুটি কবিতার বই-ই দ্বিভাষিক। বাঁদিকে স্প্যানিশ, ডানে ইংরেজি, ভায়োহো আমার প্রিয় কবিদের একজন। প্রচুর আনন্দ নিয়ে বই দুটি পড়েছি।

আপনার সংগ্রহের প্রিয় বইগুলোর কথা বলবেন?

একটি নয়, আমার সংগ্রহের অনেক বই-ই আমার প্রিয়। এগুলো প্রিয় মানুষ আমাকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন অথবা আমি অনেক আগে পয়সা বাঁচিয়ে কিনেছি। শামসুর রাহমানের কয়েকটি বই, যেগুলোতে তিনি নিজের হাতে কিছু কথা লিখে দিয়েছেন, যা শুধু তাঁর মতো বড় মানুষের পক্ষেই সম্ভব; শওকত ওসমানের কয়েকটি বই, যার প্রথম দুই পৃষ্ঠা জুড়ে বড় বড় অক্ষরে চার-ছ’লাইনের ছড়া এবং সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি বই, তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত। এ-তালিকায় আরো আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে দেওয়া কয়েকটি বই (বার্ট্রান্ড রাসেলের বিইং অ্যান্ড নাথিংনেসসহ) যেগুলো ‘পোপ স্বর্ণপদক’ পাওয়ার সূত্রে উপহার হিসেবে জুটেছিল।

বই নিয়ে আপনার কোনো স্মরণীয় ঘটনা থাকলে বলুন।

১৯৭৩ সালে একটি বিদেশি সংস্থা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে একটি বই বিক্রির মেলা করে। সে-মেলার শেষ দিনে পানির দামে বেশ কিছু বই তারা বিক্রি করে। আমি ত্রিশ টাকায় প্রায় কুড়িটি বই সেখান থেকে কিনেছিলাম। বই কিনে এরকম তৃপ্তি কখনো পাইনি। … আরেকবার ভারতের মাইসোরে কমনওয়েলথ সাহিত্য প্রতিযোগিতার জুরি সদস্য হিসেবে গিয়ে প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক মার্গারেট ড্র‌্যাবলের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি শহরের একটি বইয়ের দোকান থেকে তাঁর লেখা জেরুজালেম দি গোল্ডেন বইটি কিনে আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। এই বইটি আমার টেবিল থেকে একদিন উধাও হয়ে গেল। বছর দুয়েক আগে বইটি নীলক্ষেতের ফুটপাতে দেখে সেটি আবার কিনে নিই।

পল্টন, নীলক্ষেত ইত্যাদি বিকল্প বইবাজার থেকে বই কেনার অভিজ্ঞতা আছে কি?

এখন অতটা বই কিনি না, আগে যতটা কিনতাম। অনেক মূল্যবান বই কিনেছি। কাজী আবদুল ওদুদের নিজের স্বাক্ষর করা বাংলার জাগরণ, শামসুর রাহমানের স্বাক্ষরযুক্ত প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, ইউরোপীয় ক্লাসিক বলে খ্যাত অনেক বই, কার্ল মার্কসের অনেক বই। তবে সবচেয়ে মজার বই ক্রয় ছিল ১৯৭২ সালে আড়াই টাকা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পগুচ্ছ, যাঁর মালিক একসময় ছিলেন কলকাতার নামকরা অভিনেতা বসন্ত চৌধুরী। কীভাবে বইটি নীলক্ষেতের ফুটপাতে এলো সে এক রহস্য!

অর্থনীতির মন্দাভাব কি মধ্যবিত্তের বই কেনার ওপর প্রভাব ফেলছে?

নিশ্চয়। বইমেলা থেকে নিত্যদিনের সামগ্রী কেনাটা এখন অগ্রাধিকারের বিষয়, যেহেতু সব পণ্যের দাম হুহু করে বাড়ছে। তবে বাংলাদেশ বরাবরই বই-অবান্ধব দেশ। এদেশে বইয়ের ওপর আমদানি শুল্ক বহাল থাকে, কিন্তু এয়ারকুলারের ওপর থেকে শুল্ক উঠিয়ে নেওয়া হয়। গত বাজেটের আগে প্রধান উপদেষ্টার কাছে বইয়ের ওপর আমদানি শুল্ক তুলে দেওয়ার জন্য আমরা ক’জন মিলে আবেদন করেছিলাম। তেমন কোনো কাজ হয়নি। এই সরকারও যদি বইকে ভোগ্যপণ্য সামগ্রী হিসেবে দেখে, বইয়ের দাম এদেশে যে বাড়বে, তাতে আর সন্দেহ কি!

ইন্টারনেটের সহজপ্রাপ্যতা কি বইবিমুখ সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে বলে আপনার আশঙ্কা?

মোটেও না। যেসব দেশে বই সংস্কৃতিটি পুরনো অথবা প্রতিষ্ঠিত, সেসব দেশে ইন্টারনেট বইকে আরো প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, বিক্রি বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে বইয়ের দোকানে গিয়ে বড়জোর প্রকাশকের কাছে চিঠি লিখে বই কেনা বা বইয়ের অর্ডার দেওয়া হতো, এখন ইন্টারনেটে তা করা যাচ্ছে। ইন্টারনেটের আবির্ভাব এবং বিকাশ সবচেয়ে বেশি যেখানে, সেই পশ্চিমে, বই বিক্রি দিন দিন বাড়ছে। আমাদের দেশে বইয়ের বিক্রি এমনিতেই কম, এখানে ইন্টারনেটের তেমন কোনো প্রভাব নেই। ইন্টারনেট ব্যবহার করেইবা ক’জন?

গল্প-কবিতার বই পাওয়া গেলেও জরুরি গবেষণামূলক বইপত্রের ঘাটতি আছে আমাদের। এটি কি আমাদের বৃদ্ধিবৃত্তিক দীনতা বলে মনে করেন?

না, বুদ্ধিবৃত্তিক দীনতা নয়, বরং বুদ্ধির চর্চার অভাব। আমাদের দেশে গবেষণার ক্ষেত্রে একটা শৈথিল্য দেখা যায়। অভাব দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেসব গবেষণা হয় তার মান নিচু এবং দু-এক ব্যতিক্রম ছাড়া গৎবাঁধা। এই গৎবাঁধা গবেষণায় বুদ্ধিবৃত্তির চ্যালেঞ্জগুলো গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। সাহসী গবেষণাকে এখানে নিরুৎসাহিত করা হয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও (বাংলা একাডেমি, এশিয়াটিক সোসাইটি) যে-গবেষণা হয় (বাংলা একাডেমি গবেষণাধর্মী বই প্রকাশ করে) সেগুলোও প্রায় গতানুগতিক। এই একটা জায়গায় আমাদের সক্রিয় হতে হবে। তবে আশার কথা, ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকেই সাহসী গবেষণা করছেন।

বিশ্বসাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সাহিত্য কোন মানে আছে?

এই তুলনামূলক আলোচনা এবং মূল্যায়নটি অনেক সময় বিভ্রান্তির জন্ম দেয়, যেহেতু বিশ্বসাহিত্য বিষয়টি খুবই ব্যাপক এবং তুলনার কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। বিশ্বসাহিত্যে চৈনিক অথবা আরবি অথবা জাপানি সাহিত্য অন্তর্ভুক্ত, অথচ এগুলো সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞানই নেই। আমি যেটুকু সাম্প্রতিক পশ্চিমা সাহিত্য পড়েছি তাতে মনে হয়েছে, আমাদের সাহিত্যে চিন্তার পরিধিটা তেমন পরিব্যাপ্ত নয়, যতটা পশ্চিমা সাহিত্যে দেখা যায়। আমাদের অভিজ্ঞতাও সীমিত। প্রকাশের ক্ষেত্রেও আমাদের প্রকরণশৈলী ততটা নিরীক্ষাধর্মী নয়। এর মধ্যে অবশ্যই ব্যতিক্রম আছে। কয়েকজন কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার যেসব কাজ করেছেন তা পশ্চিমা মানের বিচারে উত্তীর্ণ। কিন্তু ব্যতিক্রম তো সাধারণকে প্রতিষ্ঠা করে না। প্রবন্ধসাহিত্যে আমরা অনেকটাই দুর্বল।

ষাটের দশকের মতো বর্তমানে আমাদের দেশে কোনো সাহিত্যিক পালাবদল কি ঘটছে?

সাহিত্যক কোনো দশকওয়ারি উৎপাদনের খতিয়ানে ফেলা যায় না। ষাটের দশকে আমাদের দেশে যা হয়েছিল, তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল ১৯৫২ থেকে। তারপর বৈশ্বিক পরিণ্ডলে ওই সময়টা ছিল খুবই ঘটনাবহুল, যার প্রভাব পড়েছে সাহিত্যে। ষাটের ব্যাপারটা ছিল বাংলাদেশের সাহিত্যে আধুনিকতার সরব উত্থান ও প্রকাশ। বর্তমানে
যে-সাহিত্য লেখা হচ্ছে, এটি গত শতাব্দীর শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া একটা পালাবদলেরই ক্রমিকতা। এই পালাবদল জীবন ও অভিজ্ঞতাকে দেখার নতুন কিছু অনুপ্রেরণা থেকে ঘটেছে। আধুনিকতার অনেক প্রকাশ রীতিরুদ্ধ হয়ে গেছে। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নতুন প্রকাশ ঘটানোর তাগিদ থেকে এই পালাবদল।

বাংলাদেশে লিটল ম্যাগাজিন চর্চা নিয়ে কিছু বলুন।

এই একটা জায়গা নিয়ে আমি বরাবরই উচ্ছ্বসিত, আশাবাদী, বড় কাগজগুলোর সাহিত্য পাতার পরিসর খুবই সীমাবদ্ধ। প্রতিষ্ঠিত ম্যাগাজিনগুলোর আয়োজনও ব্যাপক নয়। অথচ লিটলম্যাগ বিশাল লেখক ও পাঠকশ্রেণি তৈরি করে যাচ্ছে। প্রতিবছর আমি সাম্প্রতিক সময়ে যত চমৎকার, সাহসী এবং নিরীক্ষাধর্মী লেখা পড়েছি – গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ; তার একটা বড় অংশ লিটল ম্যাগাজিনে।

সাম্প্রতিক তরুণদের লেখালেখি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাচ্ছি। খুবই ইতিবাচক। তরুণরা সব সময় নতুনকে ধারণ করতে চান; প্রচলকে অস্বীকার করে নিজস্ব ধারা সৃষ্টি করতে চান। বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে। তবে অনেকের মধ্যে একটা তাড়াহুড়োর ভাব দেখি এবং প্রচুর পড়াশোনা ও অভিনিবেশের অভাব দেখি। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।