সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘দুর্গাকুমার পাঠশালা’য় না পড়লেও এর প্রতি আমি কেমন এক আকর্ষণ বোধ করি। এর একটিই কারণ – এই পাঠশালা উনিশ শতকের সিলেটের একজন বরেণ্য শিক্ষাবিদ দুর্গাকুমার বসুর নাম ধারণ করে আছে। সিলেটে বালকদের একটি সরকারি স্কুল ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও স্কুলটি ভালো চলছিল না। সিপাহী বিদ্রোহের পর, ১৮৫৮ সালের মে মাসের পর কোনো একসময়, ছাত্রাভাবে সরকারি স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন সেই স্কুলের অব্যবহৃত কক্ষগুলো ব্যবহার করে সেখানে বালকদের স্কুল চালানোর দায়িত্ব পান সুদূর ওয়েল্স থেকে ধর্মপ্রচারের জন্য সিলেটে আসা প্রেসবাইটেরিয়ান পাদ্রি রেভারেন্ড প্রাইস। সিলেট ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারে রেভারেন্ড প্রাইসের সাফল্য সীমিত হলেও তিনি ছিলেন একজন সফল শিক্ষাব্রতী। তিনি সুরমা উপত্যকায় আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তনের পথিকৃৎ। রেভারেন্ড প্রাইসের পর স্কুলটি অন্য পাদ্রিদের হাতে পড়ে উঠে যাওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু শিক্ষাব্রতী উইলিয়াম প্রাইস ততদিনে সিলেটে আধুনিক শিক্ষার একটি ভিত গড়ে দিয়ে গেছেন। তিনি নিজে না থাকলেও রেখে গেছেন তাঁর দক্ষ শিষ্যদের। যাঁদের প্রচেষ্টায় শেখঘাটের মিশনারি স্কুলের ছাই থেকে ১৮৬৯ সালের মে মাসে ‘মনা রায়ের টিলা’য় (বর্তমানে ‘জজের টিলা’ নামে পরিচিত) ফিনিক্স পাখির মতো সিলেটের গভর্নমেন্ট স্কুল আবারো জেগে ওঠে। এই মহতী কাজে যুক্ত ছিলেন প্রাইসের ছাত্র ডেপুটি ইন্সপেক্টর অফ স্কুলস নবকিশোর সেন এবং মিশনারি স্কুলের হেডমাস্টার দুর্গাকুমার বসু। সেই সময় থেকে একটানা ৩৪ বছর (১৮৬৯ থেকে ১৯০৩ সাল) দুর্গাকুমার বসু সিলেট গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
এই ‘দুর্গাকুমার পাঠশালা’র প্রতি আমার আকর্ষণ বোধ করার আরো দুটি ব্যক্তিগত কারণ আছে। একটি হলো, শতাধিক বছর পূর্বে, গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে আমার বাবা এই পাঠশালার ছাত্র ছিলেন। আর অন্য কারণ – একসময় এই স্কুলে রক্ষিত একটি বাঁধানো ছবি (এখন আছে কি না জানি না)। ছবিটি ১৯৬০ সালে প্রাথমিক বৃত্তি পাওয়া ছাত্রদের। এই ছবির বালকদের মধ্যে দুজন ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠজন – একজন আমার অগ্রজ চৌধুরী মুশতাক আহমদ ও অন্যজন আমার শিক্ষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। এঁদের প্রথমজনের জীবনাবসান ঘটে সাত বছর আগে; দ্বিতীয়জন সদ্যপ্রয়াত।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে সরকারি হওয়ার পর ‘দুর্গাকুমার পাঠশালা’র নাম হয় দুর্গাকুমার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরে পরিচালক থাকার সময় আমার অনুরোধ ও সমর্থনে স্কুল কর্তৃপক্ষ ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠের আদি নাম ফিরিয়ে আনেন এবং স্কুলের সাইনবোর্ডে বড় হরফে ‘দুর্গাকুমার পাঠশালা’ লেখা হয়। এটি ছিল সিলেটের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি এক বিনম্র শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। সিলেটের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ মুরারীচাঁদ কলেজ বা এম.সি. কলেজের উপরও সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো অন্য একটি নাম চেপে বসেছিল। এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্র হেদায়েত আহমেদ শিক্ষা সচিব হওয়ার পর তাঁর উদ্যোগে কলেজটির আদি নাম ফিরিয়ে আনা হয়।
দুই
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে চেনার আগে, শৈশব থেকেই আমার ভাইয়ের সহপাঠী মনজুরভাইয়ের নাম শুনেছি। দুর্গাকুমার পাঠশালার পর সিলেট গভর্নমেন্ট (পাইলট) স্কুলে তাঁরা একসঙ্গে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। আমার ভাই ময়মনসিংহের সিটি কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৬৬ সালে এসএসসি পাশ করেন এবং সে-বছরই সিলেট থেকে মনজুরভাইয়ের পাশের খবর আসে। দু-বছর পর দুজনই এইচএসসি পাশ করেন – মনজুরভাই সিলেট এম.সি কলেজ থেকে আর আমার ভাই ময়মনসিংহ এ.এম কলেজ থেকে। পাশ করার পর মনজুরভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেন, আর আমার ভাই ভর্তি হলেন বুয়েটে আর্কিটেকচার বিভাগে। আমার সাহিত্যিক বাবার ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ছিল এবং তিনি চেয়েছিলেন তাঁর মেধাবী পুত্র ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ুক। কিন্তু আর্কিটেকচারে আমার ভাইয়ের আগ্রহ দেখে তিনি পুত্রের পছন্দ মেনে নেন। না হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে দুই সতীর্থের পুনর্মিলন হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনজুরভাইয়ের ভালো ফল এবং তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার খবর শুনে আমার ভাই, বাবা-মা খুব খুশি হয়েছিলেন।
দুর্গাকুমার বসুর ৬৪ বছর পর ১৯৬৭ সালে সিলেট গভর্নমেন্ট (পাইলট) হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের পিতা সৈয়দ আমিরুল ইসলাম। জেলা শিক্ষা অফিসার পদ থেকে অবসরে যাওয়ার সময় হলে সরকার তাঁর চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে আমাদের ‘হেডস্যার’ করে পাঠায়। আগের বছর এই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ-করা মনজুরভাই তাঁর রাশভারী পিতাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পাননি, আমরা পেয়েছিলাম। তিনি আমাদের ক্লাস নিতেন না, তবে একদিন নির্ধারিত শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে আমাদের একটি ক্লাস নিয়েছিলেন। ক্লাসে ঢুকে ব্ল্যাকবোর্ডে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’র দুটি লাইন লিখে সারমর্ম লিখতে বলেন,
চন্দ্র কহে বিশ্বে আলো দিয়েছি ছড়ায়ে
কলঙ্ক যা আছে তা আছে মোর গায়ে।
স্কুলে আমার ছোট ভাই ও আমি খুব সচেতন থাকতাম যাতে কোনো অপকর্মে ধরা পড়ে কোনোভাবেই হেডস্যারের সামনে যেতে না হয়, কারণ হেডস্যার ছিলেন আমাদের পিতা মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর শিক্ষা বিভাগের সহকর্মী ও বন্ধু। আমার বাবা তাদের মণিপুরি রাজবাড়ি এলাকার বাড়িতে যেমন যেতেন, তেমনি আমাদের দুই ভাইকে শশব্যস্ত করে এবং আমাদের পাড়ার যারা তাঁর ছাত্র ছিল, তাদের অসীম কৌতূহল উদ্রেক করে হেডস্যারও মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় আসতেন। দুজনের মধ্যে সাহিত্য, ইতিহাস, শিক্ষা ইত্যাদি নানা বিষয়ে আলোচনা হতো। আমার মায়েরও তাঁদের বাসায় যাওয়া-আসা ছিল। মনজুরভাইয়ের আম্মা, সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাগ্নি, রাবেয়া খাতুন আমার বাবাকে ভাই ডাকতেন। তিনি সিলেট সরকারি (অগ্রগামী) বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিলেন। আমার বোন সেই স্কুলের ছাত্রী ছিল। আমার দু-বছরের জুনিয়র ছিল মনজুরভাইয়ের ছোটভাই লিটন। সে খুব মেধাবী ছিল, বোর্ডে স্ট্যান্ড করেছিল। এখন সে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো এক ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। আমি যখন সিলেট এম.সি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে ভর্তি হই, তখন সেখানে ইংরেজিতে অনার্স পড়তেন মনজুরভাইয়ের পিঠাপিঠি ছোটবোন বেবী আপা। এক বছর পড়ার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়তে আসেন। মনজুরভাই তখন ডিপার্টমেন্টের তরুণ শিক্ষক। বেবী আপা মনজুরভাইকে ‘দাদাই’ ডাকতেন। সে-কারণে বেবী আপার সহপাঠীদেরও ‘দাদাই’ হয়ে যান মনজুরভাই।
তিন
মনজুরভাই কানাডা থেকে পিএইচ.ডি শেষ করে আবার ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে যোগ দেওয়ার পর তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। তখন থেকে তিনি আর মনজুরভাই নন, মনজুর স্যার, intervention, ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের ছাত্রদের SMI। একদিন তাঁর রুমে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়েছিলাম।
তিনি কানাডার কিংস্টনের কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইরিশ কবি ইয়েটেসর কবিতায় ইমানুয়েল সুইডেনবর্গের দর্শনের প্রভাবের ওপর পিএইচ.ডি করে এসেছিলেন। মাস্টার্সে তিনি আমাদের ইয়েটসই পড়াতেন। এখনো মনে আছে ইয়েটেসর বিখ্যাত ‘The Second Coming’ কবিতাটি তিনি খুব গুরুত্ব দিয়ে পড়িয়েছিলেন। কবিতার প্রথম লাইন Turning and turning in an widening gyre-Gi gyre-এর অর্থ বুঝিয়েছিলেন যত্নের সঙ্গে। কবিতায় ব্যবহৃত ল্যাটিন শব্দবন্ধ Spiritus mundi যাতে আমাদের মাথার উপর দিয়ে সাঁ করে চলে না যায় তার জন্য তিনি বেশ সময় নিয়ে আমাদের মাথায় ঢোকানোর চেষ্টা করেছিলেন। আমরা একেকজন নিজের মতো করে এর মানে বুঝেছি বা বোঝার ভান করেছি। আবার কোনো কোনো কবিতার দু-লাইন বোঝাতে খুলে দিয়েছেন গ্রিক মিথলজির ভাণ্ডার, যেমন –
A shudder in the loins engenders there
The broken wall, the burning roof and tower
And Agamemnon dead.
শিক্ষক হিসেবে মনজুর স্যার ছিলেন খুবই সময়নিষ্ঠ, মনোযোগী এবং জনপ্রিয়। সদাহাস্যোজ্জ্বল ঝগও ছিলেন সবার পছন্দের। আমাদের ফাইনাল পরীক্ষার পর রেজাল্ট তখনো অফিসিয়ালি প্রকাশিত হয়নি। হঠাৎ একদিন খবর জানা গেল ঝগও-এর কাছে নাকি রেজাল্ট এসে গেছে। কেউ কেউ জেনেও ফেলেছে। শুনলাম কেউ ফার্স্ট ক্লাস পায়নি – এতে অবশ্য আমার দুশ্চিন্তার কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু থার্ড ক্লাসের ছড়াছড়ি শুনে দুশ্চিন্তা শুরু হলো। দুরু দুরু বক্ষে আমি স্যারের রুমে উঁকি দিলাম। মনজুর স্যার দেখে বললেন – ‘এসো। রোল নম্বর কত?’
ছাত্রদের সঙ্গে মনজুর স্যারের একটি বন্ধুত্বপূর্ণ, সহজ সম্পর্ক ছিল। অনেক প্রাক্তন ছাত্রের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল। তাঁর মুখে কোনো কোনো প্রাক্তন ছাত্রের প্রশংসা যেমন শুনেছি, তেমনি অনেক ছাত্রও স্যারের সঙ্গে তাঁদের মধুর স্মৃতির কথা বলেন। তাঁর এরকম একজন ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে এবং সরকারি চাকরিতে আমার জ্যেষ্ঠ খোন্দকার মো. আসাদুজ্জামান একটি স্মৃতিচারণা করেছিলেন। তখন তিনি একজন নবীন কর্মকর্তা, একটি মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব। বিদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য তাঁর শেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষকের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন ছিল। একদিন তিনি ইংরেজি বিভাগে গিয়ে তাঁর প্রিয় শিক্ষক মনজুর স্যারের সঙ্গে দেখা করেন। অসংখ্য ছাত্রের ভিড়ে মনজুর স্যার তাঁর এই ছাত্রটিকে আলাদাভাবে স্মরণ করতে পারবেন না – সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিষয়টি শোনামাত্র স্যার কোনো দ্বিধা না করে বিভাগের প্যাড টেনে নিয়ে খসখস করে প্রয়োজনীয় সনদটি লিখে দিলেন। বেশকিছু প্রশংসাসূচক বাক্য রইল তার মধ্যে। তবে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা ছিল, প্রার্থীর অধ্যয়নকালীন ‘দুর্বল দিক’ও সনদে উল্লেখ করতে হবে। এতদিন পর কারো চরিত্রের নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য মনে থাকার কথা নয়; কিন্তু কিছু তো লিখতে হবে। মনজুর স্যার লিখলেন : ‘তার কখনো কখনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়ার প্রবণতা ছিল।’ নিয়ম রক্ষা হলো, কিন্তু বাক্যটি নিরীহ। সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না।
সরকারের সচিব পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর মনজুর স্যারের এই প্রাক্তন ছাত্র যুক্ত হন শিশু সংগঠন
কচি-কাঁচার মেলার সঙ্গে। মনজুর স্যারও ছিলেন মেলায় নিবেদিতপ্রাণ, সংগঠনের ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যতম সদস্য। এ-ছাড়াও নানা কাজে ও অনুষ্ঠানে-আয়োজনে তাঁদের সাক্ষাৎ হতো প্রায়শ। মনজুর স্যার তাঁর ছাত্রের প্রশংসা করতেন, আর আসাদুজ্জামানের ভাষায় – মনজুর স্যার ছিলেন আমাদের জগতের সবচেয়ে ‘সুস্থ ও সবল’ মানুষদের একজন, তাঁর স্নেহময় সান্নিধ্য ছিল তাঁর এক পরম প্রাপ্তি।
চার
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগ দেওয়ার পর আমার উদ্যোগে দেশের কয়েকজন শিক্ষাবিদ নিয়ে মন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি পরামর্শক কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটিতে আমরা মনজুর স্যারকে রেখেছিলাম। কমিটির সভায় এলে মনজুর স্যার মনোযোগ দিয়ে আলোচনা শুনতেন, কারো কথা থামিয়ে দিয়ে কিছু বলতেন না। মতামত দিতে বললেই তাঁর মতামত দিতেন। একসময় আমরা দুজন একসঙ্গে সিলেট মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটির সিন্ডিকেট মেম্বার ছিলাম। সেখানেও তাঁর কাজে গভীর একাগ্রতা ও আন্তরিকতা দেখেছি। মাঝেমধ্যে আমি আশ্চর্য হতাম – এত কাজ, এত লেখালেখি, বক্তৃতা-আলোচনা, শিক্ষকতা সব একসঙ্গে নিপুণভাবে তিনি কী করে সামলান! আমার বড়ভাই কাহলিল জিবরানের দ্য প্রফেট বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। যখন বইটি ছাপার তোড়জোড় চলছিল, তখন একদিন আমার ভাই বললেন, ‘মনজুরকে বলেছি বইটার একটা ভূমিকা লিখে দিতে।’ শুনে আমি প্রমাদ গুনলাম। মনজুর স্যার এত ব্যস্ত থাকেন, সময় করে ভূমিকা লিখে দিতে না জানি কতদিন সময় নেন! কিন্তু আমার আশঙ্কা অমূলক প্রমাণ করে কয়েকদিনের মধ্যেই মনজুর স্যার তাঁর বন্ধুর বইয়ের একটি চমৎকার ভূমিকা লিখে পাঠালেন। সম্ভবত এজন্যই ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, Only busy people have time। কিছুদিন পর সরকারি কাজে আমি বিদেশ যাচ্ছি শুনে আমার ভাই তাঁর শৈশবের বন্ধুকে দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ উপহার নিয়ে আসতে বলেন। এনেছিলাম।
মনজুর স্যারকে ‘স্যার’ বললে বলতেন – ‘তুমি আমাকে স্যার বলো কেন? তুমি আমাকে ভাই বলবে।’ শিক্ষক হওয়ার সুবাদে তাঁদের পরিবারের দুজন আমার ‘স্যার’ হয়েছিলেন। আমি স্থানীয় সরকার বিভাগে কাজ করার সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বদলি হয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগে যোগ দিলেন যুগ্ম-সচিব সৈয়দ আনওয়ারুল ইসলাম। তিনি মনজুর স্যারের বড়ভাই। আনওয়ারভাইকে আমার উইংয়ের প্রধান করা হলো। অর্থাৎ আনওয়ার ভাইও সরাসরি ও পাকাপোক্তভাবে আমার ‘স্যার’ হলেন। সৈয়দ আনওয়ারুল ইসলাম স্যার ছিলেন একজন বিনয়ী মানুষ, প্রাজ্ঞ কর্মকর্তা। আমলাতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও তাঁর সঙ্গে আমার একটি আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর পোস্টিং ছিল পাকিস্তানে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সেখানে আটকা পড়েন। এসময় দেশে ফেরার জন্য গোপনে স্ত্রী ও শিশুকন্যা নিয়ে খচ্চরের পিঠে দুর্গম পাহাড়ি পথে আফগানিস্তান পৌঁছার এক লোমহর্ষক বর্ণনা শুনেছিলাম তাঁর মুখে। আমার অনুরোধে তিনি এই ঘটনার বর্ণনা লিখেছিলেন ‘ফেরা’ নাম দিয়ে। আমি একটি ম্যাগাজিনে লেখাটি ছেপেছিলাম। মনজুরভাইয়ের ছোট দুই বোন বেবী ও মিলি, আবার তাঁর দুই ভাবির নামও বেবী ও মিলি। বেবী ভাবি আনওয়ার ভাইয়ের স্ত্রী আর মিলি ভাবি মনজুর স্যারের অগ্রজ ব্যাংকার জাফরভাইয়ের স্ত্রী। আমি এমএ পাশ করার পর সিলেটের একটি বেসরকারি কলেজে পড়ানোর সময় মিলি ভাবি সেই কলেজে ছাত্রী হিসেবে ভর্তি হলেন। আমার ছাত্রী হলেও তিনি আমাকে ‘স্যার’ মনে করতেন না এবং আমি তাঁকে ভাবিই বলতাম।
সিলেট মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান তৌফিক চৌধুরী কিছুদিন আগে তাঁদের ইউনিভার্সিটির নতুন ক্যাম্পাসের ভেতর একটি চমৎকার পুকুর দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘মনজুরভাইয়ের কারণে এই পুকুর রাখতে হলো। মনজুরভাই বলেছিলেন – নতুন ক্যাম্পাসে পুকুর আর সুপারি গাছ না থাকলে তিনি মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটির সঙ্গে জড়িত থাকবেন না।’ সিলেট শহরের অসংখ্য দিঘি আর পুকুর হারিয়ে যাওয়ায় আক্ষেপ করে লেখা মনজুর স্যারের একটি সুন্দর স্মৃতিচারণমূলক লেখা পড়েছিলাম। মাত্র কয়েকদিন আগেও আমাদের সুন্দর শহরের পরিবেশ ধ্বংস হয়ে ‘শ্রীভূমি’ শ্রীহট্টের শ্রী নষ্ট হওয়া নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে; আমাদের স্কুলের পেছনের ঐতিহ্যবাহী বিশাল লালদিঘি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় মনজুরভাইয়ের খেদের শেষ ছিল না।
তিনি কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন। দু-বছর আগে কালি ও কলম থেকে ফোন করে আশফাক খান বলেন যে, মনজুর স্যার আমাকে রামমোহন রায়ের ওপর একটা লেখা দিতে বলেছেন। সে-বছর ছিল রামমোহনের মৃত্যুর ১৯০ বছর পূর্তি। আমি রামমোহন ও বিদ্যাসাগর নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। এরপর একদিন ফোনে কথা হলে তিনি আমাকে মীর মশাররফ হোসেনের উপর কাজ করতে বলেন। তিনি বলেছিলেন যে, মীর মশাররফ হোসেনের ওপর যেভাবে কাজ হওয়া উচিত, তা হয়নি। আমি তাঁর সঙ্গে একমত হই, তবে কাজটি এখনো শুরু করা হয়নি। কথাসাহিত্য ছাড়াও সাহিত্য-সমালোচনা, নন্দনতত্ত্ব ইত্যাদির পাশাপাশি সম্প্রতি Artificial Intelligence-এর ওপর তাঁর ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এশিয়াটিক সোসাইটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে তাঁর দুটি বক্তৃতা শুনেছি। দ্বিতীয় বক্তৃতাটি ছিল গত ২৮শে জুলাই।
পাঁচ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সাহিত্যাদর্শ ও রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে আমার চিন্তাভাবনার কিছু ফারাক ছিল। স্যারও হয়তো বিষয়টি জানতেন। নানা সময় একসঙ্গে কাজ করলেও তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা এড়িয়ে চলেছি। তবে রাজনীতির নামে কদর্যতা, ঘুষ-দুর্নীতি-তোষামোদির সর্বব্যাপিতা, আমলাতন্ত্রের দাপট, পরিবেশ নিধনের মচ্ছব – ইত্যাদির অকপট সমালোচনার ব্যাপারে আমরা একই তরঙ্গ-দৈর্ঘ্যে বিরাজ করতাম। তাঁর সঙ্গে আমার শেষ কথা হয় তিনি অসুস্থ বোধ করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কয়েকদিন আগে, গত পয়লা অক্টোবর। সিলেট গভর্নমেন্ট পাইলট হাই স্কুলের ঢাকাবাসী ছাত্রদের একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিতব্য স্মারকের জন্য একটি লেখা দিতে তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি সম্মত হয়েছিলেন এবং হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ নিয়ে লিখবেন বলেছিলেন। সেই লেখা আমরা আর পাবো না। আমাদের স্কুলের স্মারকে তাঁর স্মরণে আমাদের শোকবার্তা ছাপতে হবে!


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.