পৃথিবীর তাঁতঘর

ইন্ডাস্ট্রি শব্দটার ‘শিল্প’ ছাড়া আর কোনো ভালো বাংলা জানা আছে কি আমাদের? ইংরেজিতে I

Ndustry বলতে যা বোঝায়, Art বলতে তো তা বোঝায় না। তবে বাংলায় এই দুটোকেই ‘শিল্প’ শব্দটি দ্বারা প্রকাশ করা হয় বলে আমাদের জাতিগতভাবে কতগুলো দ্বিধার জায়গা তৈরি হয় – আমার কথা নয়। আমি তুলে ধরছি টাঙ্গাইল তাঁতশিল্পের দেড়শো বছরের ঐতিহ্যকে ধরে রাখা বসাক পারিবারের সদস্য নীলকমলের বক্তব্য। নীলকমল বসাককে ফোন করতে তিনি প্রথমত তাঁতশিল্পের ইতিহাস, শাড়ি তৈরির পদ্ধতিগত কৌশলসহ সমস্তটাই বললেন। কিন্তু সবশেষে তিনি যা বললেন, সেখান থেকে আমি শুরু করতে চাইলাম এই কারণে যে, টাঙ্গাইল শাড়ি সবেমাত্র একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু ২০২০ সালের পর থেকে তাঁতের সংখ্যা দশ হাজার থেকে কমে তিনশো-চারশোতে নেমে এসেছে। নীলকমল বসাকের মুখ থেকে যে-কথা শুনলাম, তাতে আঁতকে উঠতে হয়। সমস্যা দিয়ে শুরু করলে, যদি সমাধানের আশায় দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কিছুটা দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।

লোকশিল্পের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্যর মধ্যে একটি হলো, এর একটি ব্যবহারিক উপযোগিতা আছে। এখন যে বস্তুর ব্যবহারিক উপযোগিতা আছে, তা মানুষ নিজস্ব নান্দনিক চাহিদা থেকে অনেক সময় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায়। সেই শিল্পবস্তু কখনো চাহিদার কারণে শিল্পপণ্যে রূপান্তরিত হয়।

টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প বলতে কি আমরা বিশেষ শৈল্পিক দক্ষতা বুঝি? নাকি একটি industry বুঝি? ইউনেস্কো সাধারণত ইনটেনজিবল হেরিটেজের মর্যাদা একটি দক্ষতাকেই দিয়ে থাকে, যা মানুষের দক্ষতা। কোনো মেশিনের দক্ষতাকে এই intangible heritage-এর তকমা দেওয়া হয় না। যেভাবে ব্যবসায়িক সুবিধার আশায় Power Loom-এর আধিক্য বাড়ছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদি Handloom-এ নতুন করে কোনো তাঁতি আর দক্ষতা অর্জন করতে চাইছেন না। নীলকমল বসাকের কারখানায় চলে বিশটি হাতে বোনা তাঁত। এমন করে এখনো কিছু পরিবার
এ-শিল্পদক্ষতাকে কেন্দ্র করে দাঁত কামড়ে পড়ে আছেন।

চেলি কাপড়ের কথা অনেকেই শুনেছি। এই কাপড়ের ইতিহাস প্রায় চারশো বছরের পুরনো। ছয় মাসের অন্নপ্রাশনের সময়ে শিশুকে একটি নরম লাল কাপড় দিয়ে জড়ানো হতো। এই চেলি কাপড় মুর্শিদাবাদের মসলিন তাঁতিরা তৈরি করে দিতেন। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর চেলি তাঁতিরা এপারে এসে ঢাকার তেইশটি গ্রামে ছড়িয়ে পড়েন। এরপর তাঁরা বসতি স্থাপন করেন ঢাকার তাঁতীবাজার, ডেমরা ও ধামরাই অঞ্চলে। এপারে এসেও তাঁরা মসলিন দিয়ে চেলি কাপড় তৈরি করতেন। পরে পানি ও আবহাওয়ার কারণে চলে আসেন টাঙ্গাইল অঞ্চলে। শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরীর পানি তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। এ-পানি বেশ উপযোগী টাঙ্গাইল তাঁতশিল্পের জন্য। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী মো. তাজুল ইসলামের লেখা নদীবিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ বাংলাদেশের নদ-নদী ও অন্যান্য প্রসঙ্গতে তিনি বন্যাপ্রবণ ধলেশ্বরীকে শীতলক্ষ্যার সঙ্গে মিশে ভাটির দিকে জোয়ারভাটার প্রভাবযুক্ত নদী বলে উল্লেখ করেছেন। নারায়ণগঞ্জের নিকটবর্তী এ-দুই নদীর সংযোগস্থলে একসময় বাংলার গৌরবোজ্জ্বল মসলিন ও জামদানি তাঁতশিল্পের বিকাশ ঘটেছে। জোয়ারভাটার প্রভাব, আবহাওয়া সবই তাঁতশিল্পের অনুকূল পরিবেশ। তিনি আরো উল্লেখ করেন, ধলেশ্বরীতে ঠিকঠাক যমুনার প্রবাহ না আসায় ঢাকা-নারায়গঞ্জের আশপাশের অন্যান্য নদীতে তেমন প্রবাহ থাকে না। তবে টাঙ্গাইল অঞ্চলের পানির জোয়ারভাটার প্রভাব এখনো তাঁতশিল্পের উপযোগী।

টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লি বাংলার বুনিয়াদি হস্তশিল্প কেন্দ্র। দেলদুয়ারের পাথরাইল গ্রাম এই শিল্পের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

মূলত বসাক পরিবারের তাঁতিদের আগমনের মাধ্যমে টাঙ্গাইলে তাঁতশিল্পের সূচনা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ে জমিদারদের আমন্ত্রণে দেলদুয়ার, সন্তোষ ও ঘ্রিন্দা এলাকায় বসাক পরিবার প্রসার লাভ করে। ১৯০৬ সালের স্বদেশি আন্দোলনের সময় বসাক পরিবার ধীরে ধীরে টাঙ্গাইল ও ধামরাই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। আবহাওয়ার আনুকূল্যের দরুন এ-শিল্প টাঙ্গাইল অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল গ্রাম টাঙ্গাইল তাঁতশিল্পের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যা তাঁতের খটখট শব্দে মুখরিত থাকে। তাছাড়াও চণ্ডী, কেষ্টপুর, নতুনপাড়া, ঘারিন্দা, বল্লা, রামপুরসহ বিভিন্ন স্থানেও তাঁতশিল্প গড়ে উঠেছে। তাঁতে শাড়ি তৈরির প্রক্রিয়াকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায়।

সুতা তৈরি

দেড়শো বছর আগেও তুলা থেকে চরকায় সুতা কেটে পরে রং ব্যবহার করা হতো। এখন বাজার থেকে চাহিদা অনুযায়ী সুতা এনে, এরপর ধুয়ে পছন্দমতো বা ক্রেতার চাহিদামতো রং করা হয়। এক-এক কাপড়ের জন্য লাগে এক-এক কাউন্টের সুতা।

সুতা পেঁচানো

এখনো পাথরাইল গ্রামে গেলে চরকা কাটার দৃশ্য দেখা যায়। তবে চরকা এখন ব্যবহৃত হয় সুতা পেঁচানো ও গুটি পাকানোর কাজে। অনেকটা সময় তাঁতিদের দিতে হয় শুধু সুতার পেছনে।

টানা করা

এরপর শাড়ির সুতা সাজানোর কাজ শুরু হয়। টানা দেওয়া বাঁশের ফ্রেমে পাড় আর জমিনের নির্বাচিত রং অনুযায়ী সুতা টান টান করে সাজানো হয়। এইভাবে সুতা সাজিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে বলা হয় টানা করা। তাঁতিরা একবারে টানা দেন বিশ থেকে বাইশটি শাড়ির সুতা।

তাঁতযন্ত্রে সংস্থাপন

এরপর টানা করা শাড়ির সুতা পেঁচানো হয় নাতা নামের গোলদণ্ডে। নাতায় জড়ানো এ-সুতা পরে সংস্থাপিত হয় তাঁতযন্ত্রে। নাতায় লম্বালম্বি সুতা সাজানোর পাশাপাশি আড়াআড়ি সুতার বিন্যাস ঘটায় ববিন থেকে সুতা পেঁচিয়ে মাকুর ছিটায়।

শানা করা

এরপর কাগজের ছাঁচে হাত দিয়ে নকশা অনুযায়ী সুতা ঢুকিয়ে নিতে হয়। এ-প্রক্রিয়াকে বলে শানা করা। প্রতিটা ফ্রেমে ছিদ্র থাকে প্রায় হাজারখানেক। সবকিছু ঠিকঠাকমতো সাজানো শেষ হলে শুরু হয় কাপড় বোনা।

শাড়ি বোনা

তাঁতিদের এক হাতে থাকে নকশা করা দক্তি নামের শানা করার হাতল। আরেক হাতে থাকে মাকুর হাতল। মাকুর সাহায্যে আড়াআড়ি সুতার জাল বোনাই তাঁতযন্ত্রের কাজ। একটি শাড়ি বুনতে তাঁতিদের সুতা লাগে কমপক্ষে এক পোয়ার মতো। প্রতিটি শাড়িতে লম্বালম্বিভাবে সুতা থাকে চার থেকে দশ হাজার। আর আড়াআড়িভাবে থাকে সর্বোচ্চ চুয়ান্নটি (প্রতি ইঞ্চিতে সর্বোচ্চ)।

চণ্ডী গ্রামের বেশিরভাগ তাঁতি হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তাঁরা বসাক, নন্দী, পাল, প্রামাণিক, সাধু, সরকার ও শীল গোত্রে বিভক্ত। এদিকে মুসলমান তাঁতিরা পরিচিত জোলা নামে। টাঙ্গাইলে একশজনের মধ্যে এ-পেশার সঙ্গে জড়িত আছেন দুজন। দেশব্যাপী এ-শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন প্রায় ১৫ লক্ষ তাঁতি। এই ১৫ লাখ তাঁতি জোগান দিচ্ছেন দেশের বস্ত্র উৎপাদনের প্রায় ৬৩ শতাংশ।

শাড়ি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত সাঁটি শব্দ থেকে। সাঁটি মানে পরিধেয় বস্ত্র।

সব তাঁতি আগে কাপড় বুনতেন চিত্তরঞ্জন তাঁতে, যার ডাকনাম খটখটি তাঁত। খটখটি তাঁতের পাশাপাশি কেউ কেউ এখন পাওয়ার লুমেও কাপড় বোনেন। নকশা কাটার ক্ষেত্রে কখনো তাঁতিরা তাঁত বোনার সময় নকশা কাটেন। কখনো নকশা কাটেন তাঁত বোনার পরে।

কাশিদা, ক্রস স্টিচ, রান স্টিচ ও কারচুপির প্রক্রিয়ায় নকশা বোনা হয় বর্ডারে ও জমিনে। শাড়ি বোনার পর উল্টো পাশ থেকে বাড়তি সুতা ছেঁটে ফেলা হয়। রঙিন সুতার পাশাপাশি কারুকাজে ব্যবহৃত হয় ফান্দি নামের জরি সুতা। রেশমি শাড়িতে ব্যবহৃত হয় রেশমি ফান্দি। এরপর তাঁতিপাড়ার বিক্রয়কেন্দ্রে সব চলে যায়। রং বাহারি, মাসলাইস কটন, এমনকি ডেঙ্গু নামের শাড়িও মেলে।

সংস্কৃতির, সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং তার প্রচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক প্রতিষ্ঠান হলো ইউনেস্কো। মূলত জাতিসংঘের পক্ষ থেকে শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতি – এই তিন শক্তিশালী মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে মানুষে মানুষে, এক জাতির সঙ্গে আরেক জাতির মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং বিশ্ব শান্তির ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে ইউনেস্কো। তাছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইউনেস্কো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে বের করে যে, ওইসব দেশে সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করার কতটা সুযোগ আছে। সাধারণত যে-দেশ রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র, তাদের পক্ষে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে জায়গা করে নেওয়াটা কঠিন কিছু নয়। আবার রাজনৈতিকভাবে সফল না হলেও ঐতিহ্যগতভাবে অনেক দেশই বিশ্ববাসীর দৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকে। যেমন – মিশর ও কোরিয়ার মতো দেশের সংস্কৃতি নিয়ে ইউনেস্কো কাজ করার ব্যাপক সুযোগ পেয়েছে।

জাতি ও ঐতিহ্যগতভাবে অনেক পুরনো একটি জাতি বাঙালি, যাদের হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে। আমাদের দেশে কাজ করতে গিয়ে ইউনেস্কো নানা সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সভ্যতার নিদর্শন পেয়েছে। বরাবরই ইউনেস্কো তাদের সদস্য রাষ্ট্রকে উদ্বুদ্ধ করে ঐতিহ্য সংরক্ষণে। শুধু তাই নয়, এজন্য নানাভাবে আর্থিক সহায়তাও প্রদান করে থাকে। এ-কাজটি যেন তারা সুবিধাজনক উপায়ে করতে পারে, সেজন্য ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকা করে থাকে।

ইনট্যানজিবল কথাটার অর্থ হলো বিমূর্ত। ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজের ধারণাটি ২০০৩ সাল পর্যন্ত তেমনভাবে গুরুত্ব পায়নি। ধারণাটি সুস্পষ্টতা পেল, যখন দেখা গেল, বিভিন্ন দরিদ্র দেশ এবং তাদের স্থানীয় রীতিনীতি, লোকাচার, বিশ্বাস এবং নিজস্ব দক্ষতা রয়েছে, যা তাদের অন্য জাতি থেকে পৃথক করে। বিশ্বায়নের কারণে আজ হলিউড, বলিউড দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লোকাচারগুলো লোপ পেতে বসেছে। এসব লোকাচার সংরক্ষণের তাগিদ থেকেই ‘কনভেনশন অফ ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ সংঘটিত হয়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের, বিশ্ব মানবতার ঐতিহ্য – গান, নাচ, লোকাচারসহ শৈল্পিক দক্ষতা সংরক্ষণের তাগিদ থেকে এই কনভেনশনে সিদ্ধান্ত হয়, ওয়ার্ল্ড ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজের তালিকা তৈরি করা হবে। বাংলাদেশের কালচারাল হেরিটেজের প্রতিনিধিত্বমূলক হেরিটেজ হিসেবে ২০০৮ সালে স্বীকৃতি পায় আমাদের ‘বাউল গান’।

তার বেশ কিছুদিন পর ইনট্যানজিবল হেরিটেজের ইলিমেন্ট হলো ‘জামদানি’। এখানে জামদানি প্রোডাক্টটি কিন্তু স্বীকৃতি পায়নি, পেয়েছে জামদানির কারিগরি দক্ষতা। কারিগরি পণ্য একটি বাণিজ্যিক ব্যাপার; কিন্তু বংশপরম্পরায় যে দক্ষতা বা বিশ্বাস চলে আসছে, তাকেই মূলত ইনট্যানজিবল হেরিটেজের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর থেকে নানা প্রতিষ্ঠান, যেমন বাংলা একডেমি, শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় জাদুঘরসহ বিভিন্ন কালচারাল ইনস্টিটিউট তাদের নতুন নতুন অবজারভেশন ফাইল পাঠাতে শুরু করে। ফলে আগ্রহ তৈরি হলো নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলো নিজেদের বাইরে উৎসাহিত করার, তালিকা তৈরি করার এবং তালিকা আপডেট করার। এশিয়াটিক সোসাইটিসহ নানা প্রতিষ্ঠান ‘নকশি কাঁথা’কে তালিকাভুক্ত করার প্রচেষ্টা চালায়। এভাবে জামদানি তালিকাভুক্ত হওয়ার পর অনেক উৎসাহ-উদ্দীপনার ফলে উঠে আসে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র প্রসঙ্গ। বাংলা একাডেমির সহায়তায় ইনট্যানজিবল হেরিটেজের নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে পাঠানো হয়। একইভাবে রিকশা পেইন্টিংকেও স্বীকৃত করা হয়। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যুক্তিতর্কের মাধ্যমে অবশেষে ২০২৫ সালে কালচারাল হেরিটেজের স্বীকৃতি পায় আমাদের গৌরবের ‘টাঙ্গাইল তাঁতশিল্প’।

টাঙ্গাইল তাঁতের একটি দুর্দশাময়, অথচ গৌরবের ইতিহাস আছে। ১৮৫০ সালে মসলিনের সর্বশেষ প্রদর্শনীতে মসলিন শাড়ির প্রবল জনপ্রিয়তা ও পৃথিবীময় দৃষ্টি আকর্ষণের পর ব্রিটিশ সরকার মসলিনের তাঁতিদের বুড়ো আঙুল কেটে দেয়। এ-শিল্পকে ধ্বংস করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে দেখলে প্রথম খ্রিষ্টাব্দে রোমান রাজা কন্সটানটিনপলের রাজত্বকালে রাজপরিবারে ঢাকাই মসলিন পরিধান করার নমুনা পাওয়া যায়। ঐতিহ্যবাহী ও হাজার বছরের পুরনো ঢাকার বয়নশিল্পের বিলুপ্তির পেছনে ঔপনিবেশিকতার গাঢ় ছায়ার কথা আমরা সবাই জানি।

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে তাঁতশিল্পের উন্নতিকল্পে ঔপনিবেশিক শাসকদের উদ্যোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বয়ন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিভিন্ন নতুন প্রযুক্তি (যেমন ফ্লাই শাটল লুম বা ঠকঠকি তাঁত, কৃত্রিম রঞ্জনপদ্ধতি, ডবি, জ্যাকার্ড মেশিন ইত্যাদি) প্রচার ও প্রসারে এই বয়ন বিদ্যালয়গুলোর বিশেষ ভূমিকা আছে। এই নতুন প্রযুক্তি আয়ত্ত করে নান্দনিক বস্ত্রবয়নে টাঙ্গাইলের বসাক বয়নশিল্পীরা বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। টাঙ্গাইলের বয়নশিল্পীরা আসলে ঢাকা ও ধামরাই অঞ্চলের মসলিন তাঁতি, যাঁরা উনিশ শতকে বস্ত্রব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে পৃষ্ঠপোষকের সন্ধানে ভাগ্যান্বেষণে টাঙ্গাইলে চলে গিয়েছিলেন। এই দেশান্তরি বয়নশিল্পীদের একটা অংশ আবার দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে (ফুলিয়া, নবদ্বীপ) চলে গিয়ে সেখানে নতুন আবাস গড়ে তুলেছেন।

টাঙ্গাইল শাড়ির খ্যাতি সর্বজনবিদিত। এছাড়া রয়েছে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ তাঁতকেন্দ্র। পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের গামছা, লুঙ্গি, শাড়ি; নরসিংদীর চাদর, গামছা, থান কাপড়; কুমিল্লার খাদি; কুষ্টিয়ার গামছা, লুঙ্গি, চাদর ইত্যাদি বিখ্যাত। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কমবেশি তাঁতের প্রচলন আছে। প্রধানত বিভিন্ন হাটের মাধ্যমে এসব তাঁতপণ্য বিক্রি ও বিপণন হয়ে থাকে। ঢাকার ডেমরা ও তারাব, নরসিংদীর বাবুর হাট, টাঙ্গাইলের বাজিতপুর ও করটিয়া, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও বেলকুচি, কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও পোড়াদহ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ তাঁতের হাট।

নীলকমল বসাকের বক্তব্য দিয়ে শেষ করি, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এখন একান্তভাবে জরুরি। বিশ্বস্বীকৃত এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিটি ফ্যাশন হাউসে হ্যান্ডলুমের শাড়ির একটি আলাদা ও ভ্যাটমুক্ত কর্নার জরুরি। প্রযুক্তিকে অস্বীকার করে পাওয়ারলুমের শাড়ি তো বাদ দেওয়া যাবে না। তবে তাঁতিদের প্রাপ্য সম্মানী আর পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হলে এই দক্ষতা নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। না হলে, এইভাবে চিত্তরঞ্জন তাঁতের সংখ্যা কমতে থাকলে একদিন হাতে বোনা টাঙ্গাইল তাঁত শুধু জাদুঘরেই শোভা পাবে।