সময়ের দর্পণে শরৎশশী

শুরুতেই বলে রাখা ভালো, এ-লেখাটি প্রচলিত ধাঁচের নাট্যসমালোচনামূলক লেখা হবে না। এ-লেখার সঙ্গে স্মৃতি-আবেগ যেমন থাকবে, তেমনি নাটকটির প্রযোজনার ত্রুটিবিচ্যুতি, সাফল্য-সম্ভাবনা সংক্রান্ত কিছু কথাও থাকবে। আজ দেশ নাটকের দর্পণে শরৎশশী নাটকটি নিয়ে দু-চার কথা লেখার চেষ্টা করব। 

দীর্ঘ ৩৪ বছর পরে দেশ নাটকের দর্পণে শরৎশশী নাটকটি সম্প্রতি আবার দেখলাম। দীর্ঘদিন পর নাটকটি তারা মঞ্চে পুনরায় উপস্থাপন করেছে। ১৯৯২ সালে যখন নাটকটি প্রথমবার ঢাকার মঞ্চে আসে, সেই মঞ্চায়ন আর বর্তমানের মঞ্চায়নের মধ্যে পার হয়ে গেছে প্রায় সাড়ে তিন দশক সময়কাল। এই সময়ের ব্যবধানে অনেক পরিবর্তন এসেছে সমাজে, নাটকে, সর্বক্ষেত্রে। তারপরেও প্রথম মঞ্চায়ন আর সাম্প্রতিক মঞ্চায়নের মাঝে যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। নাটকটি প্রথম যখন মঞ্চে আসে, তখন নাট্যকার মনোজ মিত্র একের পর এক অসাধারণ সব নাটক লিখে চলেছেন। নাটকটির নির্দেশক আলী যাকেরও প্রবল প্রতাপে নির্দেশনাদান ও অভিনয় করে চলেছেন। দর্পণে শরৎশশী নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র মনোরমার অভিনয় করতেন তখন ইশরাত নিশাত। মেধাবী তরুণ অভিনেতা-নির্দেশক-সংগঠক হিসেবে ইশরাতও তখন দারুণ দীপ্তিমান। ৩৪ বছর পর অভিনয় দেখতে গিয়ে বারবার এঁদের তিনজনের কথা মাথায় এসেছে। দেশ নাটক নতুন করে মঞ্চায়নের আয়োজনে ‘স্মরণে ও অনুসরণে’ শিরোনামে স্মরণিকা-ব্যানার ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে উল্লিখিত তিনজনকেই স্মরণ করেছে। এ-নাটকে অভিনয় করতেন বন্ধু জসিম উদ্দিন ও সুজাত কবীর। এঁরা দুজনও প্রয়াত হয়েছেন তরুণ বয়সে। এঁরা দুজনও স্মরণে-স্মৃতিতে জাগ্রত রয়েছেন। 

পাঠকের কাছে এ-লেখাকে স্মরণসভার বক্তৃতার লিখিতরূপ বলে মনে হতে পারে, তবু কিছু কথা স্মৃতিকথা আকারে লিখতেই হচ্ছে। ওই যে আগেই বলে নিয়েছি, সময়ের যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হয় না। এবার যাঁকে স্মরণ করতে চাই, তিনি হলেন, আবুল হাসনাত। আমাদের দেশের থিয়েটারচর্চায় তিনি ছিলেন নেপথ্যের এক কাপালিক। তিনি থিয়েটারের মুণ্ডুমালা গলায় না পরেও এদেশের থিয়েটারের যাতে মঙ্গল হয়, তা নিভৃতে কামনা করে গেছেন আমৃত্যু। ১৯৯২ সালে তিনি দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সম্পাদক। সেই সময়কে যাঁরা জানেন, তাঁরা এও জানেন, সাহিত্যসম্পাদক হিসেবে তিনি কতটা উঁচুমানের ছিলেন। সংবাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির পাতাকে তিনি যে কতটা উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন, তা তাঁর শত্রুরাও স্বীকার করতে বাধ্য। ভালো নাটকের সন্ধান পেলে সে-নাটকের রিভিউ তিনি পরম যত্নে দৈনিক সংবাদে ছাপতেন। পরবর্তীকালে তিনি মাসিক কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে একই কাজ করে গেছেন, আরো বিপুল আগ্রহে ও গুরুত্বের সঙ্গে। তিনি সব সময় লেখককে সম্মান করতেন। লেখকের কাছে নিজে লেখা চাইতেন এবং লেখা ছাপা হওয়ার পরে লেখককে যত দ্রুত সম্ভব লেখক কপি এবং লেখার সম্মানী পৌঁছে দিতেন। তিনি তাঁর পক্ষে সম্ভব সর্বোচ্চ সম্মানীটাই লেখককে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। দুঃখের বিষয়, তিনিও আজ আর আমাদের মাঝে নেই। নাটকটি দেখতে দেখতে বারবার তাঁর কথাও মনে পড়ছিল। তাঁর আগ্রহেই ১৯৯২ সালে দৈনিক সংবাদে এই নাটকটি নিয়ে আমাকে লিখতে হয়েছিল। আজ লিখছি কালি ও কলম পত্রিকার জন্য, যে-পত্রিকায় তিনি প্রতিষ্ঠাকাল থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে গেছেন। লিখতে বসে আজ সকল দিক থেকে তাঁর শূন্যতা অনুভব করছি। 

দর্পণে শরৎশশী নাটকটির কাহিনি প্রায় একশ বছর আগেকার। খুব সাদামাটা কাহিনি। তবে এ-নাটক যেন অন্য এক কারণে দর্শককে ভেতর থেকে নাড়া দেয়। মফস্বলে সৌখিন থিয়েটারচর্চাকারীদের থিয়েটার করা নিয়ে নাটকের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। নাটকের ভেতরে রয়েছে আরেক নাটক। কিন্তু তা যেন শুধু নাটকের কথাই বলে না; হয়ে ওঠে রাষ্ট্র ও সমাজেরই প্রতিবিম্ব। একশ বছর আগের গল্পের মধ্যেও প্রোথিত রয়েছে বর্তমান সময়। রাষ্ট্র-সমাজ-পরিবার কখনোই যে আমাদের দেশে সংস্কৃতিবান্ধব ছিল না, এখনো নেই, তারই এক বয়ান যেন দর্পণে শরৎশশী। পরিবার কাঠামোর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকেও উন্মোচন করার প্রয়াস রয়েছে এ-নাটকে। পাঁচক্ষিরের জমিদার বিজনবিহারী। জমিদারি পরিচালনা করেন দক্ষহাতে। তার পুত্র ইন্দ্রনাথ কলকাতায় থাকেন। সেখানে থিয়েটার করেন তিনি। সেবার কোজাগরি পূর্ণিমায় ইন্দ্রনাথ নিজগ্রামে থিয়েটার করবেন গ্রামের লোকজন নিয়ে। তার আমন্ত্রণে নাট্যাচার্য গিরিশ ঘোষ কলকাতা থেকে আসবেন পাঁচক্ষিরেতে। এবারই প্রথম নারীরা অভিনয় করবেন গ্রামের এই থিয়েটারে। তাই কলকাতা থেকে দুজন নারীশিল্পীও এসে পড়েছেন। জমিদার বিজনবিহারী চিন্তায় পড়ে গেছেন, তার পুত্রের কর্মকাণ্ডে। ‘এ তো অনাচ্ছিষ্টি!’ জমিদারির সুনাম নষ্ট হবে। তার ওপরে টাকার শ্রাদ্ধ। যে করেই হোক থিয়েটার বন্ধ করা দরকার। আর কৌশলে গিরিশ বাবুর আসাটাও বন্ধ করা দরকার। গিরিশবাবু মান্যি মানুষ। তাঁকে অসম্মান করা যায় না। করলে বিজনবিহারী বাবুর জমিদারির দুর্নাম হবে। কোজাগরির রাতে থিয়েটার হতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত হতে পারেনি। এর পেছনে রয়েছে থিয়েটারের লোকজনের নিজেদের মধ্যের অন্তর্কোন্দল ও রাজনীতি। 

নাটকের পুরো গল্প বলাটা এখানে জরুরি নয়। যেটুকু বলা হলো, তার নির্যাসটা বোঝা জরুরি। পরিবার কাঠামোতে যিনি বিজনবিহারী, রাষ্ট্রের কাঠামোতে তিনিই সরকার বাহাদুরের সবচেয়ে শক্তিমান ব্যক্তি। তিনি সবকিছু দক্ষহাতে সামলান। বাইরের দেশ বা সম্মানিতজনের সামনে তাঁর কিংবা তাঁর জমিদারির ভাবমূর্তি প্রকাশে থিয়েটার বা সংস্কৃতিচর্চা একটা উপাদান বটে; কিন্তু তার জন্য রাজকোষ থেকে টাকা খরচ করাটা আবার মেনে নিতে কষ্ট হয়। আমাদের রাষ্ট্রের সঙ্গে কেমন মিল! তাই না? গত পঞ্চান্ন বছরে আমাদের রাষ্ট্রের দিকে তাকালে আমরা এই বিষয়টিই দেখতে পাই। বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাবশালী নেতারা এদেশে এলে, এদেশ যে শিল্প-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যে কতটা সমৃদ্ধ তা প্রমাণ করার জন্য তাদের সামনে দেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি উপস্থাপন করা হয়। অথচ সেই সংস্কৃতির জন্যই রাষ্ট্রের বাজেট থাকে সবচেয়ে কম। বিজনবিহারীরা নিজেদের খ্যাতির জন্য গিরিশবাবুদের সম্মান রক্ষার কথা ভাবলেও, মনে মনে চান থিয়েটারটা না হোক। এ হলো আমাদের দেশের সংস্কৃতিচর্চা বা থিয়েটারচর্চার প্রকৃত অবস্থা। ৩৪ বছর পর এ-নাটকটি আমার সামনে এই কনটেক্সকেই বড় করে তুলে ধরেছে। আর থিয়েটারের অন্তর্কোন্দল তো আছেই। 

দর্পণে শরৎশশী নাটকের কাহিনি সহজ-সরল হলেও এর চলন বেশ আকর্ষণীয়। নাটকের প্লট, সংলাপ ও গাঁথুনিতে রয়েছে অনিন্দ্য সৌন্দর্য। এ-সৌন্দর্য একান্ত এ-নাটকের অন্তরাঙ্গের। আর সেটা প্রকাশের মাধ্যম অভিনয়। নাজনীন হাসান চুমকি, আশরাফুল আশীষ, ফিরোজ আলম প্রামাণিক, কামাল আহমেদ, ব্রততি বিথু, তৌহিদ মিটুল, মাসুম রেজা, শাহেদ নাজির হেডিস – এঁরা ভালো অভিনয় করলেও অনেকের অভিনয়ে অন্তরের স্পর্শ কম ছিল। অভিনয়ে অন্তরের স্পর্শ কথাটা অনেকের কাছে মনে হতে পারে, সেটা আবার কী? অভিনেতা ভালো চরিত্রায়ন করেন, সুন্দর করে সংলাপ বলেন, দেখতে-শুনতে ভালোই লাগে, তবে কোথাও যেন একটা খামতি থেকে যায়, মনে হয় শেষ পর্যন্ত টেনে নিতে পারছেন না চরিত্রকে। চরিত্রের অন্তরটা যেন অধরাই রয়ে যায়। মনে হয়, অভিনেতার হৃদয়, চরিত্রের হৃদয় স্পর্শ করতে পারছে না। সবার ক্ষেত্রে নয়, কারো কারো অভিনয়ের ক্ষেত্রে এটা মনে হয়েছে। যেমন, কাজী মিজান কোয়েল চমৎকার ধরেছিলেন কুঞ্জবিহারী চরিত্রটি, তবে শেষ পর্যন্ত টেনে নিতে পারেননি। এরকম আরো অনেকের কথা বলা যায়। তবে, দর্শক হিসেবে আমার প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিল। আমি নিজেও একটা ঘেরাটোপের মধ্যে ছিলাম। প্রথম যখন এ-নাটক দেখেছিলাম তখন আমি নিতান্তই ২৭ বছরের এক তরুণ নাট্যকর্মী। ফলে ৬১ বছরের দর্শক হিসেবে আমিও আর আগের জায়গায় নেই। সেটা দর্শক হিসেবে আমার সমস্যাও হতে পারে আবার আমার চোখ-কান-বোধ-বুদ্ধির সাবালকপ্রাপ্তির সমস্যাও হতে পারে। ফলে অনেক ভালো অভিনয় করেও নাজনীন হাসান চুমকি, আশরাফুল আশীষ কিংবা ব্রততি বিথু যখন মঞ্চে এসে দাঁড়াচ্ছেন, আমার সামনে এসে হাজির হচ্ছেন ইশরাত নিশাত, আওয়াল রেজা কিংবা আফসানা মিমি, যাঁরা প্রথমদিককার প্রদর্শনীগুলোকে তাঁদের অসাধারণ অভিনয় দিয়ে চরিত্রগুলোর মান চরিত্রায়ন দিয়ে আমাকে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন। প্রথমের প্রতি ভালোবাসা, মুগ্ধতা বেশি থাকে। নতুন যাঁরা অভিনয় করেছেন তাঁরা যথেষ্ট ভালো করেও আমার মতো নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত দর্শকের ঘোরকে হটিয়ে দিতে পারেননি। এটা তাঁদের ব্যর্থতা নয়, তবে তা যদি তাঁরা পারতেন, তাহলে সোনায় সোহাগা হয়ে উঠতে পারতো। 

প্রথম মঞ্চায়ন এবং সাম্প্রতিক মঞ্চায়নে আলোক পরিকল্পনা করেছেন নাসিরুল হক খোকন। প্রথম মঞ্চায়নের আলোক পরিকল্পনায় আমি খুঁজে পেয়েছিলাম কোজাগরির থিম, এবার সেটার অভাববোধ করেছি। তাছাড়া আলোক প্রক্ষেপণে টাইমিংয়ের সমস্যাও লক্ষ করা গেছে। সেট নিয়ে কিছু বলার নেই। মনসুর আহমেদের নিরাভরণ মঞ্চসজ্জা আগের মতোই রয়েছে পুনর্নির্মাণেও। তবে নাটকের আবহসংগীত নিয়ে আমার কিছু আপত্তির কথা জানিয়ে রাখি। এই নাটকের আবহসংগীত করেছিলেন কে বি আল আজাদ। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে, পুনর্নির্মাণেও সেই আবহসংগীতই ব্যবহার করা হয়েছে। সেটাই কাম্য। কারণ কে বি আল আজাদ এই নাটকের জন্য অসাধারণ আবহসংগীত সৃষ্টি করেছিলেন। ঢাকার মঞ্চে এত চমৎকার আবহ এর আগে বা পরে খুব কমই আমার কানে এসেছে। তিনি কর্নেট-ক্লারিওনেট, হারমোনিয়াম, বাংলা ঢোল সহযোগে চমৎকার এক আবহ তৈরি করেছিলেন, যা ছিল এই নাটকের প্রাণ। প্রথম মঞ্চায়নের সে-মুগ্ধতার রেশ এখনো সজীব আমার কানে ও প্রাণে। এবারের মঞ্চায়নেও সেই আবহই ব্যবহার করা হয়েছে। সময় ও প্রযুক্তি যেমন এগিয়েছে, দর্শকের কানও সাবালক হয়েছে। বারবার আবহসংগীত শুনে মনে হয়েছে, মিউজিক যথাযথ ডিজিটালাইজড করা হয়নি। ১৯৯২ সালে হয়তো স্পুলে ধারণ করা হয়েছিল মিউজিক, সেটাকে যথাযথভাবে ট্রান্সফার করা হয়নি আজকের প্রযুক্তিতে। মনে হয়েছে, রেকর্ড বাজিয়ে অন্য যন্ত্রে রেকর্ড করা হয়েছে। আগের দিনে এক ক্যাসেট প্লেয়ারে গান বাজিয়ে পাশে আর একটি ক্যাসেট প্লেয়ারে রেকর্ড করলে যেমন শোনা যেত, তেমনটা শোনা গেছে। অর্থাৎ মিউজিকের সাউন্ড কোয়ালিটি পড়ে গেছে, জেনারেশন গ্যাপ তৈরি হয়েছে। তাছাড়া প্রক্ষেপণে সবসময় লো ভলিউম ব্যবহার করা হয়েছে। আশা করি, প্রযুক্তির এই সমস্যা কাটিয়ে উঠে ভবিষ্যতের মঞ্চায়নগুলোতে এ-নাটকের আবহসংগীতকে তার অনন্যমানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। 

সমালোচনাটা হয়তো একটু বেশিই করে ফেললাম। সেটা দেশ নাটকের কাছে উঁচুমানের প্রযোজনা প্রত্যাশার কারণে এবং দর্পণে শরৎশশীর মতো অনন্য একটি নাটকের প্রয়োজনেই। তাদের প্রযোজনার যে মান ও সৌকর্য দর্শক দেখেছে, তা যেন অব্যাহত থাকে – এটাই আমাদের চাওয়া। আশা করি দেশ নাটক ভবিষ্যতে এরকম উঁচুমানের নাটক আরো গুরুত্বের সঙ্গে মঞ্চায়নে উদ্যোগী হবে।