আশা আর নিরাশার দোলাচলে দোদুল্যমান ছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন। প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যে পার্থক্য ছিল বিস্তর। প্রস্ফুটনের কালে অবিকশিত থেকে গেছে তাঁর অনেক স্বপ্ন।
ইংরেজি সাহিত্যের বড় কবি হওয়ার স্বপ্ন ছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের। সে-স্বপ্ন পূরণ হয়নি। হিন্দু কলেজে অধ্যয়নকালীন ইংরেজি কবিতা লিখতে শুরু করেন। কলকাতার কয়েকটি পত্রিকায় তাঁর লেখা ছাপা হতে থাকে। অতঃপর সাধ জাগে বিলেতে কবিতা পাঠাবেন। এর আগে লন্ডনের Blackwood Magazine-এ ক্যাপ্টেন রিচার্ডসনের কাব্যের একটা আলোচনা পাঠিয়েছিলেন তিনি, যা ছাপা হয়েছিল। এ-রচনাটি ছাপা হওয়ায় নিজের ওপর আস্থা জন্মায় তাঁর – নিশ্চয়ই তাঁর মৌলিক কবিতাও ছাপা হবে। তিনি ব্ল্যাকউড ম্যাগাজিনে কবিতা পাঠিয়ে প্রকাশের অপেক্ষায় থাকেন। এই পত্রিকার সম্পাদককে হয়তো তিনি চিঠিও লিখেছিলেন। এর কিছুদিন পর তিনি Bentley’s Miscellany ম্যাগাজিনে ইংল্যান্ডের প্রখ্যাত কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থকে উৎসর্গ করে কবিতা পাঠান, সঙ্গে একটি চিঠি। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘মহোদয়, কোনো প্রকার সংকোচ না করেই এই অল্প বয়েসির একটা রচনা আপনার কাছে পাঠাচ্ছি। উদারতার সঙ্গে সাহিত্যিক সুনাম অর্জনে প্রত্যাশী ব্যক্তিদেরকে আপনারা যেভাবে উৎসাহিত করেন তা জানতে পেরেই আপনার সঙ্গে আমার সংযোগ ঘটাতে চাইছি। মহোদয়, এ-উপস্থাপনের উদ্দেশ্য যশ নয়, এটা পাওয়ার যোগ্যতা এখনো পর্যন্ত আমি অর্জন করতে পারিনি, এ-ব্যাপারে আমি সচেতন। আমার এখন উৎসাহ প্রয়োজন। আমার একান্ত বিশ্বাস ব্রিটিশ জনগণ উদার, মহৎ; সামান্য একজন বিদেশিকে তাঁরা নিরুৎসাহিত করবেন না। আমি বঙ্গদেশের অধিবাসী একজন হিন্দু, হিন্দু কলেজের ইংরেজি অধ্যয়নরত ছাত্র। আমার বয়স আঠারো। একটা শিশু মাত্র। আপনাদের কবি কাউলি-এর ভাষায় বলব – জ্ঞান অর্জনের দিক থেকে শিশু, কিন্তু বয়সে নয়।’১
বেন্টলি’স সম্পাদক মধুসূদনের কবিতা ছাপেননি। ছাপেনি ব্ল্যাকউড ম্যাগাজিনও। মধুসূদন আশা করেছিলেন, তাঁর কবিতা সেকালের এই বিখ্যাত দুই পত্রিকায় প্রকাশিত গৃহীত হবে – এ থেকে বোঝা যায়, নিজের কবিতার মান সম্পর্কে তিনি একটু বেশিই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। নিজেকে অন্যের তুলনায় বড় করে দেখা তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল বলেই মনে হয়। নিজের কবিতা সম্পর্কে এই উচ্চ ধারণা তাঁর অহংবাদী মনোভাবের সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ। তাঁর পরবর্তী জীবনের নানা ঘটনা থেকেও সেটা আমরা বারবার উপলব্ধি করতে পারি। কিন্তু বিলেতের পত্রিকায় কবিতা পাঠানোর ব্যাপারটাকে কেবল তাঁর অহমিকার প্রকাশ বলে মনে করা ঠিক হবে না। সৃষ্টির আনন্দে তিনি উচ্চকিত। তাঁর সেই আনন্দ এবং তৃপ্তি কোনো মহাকবির চেয়ে কম ছিল না। নিজের রচনাকে তিনি স্বভাবত দেখেছেন খানিকটা পাঠকের চোখ দিয়ে; কিন্তু বেশির ভাগটাই দেখেছেন, নিজের মনের মধ্যে ভাবের যে-বান ডেকেছিল, তাতে ভাসতে ভাসতে। তাঁর কবিতা উল্লিখিত দুই পত্রিকায় প্রকাশিত না হলেও এ-ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে, আত্মপ্রকাশের এবং স্বীকৃতি লাভের স্বপ্ন তিনি প্রথম যৌবন থেকেই দেখতে শুরু করেছিলেন।২
বিদেশি পত্রিকায় লেখা ছাপা না হলেও মধুসূদন হতোদ্যম হননি। একের পর এক লিখে গেছেন ইংরেজি কবিতা। ইংরেজি অমিত্রাক্ষরে কবিতা লেখায় সিদ্ধিলাভ করেন এ-সময়ে। তিনি যে এককালে বাংলা ভাষায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রচলন করবেন, তার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল ছাত্রজীবনে ইংরেজিতে অমিত্রাক্ষর ছন্দে কবিতা রচনার মধ্য দিয়ে।
ইংরেজি সাহিত্যে বড় কবি হবেন মধুসূদন। তাই তাঁর স্বপ্নভূমি ইংল্যান্ড। সেখানে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি লেখেন অনবদ্য এক কবিতা, যাতে নিজের জন্মভূমির চেয়েও ইংল্যান্ড তাঁর কাছে অধিক প্রিয়। তিনি লেখেন :
I
I sigh for Albion’s distant shore,
Its valleys green, its mountains high;
Tho’ friends, relations, I have none
In that far clime, yet, oh! I sigh
To corss the vast Atlantic wave
For glory, or a nameless grave!
II
My father, mother, sister, all
Do love me and I love them too,
Yet oft the tear-drops rush and fall
From my sad eyes like winter’s dew.
And, oh! I sigh for Albion’s strand
As is she were my native-land!৩
সহসা সমুদ্রপারের স্বপ্নভূমিতে তাঁর যাওয়া হয়নি। একদিকে ইংল্যান্ড যাওয়ার স্বপ্নে আলোড়িত তিনি, অন্যদিকে পিতা রাজনারায়ণ দত্ত পুত্রকে বিয়ে দেবেন বলে ঠিক করেছেন। কিন্তু তিনি বিয়ে করবেন না। সে-সময় তাঁর বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই বিয়ের কাজটি সেরে ফেলেছেন। কিন্তু সম্পর্ক বহির্ভূত বিয়েতে তিনি সম্মত হতে পারেন না। তাঁর চোখে নীলনয়নার স্বপ্ন। বাঙালি মেয়েরা তাঁর চোখে ‘কালা পাহাড়’। তিনি বিয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য ইংল্যান্ড যাওয়ার স্বপ্নকে মিলিয়ে নিলেন। সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য কী দুর্মর আশা! বন্ধু গৌরদাস বসাককে তার আগে চিঠিতে লিখলেন, ‘তুমি হয়ত জান না, আমার হৃদয়-বেদনা কতটুকু আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। আমার ইচ্ছা করে (সত্যিই ইচ্ছা হয়) কেউ এসে আমাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিয়ে যাক। কী ভয়াবহ ঘটনা বল! আর মাত্র তিন মাস পরে আমাকে বিয়ে দেওয়া হবে। আমার শরীরের রক্ত যন্ত্রণাবিদ্ধ হয়ে ছুটছে। আমার চুল খাড়া হয়ে উঠছে শজারুর কাঁটার মতো। যার সঙ্গে আমার বিয়ের কথা হয়েছে, সে নাকি বিরাট জমিদারের কন্যা। তার জন্য আলোহীন অন্ধকারে ভবিষ্যতে না জানি কত দুর্ভোগই জমা হয়ে আছে! তুমি জান, দেশ ত্যাগ করবার ইচ্ছা আমার হৃদয়ে এতখানি বদ্ধমূল যে, যা নাকি মুছে ফেলা যাবে না। সূর্য উদিত নাও হতে পারে। কিন্তু আমার এ ইচ্ছা, আমার মন থেকে কখনও বিদূরিত হবে না। নিশ্চিত জেনে রাখ, দুএক বছরের ভেতর আমি ইংল্যান্ডে যাব, না হয় আমি আত্মহত্যা করব। এ দুটোর একটা ঘটবেই।’৪
১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই ফেব্রুয়ারি বাড়ি থেকে পালিয়ে মধুসূদন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করলেন। বিয়ের হাত থেকে বাঁচলেন। কিন্তু সহসা বিলেত যাওয়া হলো না। খ্রিষ্টান হলে দেশত্যাগ সহজ হবে – এমন আশ্বাস তিনি পেয়েছিলেন সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। তাঁরা কথা রাখলেন না। খ্রিষ্টান হওয়ার উনিশ বছর পর তিনি বিলেত গেলেন পৈতৃক সম্পত্তি বন্ধক রেখে, ব্যারিস্টার হওয়ার জন্য।
খ্রিষ্টান হওয়ার পর হিন্দু কলেজে পড়তে পারলেন না। তাঁকে ভর্তি হতে হলো গোপনে পিতা রাজনারায়ণ দত্তের সাহায্য নিয়ে বিশপস কলেজে। তিনি যাজক হবেন। পিতা চেয়েছিলেন পুত্রকে প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনবেন। সেটা না হওয়ায় তিনি অর্থ সাহায্য বন্ধ করে দিলে মধুসূদন ভাগ্যান্বেষণে মাদ্রাজ গমন করেন। মাদ্রাজ-জীবনে ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয় The Captive Ladie, ইংরেজিতে লেখা প্রথম কাব্য; সঙ্গে দীর্ঘ কবিতা ‘Visions of the Past’ প্রকাশের পর সাময়িক খ্যাতি জোটে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রশংসাসূচক আলোচনা প্রকাশের পাশাপাশি বিরূপ সমালোচনাও কম হয়নি। কলকাতার The Bengal Hurkaru and Chronicle পত্রিকা এই কাব্যের বিরূপ সমালোচনা প্রকাশ করে। Hindu Intelligencer পত্রিকায় প্রশংসাহীন সহানুভূতিময় সমালোচনা প্রকাশিত হয়।
মধুসূদন শুধু ক্যাপটিভ লেডি লিখে ক্ষ্যান্ত হননি। তিনি ইউরেশিয়ান পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লিখতে থাকেন Rizia: Empress of Inde কাব্যনাট্য। ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই নভেম্বর থেকে ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জানুয়ারি পর্যন্ত এই ধারাবাহিক রচনার নয়টি কিস্তি প্রকাশিত হয়। কিন্তু অসমাপ্ত থেকে যায় কাব্যনাট্যটি। তিনি কি হতাশ হয়েছিলেন? হয়তোবা। কেননা, বন্ধু গৌরদাস বসাককে লেখা চিঠিতে তিনি আরো রচনার সংকল্পের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘The Anglo-Saxon and the Hindu’ শীর্ষক একটি বক্তৃতা ছাড়া আর কোনো রচনা মাদ্রাজজীবনে প্রকাশিত হয়নি। প্রথম কাব্য মাদ্রাজের সুধীসমাজে প্রতিষ্ঠা এনে দেয় তাঁকে। তবে পত্র-পত্রিকা থেকে সাধুবাদ পেলে হয়তো তাঁর কাছ থেকে আরো ইংরেজি রচনা আমরা পেতাম।
ক্যাপটিভ লেডির একটি কপি মধুসূদন বন্ধু গৌরদাস বসাকের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন তৎকালীন শিক্ষা বিভাগের সভাপতি জর্জ বিটনের কাছে। বিটন সাহেব গৌরদাস মারফত মধুসূদনকে তাঁর মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চার পরামর্শ দেন। যদিও তার আগে তিনি দ্রুত বাংলা ভুলে যাচ্ছেন বলে আক্ষেপ করে বন্ধুকে জানিয়েছিলেন মহাভারত ও রামায়ণ-এর বাংলা অনুবাদ পাঠাতে।
১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে মধুসূদন মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীহর্ষের রত্নাবলী নাটকের রামনারায়ণ তর্করত্নকৃত বাংলা অনুবাদের ইংরেজিকরণের মধ্য দিয়ে তিনি পরিচিত হন পাইকপাড়ার রাজভ্রাতৃদ্বয় প্রতাপচন্দ্র সিংহ ও ঈশ্বরচন্দ্র সিংহের সঙ্গে। বাংলা নাটকের দুরবস্থা তাঁকে পীড়িত করে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন নাটক লিখবেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি রচনা করেন বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক নাটক শর্ম্মিষ্ঠা। পাইকপাড়া রাজাদের থিয়েটার ছিল – বেলগাছিয়া থিয়েটার। এই থিয়েটারে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা সেপ্টেম্বর শর্ম্মিষ্ঠা মঞ্চস্থ হয় এবং সুধীমহলে বিপুল সাড়া জাগায়। প্রথম নাটকের সাফল্যের পর তিনি একের পর এক নাটক রচনা করতে থাকেন। বন্ধু গৌরদাস বসাককে তিনি জানাচ্ছেন, ‘আমি যখন রক্তের স্বাদ পেয়েছি, এ-বিষয় আমি ত্যাগ করছি না। আমি আবার শুরু করেছি। আমি এখন আরেকটা নাটক লিখছি। কিছুদিন আগে এর প্লটের একটা সারসংক্ষেপ রাজাদের পাঠিয়েছিলাম, মনে হয় তাঁদের মনঃপুত হয়েছে। প্রথম পরিচ্ছেদ শেষ করে ফেলেছি। জে.এম ঠাকুর আমাকে লিখেছেন – এটা সত্যিই বেশ ভালো হয়েছে। বাংলায় লিখে যদি সুনাম অর্জন করতে পারি, আমার পক্ষে সে চেষ্টা করা উচিত।’৫
শর্ম্মিষ্ঠা নাটকের পর তিনি রচনা করেন পদ্মাবতী নাটক। তারপর প্রহসন বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ এবং একেই কি বলে সভ্যতা। অতঃপর নাটক কৃষ্ণকুমারী। ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রচনা শুরু করেন সুভদ্রা কাব্যনাট্য। বন্ধু কেশবচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা চিঠিতে তিনি জানান, ‘কাব্যটা যে ছন্দে লেখা হচ্ছে, তার নাম অ্যালেকজান্দ্রাইন অর্থাৎ ছয় মাত্রার পঙ্ক্তি। আমাদের ভাষার দীর্ঘতম ছন্দ হচ্ছে সপ্তপদী পয়ার। কিন্তু সেটা হচ্ছে গ্রিক বা রোমান হেক্সামিটার। তা বেশ দীর্ঘ এবং নাটকের জন্য জাঁকজমকপূর্ণ।’৬ কাব্যনাট্যটি তিনি শেষ করতে পারেননি। এটা লেখা হলে আমরা নবতর ছন্দের দৃষ্টান্ত পেতাম। কৃষ্ণকুমারী নাটক লেখার আগেই বেলগাছিয়া থিয়েটারে সেটা মঞ্চস্থ করার প্রবল আগ্রহ ছিল তাঁর! বন্ধুকে বলেন রাজাদের রাজি করাতে। বন্ধুকে তিনি চিঠিতে লেখেন, ‘একটা নাটক লিখব, তা দেরাজে বন্দি হয়ে থাকবে, এটা কোনো কাজের কথা হতে পারে না।’৭
প্রতিটি নাটক লেখার আগে মধুসূদন প্রত্যাশা করেছেন, বেলগাছিয়া থিয়েটারে তাঁর নাটক মঞ্চস্থ হবে। কিন্তু শর্ম্মিষ্ঠার পর তাঁর আর কোনো নাটকের মঞ্চায়ন বেলগাছিয়া থিয়েটারে হয়নি। তিনি যদি পাইকপাড়া রাজাদের প্রকৃত পৃষ্ঠপোষকতা পেতেন, তাহলে হয়তো তাঁর কাছ থেকে আমরা আরো আরো উৎকৃষ্ট নাটক পেতাম।
মধুসূদন মনেপ্রাণে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। তিনি দিল্লির সুলতান ইলতুতমিশের কন্যা সুলতানা রাজিয়াকে নিয়ে রিজিয়া নাটক লেখার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন।
মাদ্রাজ-জীবনে Rizia: Empress of Inde কাব্যনাট্য শেষ করতে পারেননি, এবার সেই অসম্পূর্ণ কাজটি শেষ করতে চাইলেন বাংলা ভাষায় রিজিয়া নাটক রচনার মধ্য দিয়ে। তিনি বন্ধু কেশবচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়কে লিখলেন, ‘আমি আর একটা নাটক লেখার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত রয়েছি। কিন্তু তা নিশ্চিতভাবেই প্রথমত মঞ্চস্থ হতে হবে। হিন্দু-মুসলমান বিষয়টা নাটকে আমাদের গ্রহণ করা উচিত। মুসলমানরা আমাদের চেয়ে অনেক পরাক্রমশীল জাতি। এজন্য মনের তীব্র উদ্দীপনা প্রকাশের চমৎকার সুযোগ এতে মিলবে।… আশা রাখি এ-নাটকটাও আপনার পছন্দ হবে। মুসলমান নামের প্রতি যে বিতৃষ্ণা রয়েছে তা ত্যাগ করতে হবে।’৮ তাঁর বন্ধুরা তাঁকে সমর্থন করেননি। পাইকপাড়ার রাজারা মুসলমান বিষয় নিয়ে নাটক মঞ্চায়নে রাজি হননি। এজন্য মধুসূদন নাটকের চরিত্রলিপি ও দৃশ্য পরিকল্পনা লিপিবদ্ধ করেও আর অগ্রসর হতে পারেননি। আপাতত রিজিয়া রচনা শেষ না করলেও তিনি এই নাটক রচনার চিন্তা ত্যাগ করতে পারেননি। বিলেত থেকে ফিরেও তিনি এই নাটক রচনার কথা ভেবেছেন। কেশবচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড থেকে প্রত্যাবর্তনের পর মধুসূদন আমার সাথে শুধুমাত্র ‘রিজিয়া’ এবং ‘রিজিয়া’ রচনার বিষয়ে আলাপ করতেন। কিন্তু তা লেখার জন্য তিনি শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেননি।’৯
আমরা জানি, মধুসূদনের বিখ্যাত রচনা মেঘনাদবধ কাব্য। এই কাব্যের সাফল্যের পর তিনি আরো কয়েকটি মহাকাব্য রচনার পরিকল্পনা করেছিলেন। শুরু করেছিলেন ‘সিংহল বিজয়’। কাহিনিলিপি তৈরি করেছিলেন। শুরু করেও তিনি এ-কাব্য শেষ করতে পারেননি। বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে তিনি লিখেছেন, ‘যতীন্দ্রমোহন কৌরব ও পাণ্ডব রাজকুমারদের যুদ্ধ নিয়ে লিখতে বলছেন। অন্য আর এক বন্ধু ‘ঊষাহরণ’ বিষয়ে লিখতে বলেছেন। কিন্তু আমার আগ্রহ সিংহল বিজয়ের দিকে।’১০
মধুসূদন যখন ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে তখন একটির পর একটি ভাষা শিখেছেন। তিনি বন্ধু গৌরদাসকে লিখেছেন, ‘এ মহাদেশের তিনটা ভাষা আমি শিখতে পেরেছি। এগুলো হলো – ইতালীয়, জার্মান ও ফরাসি। এসব ভাষার সাহিত্যে যে ভাব-ঐশ্বর্য রয়েছে, সে-সম্পর্কে জানতে হলে ভাষাগুলো শেখা প্রয়োজন। তুমি কি জান, ভাই গৌর! উৎকৃষ্টরূপে চাষ করা অগাধ জমিজমার মালিক হওয়া আর একটা ইউরোপীয় ভাষায় জ্ঞান লাভ করা সমান কথা। আমি অবশ্য বিদ্যা-বুদ্ধি বিষয়ক সম্পত্তির কথা বলছি। যদি বেঁচে থাকি, দেশে ফেরার সুযোগ ঘটে, তখন নিজেদের ভাষার মাধ্যমে আমি আমার শিক্ষিত বন্ধুদেরকে এসব ভাষার সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেব। মাতৃভাষা চর্চায় আত্মনিয়োগ করা ও একে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে তোলার চেয়ে বড় কাজ আর কিছু নেই। তুমি কী ভাবতে পার, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বা জার্মানি কোন কবি-লেখকের মূল্যায়ন করে? যাঁরা তাঁর মাতৃভাষা ও স্বদেশের জন্য কিছু করতে পারে তাঁদের। যেমন মিল্টনের মহৎ ও বিশাল আশা ছিল। আমাদের দেশে যাঁরা প্রতিভাবান লেখক রয়েছেন, তাঁরা যেন মিল্টনের উচ্চাশার মধ্য দিয়ে অনুপ্রাণিত হতে পারেন, ঈশ্বরের কাছে এটাই প্রার্থনা করি। নিজের নামটা স্মরণীয় করে রেখে যেতে চায় – এমন ইচ্ছা যদি আমাদের ভেতর কারও থাকে, একটা পশুর মতো কালের গর্ভে যদি সে হারিয়ে যেতে না চায়, তাহলে তাঁকে তাঁর মাতৃভাষা চর্চায় আত্মনিয়োগ করা উচিত। আর এটাই তার কাজের প্রকৃত ও উপযুক্ত জায়গা। … আমরা যখন পৃথিবীর মানুষের কাছে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরে কথা বলব, তখন যেন আমাদের মাতৃভাষাতেই বলি। যাঁদের ভেতর নতুন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তাঁরা যেন তাঁদের মাতৃভাষার কাছে আশ্রয় খোঁজে।’১১
বিদেশ থেকে ফিরে মধুসূদন জীবন-জীবিকার টানাপড়েনে একাগ্রচিত্তে সাহিত্যচর্চা করতে পারেননি। যে-স্বপ্ন ছিল তাঁর, বিদেশ থেকে যে-মণিমুক্তা আহরণ করে এনেছিলেন, তা দিয়ে তিনি পূর্ণভাবে সাজাবেন বাংলা সাহিত্যকে – সে-স্বপ্ন পূরণ হয়নি। মধুসূদনের একমাত্র গদ্যগ্রন্থ হেক্টর-বধ। এটা মূলত অনুবাদধর্মী রচনা। বিশ্বখ্যাত কবি হোমারের ইলিয়ড কাব্যের কাহিনি এ-গ্রন্থে তিনি পরিবেশন করেছেন। গ্রন্থের উপক্রমণিকা মধুসূদন নিজের ভাষায় লিখেছেন। মূল কাব্যের বারোটি সর্গের কাহিনির তিনি ভাবানুবাদ করেছেন। বইটি তিনি উৎসর্গ করেন বন্ধু ভূদেব মুখোপাধ্যায়কে। উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছেন, ‘কাব্যখানি পাঠ করিলে টের পাইবে, যে আমি কবিগুরুর মহাকাব্যের অবিকল অনুবাদ করি নাই, তাহা করিতে হইলে অনেক পরিশ্রম হইত, এবং সে-পরিশ্রমও যে সর্বতোভাবে আনন্দোৎপাদন করিত, এ-বিষয়ে আমার সংশয় আছে। স্থানে স্থানে এই গ্রন্থের অনেকাংশ পরিত্যক্ত এবং স্থানে স্থানে অনেকাংশ পরিবর্তিত হইয়াছে। বিদেশীয় একখানি কাব্য দত্তক-পুত্ররূপে গ্রহণ করিয়া আপন গোত্রে আনা সহজ ব্যাপার নহে কারণ তাহার মানসিক ও শারীরিক ক্ষেত্র হইতে পর বংশের চিহ্ন ও ভাব সমুদায় দূরীভূত করিতে হয়। এ দুরূহ ব্রতে যে আমি কতদূর পর্যন্ত কৃতকার্য হইয়াছি এবং হইব, তাহা বলিতে পারি না।’১২ হেক্টর-বধকে মধুসূদন বলতে চেয়েছেন গদ্যকাব্য। তিনি যে গুরুগম্ভীর গদ্য রচনা করতে পারেন তার প্রমাণ এ-গ্রন্থে আছে। তাছাড়া নাটকগুলোর সংলাপেও তাঁর নিপুণ গদ্যের পরিচয় আমরা পাই। তাঁর দুটি প্রহসন একেই কি বলে সভ্যতা ও বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ-তে রয়েছে আটপৌরে ভাষা। প্রহসনে প্রথম তিনি আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি গদ্যরচনায় নিজেকে সমর্পণ করতে চেয়েছিলেন। বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে দুটি চিঠিতে তাঁর সে-ইচ্ছা ব্যক্তও করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যদি সময় পাই, কবিতা, নাটক, সমালোচনা, উপন্যাস নিয়ে কাজ করব। এ কাজ করে একজন মানুষ সমস্ত গ্রিক ও যাবতীয় রোমান কীর্তির উপরে অন্তহীন খ্যাতি রেখে যেতে পারে।’১৩ মধুসূদন তখন খ্যাতির মধ্যগগনে। তখন বাংলা গদ্যের, বিশেষত কথাসাহিত্যের, ভিত শক্ত করে গড়ে ওঠেনি। মধুসূদনের আগে যে দৃষ্টান্ত রয়েছে, তার মধ্যে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৭৮৭-১৮৪৮) নববাবু বিলাস; প্যারীচাঁদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুরের (১৮১৪-৮৩) আলালের ঘরের দুলাল; ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের (১৮২৪-৯৮) সফল স্বপ্ন ও অঙ্গুরীয় বিনিময় উল্লেখযোগ্য। ইউরোপীয় ধর্মপ্রচারক, সুইস বংশজাত হ্যানা ক্যাথারিনা ম্যালেন্স (১৮২৬-৬১) বাংলা উপন্যাসে অবদান রেখেছিলেন। তাঁর উপন্যাসের নাম ফুলমণি ও করুণার বিবরণ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) তখনো তাঁর কথাসাহিত্য নিয়ে বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করেননি। তাঁর প্রথম উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে। তার আগে মধুসূদন বাংলা গদ্য রচনায় অবদান রাখতে চেয়েছিলেন। বন্ধুকে তিনি লিখেছেন, ‘গদ্যচর্চায় আমি অগ্নিশিখার মতো জ্বলে উঠতে চাই। ‘ভদ্রলোকদের যে ঘৃণ্যজন’ নিজেদেরকে অনেক বড় লেখক বলে প্রকাশ করতে চায়, তাদেরকে আমি ছাই করে দিতে চাই। বড় লেখক!! ওরা সব বেহালার ছড়। দিন দিনই তা প্রকাশ পাচ্ছে। বন্ধু রাজ! তুমি আমার ওপর ভরসা রাখতে পার। আমি প্রচণ্ড একটা ধূমকেতুর মতো উদিত হব এবং এর কোনো অন্যথা হবে না।’১৪ এ-চিঠি মধুসূদন লিখেছিলেন ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে বিলেত যাওয়ার আগে। তিনি কাদের ঘৃণ্যজন বলেছেন আমরা জানি না। কিন্তু তিনি অগ্নিশিখার মতো জ্বলে উঠতে চেয়েছিলেন বা ধূমকেতুর মতো উদিত হতে চেয়েছিলেন, তা হয়ে ওঠেনি। ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিলেত গমন করেন। ফিরে আসেন ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে। ফিরে এসে নিরবছিন্নভাবে সাহিত্যচর্চার সুযোগ তিনি পাননি। অর্থকষ্ট, শারীরিক অসুস্থতা, ঋণের বোঝা – এসব কিছু তাঁকে বিপর্যস্ত করে তোলে। আমরা বঞ্চিত হয়েছি মধুসূদনের নবতর গদ্যচর্চা থেকে।
মধুসূদন যখন ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে – তিনি বাংলা ভাষার উন্নতির জন্য ভেবেছেন, নিজেকে নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বন্ধু গৌরদাসকে তিনি লিখেছেন, ‘আমি খুশি হতাম, যদি আমি আমাদের ভাষার চর্চায় নিজেকে পূর্ণভাবে উৎসর্গ করতে পারতাম। কিন্তু লেখক জীবন যাপনের জন্য কোনো সংস্থান আমার নেই। … সাহিত্য সংক্রান্ত বিষয়ে আমি যদি বিশেষ কিছু না করে থাকি, আমার প্রতিভা থাকলেও, সেটা পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করার মতো সংগতি আমার নেই। আমি যতটুকু করতে পারব, আমার দেশ যেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকে।’১৫ তিনি অনেককিছু দিয়েছেন, আমরা তাঁর অমূল্য সৃষ্টিসম্ভারে ধন্য হয়েছি। তবে তা তাঁর প্রতিভার তুলনায় অপ্রতুল। তাঁর বাংলা সাহিত্য চর্চা সর্বসাকল্যে সাত বছর – ১৮৫৮ থেকে ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাস পর্যন্ত। আর ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। এছাড়া বিদেশ থেকে ফিরে বিচ্ছিন্নভাবে এক বছর। আশার ছলনে ভুলে তিনি বিসর্জন দিয়েছেন সাহিত্যসাধনাকে।
মধুসূদনের অসমাপ্ত রচনার সংখ্যা একেবারে কম নয়। তিনি তাঁর ব্রজাঙ্গনা কাব্যর দ্বিতীয় সর্গ শুরু করেছিলেন। কিয়দংশ লিখে আর এগোতে পারেননি। তাঁর বীরাঙ্গনা কাব্য এগারোটি পত্রে শেষ করে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর ইচ্ছা ছিল তিনি বাইশটি পত্র লিখবেন। শুরু করেছিলেন, লিখেছিলেন ‘ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি গান্ধারী’, ‘অনিরুদ্ধের প্রতি ঊষা’, ‘যযাতির প্রতি শর্ম্মিষ্ঠা’, ‘নারায়ণের প্রতি লক্ষ্মী’ ও ‘নলের প্রতি দময়ন্তী’। শুরু করে আর লিখতে পারেননি। পুনর্লিখন করতে চেয়েছিলেন তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য। অনেকটা লিখে ফেলে রেখেছিলেন। লিখেছিলেন ভারত-বৃত্তান্ত, দ্রৌপদীস্বয়ম্বর। শুরু করে শেষ করতে পারেননি। লিখতে শুরু করেছিলেন কাব্য ‘সুভদ্রা-হরণ’। প্রথম সর্গ শুরু করে শেষ করেননি। তেমনি শেষ করতে পারেননি ‘মৎসগন্ধা’, ‘পাণ্ডববিজয়’, ‘দুর্যোধনের মৃত্যু’। ‘দেবদানবীয়ম্’ নামে একটা মহাকাব্য শুরু করেছিলেন। শুরুটা ছিল এরকম :
কাব্যেকখানি রচিবারে চাহি,
কহ কি ছন্দঃ মনানন্দ দেবে
মনীষবৃন্দে এ সুবঙ্গদেশে?
তোমার বীণা দেহ মোর হাতে,
বাজাইয়া তায় যশস্বী হবো,
অমৃতরূপে তব কৃপাবারি
দেহো জননী গো, ঢালি এ পেটে ॥
(প্রথম সর্গ)১৬
মাইকেল মধুসূদন দত্ত নতুন ছন্দ নির্মাণে সচেষ্ট ছিলেন। উদ্ধৃত উপরিংশে আমরা দেখব একাদশপদী অমিত্রাক্ষরের দৃষ্টান্ত।
শেষ জীবনে মধুসূদন কিছু নীতিগর্ভ কবিতা রচনা করেন। নাটক লিখে প্রবেশ করেছিলেন সাহিত্যাঙ্গনে। তেমনি নাটক লিখে তাঁর চিরপ্রস্থান। শুরু করতে চেয়েছিলেন নাটক বিষ না ধনুর্গুণ। বেঙ্গল থিয়েটারের জন্য নাট্যসংগঠক শরচ্চন্দ্র ঘোষের অনুরোধে সম্মানীর বিনিময়ে মধুসূদন শুরু করেন নাটক মায়া-কানন। জীবনীকার জানিয়েছেন, ‘যে অবস্থায় তিনি ‘মায়া-কানন’ রচনা করেছিলেন তাহা চিন্তা করিলে ব্যথিত হইতে হয়। রোগের যন্ত্রণায় কখনো কখনো তিনি মূর্ছিত হইয়া পড়িতেন, রক্ত বমনে শরীর মধ্যে মধ্যে অবসন্ন হইয়া আসিত; অথচ তাহারই মধ্যে অর্থাভাব ক্লেশ কথঞ্চিৎ দূরীভূত হইবে ভাবিয়া, লেখনী হস্তে যখন যে ভাবটি হৃদয়ে উদিত হইত, তাহা লিপিবদ্ধ করিতেন। নিজের যখন লেখন সামর্থ্য না থাকিত, তখন কোন বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তি নিকটে থাকিলে, তাহার দ্বারা অভিপ্রেত বিষয় লিখাইয়া লইতেন।’১৭
মায়া-কাননের প্রকাশক শরচ্চন্দ্র ষোষ ও অখিলনাথ চট্টোপাধ্যায়-লিখিত বিজ্ঞাপনে উল্লেখ আছে, ‘বঙ্গ-কবি শিরোমণি ও সুপ্রসিদ্ধ বঙ্গীয় নাট্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্ত পীড়িত শয্যায় শয়ন করিয়া ‘মায়া-কানন’ নামে এই নাটকখানি রচনা করেন। বঙ্গরঙ্গভূমিতে অভিনীত হইবার উদ্দেশ্যে আমরাই তাঁহাকে দুইখানি উৎকৃষ্ট নাটক প্রণয়ন করিতে অনুরোধ করিয়াছিলাম। তদানুসারে তিনি ‘মায়া-কানন’ ও ‘বিষ না ধনুর্গুণ’ নামে আর একখানি নাটকের কতক অংশ রচনা করেন। লেখা সমাপ্ত হইবার অগ্রে তাঁহাকে উপযুক্ত মূল্য দিয়া এবং পীড়াকালীন সাহায্য দান করিয়া আমরা উভয়ে এই দুই নাটকের অধিকারত্ব স্বত্ব ও বঙ্গরঙ্গভূমিতে অভিনয়ের অধিকার ক্রয় করিয়াছি।’১৮ বেঙ্গল থিয়েটার কর্তৃপক্ষ মায়া-কানন শেষ করে মঞ্চস্থ ও প্রকাশ করেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনের জন্য আজীবন ভেবেছেন মধুসূদন। আমাদের সাহিত্যে অনেক নতুন বিষয়, বিন্যাস, প্রকরণ সংযোজনের কৃতিত্ব মাইকেল মধুসূদন দত্তের। তিনি আরো অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই ক্ষণজন্মা অমিত প্রতিভাধর মানুষটির সক্ষমতার সবটুকু প্রয়োগের সময় ও ক্ষেত্র তাঁর অনুকূলে ছিল না। আমরা যেটুকু পাই তা যেন অসম্পূর্ণ মধুসূদন।
উৎসনির্দেশ
১. খসরু পারভেজ (অনূদিত) মধুসূদনের চিঠি, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা, ২০১০, পৃ ১৬০।
২. গোলাম মুরশিদ, আশার ছলনে ভুলি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৮, পৃ ৪৯।
৩. ক্ষেত্র গুপ্ত (সম্পাদিত), মধুসূদন রচনাবলী, সাহিত্য সংসদ, কলিকাতা, ১৯৮৫, পৃ ৪১৮।
৪. খসরু পারভেজ, মধুসূদনের চিঠি, প্রাগুক্ত, ২০১০, পৃ ২৮।
৫. প্রাগুক্ত, পৃ ৪৯।
৬. প্রাগুক্ত, পৃ ১০০।
৭. প্রাগুক্ত, পৃ ১০৩।
৮. প্রাগুক্ত, পৃ ১০৯।
৯. যোগীন্দ্রনাথ বসু, মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনচরিত, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯৩, পৃ ৪৯২।
১০. খসরু পারভেজ, মধুসূদনের চিঠি, প্রাগুক্ত, ২০১০,
পৃ ৯৩।
১১. প্রাগুক্ত, পৃ ৫৬।
১২. মধুসূদন রচনাবলী, ক্ষেত্র গুপ্ত (সম্পাদিত), প্রাগুক্ত, ১৯৮৫, পৃ ৬৩।
১৩. খসরু পারভেজ, মধুসূদনের চিঠি, প্রাগুক্ত, ২০১০,
পৃ ৬৯।
১৪. প্রাগুক্ত, পৃ ৯০।
১৫. প্রাগুক্ত, পৃ ৫৭-৫৮।
১৬. ক্ষেত্র গুপ্ত (সম্পাদিত), প্রাগুক্ত, ১৯৮৫, পৃ ২০৪।
১৭. যোগীন্দ্রনাথ বসু, মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনচরিত, প্রাগুক্ত, ১৯৯৩, পৃ ৪২৩।
১৮. মধুসূদন রচনাবলী (ক্ষেত্র গুপ্ত-সম্পাদিত), প্রাগুক্ত, ১৯৮৫, পৃ ৬৩-৬৪।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.