বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের প্রধান স্থপতিদের একজন হাসান আজিজুল হক সত্তর বছরের প্রৌঢ়তায় পৌঁছে তাঁর ˆশশবস্মৃতি পুনরুদ্ধার করে চলেছেন| এখন পর্যন্ত প্রকাশিত স্মৃতিকথার তিন খণ্ড — ফিরে যাই ফিরে আসি (২০০৯), উঁকি দিয়ে দিগন্ত (২০১১) ও এই পুরাতন আখরগুলিতে (২০১৪) আমরা পেয়েছি ˆশশব থেকে চোদ্দো বছরের বালক-স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র হাসান আজিজুল হককে| অর্থাৎ তাঁর স্মৃতিকথা এখনো স্কুলজীবনের গণ্ডি পেরোয়নি| দীর্ঘ এ-জীবনের অভিজ্ঞতার অলিগলিতে আলো ফেলে মণিমুক্তোর মতো কুড়িয়ে যে-স্মৃতিগুলোকে মলাটবদ্ধ করে চলেছেন, তার সাহিত্যিক মূল্য তো বটেই, ঐতিহাসিক মূল্যও অনেক| শুধুই স্মৃতিকথা, শুধুই নিজের অতীত জীবনকে পেছনে ফিরে দেখা অথবা দেখানোর জন্য তিনি আত্মস্মৃতি লিখতে বসেননি — এই কথা একটা সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ‘আমি সাতকাহন করে স্মৃতিকথা লিখতে বসিনি|’ সৌভাগ্যই হোক আর দুর্ভাগ্যই হোক, হাসান আজিজুল হক যে-জীবন অতিবাহিত করে এসেছেন সে-জীবন এতটাই বিচিত্র যে, এক জীবনেই তিনি অধিবাসী হয়েছেন চারটি রাষ্ট্রের| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগের মতো ঘটনা তাঁর ˆশশবস্মৃতির অংশ| এই তিন খণ্ডের হাসান এখনো বর্ধমানের যবগ্রামে, বিভক্ত বাংলার একাংশ পশ্চিম বাংলার অধিবাসী| তাঁর সম্পূর্ণ মনোজগৎজুড়ে রাঢ়ের ˆশশব| তাঁর গল্পের জায়গাজমিন মানুষ রাঢ়ের| গল্পে তো বটেই, পরিণত বয়সে উপন্যাস লিখতে গিয়ে এ-পর্যন্ত লেখা দুটি উপন্যাস আগুনপাখি (২০০৬) ও সাবিত্রী উপাখ্যানের (২০১৩) আখ্যানভূমি রাঢ়ের বর্ধমান| আর স্মৃতিকথা লিখে জানিয়ে দিলেন, তিনি জন্মভূমি ছাড়েননি| দেশ ছাড়ার ষাট বছর পরও তাঁর গ্রাম, স্কুল, ˆশশবকে এভাবে জ্যান্ত আঁকড়ে ধরে রাখার অর্থই হচ্ছে মনোজগতে তিনি এখনো রাঢ়ের অধিবাসী| এই চেতন-অবচেতন জগৎটাকেই স্মৃতিকথায় তুলে আনবেন বলে জানান প্রথম খণ্ড ফিরে যাই ফিরে আসির মুখবন্ধে|
স্মৃতিকে কতটা পেছনে নেওয়া যায়? নিশ্চয়ই চেতনার পেছনে নয়| আমার ধারণা, শুধু চেতনাতে স্মৃতি নেই, যদি থাকেও আধো-অন্ধকারেই ডুবে থাকে| আত্মচেতনা থেকেই স্মৃতির শুরু| জন্মের পর থেকে চেতনা আছে, গূঢ় রহস্যময় চেতনা, কিন্তু স্মৃতি নেই| চেতনা-আত্মচেতনার মাঝখানের সান্ধ্য জায়গাটায় অনেকবার ফিরে যেতে চেয়েছি| সে যেন শুধু চাঁদের আলো নয়, ¯^প্নের চাঁদের আলো| কোনোকিছুই ঠিকমতো ঠাহর হয় না| বস্তু বস্তুর চেহারা ত্যাগ করে, ভয় মূর্ত চেহারায় সামনে এসে দাঁড়ায়, কল্পনাও বস্তু হয়ে ওঠে| … তবু অস্তিত্বের মানে তো একটাই, তা হলো কোনো মানেই নেই তার| সারাজীবন মানুষের কোনো না কোনো একটা অর্থ বুঝতেই কেটে যায়, সে বুঝতেও পারে না|… জ্ঞানে-অজ্ঞানে এই খোঁজাটুকুর জন্যেই মানুষের সমস্ত বাঁচাটা অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে যায়|
হাসান আজিজুল হক অত্যন্ত সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন প্রচলিত আত্মজীবনী লেখার রেওয়াজ| রাজনারায়ণ বসু, শিবনাথ শাস্ত্রী, প্রমথ চৌধুরী, বুদ্ধদেব বসু, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, এমনকি বাংলাদেশের ˆসয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ, বেলাল চৌধুরী প্রমুখ যে-ধারায় আত্মজীবনী লিখেছেন, তিনি সেখান থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ নিজের একটি পথ ˆতরি করে নিয়েছেন| গল্পের নিটোল গাঁথুনি, বিষয়-বিন্যাস, চরিত্রায়ণ, শব্দ, বাক্য, ভাষার সাবলীল প্রয়োগ, উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপক-অলংকারের দক্ষ ব্যবহার, প্রতিটি খণ্ডের অসম্ভব ব্যঞ্জনাময় সূচনা ও সমাপ্তির মধ্যে দিয়ে উঁচুমানের উপন্যাস হয়ে উঠেছে| আর এই স্মৃতির ঐতিহাসিক মূল্য অনেক|
জন্ম থেকে শুরু করে কেবল লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় স্মৃতিকথার প্রথম খণ্ড ফিরে যাই ফিরে আসিতে| এই খণ্ডের ভাষা পরের দুখণ্ডের ভাষার চেয়ে কিছুটা আলাদা| পরিণত লেখক, প্রাজ্ঞ কলম, কিন্তু তিনি যে মন নিয়ে একটি সময় পরিভ্রমণ করছেন সেটা একটা শিশুর কচিমন| এই কচিমনের শিশুর জীবনালেখ্য লিখতে গিয়ে লেখক সম্পূর্ণ নতুন একটা ভাষা ˆতরি করে নিয়েছেন, যে-ভাষায় কেবল তাঁরই ˆশশবস্মৃতি বর্ণনা করা সম্ভব| লেখক যেমন একই অঙ্গে শিশু এবং পরিণত মানুষ, তাঁর ভাষার ˆবশিষ্ট্যও তাই| এই ভাষার পাঠক হবেন পরিণত বয়স্ক, কিন্তু তাঁর থাকতে হবে শিশুমন|
হাসান আজিজুল হক তাঁর স্মৃতিকথা লিখতে বসে খুব বেশি পেছনে ফিরে তাকাননি| সচরাচর পূর্বপুরুষের পরিচয় দিয়ে স্মৃতিকথা শুরু হলেও হাসান এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম| তাঁর স্মৃতিকথা শুরু জন্মের দিন-সাল নির্ধারণের বিতর্ক দিয়ে| ষোলো বছর বয়সের প্রথম ছেলের আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর পরিবার, বিশেষ করে তাঁর পিতা মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে, কিছুদিনের জন্য জীবনের প্রতি মোহ হারিয়ে ফেলেছিলেন| এই সময় তাঁর জন্ম হয় বলে জন্মের দিন-তারিখ লিখে রাখা হয়নি| মায়ের স্মৃতি হাতড়ে যে-তারিখটি তিনি নির্ধারণ করেন, সে-তারিখটি তাঁর প্রচলিত জন্মতারিখের সঙ্গে মেলে না| তাঁর সমস্ত বই এবং তাঁকে নিয়ে লেখালেখি ও গবেষণায় ২ ফেব্রুয়ারি তারিখটি ব্যবহৃত হয়| স্কুলের ভর্তি ফরমে ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯ লিখে দিয়েছিলেন বাবা, তারপর থেকেই চালু হয়ে যায়| ফলে প্রচলিত তারিখটি হাসান আজিজুল হকের প্রকৃত জন্মতারিখ নয়| মায়ের স্মৃতিশক্তি ব্যবহার করে, ভাদ্রমাসে জন্ম নিশ্চিত প্রমাণ করে তিনি তাঁর জন্মতারিখ পুনর্নির্ধারণ করেন| ‘আমার ধারণা, আমার জন্মদিন ৩রা সেপ্টে¤^র উনিশ শো ঊনচল্লিশ| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিন|’ (ফিরে যাই ফিরে আসি, পৃ ১৮)
জন্মতারিখের এ-বিতর্ক মেটানোর জন্য মাত্র কয়েকটি পৃষ্ঠা ব্যবহার করেন হাসান| এরপরই সরাসরি চলে যান তাঁর ˆশশবস্মৃতির কাছে, যেখানে প্রথমেই স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে তিনশো বছর আগে মরে যাওয়া পীরঠাকুরের কথা| এই পীরঠাকুর কোনো কোনো পূর্ণিমারাতে সাদা আলখাল্লা পরে ঘোড়ায় চড়ে ভক্তদের দেখা দেন| ঘোড়ায় চড়ে আসেন বলে তাঁর ভক্তরা মাটির ˆতরি বিচিত্র সাইজের ঘোড়া সরবরাহ করে| হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পীরঠাকুরের মাধ্যমে| যদিও হিন্দুভক্ত বেশি, তবু লেখকের বংশধররাই এর খাদেম| সন্তানহীন বিবাহিত হিন্দু রমণীরা সন্তানের প্রার্থনা নিয়ে আসে| সঙ্গে নিয়ে আসে নানা উপহার| রাঢ়ের পীরঠাকুর-ভক্তির অসাধারণ একটি দৃশ্যকল্প তুলে ধরার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় হাসানের ˆশশবযাত্রা| তারপর এই বালক গ্রামের অলিগলি, মাঠ-ঘাট-প্রান্তর ঘুরে বেড়ায়| দুপুরের কাঠফাটা রোদে রাঢ়ের বিস্মৃত মাঠে এসে দাঁড়ায় সম্পূর্ণ একা| জমির ফাটল দিয়ে পাতাল দেখে, অজানা বিশ্ব আবিষ্কারের নেশায়| বিশ্রামরত একটি ল¤^া চিতা সাপ আবিষ্কার করে ফাটলের শেষ মাথায়| এই ফাটল থেকে বিষাক্ত সাপটি বের করে আনার তীব্র চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত সাপটিকে তার নিরাপদ আস্তানা থেকে বের করে এনেই শেষ করে দুঃসাহসিক অভিযান| এই বালক নির্জন দুপুরে অথবা সন্ধ্যায় কবরের সামনে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, মৃত মানুষ জীবিত হয়ে আসার অপেক্ষায়| মৃত মানুষের কঙ্কাল দেখার তীব্র লোভ তার| কঙ্কাল দেখার জন্য পুরনো কবরে উঁকিঝুঁকি মারে| কালীপুজোর রাতে মণ্ডপে সশরীরে উপস্থিত হয়ে পাঁঠা বলি ও কালীর নড়া দেখে দুর্দান্ত কৌতূহল নিয়ে| এই বালক আবার নিস্তব্ধ দুপুরে পাখির বাসা থেকে ডিম বের করে আনা এবং ডিম ফাটানোর ওস্তাদ| ফড়িঙের পেছনে দৌড়ে সকাল-বিকাল পার করে দিতে পারে যে চঞ্চল বালক, সে-ই আবার খামারবাড়িতে একা আপনমনে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিতে পারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা| গ্রামের বনবাদাড়ের এমন কোনো স্থান নেই খাদ্যাšে^ষণে যেখানে বালকের সন্ধানী চোখ পড়েনি| তাঁর সদম্ভ ঘোষণা, ‘আমার কোনো ভয় নেই| আমি গাছে চড়ি — কদবেল গাছ, হর্তুকি গাছ, বহেড়া গাছ, তেঁতুল গাছ, নিম গাছ, তাল গাছ — কোনো গাছই বাদ নেই| এদের ফল তো খেয়ে দেখতেই হবে নিশ্চয়| হর্তুকি চিবিয়ে পানি খেলে শরবত খাওয়া হয়| পাকা বহেড়া, পাকা নিম চুষতে মন্দ লাগে না| আর নুন-মাখানো তেঁতুল, নুন-জারানো কাঁচা আমের মতোই চমৎকার খেতে| এতো রকম খাবার চেখে দেখবো না কেন? বনফুল, বঁইচি, কাঁচা আম, তালশাঁস, কাঁচা জাম, কাঁচা পেয়ারা এসব তো রীতিমতো খাদ্য|’ (ফিরে যাই ফিরে আসি, পৃ ৩৬) এই খাদ্যাšে^ষণ করতে গিয়ে সাপে ভয় নেই, ভূত-প্রেতেও ভয় নেই| বরং সে বলে, ‘ভূতের ভয়ে আমি লুকবো কি, ভূতরাই পাছে দূর থেকে আমাকে দেখে ভয়ে, লজ্জায় বিব্রত হয়ে সামনে না আসে, সেজন্যে আমি আড়ালে লুকিয়ে থেকেছি| মানুষের হিসেবে যেগুলো খুব অসময় কিন্তু ভূতেদের হিসেবে খেলাধুলো ঘর-সংসার করার একেবারে ঠিক সময়, বেছে বেছে সেই সময়গুলোতেই একা হাজির হতাম যাতে বেচারাদের বেকায়দায় ক্যাঁক করে ধরতে পারি|’ (ফিরে যাই ফিরে আসি, পৃ ৩৭) এছাড়া মাদারের খেলা, লাট্টু খেলা, কড়ি খেলা, মার্বেল খেলা, মাছ ধরার অভিজ্ঞতায় পূর্ণ হাসানের ˆশশব| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আকাশে উড়োজাহাজের ডিগবাজিকেও বালক খেলা হিসেবেই নিয়েছিল| এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি তেমন নেই|
রাঢ়ের বর্ধমানের যবগ্রামের বালক নিজের গ্রামের দিকে তাকিয়েছে নিস্পৃহ চোখে| স্মৃতিকথার তিন খণ্ডেই গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে আছে যবগ্রামের ভূ-প্রকৃতি| গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে তাঁর ভীষণ অসন্তুষ্টি| ধান ছাড়া গ্রামে আর তেমন কিছুই উৎপন্ন হয় না| শহরের সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তাটি কাঁচা, গ্রীষ্মে ধুলোবালির স্তূপ, বর্ষায় ভয়ানক কাদা| উৎপাদিত ফসল বিক্রির সংকট| হাসান আজিজুল হক যেহেতু সাতকাহন করে স্মৃতিকথা লিখছেন না, তাই তাঁর নিজের গ্রামের বাস্তব চালচিত্র তুলে ধরেন নিঃসংকোচে| প্রায় তিরিশ বছর আগে লেখা গল্পের জায়গা জমি মানুষে রাঢ়ের প্রকৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, ‘আমাদের দেশ ছিলো রুখো কর্কশ| গাছপালা প্রায় নেই| খুব বড়ো বড়ো মাঠ| তেপান্তর যাকে বলে| গরমের দিনে ঘাস জ্বলে যায়| মাটির রং হয় পোড়া তামাটে| শরতে সেই মাটিকেই দেখি হাড়ের মত শাদা| … এই হলো রাঢ়|’ এত বছর পরে স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে লিখলেন একই কথা|
একটু সবুজ খুঁজে পাওয়া যে কি মুশকিল এখানে? সব ধুলোয় ভরা| গাঁয়ের রাস্তা গোড়ালি-ডোবা ধুলোয় ঢাকা| এমনকি মরা ঘাসও নেই কোথাও| রাস্তার দুদিকে সারবাঁধা ধুলো-ল্যাপটানো মাটির বাড়ি, একটার পর একটা, গায়ে-গায়ে লাগানো| মাটির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, দুই বাড়ির মাঝখানে একটাই প্রাচীর| ন্যাংটো উদোম মেটে সব বাড়ি| বহুদূর থেকে দেখা যায়| ভুতুড়ে মনে হয়, মরা-মানুষের মরা বাড়ির সার বলে মনে হয়| (ওই, পৃ ৫৮)
এরপরই গ্রামের তিন পাগলের গল্প, প্রথম জুতো পরার অভিজ্ঞতা, পাগলা নাপিতের চুল কাটা, বাসু কামারের পাঁঠা কাটা, গ্রামের যাত্রাপালার রিহার্সেল, কণ্ঠ কামারের কামারশালার কাঠকয়লার আগুনে ইস্পাত পোড়ানো — এসব টুকরো টুকরো স্মৃতির ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে বালক পৌঁছে যায় তার জীবনের প্রথম পাঠশালায় — বামুনগাঁয়ের রণমাস্টারের পাঠশালা| এই পাঠশালায় বালকের লেখাপড়ার হাতেখড়ি| জীবনের প্রথম শিক্ষকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁর অনুভূতি : ‘কালো গাঁট্টাগোঁট্টা মানুষটি আমাদের দিকেই চেয়েছিলেন| গালভরা হাসিতে চোখ দুটি কুঁচকে আছে| এমন চমৎকার লাগছে, ভয় তো নয়ই| হঠাৎ-ই যেন এক ঝলক রোদ এসে পড়ল তাঁর মুখে, ময়লা মোটা চাদরটা কি করে একটু ফাঁক হয়ে গেলে দেখি, গা খালি তার, চাদরটাই শুধু আছে গায়ে আর আছে ধুলোয় কালো একগোছ ˆপতে|’ (ফিরে যাই ফিরে আসি, পৃ ১০০)
মাঠ পেরিয়ে বামুনগাঁয়ের রণপণ্ডিতের পাঠশালায় প্রথম গমনের দিন বালক তার পথ, মাঠ, গাছপালা, পুকুর, খাল, পাখ-পাখালির অপূর্ব দৃশ্য ছবির মতো একে একে বর্ণনা করে যায়| এই খণ্ড খণ্ড ছবিগুলো দিয়ে নির্মিত হয় একটি গ্রামের সম্পূর্ণ চিত্রকল্প| কানায় কানায় ভরা খাল পার হতে হয় হাফপ্যান্ট খুলে, সম্পূর্ণ ন্যাংটো হয়ে| স্কুলে একজনও মেয়ে নেই| ময়লা হাফপ্যান্ট-পরিহিত ছেলেগুলো তৎকালীন গ্রামীণ বাস্তবতার একটি দিক| চরম দারিদ্র্য আর অবহেলার শিকার ছেলেগুলোর লেখাপড়া খুব বেশিদূর এগোয় না| হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মেয়েদের শিক্ষা থেকে দূরে রেখেছিল| হাসান আজিজুল হক তাঁর ˆশশবস্মৃতি লিখতে বসে এভাবেই ধরেছেন তাঁর পশ্চাৎপদ সমাজকে|
রণমাস্টারের পাঠশালা ছেড়ে দাশরথি পাঠকের পাঠশালায় ভর্তি হওয়ার পরে বালকের শিক্ষাজীবন নতুন বাঁক নেয়| দ্বিতীয় শিক্ষক দাশু মাস্টার ¯^তন্ত্র চারিত্রিক ˆবশিষ্ট্যের অধিকারী| তাঁর দেহের বর্ণনা অত্যন্ত চমৎকার, ‘মাস্টার মশাই হালকা ল¤^া ফর্সা মানুষ| ঠিক বামুনদের মতোই, খুব ল¤^া আর উপুসে, রোগা; পেটে-পিঠে লাগানো, খানিকটা ধনুকের মতো বাঁকা| খাড়া নাক, বুকের মতো গলায় বড়ো পানিফলের মতো তেকোনা একটি হাড় উঁচু হয়ে আছে| ভীষণ রাগী, দুই ভুরুর মাঝখানটায় ল¤^া ল¤^া ভাঁজ|’ (ফিরে যাই ফিরে আসি, পৃ ১১০)| দাশু মাস্টার হাসান আজিজুল হকের বালকমনের ওপরে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারকারী প্রথম শিক্ষক| অনুসরণীয় এই মহৎ শিক্ষাগুরুকে তিনি স্মরণ করেন অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে| কঠিন দারিদ্র্যের মধ্যে প্রায় বিনা পারিশ্রমিকে একনিষ্ঠভাবে শিক্ষকতায় নিয়োজিত এই মানুষগুলো ছিলেন গ্রামের আদর্শ| পাঠশালা থেকেই প্রথম প্রাইমারি পরীক্ষা এবং তাই দাশু মাস্টারের শ্রম বেড়ে যায় অতিরিক্ত| বালকের ভাষ্যে, ‘বিকেল, সন্ধে, রাত পর্যন্ত পাঠশালার খোঁয়াড়ে গরু-ছাগলের মতো আমাদের আটকে রাখা হল|’ এই মানুষটিই আবার হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় মুসলমান ছাত্রকে রক্ষার জন্যে নিজে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসেন| প্রাণভয় বিসর্জন দিয়ে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করেন, ‘থামো, থামো — কে কাকে মারতে যাচ্ছো?’
দাশরথি পাঠকের পাঠশালার ছাত্র বলরাম ওরফে বলা বালকের মনে প্রভাব বিস্তারকারী এক বিশেষ চরিত্র| বলা ‘ফেল করে করে হাড় পাকিয়ে ফেলেছে, শরীরটা করেছে পুরনো তালগাছের গুঁড়ি|’ এই বলা তার তৃতীয় শিক্ষক| রণমাস্টার ও দাশু মাস্টার তাকে যা শেখাতে পারেননি, বলার কাছে নিয়েছে সেই পাঠ| বলার কাছে যে-শিক্ষা পেয়েছিলেন লেখক, সে-শিক্ষার স্মৃতি আজো জাজ্বল্যমান| ‘মানুষের শরীরে কি কি আছে একদম উদোম হয়ে সে আমাদের তা দেখিয়ে দিয়েছিল, দুঃখ করেছিল যে হাতের কাছে মেয়ে নেই বলে ওদের শরীরে কি কি থাকে, তা শুধু মুখে মুখে বলা হলো, সরাসরি দেখানো গেল না| মানুষদের ছেলেপুলে কিভাবে হয় তাও বলা কান কামড়ে বলে দিয়েছিল|’ (ফিরে যাই ফিরে আসি, পৃ ১২৩) অঙ্ক ইংরেজি ভুলে গেলেও বলার দেওয়া পাঠ ভোলার উপায় ছিল না| মুসলমানের ছেলে বলে হিন্দু ছেলেরা স্কুলের খেলার মাঠ থেকে তাড়িয়ে দিলে বলা প্রতিবাদ করে এবং মারামারি করতে পর্যন্ত প্রস্তুত| স্মৃতিকথার তিন খণ্ডেই বলা জড়িয়ে আছে লেখকের জীবনে| তৃতীয় খণ্ডে কলেরায় বলার মৃত্যু ঘটে| পালিয়ে মৃত্যু-শয্যাশায়ী বলাকে দেখতে গিয়েছিল বালক| কলেরায় ধরতে পারে ভেবে শঙ্কিত বলা তাঁর বন্ধুকে সতর্ক করে বলেছিল, ‘তুই কেন এসেছিস আইজুল? যা যা চলে যা, পালা পালা — নিভে আসা চোখে আমার দিকে চেয়ে বাঁ-হাতটা দু-তিনবার নেড়ে সে আবার বলল, সেই দুর্দান্ত বলশালী বলা, আমার কলেরা হয়েছে, খানিকবাদেই মরে যাব, তুই কেন এসেছিস ভাই আইজুল, পালা পালা…|’ (এই পুরাতন আখরগুলি, পৃ ১০২)
হাসান আজিজুল হকের স্মৃতিকথার তিন খণ্ড জুড়েই তাঁর বাবার চরিত্র ঘুরেফিরে এসেছে| বালক হাসানের ˆশশবসত্তা জুড়ে তাঁর বাবার উপস্থিতি ভয়, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা মিলিয়ে মিশিয়ে| গ্রামের সর্বজনমান্য তাঁর বাবা সংস্কৃতিবান, সংগীতমনা, মিতভাষী, প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন| সেই তিরিশের দশকের বাস্তবতার কথা ভাবলে, তাঁর বাবা প্রবলভাবে আধুনিকমনস্ক| গ্রামোফোন, একনালা বন্দুক, সাইকেল, বাড়িতে পত্রিকা রাখা, নিয়মিত শহরে যাতায়াত ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে প্রবলভাবে আধুনিকমনস্ক একজন মানুষকে পাই| তিরিশের দশকের বাস্তবতার কথা ভাবলে তাকে আলোকিত মানুষ বলা যায় নিঃসন্দেহে| গ্রামে সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানের একজন হয়েও ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন| অবশ্য বাবা সম্পর্কে বালকের অভিযোগ, ছেলের বেড়ে ওঠার ব্যাপারে তিনি বরাবর উদাসীন| কিন্তু তাঁর বর্ণনাতেই ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে, বাস্তবটা সম্পূর্ণ উলটো| হাসান আজিজুল হকের ˆশশবসত্তা এবং ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রধান দায়িত্বটা পালন করেন তাঁর বাবা| ছেলেকে প্রথম জুতো-জামা পরানো, গোসল করানো, নাপিত ডেকে চুল কাটানোর মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজগুলোর প্রতি বাবার কঠোর দৃষ্টি| কিন্তু কোনোকিছুতেই আদিখ্যেতা নেই, আছে কড়া শাসন| সংসারের কঠিন টানাপোড়েনের মধ্যেও ছেলের স্কুলে ভর্তি, বই কেনার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন| বাবার ভেতরে ছিল কোমল একটি পিতৃপ্রাণ| বালক তা ধরে উঠতে পারেনি বলেই মনে হতো পাথুরে-¯^ভাবের|
তাঁর কথাই শেষ কথা, সেজন্যে তিনিই কথা বলেন সবচেয়ে কম আর সেইসঙ্গে আছে তাঁর চরম তিরিক্ষি মেজাজ| কোনো কথা তাঁর সামনে একটু সময় নিয়ে বুঝিয়ে বলা অসম্ভব| কিছুতেই সময় দেবেন না, মুখ খুললেই বুঝে ফেলেন যে, কী বলতে চাইছে| হ্যাঁ, তারপর কী? বলে মুখের দিকে তাকালেই সব এলোমেলো হয়ে যায়| কেন যে হুশ করে জ্বলে ওঠে মানুষটা! আবার তিনিই যখন বাইরের কারো সঙ্গে কথা বলেন কী শান্ত মেজাজ, কেমন নিচু গলায় টানা কথা| খুব কম কথা আবার খুব ঠিকঠাক|
(ফিরে যাই ফিরে আসি, পৃ ১৩৩)
রাঢ়ের বালকের স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে চল্লিশের দশকের একটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের গার্হস্থ্যজীবন| একান্নবর্তী পরিবারের প্রত্যেক সদস্য প্রত্যেকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল| বালকের বাবা পরিবারপ্রধান, তবে অন্দরমহলের কর্ত্রী তার দাদি এবং দাদির মৃত্যুর পরে ফুফু| অল্প বয়সে বিধবা হয়ে যাওয়া ফুফু ভাইদের সন্তানদের বুকে টানেন মাতৃøেহে| হাসানের ˆশশবসত্তায় তাঁর নিজের মায়ের চেয়ে ফুফুর স্মৃতি বেশি জ্যান্ত| বস্তুতপক্ষে, ফুফুই ছিলেন তাঁর সার্বিক দেখভালের দায়িত্বে| তাই তিন খণ্ডের স্মৃতিকথায় বাবা, ফুফুর কথা যতবার এবং যত গুরুত্ব নিয়ে এসেছে, মার কথা সে-তুলনায় যৎসামান্য|
স্মৃতিকথার দ্বিতীয় খণ্ড উঁকি দিয়ে দিগন্ততে পাঠশালার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র বালক| অর্থাৎ চারপাশের জীবন-জগৎ, ঘটনাপ্রবাহ তার কাছে কিছু জিজ্ঞাসাচিহ্ন ˆতরি করছে| গান্ধী, নেহরু, জিন্নাহ, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভা এসব রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সংগঠনের নাম ঘুরেফিরে আসে বঙ্গবাসী পত্রিকায়| ধীরে ধীরে নিজ গ্রামের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে দেশীয় এবং ˆবশ্বিক বাস্তবতায় প্রবেশ করে বালক| কলকাতার দাঙ্গায় গ্রামের নিরীহ দরিদ্র ছেলে লক্ষ্মীর মুসলমানদের হাতে কাটা পড়ার খবর গ্রামে পৌঁছলে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যে ফাটল ধরে, সংঘাত ঘনিয়ে ওঠে| বালক লক্ষ্মীর এই হত্যাকাণ্ডকে মেনে নিতে পারে না| তার মন ভীষণভাবে মর্মাহত ও প্রশ্নাকুল, ‘খালি মনে হচ্ছে কারা যেন আমার ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার একটা সুড়ঙ্গ কাটছে| আচ্ছা, কিভাবে মেরেছে রোগা-পটকা কবুতরবুকো লক্ষ্মীদাকে? ঘরের ভিতরে, বাড়ির উঠোনে, রাস্তায়? সকালে, দুপুরে, সাঁঝে? কতজনে মেরেছে, কি দিয়ে মেরেছে, কোপ পড়ার আগে হাত তুলেছিল কি লক্ষ্মীদা?’ (উঁকি দিয়ে দিগন্ত, পৃ ২৩)
কলকাতার দাঙ্গা এবং দাঙ্গা গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার মধ্যে যে-রাজনীতি, সে-রাজনীতির জটিল সমীকরণ রাঢ়ের যবগ্রামের এই বালক ধরতে পারে না বটে, কিন্তু দাঙ্গা নিয়ে কতগুলো মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে সে| এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পরিণত বয়সেও পাননি লেখক| এই দাঙ্গার প্রত্যক্ষ অংশী বালক ভীতসন্ত্রস্ত, যে-কোনো মুহূর্তে মাকালীর ভক্ত-উপাসক আগুরিরা কপালে লালচন্দন লেপে, সিঁদুর-মাখানো খাঁড়া, টাঙি, কিরিচ নিয়ে আক্রমণ করবে, ‘একটিও মোচলমান রাখবে না| ভোর রাতের মধ্যেই চলে আসবে’| প্রাণ ভয়ে আতঙ্কিত বালকের মানসপটে দাঙ্গার ভয়ংকর দৃশ্যপট ভেসে ওঠে, ‘হাতে সিঁদুর-লেপা খাঁড়া কিংবা টাঙি, নাকের তলায় টাঙি-গোঁফ, খচখচ করে মানুষের মাথা মাটিতে পড়ছে, এক জায়গায় গাদা হচ্ছে, দু-চারটে এদিক-ওদিক গড়িয়ে যাচ্ছে, এখানে আমার মাথা, ওদিকে মায়ের বা ভাইয়ের আর একদিকে বাবার — না, অসম্ভব, বাবার মাথা কাটার সাধ্য কারো নেই, অসম্ভব| কিছুতেই ঘুমুতে পারছি না…|’ (উঁকি দিয়ে দিগন্ত, পৃ ২৭)
হিন্দু-মুসলমানের পরস্পরের বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও সহাবস্থান ভেঙে পড়ে এবং তুচ্ছ কারণে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের প্রস্তুতি চলে| এই সংঘাত যে পরিকল্পিত এবং দেশভাগের ষড়যন্ত্রেরই অংশ, বালকের চিন্তাশক্তি এতদূর পর্যন্ত না পৌঁছালেও এটা ঠিকই ধরতে পারে যে, এক সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের চাহনি পালটে যাচ্ছে, ‘টকটকে লাল হিংসা যেন ফেটে বেরোয় চোখ দিয়ে’| দাঙ্গার এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং ভয়ংকর রূপ হাসান আজিজুল হকের শিশুমনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল| শুধু স্মৃতিকথায় নয়, গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ যা কিছুই লিখেছেন, এই দুঃসহ স্মৃতি ভোলেননি| ঠিক যেমন ভোলেননি দেশভাগ এবং দেশভাগজনিত কারণে দেশত্যাগের নির্মম ট্র্যাজেডি| জীবনের প্রৌঢ়তায় পৌঁছে উপন্যাস লিখতে গিয়ে তিনি দাঙ্গা, দেশভাগের ট্র্যাজেডিকেই প্রধান বিষয় করেন| আর এখন স্মৃতির পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে প্রধান হয়ে ওঠে দাঙ্গা, দেশভাগের রাজনীতি ও দেশভাগের মর্মান্তিকতা|
বাংলা ভাগের দায় বর্তায় বাঙালির ওপরেই| হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের অবিশ্বাস আর আত্মঘাতী সংঘাতের নির্মম পরিণতি হলো বাংলা ভাগ| শিবরাম মাস্টারের কণ্ঠে লেখক প্রকৃত সত্যটিকে তুলে ধরেন, ‘…বাঙালি নিজ উদ্যোগে বাংলাকে কেটে দু-টুকরো করে এক টুকরো পাকিস্তানে ঢোকাল, আর এক টুকরো ভারতে রাখলো| এই কাজটা আমরাই করেছি| জানি না, কাল আমাদের ক্ষমা করবে কি না| আমাদের পরে যাঁরা এই বাংলায় থাকবে তারা আমাদের ক্ষমা করবে কি না|’ (উঁকি দিয়ে দিগন্ত, পৃ ১৭৪) হাসান আজিজুল হক এবং তাঁর মতো যারা দেশত্যাগ করেছেন, যারা সংখ্যালঘু হয়ে এখনো নিজ দেশে নিরাপত্তাহীন, পরবাসী, তারা এবং তাদের উত্তর প্রজন্ম কি সত্যিই ক্ষমা করতে পেরেছে? দেশত্যাগের ষাট বছর পরে এসে আগুনপাখি উপন্যাসে দেশভাগকে শুধুমাত্র প্রত্যাখ্যানই করেননি, যুক্তি দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, দেশভাগ সম্পূর্ণ ব্যর্থ, অযৌক্তিক| ক্ষমতালোভী কিছু মানুষের ¯^ার্থ দ্বারা সংঘটিত দেশভাগ ইতিহাসের একটি মারাত্মক ভুল| এই ভুল যে কতটা মারাত্মক তা দেশভাগবিরোধী এক নেতার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় এভাবে :
মারি-মড়ক-বন্যা-আকাল কিছুই করতে পারে না আমাদের| যুদ্ধ গেল, আকাল গেল, খরা গেল, বন্যা গেল, ভাইয়ে-ভাইয়ে দাঙ্গা গেল — সব পেরিয়ে এসেছেন আপনারা| দেশ ছাড়তে হয়েছে, গাঁ ছাড়তে হয়েছে, ভিটেমাটি ছাড়তে হয়েছে, কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়, বাড়িতে বাড়িতে একটু ফ্যান দাও মা, একটু ফ্যান দাও মা, বলে বলে তালু শুকিয়ে কিছুই না পেয়ে উপোসে মরেছে আপনাদের ছেলেমেয়ে, ভাইবোন, সোয়ামি-স্ত্রী| এই চোখ দিয়ে দেখেছি ফুটপাতে ফুটপাতে মানুষের মরা| কুকুরে ছিঁড়ছে, দিনের বেলায় শেয়াল বেরিয়ে কুকুরের সঙ্গে মানুষের শুকনো শরীর নিয়ে ছেঁড়াছেঁড়ি করছে| কলকাতার রাস্তায় শকুন নামছে| তাও কি শেষ হয়ে গেছেন আপনারা?
(উঁকি দিয়ে দিগন্ত, পৃ ১৩৩)|
দাঙ্গা, দেশভাগের সন্নিকটে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ও বস্ত্রসংকট ভয়ানক-বীভৎস মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল| নয় বছরের হাসানের বালকমনে সেই স্মৃতিও দগদগে| রাস্তায় কুকুর ছাড়া মানুষ নেই| যে-মানুষেরা রাস্তায় বের হচ্ছে তাদের শরীরে এক ছটাকও মাংস নেই, অস্থিসর্ব¯^, সামান্য ত্যানা বা ছেঁড়া আধখানা ধুতি-পরিহিত অর্থাৎ প্রায় নগ্ন| এই সব জ্যান্ত মানুষকে দেখে ক্ষুধার্ত কুকুরেরা এগিয়ে আসে|
‘এইবার আমি স্কুলে ভর্তি হবো| আর আমাকে পায় কে?’ বলে স্মৃতিকথার দ্বিতীয় খণ্ড উঁকি দিয়ে দিগন্ত শেষ হয়| বিচিত্রসব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সফলভাবে শেষ হয় পাঠশালার শিক্ষাজীবন| যবগ্রাম কাশীশ্বরী ইনস্টিটিউশনে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি, নবম শ্রেণি পর্যন্ত ওঠা এবং এই সময়কালের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ উঠে এসেছে স্মৃতিকথার তৃতীয় খণ্ডে, এই পুরাতন আখরগুলিতে| এরই মধ্যে দেশভাগ হয়ে গেছে এবং বালক ভারতের অংশ পশ্চিম বাংলার অধিবাসী| দেশ ¯^াধীন হবার পরে বালক সংখ্যালঘু শ্রেণিতে পরিণত হলে গেল| স্কুলের ভর্তি থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে এখন মুসলমান বলে আলাদাভাবে চিহ্নিত| স্কুলে কোনো মুসলমান ছেলে নেই| মুসলমান ছেলেকে দেখে তাই চমকায় ছাত্ররা, ‘অ, মোচলমানদের ছেলে!’ স্কুলের একদিনের অভিজ্ঞতা —
একদিন এই রকম পেন্সিল চাইলে (সংস্কৃত পণ্ডিতমশাই) আমি আমার পেন্সিলটা এগিয়ে দিলাম, তিনি কী রকম নাক কুঁচকে উঁহু-উঁহু-উঁহু করে জোরে জোরে মাথা নেড়ে বললেন, না, না, তোর পেন্সিল নয়, তোর পেন্সিল নয়| আমি, দেখেছি তুই পেন্সিলের শিষ জিভে লাগাস| তিনি আমার পেন্সিল তো নিলেনই না, তাঁর মুখে ফুটে উঠল কেমন একটা ঘৃণা| সেই প্রথম আমার মনে হয়েছিল, আমি মোসলমান, আলাদা জাত, হয়তো বা নিচু জাত| বয়েস কম তো, বেশ কষ্ট হয়েছিল|
(এই পুরাতন আখরগুলি, পৃ ৪৪)
অবশ্য, বালক এই পণ্ডিত মশায়ের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন| ভীষণ ভালোবাসতেন তাকে| শিক্ষাজীবনের দ্বিতীয় পর্বে বালক ধীরে ধীরে পরিণত হয়ে উঠছে| স্কুলের পরিবেশ ও অবকাঠামোর বিস্মৃত বর্ণনা, প্রত্যেক শিক্ষকের আলাদা ˆবশিষ্ট্যের বর্ণনা, সহপাঠীদের বর্ণনা দিয়ে সাজিয়েছেন এই পুরাতন আখরগুলি| এই পর্বে পারিপার্শ্বিক রাজনীতির কোনো বিষয় নেই| বই-ই এ-পর্বের বালকের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু| স্কুলের পাঠ্যবই তো আছেই, এর বাইরে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত সব লেখকের নতুন নতুন বই পাঠে খুলে যাচ্ছে অজানা সব জগৎ| লোমহর্ষক গোয়েন্দা কাহিনির প্রতি প্রবল ঝোঁক| ‘বই পড়ার ইচ্ছেটা আস্তে আস্তে ক্ষিধের চেহারা নিল|’ এই ক্ষিধে মেটানোর সহজ উপায় ছিল দেব সাহিত্য কুটিরের এক টাকা মূল্যের সিরিজের বই| বিশ্বের বিখ্যাত লেখকের বিখ্যাত বই, যেমন, অলিভার টুইস্ট, নিকল&স নিকলবি, অ্যা টেল অব টু সিটিজ, ট্রেজার আইল্যান্ড, থ্রি মাসকেটিয়ার্স, বলদর্পী হিটলার, দি লাস্ট অব দি মেহিকান ইত্যাদির বাংলায় সহজ অনুবাদ পড়ে ফেলে স্কুল বয়সেই| বই পড়ার এই ক্ষিধে তার একার ছিল না| তার বড়বোন জানুরও (কথাসাহিত্যিক জাহানারা নওশিন) ছিল একই রকমের পড়ার ক্ষিধা| একটা বই পেলে আর কিছুই চায়নি| বই পড়ার ক্ষেত্রে কোনো বাছ-বিচার ছিল না| লেখকের ভাষায়, ‘বেশি ক্ষিধে নিয়ে খেতে গেলে অখাদ্য-কুখাদ্য খাওয়া হয়ে যায়| আমি তো আর বাছি না, বই পেলেই গোগ্রাসে গেলা — ভালো মন্দ যা-ই হাতের কাছে আসে| ব্যাঙের দেশ, গোপাল ভাঁড়ের গল্প, ঠাকুরমার ঝুলি, বাবা এক সময় যে যাত্রাপালা করতেন, তখন কেনা সীতার পাতাল প্রবেশ, বৃষকেতু — যার কাছে যা পাওয়া যায়|’ (এই পুরাতন আখরগুলি, পৃ ৬০-৬১) রবীন্দ্রজীবনী প্রভাতরবি পড়ে রবীন্দ্রনাথের নিঃসঙ্গতা ভীষণভাবে দাগ কাটে বালকের কোমল মনে| এছাড়া এই বয়সেই সঞ্চয়িতা পড়ার সুযোগ ঘটেছিল| প্রত্যেকদিন একটা করে বই শেষ করার জেদ চেপেছিল| বস্তুত, চোদ্দো বছরের বালক জীবন কাটানোর জন্য বেছে নিয়েছিল বইয়ের জগৎ আর বই পড়ার জগৎ| শুধু বইয়ের জগতে বিচরণ করা নয়, লেখক হওয়ার আকাঙ্ক্ষাটাও ˆতরি হয় স্কুলজীবনেই|
আজকাল আমি লিখি, কবিতাই বেশি| সেই ক্লাস ফোর থেকেই তো লিখি আমি| আমার এই কবিতাগুলো জহরভাইকে শোনালে কেমন হয়? তখন আমার সব কবিতাই মৃত্যু, দুশ্চিন্তা, দুঃখ আর কষ্ট বিষয়ে লেখা| মৃত্যু, ওরে মৃত্যু আমার কই রে-দুরন্ত ঝড়ে ঘর যে আমার ভেঙে হলো ছারখার| মৃত্যুর দুঃখ, বিষাদ আর কষ্টে আমার প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে| এর কিছুদিন পরই ‘পথের পাঁচালী’ পড়ে ফেলেছিলাম| তখন ঠিক করলাম, নাঃ, আর কবিতা নয়, গদ্যই লিখব| যাই-ই লিখতে যাই, ‘পথের পাঁচালী’র নকল হয়ে যায়| গাঁয়ের কুট বদমাশ কর্মহীন বুড়োরা শরৎচন্দ্রের ‘বামুনের মেয়ে’ কিংবা ‘পল্লীসমাজে’র কুট চাল-চালা বুড়োদের মতো হয়ে যায়| তবে দুটো বড়ো এক্সারসাইজ বড়ো খাতায় তোড়ে লিখে যাই আর শোনার লোক না থাকলে নিজের লেখা নিজেই পড়ি চিৎকার করে| নিচে রাস্তা দিয়ে যারা হেঁটে যাচ্ছে তারা শুনতে পাচ্ছে ঠিক! এইসব খাতা আমার সঙ্গেই থাকত| (এই পুরাতন আখরগুলি, পৃ ১৬৬)
হাসান আজিজুল হকের লেখকসত্তার প্রধান ˆবশিষ্ট্যের বুনন ঘটে যায় লেখালেখির একদম সূচনায়| চতুর্থ শ্রেণির এক বালক যা-কিছুই লিখছে, তার সবকিছুই দুঃখ, কষ্ট, বিষাদ, মৃত্যুতে ভারাক্রান্ত| নয় বছরের একজন বালকের তো লেখার কথা ছিল অথবা ছবি আঁকার কথা ছিল ফুল-ফল-পাখি, প্রকৃতি, খেলাধুলা ইত্যাদি নিয়ে| এসবের পরিবর্তে একজন পরিণত বয়স্ক লেখকের মতো গভীর জীবনবোধ উঠে আসছে| চল্লিশের দশকের বাস্তবতা, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, ভয়াবহ দাঙ্গা, অবিশ্বাস, হিংসা, রোগ-শোক-মৃত্যুর জরাজীর্ণতা ইত্যাদি প্রবলভাবে দাগ কেটে যায় হাসানের বালক মনে| অত্যন্ত অনুভূতিশীল মন ও চোখ দিয়ে প্রত্যক্ষ করেন যে-বাস্তবতা, লিখতে গিয়ে তাই-ই উঠে আসে বালকের অবচেতন মন থেকে, তার সম্পূর্ণ অজান্তে| হাসান আজিজুল হকের লেখকসত্তার এই মৌলিক ˆবশিষ্ট্য এখনো একই আছে| যে-জীবন তিনি যাপন করছেন, লেখালেখিতেও সেই জীবনের বাইরে যাননি| এ-কারণেই, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, দেশভাগ, দেশত্যাগ, পাকিস্তানি দুঃশাসন, বাঙালির ¯^াধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতা তাঁর গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধের প্রধান বিষয়| আর স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে বাস্তবে যা দেখেছেন, স্মৃতিতে যা আজো নির্মল, তা-ই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গল্পের মধ্যে দিয়ে সাজিয়ে আমাদের সামনে পরিবেশন করেন| এ-পর্যন্ত প্রকাশিত তিন খণ্ডে বর্ধমানের যবগ্রামের বাইরে যাননি এখনো, কিন্তু তাঁর মননশীল মন স্পর্শ করে ফেলেছে বাইরের জগৎ| তাঁর স্মৃতিকথা শুধুমাত্র স্মৃতিকথা হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছে অসংখ্য ছোটগল্প, প্রায় সুবিন্যস্ত উপন্যাস, এর বাইরে প্রধানভাবে এসেছে ঐতিহাসিক বাস্তবতা| এই স্মৃতিকথা লিখছেন বাংলাদেশের সাহিত্যের একজন প্রধান কথাশিল্পী, এই কথা আমরা ভুলে যাই না বটে, কিন্তু লেখক আমাদের বুঝতেও দিচ্ছেন না তেমন-এক বালকের গল্প শোনানোর ফাঁদ পেতে তিনি আসলে উপস্থাপন করেন একটা নির্দিষ্ট সময়ের মানুষ ও সমাজেরই বাস্তব চালচিত্র| তিনি আমাদের বুঝতে দিচ্ছেন না যে, দীর্ঘ জীবনপরিক্রমায় সঞ্চিত অভিজ্ঞতায় জারিত গভীর জীবনবোধের গল্প শোনাচ্ছেন আমাদের| একটি নির্দিষ্ট গ্রাম, একটি নির্দিষ্ট স্কুল, স্কুলের শিক্ষকমণ্ডলী, তাঁর বাবা, পরিবারের অন্যান্য সদস্য, পাঠশালার পণ্ডিত, সহপাঠী, গ্রামের মানুষ মোটকথা যে-ছকে তিনি বিচরণ করেছেন, সেই নির্দিষ্ট ছকটি ধরেই এগিয়েছেন বটে, কিন্তু তা নির্দিষ্টতার গণ্ডি অতিক্রম চিরন্তন হয়ে উঠেছে| ৎ


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.