কবিতাযাপন

কবিতা কেন, কী পথে কবিতার কাছে পৌঁছলাম, কেন নিজে লিখতেও চেষ্টা করলাম? এই প্রশ্নগুলো আমার নিজের কাছে উত্থাপন করলাম| কিন্তু কোনো উত্তর নেই| ঝরছে না বারিধারাও| তাহলে অন্তত বারিধারার শব্দটা তো পাওয়া যেত| সেখান থেকে শুরু করে
ক্রমে-ক্রমে অন্য কিছু; পৌঁছোনো যেত এখন পর্যন্ত, কোনো
অজানা-অচেনা বন্দরে, পোতাশ্রয়ে| গভীর অন্ধকার বিজনে, দূর থেকে একটি নিভু-নিভু প্রদীপশিখা দেখতে পেয়ে, ভেবে নিতে পারতাম ওই তো সরাইখানা|
আশা-নিরাশার চকিত দোলায় কেঁপে উঠত পথহারানো পথিকের রক্ত-মাংস, বুকের খাঁচা| কিন্তু?
সহজ-সরল উত্তর এসে গিয়েছিল মুখে, আমি তো লিখি না, লিখতে চাই না, তবু কে যেন লেখায় নিয়ে যায় পথে-বিপথে| তাড়নায়-তাড়নায় অস্থির করে তোলে, প্রাণ ওষ্ঠাগত| সে তো হয়ে যেত প্রগাঢ় মিথ্যাচার, পরিষ্কার কপটতা| কীভাবে অ¯^ীকার করি যে, এই তো ধরে আছি কলম, সম্মুখে বিস্তৃত দুধসাদা পৃষ্ঠা, আজই কিনে-আনা নতুন খাতার| মস্তিষ্কও সামান্য সচল, ফুটছে| সাক্ষী, রাতের আঁধার সরিয়ে ঠিকরে-পড়া আলো, রেলিং ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি গাছ, একটি নিম, অন্যটি আম, জনমানবশূন্যপরিচ্ছন্ন রাস্তায় ব্রীড়ারত পাঁচ-পাঁচটি কুকুর| কিন্তু কী বলব, আমি লিখতে চাই না| বহুবার ছেড়ে দিতে চেয়েছি, আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসেছি| নিজের কাছে বলেছি, অনেক হয়েছে, আর নয়| বহু কবিই জানি, আনন্দের সঙ্গে লেখেন, লিখে আনন্দ পান| তাঁদের সসম্মান স্মরণ করি| তাদের শরণও হয়তো কখনো নিই| মাঝে-মাঝে কবিতা আমাকে পেয়ে বসে| শারীরিকভাবে অসুস্থ করে ফেলে| হাসপাতালে গিয়ে উঠি, তবে না রক্ষা পাই| এই গত তিন-চার বছরে মোট ছবার ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে পৌঁছে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছে| এরই মধ্যে আত্মপ্রকাশ করেছে আমার চারটি কবিতাগ্রন্থ, আরো তিনটি আত্মপ্রকাশের প্রতীক্ষায় দিন গুনছে| একটি কাব্যগ্রন্থের পৃষ্ঠাসংখ্যা একশ বিশ ছাড়িয়েছে| অবশ্যই ইনারসহ| তবে মানতে হবে এসব গ্রন্থে ধরে রাখা অনেক লেখাই অনাকাঙ্ক্ষিত| তবু শিশির ফোঁটার মতো মায়া সদ্য কালিতে অক্ষরে রক্তে-মাংসে প্রস্ফুটিত শব্দের গায়ে লেগেই থাকে, শরীর-আত্মায় মাখামাখি হয়ে| কপিলা লেখা সম্পন্ন হয়েছিল দিন পনেরোর মধ্যে| অতঃপর দীর্ঘ অসুস্থতা, অমিতাচার| সত্তরের মাঝ থেকে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত চলল এভাবেই| আত্মপ্রকাশ করল নয়-দশটি কাব্যগ্রন্থ| থাক, সে-কাহিনি, অন্যত্র বলা যাবে|
আমার জন্ম ২৩ অক্টোবর, ১৯৪৩, সাতক্ষীরায় নানাবাড়িতে| সেটাই রেওয়াজ ছিল তখন| এখনো হয়তো আছে, তবে বিভিন্ন কারণে হ্রাস পেয়েছে কিছু মাত্রায়| ততদিন আমি বলে আসতাম, আমার জন্মস্থান ˆবটপুর, বাগেরহাট| সেটা বলাতেই ¯^চ্ছন্দবোধ করতাম| ¯^াভাবিকভাবেই মা রুষ্ট ছিলেন| আজ তিনি গত| তাই শুধরে নিলাম| আমার জন্মক্ষণ আদৌ শুভ নয়| রাজনৈতিক-কূটনৈতিক প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনো রাখঢাক ছাড়াই| ইউরোপের
পথে-প্রান্তরে ফাটছে গোলা, গর্জাচ্ছে মারণাস্ত্র, নিয়তির প্রাণহীন শিলাখণ্ডে মাথা কুটছে অসহায় মানুষের আর্তচিৎকার| আঁচে কুঁকড়ে উঠছে দূরতম আমাদের ভূখণ্ড| অতঃপর সর্বগ্রাসী দুর্ভিক্ষ, ঔপনিবেশিক শক্তির ভারত ত্যাগ| একধরনের অবাঞ্ছিত ¯^াধীনতা জুটল উপমহাদেশের কপালে, বাংলা হলো দ্বিখণ্ডিত| বোধহয়, ১৫ আগস্ট ১৯৪৭; আমি বছর চারেকের শিশু| শুনলাম, পাশের গ্রাম ফতেপুরের প্রাইমারি স্কুলের মাঠে পাকিস্তানের পতাকা তোলা হবে| আমন্ত্রণ করা হলো গণ্যমান্যদের| বেঁকে বসলেন আমার দাদা, অর্থাৎ ঠাকুরদা| তিনি তখন ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট| সাফ-সাফ বলে দিলেন, যে-দেশে আমার বিশ্বাস নেই, সে-দেশের পতাকা তুলতে আমি পারব না| বাবা অনুনয় করতে শুরু করে দিলেন, বাপজান কী ঘটতে পারে আপনি জানেন, গ্রেফতার হয়ে যেতে পারেন, জেল খাটতে হবে কয়েক বছর| কিন্তু দাদা অনড়| পরে শুনেছি, তিনি সুভাষ-শরৎ বসুর অনুসারী ছিলেন, অখণ্ড বাংলার জন্য নিবেদিতপ্রাণ| এহেন দাদার কাছে আমার হাতেখড়ি, তালপাতায় কাঁপা-কাঁপা অ, আ, ক, খ,…-এর মিছিলে আমার নবজন্ম লাভ| দেখেছি, দাদা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন, রোজা রাখতেন ত্রিশটিই| এই হয়তো তাঁর ˆশশব থেকে বয়ঃসন্ধিকালে তালে-তালে গড়ে ওঠা অভ্যাস| গভীর নিষ্ঠায় পালন করে চলেছেন| প্রায়ই উপদেশ দেওয়ার ছলে বলতেন, দেখো, আমি একটা ধর্মে জন্ম নিয়েছি| সে-ধর্ম নির্বিঘ্নে পালন করা আমার কর্তব্য| ঠিক একইভাবে আমার ধর্ম আমাকে শিক্ষা দিয়েছে যে, আমার প্রতিবেশী, সে যে-ধর্মেই বিশ্বাসী হোক না কেন, যেন নির্বিঘ্নে আমারই মতো তার ধর্ম-আচার পালন করে যেতে পারে| সেটা দেখা এবং নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব| মনে রাখিস| অবাক হয়ে তাকিয়ে রইতাম দাদার নাতিউজ্জ্বল মুখমণ্ডলের দিকে|
আমাদের পাড়া যেখানে গিয়ে থেমে গেছে, সেই সীমানা ছুঁয়ে পায়ে-পায়ে চলে গেছে বড় রাস্তা| বাস চলে পিরোজপুর পর্যন্ত| তাও শুকনো মৌসুমে, রিকশার চল হয়নি তখনো| রাস্তা গিয়ে ঠেকেছে খেয়াঘাটে| খেয়াঘাট প্রায় ছুঁই-ছুঁই, বড় রাস্তার ডানপাশে সম্পন্ন এবং উঁচুবর্ণ হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস, ঘোষ, বসু, গুহ, মিত্র ইত্যাদি! কিছুটা পথ পিছন পানে হেঁটে এলে, রাস্তার বাঁ-দিকে তরলা বাঁশের এলোমেলোভাবে গজিয়ে-ওঠা ঝাড় দিয়ে ঢাকা নিম্নবর্ণ হিন্দুদের বাড়িঘর : নাথ, দেবনাথ, পাল ইত্যাদি| এসব বাড়িতে উঠতে হয় বাঁশের কঞ্চির খোঁচা খেতে-খেতে, প্রায় সব ঋতুতেই কর্দমাক্ত কিংবা ধুলাকীর্ণ খানাখন্দ মাড়িয়ে| ¯^াভাবিক যে সম্পন্ন উচ্চবর্ণ গৃহস্থের বাড়িতে
আসা-যাওয়ার পথ হবে প্রশস্ত এবং পাকা ইট বিছানো| এই পথ দিয়েই একদিন নির্মল বসুকে খোঁজ করার ছলে গিয়ে হাজির হলাম বসুদের একতলা দালানবাড়ির সমুখে| প্রকৃত কারণ ছিল অন্যকিছু| অন্য প্রসঙ্গে বলা যাবে, এখানে অবান্তর| তবে, কিছুকাল না-যেতেই বাঁশঝোপ মাড়িয়ে কাদা ঠেলে হানা দিয়েছি টিন-চালা মাটির বাড়িগুলোতে| সে অবশ্য কবিতারই টানে| এক তরুণ কবির খোঁজ মিলে গেল ওইসব আধ-ধসা বাড়িগুলোতে| সখ্যও গড়ে উঠল তাঁর সঙ্গে দীর্ঘদিনের| তাঁর নাম শুভ্রাংশু দেবনাথ| জুটল ভালোবাসার অদম্য নাড়ি-ছেঁড়া টান, প্রগাঢ় বন্ধুত্ব| সুতরাং আবেগে বিহ্বল তরুণকে ঠেকিয়ে রাখে কে, রক্ষা করেই বা কে! চলতে লাগল প্রতিদিনের আসা-যাওয়া, দু-পাড়াতেই,
দেওয়া-নেওয়া, মূলত উপন্যাস, গল্পের বই, কাব্যগ্রন্থ, মোট কথায়, যার যা স¤^ল| তবে দীর্ঘ জীবনের ¯^প্নভঙ্গের পালাও সেখান থেকেই শুরু| নদীর যে তীর পলি
পড়ে-পড়ে গড়ে ওঠে, ভেঙে পড়ে একদিন স্রোতেরই টানে| কিন্তু জল অনাদি-অকৃত্রিম জল, ধরে রাখে| চিরকালীন স্রোত, তাকে প্রাণে ও গতিতে করে তোলে মূর্ত ও ভা¯^র| দিনে-দিনে চরম কষ্ট ও অক্ষমতার চুরচুর বিচূর্ণ কাচের স্তূপ পেরিয়ে খোঁজ মিলে গেল বেঁচে ওঠার, বেঁচে থাকার মন্ত্রের| কবিতার|
তবে সে অনেক পরের কথা| ইতোমধ্যে রবীন্দ্রনাথ হয়ে গেছেন নির্ঘুম রজনীর অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী|
পথে-মাঠে, নদীজলের কাছাকাছি, বিপন্ন জ্যোৎস্নায় খোঁজ মিলেছে জীবনানন্দের| বসতবাড়ির পিছনে বিস্তৃত ক্ষেতের খরাদগ্ধ মাটি চিরে শ্বাস নিয়েছেন বিষ্ণু দে| টের পাই, লোকচক্ষুর অন্তরালে, সঙ্গোপনে,
ভেতরে-ভেতরে ধনী হয়ে উঠছি আমি| কিন্তু কীভাবে বিতরণ করব ধনভাণ্ডারে? প্রকরণ তো আমার জানা নেই, আয়ত্তে নিয়ে আসা অনেক দূরের কথা| বাবা সাবধান করে দিতেন, তুই ভুল পথে চলছিস| আমাদের পরিবারে কবি নেই| বড়োমামা বলেছেন, ধর্মবিশ্বাসে ঘাটতি রয়েছে তোর| কবি হতে চাস! গাধা! উষ্মা প্রকাশ করতেও ছাড়েননি তাঁরা| বেচারা আমি, অগত্যা আশ্রয় নিলাম সঞ্চয়িতার| একের পর এক প্রতিটি কবিতার হাড়-মাংস ছন্দলয় ব্যবচ্ছেদ করতে থাকলাম নিরবচ্ছিন্ন রূপে সময়ের, রাত্রি-দিনের মাপ না নিয়েই| ঠাঁই পেতে চেষ্টা অতল রহস্যের| হয়তো বৃথাই, কে জানে! ক্রমে-ক্রমে হাতে তুলে নিলাম, বনলতা সেন, সাতটি তারার তিমির, চোরাবালি, স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ, সংবর্ত কিংবা ঘরে-ফেরার দিন, চর্যাপদ, পদাবলি| ঘেঁটে দেখছি ইয়েটস, এলিয়ট, পাউন্ড|
স্কুলে থাকতেই শেক&সপিয়রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে| সম্পর্ক হয়েছে গোগল, দস্তয়ভস্কি, তলেস্তয়-চেখভের সঙ্গে পাকাপাকি| পুশকিন থেকে কিটস&, মাঝখানে গে্যঁটে, লিওপার্দি, হুগো, লামারতিন — এঁদেরও খুঁজে পেতে চেষ্টা করেছি বিভিন্ন কোণে-কোণে| শিল্প-সাহিত্যে প্রবেশের পথ হয়তো পাওয়া গেছে| শরণ নিলাম মহাভারত-রামায়ণ-ˆমমনসিং গীতিকার, হোমার-ভার্জিল-দান্তের| প্রধানদের নামই শুধু উঠে এলো| স্যাফো-ক্যালিমিকাস-অ্যানাক্রিয়ন-পিন্ডার-কাতাল্লুস-প্রোপারসিয়াস-হোরেস-ওভিদ — কত-না কবিতার আঙ্গিকে-ভঙ্গিতে ˆবচিত্র্যে ছুঁয়ে যেতে চেয়েছে জীবন-জগৎকে| কত-না বিপুল গম্ভীর ঋদ্ধ¯^রে ও সুরে শুনেছে অতল জলের আহ্বান| আমি কে, কী আমার কাজ, তারাই আমার তীর্থ রচনা করে গেছেন; শুধু দেখে যাও| কী করে জলের ওপরে ঢেউ ভাঙে প্রথম ভোরে মূর্ত কিরণ| সাবধান করে যান, খবরদার ভুলেও ঝাঁপিয়ে পড়ো না| অকালে মুখ থুবড়ে-পড়া অনিবার্য|
বিচূর্ণ কপালে, অকালে মৃত্যুকে সঙ্গী করে হাঁটতে বের হলাম অচেনা-অজানা তমসাচ্ছন্ন অভিসারে| ষাটের দশক| আমাদের এই ক্ষুদ্র ভূমণ্ডলে তুমুল তোলপাড়ের কাল| বিস্ফোরণ ঘটতে থাকল সর্বত্র — রাজনীতিতে, সমাজ বিনির্মাণে, সাহিত্যে, শিল্পে, কবিতায়, সংগীতে| একেই হয়তো বলা যায় অতিক্ষুদ্র জাগরণ, রেনেসাঁস| বাগেরহাট, বরিশাল, খুলনা, বগুড়া, রাজশাহী হয়ে পৌঁছলাম ঢাকায় সমকাল-কণ্ঠ¯^রের দপ্তরে| ব্যক্তিক জীবনের টানাপড়েন, পাকিস্তানি শাসক সম্প্রদায় কর্তৃক উগ্র সাম্প্রদায়িকতার লালন-পালন, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার জীর্ণতা ততদিন আমাকে চেতন-ˆচতন্যে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলেছে| ভেতর থেকে, রক্তে-মাংসে টের পাই, আমার একমাত্র শক্তি কবিতায়|
তোমার সান্নিধ্যে অলৌকিক প্রাণ পাই,
¯^র্গের উদ্যান থেকে উৎসাহিত নয়
কিংবা নারকীয় প্রসাধনীজাত
মর্ত্যরে, একান্ত মানবিক

মায়াবিনী সৌন্দর্যে উচ্ছল!
আমার সহযাত্রী কবিকর্মীর অধিক অংশ তখন বুদ্ধদেব বসু কর্তৃক বোদলেয়ারের অনুবাদে আচ্ছন্ন| রাইনার মারিয়া রিলকে লিখেছেন, বোদলেয়ার একটি অতিপ্রয়োজনীয় অধ্যায়| কিন্তু তাঁকে অতিক্রম করার সাধনা একজনের থাকতেই হবে| বন্ধুরা আমার রচনা সম্পর্কে ঠাট্টা করে-করে বলত, ও তো রাবীন্দ্রিক| আমি অ¯^স্তিতে আক্রান্ত হওয়া তো দূরের কথা, মুচকি হেসেছি, ভেতরে-ভেতরে অদ্ভুত প্রসন্নতা বোধ করেছি| আমি আমার লেখায় রবীন্দ্রনাথের কোনো পঙ&ক্তি বা শব্দযুগল বা বাকপ্রতিমা অচেতনে নিজের যথাযথ স্থানে জায়গা করে নিলে চমকিত হই, আজ অবধি| লাফিয়ে উঠতে সাধ হয়| তা হলে সঠিক পথেই পরিভ্রমণ করছি| আমার রচনা বিপথে হারিয়ে ফেলেনি দিশা|
দিনান্তের
শেষ-মুহূর্তের ডালি
সাজিয়ে এনেছ
নানা রং পুষ্পের কুঁড়িতে

কবে তারা ফুটবে, বলো!
জানি, রাবীন্দ্রিক বা জীবনানন্দীয় ভূগোলের সঙ্গে আমার ভূগোলের খুব একটা তফাত নেই| তবে সমাজ-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা| সেখানে ব্যবধান দুস্তর, প্রায় অমোচনীয়|
সবাই সম¯^রে চিৎকার জুড়ে দিলো, আধুনিক হতে হবে| নাগরিক! কে বেশি নাগরিক, শামসুর রাহমান না শহীদ কাদরী! সেটাই যেন কবিতার মূল সমস্যা, কবিতা হয়ে ওঠা নয়| আমি বোধহয় একটু সেয়ানা ছিলাম অন্যদের তুলনায়, পাঠ-পঠনে,
চিন্তা-চেতনায়| ভেবে দেখলাম, মাদ্রিদ তো প্যারিস থেকে ট্রেনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ| ফ্রেদারিকো লোরকা বা রাফায়েল আলবার্তির কথা বাদই দিলাম, আন্তোনিও মাচাদো বা রমন হিমানেথ তো পল ভালেরি বা মালার্মে বা আর্তুর র্যাঁবো দ্বারা প্রভাবিত হননি| তাঁরা তাঁদের কবিতা লিখেছেন, আধুনিক হয়ে উঠতে কোনো সমস্যা হয়নি| মারিয়া রিলকে, ফন হফ মানেস্তান বা গেয়র্গ ট্রাকল ফ্রান্সের লাগোয়া দেশ জার্মানির আদিবাসী, দুটো দেশের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে, আদান-প্রদান দেওয়া-নেওয়া চলছেই| মারিয়া রিলকে প্যারিসে দীর্ঘকাল বসবাস করেছেন, পল ভালেরির কবিতার প্রশংসাও করেছেন, কিন্তু কই ভালেরির কাব্যকলার দ্বারস্থ তো হননি| নিজ দেশ ও ঐতিহ্যই হয়ে উঠেছে মুখ্য| অন্যদের বেলায়ও একই কথা বলা যথাযথ| রুশ বা ইতালিয়ান আধুনিক কবিদের প্রসঙ্গ না-ই বা তুললাম| আন্না আখমাতোভা লিখেছেন, গিওম এপিলিনিয়রের পর কোনো আকর্ষণীয় ফরাসি ভাষার কবি চোখে পড়ে না| ওইটুকুই, কখনোই ঔপনিবেশিকতার চাপ-ভার বইতে হয়নি রুশ কবি-লেখক-শিল্পীদের| তাই পুশকিন-লারমেনতভ থেকেই তাঁরা ¯^াবল¤^ী অর্থাৎ নিজেদের পথ নিজেরাই খোঁড়ার বা খুঁড়ে নেওয়ার অধিকার ও সামর্থ্য অর্জন করে নিয়েছেন| ইতালিয়ানরা প্রথম থেকেই একটু আলাদা, ¯^তন্ত্র, যেন লন্ডন-প্যারিস-বার্লিনের ইউরোপ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে তাঁদেরই শেখাচ্ছে| তবে কি রেনেসাঁসে অর্জিত গরিমা ও মহিমা অগ্নি ও বিস্তার আজো বিভোর করে রেখেছে তাঁদের, জোগাচ্ছে উপযুক্ত প্রণোদনা| তবে তাঁরা সবাই ইউরোপীয় সভ্যতার সন্তান, তার উত্তরাধিকার বহন করে| লিখেছেন নিজেদেরই কবিতা| আমাদের ত্রিশের কবিকুল ইউরোপীয় আধুনিকতা আমদানি করতে চেয়েছেন| প্রায় জোরপূর্বক চেষ্টা করেছেন প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের জলে-হাওয়ায়, মাটিতে| কেউ-কেউ ক্ষমতাবলে উতরে গেলেও ওইসব কবির কাতারে ভিড়তে পারেননি| তাঁদের অবশ্য প্রকৃত সমস্যা ছিল আধুনিকতা নয়, ঔপনিবেশিক মনোভাব, মনস্তত্ত্ব, মূল্যবোধ| এই সত্য অনুধাবন করতে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন| সেই অসমর্থতার দায় আমরা এখনো টেনে চলেছি| রেহাই পাইনি| আমার কাছে আধুনিকতা কোনো সমস্যা হয়ে দেখা দেয়নি| আমার মানচিত্রকে বিশ্বপৃষ্ঠে সংস্থাপন করতে হবে, নন্দন মেলাতে হবে বিশ্বচৈতন্যে, কবিতায়, গদ্যে| সেটাই আমার সংগ্রাম| তখনই প্রশ্ন আত্মোৎসর্গের, আত্মত্যাগের, আত্মবিলোপনের| কর্মে ও সৃষ্টিতে কতটা সার্থক হয়েছি, বিচারের ভার অন্যদের| তবে, আমি আমার কবিতাই লিখেছি, লিখতে প্রাণ-মন ঢেলে দিয়েছি| নিজেকে খুঁড়ে চলেছি প্রতিমুহূর্তে| আত্মগর্বে বা প্রশান্তিতে ভুগি না, কিছু পরিমাণ ¯^স্তি অনুভব করি|
শিল্পে-দর্শনে-বিজ্ঞানে মধ্যযুগে বিকশিত হয়ে উঠেছিল স্পেন| আবু রুশ&দ, আবে-সিনা, অন্যান্য কীর্তির ¯^াক্ষর রেখে গেছেন তাঁরা মানবেতিহাসে| সুর দাস-দাসীর কণ্ঠ-নিঃসৃত গান থেকে ইউরোপ পেয়েছে মানব-মানবীর নর-নারীর প্রেমের অমর আত্মবিলয়ের বা সমর্পণের গীতি-আলেখ্য| ফ্রান্স হয়ে জন্ম নিয়েছে ত্রুাবাদুরদের পদাবলি, সুর, লয়| ঠিক যেই স্পেন থেকে বিতাড়িত করা হলো মুসলমানদের, ইহুদিদের স্থান হয়ে গেল টলেডো, আঁধার ঘিরে ফেলল আন্দালুসিয়া| সে-শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়| কেঁদে চলেছেন সারভান্তেস থেকে আন্তোনিও মাচাদো, ফ্রেদারিকো লোরকা|
প্রকৃতপক্ষে এই বেদনার মাসুল গুনতে হয়েছে ফ্রেদারিকোকে নৃশংস মৃত্যুর হাতে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে| আমি পূর্বেই আমার গাঁয়ের হিন্দু সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করেছি| গত সনে বাড়ি গিয়ে দেখি, সেই বসত আর নেই| লোভী আত্মসর্ব¯^ কিছু প্রাণী, আমার গাঁয়েরই, দখল করে নিয়েছে ঘরবাড়ি| ছলে-কৌশলে গোটা সম্প্রদায়কে বিতাড়িত করে ছেড়েছে| ইন্ধন জুগিয়েছে কিছু ধর্ম ব্যবসায়ী ও অসাধু রাজনীতিক| আপন মাটিজল পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে| এই ঘটনাই ঘটেছে সারাদেশে| কিন্তু এই যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তার দায় গুনতে এগিয়ে আসবে না কোনো কাজী নজরুল ইসলাম, কোনো জয়নুল আবেদিন, কোনো এসএম সুলতান, কোনো কামরুল হাসান, কোনো আব্বাসউদ্দীন বা কোনো বুলবুল চৌধুরী| বিরান হয়েছে ভূমি| কোনো ফসল সেখানে জন্ম নেবে না| অগত্যা আমাকেই বুঝি অসমর্থ স্কন্ধে তুলে নিতে হলো সেই দায়|
দেখলাম, ইউরোপ খাড়া পায়ে দাঁড়িয়েছে মূলত গ্রিক পুরাণ, কিংবদন্তি উপকথা এবং বিভিন্ন দেশজ রূপকথার কথকতা ভর করে| অবশ্য কালে-কালে অবধারিত রূপে যাত্রাপথে যুক্ত হয়েছে তার নিজ¯^ সত্তার আকাঙ্ক্ষায় আকুতি ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়েই| এবং বিমুক্ত হয়েছে এক অপরূপ উজ্জ্বলতা, যার সীমাহীন আবেদন অ¯^ীকার করার নয়| আমাকেও গড়তে হবে আমার নিজ¯^ পুরাণ-রূপকথা-কিংবদন্তি নিজ¯^ আঙ্গিকে, অপরাগ হলেও চাষ করে যেতে হবে, বুনে যেতে হবে বীজ| আপন প্রাণের টানেই তাই বীজ আত্মজন্ম এবং জীবন খুঁজে নেবে শস্যে ও ফসলে| তখন না মুক্তি পাবে বাঙালির সংস্কৃতি, কবিতা, সাহিত্য, কৃষ্টি ও ঐতিহ্য| আত্মতার অনুরণনের খোঁজে নামলাম বাঙালির একান্ত নিজ¯^ রূপকথা-উপকথা-কিংবদন্তির নীলিমায় ও কদরে, এমনকি বীজ হাতড়ে চললাম বাংলা উপন্যাসে ছোটগল্পে ˆমমনসিং গীতিকায় অন্য বাঙালি কবি মহারথীদের সৃষ্টিতে, নানা রং দিয়ে দিগন্তের প্রচ্ছদ উন্মোচনে, মুখ-মুখোশের অন্তরালে প্রান্তরে-প্রান্তরে, মাংসপেশিতে| মহুয়া-বেহুলা-নদের চাঁদ-কুবের-কপিলা-মদিনা-সখিনা-জমিলা-বেগুনি-দামোদর — আরো কেউ-কেউ ভিড় করে এলো কবিতার পঙ&ক্তিতে-পঙ&ক্তিতে, চিত্রকল্পে কাব্যপ্রতিমায় শব্দে, ¯^রে ও বিন্যাসে| এরাই আমার সঙ্গী, আত্মজন বহু বেদনায়, রাত্রি জাগরণের| হয়তো প্রয়াস ও রক্তক্ষরণ পুরোপুরি বিফলে যায়নি| বীজ একবার রোপিত হলে, এমনকি বিরূপ প্রাণহীন মাটিতে মাথা তুলবেই কালে-কালে, হাওয়ায়-আকাশে আত্মপ্রকাশ করবে নিজ অন্তরের তাগিদে| তবে অবশ্যই চাষ সঠিক এবং পরিমাণমতো হতে হবে এবং সেটাই বিচার্য!
সাহিত্যের দায় নিয়ে কথা পেড়েছিলেন জ্যঁ পল সার্ত্র, থিওডর অ্যাডোর্ন| তাঁদের প্রবন্ধ মূলত সীমাবদ্ধ ছিল উপন্যাসে, গদ্যে| কবিতা নিয়ে কোনো কথা ওঠেনি| হেতু বুঝে নেওয়া অতিসহজ, ¯^াভাবিক| কবিতায় শব্দবিন্যাস তো মানুষ ও প্রকৃতির সঙ্গে অঙ্গীকারবদ্ধ| সে-মানব সৃষ্টির বা বিবর্তনের সংগ্রামও চরিত্রজাত| সরল সমীকরণে বলে, কবি-জন্মের প্রক্রিয়াই দায়বদ্ধ মানুষ ও সভ্যতার কাছে| তাঁকে নিয়ে আলাদা করে আলোচনা অবান্তর|
সেসার ভায়েহো (১৮৯২-১৯৩৮) অতিবাল্যে (১৬ বছর) প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থের (কালো অগ্রবাহিনী) একটি কবিতার (‘আয়নার ভেতরে বা গহ্বরে কণ্ঠ¯^র’) সমাপ্তি টেনেছিলেন দুটি অমর পঙ&ক্তিতে : ‘সুতরাং জীবন চলে, স্ফিংসের একটি বিস্তৃত অর্কেস্ট্রা/ শবযাত্রা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বিপুল শূন্যতায়|’ শেক&সপিয়রের ম্যাকবেথের সেই বিখ্যাত আত্মকথক (সলিলকি) স্মরণ করিয়ে দেয়, তাই না| সান্তিয়াগো ডি চুকো থেকে লিমা, লিমা থেকে প্যারিস, প্যারিস থেকে স্পেন, গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ, পুনরায় প্যারিস; অবশেষে সেই সেসার ভায়েহো লিখেছেন দীর্ঘ কবিতা-বয়ান, ‘স্পেন এই পানপাত্র আমার হাত থেকে সরিয়ে নাও’| প্রশ্ন ওঠে, এই পানপাত্র বলতে কী তিনি বিষভাণ্ড বুঝিয়েছেন| ‘ভিক্ষুকগণ’ কবিতার শুরু, ‘ভিক্ষুকগণ যুদ্ধ করছে স্পেনের জন্য/ ভিক্ষা করে, প্যারিসে, রোমে, প্রাহাতে|’ শেষের পঙ&ক্তিটিতে ‘কবি অভিবাদন জানান সশস্ত্র যন্ত্রণাকে’| তাই তো ঘটার ছিল| ঘটেছেও তাই| আমারও রয়েছে নদী, ¯^দেশ, মাটি, মানুষ, কাদা, ধূলি, নৌকো, জনস্রোত, আকাশ, রাস্তা, প্রিয় মুখ, একটি মুক্তিযুদ্ধ, হারিয়ে-যাওয়া খুইয়ে-ফেলা আপনজন, শ্রম, পেশি, আম, কৃষকের মুখে গান, লাঙল, গরু
প্রান্তর-তেপান্তর, জমাট মেঘ, কালো-ধলা, অজস্র অনুভব, প্রতিবেদন ¯^র, কণ্ঠ¯^র, নিনাদ, ˆচত্রের খরা, আষাঢ়ে বৃষ্টি, শরৎ-পৌষ,
মাঘ-ফাল্গুন, চেতনে-অচেতনে তারা যে ধরা পড়বে না, ধরা দেবে না, চোখ মেলবে না, হাত কচলাবে না, মুখভর্তি হাসি ছড়িয়ে দেবে না
ঘাসে-ঘাসে, কবিতার শব্দে পঙ&ক্তিতে-পঙ&ক্তিতে তা কি সম্ভব, কবিতা রচিত হয় রক্তে-মাংসে, পেশিতে-হাড়ে, কালি-কলম-খাতা শুধু সাড়া দেয়| এই তো কবির নিয়তি, বাজে-বজ্রে আকাশ-পৃথিবী| সাড়া তাকে দিতেই হয়, আমাকে ছেড়ে কথা বলেনি সে| শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াল, সেটা কোনো প্রশ্ন| অন্তত সৎ ও সরল কবির সমীপে|
আমার সহস্র মানুষের মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিদিনের সংগ্রাম, শহিদের রক্তধারা, ধর্ষিতার আর্তচিৎকার, দেশত্যাগ আমাকে দিয়েছে দ্বিতীয় জন্ম| সে-সত্য ভুলব না কখনো|