আমার সবচেয়ে প্রিয় বই

জলপাইগুড়িতে এক প্রায়ান্ধকার অপরাহ্ণে হাসপাতালফেরত ডাক্তার দাদু, সিঁড়িতে বসে আমাকে রজতজয়ন্তী সংকলন মৌচাক পড়তে দেখে বলেছিলেন, এই কমে আসা আলোয় বই পড়ো না, চোখ খারাপ হবে| সারাজীবন বই পড়েই চললাম আর দাদুর ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি করে চোখের আলো ম্ল­ান হয়ে এলো| সেই ছোট্টবেলায় পড়েছিলাম আফ্রিদি সীমান্তে আর কামানের মুখে নানকিং আর ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সিরিজের বই| তারপর থেকে পড়েই গেলাম উচ্চতর উচ্চতম সাহিত্য, দর্শন, রাজনৈতিক আর সামাজিক ইতিহাস| জীবনযাপনের জন্য যে-পেশা বেছে নিলাম, তার প্রতি সুবিচার করতে গেলে নিয়মিত নিত্যনতুন বই পড়তেই হয়|
বছর চোদ্দো-পনেরো বয়স হবে, আনন্দবাজারের শারদীয় বার্ষিক সংখ্যায় তারাশঙ্করের হাঁসুলিবাঁকের উপকথা পড়ে একেবারে অভিভূত হয়ে গেলাম| বনওয়ারী, করালীকে ঘিরে একটা জগৎ আমার চোখের সামনে খুলে গেল| বই পড়ায় এর চেয়েও মহীয়ান অভিজ্ঞতা হয়েছিল যখন আমার বছর বাইশ বয়স| কলকাতায় তখন এক চূড়ান্ত অপছন্দের চাকরি করছি আর থাকছি মহাত্মা গান্ধি রোডের সেই সস্তার নিরানন্দ হোটেলে, যেখানে একদিন জীবনানন্দ থাকতেন| সেই সময় পড়েছিলাম দস্তয়েভস্কির The Brothers Karamazov| সেই মহান উপন্যাসের অভিঘাত অত্যন্ত গভীর হয়েছিল আমার জীবনে| পনেরো দিনের জন্য মুছে গেল জীবনযাপন আসা-যাওয়া, সত্য হয়ে উঠল উপন্যাসের চরিত্রগুলির, বিশেষত ফাদার জোশিমার সত্তা আর জিজ্ঞাসা| পরবর্তীকালে আমার চিত্তকে বিশেষভাবে আলোড়িত করেছিল টলস্টয়ের উপন্যাস The Death of Ivan Ilych,, টমাস মানের ঞযব The Holy Sinner,, হারমান হেস্‌সের The Glass Bead Game|
নিরীশ্বর আমি, ধর্মহীন আমি, কিন্তু আমার সত্তাকে আমূল নাড়িয়ে দেয় আত্মিক সংশয়, আত্মিক প্রশ্ন| তাই ব্রেখটের নাটকাবলি ভালো লাগলেও, আমি বারেবারে পড়ি গ্রিক ট্র্যাজেডিসমূহ, King Lear এবং রবীন্দ্রনাথের রাজা|
বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে এক বিদেশি পত্রিকায় উচ্ছ্বসিত রিভিউ পড়লাম আর শিলিগুড়ির এক দোকানে পেয়ে কিনে ফেললাম মার্কেজের One Hundred Years of Solitude| এটিও আমার পড়া একটি খুব প্রিয় উপন্যাস| অনেক প্রিয় বই কিনেছি গ্র্যান্ড হোটেলের নিচের একটি সুপরিচিতি বইয়ের দোকান থেকে, লাইট হাউজ সিনেমার উলটো দিকের সংকীর্ণ গলির দোকান থেকে, কলেজ স্ট্রিট থেকে তো বটেই, প্রেসিডেন্সি কলেজের রেলিংয়ের পুরনো বইয়ের দোকান থেকে| শেষের দোকানগুলির একটি থেকে কিনেছিলাম আইয়ুব এবং হীরেন্দ্রনাথ-সম্পাদিত আধুনিক বাংলা কবিতা| বুদ্ধদেব বসু-সম্পাদিত সংকলনটিও আমার আছে, কিন্তু আগেরটি আমার খুব প্রিয় বই| ইংরেজি তর্জমায় পড়েছি হাইনে, ইংরেজিতে ও বুদ্ধদেবের বাংলায় পড়েছি বোদলেয়ার, লিশম্যানের অনুবাদে অনেক পড়েছি রিলকের কবিতা| কিন্তু তর্জমায় কবিতা পড়ে আমার তৃপ্তি হয় না| ইংরেজ কবি ইয়েটসের কাব্যসংকলন আমার খুব প্রিয় বই| তাঁর কবিতা আমি তন্নতন্ন করে পড়েছি, এমনকি পাঠান্তর মিলিয়ে| তাঁর কাব্যসংকলনের যে-কোনো পৃষ্ঠা খুললে আমি মগ্ন হয়ে যাই|
ˆবষ্ণব কবিতা আমার খুবই প্রিয়| বাংলা কবিতার অন্য
কী-কী বই প্রিয় বলতে গেলে প্রথমে বলব একটি উপন্যাসের নাম, যেটিকে আমার গদ্যে লেখা কাহিনিকাব্য মনে হয়| সেই অতিপ্রিয় বইটি বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা| পিঠে ছড়ানো মুক্তকেশ অবস্থায় নবকুমার কপালকুণ্ডলাকে প্রথম দেখেছিল, বিয়ের পরে তার চুল বাঁধা হয় আর শেষে এই নায়িকা শ্মশানের পথে এগিয়ে গেল উন্মুক্ত বিপুল কেশরাশি নিয়ে| তিন পর্বে রচিত হলো এই কাহিনিকাব্য| এই কাব্যের নায়িকাকে শকুন্তলা মিরন্দার সঙ্গে মিলিয়ে তুলনাও করতে পারতেন রবীন্দ্রনাথ|
কবিদের গোটা কবিতার বই যে প্রিয়, তা নয়, বিশেষ-বিশেষ কবিতা প্রিয়| সেইসব কবিতা স্মরণে জাগ্রত থাকত, এখন স্মৃতি প্রায়ই বিশ্বাসঘাতকতা করে| তবু সুধীন্দ্রনাথের অর্কেস্ট্রা আর বুদ্ধদেব বসুর যে আঁধার আলোর অধিক আমার খুবই প্রিয় বই| সৃজনমূলক বই ছাড়া চিন্তামূলক বইও আমার খুব প্রিয় — যেমন, অস্তিত্ববাদী দার্শনিক কার্ল জাসপার্সের রচনাবলি বা হানা আবেনডের Origins of Totalitarianism| জীবনীগ্রন্থের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় আইজাক ডয়েটশরের লেখা তিন খণ্ডে ট্রটস্কির জীবনী|
কিন্তু সবার চাইতে প্রিয়, সারাজীবন ধরে পড়া এত-এত বইয়ের মধ্যে প্রিয়তম বই রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র বা তাঁর পরিবর্ধিত সংস্করণ ছিন্নপত্রাবলী| কিটসের বা ভ্যান গঘের পত্রাবলি আমার প্রিয়, কিন্তু ছিন্নপত্র তুলনারহিত| সেই টেলিফোনহীন, সেই
প্রাক&-মোবাইল যুগে রবীন্দ্রনাথ এই চিঠিগুলিতে যেন পবিত্র পৃথিবীর কথা লিখেছিলেন প্রধানত তাঁর তরুণী ভাইঝিকে, ইন্দিরা দেবীকে, যার ডাকনাম বিবি| বিবাহোত্তর জীবনে পরে তিনি ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী হন| এই চিঠিগুলি স¤^ন্ধে রবীন্দ্রনাথ পরে লিখেছেন, ‘তখন আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম বাংলার পল্ল­ীতে পল্লীতে, আমার পথচলা মনে সেইসকল গ্রামদৃশ্যের নানা নতুন পরিচয় ক্ষণে ক্ষণে চমক লাগাচ্ছিল; তখনি তখনি তাই প্রতিফলিত হচ্ছিল চিঠিতে|’ রবীন্দ্রনাথের এই চিঠিগুলি অনুলিপি করে ইন্দিরা দেবী দুটো চামড়ায় বাঁধানো খাতায় রবীন্দ্রনাথকে উপহার দেন অনেক পরে, কবির বয়স যখন সত্তর পেরিয়ে গেছে, তখন তিনি রানী চন্দকে বলেন, ‘ছিন্নপত্র যখন লিখেছিলুম — তারই সঙ্গে স্রোতের শেওলার মতো ছোট ছোট ঘটনা ভেসে এসেছিল, ধরা পড়েছিল প্রতিদিনকার জীবনে| রসে ভরা ছিল এমনতরো দিনগুলো, জীবনে আর আসবে না| বাংলাদেশের হৃদয়ে আমি প্রবেশ করেছি| হৃদয়ের অতবড়ো দান আর আমার হবে না|’
বাংলাদেশের হৃদয় থেকে উঠে আসা, স্নেহের বিবিকে স¤ে^াধন করে লেখা এই চিঠিগুলি আমাকে মাতিয়ে দেয়| বইটা খুলে যেখান থেকে খুশি পড়ি — গোড়া থেকে, মাঝখান থেকে, যে-কোনো পৃষ্ঠা থেকে| কোনো পারম্পর্য বজায় রাখবার দায় নেই| কখনো কাছারিতে বসে বিশুদ্ধ সাধুক্রিয়ায় বিন্যস্ত বঙ্গভাষায় ছোট-ছোট ছাত্রের মুখে কাষ্ঠাসনের অভাব নিয়ে আবেদনের কৌতুকময় বর্ণনা পড়ি| পালকিতে তিন-চার ভাঁজ হয়ে বসা যায় না বলে যে কোমরের টনটনানি, মাথার ঠকঠকানি তার মজার বর্ণনা পড়ি| সরল ভক্ত বৃদ্ধ প্রজাদের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তার কথা পাই| কোনো-কোনো চিঠিতে নিজের লেখা ছোটগল্পের বীজ পাই — ‘সমাপ্তি’র কিশোরীর বীজ, মৃত কবি কালিদাসের চেয়ে বড়ো দাবি একজন জীবিত পোস্টমাস্টারের — যিনি পরে রবীন্দ্রগল্পে অমরত্ব পাবেন| নদীতীরের এই নির্জনতায় কবির মনের কারখানা — যেখানে শুধু গল্প ˆতরি হয় না, কবিতা লিখিত হয়, নাটকের সূচনা হয়| বাইরের প্রকৃতির সমস্ত ছায়া আলো বর্ণ ধ্বনি কবির রচনাবলির সঙ্গে মিশে যায়| রাগী মেঘকে দেখে মনে হয় বাইসন মোষ| পদ্মার বোটের বাসিন্দার চারিদিকে জল আর জল, ‘চারিদিকে একটা স্পন্দন কম্পন আলোক আকাশ মৃদু কলধ্বনি, একটা সুকোমল নীল বিস্তার’, তখন এক একটা সময় তাঁর মনে হয়, ‘আমি এই পৃথিবীর নতুন মাটিতে কোথা থেকে এক প্রথম জীবনোচ্ছ্বাসে গাছ হয়ে পল্ল­বিত হয়ে উঠেছিলুম|’ তাঁর সান্ধ্যভ্রমণের সঙ্গী শুক্লপক্ষের চাঁদকে কোনো-কোনো দিন না পেলে তিনি বড়ো একলা বোধ করেন| আমরা চিঠিগুলি পড়তে-পড়তে উন্মুক্ত প্রান্তরে জ্যোৎস্নার ¯^াদ উপভোগ করি, খোলা চরের উপর থেকে উঠে আসা গরম বাতাসের স্পর্শ পাই, দূর থেকে মাঝিদের গানের ভেসে আসা সুর শুনি| মাঝে-মাঝে ঘূর্ণিবাতাস শুকনো পাতা আর ধুলোর ওড়না ঘুরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়| নদীর স্রোতের মধ্যে নতুন তরঙ্গ এসে উন্মত্ত অধীরতা রচনা করে| আকাশের শূন্যতা থেকেও বেশি মনে হয় বিস্তীর্ণ নদীচরের শূন্যতা| এইসব অতুলনীয় চিঠি পড়তে-পড়তে আকাশপূর্ণ আলোকপূর্ণ আলস্যপূর্ণ দিনরাত্রিগুলির মাধুর্য অন্তরের মধ্যে নিবিড় করে নিই| বাংলার হারিয়ে যাওয়া গ্রাম ছিন্নপত্রগুলির মধ্যে চিরন্তন হয়ে থেকে যায় আর তার গদ্যের মধ্যে থাকে যেন পদ্মা-গরাই-কুমার নদ-নদীর ছন্দ আর কলধ্বনি|