…এবং গেরিলা থেকে সম্মুখযুদ্ধ

খুব ছোটবেলায় প্রিয় ছিল রূপকথার বই| আর আব্বা যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন, পিটিআই, সেখানকার লাইব্রেরিতে আমাদের ছিল অবাধ প্রবেশাধিকার| ঠানদিদির থলে, ঠাকুরমার ঝুলি, পূজার দিনের উপহার — এই ধরনের বই বের করত দেবসাহিত্য কুটির| সেসব এনে-এনে পড়তাম| রূপকথাই বেশি ভালো লাগত, আর ভালো লাগত হাসির গল্প| শিবরামের গল্প ছাপা হতো, সেসব পড়তাম বুঁদ হয়ে| কিন্তু একটা আশ্চর্য ঘটনা যে, ছোটবেলা থেকেই কবিতা পড়ার নেশা ছিল| কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, রবীন্দ্রনাথের ছোটদের কবিতা পড়তাম চিৎকার করে-করে| একটু পাগল প্রকৃতির ছিলাম, পিটিআইয়ের তিনতলার ছাদে মাদুর বিছিয়ে একটা পাটকাঠির মাথায় কাগজের ঠোঙা বানিয়ে মাইক বানাতাম, আর একটা তারের মাথায় দিয়াশলাইয়ের প্যাকেট লাগিয়ে মাউথপিস বানিয়ে অবিরাম কবিতা পাঠ করতাম উচ্চ¯^রে| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীরপুরুষ’ কিংবা ‘সামান্য ক্ষতি’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ আবৃত্তি করতাম| তারপর হাতে এলো ফররুখ আহমদের সাতসাগরের মাঝি| আর ছিল গল্পগুচ্ছ|
এখন আমার লেখার ঘরটায় গল্পগুচ্ছ, সঞ্চয়িতা, গীতবিতান, জীবনানন্দ দাশের কবিতাসমগ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস আছে দুই কপি করে| মাঝে-মধ্যে র‌্যাক থেকে নামাতে হয়, পরে খুঁজে পাওয়া যায় না, দুকপি থাকাই ভালো| শ্রেষ্ঠ নজরুল, শ্রেষ্ঠ বিভূতিভূষণ, সঞ্চিতা, তারাশঙ্কর, বঙ্কিম সমগ্র, ˆসয়দ মুজতবা আলী সমগ্র, ˆসয়দ ওয়ালীউল্লাহ — এসবও হাতের কাছে রাখি| যেমন, লিখতে-লিখতে কোনো একটা সমস্যা বোধ করলেই হাসান আজিজুল হকের গল্পের বই নামিয়ে ফেলি, আচ্ছা, হাসান এই সমস্যার সমাধান করেছিলেন কী করে?
আমার খুব প্রিয় বই মাহমুদুল হকের কালো বরফ| আরেকটা বই ইদানীংকালে আবারো পড়ে মুগ্ধ হয়েছি — আবু ইসহাকের সূর্যদীঘল বাড়ি| আমি বেদনার্ত হলে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ি, জীবনানন্দের কবিতা পড়ি, এবং নির্মলেন্দু গুণের কবিতা পড়ি| কবিতা পড়ার প্রহর এলে পড়ি বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জয় গো¯^ামী, ˆসয়দ শামসুল হকের ˆবশাখে রচিত পঙ&ক্তিমালা কিংবা পরানের গহীন ভিতর|
অনুবাদের মাধ্যমে দুই লেখকের প্রায় সব বই আমার পড়া — গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ আর মিলান কুণ্ডেরা| কুণ্ডেরার কেবল যে গল্প-উপন্যাস পড়ি, তা নয়, ওর প্রবন্ধের বইগুলো বরং বেশি পড়ি, আমার নিত্যপাঠ্য গ্রন্থের তালিকায় রয়েছে সেগুলো, বিশেষ করে দি আর্ট অব দি নভেল|
আর যতবার পড়ি, ততবার তাঁর শিল্পিতায় মুগ্ধ হই — অরুন্ধতী রয়ের — দি গড অফ স্মল থিংস পড়ে|
আমি নিজে ফিকশন লিখি, কিন্তু আজ আমি আলোচনা করব একটা নন-ফিকশন নিয়ে|
আমি মনে করি, বাংলাদেশের ঘরে-ঘরে সঞ্চয়িতা, গল্পগুচ্ছ, সঞ্চিতা, রূপসী বাংলা, বিষাদসিন্ধুর মতো বইগুলোর পাশাপাশি গেরিলা থেকে সম্মুখযুদ্ধে বইও থাকা জরুরি| এই বইটা মুক্তিযুদ্ধের বই বলে নয়, এই বইটা একজন সাধারণ ছাত্রমুক্তিযোদ্ধা গেরিলা মাহবুব আলমের, যিনি গেরিলা যুদ্ধ থেকে শুরু করে অংশ নিয়েছেন ডিসে¤^রের সম্মুখযুদ্ধে| এই বইটায় আমরা পাব উনিশশো একাত্তর সালের অবরুদ্ধ দিনরাত্রিগুলোয় বিশাল বিস্তারিত বাংলাদেশের জনপদগুলোকে, যেখানে লেখকের বর্ণনার গুণে প্রতিটা চরিত্র জীবন্ত মানুষ হয়ে উঠেছে| সেই চরিত্রের মধ্যে বিএসএফের হিন্দিভাষী কমান্ডার যেমন আছেন, তেমনি আছে গ্রামবাংলার কিশোর রাখাল বালক, গ্রাম্য গৃহবধূ, লাজুক তরুণী| মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাহবুব আলমের সহযোদ্ধাদের প্রত্যেকের চরিত্র এই বইয়ে ফুটে উঠেছে উপন্যাসের চেয়েও প্রাণবন্ত ভাষায়| মুক্তিযুদ্ধ যে কেবল নেতাদের যুদ্ধ নয়, কেবল ˆসনিকদের যুদ্ধ নয়, সাধারণ মানুষের যুদ্ধ, সেই বিবরণ গেরিলা থেকে সম্মুখযুদ্ধে এত জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে যে, মনে হয় ফিরে গেছি একাত্তরের দিনাজপুরের বীরগঞ্জে বা সীমান্ত এলাকায়| একটু উদ্ধৃত করি :
সজিম উদ্দিন আজকের রাতের গাইড|… যাত্রার আগে নিজের গ্রামে ছুটে যেতে হবে শুনে ওর চোখমুখ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এক অনাবিল আনন্দে| এ অপারেশনে গেলে সে তার বাড়িতে যেতে পারবে, আর সেখানে অপেক্ষা করছে ফুটফুটে এক সুশ্যামলা নারী, সজিম উদ্দিনের স্ত্রী|…
একটা কুপি হাতে সজিম উদ্দিনের বউ পথ দেখিয়ে চলল| সজিম উদ্দিন তার পাশে-পাশে| যেতে-যেতে অনুচ্চ ¯^রে তার বউকে বলছে, খোকার মা, তুই ভালে আছিস গে? মাথার আলগা আঁচল খসে পড়েছে, কুপির কাঁপা নরম আলোয় উদ্ভাসিত এক উচ্ছল মুখ| বাংলার চিরন্তন নারীর এক ভালোবাসার মুখ সেটা| দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিই, একজন গ্রামের সামান্য নারীর অনাবিল খুশির আনন্দটুকু কেড়ে নেয়া ঠিক হবে না| যা হবে হোক| সজিম উদ্দিন আজ থাকবে বাড়িতে| আজকে রাতে ওর ছুটি|
কী আর এমন ঘটে এই বর্ণিত অংশে, যুদ্ধ নয়, গোলাগুলি নয়, সামান্য একটু বর্ণনা| কিন্তু মনটা ছুঁয়ে যায় একেবারে|
আবার আছে সহযোদ্ধা হারানোর কষ্টকর বর্ণনা| ‘আক্কাস গুলি খেলো| আক্কাসের সেকশনের সাথে আমার নিজের অবস্থান| যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আমার পাশে শোয়া অবস্থানে থেকে শত্রুর মোকাবিলা করছিল সে| সুঠাম শরীরের অধিকারী, ঠান্ডা মেজাজের মিতভাষী ছেলে, সেকশন কমান্ডার আক্কাস| রংপুর জেলার কালীগঞ্জ এলাকায় তার বাড়ি| ম্যাট্রিক পাস করে কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় প্রাণের টানে চলে এসেছে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে| যুদ্ধের মাস খানেক আগে তার বিয়ে হয়েছে|… আক্কাস দাঁড়িয়ে তার হাত স্টেনগানে ম্যাগাজিন ভরছে| ঠিক এই সময় হঠাৎ করে বাঁ হাতে বুক চেপে ধরে ও হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে| তারপরেই আর্তচিৎকার করে ওঠে সে,… গুলি লেগেছে মাহবুব ভাই, আমাকে বাঁচান|’
আহারে, আমার মন কেমন করে| কত বয়স ছিল আক্কাসের? আঠারো? কত বয়স ছিল তার সদ্যবিধবা কিশোরী বউটির? বেরুবাড়ি-হাড়িভাসা সড়ক, যার নাম দেওয়া হয়েছিল জয়বাংলা সড়ক, সেখানে সমাহিত করা হয়েছিল আক্কাসকে| এই আক্কাসদের কথা কেউ জানবে না? কোথাও লেখা থাকবে না?
মাহবুব আলম ভূমিকায় লিখেছেন, ‘শহীদুল ইসলাম বাবলু, আমার সে দিনের যুদ্ধ সময়কার সাথী, তার অভিযোগ ছিল, আমাদের কথা তো কেউ লিখল না|… মেরুদণ্ডে গুলি খাওয়া হাসান, রংপুরের গঙ্গাচড়ার ছেলে, তারও অভিযোগ, তার কথা কেউ লিখল না| পঞ্চগড়ের ছেলে জহিরুল, গ্রেনেডের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল যার শরীর, কিছুদিন আগে অভিমানাহত হয়ে বলেছিলো, সবকিছু ব্যর্থ হয়ে গেল|’
না, সবকিছু ব্যর্থ হয়নি| এসব নাম না-জানা যোদ্ধা আর শহীদের অনেকের কথা লেখা হয়েছে দুই খণ্ডের বই গেরিলা থেকে সম্মুখযুদ্ধেতে, যে-বই ইতিহাসের ইতিহাস, উপন্যাসের উপন্যাস, মহাকাব্যের মহাকাব্য| এটি আমার পড়া শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলোর একটা| সব বাংলাদেশির অবশ্যপাঠ্য|
বইটা শুরু হয়েছে অবশ্য ১৭ ডিসে¤^র দিয়ে| পরের পৃষ্ঠাতেই ১৬ ডিসে¤^রের ডায়েরির পাতা|
‘১৬ তারিখে বিকেল চারটার দিকে ওয়াকিটকি সেঁটে ক্যাপ্টেন শাহরিয়ারের গলা ভেসে এসেছিল হঠাৎ করে|
টু ফোর ওয়ান টু ফোর ওয়ান ক্যান ইউ হিয়ার মি? ওভার|
ওয়ান ফোর টু ওয়ান ফোর টু লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার ওভার|
কংগ্রাচুলেশন্স মাহবুব| বিরাট সুখবর| আজ বিকেলে ঢাকা রেসকোর্সে পাকবাহিনী সারেন্ডার করেছে| ওভার|
কংগ্রাচুলেশন্স স্যার| বিরাট সুখবর| যুদ্ধ তাহলে শেষ| ¯^াধীনতা এলো, ওভার|…
‘কথোপকথন শেষে সুবেদার খালেক জড়িয়ে ধরলেন| হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন| পাশে দাঁড়ানো আমার কোম্পানি সেকেন্ড ইন কমান্ড পিন্টু| সেও জাপটে জড়িয়ে ধরল আমাকে| তারপর ছেড়ে দিয়ে নাচার ভঙ্গিতে হাত ওপরে তুলে চিৎকার করতে লাগল, ‘¯^াধীনতা ¯^াধীনতা মুক্তি মুক্তি সারেন্ডার সারেন্ডার’ এবং সবশেষে তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এলো সেই চিরায়ত স্লোগান, জয় বাংলা|’
মাহবুব আলমের দৃশ্য-চরিত্র-ঘটনা-সংলাপ রচনার মুন্সিয়ানায় আমি বিমোহিত| ১৯৭১ আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়| সেই শ্রেষ্ঠ সময়ে সাধারণ মানুষের এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দিনরাত্রির অপরূপ বিবরণ এই গ্রন্থ|
এটা বাংলাদেশের প্রতিটা ঘরে স্থান পাক| এটা পাঠ করুন সবাই| আমি এই রকমই ভাবি|