গল্পটা লাইলি মজনুর হলেও পারত

বাপের থান থেকে এক কাপড়েই বেরিয়েছে লাইলি। মাথায় আলুঝালু চুল, পরনের কাপড়টারও দিশ নেই – ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে দেওয়া যায় যেন জেদে ফুঁসছে ভেতরটা। সন্ধের ঠিক আগে দুপদুপিয়া নদী থেকে খালের জল কেটে ইঞ্জিন বোটগুলো ঘাটের কাছে ভেড়ে। পশ্চিমের আকাশ যখন লাল এবং সেই লালিম আভা যখন চরাচরে মিশছে, লাইলি তখন ইসমতের ট্রলারে করে এসে নেমেছিল গুদারাঘাটের কাছে। লম্বা-কালো মুখখানা রাগে ফুঁসে ঢোল – ঘাটে নামার পর থেকে ডেরায় ফেরার আগ পর্যন্ত নিজের মতোই গজগজ করেছে রাগে। 

চর দুপদুপিয়ার গুদারাঘাটের কাছে দিদার মোল্লার বড় কাঠগোলা। তার পেছনেই লাইলিদের একচালা ঘর। ঘর মানে ঝাঁঝরা টিনের ছাউনির নিচে কাঠ-বাঁশ-বেড়া কোনোমতে জোড়া দিয়ে একটা ছাপরা। বেড়ার ফাঁক-ফোকর দিয়ে নামে রোদের আঁকিবুঁকি – দিনের বেলা আলো-হাওয়া যেমন ইচ্ছেমতো ঢোকে, ঝড়-বাদলা থেকেও তেমনি নিস্তার নেই। গেলবার আইলার সময় সেটাও প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। রশিদ নেহাত কাঠগোলায় কাজ করে বলে এবং দিদার মোল্লার সুদৃষ্টির কারণে সেইবার ডেরাখান তবু মাটিতে মিশে যায়নি। 

দিদার মোল্লা ডেকে বলেছিল, তুই তো পশুরও অধম রশিদ। মেয়েডারে ভাগাইয়া আইনা সংসার পাতছিলি। কিন্তু অহন তোর নজর নাই ক্যান রে? তোরা তো তিনডা পেট। ওইডার কতা মনে আছেনি? হাত-পা ধইরা আমার বোটখান নিলি – আর ওইডাও খালে ডুবাইয়া এমনি পচাইয়া ফেললি। ইসমতের কাছে বেইচা দিলেও না হয় কডা টাহা হাতে আইত।

– ওই বোটখানই তো আমার কাল হইছিল। আমি কি আর এমনি এমনি বেইচা দিছি নাকি?

– নিজের বউয়ের দিকে না হয় খেয়াল নাই তোর। কিন্তু পোলাখান? ওইডারে তো মানুষ কইরা তুলতে হইব রে। 

ছেলের কথা ওঠায় রশিদের মুখ যেন আরো ভোঁতা হয়ে গেল। থমথমে মুখে উত্তর দেয়, আর মানুষ! আমার চেহারার লগে কি ওইডার কোনো মিল আছে নাকি? ওই পোলা আমার না।

রাগ চড়ে যায় দিদার মোল্লার। ব্যঙ্গ করে মুখ ভেংচেই বলে, ইস, ওই পোলা আমার না! এইডা অহন কেডা শুনব রে? ক্যান? লাইলির লগে পিরিত কইরা ওরে ভাগাইয়া আনবার টাইমে মনে আছিল না? আমার কতা শুনছস তহন? তহন তো দুইডায় আছিলি য্যান লাইলি-মজনু। অহন আমার চখে ধুলা দিতে চাস তুই?

জোঁকের গায়ে এবার ঝিনুকের চুন পড়েছে। পাংশু মুখে মাথা গোঁজ করে তখন চুপচাপ বসে থাকে রশিদ। আসলেই ছেলেটা পেটে আসার পর থেকে রশিদ যেন অন্য মানুষ। মায়া-মমতা সব উবে গিয়ে সারাক্ষণ
 জ্বালা-যন্ত্রণা আর নানাবিধ গঞ্জনায় তখন ঝালাপালা লাইলি। ছেলের কথা জিজ্ঞেস করলেই লাইলি চুপ। রশিদেরও রাগ চড়তে থাকে চরমে। 

কখনো এক-দু’কথার পর হাতাহাতি, গালে চড়-থাপ্পড়। তারপর থেকে অত্যাচারের মাত্রাটা যেন বেড়েই গিয়েছিল। রশিদের মনে শুধু একটাই প্রশ্ন, এই ছেলেটা ওর নিজের তো? এভাবেই দেখতে দেখতে পাঁচটি বছর কেটে গেল। সন্দেহ এখনো অটল পাহাড়ের মতো জেঁকে বসে আছে রশিদের মনে।

রশিদের দেহাতি গড়ন, লম্বা-পেটানো শরীরে একমাথা ঝাঁকড়া চুল – চোখগুলো ভাটার মতো জ¦ললেও চেহারায় একটা সরলতাগোছের মায়া আছে। কিন্তু ছেলের মুখটা ছুঁচালো – রোগে ভোগা চেহারা নিয়ে দেখতে কালো ইন্দুরের মতো। কাঠগোলায় কেউ এলে কিংবা ওর সঙ্গে হাটে-দোকানে দেখা হলে বলে, কী রে রশিদ! এইডা যে তোর পোলা মনেই হয় না। বন্ধুবান্ধব তো ঠাট্টা করেই বলে, দ্যাখ গিয়া তোর বউ আবার কোন কোন জায়গায় মজনু রাইখা আইছে। ভালা কইরা খোঁজ নিয়া দ্যাখ। খোঁজ একদিন না একদিন পাইবিই। এসব শুনে রশিদের গা জ্বলে ওঠে, অকারণে জেদ বাড়ে। সে যে বিয়ের পর দোজবর বুড়োর কবল থেকে লাইলিকে ভাগিয়ে এনেছিল
 এ-কথাটাও তখন বেমালুম ভুলে যায়।

খোঁজ মিলুক আর না-ই মিলুক কিংবা খোকার চেহারা ইন্দুর বা বান্দর যাই হোক, ছেলেকে সঙ্গে করে আর সেই নড়বড়ে ডেরার মুখে ঝাঁটা মেরে লাইলি এখন সোজা পথ নিয়েছে বোচারহাটের দিকে – সেখান থেকে সোজা বেতুয়ার লঞ্চঘাট। লাইলি জানে, কলাকান্দির ঘাট এখন সরিয়ে আনা হয়েছে বেতুয়ায় – সেখানে রাতবেরাতে
 দু-চারটে বড় লঞ্চ ঠিকই থামে, ঘুরতে আসা মানুষ হড়হড়িয়ে নামে। দূরগামী ইস্টিমারের ভেঁপুর ভোঁ-ভোঁ আওয়াজ সে নিজেই তো কত শুনেছে। রাতদিন অকারণ গঞ্জনা আর কত? গর্ভের ধন – পরিচয় খোঁজার দরকার নেই। লাইলি নিজেই তো সাক্ষী যে খোকা ওর সন্তান। বাপের টিকি খোঁজার দরকার কী? মনে মনে জেদের ফণা হিসহিস করতেই কাউকে কিছু না জানিয়ে কোমরে পুঁটলি বেঁধে পথে নেমেছে লাইলি। অন্য হাতে পুঁটলির মতোই খোকা দীন ইসলাম। 

দুই

দুপদুপিয়া গুদারাঘাটের পেছনে কৈমারি খাল। আরো দূরে নৈকাঠি বাজার বা ডুবি বাজার পর্যন্ত আরো যেসব খালের যোগাযোগ সেখানে খালঘেঁষে বড় বড় কাঠের মোকাম। বিশাল বাণিজ্যের রমরমা কারবার। যেখানে মাটি নেই সেখানে খালের মধ্যেই জলহাতির পিঠের মতো সব কাঠের ভাসান। সে এক দেখার মতো ব্যাপার। খোনকারপাড়া থেকে মণ্ডলপাড়া হয়ে দূরের পঞ্চায়েতবাড়ি। বোচারহাট, রাণীগঞ্জ থেকে একেবারে জোড়গাছের মাঠ। যতদূর চোখ যায় নামবাহারি শুধু জারুল, চাম্বল, চাপালিশ, তেলসুর, গর্জন, নিম, কড়ই আর বার্মাটিক সেগুনের বড় বড় ঢাউস সব টুকরোর পাহাড়। 

রশিদ যে মহাজনের কাজ নিয়েছে তার অমন বিশাল ব্যবসা নয়। আগে শুনেছে একসময় দিদার মোল্লার কাঠও নাকি নদীপথে রাজধানীর ফরাশগঞ্জে যেত। উল্টিনগঞ্জ লেনের দুপাশে যে সারি সারি কাঠের মোকাম তা ওদের এই বোচারহাটেরও কয়েক গুণ – আর ওই খালের ভাসানের মতোই স্তূপের মতো রাস্তায় পড়ে থাকে, সেটা ও জানে। রশিদ নিজেও স্বপ্ন দেখে দিদার মোল্লার বাণিজ্য যখন আরো ফুলেফেঁপে উঠবে, ও নিজেই নদীপথে সওয়ার হয়ে যাবে একদিন। চর দুপদুপিয়ায় থাকতে ইসমতের সঙ্গে এইসব খোয়াবই দেখত রশিদ। ইসমত ওকে বলেছে, উল্টিনগঞ্জ লেনের শেষ মাথায় বাকল্যান্ড বাঁধ – ইংরেজরা বানিয়েছে – বাঁধের নিচে বুড়িগঙ্গা নদী আর নদী ঘিরেই তো ঝলমলে রাজধানী। সেই কোন দূরে কতশত নদী পেরিয়ে এই কাঠের স্থবির জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার বাসনা বা স্বপ্ন ওর চোখের নিচে এখনো চিকচিক করে। 

রশিদের বাড়ি চর দুপদুপিয়ায়। আগে চরের ভাড়ানি খালে ইসমতের সঙ্গে ইঞ্জিন বোট চালাত। শীতের সময়ে যখন পর্যটকেরা চরে ঘুরতে আসত তাদের চর দেখানোর নাম করে ঘুরে বেড়াত চারদিকে, নতুন গজিয়ে ওঠা
 খালে-জঙ্গলে। মোটামুটি এই ছিল পেশা। নাও বাইবার ছলেই তখন লাইলির সঙ্গে পরিচয়। পরিচয় থেকে সখ্য আর ভালোবাসা। কিন্তু লাইলির দুস্থ পিতা ওকে এক বুড়ো দোজবরের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল। সমস্ত কাহিনিতে যেমন হয় তেমনি এই দোজবর বুড়োও ছিল অনেক কাঁচা পয়সার মালিক। সেই লোভে লাইলির বাপ ফেঁসে গিয়েছিল। সেখানে কিছুদিনের জন্য পেতেছিল ঘর-সংসার। তারপর বন্ধু ইসমতের ইন্ধনে আগের দোজবর জামাই থেকে ফুঁসলিয়ে এনে লাইলিকে বিয়ে করেছিল সে। লাইলিকে নিয়ে চর দুপদুপিয়ায় থাকা বিপদ হবে জেনে গুদারাঘাটের কাছে কাঠের গদিঘরে শেষমেশ একটা কাজও জুটিয়ে নিয়েছিল রশিদ।

লাইলির সঙ্গে অনেকদিন ধরেই রশিদের ইটিস-পিটিস চলেছে। আসলে প্রেম-ভালোবাসা বিশেষ কিছু নয় – হঠাৎই একটা মোহ। আর সেই মোহে ডুবতে গিয়ে ইসমত হাতে ধরে আরো ডুবিয়ে দিয়েছিল ওদের। জঙ্গলের আড়ালে ভাড়ানি খাল যেখানে নদীর পেটে মিশেছে মাঝেমধ্যে ওদের দুজনকে ইঞ্জিন বোটে একা রেখে আসত।
 লাইলি-মজনুর গল্পটা আরেকটু জমে ওঠার আগেই একদিন দুপুরের পর নিজেরা শলাপরামর্শ করে ইসমতের ট্রলারে করে সোজা চলে এসেছিল দুপদুপিয়ার গুদারাঘাটে। ইসমতের দূরসম্পর্কের চাচা ওই দিদার মোল্লা। উপায়হীন হয়ে লাইলিকে নিয়ে রশিদ উঠেছিল তারই কাছে। 

লাইলি তখন শহরের মতো ঝকমকে আলো দেখা শিখেছে, আর দেখেছে মিথ্যে মোড়কে ভরা লোভের চাকচিক্য। রশিদ তখন প্রেমের জলে ডোবা মজনু। তার চোখে লাইলি শুধু নামে নয়, আগে থেকেই তো প্রেমিকা লাইলি হয়ে আছে। অথচ লাইলির চেহারাও আহামরি তেমন কিছু নয়। লম্বাটে মুখ। মুখে-গলায় হালকা মেছতার দাগ। তবে মাথাভর্তি চুল আর চিরল দাঁত দেখেই নাকি মন ঢেলেছে রশিদ। কে জানে, যুগে যুগে লাইলি-মজনুর প্রেমকাহিনি হয়তো এভাবেই মহান হয়েছে! লাইলির অবশ্য আরো দুটো গুণ ছিল। কথার তীর বিঁধিয়ে যে-কাউকে বশ করতে পারত মেয়েটা আর সারাদিন খাটতে পারত বলিষ্ঠ মোষের মতো। সেই লাইলি জাদুটোনা দিয়ে বশ করেছে মজনুরূপী রশিদকে। 

ডেরায় শিকল তুলে বাকবাকুম পায়রা হলে কি আর পেটের ক্ষুধা মেটে, নাকি এমনি করে বেঁচে থাকা যায়! সারাক্ষণ দুজনের চোখে চোখে চোখ, মনে মনে মন। এসব দেখে দিদার মোল্লা খুব ক্ষেপেছিল একদিন। রশিদকে শাসিয়ে বলেছে, খালি এইভাবে বইয়া খাইলে দিন যাইব তোমাগো? আমার কাঠগোলায় আইয়া বসো। মাসে মাসে কিছু টাহা দিমুনে। 

মেঘ না চাইতেই যেন আসমান ফাইট্টা পানি। কারণ ততদিনে রশিদ চাট্টিবাট্টি তুলে চর দুপদুপিয়া থেকে পাকাপাকি চলে এসেছে। এখন একটা কাজ চাই। দিদার মোল্লা বড়শিতে একটা টোপ ফেলেছে। আর রশিদও সেই টোপ গিলেছে।

রশিদের মনের খেয়াল আর কেউ না জানলেও জানে শুধু লাইলি। দুপদুপিয়া নদীতে চর জেগেছিল অনেক। নতুন জেগে ওঠা সেই চরে রশিদের ঘর ছিল, দখল করা কিছু জমি-জিরাতও ছিল। অবশ্যই সেগুলো থকথকে নরম কাদার জমি। ঠিকমতো ফসল হয় না। জোয়ার-ভাটার চক্রে ডুবে যায়, আবার ভেসে ওঠে। ছাপরাটাও হাওয়ার তোড়ে যেমন-তেমন। তাই ক্ষেত-ফসলের চিন্তা আপাতত বাদ। চরের সকলেই হয় মাছ ধরে, কিংবা নৌকা বায়। সেইসব কাজ এখন অতীত। রশিদ তাই কোনোরকমে পালিয়ে এসে কাজ নিয়েছে কাঠের এই গদিঘরে। চর দুপদুপিয়া বাজারে অন্তত শহরের চমক আছে, মানুষের ঠমক আছে। ওর মনেও সুপ্ত আশা – এইসব ছেড়েছুড়ে একদিন ঠিক চলে যাবে রঙিন রাজধানীতে। সেই চাকচিক্যময় জগতে, সত্যিকার লাইলি-মজনুর মতোই না হয় বাস করবে দুজনে।

তিন

লাইলির কোমরে শুধু কাপড়ের পুঁটলিই নয়, অন্য হাতে ধরে রেখেছে এঁটুলি – ওর চার বছরের খোকা দীন ইসলাম। রশিদের ধারণা, এটা ওর সন্তান নয়। এতে অবশ্য ওর দোষ নেই। কোত্থেকে কী হয়েছে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিয়ের ছ-মাসের মাথায় সন্তান এসেছিল ঘরে। অপুষ্ট, রোগেভোগা; বাঁচাতে বেশ খরচাই হয়েছিল। তারপর থেকেই দুজনের মধ্যে তুমুল অস্বস্তি, অশান্তি। এদিকে চার বছরের হলে কী হবে বেঁচে থাকার যুদ্ধে টিকে গিয়ে জীবন পেয়েছিল বলেই কি না ছেলেটা হলো যেন জাত বিচ্ছু। চোখা মতোন মুখ আর কুটুস কুটুস করে কথাও বলে সারাক্ষণ রেডিওর মতো। দেখতে মিশকালো চেহারায় ঠিক যেন রশিদের বিপরীত। রশিদ লাইলির মুখের দিকে চেয়ে তবু চার বছর পেলেছে সংসারে। অশান্তি হলে ছেলেটাকে মেরে-ধরে লাইলিই বলত, এইডা তোর বাপ না। বিচ্ছুটাও তখন জিজ্ঞেস করত, তাহলে ওর বাপ কে? এভাবেই বিপত্তির শুরু। রশিদ এখন তাই আর মায়া বসাতে পারছে না। এরকম নানা অশান্তিতে লাইলির তাই এ কঠিন সিদ্ধান্ত। 

ডেরায় এসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে একবার কাঠের গোলায় উঁকি দিয়েছিল লাইলি। নিশ্চিত হতে চেয়েছিল রশিদ তখন মোকাম বা অন্য কোথাও আছে কি না! সন্ধ্যায় খানিকটা বৃষ্টি হয়েছিল। বাজারের এঁদো গলির ভেতরে পানি জমে কেমন ছপছপে হয়ে আছে। চারদিকে দমবন্ধ হাওয়া – দোকানের কাছে যেতে ভেজা কাঠের কেমন পচা সোঁদা গন্ধ। সার সার নানা আকৃতির কাঠ সাজানো মোকামে। ভেতরে হলুদ দুটো বিজলি বাতি জ¦লছে। কাঠের সারির ফাঁক দিয়ে গদির দিকে চোখ রাখতেই দেখল রশিদের উজ্জ্বল মুখ – মুখে ঘামের বিন্দু বিন্দুকণা। কী ভেবে দরজার আড়ালে খানিকক্ষণ দাঁড়াল। বাঁয়ের কোমরে পুঁটলি গুঁজে ডান হাতে খুব সাবধানে শক্ত করে ধরে রেখেছে দীন ইসলামের হাত। হঠাৎ না আবার ছেলেটা ‘আব্বা’ বলে চিৎকার দিয়ে ওঠে, সে নিয়েও সতর্ক লাইলি। 

কাঠ মোকামের মহাজন দিদার মোল্লা সন্ধের পর গদিতে থাকে না। তখন রশিদই সবকিছুর দেখাশোনা করে। মাঝেমধ্যে হাতে কাজ না থাকলে বা মন না চাইলে গুদারাঘাটে ট্রলার রেখে ইসমতসহ আরো কয়েকজন সন্ধ্যায় ইচ্ছেমতো বসে আড্ডা মারে একেবারে রাত পর্যন্ত। আজ ইসমত অবশ্য নেই সেখানে। তবু ভেতরে কথার গুনগুন ভাসছে। দুজন লোক বসে আছে। নিশ্চয় কাঠের কারবারি। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই আসে এই বোচারহাটে। তারপরও কুটকুট করে কথা বলে উঠল দীন ইসলাম। 

– আম্মা, ভেতরে যাইবা না?

– চুপ থাক, হারামজাদা। ভেতরে গিয়া কী করবি?

– আব্বার কাছে যামু।

– তোরে কতবার কইছি না, ওইডা তোর আব্বা না। 

– আমার আব্বা কেডা?

দীন ইসলামের এমন কথার জবাব না দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখ চেপে ধরে লাইলি। কারণ ততক্ষণে চাপা কথার আওয়াজ পেয়ে রশিদ দরজার দিকে চোখ লাগিয়ে খুঁজছে। লাইলিও তখন সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে গজরাচ্ছে। … হারামজাদা বদমাইশ … আমারে কত আশা দিছিল … সেইডা থুইয়া অহন সে এইখানে গাইড়া বইছে। তার সংসারের কপালে আমি ঝাঁটা মারি। যেইদিগে দুই চখ যায় আইজ ওইদিগেই যামু।

লাইলির হাত ধরে টানাহেঁচড়া করছিল দীন ইসলাম। রেগে-ফুঁসে হাত কামড়াতে চাইল দু-একবার। ঠাস করে গালে এক চড় বসিয়ে দেয় লাইলি। মেরেই টেনেহিঁচড়ে গলি থেকে বেরিয়ে চলে যায় অটোস্ট্যান্ডের দিকে।

লাইলি জানে, বোচারহাটের বাস ধরে যেতে হবে রাণীগঞ্জের বাস টার্মিনালে। সেখান থেকে সোজা অটো বা লেগুনা ধরে তবেই বেতুয়া লঞ্চঘাট। পথ একেবারে কম নয়। হিসাব করতে গেলেও দেড়-দুই ঘণ্টার মতো। তারপর রাতটা কোনোমতে কাটাতে পারলে সকালেই রাজধানীর পথে।

বোচারহাট থেকে বাসটা তখন ছেড়েছে। মফস্বল অঞ্চলে বাসের চেহারা যেমন হয় – নড়বড়ে বাসটার ভেতর বোঁটকা গন্ধের মধ্যে মানুষের গাদাগাদি ভিড়। কোনোমতে ড্রাইভারের পেছনে ইঞ্জিন কভারের ওপর পুঁটলি কোলে নিয়ে বসেছে লাইলি। পাশেই হেলান দিয়ে দীন ইসলাম। এদিক-ওদিক চোখ ঘুরিয়ে কেউ আবার ওকে চিনে ফেলছে কি না সেটা দেখছে ও। এদিকে সেই তখন থেকে ছেমরাটা গোঁ-গোঁ করে কাঁদছে আর ক্ষণে ক্ষণে কঁকিয়ে উঠছে। দু-একবার ধমক দিয়ে থামিয়েছে লাইলি। বাসে ওঠার আগে দোকান থেকে দুটো কাঠি লজেন্স কিনে দিয়েছিল। ফোঁস-ফোঁস করতে করতেই দীন ইসলাম ওগুলো চুষছে।

জেদ আর ক্ষোভের বশে অবশেষে ঘর ছেড়েছে লাইলি। একবার ভাবল, রশিদ ওর কাছে কোনোদিন সত্যিকার মজনু হতে পারেনি। এতগুলো বছর ধরে সে শুধু বৃথা চেষ্টাই করে গেছে। তবে রশিদের সংসারে ও তেমন মন্দ ছিল না। কারণ কাঠ মোকামে কাজ করা ছাড়াও রশিদ শীতকালে মাঝেমধ্যে ট্রলারে মাঝির কাজ করত। বাপ-দাদা বহু আগে চর দুপদুপিয়ায় বসত গেড়েছিল। প্রতি বছর বালির চরে কিছু নতুন জমি ভেসে উঠত। চরের বুক চিরে যে ভাড়ানি খাল – সেই খাল শেষে নদীতে মিশে আবার সাগরেই মিলেছে – সেই খালেও খেয়া বেয়েছিল রশিদ।

খেয়া বাইতে গিয়েই তো লাইলির সঙ্গে প্রেম। তারপর একদিন কী যে মতি হয়েছিল সব ছেড়েছুড়ে চর দুপদুপিয়ার ঘাটে লাইলিকে নিয়ে ডেরা বেঁধেছিল। ওদিকে রশিদের ধারণা, দোজবর জামাই থেকে যেদিন লাইলিকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তখন দীন ইসলাম লাইলির পেটে। যেদিন থেকে জানতে পারল ছেলেটা আসলে ওর নয়, তখন থেকেই লাঞ্ছনা আর গঞ্জনা শুরু করেছিল লাইলির ওপরে। অথচ পালিয়ে চলে আসার পরও আগের বুড়ো জামাই আহ্লাদ করে লাইলিকে নিতে এসেছিল দুইবার। লাইলি ফিরেও তাকায়নি। 

প্রথম প্রথম রশিদের নেশায় বলেছিল, পোলাডারে নিয়া যাও। ওর চোখে তখন লাইলি-মজনুর রঙিন নেশা। একদিন লঞ্চ বেয়ে অসীম স্রোত ডিঙিয়ে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার নেশা। 

তারপরও লোকটা সেধেছিল, এবার চল লাইলি। আঁই তোরে ঘরে নিয়া তুলুম। আর তুই না গেলে পোলাডারে দে। ওরে আঁই মানুষ করুম।

মুখ ঝামটা দিয়ে লাইলি তেড়ে এসেছিল। ইস্, বড় আল্লাদের কতা। এই নদী-খালের দ্যাশে আবার মানুষ! বড় হইলে ট্রলার চালাইব, না হয় শেষমেশ একটা ট্রলার কিন্যা নিজের কোম্পানি দিব। এর চেয়ে বেশি আর কী!

– তবু তুই পোলাডারে দে। 

– না, আঁই দিমু না … লাইলি বেঁকে বসেছিল। উল্টো তখন জেদ ধরেছিল … দীন ইসলাম এহনও ছোড। আগে বড় হউক, নিজের বাপ চিনতে শিখুক, তারপরে দেহা যাইব।

লাইলির স্বভাবটাই যে অমন! কখন কী বলে ঠিক-ঠিকানা নেই। তারপর আরো কী কী যেন হয়েছিল। কালো ছেমরার চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে জেদ চেপে বলেছিল, তুই ভাগ, আমার চখের সামনে থেইকা। বুইড়া খচ্চর। তোর মুখে থুক দেই।

ইঞ্জিনের গরম সিটের ওপর বসে বছরখানেক আগের সেইসব কথাই লাইলি এখন উল্টেপাল্টে ভাবছে। একটা মজনুর নেশা ওর মন থেকে কখনো মুছে যায়নি। নিজের সামান্য পুঁটলিটার মতো দীন ইসলামকেও ওর এখন তাই বোঝা মনে হচ্ছে। কই যাবে, কই থাকবে সঠিক জানেও না। তবু মনে জেদ – একবার যেহেতু বের হয়েছে আর সে ফিরে যাবে না রশিদের ডেরায়। এই দীন ইসলামই না হয় ওর অবলম্বন হবে একদিন। 

রাণীগঞ্জ বাজারে নেমে পুঁটলি দুটো হাতে নিয়ে একটা অটো খুঁজে নিল। রাত বাড়ছে। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টিটাও বাড়ছে। ছেলেটা সেই তখন থেকে খিদে লেগেছে বলে ট্যাঁ ট্যাঁ করছে। বেতুয়ায় যেতে এখনো ঢের পথ বাকি। তবে একবার বেতুয়ায় পৌঁছতে পারলেই হলো – লাইলি জানে রাতের দিকে সেখানে রাজধানীর কয়েকটা লঞ্চ এসে থামে। যাত্রীরা নেমে গেলে ভেঁপু বাজিয়ে আরো দূরগামী হয়। রাত কিংবা ভোরের যে-কোনো একটায় চেপে ও ঠিক পৌঁছে যেতে পারবে ঝলমলে রাজধানীর বুকে।

চার

বেতুয়া লঞ্চঘাটে রাতের বুকে এমভি দ্বীপরাজ থেমে আছে। রাজধানী থেকে শ-তিনেক যাত্রী নিয়ে সেদিন সকালেই এসেছে বিশাল লঞ্চটি। হাজারখানেক যাত্রী নিয়ে চলাচল করতে পারে অনায়াসে। কিন্তু এবার একটা ভ্রমণদলের বুকিং নিয়েই লঞ্চটি ঘাটে এসে থেমেছে। ভ্রমণদলটির চর দুপদুপিয়া আর তারুয়া সৈকতে ঘোরাঘুরি শেষ হলে আবার তা পূর্বের গন্তব্যে ফিরে যাবে – এমনটাই কথা রয়েছে। 

লাইলি তখন অটো থেকে নেমে নতুন পন্টুনে দাঁড়িয়ে। ওর চোখের সামনে বিস্ময়ে ঘোরমাখানো বস্তুর মতো রাতের অন্ধকারে ঝলমল করছিল লঞ্চের ভেতরটা। মনে হচ্ছে, জলের ওপর এ এক অদ্ভুত আজদাহা। ভেতরে তখন গান বাজছে, সংগীতের মূর্ছনা ভাঙছে মুহুর্মুহু আর লোকজন ইতস্তত ঘোরাঘুরি করছে প্রশস্ত ডেকে, চৌখুপি ঘরের সামনের টানা বারান্দায়, ঘাটের পন্টুনে, এমনকি নদীর তীরঘেঁষে দাঁড়ানো মফস্বল বাজারের দোকানগুলোতে।

রাত ঘনিয়ে আসছে। সমস্ত বিস্ময় এবার মুছে গিয়ে লাইলির পেটে এখন ক্ষুধার তাড়না ও জমাট ভয়। সে এখন কোথায় কোনদিকে যাবে সেই হিসাব মেলাচ্ছে চুপচাপ। লঞ্চের নিচের ডেকে রাতের খাবারের এন্তেজাম সারছে বাবুর্চিদল আর সঙ্গে আসা বাঁধা কয়েকজন। গরম ভাতের ধোঁয়া থেকে গন্ধ উঠছে সেখানে, সঙ্গে রুই মাছের মুড়িঘণ্ট, সবজি, মাংস এমনই আরো কত আয়োজন। বৃষ্টিমাখা শীতল হাওয়া এসব লোভাতুর খাদ্যের ঘ্রাণ তাড়িয়ে আনছে পন্টুনের দিকে, ক্ষুধার্ত লাইলিদের নাকের কাছে।

লঞ্চের নিচের ডেকে উচ্চৈঃস্বরে মাইকে গান বাজছে। আর কী সব ঝকমারি আলো! তার মধ্যেই দূর থেকে মজনুর পরিশ্রান্ত মুখটা দেখা যাচ্ছে দলের ভেতরে। মজনু দলের হেড বাবুর্চি। এতক্ষণ রান্না করে ক্লান্ত, এখন আবার চেঁচিয়ে ওকেই সামলাতে হচ্ছে রাতের এই পালা। বিরাট কোনো উৎসবের মতো সারি সারি খাবারের টেবিল বসানো। খাবার পরিবেশন করা হলে ধুন্দুমার খেয়ে সবাই চলে গেল যার যার মতো। ধোঁয়াওঠা গরম ভাতের হাঁড়ির দিকে তখন চুপচাপ তাকিয়ে বসে আছে মজনু। একটা বিষণ্ন শূন্যতা ওর মনে ডুকরে উঠছিল। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল ছেলে ইয়াসিনের কথা। নিচের ডেক সম্পূর্ণ খালি হয়ে গেলে একটা ঘোরগ্রস্ত জগৎ থেকে হেঁটে এসে ইয়াসিন তখন কথা বলতে শুরু করল মজনুর সঙ্গে। মজনুও মনে মনে কথা বলছে। 

লঞ্চের কয়েকজন বাসন-কোসন ধুতে লেগেছে। মজনু চুপচাপ পন্টুনের দিকে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর হঠাৎ চোখ পড়ল পুঁটলি হাতে দাঁড়ানো লাইলির দিকে। একটা লোহার রেলিংয়ের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে আছে লাইলি। চোখেমুখে রাজ্যের ক্লান্তি। কিন্তু চোখে তার চেয়েও বেশি বুঝি ক্ষুধার ছায়া। দীন ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ওর উত্তেজনার চোখ দুটো অসহায়জনিত দৃষ্টিতে অচেনা আগন্তুকটিকে দেখছে। লোকটার চোখেও যেন ভরপুর জিজ্ঞাসা। 

গরম ভাতের ধোঁয়া-ওঠা গন্ধ নাকের কাছে ঠেকতেই ওরা দুজনই সোজা হয়ে বসল। দীন ইসলাম চেঁচাচ্ছিল, মা, ভাত খামু। খিদা লাগছে।

রাতের সুনসান অন্ধকারে এসব কথাই ভেঙে টুকরো হয়ে কানে এসে ঠেকল মজনুর। ইয়াসিনের ছায়া ওর মনে তখনো ঘুরঘুর করছে। পন্টুনের মধ্যে দাঁড়ানো ওই ছোকরার বয়েসিই হবে। হাত ইশারা করে কাছে ডাকল।

– নাম কী রে তোর? ভাত খাবি?

দীন ইসলাম হঠাৎ কথা থামিয়ে লাইলির দিকে চেয়ে আরো জোরে চেঁচিয়ে উঠল। মজনু এবার কথা ঘুরিয়ে বলল, তোমরা কী চাও এইহানে? নাম কী গো তোমার?

– আমার নাম লাইলি।

নাম শুনে হঠাৎ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল মজনু। ওর বুকে প্রবল একটা ধাক্কা এসে লাগল। বলল, লগে এইডা কে? তোমার পোলা?

লাইলি মুখে কিছু বলল না। পুঁটলি সামলে এক হাতে দীন ইসলামকে আরো কাছে এনে কোলে তুলে বসাল।

মজনু এবার বলল, সারাদিনে কিছু খাইছ? লঞ্চে গরম ভাত, ডাইল আর তরকারি আছে। ভিতরে আইসো। পোলাডারে কিছু খাইতে দাও।

লঞ্চের নিচের ডেকে ভিড়-ভাট্টা তখন একেবারেই কমে গেছে। লাইলি সুড়সুড় করে ভেতরে চলে গেল। দুটো থালা টেনে ভাত-তরকারি ঢেলে দিলো মজনু। দীন ইসলাম তখন গোগ্রাসে ভাত গিলছে।

মজনু বুঝল, ছেলেটা অনেকক্ষণ ধরে কিছু খায়নি। তারপর লাইলিকে বলল, তুমি কই যাবা? বাড়ি কই?

– আমার বাড়ি চরের দিগে। দুপদুপিয়ায়। আমায় ঢাকায় লইয়া যাও।

– তুমি থাহো কই?

– দুপদুপিয়া বাজারের গুদারাঘাটের পিছে।

– এই পোলার বাপ নাই?

– আসল বাপ থাইকাও নাই। দ্বিতীয় বাপে তাড়াইয়া দিছে। কথাটা যে আংশিক মিথ্যা সেটা মনে করে লাইলির একটু হেঁচকি উঠল। রশিদ সন্তান স্বীকার না করলেও ডেরা ছেড়ে কখনো তাড়িয়ে দেয়নি। তবু বলল, এই লঞ্চডা কি ভোরে ছাড়ব না? এই বাজারঘাট আর ভালো লাগে না। রাজধানীতে যামু আঁই। একটা কাম করুম শহরে গিয়া।

– এইডা ঢাকায় যাইব ঠিকই, তয় ছাড়তে ছাড়তে কাইল সইন্ধ্যা। মানে আর একদিন বাদে। তুমি কাইল সারাদিন লঞ্চেই থাইকো। কাইলকার দিন বাদে আমরা শহরে যামু। 

ভরপেট খেয়ে দীন ইসলামের তখন কথা ফুটেছে মুখে। কুটুস কুটুস করে নানা প্রশ্ন করছে। মজনুর তখন কেন জানি হঠাৎ মায়া হলো। দীন ইসলামকে দেখে অনেককিছুই মনে পড়ে যায়। ওর নিজেরও এই বয়সের একটা ছেলে ছিল। সারাদিন বাপ ডেকে আকুল করত, কুটকুট করে কথা বলত। 

পরদিন সকাল থেকেই লাইলি খেয়াল করল দীন ইসলাম এখন আর ওর সঙ্গে নেই। নেওটার মতো কাছ ঘেঁষে রয়েছে মজনুর। আর কুটকুট করে বলছে চর দুপদুপিয়ার গুদারাঘাটের নানান কেচ্ছা। দুপুরের মধ্যেই মজনুর সঙ্গে ছেলেটার বেশ খাতির হয়ে গেছে। দুপুরের খাবারের পর মজনু ওকে এখন কাঁধে নিয়ে ঘোরাচ্ছে। এদিকে সকাল থেকে লাইলি লঞ্চের রান্নাঘরে বসে বাটনা বেটে দিচ্ছে। সবজি কেটে তরকারি রান্না করছে। কখনো লম্বা হাতা নিয়ে ডাল ঘুঁটছে। এই লঞ্চ যদি কোনোদিন শহরে না-ও যায়, যদি এখানেই এভাবে সংসার পাতা যায়, সেটাও-বা মন্দ কী! লাইলি-মজনুর গল্প এখানেও সম্ভব হতে পারে!

সেদিন রাতের বেলা লঞ্চ রাজধানীর উদ্দেশে চলতে শুরু করেছে। আকাশে বড় চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় ঝকঝক করছে আকাশ। সেই চাঁদের আলো নদীর জলে তৈরি করছে ঝলমলে পরিবেশ। লাইলি আড়াল থেকে দেখল সারাদিনের সমস্ত কাজ শেষে দীন ইসলাম মজনুর পাশে গা-ঘেঁষে বসে কী যেন করছে। আর মজনু আঙুল উঁচিয়ে আকাশ দেখাচ্ছে। এসব দেখে লাইলির চোখে রীতিমতো জল এসে গেল। ওর সন্তান এতদিনে বুঝি একটা অবলম্বন পেল। এবার ও নিশ্চিন্তে শহরে কাজের সন্ধানে পালিয়ে যেতে পারে। এসব দেখে আড়ালে বসে লাইলি কেবল চোখ মুছে যাচ্ছে।

জাহাজ চলছে গন্তব্যে – চলতে চলতে ওরা মাঝনদীর কোথায় রয়েছে কে জানে! ভ্রমণদলের রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়েছে অনেক আগেই। সবাই এখন নিরিবিলি যার যার মতো আড্ডা-কাজে ব্যস্ত। লঞ্চের দুপাশের ডেক ও ছাদে ভ্রমণকারীদের ভাঙা ভাঙা গানের সুর জোছনাধোয়া চরাচরকে ক্ষত-বিক্ষত করছে। কিন্তু কিছু মানুষ তখন যাবতীয় মৌল অধিকারের চিন্তায় মগ্ন, অবিরত সন্ধানে ব্যস্ত, বিপর্যস্ত। 

তিনতলা লঞ্চের শরীরে অনেক ঘর, তবু সেখানে লাইলি বা দীন ইসলামের কোনো আশ্রয় নেই। লাইলি হয়তো নিচের ডেকের রান্নাঘরে হাঁড়ি-কুঁড়ি-থালা-বাসন গুছিয়ে নিচ্ছে একটা ভবিতব্য সংসারের আশায়। ওদিকে এই বেলা খাদ্যের সংস্থান হওয়ায় দীন ইসলামের তখন আর লাইলির কথা মনে নেই। সে ছায়ার মতো ঘুরছে মজনুর সঙ্গে। লঞ্চের নিচের ডেকে বসে সেই দুটি প্রাণী দারুণ আনন্দে বিভোর, পারস্পরিক অবলম্বনে মগ্ন। কারো আর খেয়াল নেই পেছনে কোথায় কী ঘটছে। খানিকক্ষণ বাদে লঞ্চটা যেদিকে এগিয়ে চলছে সেদিক থেকেই একটা অন্যরকম আওয়াজ এলো। ঢেউভাঙা জলে ঝপাস শব্দ শুনে দুজনই কান খাড়া করে পেছনে তাকালো। লঞ্চের নিচের ডেকে ঝাপসা অন্ধকার। না, ওখানে কেউ নেই। জোছনাধোয়া চরাচরে সব গল্প হয়তো লাইলি-মজনুর হয় না। কিংবা হতেও নেই।