আফরোজা সবসময় বিশ্বাস করতো – ভালোবাসা শুধু অনুভূতির বিষয় নয়, বরং তা অর্জন করতে হয়, আর অর্জনের পর তা ধরে রাখার জন্য কিছু অতিরিক্ত প্রয়াস লাগে। অর্জন শব্দটা সে ইচ্ছে করেই বেছে নিত। কারণ, তার কাছে ভালোবাসা হঠাৎ নেমে আসা কোনো অলৌকিক ব্যাপার ছিল না; বরং ছিল একধরনের শ্রমসাধ্য বিনিয়োগ, রুপার বাসনের মতো – যত্নে ঘষলে উজ্জ্বল, অবহেলায় নিস্তেজ।
জেলা শহরের এক প্রান্তে অবস্থিত তার বাড়িটি যেন সেই বিশ্বাসেরই প্রতিচ্ছবি। উঁচু নীল রঙের লোহার গেটের আড়ালে বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। প্রতি বৈশাখে সে গেটটা নতুন করে রং করায়। যেন নতুন রঙের সঙ্গে সে নিজের জীবনটাকেও নতুন করে শুরু করতে চায়। ভেতরে পোলিশ করা কাঠের আসবাব, ভারি পর্দা, মেঝের ওপর ঝকঝকে টাইলস – সবকিছুতেই একধরনের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া স্থায়িত্বের ছাপ। যেন এই সবকিছু দিয়ে সে তার মালিকানার প্রমাণ দিতে চায় – তার টিকে থাকা কেউ ঠেকাতে পারবে না – এই ঘোষণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
কিন্তু এই আপাতস্থায়িত্ব অনায়াসে আসেনি। মোটামুটি বড় অঙ্কের টাকাটা তার জীবনে আসে বেশ কিছুটা দেরিতে। চল্লিশ পেরোনোর পর বাবার জমি বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থই আফরোজার জীবনে প্রথম বড় পরিবর্তন এনে দেয়। সেই সম্পদ যেন হঠাৎ করে তার জীবনকে নতুন করে সাজানোর একটা সুযোগ তৈরি করে দেয় আর সেই চলমান সাজানোর প্রক্রিয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে মাহফুজের প্রবেশ ঘটে। সবকিছুই আকস্মিক, সবকিছুই একসঙ্গে।
বয়সে দশ বছরের ছোট, চটপটে আর একধরনের নির্লিপ্ত ভদ্রতা, যার মধ্যে লুকিয়ে থাকে প্রচণ্ড খ্যাপাটে আত্মবিশ্বাস – যে জানে, তাকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
এক নিকটাত্মীয়ের বিয়ের বাগদান অনুষ্ঠানে তাদের প্রথম দেখা। পরিচয়ের সেই দিনটির কথা আফরোজার এখনো পরিষ্কার মনে আছে।
‘এই ছেলেটা কে?’ সে তার খালাতো বোনকে জিজ্ঞাসা করেছিল।
‘ওই যে নীল শার্ট পরা? বড় ভাবির ভাগ্নে। খুব স্মার্ট, না?’
মাহফুজ তখন অতিথিদের মাঝে চা পরিবেশন করছিল, মাঝেমধ্যে কারো চোখে চোখ পড়লে হালকা রসিকতার সঙ্গে মনকাড়া হাসি ছুড়ে দিচ্ছিল। তার সেই হাসিতে একটা নির্লিপ্ত আত্মবিশ্বাস ছিল, যেন সে জানে, তাকেই লক্ষ করা হচ্ছে। আফরোজা লক্ষ করছিল তাকে। এক মাসের মধ্যেই তাদের বিয়ে হয়ে যায়।
প্রথমদিকে সবকিছুই সহজ ছিল। মাহফুজের উদ্দীপ্ত তারুণ্য আফরোজাকে আনন্দ ভীষণ দিত। তার হাসি, তার দুষ্টুমি, তার অবহেলাভরা দম্ভ, সন্ধ্যায় বাইকের পাশে নায়কোচিত ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা – এসব যেন আফরোজার জীবনে এক নতুন তরঙ্গ নিয়ে আসে। সেই তরঙ্গের উন্মাতাল স্রোতে ভেসে মধ্য-যৌবনা আফরোজা নতুন করে বাঁচতে শেখার আগ্রহ অনুভব করে, হঠাৎ হাতে-পাওয়া জীবনের রস নিংড়ে তাকে যথেচ্ছ উপভোগ করে নিতে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। সে শুধু মাহফুজকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসেই ফেলেনি, তার মধ্যে নিজের চাপা, বহুদিনের অবদমিত কামনা প্রকাশের পথও খুঁজে পেয়েছিল।
একদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাহফুজ বলেছিল – ‘আন্টি না, এখন তো বলা যায় না, আফরোজা, তুমি হাসলে তোমাকে অনেক কমবয়সী লাগে।’
আফরোজা হেসে ফেলেছিল। ‘তুমি এসব বলতে শিখলে কোথায়?’
‘শিখিনি। সত্যি বলছি।’
এই ‘সত্যি’ শব্দটাই আফরোজাকে দুর্বল করে দেয়।
কিন্তু সময় এক নীরব হিসাবরক্ষক, তার নিজস্ব ভাষা মেনে নিজের গতিতে চলে।
বছর গড়াতে না গড়াতে আফরোজা বুঝতে শুরু করে, মানুষের চোখের ভাষা বদলে যাচ্ছে। তাদের তাকানোটা আর স্বাভাবিক নয়। পরিচিতজনদের ফিসফাস, মুখটেপা হাসি, ‘টাকাওয়ালা বউ আর চেংড়া স্বামী’ কথাটা বাতাসে ভেসে বেড়াতে থাকে।
একদিন বাসার গেটের সামনে রিকশা থেকে নামতে গিয়ে কিছু কথা শুনে ফেলেছিল আফরোজা। রাস্তার ওপর পাশের চায়ের দোকান থেকে তাকে উদ্দেশ করেই কেউ যেন বলেছিল –
‘দেখছিস? টাকার জোরে ছোকরা ছেলেকে বিয়ে করেছে। কথায় বলে না, টাকা থাকলে বাঘের দুধও মেলে!’
আফরোজা কিছু বলেনি। সে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। আর চোয়াল শক্ত করে রেখে না শোনার ভান করে গেটের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। তবে কথাগুলো তার মনে গেঁথে যায়।
তারপর থেকে, হয়তো অজান্তেই, তার ভালোবাসা একটু একটু করে দখলে পরিণত হতে শুরু করে।
মাহফুজের আয় খুব বেশি নয়। শহরের বড় বাজারে তার মুদিদোকানের আয় দিয়ে নিজের খরচই ঠিকমতো চলে না। মোটরবাইক আফরোজার, ফোনের বিল আফরোজার, জামাকাপড় আফরোজার টাকায়, বাড়ির প্রতিটি জিনিস তার।
এই অদৃশ্য ভারসাম্যের ভেতরেই তৈরি হয় এক অকথিত চুক্তি – মাহফুজ থাকবে, বিনিময়ে তার কাছে প্রত্যাশা – নিষ্ঠা, কৃতজ্ঞতা আর প্রকাশ্য আনুগত্য। কিন্তু মানুষ কখনোই পুরোপুরি চুক্তির মধ্যে বাঁচতে পারে না।
এই চুক্তির চাপ অলিখিত, কিন্তু ভারী – ধীরে ধীরে তাদের দুজনকেই ক্লান্ত করে তোলে। ঈর্ষা শুরু হয় খুব ছোট জায়গা থেকে। মাহফুজ অন্য ঘরে গিয়ে ফোন দেখে। দেরিতে বাড়ি ফিরতে শুরু করে। খোঁড়া অজুহাত দিয়ে সামনে থেকে সরে যায়। কথা বেশি বাড়তে দেয় না। প্রথমদিকের প্রেমময় অন্তরঙ্গতা এখন কেবল স্মৃতির অংশবিশেষ।
এসব বাড়তে থাকা অস্বস্তি আর মনকষাকষির ভেতর অনুপ্রবেশ ঘটে সুমি নামের তরুণীটির।
সুমি, পাশের বাড়ির মেয়ে। লম্বা গড়ন, শান্ত, সাদামাটা চেহারা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় গার্মেন্ট কারখানা থেকে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় আফরোজার গেটের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। গলির মাথায় পৌঁছানোর আগেই তার কাঁধ ঝুঁকে যায় – দিনভর কাজের ক্লান্তিতে।
আজকাল তার মা প্রায়ই বিরক্তি প্রকাশ করে ফেলে – ‘আর কতদিন এইভাবে একা থাকবি? একটা বিয়ে কর।’
সুমি চুপ থাকে। একদিন রাতে বান্ধবী নাজমার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় সে বলে – ‘আমি বিয়ে করতে চাই না।’
‘কেন?’
‘কারণ, আমি কারো ওপর নির্ভর করতে চাই না। বড় আপাকে দেখে শিক্ষা হয়েছে।’
‘সবাই কি খারাপ?’
সুমি একটু ভেবে বলে, ‘খারাপ না। কিন্তু নিরাপদও নয়।’
এই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই সে বেঁচে আছে।
মাহফুজের সঙ্গে তার পরিচয়টাও খুব সাধারণ এক ঘটনা থেকে। একদিন মাহফুজের বাইকটা নষ্ট হয়ে যায় তাদের গলির কাছে। দুজনের মধ্যে কিছু কথাবিনিময় হয়।
‘আপনার বাড়ি এইদিকে?’
‘হ্যাঁ।’
‘গ্যারেজে নিয়ে গেলে ঠিক হয়ে যাবে।’
ব্যস, এতটুকুই। এর বেশি কিছু নয়।
কিন্তু আফরোজার কাছে সেটাই হয়ে ওঠে অপরাধ, ভাগ্যের লিখে দেওয়া বিশ্বাসঘাতকতা। সেই রাতে আফরোজা ঘুমাতে পারেনি। ফোনের আলোয় তার মুখটা আরো ক্লান্ত, আরো ফ্যাকাসে লাগে। ফেসবুকে একের পর এক তরুণ মুখ – হাসি, আলো, স্বাভাবিকতা। শুধু তারই সবকিছু বয়স্ক, পুরনো ধাঁচের।
হঠাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে সে তার দৈনিক হিসাবের খাতার একটা পাতা ছিঁড়ে তাতে খসখস করে লিখে ফেলে – ‘আর একবার আমার স্বামীর দিকে তাকালে, গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেবো।’
লেখার সময় তার অনভ্যস্ত হাত কাঁপছিল, কিন্তু শব্দগুলো ছিল একদম পরিষ্কার। পরদিন সকালে সকলের অগোচরে ভাঁজ করা কাগজটা সে সুমিদের বাড়ির দরজার নিচে গলিয়ে দেয়।
যখন তার মা হুমকির চিরকুটটা সুমির হাতে দেয়, তার প্রথম অনুভূতিটা ভয় নয়, হয় অপমানের। ‘আমি কী করেছি?’ মাকে শুনতে না দিয়ে সে নিজের মনে বিড়বিড় করে ওঠে।
দুই
সুমি প্রথমে ব্যাপারটাকে জাস্ট মজা হিসেবে ভেবেছিল। কিন্তু আফরোজার হাতের লেখা দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। সে কাগজটা দেখায় বান্ধবী নাজমাকে।
নাজমা আগুনের মতো মেয়ে। ‘চুপ করে থাকবি? এইভাবে তোকে ভয় দেখাবে? চল, কথা বলি।’
শনিবার তাদের কারখানায় সাপ্তাহিক ছুটি। দুপুরের দিকে তারা দুজন আফরোজার বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়। কিছুটা সংকোচ আর কিছুটা সাহস নিয়ে।
‘আফরোজা আপা! একটু বের হবেন?’ দুপুরের রোদে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে নাজমা একটু জোর গলায় ডেকে ওঠে।
ভেতরে ড্রয়িংরুমের সোফায় আফরোজা স্থির হয়ে বসে থাকে। সে কণ্ঠস্বরটা চিনতে পারে। তার মনে হয়, যদি সে না বের হয়, কিছুক্ষণ পর সবকিছু থেমে যাবে। এত তাড়াতাড়ি এরকম মুখোমুখি হতে হবে এটা তার চিন্তায় ছিল না চিরকুটটা দেওয়ার সময়।
‘যাও, দরকার নেই’, একটু সময় নিয়ে সে ভেতর থেকেই বলে।
কিন্তু নাজমা থামে না। তার কণ্ঠস্বর আরো তীক্ষè হয়। কণ্ঠে একটা কটাক্ষ, একটা চ্যালেঞ্জ।
‘আপনি চিঠি দিয়ে হুমকি দিয়েছেন! বের হন, দেখি!’
আফরোজার ভেতরে জমে থাকা লজ্জা হঠাৎ রাগে ফেটে পড়ে। তার বুক ধড়ফড় করতে থাকে। কিন্তু মুখ থেকে বের হয়ে যাওয়া কথাগুলো আর তার নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
‘তোর ওই বেহায়া বান্ধবীকে বল, নিজেকে সামলে চলতে! বিবাহিত পুরুষের কাছ থেকে দূরে থাকতে!’
সুমি প্রথমবারের মতো মুখ খোলে, ‘আপনি কী বলতে চাইছেন। আমি কিছু করিনি।’
‘সবাই এটাই বলে!’ আফরোজা চেঁচিয়ে ওঠে।
নাজমা মোবাইল তুলে ধরে ভিডিও করতে থাকে, ‘আপনি তো রীতিমতো হুমকি দিয়েছেন?’
সেই মুহূর্তে আফরোজা বুঝতে পারে, ঘটনাটা আর ব্যক্তিগত বা গোপন নেই। লোকচক্ষুর সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। আর এটার জন্য সে একেবারে প্রস্তুত নয়।
বাকবিতণ্ডা শুরু হয় তাদের মধ্যে। অপমান, পাল্টা-অপমান, হাসি – সবকিছুই ধরা পড়ে নাজমার মোবাইলের ক্যামেরায়।
মাহফুজ যখন বাড়ি ফেরে, তখন তারা চলে গেছে।
‘ওরা আমাকে ভিডিও করেছে’, আফরোজা বলে, কাঁপা গলায়। ‘আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছিল।’
মাহফুজ মাথা চেপে ধরে। ‘তুমি পাত্তা দিলে কেন?’
‘কারণ তারা আমাকে বোকা ভাবছে!’ আফরোজা চিৎকার করে ওঠে। ‘তুমিই তাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছ!’
মাহফুজ চুপ করে যায়। আত্মরক্ষায় বলার মতো জুতসই কিছু খুঁজে পায় না সে। শোবার ঘরের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে চুপচাপ।
তার সেই নীরবতাই আফরোজার কাছে সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে বাজে।
সেই রাতেই ভিডিওটা ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগে না।
তিন
পরদিন সকালে পাড়ার চায়ের দোকানে, গলির মোড়ে, দর্জিবাড়ির দরজায় গুঞ্জন, ফিসফাস, মুখ টিপে হাসাহাসি।
‘এই মহিলাকে চেনো?’
‘ওই নীল গেটওয়ালা বাড়ির না?’
‘ভাই, ভাইরাল হয়ে গেছেন, আপনার বউ তো স্টার!’ কেউ মাহফুজকে ভিডিওটা দেখিয়ে বলে।
মাহফুজ মাথা নিচু করে ফেলে। সে জোর করে হেসে উড়িয়ে দিতে চায়; কিন্তু ভেতরে একটা চাপা সংকোচ খোঁচাতে থাকে।
বাড়ি ফিরে দেখে আফরোজা ফোন হাতে বসে আছে। ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক। পড়ছে কমেন্টের পর কমেন্ট।
‘ওরা আমাকে পাগল বলছে’, সে বলে। ‘আমাদের নিয়ে হাসছে।’
মাহফুজ আস্তে করে বলে, ‘তুমি দেখছ কেন? দেখো না ওসব।’
‘না দেখে পারি?’ তার কণ্ঠের অসহায়তা মাহফুজকে অস্বস্তিতে ফেলে।
আফরোজা দেখতে আর পড়তে থাকে সবগুলো কমেন্ট।
প্রতিটি মন্তব্য শেলের মতো আঘাত করে বুকে। বুড়ি ডাইনি। পাগল। নিশ্চয়ই স্বামী অন্য কোথাও যায়।
তার টাকা-পয়সাও এখন হাসির বিষয়।
‘টাকা দিয়ে ছেলে কিনেছে, এখন কাঁদছে।’
রাতে মাহফুজ ঘুমিয়ে পড়লে আফরোজা তার ফোন চেক করে। কিছুই পায় না। কিছু না পাওয়াটাই তাকে আরো অস্থির, সন্দেহগ্রস্ত করে তোলে। সে আরো বেশি করে চেষ্টা করে মাহফুজকে কাছে টানতে – ভালো রান্না, নতুন পোশাক, হাতে নগদ টাকা তুলে দেওয়া। যা যা তার মাথায় আসে সব।
অন্যদিকে, মাহফুজ নিজেও বন্দি বোধ করতে শুরু করে। সে ক্রমশ দূরে সরে যায় ভদ্রভাবে। কিন্তু তার ব্যবহার শীতল থেকে শীতলতর হতে থাকে। একসময় সে আফরোজাকে ভালোবাসত – তার মনের জোর, তার হাসি, তার আশ্রয় দেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু একই সঙ্গে তার অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা ধীরে ধীরে সেই ভালোবাসাকে দমিয়ে ফেলেছে। মাহফুজ ভাবতে বাধ্য হয় – সে কি দায়িত্বের কারণে আটকে আছে, নাকি অভ্যাসের বশে?
চার
ভিডিওর জোয়ার কমে গেলেও তার ছায়া থেকে যায়। পাড়ায় গল্প চলতেই থাকে।
‘ঈর্ষায় পাগল হয়ে গেছে’, বলে মাসুমা নামে এক অতিউৎসাহী প্রতিবেশী। ‘এরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক। বয়সের ধর্ম বলে একটা ব্যাপার আছে। আমি-আপনি চাইলেই সেটা অস্বীকার করতে পারি না।’ তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী, শারমিন নামে আরেকজন তার মতামত জানায়।
এসব চলমান গল্প-গুজবের মধ্যে মাহফুজ তার দোকানে এসে সামান্য স্বস্তি পায়। চাল-ডাল-তেলের গন্ধ, মোবাইলের রিংটোন – এখানে সে শুধু বিক্রেতা মাহফুজ।
একদিন সাথি নামে এক নারী ক্রেতা, তরুণী বিধবা সে, প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি সময় ধরে কথা বলে। তার গলায় এক ধরনের সমবেদনা।
‘আপনার দোকান থেকে বাজার করে নিশ্চিন্ত থাকি। জিনিস ভালো পাই, দামও নাগালের মধ্যে। আমার মতো সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এটা অনেক বড় ব্যাপার।’
এই সাধারণ প্রশংসাই মাহফুজের ভেতরে অদ্ভুতভাবে প্রতিধ্বনিত হয়, অগোচরে কিছু নাড়া দিয়ে যায়। বাড়িতে সে এখন শুধু অভিযুক্ত। এখানে, কাজের জায়গায়, কিছুটা স্বীকৃতি তো অন্ততপক্ষে মেলে।
আরেকদিন সকালে মাহফুজ কেবল দোকানের ঝাঁপি খুলে বসেছে। তখনো অন্য কোনো কাস্টমার এসে পৌঁছায়নি। বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে সাথি দোকানে এসে হাজির। পুরনো আন্তরিকতার সুযোগ নিয়ে দুয়েকটা কথার পর আচমকা জিজ্ঞাসা করে বসে, ‘আপনি কি সুখী?’
মাহফুজ থমকে যায়। ‘এই প্রশ্ন কেন?’
‘এমনিই।’
মাহফুজ উত্তর দেয় না। কিন্তু প্রশ্নটা তাকে ছেড়ে যায় না। তার ভেতরে নিষিদ্ধ এক অনুভূতি জেগে ওঠে, তারপরই অপরাধবোধ।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে আসার পর আফরোজা বলে, ‘এত দেরি হলো কেন?’
‘কাজ ছিল।’
‘মিথ্যা বোলো না।’
‘সবকিছুই কি তোমাকে বলতে হবে?’
কথাটা আগুন ধরিয়ে দেয় আফরোজার মাথায়।
‘হ্যাঁ, অবশ্যই আমাকে বলতে হবে!’ আফরোজা চিৎকার করে ওঠে। ‘কারণ আমি কিনেছি এই সবকিছু! এই বাড়ি, এই জীবন, এমনকি তোমাকেও!’
কথাটা বেরিয়ে যাওয়ার পর মুহূর্তখানেক নীরবতায় সবকিছু ডুবে যায়। মাহফুজ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখে প্রথমবারের মতো একটা স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায় – আঘাত, অপমান আর একধরনের অবসন্ন ক্ষোভ।
নিচু স্বরে আফরোজার চোখে চোখ রেখে সে জানতে চায়, ‘তাহলে আমি কী? বাজার থেকে কেনা যায় এরকম জিনিস?’
আফরোজা উত্তর দিতে পারে না। সেই রাতের পর থেকে বাড়িটা যেন আর আগের মতো থাকে না। ভাঙনের শুরু হয় সেদিন থেকেই। একই ছাদের নিচে থেকেও তারা আলাদা ঘরে ঘুমাতে শুরু করে। মাঝখানের করিডরটা অদ্ভুতভাবে লম্বা মনে হয়, যেন কয়েক পা হাঁটতে গেলেও একটা অচেনা দূরত্ব পেরোতে হয়।
আফরোজা যখন-তখন আয়নার সামনে দাঁড়ায়। চোখের কোণের রেখা ছুঁয়ে দেখে। নতুন অ্যান্টি-এজ ক্রিম কেনে, চুল বাঁধার ধরন বদলায়। কিন্তু তার মনের অশান্তি দূর হয় না। সে দিন দিন মোবাইল ফোনের আসক্তিতে ডুবে যেতে থাকে। রিলস ভিডিওতে দেখা নানা বয়সী মেয়েদের হাসি, নাচ, রঙ্গ-তামাশা দেখে তাদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে থাকে। তার ভেতরে এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়। একদিকে ঈর্ষা ধীরে ধীরে ভয়ে পরিণত হয়, অন্যদিকে বাড়িতে নীরবতা ঘন হতে থাকে।
পাঁচ
এক রাতে মাহফুজ বলে, ‘আমরা কি এভাবে থাকতে পারব?’
আফরোজা তাকায়। ‘তুমি কী চাও?’
মাহফুজ দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে বলে, ‘আমি জানি না।’
এই ‘জানি না’ কথাটাই সবচেয়ে ভয়ের। কারণ এতে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
পরদিন বিকেলে বাইরে আকাশ মেঘলা। বাতাসে একটা অদ্ভুত চাপা গরম। আফরোজা সারাদিন কথা বলেনি। হঠাৎ সে মাহফুজের ফোনটা খুঁজে পায়, চার্জে লাগানো, আনলক করা অবস্থায়। তার হাত কাঁপতে থাকে। সে সরাসরি মেসেজে গিয়ে ইনবক্স খোলে।
সাথি নামের একজনের মেসেজ প্রথমেই দেখতে পায় সে। মেসেজগুলো থেকে খুব বেশি কিছু বোঝা যায় না।
‘আজ আসবেন?’
‘আপনি ঠিক আছেন?’
‘কাল যা বললেন, ভাবছি।’
কিন্তু এই অল্প কথার ভেতরেই এমন এক অন্তরঙ্গতা আছে, যা অস্বীকার করা যায় না। আফরোজার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ঠিক তখনই গেটের বাইরে থেকে আওয়াজ শোনা যায়। সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। সুমি দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে নাজমা। তার বুকের ভেতরটা আবার কেঁপে ওঠে। পুরনো অপমান, পুরনো রাগ, সব ফিরে আসে।
নাজমা ডাকে, ‘আফরোজা আপা! একটু কথা আছে!’
আফরোজা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে। তারপর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে।
‘আবার কেন এসেছ?’ তার গলা শক্ত।
সুমি এবার আগের মতো ভীত নয়। ‘আপা, আমি শুধু একটা কথা বলতে এসেছি’, সে নরম স্বরে বলে। ‘আপনার স্বামীর সঙ্গে আমার কখনো কোনো ধরনের সম্পর্ক ছিল না। এক পাড়ায় থাকার কারণে দুয়েকবার সামনাসামনি দেখা হলে সামান্য কথা হয়েছে। এর বেশি আর কিছু না।’
আফরোজা তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকায়। ‘এসব বলতে তাহলে এতদিন এলে না কেন?’
সুমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। ‘কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। আর অপমানিতও হয়েছিলাম।’
নাজমা যোগ করে, ‘সব দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে নিজের সমস্যা মিটে যায় না, আপা।’
এই কথাটা যেন সরাসরি আঘাত করে।
আফরোজার কণ্ঠস্বর হঠাৎ কর্কশ হয়ে ওঠে। ‘তোমরা কি ভাবো? আমি কিছু বুঝি না? সবাই আমার পেছনে হাসে!’
নাজমা এবার এক পা এগিয়ে আসে। ‘মানুষ নানা কারণে হাসে, আপা। কিন্তু সব হাসি আপনাকে নিয়ে না। এরকম ভাবাটা ভুল।’
এরপর কিছুক্ষণের জন্য একটা নীরবতা নেমে আসে। এই নীরবতার মধ্যেই গেটের পাশে এসে দাঁড়ায় মাহফুজ। সে কিছুক্ষণ সব দেখে বোঝার চেষ্টা করে, আদতে কী ঘটছে।
তারপর ধীরে ধীরে বলে, ‘ওরা ঠিক বলছে।’
আফরোজা যেন আঘাত পায়। ‘তুমি চুপ করো।’
‘না, আজ বলব।’ তার কণ্ঠে ক্লান্তি, কিন্তু একই সঙ্গে তাতে সুস্পষ্ট দৃঢ়তা।
‘তুমি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছ। আমি কোথায় যাব, কার সঙ্গে কথা বলব, কিন্তু এতে কী হয়েছে?’
সে একটু থামে। ‘আমি দূরে সরে গেছি।’
আফরোজা ফিসফিস করে, ‘তাহলে সাথি?’
মাহফুজ চোখ বন্ধ করে। ‘হ্যাঁ, ওর সঙ্গে কিছু কথা হয়েছে। অনেকটা বাধ্য হয়ে বলেছি। যখন আমার কথা বলার তেমন কেউ ছিল না! কিন্তু?’
‘কিন্তু?’
‘কিছু হয়নি। এখনো না।’
এই ‘এখনো না’ কথাটাই সবচেয়ে তীক্ষè। এই অকপট স্বীকারোক্তি বাতাসকে ভারি করে তোলে। সেখানে আর কোনো শব্দের প্রয়োজন পড়ে না।
আফরোজা হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। তার চারপাশে সবাই দাঁড়িয়ে – সুমি, নাজমা, মাহফুজ; কিন্তু সে যেন একা। সে নিচু স্বরে, স্বগতোক্তির মতো বলে, ‘তাহলে এতদিন আমি কার সঙ্গে লড়ছিলাম?’
কেউ উত্তর দেয় না।
বাইরে হাওয়া একটু জোরে বইতে শুরু করে। দূরে মেঘ গর্জায়। আফরোজার মনে হয়, সে যেন হঠাৎ করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। অদ্ভুতভাবে, তার আর চিৎকার করতে ইচ্ছে করে না।
ছয়
সেই ঘটনার পর পাড়া আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। কেউ সরাসরি কিছু বলে না। কিন্তু একটা অদৃশ্য দূরত্ব থেকে যায়। সুমি আর আফরোজার দিকে তাকায় না, কিন্তু পথ বদলে চলেও যায় না। নাজমাকে কালেভদ্রে দেখা যায়। সাথি দোকানে আসা কমিয়ে দেয়। কিছুদিন পর সে বাড়ি বদলে অন্য এলাকায় চলে যায়।
আর মাহফুজ, সে বাড়িতে থাকে, কিন্তু আগের মতো নয়।
এক সন্ধ্যায়, আফরোজা বারান্দায় বসে সামনে শূন্যদৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে। আকাশে আলো-অন্ধকার মিশে একাকার।
মাহফুজ পাশে এসে দাঁড়ায়।
‘চা খাবে?’
আফরোজা মুখ তুলে তাকায় না। ‘রেখে দাও।’ কিছুক্ষণ পরে বলে, ‘তুমি কি চলে যাবে?’
মাহফুজ প্রশ্নটা বুঝতে পারে। সে উত্তর দিতে দেরি করে। ‘জানি না।’
এই ‘জানি না’ এবার আগের মতো তীক্ষ্ণ নয়, বরং ক্লান্ত।
সাত
রাতে আফরোজা আবার ফোন হাতে নেয়। স্ক্রল করতে করতে থেমে যায়। একটা ভিডিও – দুজন মানুষ ঝগড়া করছে, চারপাশে ভিড়, হাসাহাসি। সে কিছুক্ষণ দেখে। তারপর হঠাৎ ফোনটা বন্ধ করে ঘরের আলো নিভিয়ে দেয়।
অন্ধকারে জানালার কাচে নিজের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। এই মুখ – এই রেখা, এই ক্লান্তি – সবই তার। কিন্তু আজ প্রথমবার, সে মুখটার দিকে তাকিয়ে কোনো বিচার করে না। শুধু নীরবে দেখে। ধীরে ধীরে তার মনে হতে থাকে – ঈর্ষা আসলে অন্য কাউকে নয়, নিজের হারিয়ে যাওয়া সময়কেই আঁকড়ে ধরেছিল।
বাইরে বাতাস বইছে। দূরে কোথাও একটা মোটরসাইকেল চলে যায়। জীবন থেমে নেই, থাকে না। হয়তো আগামীকাল কিছু বদলাবে। হয়তো কিছুই বদলাবে না।
আফরোজা জানে না। সে শুধু জানে – এই মুহূর্তে, সে আর আগের মতো ডুবে যাচ্ছে না। তার হাত দুটো ক্রমশ স্থির হয়ে আসে। অন্ধকারে, খুব ক্ষীণভাবে, যেন একফোঁটা আলো জমতে থাকে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.